কাপালিকের উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা

কাপালিক, তুমি পড়তে পার কিনা জানিনা।
জানিনা তোমার ইন্দ্রিয়ের সক্রিয়তা!
তবু তোমার উদ্দেশ্যে সতর্কবার্তা;
জানি মৃত্যুর নিঃশ্বাস আমার শিয়রে,
ভেবনা তুমি অনন্ত অসীম
তুমিও কয়েক প্রশ্বাসের পরে।

কাপালিক, তোমার শক্তি সাধনায় আর কত নরবলি?
সহস্র লাশের সোপান পেরিয়ে হয়েছিলে রাজা,
লক্ষ লাশের সিঁড়িতে হয়েছ মহারা্‌জ,
কায়েম করেছ ত্রাসের রাজত্ব।
মনে রেখ দেবতা হওয়ার এই শেষ ধাপ,
নরকঙ্কালের শিখরে রচিত হোক তোমার দেবত্ব।

কাপালিক, ভয় কর পুনরুত্থান দিবসের
সব ফরিয়াদ লিখে রাখা আছে-
মৃত মায়ের স্তনবৃন্ত খুঁজতে থাকা ক্ষুধার্ত শিশুর আর্তনাদ,
স্টেশনে পড়ে থাকা মৃত মায়ের পাশে অবুঝ শিশুর কান্না,
ধ্বংসস্তূপ থেকে নির্গত অনাথ শিশুর নালিশের সমাহার
সব লিখে রাখা আছে।

যে পা হাজার হাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরছে
সে পথ একদিন বেঁকে যেতেও পারে তোমার শক্তিপীঠে।
যে কৃষক আত্মহত্যা করেছে নিষ্প্রাণ ক্ষেতে
তার উত্তরাধিকারী কাস্তে হাতে নামতেও পারে রাজপথে।
যে কলম ছাত্রছাত্রীদের হাতে খুঁজছে শান্তির বার্তা
কাল তা মারণাস্ত্রের রূপ নিতেও পারে।

কাপালিক, সাবধান! ভয় কর পুনরুত্থান দিবসের।
একদিন রাজপথ কেঁপে উঠবে নিশ্চয়
একদিন সম্মিলিত আওয়াজে নড়ে উঠবে রাজপ্রাসাদের ভিত
একদিন প্রবল গর্জনে ভূমিস্মাৎ হবে শক্তিধাম-
নরকঙ্কালের পাহাড়ে যুক্ত হবে আরও একটি লাশ
কাপালিক সে তোমার!

কাপালিক, সব ফরিয়াদ লিখে রাখা আছে।
প্রতি নিঃশ্বাসের শেষে দেখা হবে পুনরুত্থান দিবসে;
মুখরিত ওষ্ঠ হবে ভাষাহীন
মৌন অঙ্গ হবে মুখরিত
সব কিছুর হিসেব নেওয়া হবে
যা ছিল গোপন, যা ছিল প্রকাশ্য।
…………………………………………..

সঠিক সময় এখনই

এখনই নীরবতা পালনের উপযুক্ত সময়,
ঘৃণার উর্বর জমিতে নীরবে নিভৃতে
প্রেমের বীজ বপনের উপযুক্ত সময়;
সকল দৃষ্টির অগোচরে দহনে দহনে
অফুরন্ত শক্তি সঞ্চয়ের উপযুক্ত সময়।
হাতে হাত রেখে মানব বন্ধনের উপযুক্ত
সময় এখনই; ইতিহাস নয়, ইতিহাস বদলে
দেওয়ার সঠিক সময় এখনই।

…………………………………………..

বোধোদয়ের অপেক্ষায়

দিন গুনছি বোধোদয়ের অপেক্ষায়-
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় মৃত্যু নামক অমোঘ
সত্য ছাড়া আর কিছু নাই।
দেশ ক্ষণিকের প্রতিশ্রুতি মাত্র
সময় বদলে দেয় তার সীমারেখা।

…………………………………………..

ধর্মীয় ইস্তাহার

ধানের ভুঁইয়ে শস্য দানার বদলে
পরে আছে ধর্মের দানা,
পাখিরা তাই খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে
এবং ধার্মিক হয়ে উঠছে।
ধর্মীয় ইস্তাহার ভাসছে ইথারে
মানুষ তা দিয়ে শ্বাস প্রশ্বাস নিচ্ছে
প্রতি কোশে কোশে ধর্মীয় শ্বসন
এবং নাক দিয়ে তা উপচে পড়ছে।
পোশাক-আশাকে ছাতা চপ্পলে
ধর্মের সুগন্ধ; রৌদ্র ছায়ায়
তমস জ্যোৎস্নায় ধার্মিকের ভিড়
অগ্রদূত বসন্তের পরিযায়ী।
মানুষের দল ক্রমশ নিঃসঙ্গ
প্রহর গুনছে বিপ্লব
ঝড়ের অপেক্ষায় নিষ্পলক প্রবাহ
আকস্মিক অশনিপাত।
…………………………………………..

নিঃসঙ্গ পতাকাবাহী

সামনে পতাকাবাহী নিঃসঙ্গ একাকী
পেছনে বজ্র-নির্ঘোষ স্লোগান
মাইল বিস্তৃত মিছিলের সারি
থাকার কথা ছিল, কিন্তু নেই।
স্লোগান হারিয়েছে জন কলরোলে
মিছিলের সারি মিশেছে জনস্রোতে।
পতাকাবাহী এগিয়ে চলেছে তবু
সামনে জয় অথবা নিশ্চিত মৃত্যু!

…………………………………………..

এবং তোমাকে

আমি ছুঁতে চাই তোমার হৃদয়
তোমার শরীর এবং তোমাকে।
স্মৃতি নয়, অনুভূতি নয়
ভালোবেসে চাই তোমাকে।
জীবনের দিন জীবিত থাক
পুষ্পিত হোক জীবনভর
শূন্যতা নয় বিষন্নতা নয়
পূর্ণতা পাক মরণোত্তর।
…………………………………………..

আমি নির্বাসন চাই

আমি নির্বাসন চাই
অন্তহীন নির্বাসন
মৃত্যুর পূর্বে অনুভব করে যেতে চাই
প্রকৃতির অভ্যন্তরে লুকানো বাসনা
সময়ের নিষ্পলক স্রোতে
ধান-মঞ্জরী চিবোতে চিবোতে
পার হয়ে যাওয়া দেশের সীমানা
কাঁচা রৌদ্রের ভিতর
প্রবাল-বর্ণ রডোডেনড্রন বন
দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়
ক্ষমতার সুপ্ত প্রলোভন।
আমি নির্বাসন চাই
অন্তহীন নির্বাসন।
মৃত্যুর পূর্বে অনুভব করে যেতে চাই
মৃত্তিকার অভ্যন্তরে সুপ্ত যাতনা।
সবুজ ভুঁইচাঁপার বুক্ল চিরে
পরিযায়ীদের উদ্ধত অভিমান
মনুষ্য চরিত্রের আদিম কামনা
সামাজিক বিষন্নতায়
রাষ্ট্রবিপ্লবের গান
স্বপ্নের আবর্জনায়
প্রতীক্ষার দুঃসাহসিক অভিযান
আমি নির্বাসন চাই
অন্তহীন নির্বাসন।
…………………………………………..

ইচ্ছেরা ধিকধিক জ্বলে

জানলা ও নৌকার মাঝে একখন্ড ভুঁই সবুজ ধানে ঢাকা
কদিন পর সোনা ঝরাবে সেখানে অপরাহ্নের আলো
শত চেষ্টাতেও লঙ্ঘন করতে পারিনা তার সীমারেখা
নৌকা বিহারের সুপ্ত বাসনা
গুমরে মরে হৃদয়ের অন্ধকার কোণে
সবুজের বেড়া টপকানো মুখের কথা নয়
পাটা লাগে ছাপান্ন খান্ডব দহনে
ইচ্ছেরা ধিকধিক জ্বলে
সোনালীর শেষে ফিরবে শূন্য উদাসীনতা
নির্বাধায় তরণী বইবে পরিযায়ীদের ভিড়ে।
…………………………………………..

একটি অরাজনৈতিক অধর্মীয় ইস্তাহার

আস্তাকুঁড়ে চার হাতপা বিশিষ্ট কিছু অবলা জন্তু এসে জুটেছে ছাগল কুকুরের দলে। হুবহু মানুষের মত দেখতে হলেও, ঠিক মানুষ নয়। সন্দেহ প্রবণ নাগরিক সমাজের একাংশ জানতে বড়ই উৎসুক তাদের পরিচয়।
একদল নাগরিক এগিয়ে এল- কোথা থেকে এসেছ? সঙ্গে আছে কোনও পরিচয়পত্র? ভোটার আধার প্যান? পশুরা তাকিয়ে রইল ফ্যাল ফ্যালে চোখে। – উঁহু গায়ে কি গন্ধ মাইরি, লাভ নেই এদের জিনিসপত্র ঘেঁটে। যাদের দেহে কাপড় নেই এক থান তাদের আবার পরিচয়পত্র! ফিরে এল ব্যর্থ মনোরথে।
একদল ধার্মিক এগিয়ে এল দ্বিগুন উৎসাহে- তোমাদের ধর্ম কী? ধর্ম মানো? কে তোমাদের সৃষ্টিকর্তা? ভগবান ঈশ্বর না আল্লাহ? প্রাণীরা তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যালে চোখে উদরে হাত বুলাতে বুলাতে। নরকের পথ দেখাতে দেখাতে ফিরে এল তারা ব্যর্থ মনোরথে।
এগিয়ে এল এবার রাষ্ট্রপ্রেমীর দল- বল দেখি জয় অমুক, জয় তমুক। ওদের উদাসীন চোখে বিস্ময়! রাষ্ট্রগান জান? জাতীয় সঙ্গীত? চতুষ্পদীরা তাকিয়ে রইল ফ্যালফ্যালে চোখে। কোলের শিশুকে আঁকড়ে ধরল বুকে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে।
রাজনৈতিক দলের কর্মীরা এগিয়ে গেল এবার, হাতে রঙিন কাপড়ের পতাকা। -তোমরা কোন দলের? ভোটের প্রতিশ্রুতি দিলে নাম তুলে দিব ভোটার লিস্টে। সঙ্গে রেশন কার্ডও। ফ্যালফ্যালে চোখে তাকিয়ে রইল ওরা পতাকার দিকে ও নিজেদের নগ্নতায়। ফিরে এল তারা অশুচি ব্যর্থতায় ।
একদল তথাকথিত সমাজসেবীর আবির্ভাব ঘটল লাঠি ডান্ডা হাতে। –কী মতলব তোদের? গোভক্ষণ? শূয়োর ভক্ষণ? কুকুর ভক্ষণ? জন্তুগুলো সিঁটিয়ে গেল ভয়ে, কাতর বিস্ময়ে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল সমাজসেবীর দল বিনা রক্তপাতে।
শেষ পর্যন্ত আগমণ ঘটল একদল মানুষের। হাতে খাদ্য ও বস্ত্রের থলি। হামলে পড়ল ন্যাংটো জন্তুর দল। মুখে তৃপ্তির ছায়া। খাবার শেষ করে পরস্পরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে থাকল পোশাকের থলির দিকে তাকিয়ে। নিশ্চিত প্রতীতি হল ওরা আসলে চার হাতপায়ের কোনও জন্তু না, ওরা মানুষ।
…………………………………………..

ইতিহাস হওয়া মুখের কথা নয়

মৃত অশ্বের ক্ষুর-ধ্বনি মুখরিত
অতীতের বিষন্ন বুক; ইতিহাসের
অন্ধকারতম খাদ থেকে উঠে আসে ক্ষমতা
ইতিহাস হওয়া মুখের কথা নয়
সাত সমুদ্র তেরো নদীর রক্ত
পেরিয়ে ইতিহাস হতে হয়।