পৃথিবীর ইতিহাসে নিসর্গ বা প্রকৃতির সর্বব্যাপী ভূমিকা সর্বজন স্বীকৃত এবং মানুষের ইতিবৃত্তে তার উপস্থিতি অপরিহার্য। অস্তিত্বের জন্য প্রকৃতির কাছে মানুষ আশ্রয়, অবলম্বন, উপকরণ যেমন আদায় করে নেয়; তেমনি সে নিসর্গে খুঁজে পায় নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, নন্দনবোধ, সৃষ্টির প্ররণা, সুর-ছন্দ, রঙ-রূপ-রেখা, লড়াইয়ের সাহস, অপরাজয়ের মনোভাব। তবে মানুষের প্রাথমিক যুগ সম্পূর্ণ অতিবাহিত হয়েছে প্রকৃতির কোলে অসহায় শিশুর মতো- যে শিশু ভয়ে, বিস্ময়ে, সংস্কারে, বিপদে, বিনাশে কেবল নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে; স্বনির্ভর হতে পারেনি। প্রকৃতি বুঝতে ও আবিষ্কার করতে সহস্র শতাব্দী পার হয়ে গেছে। তবুও মানুষ বেঁচে থাকার তাগিদে সংগ্রাম করেছে, প্রকৃতিপাঠ ও গতি-প্রকৃতি নির্ণয় করে বোঝার চেষ্টা করেছে বৈশিষ্ট্য ও প্রবণতাসমূহ। অনেক সময় সফলও হয়েছে নানা ক্ষেত্রে। চাষাবাদ পদ্ধতি উদ্ভাবন, পশু-পাখি-মাছ শিকার-পদ্ধতি আবিষ্কার, জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত জ্ঞান অর্জন, ঋতুভিত্তিক অভিজ্ঞান ইত্যাদি মানুষ শিখেছে ইতিহাসের স্তরে স্তরে, বাঁকফেরায়। ফলে সৃষ্টি হয়েছে লোকজ্ঞান- খনার বচন, লোকসাহিত্য, লোকশিল্প, লোকপ্রযুক্তি ইত্যাদি। এইসব কিছুর মূলে রয়েছে অনুসন্ধিৎসু ও ভাবুক মানুষের প্রকৃতিপাঠ, নিবিড় বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কৃষিভিত্তিক সভ্যতা তাই গড়ে উঠেছে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। যুগে যুগে তাই মাঠিলগ্ন মানুষ প্রকৃতিকেই তাদের জীবনের প্রধান ক্ষেত্রে ভেবেছে, জীবনের সবখানে প্রকৃতির পটভূমিকা ও উপাদান কাজ করেছে। শিল্প-সাহিত্যেও একইভাবে তার প্রাধান্য ও প্রাচূর্য বিরাজমান। মানুষের কাছে কখনো মনে হয়নি প্রকৃতি কোন সৌখিনতা, নান্দনিকতা বা ভ্রমণের জায়গা। লোকজীবনে নিসর্গ মানেই জীবনের মূলধারা, মৌলিক অবলম্বন ও আশ্রয়।

এই ধারণার ব্যত্যয় ঘটতে শুরু করেছে ইউরোপে জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় বিপ্লব ও শিল্পবিপ্লব সম্পন্ন হবার সঙ্গে সঙ্গে। নগর সংস্কৃতি ও সভ্যতা সৃষ্টির পরে তা আরও বাঁক নেয়। শিল্পবিপ্লব পরবর্তী জ্ঞান আবিষ্কারে প্রকৃতির ভেতর-বাহির অনেকটা খুলে খুলে যেতে থাকে বিজ্ঞানের চোখে। ফলে পূর্ববর্তী সমস্ত জ্ঞানসম্পদ অস্বীকার এবং তাকে অন্ধকারাচ্ছন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। মনে করা হয় মানুষ প্রকৃতিকে জয় করে ফেলেছে, ফলে যত্রতত্র অপব্যবহার করা হয় প্রকৃতিকে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে প্রাণবৈচিত্র্য বিনাশ ও প্রকৃতির ওপর অত্যাচার করা হয়। ফলে প্রকৃতির স্বভাবজ ধর্ম নষ্ট হতে ও জলবায়ু পরিবর্তন ঘটতে থাকে অহরহ। অন্যদিকে নগর সংস্কৃতিতে ভোগবাদী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে নাগরিক সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে প্রকৃতি থেকে। নাগরিক ক্লান্ত-শ্রান্ত মন তখন কল্পনা করে, খুঁজতে থাকে আরাম-আয়েশ-সৌন্দর্যের আশ্রয় বা ক্ষেত্র। সে রচনা করে নিসর্গ নিয়ে নান্দনিক পঙ্ক্তিমালা, ভাবতে শুরু করে দর্শনচর্চার জায়গা। এইসব চিন্তা-চেতনা-ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গি মূলত পশ্চিমা পৃথিবীতে বাস্তবায়নের পরে তৃতীয় বিশ্ব বা এশিয়া-আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় আরোপ করা হয় উপনিবেশ নামক গোলামী ব্যবস্থার মাধ্যমে।

বঙ্গদেশে তথা ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপন, বিকাশ ও ব্যাপ্তির পরে সমাজ, সংস্কৃতি, দর্শন ও সাহিত্য ক্ষেত্রে প্রকৃতি সম্পর্কিত ঐতিহ্যবাদী ধ্যান-ধারণা-জ্ঞান অপাঙ্তেয় হয়ে পড়ে। পশ্চিমের চোখে দেখা হতে থাকে নিসর্গকে, বিলেতের লেখকদের রোমান্টিক দৃষ্টিতে লিখিত হতে থাকে বাঙলা সাহিত্য। ফলে বাঙলাদেশের লেখক হয়েও অঙ্কন করেন ইউরোপের নিসর্গের মতো প্রাকৃতিক ভূগোল। বাঙলার প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য যৎসামান্য স্থান পায় সাহিত্যে, পেলেও তা শুধু সৌন্দর্যের উপাদান, উৎস ও পটভূমি হিসেবে। এ ক্ষেত্রে মধুসূদন, রবীন্দ্রনাথ ও তিরিশের লেখকবৃন্দ অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখেন। কাজী নজরুল ইসলাম বিচিত্র ভঙ্গিতে প্রকৃতি চিত্রণ করেন- কখনো রোমান্টিক, কখনো বাস্তব, কখনো উভয়ের মিশ্রণে। পরবর্তীকালে জসীমউদ্দীন ও আল মাহমুদ বাঙলার প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করেন।

নজরুল মূলত কবি ও সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব। কবিতায় ও গানে তিনি বাঙলার দ্রোহী ও প্রেমী দর্শনের শক্তিমান রূপকার, অনন্য সাধারণ প্রতিভা, উপনিবেশিকতার বাইরে নিজস্ব, স্বাধীন ও আত্মবলিষ্ঠ সত্তার অধিকারী হিসেবে চিরস্মরণীয়। এ ক্ষেত্রে তাঁর প্রাকৃতিক পটভূমি সবসময় বাঙলাকে অনুসরণ করেছে।

গল্পসাহিত্যে নজরুলের আগমন কবিতার সঙ্গে সঙ্গে; কিন্তু তিনি স্বভাবজাত কারণে গল্পের দিকে বেশি দূর যাননি। তাঁর মোট তিনটি গল্পগ্রন্থ বেরিয়েছে- ব্যথার দান (১৯২২), রিক্তের বেদন (১৯২৪), শিউলীমালা (১৩৩৮)। তিনটি গ্রন্থে মোট ১৮টি গল্প আছে। প্রথম দুটি বই দুই বছরের ব্যবধানে এবং শেষেরটি প্রায় দশ বছর পরে প্রকাশিত হয়। কবির প্রাথমিক তীব্র আবেগানুভব, দুঃসাহস ও চিত্তচাঞ্চল্য প্রথম দুটি গ্রন্থে পরিলক্ষিত। শিউলীমালা বেশ পরিণত ও সংহত অনুভূতির বই। নিসর্গ তাঁর গল্পে এসেছে মূলত বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতায়। রিক্তের বেদন ও শিউলীমালায় প্রকৃতি উপমা-রূপক-উৎপ্রেক্ষা বা চিত্রকল্প হিসেবে ব্যবহৃত। পৃথকভাবে বিস্তৃত বর্ণনা আসেনি। তবে ব্যথার দানে নিসর্গ অঙ্কিত হয়েছে বিশাল পটে, বিপুল ঐশ্বর্যে ও অপূর্ব বৈচিত্র্যে। এই গ্রন্থে প্রকৃতি আলাদা মহিমায় দীপ্তিময়।

ছোটগল্পের শিল্পসৌকর্য, গঠনশৈলী বা ভাষারীতির দিক থেকে ব্যথার দান অনুত্তীর্ণ রচনা বলা যায়। কিন্তু গল্পগুলো পাঠে পাঠকের মন ভরে ওঠে অনির্বচনীয় আনন্দে ও বেদনায়। অন্য এক পৃথিবীর অন্য পরিবেশ, অন্য মানুষ, সংস্কৃতি ও প্রকৃতির বৈচিত্র্যময় সমাবেশ। বাঙলার বাইরে ভিন দেশের ভিন নিসর্গের সন্ধান বাঙলা সাহিত্যে একেবারেই নতুন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যাত্রা, যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, অবস্থান ও নানা দেশের মানুষজনের সঙ্গলাভ ও ভিন্ন প্রাকৃতিক পরিবেশের অভিজ্ঞতা অর্জন এবং অসামান্য বর্ণনা নজরুলের গল্পকে স্বাতন্ত্র্য ও নতুনত্ব দিয়েছে। বাঙালি লেখকের এমন অভিনব সৃষ্টি বিশ শতকের বাংলা সাহিত্যে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। নজরুলের গল্পের এই নতুনত্ব ও আপন স্বভাবের কিছু দৃষ্টান্ত :
ক. আঙুরের ডাঁশা থোকাগুলো রসে আর লাবণ্যে ঢল্-ঢল্ করছে পরীস্তানের নিটোল-স্বাস্থ্য ষোড়ষী বাদশাজাদীদের মত। নাশপাতি-গুলো রাঙিয়ে উঠেছে সুন্দরীদের শরম-রঞ্জিত হিঙুল গালের মত। রস-প্রাচুর্যের প্রভাবে ডালিমের দানাগুলো ফেটে ফেটে বেরিয়েছে কিশোরীদের অভিমানে-স্ফূরীত টুকটুকে অরুণ অধরের মত। পেস্তার পুষ্পিত ক্ষেতে বুল্বুলদের নওরোজের মেলা বসেছে। [ব্যথার দান, ব্যথার দান]
খ. পাহাড় কেটে নির্ঝরটা তেমিন বইছে, কেবল যার মেহেদী-রাঙানো পদ-রেখা এখনও ওর পাথরের বুকে লেখা রয়েছে, সেই হেনা আর নেই। … তখন আমার মনে হল এত দিনে হিন্দুকুশের চূড়াটা ভেঙে পড়ল। সুলেমান পর্বত জড়শুদ্ধু উখড়িয়ে গেল। [হেনা, ব্যথার দান]
গ. আমি ভাবছিলাম, এমনি করেই বুঝি মেঘে আর মানুষে কথা কওয়া যায়। এমনি করেই বুঝি ও-পারের বিরহী যক্ষ মেঘকে দূতী করে তার বিচ্চেদ-বিধুরা প্রিয়তমাকে বুকের ব্যথা জানত! আমার ভেজা-মন তাই কালো মেঘকে বন্ধু বলে নিবিড় আলিঙ্গন করলে! [বাদল-বরিষণে, ব্যথার দান]
ঘ. সে ছিল এমনি এক চাঁদনী-চর্চিত যামিনী, যাতে আপনি দয়িতের কথা মনে হয়ে মর্মতলে দরদের সৃষ্টি করে। মদির খোশ্-বুর মাদকতায় মল্লিকা-মালতীর মঞ্জুল মঞ্জরীমালা মলয় মারুতকে মাতিয়ে তুলেছিল। উগ্র রজনীগন্ধার উদাস সুবাস অব্যক্ত অজানা একটা শোক-শঙ্কায় বক্ষ ভরে তুলেছিল। [ঘুমের ঘোরে, ব্যথার দান]
ঙ. আঃ আজ আরবের উলঙ্গ প্রকৃতির বুকে-মুখে মেঘমুক্ত শুভ্রজ্যোৎস্না পড়ে তাকে এক শুক্লবসনা সন্ন্যাসিনীর মত দেখাচ্ছে। এ দেশের এই জ্যোৎস্না এক উপভোগ করবার জিনিস। পৃথিবীর আর কোথাও বুঝি জ্যোৎস্না এত তীব্র আর প্রখর নয়। জ্যোৎস্না রাত্রিতে তোলা আমার ফটোগুলো দেখে কেউ বিশ্বাস করবে না যে এগুলো জ্যোৎস্নালোকে তোলা ফটো। ঠিক যেন শরৎ প্রভাতের সোনালি রোদ্দুর। [রিক্তের বেদন, রিক্তের বেদন]
চ. দূরে হিজল গাছের তলায় আরো দুটি চোখ আল্লা-রাখার কৃষাণ-মূর্তির দিকে তাকিয়ে সেদিনকার প্রভাতের মেঘ্লা আকাশের মতই বাষ্পকুল হয়ে উঠল- [জিনের বাদশা, শিউলীমালা]

নজরুলের এইসব গল্পের পটভূমি অধিকাংশ বাঙলার বাইরে। গল্পের চরিত্রাবলীর মানসপ্রকৃতি অত্যন্ত আবেগঘন, সংবেদনশীল ও জীবন্ত। দৈনন্দিন জীবন ও প্রতিদিনের সমাজ প্রতিবেশের বাইরের ঘটনাবলী গল্পের আখ্যান। গল্পে ব্যবহৃত প্রকৃতি গল্পের প্লট, চরিত্র, আখ্যান ও পটভূমির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। ব্যথার দানে অধিকাংশ গল্পের পটভূমি বিদেশি; প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নজরুলের বাঙালি পল্টনে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ, সৈনিক জীবনের অভিজ্ঞতা, ভিন্ন প্রাকৃতিক আবহে দিন যাপন লেখককে প্রবলভাবে প্রভাবিত করে। ব্যথার দান গল্পের স্থান গোলেস্তান বা ইরান; ফলে সেখানকার মরুময় নিসর্গের বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত; গল্পকার বেলুচিস্তান ও আফগানিস্তানের পাহাড়, মরুভূমি, বাগান, মরুদ্যান, জঙ্গল ইত্যাদিকে কাব্যময় ভাষায় রূপ দিয়েছেন। ‘হেনা’ গল্পের পটভূমি ভার্দুনট্রেঞ্চ, ফ্রান্স, সিন নদীন ধার, প্যারিসের পাশের ঘন বন, বেলুচিস্তানের কোয়েটার দ্রাক্ষাকুঞ্জ, কাবুল ইত্যাদির নৈসর্গিক অবস্থান ও দৃশ্যাবলীর সঙ্গে গল্পের পাত্রপাত্রী মিশে আছে। পাহাড়, পাহাড়ী নির্ঝর, নদী ও তীরবর্তী নিসর্গ বাঙালি পাঠকের চোখে নতুনত্বের স্বাদ জুগিয়েছে। ‘বাদল-বরিষণে’ গল্পটিও আলাদা এক প্রাকৃতিক পরিবেশে রচিত; কালিজ্ঞরে ‘কাজরী উৎসব’কে কেন্দ্র করে গল্পের নায়ক-নায়িকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও পরিণতির মধ্য দিয়ে বর্ষার এক অসাধারণ, মনোরম ও ইন্দ্রিয়ঘন রূপাবলী অঙ্কিত। বর্ষার বাদলা নিসর্গ আর গল্পের চরিত্রের মনোভঙ্গি যেন একই সূত্রে গাথা। ‘ঘুমের ঘোরে’ গল্পের স্থান আফ্রিকা, সাহারার মরুদ্যান-সন্নিহিত ক্যাম্প ও বীরভূমের ময়ূরেশ্বর। গল্পের ঘটনাবলী ও চরিত্র সেইসব দেশের প্রাকৃতিক ভূগোলের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে।

ব্যথার দান গল্পগ্রন্থটি নজরুলের তেইশ বছর বয়সে লেখা। এই বয়সের একজন লেখক মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আফ্রিকার প্রেক্ষাপট এবং প্রাকৃতিক ভূগোলের পরিপার্শ্ব বর্ণনায় কিভাবে গল্প নির্মাণ করলেন, সেটা রীতিমত অভাবনীয় ও বিস্ময় জাগানিয়া ব্যাপার। সব নৈসর্গিক চিত্রকল্প যে তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তা কিন্তু নয়; কিছু অভিজ্ঞতা নিজের জীবনের সঙ্গে যুক্ত, বাকিটা কল্পনা, অন্যের কাছে শোনা; অর্থাৎ এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাঙলা কথাসাহিত্যে নতুন এক মাত্রা সংযোজন ঘটান নজরুল। ফলে আন্তর্জাতিকতা ও বৈশ্বিক পরিস্থিতির সংস্পর্শ লাগে তাঁর গল্পে।

এই প্রকৃতি অঙ্কন সম্পূর্ণ পালটে যায় রিক্তের বেদন ও শিউলীমালায়। অন্য বিশ্ব থেকে বাঙলায় প্রত্যাবর্তন করে গল্পের নিসর্গ। তবে ব্যথার দানের মতো প্রাকৃতিক প্রাচূর্য এই দুটি বইয়ে নেই, আলাদা বর্ণনা নেই; আছে স্বাভাবিক ব্যবহার। অধিকাংশ জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে উপমা, উৎপ্রেক্ষা, রূপক, চিত্রকল্প বা প্রতীক হিসেবে। এইসব আলঙ্কারিক ভাষাভঙ্গি গল্পকার প্রয়োগ করেন বাঙলা ও বাঙলার বাইরের প্রকৃতি থেকে। রিক্তের বেদন নামগল্পটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বাঙালি যুবকের যাত্রাকালীন আবেগানুভূতির সঙ্গে বাঙলার প্রকৃতির স্পন্দন; যুদ্ধক্ষেত্রে অবাঙালি মানব-মানবীর সম্পর্কের সংকটে ও ভিন্ন প্রাকৃতিক পটভূমিকায় রচিত। বীরভূম, নান্নুর, সালার, মধুপুর, লাহোর, পেরিয়ে নৌশেরা, কুর্দিস্তান, কারবালা, আজিজিয়া ইত্যাদি স্থানে যুদ্ধের ঘটনা প্রবাহ ও মানবিক আর্তির পাশাপাশি সেইসব জায়গার বিচিত্র প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী- শুষ্ক-রুক্ষ মরুভূমি, উদ্যান, মরুবৃক্ষ, বিরাট বিরানভূমি বাঙলার গল্পে অভিনবত্বের আমদানি। ‘মেহের-নেগার’ও সেই যুদ্ধের প্রেক্ষিতে আফগানিস্তানের পটভূমি ও নৈসর্গিক চিত্রাবলীতে লেখা; ‘সাঁঝের তারা’ গল্পে আরব সাগরের তীরবর্তী অঞ্চল এবং ‘রাক্ষুসী’ বীরভূমের গ্রামীণ জীবন ও নিসর্গের দৃশ্যকল্পে রচিত; তবে ‘স্বামীহারা’ ও ‘সালেক’ গল্প দুটি বাঙলার প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলীতে নির্মিত। প্রকৃত অর্থে ব্যথার দানের সম্প্রসারণ হলো রিক্তের বেদন বইটি- ভাববস্তু, ভাষাশৈলী ও প্রকৃতি অঙ্কনের প্রবণতানুসারে। আর শিউলীমালার সবগুলো গল্পে লেখক বাঙলার জীবন ও প্রকৃতিতে ফিরে আসেন। বিশেষভাবে ‘পদ্ম-গোখ্রো’, ‘অগ্নিগিরি’ ও ‘জিনের বাদ্শা’ গল্পগুলোতে বাঙলার গ্রামীণ জীবনের প্রবণতা, লোকবিশ্বাস-সংস্কার, পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক আবহ বিরাজমান। বেশ পরিণত ও সংহত গল্পগুলোতে প্রকৃতি বর্ণনা আলাদাভাবে নেই। তবে গল্পের চরিত্রাবলী, ঘটনা প্রবাহ, পরিপার্শ্ব, প্লট ও পটভূমির সঙ্গে প্রকৃতি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। নাম থেকেও বোঝা যায় গল্পের নিসর্গ প্রবণতা।

নজরুল মূলত কবি। কবিসত্তা ও কবিত্ব তাঁর গল্পে প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে; ফলে ব্যথার দান ও রিক্তের বেদনের গল্পভাষা হয়ে উঠেছে কাব্যময়, আবেগঘন ও আলঙ্কারিক। প্রধানত মধ্যএশিয়ার মরুময় প্রকৃতির বিচিত্রতার কাব্যিক বর্ণনা অসামান্য ভাষায় উপস্থাপিত। এক্ষেত্রে বাঙলা কথাসাহিত্যে তা এখনো অদ্বিতীয় শিল্পকর্ম হয়ে আছে। প্রশ্ন উঠতে পারে বাঙলার কবি বা লেখকের স্বাদেশিক নিসর্গ অঙ্কনের অনুপস্থিতি নিয়ে। কারণ নজরুল বাঙলার লেখক। এক্ষেত্রে দেশের বাইরে মহাসমরের মাঝে নজরুলের অবস্থান, সম্পৃক্ততা ও অভিজ্ঞতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ সেই প্রশ্নের জবাব হতে পারে। পরবর্তীকালে গল্পকার প্রত্যাবর্তন করেন বাঙলার আবহমান ও চলমান জীবনে, নিসর্গে ও আপন আবহে। লৌকিকতা-অলৌকিকতা, গ্রামীণ প্রকৃতি ও জীবনস্পন্দনের গল্পভাষ্য নির্মাণে নজরুল বাঙলা সাহিত্যে একজন সফল শিল্পী।