ডায়েরি

বিভা
আজ সারাদিন তোমার ডায়েরি পড়লাম
প্রতিটি পাতায় লিখে রাখা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার বিষাদ খেয়াল
স্মৃতিচারিতার সুতোয় গাঁথা একটা একটা দগ্ধ দিনের ফুল
প্রায় বেয়াল্লিশটা বছরের কথা
বড়ো কম কথা নয়
নয় মামুলি বিষয়।
তোমার ডায়েরি পড়ে জানলাম
নারীর পৃথিবী, নারীর সংগ্রাম
নারী কমিউনিজম, মার্কস থেকে মাও সেতুং
মনুসংহিতা এবং নারী, ধর্ম ও নারী
সাঁওতাল বিদ্রোহ থেকে তেভাগা সংগ্রাম
হারানো অতীত থেকে ঝাঁপানো বর্তমান।
পদে পদে সময়ের আয়না
স্বাধীনতা হারা এক নারীর চোখ দর্পনে
দুই শতাব্দী যাপন ক্ষণের বচন
বুকজুড়ে কষ্ট তো নয় বরফের গান।
তোমার প্রশ্ন গুলো কোট করে রাখলাম বলেছিলে-
‘এমন কোন আর্দশ বা নীতি এ জগতে স্থান কাল-পাত্র নির্বিশেষে, সব সময়ের জন্য সার্থক হয়েছে?’
আমি জানি না হয়েছে কিনা
বলেছো’ আমার জীবনই আমার বাণী’ যদি কারো বোধগম্য না হয় তবে আমার বাণীকে অযৌক্তিক মনে হতে পারে।
বড় ভাল বল্লে বিসর্জিত বিবেকে
আমরা আর কতটুকু ধার্মিক থাকি?
প্রতিশোধ নেবার পালা যখন এলো
তখন তুমি গান্ধীর সেই প্রত্যয় মেনে নিলে
বলে ফেল্লে – চোখের বদলে চোখ যদি নিতে হয়
তাহলে পৃথিবী একদিন অন্ধ হয়ে যাবে,
অহিংসা ও প্রীতির মধ্যে যে বীরত্ব নিহিত তা হিংসায় নেই,
তাই তো তোমাকেও গান্ধীর মত লক্ষ্মণ তুকারাম গোলে কে রেহাই দিতে হলো,
তোমার কি মনে হয়নি একবার
তোমার আত্মকথা বদলে গেলো?
হয়ত ভাবছিলে তুমিও গান্ধীবাদী সত্য- সাধনার উত্তরাধিকার নেলসন ম্যান্ডেলা, মার্টিন লুথার কিং, বিশপ টুটু, আউংসাংসু-চি র মত স্বদেশ বিদেশ জাতীয়ভাবনা ও বিশ্বজনীনতা মিলবার-মেলাবার চারিত্রধর্মে একাকার।
তুমি গুছিয়ে যতটা সুন্দর ভাবে নিজেকে সামলেছিলে
কিন্তু সাহিত্যর প্রতি, বন্ধুত্বের প্রতি তোমার প্রগাঢ়তা তলানিতে এসে ঠেকেছিল,
তোমার চিলতে গোপনে বাস সামাজিক মননে ধিক্কার ছিল তাদের প্রতি
দোষ গুণ বিচারে যারা একদম ঠোঁটের গোড়ায়
তোমার দেহ শৈল্পিকতা কে নিছক
হাম্পি বাকুরা খাজুরাহো র মূর্তি বানিয়েছিল
বড় ভাল লাগলো তোমার সূর্যাস্ত এবং চন্দ্রোদয়ের সময়কার দেহমিলনের স্মৃতির স্বর্ণখন্ড,
বিভা’’র গোপনতার দুরত্বের বিষাদের
হাজার হাজার তারাজ্বলা সুখের গভীর আকাশ। তোমার ইচ্ছেগুলো আদর গুলো মনখারাপ, গলা চিরে চিৎকার রক্তঝরা ঠোঁট তোমার লেখা ডায়েরির ছেঁড়া পাতায় থমকে গেলাম
কি ছিল তবে?
পরের পৃষ্ঠায় কিচ্ছু নেই, শুধু আঁকিবুকি,
অভ্যস্ত হাতের আঁচড়ে কিছু মুখের কোলাজে ঠাসা কিছু বিকৃত মুখের অবয়ব। বুঝতে দেরি হয়নি তুমি এক থাবলা থু থু দিয়েছিলে সেই মুখ গুলোতে।
তুমি আদরের পাগল ছিলে
রূপকথার রাজকুমারের কিন্তু বাস্তবে হয়ে গেলে প্রগতির পথে এক সংগ্রামী জীবন,
মানুষ হওয়া মানুষ করা : সমকালের অনুষঙ্গে।
পালন করতে শুরু করলে বারো মাসে তেরো পার্বণ।
কথা দিলাম বিভা তোমার দিনলিপির লাইনগুলো আমি ছড়িয়ে দেবো
চলমান সময়ে গুঁজে রাখবোনা
পুরোনো তোরঙ্গে।
…………………………………………..

সুরাইয়া…

‘জালিম’ এ নামটা খুব পরিচিত-
পাশের বাড়ির মেয়ে মনে হয়।
তাই তো সেদিন দাদা বললো, “যদি পটে যেত বউটা!
এবার যদি মেয়ে হতো, সত্যি ওর নাম রাখতাম ‘সুরাইয়া’
জানিস তো, একই নামে সুরা ও সুর দুই-ই বর্তমান।”

সু রা ই য়া…..
নাম ধরে ডাকতেই মনে হলো দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
দৌড়ে গিয়ে হুড়কো নামিয়ে দেখি,
একটা নিরবতা—দূরাকাক্সক্ষা—মৌন
একটা রঙিন, থমথমে মুখ
লাল-নীল সুতোয় বোনা একটা পুতুল…

গতকাল আমার মেয়ে পাশের বাড়িতে ফেলে এসেছিল,
এই যে পুতুলটা!
আচ্ছা, এ কি গান ভালোবাসে? সাজতে?
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে বেগুনি রুমাল খোঁপায় জড়াতে?
এ কি গাইতে পারে?
‘ঘুঙ্ঘট কি আড় সে দিলবার কা
দিদার আধুরা রেহেতা হে
যাব তাক না পারে আশিক কি নাজার
শৃঙ্গার আধুরা রেহেতা হে…’

তার সৌন্দর্য আকাশে ওঠে; কত গল্প কত কত কথা—
অদেখায় ঢাকা থাকলো ঋজুপাঠ।
আমরা দুজন ছেলেবেলায় ভাঙা ধ্বস্ত সিঁড়ি বেয়ে
দু’চার ধাপ টপকে, কত কুল পেড়েছি!
কাঁচামিঠা আম, আচারের বয়াম ভেঙেছি!
-সে কি ভয় ওর! দেখিস আজ মা মেরেই ফেলবে!
পাপবোধে হাত দিয়ে, চোখ দেখি ভেসে যাচ্ছে-

কেমন একটা স্কুল পালানো ফন্দি,
পাঠ রোধ, ভুলভাল ব্যাকরণ,
আতঙ্ক বিজ্ঞান, বিফল গণিত।
গোলাপি-হাসনা বিলাস, তেলের বাটি
সবুজ শার্টিনের ফিতে, কাঠের চিরুনি, লম্বা কলাবেণি,
চুলটা আঁচড়ে দিতে দিতে ওর মায়ের বকুনি, ধাড়ি মেয়ে!
গোসল শেষে একমাথা ভিজে চুল- ও টান খায় চুলে,
আমি বসে কান্নার সিঁথি কাটি দূরের দেয়ালে দেয়ালে…

জানিস তো, তোর নামটা নিয়ে কত খিস্তি-খেউড়
কাঁদতিস খুব বখাটে ছেলেটার খেপানোর শব্দ শুনে,
‘সুরাইয়া রে সুরাইয়া দিলি অন্তর জুড়াইয়া…’
-শোন বান্ধবী বলছি, তোর নাম আখ্যান আরব দেশের;
সুরা থাকে সুর থাকে, থাকে মাতলামি।
এখন কি তোর জন্য কেউ মাতাল হয়?
তোর কি রাগের গ্রীষ্মতাপ গায়ে লাগে?
তুই কি ভালো রাঁধিস এখন?
শুনেছি তুই স্কুল পড়াস- দিদিমণি নাকি?
টিউশনটা জমেছে কি?
কেমন বুঝিস সংসার মাটির জ্যামিতি?
শুনেছি তোর উঠান ভরা গাছ,
ফড়িং ওড়ে, ফলে-মূলে ঠোকরায় নাকি পাখি!

জানিস, আমি পেয়ারাটা এখনও খাই নুন আর ধানি মরিচ ছাড়াই,
তোর কথা ভাবি আর স্মৃতির জালখানি রোদ্রে শুকাই।
জানি, তোর ঘরে আমার ভালোবাসা মাপবার যন্ত্রখানি নাই
নাই কোনো অনুভূতি, নাই সেই বোঝাপড়া।

মনে আছে তোর আমার লেখা চিঠি?
প্রেম করতিস তুই আর অনুভূতি লিখতাম আমি!
কত ডাকি তোরে, ‘ওরে বন্ধু, ওরে আমার সুন্দর…’
ডাকি দূরে থেকে… নিরুপায়…

এ কবিতাটা পড়বার একটা বিহিত অন্তত কর-
জানিস, আজ বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে মন,
স্মৃতির পাতা উল্টে যাচ্ছে জলে;
সেই অমলা ডোবার উল্টে দেওয়া হাওয়া-
ফ্রকের বেলুন উড়িয়ে যেন কিশোরবেলায় যাওয়া।
বুঝবি তো এই কবিতা? একেবারে সহজ বাংলায় লেখা
-পড়িস, যদি পত্রিকাতে ছাপে।

আমি চিরটাকাল ভ্রাম্যমাণ হিমালয়ের মতো উদাসীন।
জানি জানি জানি, আমি তোর জীবনে শিহরিত ছত্রাক!
যদি কখনও সময় পাই,
দেবো প্রেম-সুধা-সিন্ধু এক আঁজলা ভরে
সুরা ও সুর এক করে ডাকবো নতুন করে
‘সুরাইয়া’ আমার বাল্য বন্ধুরে…
…………………………………………..

পাগলু

নির্দয় রোদ্দুরে মহা শোরগোল,
ভিড়ের মধ্যে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে
এগুচ্ছি,
চারিদিকে কয়েক‘শ লোকের চোখ,
ঢেউয়ের মত ফুলে ফুলে ক্রোধে
কেঁপে উঠছে মস্তান গুলোর বুক।

এগুচ্ছি আরও কাছে অনেক কাছে
ঘটনার ভূমিতে অতি কষ্টে ভিড় ঠেলে
ঘাম হচ্ছে অঝোরে, তেষ্টা গলা ভরা
ভারী সঙ্কুচিত, জড়সড়।

হঠাৎ চোখটা ছিটকে পড়া রক্তের ফোঁটায়
পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে একজোড়া যুবক
পিটা শালা শুয়োরের বাচ্চাকে,
একটা আধশোয়া নিরালম্ব শরীর
টানতে টানতে উঠবার তাগিদ
পায়ে জুতো নেই, জামা ছিড়ে ফর্দাফাই।

সর্বাঙ্গে বিষের ব্যথা
কালশিটে রক্তের দাগ কপাল চাতালে
খানিকটা বমি উগ্রে এলো
মানুষের পশুত্ব দেখে
রক্ত পড়ছে কপাল, গাল, নাক, কনুইয়ের
রাস্তা বেয়ে।

সমস্ত শরীরে ধুলো কাদার আস্তরণ
ঠেলে এগুচ্ছে
কোথায় ধাবমান হচ্ছে সে
চলতশক্তিহীন শরীরটা কতদুর নিয়ে যাবে
সে,
পথচারী দেখছে, হয়তো ভাবছে
নেড়ি কুকুরের অধম।
ছোকরা কতক
গালাগাল দিচ্ছে, আর লাথি বসাচ্ছে,
হঠাৎ একটা পরিচিত শব্দ পেলাম,
শৈশবের পরিচিত কান্নার, কতবার
শুনেছি,
বুঝতে দেরি হল না সে কে!

নিজেকে আড়াল করবো সে চিন্তা
হল না,
শুধু কান্না এলো বুক ভরে
চোখের জল ছুটে এলো
তবু আহত রক্তাক্ত মুখটা বড়
আদুরে চোখগুলো নির্মোহ
প্রতিশোধ নেবার প্রতিহিংসা মেরে
বেঁচে আছে শুধু।

জীবনের গতি মসৃণ ভাবে ছোটেনি তার
একটা চিঠি একটা ছোট প্রত্যাখ্যান
সম্ভাবনাহীন আশাহীন এক জীবন
দিল তাকে,
সে পাগল পাড়ার, মোড়ের পাগল
বটে, মার খায়, গাল খায়,
কিন্তু ব্যাথা নিয়ে বেঁচে থাকার হোঁচটগুলি
খেতে হচ্ছে না তাকে।

তার স্বপ্ন নিয়ে ভয় নেই,
না, জীবন নিয়ে ভয়।

কাছে গিয়ে রক্তাক্ত মাথাটা
বুকে জড়িয়ে ধরি
হঠাৎ যেন জেগে উঠলো
বেয়াল্লিশ বছরের স্মৃতি।

দে, দে, ডলার দে, অস্ট্রেলিয়া যাবো,
মায়ার কাছে যাবো,
…………………………………………..

বিড়ি

একটা বিড়ি হবে বাবু
আরে আকাশ থেকে পড়লি কেনে,
একটা বিড়ি চাইছি
দে দে, দে কেনে,
তুই বড় ভালো মরদ
বলেনি কেউ?

আমি তোকে চিনি বাবু
যখন থেকে মধুঋতু পিঁপড়ে খাওয়া শুরু করলো
সেই তখ্খন থেকে
আচ্ছা বলবি তো ঠিক ঠিক
বস্তায় ভরা ওটা কার লাশ
অমন করে মারতে পারলি?

তুই না স্বামী নামের দেবতা
তোর জন্য কত পরমান্ন রেঁধে
চলকে পড়া ঝোলে হাত পুড়েছে
তুই অমন করে উপোসী পেটে লাথি
বসাতে পারলি?

জানি জানি
মরদ চায় নিত্যনতুন
মুগ্ধতার ছক
ঘরের নারী যতই মুখ ধোঁয়াক
ছুঁচু করার
তবুও তুদের মনে কত কত
আমার মত পথ নারী
বকবকম যৌনকাতর।

অ্যাই মাগি বোইলবি না
একটু পরেই তো আইসবি
বুকের হরলিক্সে নাক ডুবাতে,
তা না হলি তুই তো, না মরদা ।

হুম আমি ডাইনি
তা না হলি তোরা
এক ঘেয়ে পিটাবি
বিষ নজরে তাকাইবি
পেটের বাচ্চা মাইরবি।

মানুষ ও মানুষ এখনো জাগে না
মানুষ গর্জে উঠেনা
অন্ধকার ভাঙ্গে না দেখে
আমি সুজাতা কত মরদের
চাঁদমারি অভিযাত্রী।
…………………………………………..

আমিবাদ তুমিবাদ

রোজ দৃকপাতহীনভাবে চলে যাই
পাশ কাটিয়ে,
এ এক বীভৎস রচিত বাস্তবতা,
যা কিছু দেখা
অতি কঠিনের চেয়েও সত্য।

যতই নারীবাদ পুরুষবাদ
সমবাদ অসমবাদ করে
আগুনের চিৎকার উড়ে ফেসবুকে
মুখ তো নয় যেন বিষন্ন কাঠ
চলমান অস্থির মিছিল।

যারা প্রকৃত বাতাবরন রচনা
করে,
একটু জল চায় তাও তোমারই হাতে
তবুও তারা কান্নাগুলো
আলাদা করে।

টেনে নিয়ে যায়
তারা দীর্ঘ আহাজারি হুংকারের
দীর্ঘ কবিতায় ফেসবুকের
গুটি কতক চরিত্র রচনা করে
তারা বহন করে
প্রেম আঘাত অবিশ্বাস।

তাড়িত নারীর বুকের ধুকপুকানি
পেটিকোটের ভোরের গিঁট ছাড়ার
হিসাব?

কিন্তু রাত হলে বিষন্ন ছাদ
কিংবা বিছানায় নেড়েচেড়ে
পাশবালিশকে পুরুষ বানিয়ে
জড়িয়ে ঘুমায়।

তবে কি করে উটের চামড়া
চিনলো,
তোমরা যারা মানুষের অস্তিত্বকে
নিয়ে ভাষার প্রগাঢ় মায়া রচনা করছ
কেউ কি বিষন্নতাকে আত্মসাৎ করে
টইটুম্বুর হতে পেরেছো কখনো?

গায়ক, কবি, লেখক, চারুকলার
উন্মেষকে নেতি করে।

তৃতীয় বিশ্বের মানুষের স্বপ্নগুলো
এখনো আদুল শরীর
একচিলতে সবুজ ভূখন্ড কাঁচালংকা
জানি জানি তোমাদের মজবুত
পাহাড়েও হাওয়া দেয়
নতুন প্রত্যাশা জাগায়!

অন্ধ স্কুলের ঘণ্টা যতই বাজাও
কুলুঙ্গিতে আগুন তো তোমাকেই
দিতে হবে উজল করতে
সময়কে।
আমি তো সেই গান্ধীবাদে
পড়ে আছি
‘অহিংসা ও প্রীতির মধ্যে
যে বীরত্ব নিহিত
তা হিংসায় নেই’।
তাই আমিও গান্ধীর সাথে
‘বলি, আই এম ইন এভরিবডি
এন্ড এভরিবডি ইজ ইন মি’
‘ম্যান ফর ম্যান, দা স্ট্রেন্থ
অফ নন ভায়লেন্স ইজ ইন
এগেইন্সড প্রপরশন টু
দি এবিলিটি নোট দা উইল
অফ দা নন ভায়লেন্ট
পার্সন টু ইনফ্লিক্ট
ভায়লেন্স।’
…………………………………………..

শক্তি ও ভক্তি নারীমুক্তি

শহরের তরুন তরুণীরা যেখানে
খোলামেলা হতে শেখে
তার নাম হাতির ঝিল।
শহরের তরুণীরা যেখানে হালুম হয়ে যাবার হাত থেকে বাঁচে
তার নাম হচ্ছে ফেসবুক।
এ যেন কুমিড় তোর জলে নেমেছি খেলা
জলে নামবো কিন্তু জল ছোঁব না।
কত কত নারী মওকা পেয়ে
কত অধমের পিঠে চড়ে টপকে
পেড়িয়ে যাচ্ছে সিঙ্গাপুর মালেশিয়া।
আহা! কাল মার্কস পণ্য হিসাবে প্রেমের
রুপান্তর সম্পর্কে কিছুই কেন লিখে গেলে না!
এখন প্রেম প্রেম আবেগের অফারে তুলকালাম বাজার গরম
যাদের মনে প্রেম নেই
দীনের দুর্দশা পিঠের ঝোলাও ফুটো তাদের।
পণ্য সর্বস্ব সমাজে বিউটিপার্লার গুলো
দেদার জমেছে
কারা সবচেয়ে প্রমাণ সাইজের ক্রেতা?
সরকারী কর্মকর্তা সম্মিলিত সংস্কৃতি জোট
রাজনৈতিক শ্রমীক ঐক্য চলচ্চিত্রের ফ্রেমের মালিক
প্রত্যেকেই নিজের পণ্যের পাবলিসিটে ওস্তাদ।
তবু মেয়ে তোমার কাছে ভিক্ষা চায়
নায়ক নয় তবু সাজে
বাঘ নয় তবু রয়েল বেঙ্গল টাইগার
কে চায় না ভিক্ষা?
পরিবেশবাদী বুদ্ধিজীবী সব্বাই কনজার্ভেশন ও ইকোলজীর আঙিনা দূষিত করে।
বলছি মেয়ে তুমি চিনাবাদামের লোভে
ফুলের মালা মাড়িয়ে যাচ্ছো
যারা পাজামা খুলে ম্যাডোনার স্থাপত্যে প্রগ্রাব করে
তারা শিল্পের আর্কিটেকচারকে
জুতা খুলে ভক্তি জানালেও
তোমার নিজের নিজেকে ইনফেরিয়র ভাবাতে বাধ্য করে।
কত রাবার ঘষে মাতৃজনিত দাগ মুছবে আলেয়া
তোমার ওজন তবুও শূন্য।
অহো! আল মাহমুদ
তোমার কবিতার লাইন খুব মনে পড়লো
‘মক্তবের মেয়ে চুল খোলা আয়েশা আক্তার’
কত আধুনিক মক্তবে চুল খুলে বসেছে তখন!
এখন মক্তব বাজার, ভার্সিটিতেও রঙ বাহারী রুমালে ঢাকছে মাথা
কোন আয়শা আক্তার আর চুল খুলে মক্তবে যায় না।
নারী নিজের প্রোণোদনায় নিজেকে চিনতে
ব্যর্থ তুমি;
মনে রেখো যারা পেটিকোট প্লাজো পড়ে না
স্কিনি প্যান্ট পরে তারা হ্যাঁচকা টান খায়না।
তোমার রঙ করা চুল দেখে
পুরুষরা লোমের মসৃনতার গল্প জুড়ে দেয় কফির কাপে
আর তুমি শুধু আমও হারাও ছালাও হারাও।
তুমি রাজী হও সারোগেট মাদার হুড
টেস্টটিউব হ্যাচামল, ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশন।
মানুষ পয়দা হয় জননেন্দ্রিয় থেকে নয়
কারখানা থেকে
তুমি মাদার মেশিন
তুমিই তো মস্ত প্রহসন
কি নাম দেবে এর
নারী মুক্তি শক্তি ও ভক্তি।
…………………………………………..

পাল্টে যাচ্ছে অনুভুতি

থরহরি শরীরে কতো শত বাস্তব জ্ঞানের
সঞ্চার হয়েছে, সাত ঘাটের জল খেয়ে
বড় হতে হয়েছে।
এ জীবন স্পষ্ট,
সমগ্র জগৎএকই
একটা ঠাট্টা মাত্র?
এসব কিছুর মানে কি?
কেন রচিত জড়ো জগৎ, এই চৈতন্য
এই প্রাণ!
জবাব পাই না…

হেমন্তের কুয়াশার মতই
সৃষ্টির সত্যগুলি অবগুণ্ঠনে ঢাকা,
স্থির নিরুত্তর,
সাত ঘাটের জল খেয়ে খেয়ে
ভিন দেশে নোঙর ফেলে বসে আছি চার সাল।
আর কোন বন্দর ডাকলো না,
কোথাও যাওয়ার নাই।
এ শহরের রাস্তায় আঁতিপাঁতি
খুঁজি প্রিয় ঋতুগুলি,
সেতাবগঞ্জ, মঙ্গলপুর, কাহারোল,
মোল্লা পাড়া, বাজনাহার বকুলতলার
সীমানায় ছিল আমার খেলা,
কোথায় তারা ?
খুঁজি আর খুঁজি,
ভাঙা চোরা উপচে পড়া বিন,
বৃক্ষহীন ফুটপাত, জনাকীর্ণ ময়দান,
পিঙ্গল আকাশ,
কোথায় তুই ?
স্মৃতির আনাচে কানাচে পদশব্দ শুনি
ত্রস্ত হরিণের মতো পালায়,
যে ঢাকা শহরে বাস করেছি
এক যুগের অধিক,
সেখানে কোটি ছাড়িয়ে মানুষ
পোকামাকড়দের জীব জন্তুর
গাছপালার জায়গা কেড়ে নিচ্ছে
লুটেরার মতো।
প্রকৃতি লক্ষ্মী পিছুতে পিছুতে
চৌকাঠের বার
ঋতু চক্র উঁকি ঝুঁকি দিয়ে ফিরে যায়,
ঢাকা শহর গভীর গভীরতর
অসুস্থ এখন
দেশের সবচেয়ে বড় বিপদ
জনগণের বাড়বাড়ন্ত।
বুদ্ধিমান কূটনীতিকরা বুঝতে পারলেন না মোটে !
মনুর সন্তানেরা চোরাপথে স্রোতের
মতো এসে দেশ ভাসিয়ে দিল,
সাড়া দেশ জুড়ে ধস্ত করে
দিল প্রকৃতিকে, উবে গেল
দণ্ডক বন, দাঁতন কাঠির টান
পড়ে যায় সুন্দরবনে।
হারিকেনের মায়াবী আলোয়
শুরু হয়েছিল শৈশব
বাড়িতে প্রথম টেলিভিশন
এলো যখন, আমার মায়ের তখন
বয়স বাইশ,
গ্যাসের উন্নয়ন চুরাশিতে, এক জীবনে
মায়ের অনেকবার জন্মান্তর ঘটে গেল,
টেলিভিশন, মাইক্রোওয়েভ,
কম্পিউটার, স্মার্ট ফোনের ঘেরাটোপের
মধ্যে বসেও কেন যেন
ভ্রমবশে চমকে উঠি,
জীবনের কন্ট্রাক্টর কেউ কি চেঁচিয়ে বলছে
পিছনের দিকে বড্ড এগিয়ে গেছেন ম্যাডাম!
…………………………………………..

ভূমিপুত্র

মোষের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়াতে
দেখছিলাম আখ ও পাটক্ষেতের
এক বাক্সে রহস্য।

যে কিশোর লেদ মেশিন মুছত
তার মর্মমেঘ থেকে বৃষ্টি নয়
মাধ্বী ঝরে পড়তো।

এক জীবনে শরীর একমাত্রিকতায়
থেমে থাকে না,
প্রেমের বহু রৈখিকতায় নবীকরণ ঘটে
জঠরের অন্ধকার ভেদ করে
যেমন আলো আসে চোখ মেলতেই
আততায়ীর মত আঘাত হানে।

জলে ধুয়ে যাওয়া আগুন তো আগুনই
সময়ের বেড়াল পাড় হয়-
শৈশব কৈশোর যুবা পড়ন্ত বেলার
পথ ধরে।

জীবনের ঝাড়খ- সীমান্তের
কাছে যোগাযোগ
এই একটা শব্দেই হ্যাজাক জ্বেলে
সুখ দু:খের পিকনিকে মাতি,
সক্রেটিসের পৃথিবী জানতে হয়।

পাওয়া কিংবা না পাওয়ার মেলায়
হয়তো ডাকে না কেউ
জীবনের পথে পথে উত্তর খোঁজার চেষ্টা।

পার হয়ে আসা বেড়ালের
নখ আঁচড়ের সম্ভাবনা স্বতন্ত্র,
লেদ মেশিন মুছে এসে
আমার চোখে বাংলাদেশের
মানচিত্র আঁকে সেই যুবক।

আমি তার দিকে তাকিয়ে
নিঃস্বতার অভিব্যক্তি সুন্দরের
আর্তনাদ দেখি;
যন্ত্রের তর্জনী কেড়ে নিয়েছে
তার সহজ প্রকৃতির অধিকার
কে দেখাবে তাকে সরল ও
সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন…
…………………………………………..

আমরা সবাই সংস্কৃতিবান

কারা-বা রাষ্ট্রদ্রোহী, কারা-বা রাষ্ট্রের দুশমন?
কে ফেইসবুক বন্ধু, কে-বা ঘরের বিভীষণ?

যদি জিজ্ঞাসা করি নিজেকে
একই উৎস মুখ থেকে জবাব আসবে-
‘নিজেরই ঠিক নাই গাল ফুলিয়ে প্রশ্ন করছে!’

অরণ্যের আঁতুড়ঘরে যার জন্ম
তার লজিকবিজ্ঞান, যুক্তি কতটুকু গ্রহণীয়?
আর যে সোনার চামচ মুখে জন্মেছে
তার লজিকবিজ্ঞান কতটুকু পা-িত্যের?

স্তুতি কারা করে
আসলে কাদের করে সম্বোধন?

মানুষ বড় অদ্ভূত বটে
একই মুখে উপরঠোঁটে দ্রোহ, নিচঠোঁট দুশমন!

সকল অভ্যুদয় ঘটছে একসাথে
একই উৎস মুখ হতে
তবুও যায় না বোঝা
কে প্রিয় বন্ধু, কে প্রিয় শত্রু জন?

মাঝে মাঝে ট্রিগারে হাত দিয়ে দেখতে ইচ্ছা হয়
কতটুকু আঙুল কাঁপে থর থর
যতটুকু হাত কলম ধরলে কাঁপে ঠক্ ঠক্
খেয়াল করি খুব, কান পেতে শুনি
মেঘের উপরে মেঘের ঘর্ষণ
আর মানুষের সাথে মানুষের প্রহসন!

আমার খুব ভাষণ শিখতে ইচ্ছা হয়
রাষ্ট্রদ্রোহীকে গালাগাল দেবার জন্য
আমার খুব দুধর্ষ শাবক জন্ম দিতে হচ্ছে হয়
শেখাতে ইচ্ছা করে কেমন করে ধরতে হয়
এক হাতে বাঁশি, আরেক হাতে রণতূর্য!

মাল্টিভিটামিন গামী চোষা শাবকেরা
অস্ট্রেলিয়ান মাইলো অব কমপ্ল্যানের ডিব্বায় যারা
মগজ বৃদ্ধি করে

তারা কি জানে, কচুঘেঁচুর পুষ্টিগুণ?
তারা জানে? আর্সেনিক-কীটনাশকের বিষমাড়িয়ে
কি করে বিশ্বকাপ ক্রিকেট মাঠে নামতে হয়?

এখন তো ফঢকাবাজ আর ঋণ খেলাপিদের হাতে পুঁজি ও মূলধন
তাই দরিদ্র বিমোচনের রহস্যভেদ করতে
হাতে হাতে পৌঁছে দিয়েছে মোবাইল ফোন!

চব্বিশ ঘন্টার চ্যানেল খুলেছি আমরা
বিউটি কনটেস্ট, মিউজিক আইডল, দারুণ সব টক শো!
কেবল মজবুত দাঁতের ঝিলিক আর কি!
বছর বছর রজত জয়ন্তী পালন
উন্নয়ন উন্নয়ন!