ত্বরা কেমন আছো?
আমি ভালো নেই। ক’দিন পর পর জ্বর আসে। ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়েছি।ডাক্তারের তাকানো ভঙ্গি দেখে মনে হয়েছে মারাত্মক কিছু। বোধ হয় ক্যান্সার ফ্যান্সার জাতীয় কিছু হবে। ডাক্তার সাহেব বলার সাহস পাচ্ছেন না।অথচ কি আশ্চর্য এমন একটি মারাত্মক অসুখের কথা শুনার জন্য আমি অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছি।মরতে তো একদিন হবেই। আগে কিংবা পরে। তাই না? জানো, ডাক্তার আমাকে বললেন আপনার কে আছে।পাঠিয়ে দিবেন। আমি বললাম, ত্বরা আমার ত্বরা আছে। কেন যেন আমার চোখ দু’টো জলে ভিজে গেলো। তোমার নাম মুখে নিতে আমার এতো কষ্ট কখনো হয়নি। কিন্তু আজকে কেন এতো কষ্ট হলো আমার। আমি জানিনা। ত্বরা পৃথিবীতে অনেক মানুষ জন্ম নেয় কষ্ট পেতে। আমি তাদের মধ্যে একজন। কষ্টে পাথর হয়ে গেছি আমি। কাঁদতে ভুলে গেছি আমি। কিন্তু আজ নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পাচ্ছি না। হাত দিয়ে দেখলাম সত্যিই চোখে পানি চলে এসেছে আমার। ত্বরার জন্য এতো ভালোবাসা আমার বুঝতে পারিনি। ত্বরা আমার চিঠি পেয়ে তুমি হয়তো ঘৃণা করবে।কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে দেবে হয়তো। সে কুচি কুচি কাগজগুলো কিছুক্ষণ উড়বে। তারপর ক্লান্ত হয়ে পরে যাবে মাটিতে। তবু এতোকিছু ভাবনার পরেও তোমাকে লিখতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছু। বলতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছু। হয়তো এটাই আমার শেষ চিঠি।
জানো, একদিন বাবাকে আবদার করে বলেছিলাম, আমার একটি নীল ডায়েরি চাই। বাবা কিনে দিলেন। আমার কাঁধে বাবা হাত রেখে বললেন, তোমার কোন আবদার কোন চাওয়া পাওয়াকে আমি অপূর্ণ রাখবো না। কিন্তু একটা শর্তে। তোমাকে সত্যিকার অর্থে একজন মানুষ হতে হবে। আজ বাবা নেই। বাবা থাকলে ভালই হতো। বাবাকে বলতাম এই নাও তোমার নীল ডায়েরি। আমার লাগবে না। আমি ভালো মানুষ হতে চাই না। ভালো মানুষ হওয়া মানে কষ্ট পাওয়া। আমি বখাটে ছেলেদের মতো সিগারেট খেয়ে গাজা খেয়ে রাস্তায় ছিটকে পরে থাকবো। ত্বরার মতো কোন মেয়ে জীবনটাকে এমন ভাবে নষ্ট করে দিতে পারবে না। কষ্ট দিতে পারবে না।
তুমি রাগ করলে ত্বরা? মৃত্যুর মুখোমুখি তো তাই অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করছে। প্লিজ তুমি রাগ করো না।
পৃথিবীটা খুব সুন্দর। এ সুন্দর পৃথিবীতে আমার মতো দুখী দুখী মানুষ না থাকাই ভালো। তাই বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছি তোমার সীমানা থেকে অনেক দূরে। ভালো থেকো।
আম্মু?
শিহরে উঠলো ত্বরা। হাত থেকে চিঠিটা পরে গেলো। ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় বললো, কি হয়েছে বাবা?
আমাকে একটি নীল ডায়েরি কিনে দিবে?
ত্বরার বুকটা কেঁপে উঠে। চশমার ভেতরে চোখ দু’টো ভিজে যায় তার। চশমাটা খুলে চোখ দু’টো শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নেয়। আলতো করে চশমাটাও মুছে নেয়। আজ এগারো বছর পূর্ণ হলো রোমেলের মৃত্যু।
আম্মু তুমি কাঁদছো কেন?
এমনি বাবা।
আমাকে নীল ডায়েরি কিনে দেবে না?
নিশ্চয় দেবো। তোমার কোন আবদার কোন চাওয়া পাওয়াকে আমি অপূর্ণ রাখবো না। তবে একটা শর্তে। তোমাকে সত্যিকার অর্থে একজন মানুষ হতে হবে।
আম্মু তোমার কি হয়েছে?
দু’ হাতে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে ত্বরা। সে কান্নার শব্দ শুনে অবুঝ শিশুটি মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে অবাক দৃষ্টিতে। কিছুই বুঝেনা সে।