বৃষ্টিতে ভেজার শখ কার নেই? সকলের আছে। এটা মানুষের আজন্ম সহজাত প্রবৃত্তির শখ। প্রকৃতির নিদারুন ছন্দ পতনের মৃদঙ্গ তরঙ্গ রাশি মেতে উঠে এ বৃষ্টির মধ‍্যে। তাই এ ছন্দে মানুষের হ্নদয় মাতে । অনুভুতি জাগে। শিহরণ তুলে। কৈশোর বেলায় প্রত‍্যেকের এ ছন্দ আহরণের শখটা বেশ উদ‍্যম থাকে? কম বেশি সবাই শখের বশে কিংবা নিতান্ত প্রয়োজনে বৃষ্টিতে ভিজে। বয়সের ভারে একদিন তা অনেকের জীবন থেকে অবলীলায় এ শখ ছুটিও নিয়ে বসে।

যা হোক। তাই বলে কেউ কখনো বৃষ্টিতে ভিজে পেরেশান মন ধুয়ে ফেলেছে ? কেউ কি মন খুলে চোখের জল বৃষ্টিতে একত্ব করে কেঁদেছে ? বৃষ্টিতে ভিজে কেউ কি মনের কষ্ট ছুয়ে দেখেছে?

এমনটা কেউ করে নি। এমন অদ্ভুত নয়নসিদ্ধ জীবন ভঙ্গিমা কারো সাত জন্মেও চোখে পরেনি ?

হ‍্যাঁ, আমি দেখেছি। এই প্রথম। কি অপূর্ব দেখতে ! দেখলে চোখের সাম্র‍াজ‍্যে বিষ্ময় মন্ত্র মুগ্ধের মত রাজত্ব করতে বসে। হ্নদয় ও মন আঁটকে যায়। নয়নের তৃপ্তিটা যেন উষ্ণ গালিচা বিছানো রাজ প্রাসাদের সজ্জিত বিলাশ বহুল সুখবোধ মনে হয় ।

একটি ষোড়শী বালিকা বৃষ্টিতে ভিজছে। ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি। পথ ঘাট ফাঁকা । প্রকৃতিটা শুধু বৃষ্টিতে বৃষ্টিতে মাখা। বিয়ের সাজ তার অঙ্গে। পড়নে লাল বেনারশি। হাতের চুড়ি গুলো রেশমী। পায়ে আলতা পাতানো। নাকে নাক ফুল সাজানো। যেন আগ্নেগিরির উৎপাত হচ্ছে তাতে । কাঁদছে না হাসছে। দুর থেকে বুঝার উপায়টা বড়ই দুরহ মনে হচ্ছে। তবে এ টুকু নিশ্চিত, মেয়েটির হাত শাড়ির কুচিতে চেপে ঘন শ্বাষে ছুটছে-

দোতালার বাড়ান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতে আমার বড়ই ভাল লাগছে।

ঢাকার রাজ পথ। বিশ্ব বিদ‍্যালয় চত্ত্বর। এখানে কত মানুষের পদচারনা। তা ভাবাই যায়না। ছাত্র, শিক্ষক, দর্শনার্থী, পথিক, ব‍্যবসায়িক, পর্যটক, সাংবাদিক, রাজনীতিবীদ সহ হাজার মানুষের বিচিত্র বাহার। কে জানেনা এমনটা, সবাই জানে। নিত‍্য নয়ন জুরে সকলে এমন হাজার দৃশ‍্য উপভোগ করে । তাই আমার বলার অপেক্ষাটা, জানি পাঠকমহলে নিতান্ত হাসির মাঝে উপেক্ষিত হবে। হোক, তাতে আমার কি যায় আসে।

নীলা এ সমাজের একজন নববধু। আজই বিয়ে হল তার। পোশাকে টুকটুকে রঙ। হাতে মেহেদী, মনের ক‍্যানভাসে সর্পিল জীবনের বড় বড় খন্দক। বাসর ঘরে পা রাখার কথা। যদিও ছত্র ছায়া হীন জীবনে বাসর ঘরটা ফাঁকা ফানুসের মত। জৌলুসহীন অনাড়ম্বর । নিজেই নিজের অভিভাবক, আয়োজক। তবুও ক্ষীর্ণ ভাবে বাসর ঘরে যাওয়ার স্বাদ দোল খায় মনের দেয়ালে। ভীরু ভীরু চোখে ঝাপটা দেয় ভালবাসার তীব্র বাসনা। পুরুষের উষ্ণতা ছোঁয়ার মৌন তৃপ্ততা। দেহে দুর্বল শিহরন জাগায়। কোনটারও হিসাব সে ভালভাবে মিলাতে পারেনা।

হঠাৎ এ কি হল? যৌবনে স্তব্ধতা, জোয়ারে ভাটা। স্বপ্নের বুকে শুষ্কবালু রাশির স্তুপ। মরুর পথে জলের তৃষ্ণা। স্রোতহীন জীবনের মোহনায় সহসায় ভীর হল ভাঙ্গা তরীর যন্ত্রনা।এটাই কি জীবন? বিচিত্র নিয়তীর প্রহসন। অবান্তর পথ চলার ইতিহাস। হায়, হায় কি আজব সেলুকাস!

স্বামীর হাত ধরে বাসরঘরে যাওযার পুর্বেই বৈরী বাতাস ছিন্ন করল মালার গ্রন্থি। একে একে খসে পড়ল আশার নুড়ি। মিলন সূখের পরশ পাওয়ার আগে হাতে এসে ভীরল বিচ্ছেদের চিঠি। চিঠিটা পড়তে না পড়তে ঝড়তে লাগল চোখে অজস্র অবুঝ নীর। শেষ করতে পারল না নীলা। বলা-কয়া নেই আচমকা ঝাপটা দিল মনের দুয়ারে ব‍্যথার ঝড়। বাইরে ও ভিতরে ঠিক একসাথে। ঝড় আর বৃষ্টির মধ‍্যে পাল্লা। দুর্যোগের কাছে ব‍্যথার প্রাচ‍্যুর্যে মনটা কোনভাবেই হাড় মানল না।
সমুদ্রে ভাসমান তরী হয়ে ঝড়-বৃষ্টির মাঝে ভাসতে লাগল নিজের তথৈবচ অতীত । তাই ঝড় বৃষ্টিতে পা পা হাঁটে আর ভাবে। হায়! হায়! মানুষের ভাগ‍্যের তরী এভাবেই ছুটে-

নীলা বাবা-মা পরিচয় হীন অনাথ বালিকা। বাবা জীবিত আছে কিনা তার কোন সন্ধান মেলে না। জন্মটা এক কাল বৈশাখী ঝড়ের রাতে। জন্মের পরে বাবা তার মুখ দেখে মাকে ফেলে পালিয়ে গেছে। একটুও মনে নেই মাকে। মা আত্নহত‍্যা করেছে। না, কেউ তাকে মেরে ফেলেছে তার হদিস আজও অজানাই আছে।

শুধু একটু আধটু কি যেন মনে আছে-

তখন চৈত্র মাস। আকাশ হতে আগুনের দাবাদাহ খসে পড়ছে। ঘরে বাইরে উষ্ণতা আর উত্তাপ একসাথে লুকোচুরি খেলছে। মা নীলাকে উঠানের তাল তলায় চাটাইয়ে শুইয়ে তাল পাখা ঘুরিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করছিল। কোথাও এক মুঠো বাতাস নেই। গাছের পাতা গুলো নিথর। একটুও নড়ে না। মায়ের হাত পাখার বাতাসে সেদিন নীলা জন্মের ঘুম দিয়েছিল। তারপর মা নাকি তাকে ঘুমিয়ে কলশ নিয়ে অন‍্যের বাড়িতে পানি আনতে যায়। পানি নিয়ে ফিরছিল পুকুরের মাল্লি ধরে। পথে দুর্বৃত্তদের চোখ পড়ে তার রুপের উপরে। তারপর কি হয়েছিল তা কে জানে?
ঘুমের মধ‍্যে দুর সম্পর্কের মামির নিষ্ঠুর লাথি আর থাপ্পরে নীলা আৎকে উঠে। কর্কষ ভাষায় শুনতে হয়—“ধুমশি মাগি, মছিস না আছিস। তোর মা’ যে পুকুরের জলে পরে মরে আছে। এখন তুই কার ঘ‍্যাক হয়ে গলায় ঝুলবি গে মাগি। তোর মা মইছে তোক ধরি মরতে পারে নাই ।”

ঘুম থেকে উঠে হাউ মাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নীলা মা ‘র খোঁজে যায় পুকুর পাড়ে। মায়ের আর দেখা হয়না। অনেকে জোর করে আটকে দেয় তাকে। কেন যেন যেতে দিল না মায়ের কাছে। গেলে নাকি সেও মরে যাবে এই ভয়ে। এক পা এগুতে দিল না কেউ। কয়েক জন লোক সাহস করে পুকুরে নেমে মায়ের শবদেহ পুকুরের পাড়ে তূলে।পুলিশ আসে। লোকে লোকারন‍্য। ঐযে মায়ের মুখ দেখে ঘুমিয়ে ছিল। আর কোনদিন দেখা হল না তাকে। সে দিন হতে চেপে বসল কংস মামার ঘাড়ে। মামার সংসারে উচ্ছিষ্ট হয়ে বেড়ে উঠা। অভাব অনাটনের সংসার। একবেলা খেলে, অন‍্যবেলা থাকতে হয় উপোসে। তাছাড়া মামির চোখের বালি হয়ে কোনমতে জীবন যাপন করে। সময় অসময়ে খাবারে, ঘুমের মধ‍্যে ধুপধাপ করে লাথি আর বাড়ি নিত‍্য দিনে চলে। সাত সকাল হতে নাহতে বিছানাটা পর হয়ে উঠে। হাতে এসে পরে ঘরদোরের ঝাড়ু, থালা বাসন মাজার রোজ কাজ। কোন দিন একটু বই হাতে আসে, কোনদিন তারও সুযোগ টুকূ হয়না শেষে। তবুও স্কুলের দেয়ালে মিনা রাজুর ছবিটা তার মনটা কে বড়ই মায়া জড়িয়ে টানে।

বর্ষাকালটা কাটে নীলার একটু ভিন্ন আঙ্গিকে। দিন ভর ঝরঝর বৃষ্টি পরে। সে জাল পেতে মাছ ধরে। দুরে ধান ক্ষেত। ক্ষেতের মাঝ খানে স্রোতধারা। সেখান থেকে তুলে আনে জাল ভর্তি বড় বড় পুটি, কৈ, টেংরা। কাক ডাকা ভোরে জানালার পাশে এসে ফিসফিস করে অমিত ডাকে।
➡”এই নীলা, জাল তুলতে যাবিনা।”
➡”যাবই তো।”
নীলা চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে আসত। দুজনে হাত ধরে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মাছ তুলতে যেত ধান ক্ষেতের মধ‍্যে। নিতম্ব ছুইছুই পানি । ছল ছল বৃষ্টি। বিজলী চমকাতো বারবার। আকাশে বিকট গর্জন হত। অমিত সহ‍্য করতে পারতনা মেঘের গুড়গুড় শব্দ। বিজলী চমকালে অমিত নীলাকে বুকের মধ‍্যে জরিয়ে ধরে। নির্জন নিধুয়া পাথার। অমিতের উষ্ণ দেহটা বড়ই ভাল লাগে তার। অমিতের নিলর্জ আচরনটা নীলার মনে নিভৃত্বে দাগ কাটে। নীলার একমাত্র ভাল স্কুল সহপাঠী বন্ধূ অমিত। পাঁচ ঘর বাদে ওদের আটচালা। অমিতের দুরন্তপনা সাহসী কাজগুলো মনটাকে জয় করে বসে। অজান্তে বড়ই সুখবোধ মনে হয় তাকে।

একদিন মামা গ্রাম ছেড়ে স্বপরিবারে ঢাকায় আসে। সে সুবাদে নীলার পাদুটো ঢাকায় পড়ে।
গ্রাম ছাড়তে নীলার মনটা মোচড় দিয়ে উঠে। বালক সুলভ মনে একটা অজানা কষ্টবোধ জন্ম নেয় হ্নদয়ের কোনে। তাও অমিতের জন‍্যে। কিন্তু তা বেশিদিন স্থায়ী হলনা। শহরের রঙিন পরিবেশটা স্বপ্নীল মনে উড়াবার ডানা মেলে। সাধ জাগে কলেজের কড়িডোরে ছুটতে। ছবি আঁকতে, নাচতে। মামি সর্বদাই তাকে গ্রামে ফেলে আসার পক্ষপাতিত্ব ছিল। কিন্ত মামা তাতে রাজি ছিল না। কোথায় যেন মামার হ্নদয়ে তার জন‍্য একটা দরদ জায়গা করে বসে । এনিয়ে সব সময় মামা-মামির মধ‍্যে তর্ক-বিবাদও বাঁধে।

মামা বেশির ভাগ বাইরে কাটাত। এ সুযোগে মামির অন্দর মহলে চলে নির্যাতনের রাজত্ব। তাই নীলা মামীর অনাদরে অহেলায় অসহ‍্য বোধে হাঁপিয়ে উঠে। ঢাকার চার দেয়ালে চাপা পড়ে মনের রঙ। পৃথিবীটা কে মনে হত কসাই খানা। দিগ দিগন্তগুলো একাকীত্বের চাদরে পরে ঢাকা। বাবা মা “র স্নেহ-ভালবাসার স্বাদ তিতা না মিঠা তা আদৌ জানা হয়না। তাই পরের হাতে, পরের ঘরে বেড়ে উঠা নরকীয় জীবনটা তার কাছে বড়ই নিষ্ঠুর, বড়ই অদ্ভুত মনে হতে থাকে ।

নীলার আশ্রয় হল নীল ক্ষেতের একটা গলিতে। এই আশ্রয়ের খুটিটাও ছিল প্রথমে বড়ই নড়বড়ে। কিছুদিন যেতে নাযেতে বাধ‍্য হয়ে ছাড়তে হয় মামার সে বস্তিভিটে । মামির লোভ জাগে সে অন‍্যদের মত কাজে যোগ দিক। তার বয়সী মেয়েরা অনেকে কাজ করছে। দু”পয়সা উপার্জন করছে। কিন্তু মামির কথায় তার মন সায় দেয়না। লেখাপড়াটা শেষ করতে পারলে নিজপায়ে দাঁড়াতে পারবে। এই স্বপ্ন রাতের ঘুম মামির নির্যতনকে একেবারে তুচ্ছ করে তুলে।

অবশেষে লেখাপড়ার স্বার্থে মামার ঘর ছাড়তে হল নীলাকে। অনেক কষ্ট পেতে হয়েছে সেদিন। গ্রন্থি ছিঁড়ে কূয়ায় পরার মতো অসহায়ত্ব বোধ। একান্ত নিরুপায় হয়ে মামার ক্ষীর্ণ দৃষ্টি হতে মুক্তি পেল । কারন, মামি সেফ কথায় কান ফুঁড়ে দিয়েছিল। “লেখপড়া করলে আমার এখানে নয়। আমার আশ্রয়ে, আমার খেয়ে থাকতে হলে, গতর খেটেই থাকতে হবে। লেখাপড়া করে শাহাজাদী হওয়ার সুযোগ আমার ঘরে নেই। আমার কথায় চলতে হবে, দুই পয়সা উপার্জন করে আমার হাতে দিতে হবে। নচেৎ বাড়ি ছেড়ে ভাগারে গিয়ে মরগে। “

মামির কথা গুলো তার হ্নদয় ফুঁড়ে এপার ওপার করল। কিন্তু লেখাপড়ার মমতায় নিভৃত্বে কিছুক্ষন অশ্রুপাত করল। বাবা-মা থাকলে কি তার সাথে এ নিষ্ঠুরতা হত। নীলা পেটে ধরে সব হজম করল। অলংকারের হার হিসেবে মামির গঞ্জনাকে গলায় পরল। তারপর একদিন বিষ গিলে মামীকে মুক্তি দিল। নামল শুন‍্য হাতে শুন‍্য আকাশের নিচে। ভা‍গ‍্যের শিলালিপিতে খোদাই করে সঙ্গী করল জীবন যুদ্ধটাকে। নিসঙ্গতার হাত ধরে পা বাড়াল বাইরের বন্ধুর পথে।

তবে সেদিন আকাশে মেঘফেটে বৃষ্টি ছিল কিনা । তার একটুও মনে নেই।

নীলা জীবন সংগ্রামে দুর্বার সৈনিক। বিশ্ব বিদ‍্যালয়ের রাজপথ তার যুদ্ধশিবির। বেঁচে থাকার আত্নরক্ষা মূলক ঢাল তলোয়ার বলতে শুন‍্য দু”খানা হাত। কন্ঠকাকীর্ণতায় পূর্ণ পথের ধুলি। জীর্ন শীর্ন জীবনের রঙ। মনের স্বপ্ন একান্তই ধুসর। হ্নদয়ের কল্পনা গুলো একে বারেই এলোমেলো, অপরিচ্ছন্ন।

জীবনটা গড়াতে গড়াতে নীলা ইডেন কলেজের ছাত্রী। লেখাপড়া করে। আলগা পদযুগলে কোনমতে আঁকড়িয়ে পিচ্ছিল পথটিতে চলে। চোখের জল নিভৃত্বে বির্সজন দিয়ে কিছুটা হেঁটেছে। অবলম্বন বলতে কিছুই ছিলনা। শুধু জীবিকার সন্ধানে রাত পর্যন্ত ঠেলা গাড়িতে করে রাস্তায় পুরুষের বেশে কখনো বোরখা পরে সিদ্ধডিম, ফুচকার একটা ছোট ব‍্যবসা করে। মুখের খাবার টুকুও তাতেই মেলে। যা আয় হয়, তা দিয়ে বাসাভারা, লেখা পড়ার খরচ সহ জীবনের পালহীন নৌকা বয়ে যায় স্রোতের প্রতিকুলে।

নীলা একদিন ধরা পরে জিহানের চোখে । বড়ই চৌকস ছেলে জিহান। ও কলেজে পড়ে। গ্রাম থেকে এসেছে। প্রায় বিকেলে কিংবা সন্ধ‍্যার পরে বিশ্ব বিদ‍্যালয়ের কার্জন হলের সামনে ঘুড়াঘুড়ি করতে আসে। ফুচকা, সিদ্ধডিম, হালিম, চটপটি খায়। নয়ন সিদ্ধ সৌমদর্শন চেহারা। কচি ডাবের মত বড়বড় দুটো চোখ। পাপড়ী দ্বয় আয়তকৃষ্ণ। রুপ লাবন‍্য অপূর্ব। অসাধারন। ঢল ঢল চাহনি। চোখের উপর চোখ পরলে ফেরানো বড়ই দায়।
প্রতিদিন গুরুগম্ভীর নিরবতা নিয়ে নীলার সামনে আসে। চোখে চোখ রাখে। দৃষ্টি জুরে শুধুই নির্লিপ্ত ব‍্যঞ্জনা অবাধ ভাবে জুটি বাঁধে।
হাজার মানুষের মধ‍্যে সে একাই আলাদা। আলাদা চোখে দ‍্যাখে। নিরব দৃষ্টিতে কি যেন মাপে ।

একদিন সে নীলার আত্নসম্মানে বাড়ি মেড়ে বসে। অযাচিত বলে ফেলে
➡”এই মেয়ে তোর দাম কত?”

নীলা অবাক দৃষ্টি তুলে তাকায়? জিহানের চোখে চোখ রাখে। যেন চোখ নয় চুম্বক। নীলা তো পুরুষের বেশনিয়ে রাস্তায় নেমেছে। অবয়বে পুরুষের কৃত্রিমতা। তাহলে ছেলেটা কি তাকে চিনে ফেলেছে? ওর আসল পরিচয় জেনে গেছে। নীলা লজ্জায় চোখ ফিরাতে পারে না-

জিহানের চোখে মুখে বিষ্ময় লুকোচুরি খেলে।
সত‍্যি কি সে মেয়ে? এত অপূর্ব পুলকদীপ্তি কেন তার চোখে মুখে? মধুবর্ষী কেন মুখের ভাষন ? বিনীত বিনম্র কেন তার প্রকৃতি ? বয়ানে অপুর্ব কান্তশ্রী । চোখ দু”টো স্বচ্ছ গভীর পদ্মপুকুর। কাজল রেখাটানা যুগল ভ্রু। মনোহর মায়াবী চাহনী। এ কি কখনো ছেলে হতে পারে? কিচ্ছু ঠাওর করতে পারেনা। মনের গভীরে শুধু বিস্ময়ের পাহাড় আঁচড়ে আঁচড়ে পরে ।

➡”মানে ?” আলত প্রশ্ন নীলার।
➡”সরি,আপনার ডিমের মূল‍্য। মোলায়েম উত্তর জিহানের।
➡” ও ও”-নীলা চোখ তুলে নেয়, ওর চোখ হতে।

কথাটা রহস‍্যময়ই থাকল। কিন্তু দু” টি প্রানে সম্বিত ফিরে এল। দৃষ্টি ফিরাল আপন পথে। সেদিন আর বেশী কিছূ হল না। জিহান টাকা দিয়ে স্থান ত‍্যাগ করল।

বাসায় ফিরে জিহান ভাবতে বসল। ফুচকা ওয়ালার চোখে মুখে প্রচন্ড ঝড় এত কিসের। সত‍্যি কি সে মেয়ে? মনটা তো তাই বলছে। দেহের গঠন তো এমনটাই মনে হচ্ছে। জীবনের চাহিদা পুরনে মানুষের রুপ বদলানোর কি বিচিত্র ভঙ্গিমা ? ভাবাই যায় না। জিহানের মনে প্রশ্নের পর প্রশ্ন জমে।

নাঃ, যদি তাই হয়। তবে তা পাপ। তাকদিরের সাথে প্রতারনা। জিহান এতটা মেনে নিতে পারে না। নিশ্চয় সে বাঁধা দিবে। তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনবে। মূলতঃ সে পরিস্থিতির শিকার। এজন‍্য সে দায়ী নয়, সমাজ দায়ী। ওকে বুঝিয়ে সঠিক পথে নিয়ে আসার জোর চেষ্টা জিহান করবে। এ নিয়ে তার মনে এক অচেনা বুনো ঝড় তোলপার করে।

নীলা কলেজ থেকে বের হয়ে চাঁনখার পুলের মোড়ে দাঁড়াল। বেলা দেড়টা। প্রচন্ড খাঁ খাঁ রোদ। যেন মাথায় শীশা গলে পড়ছে। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। গাছের তলায় থোকায় থোকায় মানুষ। ছায়ার মায়ায় আবদ্ধ। রোদে রিক্সা ওয়ালারা পথে বেরহতে সাহস পাচ্ছে না। হঠাৎ নীলা একটা রিক্সা হাতে পেল। উঠে বসল। বলা-কয়া নেই সঙ্গে সঙ্গে একজন ছেলেও উঠে পাশে জায়গা নিল। ছেলেটাকে বেশ পরিচিত, পরিচিত লাগছে। কোথায় যেন চোখে পড়েছে। ছেলেটি রিক্সায় চেপে বসল। বলল, “নীলক্ষেত মোড়”। নীলা কিচ্ছু বলল না। কারন,তার গন্তব‍্যটা ও নীলক্ষেত মোড়ে।

রিক্সার চাকা ঘুরতে লাগল। রোদ মিশ্রিত বাতাস গায়ে চুমো দিয়ে পালিয়ে গেল। মুখ খুলল ছেলেটা।

➡”দেখুন, আমাকে নিলর্জ্জ ভাববেন না” ? ছেলেটির মুখে এমন অবান্তর প্রশ্ন নীলার দৃষ্টি কেড়ে বসল। নীলা তার চোখে চোখ রাখল। বলল–
➡”যা করলেন, তাতে নিলর্জ্জ ভাবাটা কি অন‍্যায় ?” বলুন।
➡” মনটা রোদে পুড়ে কাঠ হয়েছ, প্রকৃতির নিদারুন বৈরীতায় বেশ হাফিয়ে উঠেছি। পথ না পেয়ে অনধিকার চর্চায় এ পথ ধরা।”
➡” জানি, ছেলেরা এমন শতছলনায় বেশ অভ‍্যস্ত।”
➡”আমি কিন্তু পথ চলার সঙ্গি হিসেবে খারাপ না।
➡”তা জানি।”
➡”আর এমনটা করলে আমি নেমেই পড়ব। তখন নিসঙ্গতাই হবে আপনার সঙ্গী”–বলতে বলতে রিক্সা থামার ইঙ্গিত করল। রিক্সা ও থামাল।
➡”আরে, আরে,কি করছেন? ছেলেদের এত অভিমান থাকা ভালো নয়।”
➡অভিমান করব কেন? বন্ধু নাহলে অভিমান সাজে নাকি?
➡”বেশতো ! ছেলেরা কাউকে পেলেই আপণজন, বন্ধু ভাবতে বসে ? এটাই তো ছেলেদের বড় দোষ।”
➡” মানুষ যে মানুষের জন‍্যে। নিশ্চয় তা আপনার জানা আছে?
➡”তার মানে “
➡”মানেটা সহজ, কারো সঙ্গী হয়ে পথচলাটা বোধহয় দোষের কিছু নয় ?”
➡”তর্ক ছাড়ুন, তর্কবাদী লোকদের আমার মোটেও পছন্দ নয়। রিক্সায় উঠে গলায় ঝুলেই পড়েছেন যখন, তখন আর কি করার আছে? চলুল —
➡এতটা অপমান?
➡অপমান বোধ আপনার আছে তাহলে?
➡আছে বৈকি? ছেলেদের থাকতে হয়।

খানিকটা চুপচাপ কাটল। রিক্সা নীলক্ষেত মোড়ে থামল। ছেলেটা নামল।
পা বাড়াতে বাড়াতে আবারও বলল,
➡ “তর্ক সুত্রে নয়। পরিচয় টা তিক্তহলেও অসম্পুর্ণ থাকল বোধ হয়। বাকিটা—–? “
নীলা হসল। বলল,
➡”আপনি বড়ই কৌশলী দেখছি? “
➡”কৌতুহলী আর কৌশলী যাই বলুল। এটা প্রয়োজনে শেখা।”
➡”নীলা “
➡”নীলা, অনেক সুন্দর নামতো? আমি জিহান”
➡”ধন‍্যবাদ “
➡”আপনাকেও”
জিহান একটা গলি পথে হাড়িয়ে গেল। নীলা পলকহীন দৃষ্টিতে তার গমন পথে তাকাল। রিক্সা ওয়ালা ভাড়ার জন‍্য তাড়া দিল। নীলার তন্ময় ভেঙ্গে গেলে অপ্রত‍্যাশিত ভাবে আর এক অঘটন ঘটে গেল।
➡”আরে অমিত তুই?”
➡”হ‍্যা, চিনতে পেরেছিস তাহলে”
➡” চিনতে পারব না, মানে। তুই ঢাকায় কবে এসেছিস?”
➡”তুই চলে আসার বছর খানেক পরে ?”
➡ “লেখাপড়া ছেড়ে তুই রিক্সা নিয়েছিস?”
➡” হু “
➡”কেন?”
➡”ও তে কি হবে? অনুপ্রেরনাটা যখন জীবন থেকে হাড়িয়ে গেছে তখন মরিচিকার পিচনে ছুটে লাভ কি?”বেঁচে তো থাকতে হবে?
➡”অমিত, ভাবছিস আমিও কি সুখে আছি?” দুঃখ আশা আর ভালবাসা দিয়েই গড়া মানুষের জীবন গুলো বড়ই দুঃসহ, বিচিত্র। যাক, আছিস কোথায়?
➡”উর্দু রোডে।”
➡” বিয়ে করেছিস”
➡”না”
➡”এইনে তোর ভাড়া।”
➡”থাক-অন‍্য দিন নেব।”
➡”অন‍্য দিন নেবে, মানে।”
➡তোর থেকে টাকা নিলে। নিজেকে অপরাধী মনে হবে রে।
➡ধুর বোকা, আমি কি তোকে করুনা করছি, এটা তোর ঘাম ঝড়ানো পয়সা। এই নে, ধর।”
নীলা টাকা দিয়ে বিদায় হল।
অমিত খানিকটা চেয়ে চেয়ে নীলার পথ দেখল।

পাঠক বন্ধুগন, এমনি নাটকীয় ভাবেই তাদের পরিচয়। পরিচয়ের সুত্রধরে প্রেম। তারপর বিয়ে। এ পরিচয়ের পর নীলা আর কখনো পুরুষ বেশে রাস্তায় নামেনি।
জিহানের বাবা মা নেই। ভাবীর ছত্রছায়ায় গ্রামে বড় হয় । তীতুমীর কলেজে অনার্সে চান্স পেয়ে ঢাকায় আসা। থাকে নীলক্ষেত মোড়ে। লেখাপড়ার খরচ যোগায় বড়ভাই গ্রাম থেকে । এক দিন বড় ভাইয়ের অনুমোদন দিয়ে নীলাকে বিয়ে করতে কথা দেয়। ওর সব কিছু জেনে ওকে ভাল লাগে জিহানের। ভাই-ভাবীকে ফোনে জানায়। আগামী রমজানে বউ নিয়ে বাড়ি আসছি।
জিহান বিয়ের কাজটা ওর এক বন্ধুর বাড়িতে সেরে নেয়। মালিবাগে একটা বাসা ভারা করে।বিকেলে নীলাকে নিয়ে সেখানে উঠবে। জিহান বন্ধুর বাড়ি হতে ম‍্যাচে ফিরে। নীলাকে বলে এসেছে,
➡”আমি ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে বাসায় উঠব, তুমি তৈরী থেক।”

আজ শুক্রবার। জিহান সকালে নীলাকে রেখে বের হয় ম‍্যাচের পথে । রিক্সায় চেপে ফেস বুকটা অন করে। দেখতে পায় মিছিলের ডাক। জুম্মার নামাজ বাদে বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে মুসল্লিরা সমেবেত হচ্ছে। মিছিলের জন‍্যে। দেশে চলছে ধর্ম সংস্কৃতি নিয়ে আলেম ওয়ালামাদের সাথে মতবিরোধ। অপসংস্ক‍্যতির বিরুদ্ধে আলেমরা দিয়েছে ডাক। জিহান প্রস্তূতি নিল তাতে যোগ দিবে। মনটা বড়ই খচ খচ করছে । ম‍্যাচে বসে তড়িঘড়ি একটা চিঠি লেখে। চিঠিটা নীলার হাতে পৌছানোর ব‍্যবস্থাও করে। তারপর জুমার নামাজ পড়ার জন‍্য গোছলটা সেরে পোশাক পড়ে মসজিদে ছুটে ।

নীলা জিহানের চিঠি পায় হাতে। তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। এতক্ষন ধরে সে জিহানের বন্ধু সবুজের বাড়িতে খাঁচা বন্দি পাখির মত বসে জিহানের জন‍্যে অপেক্ষা করে। চিঠিটা পেয়ে সে পড়তে থাকে। বায়তুল মোকাররম মসজিদের সামনে গোলাগুলির কথাও শুনে। বেশ কয়েক জন মুসল্লী মারা যাওয়ার খবরটা কানে আসে। পুলিশের বন্দুক হতে নাকি বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষে। পাখির মত মানুষ মরে। রক্তে রাজপথ ভাসে। হঠাৎ রক্তের দাগ মুছে দিতে আকাশ থেকে কাল বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টিও নামে। নীলা সে বৃষ্টি উপেক্ষা করে পথে পথে পাগলের মত জিহানকে খুঁজ্ঞে। নীলা কখনো কান চেপে ধরে,কখনো চিঠিটা বুক চেপে দৌড়াতে থাকে।বার বার চিঠির মর্মটা হ্নদয়ে ভুমি কম্পের মত থরথর করে কেঁপে উঠে। কখনো ঘন্টার মত ঠনঠন করে কানে বাজে।

প্রিয়তমা নীলা,
তোমার কুসুম কোমল হ্নদয় সিংহাসনের উদ‍‍্যেশে পরিবেশন করছি অধমের ভালবাসা মিশ্রিত সুন্নাতে সালাম। তোমার মায়াবী মুখ খানা এ মুহুর্তে চোখের আড়ালে থাকলেও আমার অন্তরে প্রস্ফুটিত রক্তিম গোলাপের মত অম্লান হয়ে আছে। জানি, তুমি বাসর ঘরে যাওয়ার অপেক্ষার প্রহর গুনছ। এ সময় তোমার কোলে মাথা রেখে আমার চুল নিয়ে তোমার আঙ্গুলগুলো ইনিবিনি খেলার কথা ছিল। হয়ত তা হলনা।

হায়! তুমি ভাবছ, আমি কতইনা নিষ্ঠুর। তোমার ভালবাসার কোন মুল‍্য আমার কাছে নেই। হয়ত বসে বসে এ ও ভাবছ। আমি তোমার হদয় নিয়ে পুতুল পুতুল খেলছি। মন ভেঙ্গে চুরমার করে দুরে লুকিয়ে আছি। তুমি ভাবলেও আমি ভাবছিনা। একজন ভাগ‍্য বিড়ম্বনা নারী নিস্তব্ধ নীশিতে স্বামীর বিরহ বেদনায় চাতক পাখির মত চঞ্চল হয়ে আছে। খোলা গগনে দাঁড়িয়ে রাতের তারা গুনছে।

সত‍্যি, তুমি যদি এমনটা ভেবে থাক, তাহলে তা হবে তোমার নিস্পাপ ভালবাসার ফলে। কিন্তু কথা গুলো আমার হ্নদয়কে বিভতশো রক্তাত্ত করে হানা দিবে। হয়তো আমি আদৌ তোমাকে বুঝাতে পারবনা যে, আমার হ্নদয়ে তোমার চেয়ে ভালবাসায় মূল‍্যবান ব‍্যক্তি আর কেউ নেই। তুমি আমার অন্তরকে ছিনিয় নিয়েছ। রানী বেশে রাজত্ব করেছ।

তবুও কেন তোমাকে বাসর ঘরে একাকী ফেলে, কোথাও পালিয়ে এসেছি? তোমার থেকে কেন আমি বিচ্ছিন্ন?
এ প্রশ্ন তুমি করতেই পার। তবে শোন,
কোন ধন-সম্পদের মোহে, ক্ষমতার লিপ্সায়, কিংবা মসনদের স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমি দুরে নই। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে অর্পিত কর্তব‍্য টানেই কেবল আমি তোমার থেকে পৃথক হয়েছি।
“জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ” এর চেয়ে বড় কোন কর্তব‍্য নেই। মুমিনের জন‍্য কর্তব‍্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। বিনিময় জান্নাতুল ফেরদাউস। এ সুপ্ত বাসনা অলক্ষ‍্যে আমার মনে বাসা বেঁধেছে। জানিনা এ অজানা পথে কতদুর যেতে পেরেছি।
তবে, তোমার বিরহ ব‍্যথা আমাকে সর্বক্ষন কুড়ে কুড়ে খাবে। নিরন্তর পীড়া দিবে। তবুও এ বিরহে আমি পরম আনন্দিত। কারন, তোমার ভালবাসাই আমার সংকল্পের পথে ছিল বড় পরীক্ষা।
আলহামদুলিল্লাহ, আমি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। আমি আল্লাহর ভালবাসা পেতে নিজের ইচ্ছা, স্বপ্ন, ভালবাসাকে উৎসর্গ করতে পেরেছি। এজন‍্য তোমার চরম আনন্দিত হওয়া উচিৎ। তোমার স্বামী মজবুত ইমানের অধিকারী। আল্লাহর রাহে তোমার ভালবাসাকে নির্দ্ধিধায় উৎসর্গ করতে পেরেছি।
আমার একটা অনুরোধ রাখবে। কখনো কামনা করবে না যে, তোমার স্বামী জিহাদের ময়দান হতে অক্ষত অবস্থায় তোমার ভালবাসা ও আদরের কোলে ফিরে আসবে। জানি এতটা স্বার্থবাদি তুমি নও।

প্রিয়তমা,
দুনিয়ার সুখ সাচ্ছন্দ ক্ষনস্থায়ী। তবে মৃত‍্যুকে ভয় পাওয়ার কি অর্থ? মৃত‍্যু যখন সুনিশ্চিত। তখন তোমার কোলে বিছানায় পড়ে কেন মরবো ? শাহাদাতের মৃত‍্যু, মৃত‍্যু নয়। অনন্ত অনাদি সে জীবন। কার না লোভ নেই তাতে? ক্ষমা কর। আমি শাহাদাতের জন‍্য বড়ই লোভি। আমার প্রবল ইচ্ছা বাসনা শহীদ হওয়ার।

নীলা,
এবার তাহলে বিদায় নিচ্ছি। আমার মন বলছে যখন এ চিঠি তোমার হাতে পৌছবে। তখন আমার দেহ মাটিতে লুটাবে। কি আশ্চর্য ! আমার শাহাদাতের সময় তোমার অপুর্ব সুন্দর মুখ খানা দেখার অতৃপ্ত তৃষ্ণায় দেহ-মন ছটপট করবে !
তবে আমার অনুরোধ, তুমি কখনো ধৈর্য‍্য হারাবেনা। আমার শাহাদাতের সংবাদ তোমার কানে পৌছলে পেরেসান ও ব‍্যকুল না হয়ে বরং খুশি হবে। এটা হবে তোমার জন‍্য বড়ই গৌরবের।

সুহ্নদ বন্ধু
আর না, কলম তুলছি। আমার কল্পনা ও স্বপ্নের জগতে তোমাকে আলিঙ্গন করে তোমার কপালে চুম্বন দিচ্ছি। ইনশাআল্লাহ, জান্নাতে দেখা হবে। কথা দিচ্ছি তখন বিচ্ছিন্ন হব না। আল্লাহ হাফেজ।

নীলা অন্ধের মত দৌড়াল। নীলক্ষেত হতে বায়তুল মোকাররমে। তারপর জাতীয় ঈদগাহ মাঠ। শহীদদের সে মাঠে সমেবেত করা হয়েছে। এক এক করে সাতাশ জনের কফিন সাজানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের ভীর ঠেলে নীলা পাগলের মত প্রতিটি কফিন খুজতে লাগল। এক সময় খুজে পেল জিহান কে। ও জাতীয় ঈদগাহ মাঠকে ম্লান করে মিটিমিটি হাসছে। অম্লান বদনে চুপটি মেরে ঘুমের ভান করে শুয়ে আছে জান্নাতি খাটে। কি আশ্চার্য! বাসর ঘর ফেলে, নব বধুর গায়ের গন্ধ ছেড়ে জিহানটা স্বার্থবাদিদের মত চুপটি মেরে কোথায় শুইয়ে আছে। কি নির্বোধ? বেকুব ছেলেটা। পড়নে বিয়ের পাঞ্জাবটা। মাথায় মুকুট হীন। তবে একটা সাদা টুপি পড়ানো আছে। হলুদ মাখা মুখটাতে রক্ত লেগেছে। চুল গুলো এলোমেলো । দেখলে মনে হবে আস্ত একটা পাগল। পাগল না হলে কেউ কি এমনটা করে? নীলার ভিষন রাগ হল। ইচ্ছে করল, চপটাঘাত করে ওর কপোল দুটো লাল করে দিতে । কিন্তু পারলনা। মায়া হল। প্রচন্ড মায়া। বাধ‍্য হয়ে কিছুই করলনা। মনটা পাথরে পরিনত হল।
চোখে জল নেই। মুখে ভাষা নেই। নীলা ওর দু গালে দুহাত লেপে নির্বাক কতক্ষন তাকিয়ে রইল।

জানাযার জন‍্য লক্ষ মানুষের ভীর হল। গ্রাম হতে জিহানের ভাই-ভাবী ছুটে এসেছে। জিহানের বন্ধু সবুজ,অমিত, নীলার মামা-মামী সকলে এসেছে। সকলের কান্নার মাতমে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। ঝর ঝর করে চোখ জুরে গড়াল অশ্রু । জানাযা শেষে জিহানের পক্ষে শবদেহ গ্রহন করতে এগিয়ে এল নীলা। জিহানের ভাই ভাবীর অভিপ্রায় জিহানকে তার গ্রামে সমাহিত করবে। তাই হল শবদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হল। সাথে সবুজ গেল। নীলাকে তার মামা যেতে বারন করল। নীলাকে সাথে নিয়ে যেতে চাইল । মামা বলল, তুই গিয়ে কি করবি,কোথায় যাবি।ওখানে গেলে তোর মনের অবস্থার আরো অবনতি হবে। জিহানকে ভুলতে বড় কষ্ট হবে। সময় লাগবে। মামীর ভাষা তো বড়ই ট‍্যারা। যেন কাঁটা ঘায়ে নুনের ছিটা। সে বলল।” গাবুর আড়ি মাগি। নিজের ভাগ‍্যটাকে তো নিজে নিজে কুড়াল মারলি। ঢং কত মাগির? সোয়াং করে নিজে নিজে ভাতার ধরলু। এক দিনও ভাতার ধরি খাবার পালু না।”
নীলা সব তিরস্কার গঞ্জনা মুক বুঝে হজম করল। শব দেহের সাথে যেতে সে পা বাড়াল। সবুজ গাড়িতে উঠল। অমিত নিরব থাকতে পারলনা সেও যেতে পথ ধরল। গাড়ী ছুটছে ঢাকা ছেড়ে নীলফামারীর উদ‍্যেশে।দুরে শুভ্র মেঘ। নীল নীল গগন। সেই নীল এসে ভরে উঠল নীলার জীবন।