পথবাসী

রাস্তার খানাখন্দে যে জল জমে
পথবাসীর চোখের জল
তাদের কপোলের ঘাম
বারিধারা ঝরার পর রাস্তায় জমে গৃহহারাদের চোখের টলমল জল
একটু ছুয়ে দিতেই ঝরে পড়বে
মোতির মত জলের ধারা চোখের পাশে গালের ধারে চিকচিক করে
যেমন বালুর পরে ওরা থাকে তেমন ওদের চোখ চিকমিক করে
পার্কের বেঞ্চিতে বা এক কোনায় সংসার
রোদে পোড়ে জলে ভেজে ওরা কারা
গেটের পাশে উনুন ধরায় রান্না করে খায় বাস্তুহারা
রাস্তার ক্যাচক্যাচে কলে জল ভরতে আসে ওরা
কুকুরের পাশে ওরাও শুয়ে পরে ছালা গায়ে দিয়ে
শীতে কাপে ঠকঠক
রাতের বেলা কাপে আগুন ধরায় লাকড়িতে
ওরা ফুটপাতবাসী ওরা বাস্তুহারা
গরমে ঘোরে না পাখা শীতে নেই কম্বল
ওদের চোখের জল রুপোর মত চকচকে
দেখে না কেউ নেই কোনও সম্বল…
…………………………………………..

সময়ের চিত্র

এ এক ভয়ংকর অদ্ভুত সময়
ভাই ভাইকে মারছে
মানুষ মানুষ মারে নানা ঢঙ্গে
উল্লাসে মাতে
আমরা আর এক নেই কেউ ভেঙ্গে যাচ্ছি কেবলই
কেউ কারো আপন এ যেন দোজখপুরী
সব রঙ্গিন সময় রক্তে লাল শোকে কালো
এ কালো কাককেও হার মানাচ্ছে
আমরা কিভাবে শোকে অভ্যস্ত হই তার মহড়া চলছে
এ এক ভীষণ অদ্ভুত সময় !
আমরা সবাই একে অপরের জন্যে হিংস্রতা লুকিয়ে রাখছি আস্তিনে
মুঠো খুলে বন্ধুত্বের হাত নয় ছুরি মেরে দিচ্ছি
এই দেখো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি মাছের মত

যখন মেরে চলে যাচ্ছ ভাবছি তুমি আমার বাবা ছিলে তো সত্যি !
ভাবছি তোমরা আমার সহপাঠী ভাই ছিলে
দেখো কেমন অবেলায় আমি ঘুমুচ্ছি
আর তোমরা সবাই মিলে আমাকে ঘুম পাড়িয়ে দিলে
আমার এখন সারাক্ষণই রাত
তোমাদের দিনগুলো দারুণ কাটছে নিশ্চয়ই
আমার পরিবার হয়তো যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে
এখানে এখন অন্ধকার শুধু
বইয়ের মলাটে আর চোখ রাখি না
জানিনা সুবিচার পেলাম কি না আমি
শুধু জানি এখন মানুষে মানুষে এত ভেদাভেদ যে মনুষ্যত্ব অনেক দূরে থাকে…
…………………………………………..

বড় হয়ে ওঠে কবিতা

বয়স বাড়ার সাথে সাথে মন পুরনো হতে থাকে
তাকে বলি অভিজ্ঞ হওয়া
আড়াল করে নেই বুড়িয়ে যাওয়া
বুড়ো মন লুকোতে চায় পুরনো হবার শোক
যে বয়সে মন নতুন ভাষা নতুন শিখতে বুড়ো হয়ে যাই
শিখে নেই রেওয়াজ করে গলা পাকানো
প্রথম প্রথম কাঁচা হাতে কাঁচা ভাষায় কবিতা
অভিজ্ঞতায় নিত্য নতুন পাকা ভাষায় গড়ে ওঠে কবিতা
কবিতায় তো কোনও প্রতিষ্ঠান নেই
সঙ্গীতের মত ঘরানা নেই তবু রেওয়াজে পেকে ওঠে কবিতা
কাঁচা বয়সের কবিতা পাকা বয়সের কবিতা
আমাদের অভিজ্ঞতার হাত ধরে এগিয়ে যায় কবিতা
আমাদের বয়স বাড়ে বড় হয়ে ওঠে কবিতা
কবিতার মন পুরনো হয় না কোনোদিন…
…………………………………………..

ওয়াটার বাস

হাতিরঝিলের ওয়াটার বাস
গুলশান থেকে বেগুনবাড়ি যাত্রা
ইটের ঘাট ঘাটের সিঁড়িতে বসে ঝালমুড়ি
বাস থামতেই জলের দুলুনি
সারা বাসে পানির শীতল হাওয়া
চারিধারে নানা প্রকার গাছ, গাছের ছায়া
রঙ চা খাওয়া, লাল নীল ফোয়ারা সন্ধ্যা নেমে এলে
মানুষ লাইন ধরে উঠে যায় আনন্দ যাত্রায়
এভাবে পারাপারে রাস্তার বাসের চেয়ে জলের বাসে আনন্দ বেশি
হাতিরঝিলের ঘোলা জল এর পাশে জমে আড্ডা দারুণ কম বয়স আর বেশি
কাঁচের দেয়াল ঘেরা রেস্তোরায়
আর ঘাটের পাশের বেঞ্চে বসে জলের হাওয়া
ওয়াটার বাস এর আসা যাওয়া…
…………………………………………..

সমাধি

তোমার আমার সমাধি তার পাশে দাঁড়িয়ে এক মস্ত তালগাছ
রোদে ছায়া দিচ্ছে
প্রখর তাপে পুড়ে যাওয়া মাটিকে ঠাণ্ডা রাখছে
চোখ বুজে শুয়ে আছি এই সকাল সন্ধ্যা দুপুর বেলায়
আমাদের ঘুমের কোনও নিয়ম নেই যখন তখন ঘুমাই
পাশাপাশি কবর কখনো ফিসফিস আলাপ করে নেই
গায়ের উপর ঘাস খেলা করে তার উপর রংবেরঙের প্রজাপতি
আকাশের নিচে শুয়ে থাকি তারা গুনি
এখন আর বৃষ্টি এলে কাঁদায় ঘেন্না করে না
বৃষ্টি ছুয়ে যায় আমাদের দেহের ঘর মাটি
এখন আমাদের অফুরন্ত সময়
রাত্তির বেলা আমরা কবরের ঘর ছেড়ে বের হই কবরস্থানে হাটি
এখানেও চুরি হয় কঙ্কালগুলো
কখনো পোকা মাকড়ে শুষে নেয় দেহের অস্থি মজ্জা
গোগ্রাসে আনন্দে গিলে নেয় সব
আমরা তবু শুয়ে থাকি মাস যায় বছর পেড়োয় আমরা তবু আর ঘুম থেকে জাগি না…
…………………………………………..

বৃষ্টিস্নাত সবুজ যৌবন

বৃষ্টিতে চারিদিকের যৌবন স্নাত হয়ে সবুজ হয়ে ওঠে
তখন আমি বাতিঘর দেখি সবুজ বাতিঘর
তার মাঝে আমি লেখার রসদ খুজে পাই
মেঘমালা মাথার উপর থরে থরে সাজানো
ভাঙ্গা আয়নায় ভাঙ্গা কার্নিশেও সাদা ভেড়ার পালের মত মেঘ সাজাই
নারকেল গাছের ফাকে ফাকে দাড়িয়ে থাক মেঘ সুন্দর পুরুষের মত
চারিদিকে যখন মহামারীর করাল থাবা গ্রাস করছে দেশ
তখনও ভেজা মেঘে স্বপ্ন পাঠাই
কবুতর এর মত মেঘগুলো ভিজে জড়সড়
নীল এর মাঝে সাদা পাহাড়
এত বন্যা এত বাদল তবু ভালো লাগে
বৃষ্টির সাথে কবিতাও পাই
কি বোর্ডে ঝর তুলে ফেলি মুহূর্তেই
কবুতরগুলি আকাশে জড় হতেই যেন লেখার রসদ সাজে
বাকবাকুম শুনতে পাই গুড়ুম গুড়ুম শব্দে যখন আকাশে বাজ পরে
চারিদিকে প্রেমে মাতোয়ারা কবুতর আকাশ প্রেমে মাতে সবুজ ঘাস আর গাছের সাথে ভিজিয়ে তুলতুলে হয়ে ওঠে বৃক্ষের পেলব শরীর
আনকোরা বধূর মত হয়ে ওঠে যৌবনা গাছের সারি…
…………………………………………..

বহুদিনের মত

তোমার শাড়ির আঁচলে পাথরের মত লেগে আছি
তোমার উনুনে লাকড়ির মত জ্বলে আছি
পূর্ণিমা চাঁদের মত তোমার হাসি
রুপালী নথ যেন বাঁকা চাঁদ হয়ে ঝুলে আছে তোমার নাকছাবি
তোমার হাসিতে শত মুক্তো ঝরে রুপালী ঝর্ণা রুপালী স্রোতস্বিনী
আমি তোমার ক্যাকটাসে মাটি হয়ে বসে আছি
তোমার কাজল কালো আখিতে সুরমা হয়ে সেজেছি
চোখের পিসির ওঠা নামা ময়ূরের পাখা মেলা
অবাক চোখে দেখেছি তোমার গৌড় হাতের লাল কাঁকন
গোলাপি আকাশের মত তোমার গোলাপি শাড়ি যখন মেলে দাও ছাঁদে
মনে হয় স্বপ্নের জীবন
শুধু আমি পুড়নো বোবা কাপড় হয়ে তোমার হ্যাঙ্গারে ঝুলে আছি বহুদিন…
…………………………………………..

মুখোশ

সমুদ্রতটে বসে কাঁচের গ্লাসে শুরা ঢেলে নিচ্ছ
গোগ্রাসে গিলছ স্কচ
দামী বোতলের পাশে তোমার দামী মুখোশ রোদে শুঁকোতে দিয়ে
সাদা শার্ট বুকের সমস্ত বোতাম খোলা সামনে আকাশী আর সফেদ সমুদ্র
দুপুর বেলার শেষ দিকে তপ্ত রোদে গায়ের সোনালী চামড়া পোড়াচ্ছ
সান বাথ যাকে বলে
পিছন দিকে তোমার কটেজ এর বারান্দা
বারান্দা যেন তোমাকেই দেখছে যেন তুমি কোনও সামুদ্রিক প্রাণী
বালুতে তোমার হাঁটু পর্যন্ত পড়া শর্টস
রঙিন না হলেও বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছুটি কাঁটাতে এসেছ
অথচ সমুদ্রে নামছ না
সমুদ্র পারের ঝাউগাছ বা নারকেল গাছের মত চুপচাপ বসে পান করছো বিদেশী মদ
এক পেগ থেমে থেমে দুই পেগ তিন পেগ
তোমার দামী মুখোশ আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে কিন্তু কেউ দেখছে না
এভাবে ভালো মানুষের মত আবার ফিরে যাচ্ছ মুখোশটা পড়ে
সূর্য যখন গোধূলি ছড়াল
হাতের দামী ঘড়িতে সময় দেখে উঠে গেলে স্কচ এর বোতল হাতে
মুখোশ পড়ে নিচ্ছ তুমি মুখোশ পড়ে যাচ্ছ…
…………………………………………..

শীতের শেষে

নতুন কুঁড়ি গজিয়ে ওঠে গাছের ডালে
গাছ ভরে যায় সবুজ আর লালে
কচি পাতার তাজা ঘ্রাণ
চনমন করে প্রাণ
তরতাজা হয় মন
দুপুরের মত রোদেলা হয়ে ওঠে নির্জীব শরীর
আজানের সুর ভেসে আসে কানে
হারানো সুর বেজে ওঠে গানে
শীত উড়ে যায় পাখির পালকে
বসন্ত আসে চারিদিকে
কৃষ্ণচূড়া লাল হয়ে যায়
সাঁজে কৃষ্ণকলির কেশে
বাসন্তী রঙ পড়ে রমণী সাজে
নতুন রঙের বাহার লাগে সবার প্রাণে
পিউ কাহা পিউ কাহা কোকিল বলে…
…………………………………………..

নান্দনিক বন

পাতা ছায়া ঘেরা বারান্দায় আমি চেয়ে রই উর্ধপানে
আকাশপানে মেঘমালা সাজিয়ে থরে থরে
নীল আকাশ চেয়ে রয় মায়াভরা চোখে মৃত্তিকার দিকে
সাদা মেঘের দিকে আমি আনমনে উদাস দৃষ্টিতে
মেঘ সরে আসে ক্রমে চাঁদ উঁকি দেয় গগনে
কানে বাজে রবীন্দ্রসংগীত আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে
সবুজ পাতা আর গোলাপি ফুলগুলো একে অপরের গায়ে গায়ে
প্রার্থনায় মগ্ন ওরা সমর্পণে নিবেদিত আত্মা ওদের
আমি স্পর্শ করি আলতো ছোঁয়ায় ওদের গায়ে
লতাগুলো আলিঙ্গন করে আমায় গা ছুয়ে যায় ফুলেরা
ইচ্ছেকরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়ি ফুলের আদরে
ক্রমাগত আঁধারের বুকে চাঁদ ঘুমায়
শুধু ফুলগুলো শিশির খেয়ে জেগে থাকে রাতভর
আর তারাগুলো মিটমিটিয়ে চাদের চাঁদনীর পাহারাদার
সেই জ্বলজ্বলে রাতে সৌন্দর্যের মোহনায় আমার ভেসে যেতে ইচ্ছে করে
ইচ্ছে করে হারিয়ে যাই নান্দনিক বনে…