হরবোলা

গভীর অন্ধকারের যখন সবেমাত্র ভেঙেছে ঘুম
বেত বাঁশবনের, ঝাউ-শিয়াকুলের গাছের পাশ দিয়ে পেঁচা আর বুনো শূকরের দৌড়াদৌড়ি

আকাশের কোলে সদ্যজাত রবি কোলে চড়েনি তখনো
হালকা হিমেল বাতাস হাঁটুর নিচে অনবরত দিচ্ছে ছ্যাকা
চাঁদ মামার কর্তব্য শেষ
সে এখন রওনা দিচ্ছে পশ্চিম আকাশে
একটা লাল আভা চারিদিকে
ঘুমন্ত শিশু,আকাশের পাখিরা সবেমাত্র ধরেছে গান
আমার তখনো পথ বাকি অনেক
যাব যমুনা তীরে…
সেখানে একবার দেখব খুঁজে
সেই হারানো মোহনবাঁশি যদি পাই ফিরে
তারই ওপর মুখ রেখে
যে সুরটা উঠাব বুক ভ’রে
যদি আসে, আসে আমার ঘুমন্ত হরবোলা
সে আগে যেমন শুনে যেত শিস্ তেমনই।
……………………………………………

এত দেরি কেন?

সেই এলে, এত দেরি কেন?
তোমার জন্য বসে আছে ভোরের তারা, রাতের জোনাকি
চঞ্চল মাঘের চাঁদ।

তুমি প্রতিক্ষণে সে কথা,যে স্বপ্নের মোহে ভুলাতে চাও জগৎটাকে,সে ক্লান্ত।

অনন্ত সেই নীল ঢেউ এ
নীল পদ্মের মত পা দুটি ভিজিয়ে নেবে কি একবার?

মায়া -মমতা সব কিছু ভুলে
তুমি চলে গেলে চুপিচুপি
সেই এলে, কিন্তু এত দেরি কেন?
……………………………………………

আগুন ঘিরে ঘিরে বসি

শীত এসে গেছে ,আমরা চাদর জড়িয়ে নেব
চাদরের ভিতর গরম বাতাসই আমাদের সম্পদ
হাঁটুমুড়ে বসে থাকব
ঠকঠক করে দুই হাঁটুর শব্দ উঠবে…
যত শীত বাড়ে তত শব্দ বাড়ে
আগুন ঘিরেঘিরে বসি
খড়ের আঁটির বাঁধন খুলে আগুনের ঘর সাজাই
আগুনই কম্বল আমাদের…
……………………………………………

আমাদের বাড়ি নেই

আমাদের বাড়ি নেই
তাও সাঁঝের চাঁদ আমাদের বারান্দায়
ইচ্ছে মত হেঁটে যায় ইঁদুর,ছুঁচো ,কত কি…
ফুটো চালে গড়িয়ে পড়ে জল…

ঝড়ের সময় আমরা চালের টিন ধরে থাকি উড়ে যাবে বলে
খিদে এসে খেলা করে ভাতের থালায়
এভাবে কি সংসার চলে?

সম্পত্তি বলতে এক তাড়ি খড়, ঘটিবাটি
একটি ছেঁড়া মাদুর, একটি কাঠের পিঁড়ি
এভাবে কি সংসার হয়?

জ্যোৎস্নার আলো এসে ঘর উজ্জ্বল করে
বাতার পাঁজরের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় চাঁদ
আমরা কত সুখি; ঘরে ব’সে মহাকাশ দেখি
……………………………………………

ক্ষুধার্ত হৃৎপিণ্ড

রাত্রের যখন গভীর ঘুম
স্বপ্নেরা তখন কানে এসে বলে কথা
চারিপাশে গভীর অন্ধকার
আলো খুঁজছে সকলে
যদিও দিনের আলোয় সবাই আলোকিত।

মনের ভিতর রয়েছে গভীর অমানিশা
ওই মানুষগুলোর!
ওদের শরীরে রয়েছে ক্ষুধার্ত হৃৎপিণ্ড
ফুসফুসে বায়ু নেই
নরম হৃদয় নেই
অনুর্বর উষ্ণ পাথরের পদাঘাত।
ওদের বুকে সবুজের অভিযান নেই
নেই সহযোগিতার
এক কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড বুকে নিয়ে ঘুরছে অনবরত…
……………………………………………

হৃদয় পুড়ছে বাতিহীন ঘরে

এগিয়ে আসে মেঘ
একটি নির্জন ঠিকানায়
ভেসে যায় কথা
দু’চার ফোঁটা চোখের জল

হৃদয় পুড়ছে বাতিহীন ঘরে
মাকড়সার জালে শিশির
শিশিরে কি আগুন নিভে?

কথা কও নাগরিক
ক্লান্ত পা,
নির্ঘুম রাত্রি
হোঁচট খাই
স্বপ্নে সূর্য ডুবে যায়
ভেসে ওঠে মায়ামুখ

চোখ টলটল করছে
বুকের ভিতর মন খারাপের পৃথিবী…
……………………………………………

নির্বাসন

তোমার মনে এত বিষ জানা ছিল না
এভাবে কেউ কি ভুলে যায়!
এখানে পাথরবৃষ্টি হচ্ছে, ভেঙে যাচ্ছে ভালবাসার পাটাতন
এভাবে কি প্রেম হয়?
চলেই যদি যাবে একটা দরখাস্ত দিতে পারতে…

বাড়ি ছেড়ে অন্যবাড়ি এও এক নির্বাসন
হৃদয় কতটা পাথর হয়ে গেলে আর কান্না আসে না?
তুমিই বলো…
……………………………………………

পা ভিজে যাচ্ছে

ভোরের অন্ধকারে শিশির পতনের শব্দ অনেক নির্জনতা ভাঙে
হেঁটে চলে গেছি কাঁদরের পাড়ে, বাঁশবনে
ধানের গাছের প’রে মাকড়সার সিক্ত জাল
পা ভিজে যাচ্ছে
পোয়াতি মেয়েদের মত পাকা ধানের শীষ ঝুঁকে পড়ছে আলে
কেউ কেউ মাকড়সার জাল ছিঁড়ে চলে যাচ্ছি দূরের মাঠে
শুরু হবে ধানকাটা
কাস্তের শব্দ আর উঠবে কি?
মাঠের আলে পড়ে থাকা গামছা, একটা থলি, আর একটা বোতল রেখে
হেঁটে যাচ্ছি অন্য পথে,অন্য সভ্যতায়…
……………………………………………

সবাই চোখ রাঙায়

দেহের ভিতর সম্পদ গলে যাচ্ছে
বৃষ্টির ন্যায় ঝরে যাচ্ছে রক্ত
দু’চোখে জলের স্রোত
কষ্টগুলোর আকার নেই
মাটিতে মিশে যাচ্ছে ঘাম
কে আর আপন হবে বলো !
আমাদের চোখে চোখে অভিনয়

সবাই চোখ রাঙায়
কিভাবে তোমার মুখ দেখব?
মৃদু অক্ষররা চিৎকার করে ওঠে

রাস্তা ছেড়ে দাও মানুষ
ছাড়ো বলছি -রাস্তা ছাড়ো

হাত দিয়ে মুখ ঢেকে নিলাম
লজ্জায় পেতেছি সংসার..
দু’চার কথায় যদি বিষ মনে করো
তাহলে সূর্য ভেঙে পড়ুক
চাঁদ ঘেমে যাক
আমরা হাততালি দি
……………………………………………

আমরা ছুটছি এ কোন সাহারায়

ছিপের ডগায় ফড়িং এর আসা-যাওয়া
চড়ুই এর ঘরবাড়ি কোথায় সে সব?
পৃথিবী আজ রহস্যময়ী।
গরুর পালে আর উড়ে না ধুলো
নদী আছে মাঝি নেই
শিকার আছে চিল নেই
প্রজাপতির উড়াউড়ি
মৌমাছির ব্যস্ততা …কোথায় সে সব?

বিধাতার কাছে চেয়েছিল কি অবসর?
চারিদিক স্তব্ধ, শান্ত
ঢেঁকিতে ওঠে না পাড়
গোয়ালে উড়েনাকো ধোঁয়া
শিশুর কান্না থেমে গেছে কবে!
সব পাখি আর সন্ধ্যায় ফিরেনাকো ঘর
বন্ধ কাকলি কলরব
আমরা ছুটছি এ কোন সাহারায়…