নিখিল

যে ছেলেটি শিস দিতে দিতে রাস্তা পার হলো, তার হাতে কোন লাটাই নেই,
প্রদীপ জ্বেলে রেখে মৃত্যু নিয়ে রাস্তায় বের হল। ছেলেটির নাম নিখিল। অদৃশ্য ছায়া পথ ধরে সাঁকোতে নেমে গেল। উঠে এলো শুদ্ধ করে নিজেকে, গায়ের ধূপ গন্ধ,ধূনো গন্ধে—
তুলসী পাতার মতো মিটিমিটি হাসছে কেবল,
হাতের লেখা ভালো লাগত বলে লাল কলম দিয়ে লাউডগা উঠিয়ে দেয় প্রখর রোদের দিকে—
ঝিলের পাশে নিখিল ঘুড়ি উড়াচ্ছে নিজের ছেলের সাথে,
বন্যার জল হাতে নিয়ে তুলসী চারা পুঁতছে ক্রমিক মৃত্যু প্রহরীর মতো—
…………………………………………..

জাগাতি তলা

জাগাতি তলার সবকটি পার্লারে বটের ঝুরি নেমে এসেছে, সাইনবোর্ডে লাল ডুরি বেঁধে পড়াতে যাচ্ছে একান্ত অভিমানী। অভিমানী রাস্তা ধরে দৌড়াতে থাকে শিউলিপুর থেকে গুড় গ্রাম—
নীলচে জামায় খেয়ায় বসে আছে লাটাই হাতে অনন্তের নিখিল,
পড়াশোনার হোস্টেলে নিজের লাগানো চারা গাছ,
রোদ্দুর ভেঙ্গে ভেঙ্গে বারান্দা বাড়িয়ে ব্যালকনি ঢালাই করছে রাজমিস্ত্রি , মাথার রক্তচাপের স্নায়ু ছিঁড়ে ছিঁড়ে আমাকে নাঙল কাটা পারা পার করে দিয়েছিল একদিন—
জয়ন্ত হাঁফছেড়ে টেলিফোন বুথ বন্ধ করে দেখছে নাভি বিন্দুর দহন,
সন্ন্যাসী পুড়লে চন্দনের নৈঃশব্দ মায়া বেড়ে যায় ক্রমশ—
…………………………………………..

নদীচর

সজল ধারা বেয়ে যীশু জামাল মুখে ব্রণ ফুটিয়েছে, পালানো বাবার ছায়ার পথে হাত বুলিয়ে চলে কৃষ্ণ নামের থলি। জলীগোপিনাথপুরে বাঁশ তলায় বসে বিড়ি খায় যারা, সকলেই ভুক্তভোগী— একটি বিকলাঙ্গ পুরুষ বিড়ি বেঁধে চলে দিনরাত, অন্ধকার নামলেই পায়ে বাবলা কাটা ফুটিয়ে দিয়ে চলে নদীর চরে, আলো জ্বালায় নতমুখে, ভিজে সপসপে শরীর, কেউটে সাপের খোলস ছেড়ে আসে নোনাচরে,
জুতো পায়ে নারান বল হরি ঠাকুরের মাথায় জল দেয় তিনবার ।
…………………………………………..

মা

প্রতিটি মঙ্গলবারে হাই প্রেসার রোগ ধরা পড়ে আমার, অর্জুনতলা নার্সারী স্কুলে রাস্তা ভেঙ্গে গেলে, নীলাভ জামার হিরো সাইকেল ঘুরে দাঁড়ায়, বৃষ্টির মধ্যে। সবজির ভিতরে করোনা খুঁজছে আজকাল। বাজ পড়ে গভীর রাতে। বাবা দাঁড়ায় যীশু ঠাকুরের মত। দৃষ্টি ভ্রমে দাঁড়াই খাদের কিনারায়, মুখোমুখি মা স্তন পানের জন্য ডাকছে আমায়। বায়বীয় স্বর। নৈঃশব্দ নিয়ে জল ভাঙতে ভাঙতে নদী একটি নিশাচর হয়ে যায়। তাই, অর্জুন তলায় কোনো নদী নেই, গাছ নেই, পাতা নেই, কোন অর্জুন নামের ও পুরুষ নেই।
…………………………………………..

পিরাসিটাম

একবার রাতের অসুখ করেছিল আমার কুলভি ডাক্তার কতকগুলি গ্লবিউল দানায় ফেলেছিল মহৌষধ।
গিয়েছিলাম পরম বিশ্বাসে। অদ্ভুতভাবে সূর্য উঠলে ভয় চেপে বসত বুকের ওপর। স্পন্দনের তীব্রতায় সকলেই পড়ে ফেলত অস্বাভাবিক মনস্তত্ব।
ভয় কাটেনি তবু। অসুখ ছড়িয়ে একেবারে চাঁদের 8 ইঞ্চি দূরত্বে। ঘুম হয়নি রাতে। উপুড় কাঠের মতো শুকনো হয়ে যাই, ফুরিয়ে আসে শরীরের রক্ত। কুঠার দিয়ে জ্বালানি সপ্তাহ জুড়ে, দুর্বল হয়নি, বাজার থেকে ফেরত মুখী জীবনদায়ী ওষুধ, পলিব্যাগ,অ্যামলোডিপিন। পিরাসিটাম ব্রেনের শিরার ওষুধ।
…………………………………………..

ব্লাডসেল

পিচ রাস্তা ধারে অনেকগুলো ব্লাড সেল এর মত,
বাসট্যান্ড জেগে থাকে রাতে হরিকথা উড়ে আসে কাটা পুকুরে। শীতলদার হনুমান মন্দিরে ছায়াময় জমায়েত।
প্রলয় শিখা। বরফদোকানীর দুই হাতে গিরিখাত। অসুখের চিপস রোদকে উপুড় বুক নিয়ে অন্ধকার ঘরে ঢুকে গেল, কোকিল ডাকলে অন্যের অসুখ নিজের অসুখে ঢুকে যায়। শরীরের আরো ভিতরে। শরীর জুড়িয়ে যায় মৃত্যুর হিমস্রোতে। টোটো চালিয়ে দিনরাত পাগলামি করতো, মুঠোফোনে গদ্য লিখে অনেকবার রামধনু হতে চেয়েছিল। বরফ শুধু গরমে বিকোয়, টোটো চলে দিনরাত। পিছনে লেখা অসুখের লাল নেল পালিশ। ফোন নাম্বার। গলে যাচ্ছে বরফ দোকানী। পেটের লম্বা কাটা দাগের পিচ রাস্তা ধরে ক্রমশ বাড়িমুখো আত্মীয়রা। আগুনে পুড়ে যাচ্ছে ছড়িয়ে থাকা জামা-জুতো, ওষুধের বাক্স,
উত্তরসূরি নেই বলে কলমীলতা পুড়ে ছিল একসাথে, থেকেছিল অন্তিম দিনে। শাঁখের শব্দে অশৌচ ভেঙ্গে গেলে, টোটো চলে দিনরাত।
…………………………………………..

তরুণের মা

তরুণের মা তিন বছর হল মারা গেছে তাপস দা রুইনান মোড়ে হার্ডওয়্যারে বাঁশি বাজিয়ে একা একা রং মাখে। যে শিশুর গণিতে কোনদিন ভাগশেষ থাকে নি তার অসম্ভব রোদকে নিয়ে জবা ফুল কুড়োয়, উঠোনে ঝাট দেয়, হরিমন্দির ধুইতে থাকে। ভোররাতেই অসুখ নেমে আসে শরীরে। বড় বড় চাঁদকে নিয়ে মায়া বাড়িয়ে চলে গেছে পোস্টমর্টেমে।
খাটের তলায় জমতে থাকে ধূলো, বারুদভর্তি পেন্সিল ডগায় ট্রাপিজিয়াম আঁকে।
চাকরি না পাওয়া ছেলেটা মুখে ব্রন ফুটিয়ে, জল ঢালা ভাতে রাতের খাবার নামিয়ে আনে ভরসন্ধ্যায়। গভীর রাতেও হাসপাতাল থেকে ঘুরে এসে মাটি কুপায়, শাকতলা ফেলে- ঘাম ঝরে অঝোরে- তরুণ ঘুমিয়ে পড়ে- ভোররাতের দিকে- ডাক্তার, এ্যালজোলাম একটি ঘোরের মতো।
…………………………………………..

নীলমণি

নীলমনি আচার্য পুড়ে যাচ্ছে শুকনো পাতার মতো,
উঠোনের সবুজ মখমলের দূর্বা ঘাস মাড়িয়ে যাচ্ছে-
রাতের চাঁদ। আড়াই’টার রাতে বন্ধুর কোল ছেড়ে শ্বাসবায়ু গ্ৰাস করছেঃশরীরঃ

চিতার উপর পুড়ছে নিম ডালের পরকীয়া। বিনিদ্রার শ্বাস টানে- কৃত্রিম ইনহেলেশান। এলোমেলো অক্ষর সাজিয়ে দেওয়া যার কাজ তার চোখে চুম্বন এঁকে দেয় তুলসী পাতা।

লাল ধুতির পুরোহিত পোশাকে ছেড়ে যাচ্ছে মহাপৃথিবী দ্বার-
আগত বায়ুর তৃষ্ণা ঝড়ে নীলমণি স্বর্গত,
কপালের সিঁদুরের নীল বন্ধু বেড়ে উঠছে, রোদের মতো, আমাদের সাধ্য নেই ছোঁয়ার- মুনির প্রহরে
আমাদের কেবল মঙ্গল এগিয়ে যায়-
-নীলের ভিতর
…………………………………………..

আমার তারক

প্ল্যাটফর্মের আলো আর মাঠের লাবণ্য মেখে
টিমটিমে আলো ঘরে শুয়ে আছে আমার তারক। আর্দ্রতা শুষে নিচ্ছে সন্ধ্যের নিভু প্রদীপের বৈরাগ্য, সাঁঝ আকাশে তারার সাথে বাউলি বৈরাগীর লাউ ডুঙ্গি।
তুলসী পাতা আকাশ নিয়ে নাচতে নাচতে শুয়ে পড়েছে পুকুরপাড়ে,
বাতাসে উড়ছে ধূসর গোধূলির ছেঁড়া আলখাল্লা, গায়ে চন্দন গন্ধ, ধুপ বাতি দুহাতে খুঁজছি তারক মাঝিকে,
এখন যাকে খুব দরকার
মাঠের পর আলোক বিন্দুর দূরত্ব বাড়ছে সরসর করে—
…………………………………………..

অর্জুনতলা

প্রতিটি অর্জুনতলা ব্রহ্মপুত্র পুরুষের মতো ভূষিমাল দোকানে অবৈধ চারাগাছের মতো জ্বলতে থাকে নারী যোগ। মশলাপাতি দ্রব্য বাকির খাতায় টুকরো চাঁদ ভেঙে ভেঙে ভিজিয়ে যায় জলছোপ আঁধার। প্রতিটি পুরুষ গাছে মেঘ জমে আছে, পশ্চিম আকাশে বাঁশি বাজিয়ে ছুটি ঘোষণা করে কালবৈশাখী। নার্সারি স্কুলের দিদিমণি মাটির উর্বরতা খোঁজে বাৎসরিক অনুষ্ঠানে।
শাড়ির আঁচল আটকে যাচ্ছে অসুখের গোল কাঁটায়।
প্রতিটি আঙুল জখম করেছে পুরুষ। লেডিজ সাইকেলে ফিরে যাচ্ছে ঘরে নিজের আকাশেই কেবল ভিজবে বলে।।