ব্যক্তিসামর্থ ছোট। তবে উচ্ছ্বাস বা আবেগ বড়। ধরেন হিমালয়ের সমান। দুর্যোগ-দুর্ভোগ মোকাবেলায় আমরা সরকারের ভরসায় বসে থাকি না। টাকার কুমির যারা তাদের দিকেও না। ব্যাংক-বীমা-গ্রুপ কোম্পানীর মালিক তাদের দিকেও না। আন্তর্জাতিকি দাতা সংস্থার অর্থ কড়ি, সাহায্যপত্র আসে বাজপাখি বা রাজহাঁসের পেটে-পিঠে সওয়ার হয়ে। সেগুলো আনতে পায়রার ঠোঁটে পত্র পাঠাতে হয়। মি্টিং হয়, কমিটি হয়। সভা-সেমিনার হয়। উপরের পানির ঢল গড়াতে গড়াতে নিচে আসতে শেষ! ওই পাইপের নানারকম ছিন্দ্র দিয়ে পানি ঝরতে ঝরতে নিচে গিয়ে আর থাকে না! মহাত্মা আবুল মনসুর আহমদ এর ফুডকনফারেন্স পড়লে বিষয়টা আরো সহজ হবে।

আমাদের দয়ালু মন গরিবের কথা ভাবতে ভাবতে অস্থির। সরকারকে গালমন্দ করতে করতে জীবন শেষ । বালিশকাণ্ড, পর্দাকাণ্ড, পিঁয়াজকাণ্ড চোখের সামনে ভেসে ওঠে। শেয়ার বাজার, পণ্যবাজার কে গিলে ফেললো— এসব নিয়ে তো ড্রইংরুম থেকে মোড়ের চায়ের দোকান বাদ যায় না।

ব্যাংক মালিকরা কয়দিন পরপর বিশাল বিশাল চেক অনুদান হিসেবে প্রধান মন্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দেন। সারিবন্ধভাবে এমডিগণ যান তার সাথে; আনতে না- দিতে। শয়ে শয়ে কোটি! সেই টাকার খরচ-পাতি নিশ্চয়ই জাতির কল্যাণে ব্যয় হয়। তাদের সামর্থ বড়। আমরা যারা দিন আনি দিন খাই তারা ওই জাহাজের খবর নিয়া লাভ কী? আমরা তো কোষা নাওয়ের যাত্রী।

ঠিক তাই। এই কোষা নাওয়ের যাত্রীরা দু-চার আনা খরচ করি। সংসার খরচও করি, দান-খয়রাতও করি। তাদের দান বা ত্রাণ আনতে গিয়ে কেউ পদপিষ্ট হয় না। এরা সবাই ব্যক্তিপর্যায়ের। ছোট সামর্থের অধিকারী। তারা ব্যানার ধরে না। ডকুমেন্টারি বানায় না। প্রেস লাগে না। এনজিওদের ডকুমেন্টারি লাগে, নইলে দাতারা খুশি হয় না। সরকারের নানা কিসিমের মিটিং, নোট কত কী লাগে।

করোনায় মানুষের ক্ষতি যা হবে, গরিব মানুষের ক্ষুধাকষ্টে ভোগান্তি হবে তার চেয়ে বেশি। শহরের বস্তিতে যারা থাকে তাদের কষ্ট হবে সীমাহীন। কড়াইল বস্তি নিয়ে প্রতিবেদন দেখলাম। তাদের যাতায়াত কিন্তু ঢাকার সবচেয়ে ধনী এলাকায়। গুলশান, বনানি। ওখানকার গৃহকর্মের যোগানদাতা। তারা বিশুদ্ধ পানি তো দূরের কথা ওয়াসার পানিও পায় না ঠিক মতো। একরুমে গাদাগাদি করে বসবাস। অন্য বস্তিগুলোর অবস্থা এমনই। করোনার ভয়ে অনেকেই অর্ধেক বেতনে আসতে মানা করে দিয়েছে গৃহকর্মীদের। কেউ কেউ মাসের বেতন পুরোটাই দিয়েছে। এই মহানুভব গৃহকত্রীর সংখ্যা কম। নিজের ঘরে খাবার মজুদ করেছেন। তাদের কথা কিছু ভাবলেন না! আগুন লাগলে কিন্তু শহরও পোড়ে, দেবালয়ও পোড়ে। বস্তিতে যদি রোগ ছড়ায়, শহরও নিরাপদ থাকবে না।

বাঁচতে হলে সবাইকে নিয়েই বাঁচতে হবে। এইসব অসহায় দিনমজুরদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সরকারি সাহায্য, দাতা সংস্থার সাহায্য আসতে আসতে অনেক দেরী! এই সময় তাদের পাশে কে দাঁড়াবে? রাজনীতিবিদ? গ্রুপ কোম্পানির মালিক? ধনিক শ্রেণী? তারা আগে স্বার্থ দেখবে। এক পয়সা দান করলে যদি ১০০ পয়সা ফেরত পাওয়া যায় তবে তাতে বিনিয়োগ করবে। তার আগে না। তবে এদের মধ্যেও মহানুভব যারা আছেন তাদের কথা আলাদা।

একবার চিন্তা করুন, একমাস ঘরে থাকলে আপনার খরচ বাঁচে কতো। রেস্টুরেন্টে খাওয়া, ঘোরাঘুরি, বউ-বাচ্চার হাত খরচ এসব খরচ তো এখন নেই। তার সাথে যদি সামান্য একটু যোগ করি তবে অনেক মানুষ বেঁচে যাবে। আমাদের এই দরিদ্র মানুষগুলো মুখে মাস্ক পরা জানো না। হাতে সেনিটাইজার মাখতে জানে না। তারা রাস্তায় বসে খায়, রাস্তায় ঘুমায়, রাস্তার পাশে পায়খানা পেশাব করে। এই মানুষগুরো রোগের ভয় করে না; যতটা ভয় করে ক্ষুধাকে।

পাঁচকেজি চাউল, এককেজি ডাল, এককেজে পেঁয়াজ, দুইকেজি আলু, একটু তেল-সাবান কি আমরা তাদের হাতে দিতে পারি না। খুব বেশি কি খরচ পড়বে? জনপ্রতি পাঁচশ টাকা কি আমরা খরচ করেতে পারি না? এই সামান্য খাদ্য এই গরিব মানুষগুলোর এক সপ্তাহের দুচিন্তা তো দূর করতে পারবে। আপনি সামর্থ অনুযায়ী সংখ্যাটি বাড়িয়ে কমিয়ে নিতে পারেন। ২৫০০ টাকা খরচ করলে পাঁচটি পরিবারের হাতে দিতে পারবেন। ১০টি পরিবারকে দিতে খরচ পড়বে পাঁচ হাজার । গেটের দোরোয়ান, বাসার গৃহকর্মী, রাস্তার পাশে থাকা অসহায় নাইটগার্ড, বস্তিতে বসবাসরত অসহায় মানুষ, পথের ভিক্ষুক, ফুটপাথে জুতা পলিশঅলা, রিকশাচালক, কিংবা এমন মানুষ যারা বিপদে ঘরে বন্দি হয়ে মরবে; কিন্তু কারো কাছে হাত পাতবে না। এমন আত্মীয় যে আপনার কাছে তার কষ্টের কথা বলবে না। আপনার পরিবারের অসহায় মানুষ যার ভিতরের অভাব বুঝা যায় না। তাদের পাশে কি আমরা দাঁড়াতে পারি না?

গতকাল ত্রিশটি মাস্ক কিনলাম অসহায় পথিকের মাঝে বিলি করার জন্য। কিছু বিলি করেছি এর মধ্যে। আজও করবো। আমার পাশে মুদি দোকানদার মিন্টুর কাছে জানতে চেয়েছি ৫ কেজি চাল, ৩ কেজি আলু, ১ কেজি মশুর ডাল, ১ কেজি পিঁয়াজ, ১ কেজি লবণ এর দাম কত পড়বে? মিন্টু হিসাব করে বললো ৩৬০ টাকা লাগেবে। আমি বললাম তুমি ৩৫০ টাকা করে নিও। সে স্বহাস্যে রাজি হলো। আমার মনের খবর হয়তো বুঝতে পেরেছে। তাকে বললাম তুমি ১০টি প্যাকেট বানিয়ে রাখো। পরে নিয়ো যাবো।

আমি ক্ষুদ্র মানুষ। এটুকু করার সামর্থ আছে। ১০টি পরিবারের হাতে যদি দিতে পারি, মনের প্রশান্তি খুঁজে পাবো। যার সামর্থ বেশি আছে তিনি আরো বেশি দিবেন। আল্লাহর হয়তো তার রহমতের দুয়ার খুলে দিবেন আমাদের জন্য। একবার ভাবছিলাম এটা লেখা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না! পরে ভাবলাম, আমার এইটুকু শুনে যদি ১০জনও এগিয়ে আসে, তবে ১০টি পরিবারের উপকার হবে। তাই মন বললো, লেখো।

নিজের সাথে কিছু মাস্ক রাখুন, সেনিটাইজার রাখুন। চলার সময় যদি চোখে পড়ে পথিক তার দিকে বাড়িয়ে দিন। অন্তরের দোয়া আর হৃদয়ের ভালোবাসা অর্থ দিয়ে, সম্পদ দিয়ে অর্জন করা যায় না। হৃদয় দিয়েেই হৃদয়ে জায়গা করা যায়। প্রভুর দয়া লাভ করা যায়।

২৫ মার্চ ২০২০