শুভকামনা

ভালো থাকুক প্রিয় গায়ের মাটি
মায়ের খায়েসের শীতল পাটি
জোছনার ফুল
কিশোরীর চুল
তুলতুলে গাল
শিশুদের পাল
ভালো থাকুক বাবার প্রিয় শাল
বাড়ীর কিনারে বহমান খাল

ভালো থাকুক শালিখ টিয়া কাক
মোরগ আর হাঁসের ছোট্ট ঝাঁক
কৃষাণীর হাসি
আড়িপড়ি মাসি
ফসলের মাঠ
দাদীমার খাট
ভালো থাকুক ঘাস ফড়িঙের দল
অপাংতেয় ডোবার টলমলে জল

ভালো থাকুক আমার মাও মাটি
নির্ভয়ে নিরাপদে যেথায় হাঁটি
শেফালী বকুল
নদের দু ‘কূল
পাখির কূজন
বন্ধুয়া সুজন
ভালো থাকুক ওড়া নিজেরই মত
দূর হোক অপয়া আঁধার যত।
…………………………………………..

জলবাসী

যেখানে সবাই বড় বড় গ্রন্থ পঠনপাঠন শেষে
সভা সেমিনারে তুমুল জ্ঞান জাহির করেন,
মুহুর্মুহু করতালিতে ত্রিকাল দর্শি গুণীজনের—
অকুণ্ঠ প্রসংসার ফেনিল জলে ভাসতে থাকেন।
যেখানে কেউ কেউ রান্নাবান্নার প্রতিযোগিতায়—
সেরার খেতাব পেতে তেল মসল্লার মাপজোঁক শেখেন,
কেউ কেউ সুর সাধেন,
রূপবিশেষজ্ঞ হতেদিনের পর দিন প্রশিক্ষণে নিয়োজিত থাকেন,
কেউ আবার পার্লার কেউ অনলাইনে বানিজ্যের পসারা সাজান।

সেখানে আমি,
জলভেদি কোনো এক কচি সবুজ ঘাসের ডগায় —
প্রজাপতি মুকুট হয়ে জড়িয়ে থাকি।
পানিফুলের ডিগডিগে লতায় দুলতে থাকি ঢেউয়ের ভাঁজে।
তোমরা আমাকে ডাকো শাপলা, শালুক,কেঁচোর ও পানাফুল নামে।
আমার তৃপ্তি এই জলজ জনমে, আমাকে ডেকো জলবাসী নামে,
আমিতো জলোদ্ভব; জলেই করেছি রোপণ এইপ্রাণ
চারপাশে জল শুধুই জল, বুকভরে নেই জলের ঘ্রাণ।
…………………………………………..

দেবতার পায়ে ঘুঙুর

মেয়েটি চেয়েছিল ঘাসফড়িং হতে
শিশিরে টুপকরে মুখ ধুয়ে,
রুদ্দুরের ডানায় চরে নিরুদ্দেশে উড়াল দিতে।
কনকলতায় বসে হালকা বায় দুলতে দুলতে,
জলপাইর সদ্য লাল পাতায় গাঁ এলিয়ে—
ঝিমুতে ঝিমুতে,
সে ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতে চেয়েছিল।
পদ্মপাতার বুকে শুয়ে শুয়ে ঢেউয়ের পিঠে চড়ে,
সাত সমুদ্দুরের ওপারে—
সেই পৌরাণিক বংশীবাদকের কাছে পৌঁছতে চেয়েছিল।

মেয়েটি ঘাসফড়িং হতে চেয়েছিল
মেয়েটি প্রজাপতি হতে চেয়েছিল
মেয়েটি জোনাক হতে চেয়েছিল
মেয়েটি সুরেলা পাখি হতে চেয়েছিল
কোনো এক সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায়
মেয়েটি আপন নীড় বাঁধতে চেয়েছিল
মেয়েটি মিহিনচিক্কন বৃষ্টি হতে চেয়েছিল
মেয়েটি শিশির বিন্দু হতে চেয়েছিল
মেয়েটি শরতের রুদ্দুর হতে চেয়েছিল
মেয়েটি পানকৌড়ি হতে চেয়েছিল
মেয়েটি বনহংসী হতে চেয়েছিল
মেয়েটি চেয়েছিল জলজ জীবন

মেয়েটি অবশেষে ঘুঙুর হয়েছে দেবতার পায়ে।
…………………………………………..

অতৃপ্তি

আবারও যেতে চাই বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ গুঞ্জন শুনে শুনে
ছৈয়ার ভেতরে হাতপাখার বাতাস করে করে
নৌকার গুলোইয়ে কাতহয়ে টুপকরে ভেট কিংবা
শাপলা ছিঁড়তে পারার আনন্দে ভাসতে চাই
বিনিময়ে গেছোমেয়ের উপাধি জুটুক, আপত্তি নেই
বনেলা মেয়ে বলে মায়ের শত অভিযোগের দিনগুলিতে ফিরে যেতে চাই
লাল ফুলছাপা ফ্রক পরে গঙ্গাফড়িঙের পেছনে ছুটে চলা কিংবা
দু ‘বেনী দুলিয়ে কাদাজল ভেঙে পানাফুল,শালুক, শিঙড়াই তুলে আনার— দিনগুলিতে যদি ফেরা যেতো
যদি সময়কে সাঁৎলে আবারও প্রথম থেকে শুরু করা যেতো

তবে নিশ্চিত আমি প্রজাপতিই হতাম
জলভেঙ্গে ভেসে ওঠা ঘাসের ডগায়!
…………………………………………..

মার্বেলফুল

তোমার উনুনের আগুন উস্কে দিয়েছে
বুঝতে পারোনি
তুমি তো আগুন নেভাতে দিগ্বিদিগ ছুটছো
ওদিকে হাততালি দিয়ে মজা লুটছে কেউ

একটু সজাগ থাকলে কি হতো
আঁচলটা বিছানো থাকুক
কারও ইচ্ছে হলে শুইবে
না শুলে আপত্তি নেই
গুটিয়ে নেবার কি দরকার
হাতের তালু উম্মুক্ত রাখাই ভালো
জোছনা আর শিশিরের ছোঁয়ায় ফুটবে
একদিন মার্বেল ফুল

কেন অকারণ হকচকানি অকারণ হুলস্থুল
…………………………………………..

খাপছাড়া

সবখানেই বেখাপ্পা হয়ে যাই
চারপাশে জোনাকের বদলে
আগুনের ফুলকি উড়ে ঝরে
বন্ধুত্ব টেকসই হয়নি কোনকালে

তোমার কন্ঠে বিষ
তোমার ওষ্ঠে বিষ
সবখানে বিষ অহর্নিশ

চুপ যাও চুপ যাও বলেই চিল্লায় সন্নাসী সুজন
কে শুনে কার কথা সুনসান নিরবতা ভেঙে
উড়াল দেয় পানকৌড়ির দল ;পালক খসে পড়ে
একটি দুটি তিনটি অগনিত
ইঁদুরের কর্মববিরতি নেই,কথার সৌকর্যে কে হারায় খেই?
…………………………………………..

উপলদ্ধি

আমি যখন নানাবর্ণের মেঘেরখেলা দেখেতাম সকৌতুহলে
তোমরা তখন আমার পতনের সোপান রচনা করেছো সদলবলে
প্রতি প্রহরে, প্রতি পলে আমি তোমাদেরই করেছিলাম সাড়
অতঃপর তোমরা বিষবাণ ছোঁড়ে কলিজাটা করেছো এপার ওপার
কি করে বল তোমাদের ভুলি?
তোমাদের জন্যই সোনালী প্রহরটুকু দিয়েছি জলান্জলী
সেই তোমরা যখন খড়গহস্ত হলে আমারই ওপর
ছেড়ে এলাম সব দলিত পায়ে থু থু ছোঁড়ে নিরন্তর

আজ আমারই পিঠের পরে গজিয়েছে রঙিন ডানা
তারাদের সাথে সখ্য গড়েছি মেঘেররাজ্যে দেই হানা
তটিনীর চিবুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে আমি পদচিহ্ন এঁকে চলি
সাগরিকার তালে দুলতে দুলতে না বলা কথা বলি
গাংচিলেদের ভিড়ে আমিও আজ লুকোচুরি খেলি
মৎস্যকন্যার সাথে ঘুরে বেড়াই যাদুর পাখনা মেলি

আজ আমি আমারই মত
চোখের সামনে খোলা রয়েছে অজস্র পথ

ভাঙন মানেই নিঃশেষ তো নয়,ভাঙনেই শুরু
এ সত্যটা হয়তো জানেনা যারাই নাটের গুরু
ভাঙন থেকেই নতুনের সৃষ্টি একধাপ এগিয়ে যাওয়া
ভাঙন থেকেই খোলসহীন আমিত্বকে যায় পাওয়া।
…………………………………………..

জোছনাপায়ী

চাঁদের গায়ে মেঘ ছুঁয়ে যায় মেঘের গায়ে চাঁদ
হাত বাড়িয়ে ছুঁতে তাকে মনে জাগে বড়ই সাধ,
ব্যালকনিতে জোছনা লুটায় কচি পাতার ফাঁকে
এরই মাঝে আলোক মাণিক উড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে।

আপন মনে ভাঁজ খুলেছে শেষ শরতের রাতে
জোছনাপায়ী নামটি নিলাম জোছনা মেখে হাতে,
জোছনা গড়ায় বিছানা জুড়ে জোছনা ফোঁটে মেঝে
খোঁপার ভাঁজে জোছনার ফুল চাঁদ দিয়েছে গুঁজে।

বন্ধু আমার চাঁদ, জোনাকি আরো রাতের তারা
তোমাদের পেয়ে এই আমিটা আনন্দে দিশেহারা।
…………………………………………..

শিকড়

আমিও অন্যসব মানুষের মতো শিকড় খুঁজে ফিরি
কোথায় রয়েছে লুকায়ে সেই প্রাচীন ঠিকানা?
কোন সে কান্তারে, পারাবারে, কোন মরুগিরিতে,
পিতামহ, প্রপিতা, প্রপিতামহের ভিটেমাটি আমি—
তারই লাগিয়া দূর হতে দূরান্তরে করি হাঁটাহাঁটি
যে নদী গিলেছে আমার সমূল,পিতামহের শৈশব সুগন্ধ
সেই নদীর নাভীমূলে আমি অবগাহন করতে চাই
সেই নদীর কাদাজল ছুঁয়ে তাদের সুগন্ধ মাখতে চাই
সেই নদী কি রেখেছে আজও অক্ষত তা—
সেই নদী কি অনুধাবন করে বিক্ষত আত্মার চিখ চিৎকার
না হয়তো! তবুও আমি শিকড়ের সন্ধানে ছুটবোই
রাক্ষুসীনি নদীর গহীনে আমার আপনারে খুঁজবোই।
…………………………………………..

নির্লিপ্ততা

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি
না কোথাও কোন সাড়াশব্দ নাই
কোন অথৈ নিতলে গড়েছো আবাস
কোন দূর দিগন্তে বল খুঁজে পাই!
এত খোঁজাখুঁজি, পুজাপুঁজি আমার ধাতে নেই
তবুও কেন এই লুকোচুরি খেলা
সময়টা একটু এলোমেলো,
অবেলায় ভাসিয়েছি ভেলা
হয়তো পৌছাবো তীরে,
নয়তো হারাবো হারানোর ভীড়ে
এই চিত্ত ঠুটবেনা একদম তাতে
বহুকাল কেটে গেছে ঘাতে প্রতিঘাতে
পাওয়া না পাওয়ায় আর নেই দুখশোক
আমি অনেক কিছু হারিয়ে আসা লোক।