ভোরের সূর্যের মতোই কিছু কিছু কবিতা উদিত হয়। তারপর সে আলো দেয় এবং নিভে যায়। এই প্রক্রিয়া ঘটতে থাকে নিত্যদিন। সূর্যের আবর্তনের মতোই আমাদের জীবনে ঘটে যায় নানা ঘটনা। এই ঘটনা প্রতিফলন ঘটে মানুষের মনে-মগজে। মানুষ যখন বেশি আন্দোলিত হয় তখন মন-মগজ থেকে বেরিয়ে আসে ভাষা। এই ভাষার বাহন হলো কবিতা। কবিতা এমন এক শক্তিশালী মাধ্যম যা যুগ যুগ ধরে মানুষ আয়ত্ব করেছে। এটা এক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সামনে এগিয়ে চলে। কেয়ামতের আগ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। সেই চলমান প্রক্রিয়ার অংশ কবি নীলিমা আক্তার নিলার কাব্যগ্রন্থ ‘আরেকটি অজানা রহস্য’।

‘কেমন আছিস মা?
এখনো বোধ হয় অভিমান করে বসে আছিস
এখনো বোধ হয় ভাবিস, তোর বাবা ভালো না’
-বাবার চিঠি
পৃথিবী সৃষ্টির যে রহস্য তা বাবা ও মা। আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নেয়ামত হিসেবে দেখি মাকে। মায়ের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করতে করতে এক সময় ভুলেই যাই বাবারও একটি দায়িত্ব ছিলো। সে বুঝি সব ভালোবাসা থেকে দূরে সরে গেছে। বাবাকে বুঝার ফুসরত খুঁজে পাই না। বাবাও যে আমাদের জীবনে অন্যতম নেয়ামত তা ভুলে যাই। কিছু কবি তার সুক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে দেখেছে বাবার ভালোবাসা, প্রেম, ¯েœহ, মমতা। সে বাবাকে বুঝতে চেষ্টা করেছে সাধারণ মানুষ থেকে আরো একটু উপরে উঠে। বাবার ভালোবাসা ছুঁয়ে দেখেছে। বাবার ঘাম সে মুছে দিতে চেষ্টা করেছে। এখানেই কবির সার্থকতা। এখানেই আরেকটি অজনা রহস্যের উৎঘাটন হয়েছ। বাবা যখন বলে ‘কেমন আছিস মা?’ বাবা ও মেয়ের যে ভালোবাসা তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে মা ও ছেলের ভালোবাসার মতোই। বাবা যে মেয়েকে গভীরভাবে অনুধাবন করে, একজন আদর্শ মা হয়ে উঠার সোপান তৈরি করে দেয় সেই বিষয়টি উঠে আসে। আমার তার পরের লাইনে দেখতে পাই ‘এখনো বোধ হয় অভিমান করে বসে আছিস’ মেয়ের মান অভিমান ভাঙানোর জন্য বাবার সেই মিষ্ট মধুর ¯েœহ, মাথায় হাত দিয়ে যেনো অভিমানের ঝুড়িটি নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় রেখে আসা। অভিমানি মেয়ের অভিমান ভেঙে দিতে। এমনি স্নেহ ভালোবাসা তার কবিতা উঠে আসে খুবই সরলভাবে। তার পরের লাইনটি আরো গভীরভাবে পাঠকের মনে রেখাপাত করবে ‘এখনো বোধ হয় ভাবিস, তোর বাবা ভালো না’ এই লাইনটি দিয়ে বাবার দূরে থাকার দায় বেদনার মতো ঝরে পরে। তাসবিদানার মতো ঘুরতে থাকে মন মগজে। আহ বাবা যে জীবনের সবটুকু সময় ব্যয় করে সন্তানের জন্য। পরিশ্রমে ঝরে পরে পবিত্র ঘাম। পরিবার থেকে দূরে থেকে পরিবারের জন্যই মেহনত করে যায়। বাবাদেরে দুঃখ খুবই প্রাঞ্জলভাবে তুলে ধরেছে কবি। কবির এখানেই স্বার্থকা।

এখনো ডুবন্ত অন্ধকারে
আমার কান্নার আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে
-কোন সর্বনাশের গল্প নিয়ে
কবিকে বুঝতে হলে তার কথার মায়াজালে বন্দী হতে হয়। তার পরতে পরতে ডুব দিয়ে দেখতে হয় ভাঁজের কারুকাজ। কবি শুধু তার কথার জাদু দিয়ে মোহিত করে না। তার ভেতরের স্বপ্ন-কল্পনা-দুঃখকে নিয়ে আসে পাঠকের সামনে। কবি যেনো পাঠকের হৃদয়ে উঁকি দিয়ে দেখে আসে তার সর্বনাশের গল্প। তার ভালোবাসার সংসার। কবি নীলিমা আকার নীলা তার কবিতার ভেতের তুলে আনো তার প্রতিবেশ ও পরিবেশ। সমাজের দুঃখ বেদনাকে সম্বল করে যে জনসমাজ গড়ে ওঠে তার গল্পগুলো খুব সহজভাবে বয়ান করে। মানুষ ভাষার মারপেঁচে হারিয়ে যায় না মূল বিষয় থেকে। কিন্তু চিত্রকল্প আর উপমাও তার খুব সরল। উপরোক্ত দুটি লইন দেখতে আমরা বুঝতে পারবো কতোটা মিহি সৌন্দর্য তার কবিতার পংক্তিতে। তার উপমা ‘ডুবন্ত অন্ধকার’ অন্ধকারও এক সময় ডুবে যায়। জীবননান্দ দাস যেমন বলেছিলো ‘পাখির নীড়ের মতো চোখ’ এই দুই উপমায় আমাদের দারুনভাবে মুগ্ধ করে। আমাদের কবিতা সম্পর্কে আরো একধাপ এগিয়ে গিয়ে ভাবতে সহায়তা করে। বাংলা কবিতার সৌন্দর্য এখানেই লুকায়িত। আর আমরা কবিতার এই পরম্পরায় এগিয়ে যেতে চাই আরো আরো নতুন কবিতার সন্ধানে।

‘নতুন বছর এসো সবার ঘরে
আলো দিও দুটো চোখ ভরে’
কবি আল মাহমুদ বলেন ‘কবিরা স্বপ্ন দেখে স্বপ্ন দেখায়’। কবি নীলিমা আক্তার নীলাও একজন আশাবাদী কবি। তার কবিতায় সমাজের দুঃখ উঠে আসলেও শেষ পর্যন্ত তার কবিতায় আশাবাদই জেগে থাকে। আশা নিয়েই যেনো পৃথিবী টিকে থাকে সেই চেষ্টার প্রতিফলন দেখি তার কবিতায়। তিনি বলেন, ‘নতুন বছর এসো সবার ঘরে আলো দিও দুটো চোখ ভরে’ নতুন বছর সবার ঘরে প্রবেশ করে না। কিন্তু কবি বলছেন নতুন বছর সবার ঘরে প্রবেশ করে এবং নতুনা বছরের যে আনন্দ খুশি, নতুন বছরে যে কল্যাণ তা যেনো প্রতিটি মানুষে মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। কবি এখানেই মানুষকে আশাবাদী করে তুলে। একজন আশাবাদী কবিই শেষ পর্যন্ত একজন দেশপ্রেমিক কবি। তার প্রেম দিয়ে সে পৃথিবীর মানুষকে ভালোবাসে, তাদের জন্য কল্যাণ কামনা করেন।

আমার সোনা মানিক
আয়রে সোনা আয়
রাজকুমারের গল্প বলে
ঘুম পাড়াতো মা’য়
-মা
কবি নীলিমা আক্তার নীলার কবিতা বইয়ের আলোচনা শেষ করছি এমন এক কবিতা দিয়ে যেখানে একটি সুখি দেশের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। উপরের ৪টি লাইন পড়লে তাবৎ পৃথিবীর মানুষ বুঝতে পারবে বাংলার মানুষ কতোটা সুখি। কবির এই স্বপ্ন বেঁচে থাকুক পৃথিবীর সমান বয়স নিয়ে।

কবি নীলিমা আক্তার নীলার ‘আরেকটি অজানা রহস্য’ কবিতার বইয়ে কবিতা সংকলিত হয়েছে ৫৪টি। বইটির ভূমিকা লিখেছেন আশির দশকের অন্যতম কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। মোস্তাফিজ কারিগরের প্রচ্ছদে বইটি প্রকাশ করেছে ‘মাহাকাল’ যার মূল্য নির্ধারণ করা হয় দুইশত টাকা।