নিখোঁজের শহরে

অতপর আমিও একদিন চলে যাবো নিখোঁজের দখলে।
তখন কি করবে শুনি
খুঁজবে বুঝি?
খুঁজো না।
নিখোঁজের শহরে তোমরা পৃথিবীবাসির নিয়ম খাটে না
খুব যদি মন খারাপ হয়,
বুকের ভেতর আমায় দেখার আকুতি
উথালপাতাল বন্যা বয়
তবে আগরবাতির ঘ্রাণে আমায় খুঁজে নিও।
নাহয় সবাই যেমনটা করে,
২ মিনিট নিরবতা পালনে চোখ বুজে নিও।
আচ্ছা, দুই মিনিটে আমায় নিয়ে কতখানি ভাবতে পারো?
কতখানি মাইল বা ক্রোশ পেরোতে পারো আমার স্মৃতির পথ।
দুই মিনিটে কতটা পূরণ হয় স্মৃতি রোমন্থনের শখ?
আর যায় করো,
আমায় ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলো না।
আমি তাতে সুখী হই এমনটাও ভেবো না।
বরং ওতে আমি উড়ে যাই খড়কুটোর মত।
তারচেয়ে দীর্ঘশ্বাসটাকে হৃদয়ে যত্নে রেখো আদুরে বেড়ালের মত।
আমায় ভেবে কিছুটা নোনা জল যদি ঘর ছাড়তেও চায়,
যেতে দিও না।
ওকেও বুকের মাঝেই রেখো।
সে জলে বাণের জলের মত ভেসে যাই।
তারচেয়ে বরং আগরবাতির ঘ্রাণেই আমায় খুঁজে নিও।
নাহয় সবাই যেমনটা করে,
দুই মিনিট নিরবতা পালনে চোখ বুজে নিও।
কয়েকশ কদম না হোক, কয়েক কদম স্মৃতি রোমন্থনের পথে হেটে এসো।
তারপর যেদিন তোমারো ভ্রমণ এসে ফুরোবে
নিখোঁজ শহরের মেইনগেটে,
আমি ঠিক খবর পাবো চেনা আগরবাতিরর ঘ্রাণে।
হাত পেতে বুঝে নেব তখন,
আমার পাওনা প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস ও নোনা জলের ফোঁটা
আমার নামে বুকের বাম অলিন্দে জমা করেছিলে যতটা!
…………………………………………..

বিশ্বাস ও বিশ্বাসীর

তবুও বেখেয়ালি মনে খুচরো পয়সার মত বিলি হয়ে যায় কিছুটা বিশ্বাস।
আর তাতেই লোভে লকলকিয়ে ওঠে ঘাতকের লুকোনো জিভ ।
উত্তেজনায় ঘন হয়ে আসে নিঃশ্বাস।
ওরা ছুটে আসে ক্ষুধার্ত নেকড়ের মত।
ক্ষুধায় কাতর ওরা বিশ্বাস কুঁড়িয়ে নেয়, নুড়ি পাথরের মত।
হয়ে ওঠে বিশ্বাসী।
তারপর ছোট ছোট বিশ্বাসের গোড়ায় জল ঢালে।
খুচরো বিশ্বাসগুলো একদিন আকাশ ছোঁয়!
আমি সুখি হই।
কৃতজ্ঞতা জানাই বিশ্বাসীদের।
বীভৎস হাসি হেসে ওরা তখন নিজেদের খোলস পাল্টায়।
অতপর বিশ্বাসীর মরা চামড়া উড়িয়ে দেয় কবুতরের ডানায়
শ্বাসরোধে হত্যা করে নিষ্পাপ বিশ্বাসীদের।
অসহায় রাখাল আমি দেখে যাই
কেমন করে অন্তিম শ্বাস ফেলে আমার আদুরে বিশ্বাসগুলো।
দিন শেষে বিশ্বাসঘাতকেরা মিশে যায় সূর্যের লাল আলোয়
পেছনে আমি আর আমার মৃত বিশ্বাস পড়ে রই তপ্ত ধুলোয়।
আমি দেউলিয়া হই
আমি আরও সাবধানী হই।
আমি সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত হয়ে পড়ি
বিশ্বাসের বাজারে আমি কৃপণতা করি
দিন শেষে সেই নির্দয় ভাবে আবারও বিলি হয়ে যায় কিছু খুচরো বিশ্বাস!
…………………………………………..

দূরত্ব

যদিও খুব সাবধানে, আঙ্গুলে আঙ্গুলে হয়নি ছোঁয়া অসাবধানতার দায়ে
অঙ্গুলের পিঠে কতটা লোম হয়নি গণনা খেলার ছলে।
চোখে চোখ রেখে হয়নি খেলা পলক না ফেলার খেলা।
এমন করে হয়নি খেলা কোনরকম খেলা।
প্রিয় সবুজ বিন্দুটির আসায় কাটত বেলা।
তুমি আমি অনেক দূরে সূর্য যেখানে সমুদ্রের জলে গলে গলে পড়ে,
ঠিক সেখানে তুমি বৈকালিক ভ্রমণে বের হও।
অতপর সমুদ্রের তলদেশে সূর্যের জলসায় তুমি আমন্ত্রিত অতিথি।
আর আমি,
বিকেল তাড়াতে অপরাজিতা গাছটায় নীল কতটা গাঢ় হলো সেই গবেষণায় ব্যস্ত ভীষণ।
ভেবে দেখ তুমি আমি কত দূরে।শব্দহীন, ভাষাহীন।কেউ জলসায় মাতে,কেউ ফুলে ভাসে।
জানো কি তবু আমার ভেতর দাপটে বেড়ায় তোমার একনায়কতন্ত্র শাসন!
…………………………………………..

হিসেবের হালখাতা

আর দু ফোঁটা চোখের জলে এত আপত্তি কিসের,
আড়ালেই যখন হারিয়ে যায় অজস্র অশ্রুক্ষয়ের হিসেব।
আর দু দণ্ড সঙ্গদানে,
হৃদয়ের অনুভূতি ব্যক্তকরণে, এত আগ্রহ কেন?
তুমিহীনতায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয় অনুভূতির ফোয়ারা!
বলতে পারো অবহেলায় মানুষ মরে কেন?
আমি কাদলেই বা তুমি কাদ কেন?
আমার মন খারাপে বা তোমার মনে ব্যথার প্রাচীর জমে কেন।
তবে আড়ালেই যত মন খারাপের ইটে তৈরি হল ব্যথার প্রাচীর
তুমি নামের অসুখে যখন ব্যথার ক্ষত হল ভীষণ গভীর
তখন চোখের জলে নিজের ঘুম নাই বা হারালে।
সব ক্ষতস্থানের তো ব্যথানাশক থাকে না
ওসবে আপত্তি আর নাই বা জানালে।
অপ্রয়োজনীয় অনুভূতির ফোয়ারায় আর ডুব দিও না
আর খেলো না জোয়ার ভাটার খেলা
হিসেবের খাতায় থাকুক শুধু ভাটার হিসেব ভরা।
…………………………………………..

আনন্দ

জানিস আনন্দ,
এখানেও বৃষ্টি হয়।
বৃষ্টি হয় বটে, তবে কেমন যেন
বলতে পারিস এমন কেন
তোর আমার পৃথিবীতে যেমন করে ঝুমঝুমিয়ে বৃষ্টি নামত।
কাচা মাটির ঘ্রাণে বুকের ভেতর ভীষণ সুখের বন্যা বইত,
এখানে ঠিক তেমনটা নয়,
যেন কর্তব্যের তাগিদে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও দুয়েক ফোঁটা আনাড়ি ধাঁচের বৃষ্টি নামে।
আনন্দ,
তোর কি মনে পড়ে, দু কোটি বছর আগেও বৃষ্টিতে ভেজা সেই রূপকথার দিন?
সেই বৃষ্টিতে কত রঙ হত, লাল,নীল, হলুদ আরও কত রঙ!
একটি রঙ ছিল একেবারে ভিন্ন, আমরা নাম দিলাম
হৃদয়ের রঙ।
জানিস আনন্দ,
এখানে বৃষ্টিতে কোন রঙ নেই।
শুধু কি রঙ? রূপ, রঙ, গন্ধ, স্বাদ কিছুই নেই।
তারচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার হলো, এখানে বৃষ্টিতে কোনো আনন্দ নেই।
যে বৃষ্টিতে আনন্দ নেই,
সে বৃষ্টিতে রূপ, রঙ, গন্ধ কি করে আসে বল?
এমন সৃষ্টিছাড়া বর্ষণে কেমন করেই বা ভিজাই লালপেড়ে আচল
আনন্দ,
তোর কি সত্যিই মনে পড়ে না দু কোটি বছর আগে বৃষ্টিতে ভেজা সেই রূপকথার দিন?
তখন বৃষ্টিতে শুধু কি শরীর ভিজত?
বৃষ্টির ফোঁটায় তখন মগজ ভিজত
ভিজে একসার হত ফুসফুস,কিডনি আর ভালোবাসার যন্ত্র।
বিশ্বাস করবি না আনন্দ,
এধারে কৃপণ বৃষ্টির দু ফোঁটা জল, আগুনের তাপে ঝলসে যায়।
আনন্দ,
দু কোটি বছর আগের কোন রূপকথাই কি তোর মনে পড়ে না?
অন্তত বৃষ্টিতে ভেজার সেই প্রস্তুতির কথা?
তোর চোখে মুখে থাকত বৃষ্টি বিলাসের বাহানা।
আর কাজলের কালোতে আমি আঁধার করে নেই
চোখের সীমানা।
অস্বীকার করতে পারবি, সে চোখের চাহনি কখনো এড়াতে পারিস নি।
অস্বীকার করতে পারবি সে পবিত্র মুহূর্তের কথা?
সে মুহূর্তে পাক পারওয়ারদিগার ও বুলায় মহব্বতের নজর।।
আসলে কি হয়েছে জানিস,
এখানে কোন কিছুতেই অমন করে প্রস্তুতি নেই না।
আর বৃষ্টিতেও খুব একটা ভেজা হয় না।
হয়ত সর্দি, কাঁশির ভয়ে।
কি বিশ্বাস হয় না বুঝি?
আসলে ঠিক সর্দি কাশির ভয়ে না,
হয়ত বুড়িয়ে যাচ্ছি,
আসলে ঠিক তাও না।
আসলে জানি না কেন।
কোন কিছুতেই কেমন যেন আনন্দ পাই না।
…………………………………………..

মন খারাপের অবেলা

ঝুম নিঝুম শীতের রাত।
২-৩ ফোঁটা শিশির শুধু খেলছে খেলা পাতায় পাতায়।
কি যন্ত্রণা!
এতো মন খারাপের অবেলা।
চোখ মেললেই এরা খেলে টুক পলানতিস
দেখতে যাই তো লুকিয়ে পড়ে
চোখ বুঝলে খেলে চোর পুলিশ
যতই ছুটি, এরা তবু তাড়া করে।
পাঠ্য বইয়ের সাথে আজ আমার আর সখ্যতা নেই।
ডায়েরীতে শুধু লিখছি লেখা, করছি কাব্য
আটকে আছি এই নেশাতেই
মন বলে,
থামাবে না আজ আর কাব্য লেখা
ছন্দ শুধু ভেবে যাও, ভাবতে থাকো।
পৃথিবীর নিয়মে আজ চলবে না তুমি-করবে না কোন
পড়াশোনার আয়োজন।
ভাবনায় আজ শুধু থাকবে তুমি-
কবিতায় আজ শুধু থাকবে তুমি।
ভাবনা-কবিতা কবিতা-ভাবনায় করবে তুমি রাত্রি যাপন
অবশেষে যখন ক্লান্ত তোমার মন, ক্লান্ত হাতে যখন নড়ছে না আর কলম,
বন্ধ কর কাব্য লেখা- ছিঁড়ে ফেলো ভাবনা – কবিতা কবিতা- ভাবনার স্বপ্নের জ্বাল
আর জীবনে যত রেখেছ কঠিন প্রতিজ্ঞা, কত নিজের কাছে
এমনি করে ভুরি ভুরি,
ভেঙে ফেল, ভুলে যাও, মুছে দাও এত প্রতিজ্ঞা।
এত প্রতিজ্ঞা রাখতে নেই, রেখো না তুমি, রাখবে না তুমি, কেনইবা রাখবে তুমি?
এবার দেখো, বই ছাপা হরফগুলো আর খেলছে না খেলা মজার খেলা।
চলে গেছে, নেই নেই নেইতো আর –
মন খারাপের অবেলা
আর দেখো, কি সুন্দর স্বর্গীয় মুহূর্তইই না সৃষ্টি করেছে,
রাতের এই পিনপতন নীরবতা!
…………………………………………..

দৃষ্টিভঙ্গি

একরাশ ধুলো এসে ওর চোখের পাপড়িতে জমি দখল করে নেয় পরম নির্ভরতায়।
ও বুঝি জানতেই পারেনি সেকথা
কারণ দিনগুলি কাটে ওর নিদারুণ ব্যস্ততায়।
ওকে দেখে আমি দ্বিধাগ্রস্ত হই
এ চোখ মানুষের না ঈগলের?
নইলে দু চোখের ক্ষিপ্রতায় হাজার মানুষের ভীড়ে কেমন করে বেছে নেয় নিজের টার্গেটদের।
ও টার্গেটদের কাছে আসতে ডাকে।
ডাকে যেন কেমন করে,
হ্যামিলনের বাঁশি বাজত বুঝি এমন করে।
সে ডাক এড়ানোর সাধ্য বুঝি কারো নেই।
একরাশ ধুলো এসবই বসে বসে দেখে স্তব্ধ হয়ে।
ওরা শুনে, ছেলেটি বলে বোনের অঙ্ক খাতা, মায়ের ঔষুধ আর ইদানিং বাবা খুব কাঁশে।
আর আমি শুনি,
এই টঙ্গি আগে, টঙ্গি আগে, টঙ্গি আগে।
…………………………………………..

কৃষ্ণকলি

বালিকার কৃষ্ণ দেহে দৃষ্টিপাত মাত্রই পিতা-মাতার যে বিরক্তি আর বিবাহ সম্পর্কিত দুশ্চিন্তা জাগিয়া উঠে’
তাহা অবলোকন করিয়াও বালিকা নিরবে সহ্য করে।
মাতার আনিয়া দেওয়া গাত্রোজ্জ্বল করিবার বিভিন্ন ফেসিয়াল প্যাক ও কৃষ্ণদেহের অভিশাপ ঘোচাইতে গ্রহণ করে। রূপবতীদের কটুক্তি করিয়া বলা “তুমি কালো হইলেও কিউট আছো “
কথাখানিও সে নিরবে শ্রবণ করে।
কৃষ্ণচর্মের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখিয়া,
কাহারো সহিত যাচিয়া আলাপ করিবার স্পর্ধাও সে দেখায় নাই।
পাছে কেহ ভাবিয়া বসে, বালিকাটি নিতান্তই বেহায়া।
তথাপি সতর্ক দৃষ্টিতে ক্লান্তি নামিয়া আসিলে, অসতর্কতার অশুভ লগ্নে,
কাহারো সহিত যাচিয়া আলাপচারীতার স্পর্ধায় মাতিলে,
চতুর্দিক হইতে জনতা বলিয়া উঠে, বালিকাটি নিতান্তই বেহায়া।
এরূপ কৃষ্ণকায় চর্মের অধিকারিণী হইয়াও, কি করিয়া আলাপচারিতার স্পর্ধা দেখাইলে।
মূহুর্তেই বালিকার হৃদয়ে আত্মঘৃণার আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিয়া উঠে।
আর দুই নয়ন সম্মুখে, আর একখানি দৃশ্য ভাসিয়া উঠে।
রূপবতী মেয়ের যাচিয়া আলাপচারীতা দেখিয়া এই জনতাই বলিয়াছিল,
বালিকাটি বড়ই মিশুক।
আর কি রূপ, যেন বাহিয়া বাহিয়া পড়ে।
কৃষ্ণদেহের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া, সাশ্রুসজলনেত্রে বালিকা তাহাও সহ্য করিল।
…………………………………………..

পরিবর্তন

নতুন রঙের প্রলেপে বুঝি হারিয়ে
রঙচটা দেয়ালের ইতিহাস।
আশ্বাস দিতে
এইতো আসছি,উফ ভীষণ জ্যাম,লক্ষীসোনা রাগ করো না
এইতো আর মিনিট পাঁচ।
মিনিট পাঁচের হিসেব বোঝতো?
রঙচটা দেয়ালটি জানতো,
মিনিট পাঁচেকে
আঙুলের কারসাজি
কেমন করে আলগা করে রঙের ছোঁয়া।
দেয়ালে আজ নতুন রঙ,
অফ হোয়াইট শেডের কাচা রঙে হাত রাখায় দায়।
এখনো বুঝি সেই আশ্বাস,
এইতো আর মিনিট পাঁচ।
নতুন ঘর নতুন সময়
মিনিট পাঁচেকের ঘড়ির কাঁটা ঘণ্টাখানেকে ফুঁরোয়।
ইদানিং নতুন আশ্বাস,
আসতে দেরি হবে ঘুমিয়ে পড়ো।
সেই রঙচটা দেয়ালে এসেছে নতুন জৌলুস।
নড়বড়ে চৌকিটা নেই
অথচ সেগুন কাঠের নতুন খাটেও ঘুম নেই।
ভীষণ কায়দায় দাঁড় করানো আয়নাখানা নেই।
অথচ বিউটি প্রোডাক্টসে ভর্তি নতুন ড্রেসিং টেবিলে চোখ সাজানোর স্বাধ নেই।
এখন আর আঙুলের কারসাজিতে ঘষে পড়ে না রঙের ছাপ,
বরং রাত বারোটার বন্ধুর সাথে জমে উঠে মুখরোচক চ্যাটিং।
আহ স্বপ্নের জীবন।
অফহোয়াইট শেডের দেয়ালটায় স্বপ্ন স্বপ্ন রং ছড়ায় ড্রিম লাইট,
আইফোনে ভেসে উঠে ছোট্ট বার্তা
এ সপ্তাহে আসছিনা
নেক্সট উইকে ফ্লাইট।