সৈয়দ শামসুল হক :: বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে
শামসুর রাহমান :: ইলেকট্রার গান
আল মাহমুদ :: নিশিডাক
শহীদ কাদরী :: হন্তারকদের প্রতি
নির্মলেন্দু গুণ :: আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো
মোহাম্মদ রফিক :: ব্যাঘ্রবিষয়ক
মুহম্মদ নূরুল হুদা :: হে বাঙালি যিশু
মহাদেব সাহা :: কফিন কাহিনী
জাহিদুল হক :: স্মৃতি
খোন্দকার আশরাফ হোসেন :: স্বাপ্নিকের মৃত্যু
ফারুক নওয়াজ :: তুমিই সত্য
মাৎসুও শুকুইয়া :: বাংলাদেশের স্থপতি : অনুবাদ অর্জিতা মাধুর্য
আসলাম প্রধান :: বঙ্গবন্ধু
হুমায়ূন কবীর ঢালী :: তিনি
লড়াইয়ের অপর নাম স্বাধীনতা :: আফসার নিজাম
তাপস বিশ্বাস :: তুমি ভেবো না পিতা
শেখ একেএম জাকারিয়া :: ছবি
সৌমেন দেবনাথ :: পনেরো আগস্টের এলিজি
মিশকাত উজ্জ্বল :: পনেরো আগস্ট
শ্যামসুন্দর সিকদার :: পনেরো আগস্টের শক্তি
……………………………………………

সৈয়দ শামসুল হক
বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে

এই পৃথিবীতে আর আকাশ দেখিনি আমি এতো অবনত
ঘুমন্ত শিশুর মুখে যেন চুমো খাবে পিতা নামিয়েছে মুখ;
প্রান্তর এতোটা বড় যেন মাতৃশরীরের ঘ্রাণলাগা শাড়ি;
আদিকবি পয়ারের মতো অন্তমিল নদী এতো শান্তস্বর;
এতোই সজল মাটি কৃষকের পিঠ যেন ঘামে ভিজে আছে;

যদিও বৃষ্টির কাল নয় তবু গাছ এতো ধোয়ানো সবুজ;
দেখিনি এমন করে পাখিদের কাছে ব্যর্থ ব্যাধের ধনুক
মানুষের কাঁধটিকে বৃক্ষ জেনে বসে তারা এতো স্বাভাবিক;
এ কেমন? এমনও কি ভিটে হয় কারো এই পৃথিবীতে যার
বাড়ির গভীরে আছে সকলের বাড়িঘর এতোখানি নিয়ে;
এভাবে ওলান থেকে অবিরল দুধ ঝরে পড়ে যায় এতো
শব্দ কোন গ্রামে আমি কোন বিবরণের আর কখনো পাইনি;
কোথাও দেখিনি আর একটি পল্লীতে এতো অপেক্ষায় আছে
রাখালের মতো তার গ্রীবা তুলে মানুষের স্বপ্নের সময়।
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এলো এই পল্লীটিতে।
সকল পথের পথ পল্লীটির দিকে অবিরাম ঘুরে গেছে
গিয়েছিল একদা যখন এই পল্লীটির কালো মাটি থেকে
একটি নতুন শিশু উঠে এসেছিল, আর এই পল্লীটিরই
পাশ দিয়ে মাটির দুধের মতো বহে যাওয়া নদীটিতে নেয়ে
ক্রমে বড় হয়েছিল আর চেতনার কামারশালায় বসে
মানুষের হাতুড়ি নেহাই লোহা প্রযুক্তির পাঠ নিয়েছিল,
সকল পল্লীকে তার আপনার পল্লী করেছিল। সেই তাঁরই
টগবগে দীর্ঘদেহ ছিল, মানুষ দেখেছে দেখেছিল তাঁকে
বাংলার বদ্বীপব্যাপী কংকালের মিছিলের পুরোভাগে, তাঁকে
দেখেছিল চৈত্রের অগি্নতে তারা, আষাঢ়ের বর্ষণের কালে,
মাঘের শীতার্ত রাতে এবং ফাল্গুন ফুল যখন ঝরেছে,
যখন শুকিয়ে গেছে পদ্মা, আর যখন সে বিশাল হয়েছে;
যখন ষাঁড়ের ক্ষুর দেবে গেছে আর মাটি রক্তে ভিজে গেছে,
যখন সময়, আর ঘরে ঘরে দুর্গ তৈরি শুরু হয়ে গেছে
এখানে এসেছি যেন পথই টেনে নিয়ে এলো এই পল্লীটিতে।
টেনে নেবে পথ; যদিও অনেকে আজ পথটিকে ভুলে গেছে,
যদিও এইতো দেখি, কন্টিকারী ফেলে ফেলে পথটিকে কেউ
পথিকের জন্যে বড় দুর্গম করেছে এবং যদিও জানি
কেউ কেউ আমাদের পথের সম্বল সব খাদ্যপাত্রগুলো
মলভাণ্ডরূপে আজ ব্যবহার করে; বিষ্ঠায় পতিত হবে
অচিরে তারাই; আমি করতল থেকে খুঁটে খাবো; সঙ্গ দেবে
আমাদেরই পথের কবিতা; আমাদের প্রধান কবিকে যারা
একদিন হত্যা করে তাঁর জন্মপল্লীটিতে মাটিচাপা দেয়
কতটুকু জানে তারা, কত ব্যর্থ? জেগে ছিল তাঁর দুটি হাত,
মাটি গভীর থেকে আজো সেই হাত পুরানোকথার মতো
স্মৃতির ভেতর থেকে উচ্চারণমালা, নদীর গভীর থেকে
নৌকোর গলুই, পথিকের পদতল কাঁটায় রক্তাক্ত যদি,
সেই রক্ত শোধ হোক তাঁর কাছে ঋণ; মানব প্রসিদ্ধ কৃষি
খুব ধীরে কাজ করছে; পাখিরা নির্ভয়; আর আমিও পৌছেছি;
আমারই ভেতর-শস্য-টেনে নিয়ে এলো আজ আমারই বাড়িতে।
……………………………………………

শামসুর রাহমান
ইলেকট্রার গান

শ্রাবণের মেঘ আকাশে আকাশে জটলা পাকায়
মেঘময়তায় ঘনঘন আজ একি বিদ্যুৎ জ্বলে।
মিত্র কোথাও এশপাশে নেই, শান্তি উধাও;
নির্দয় স্মৃতি মিতালী পাতায় শত করোটির সাথে।
নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ।

সে কবে আমিও স্বপ্নের বনে তুলেছি গোলাপ,
শুনেছি কত যে প্রহরে প্রহরে বনদোয়েলের ডাক।
অবুঝ সে মেয়ে ক্রাইসোথেমিস্ আমার সঙ্গে
মেতেছে খেলায়, কখনো আমার বেণীতে দিয়েছে টান

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন্, কবরে শায়িত আজ।

পিতৃাভবনে শুনেছি অনেক চারণের গাথা,
লায়ারের তারে হৃদয় বেজেছে সুদুর মদির সুরে।
একদা এখানে কত বিদূষক প্রসাদ কুড়িয়ে
হয়েছে ধন্য, প্রধান কক্ষ ফুলে ফুলে গেছে ছেয়ে।

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ।

প্রজাপতি খুশী ফেরারী এখন, বিষাদ আমাকে
করেছে দখল; কেমন বিরুপ কুয়াশা রেখেছে ঘিরে।
রক্তের ডাকে দিশেহারা আমি ঘুরি এলোমেলো,
আমার রাতের শয্যায় শুধু কান্নার স্বাক্ষর।

নিহত জনক, এ্যাগামেমনন, কবরে শায়িত আজ।

সেইদিন আজো জ্বলজ্বলে স্মৃতি, যেদিন মহান
বিজয়ী সে বীর দূর দেশে থেকে স্বদেশে এলেন ফিরে।
শুনেছি সেদিন জয়ঢাক আর জন-উল্লাস;
পথে-প্রান্তরে তাঁরই কীর্তন, তিনিই মুক্তিদূত।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

নন্দিত সেই নায়ক অমোঘ নিয়তির টানে
গরীয়ান এক প্রসাদের মতো বিপুল গেলেন ধসে।
বিদেশী মাটিতে ঝরেনি রক্ত; নি বাস্তভূমে,
নিজ বাসগৃহে নিরস্ত্র তাঁকে সহসা হেনেছে ওরা।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

আড়ালে বিলাপ করি একা-একা, ক্ষতার্ত পিতা
তোমার জন্যে প্রকাশ্যে শোক করাটাও অপরাধ।
এমনি কি, হায়, আমার সকল স্বপ্নেও তুমি
নিষিদ্ধ আজ; তোমার দুহিতা একি গুরুভার বয়!

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

মাথার ভেতরে ঝোড়ো মেঘ ওড়ে, আমি একাকিনী
পিতৃভবনে, আমার কেবলি শোক পালনের পালা।
পিতৃহত্যা চারপাশে ঘোরে, গুপ্তচরের
চোখ সেঁটে থাকে আমার ওপর, আমি নিরুপায় ঘুরি।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

কখনো কখনো মাঝরাতে আমি জেগে উঠে শুনি
পায়ের শব্দ, আস্তাবলের ঘোড়ার আর্তনাদ।
শিকারী কুকুর ঘরের কপাট ঠ্যালে অবিরত,
আমার রক্তে দাঁত-নখ তার সিক্ত করতে চায়।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

যতিদিন আমি এই পৃথিবীতে পত্যহ ভোরে
মেলবো দুচোখ, দেখবো নিয়ত রৌদ্র-ছায়ার খেলা,
যতিদন পাবো বাতাসের চুমো, দেখবো তরুণ
হরিণের লাল, ততদিন আমি লালন করবো শোক।

নিহত জনক এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

অন্ধের দেশে কে দেবে অভয়? ভাই পরবাসে;
যে নেবে আমার মহা দায়ভাগ, তেমন জীবনসঙ্গী কই?
কেমন ছাদের নিচে সহোদর ছেড়ে তার রুটি?
কোন প্রান্তরে ওড়াচ্ছে ধুলি ওয়েস্টেসের ঘোড়া?

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

কান পেতে থাকি দীপ্র কন্ঠ শোনার আশায়,
কাকের বাসায় ঈগলের গান কখনো যায় কি শোনা?
ক্রাইসোথেমিস, অবুঝ তন্বী, দূরে সরে থাকে,
চিকচোন্মুখ শরীরে এখন লায়ারের ঝংকার।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

আমার উপমা দাবানলে- পোড়া আর্ত হরিণী;
মৃতের মিছিল খুঁজি দিনরাত, আঁধারে লুকাই মুখ।
করতলে কত গোলাপ শুকায়, ঝরে জুঁই, বেলী;
আমার হৃদয়ে প্রতিশোধ জ্বলে রক্তজবার মতো।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

পারবো না আমি হানতে কখনো ক্রূর তরবারি,
যদিও ক্ষুদ্ধ হৃদয় আমার, প্রতিশোধ জপমালা।
আত্মশুদ্ধি ঘটে যায় যদি দেখি সন্ধ্যায়
উড়ন্ত দু’টি সারস কী সুখে নদীটি পেরিয়ে যায়।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।

যে যেমন খুশি যখন তখন বাজারে আমাকে
নানা ঘটনায় ষড়জে নিখাদে, আমি কি তেমন বাঁশি?
কন্টকময় রপ্তপিপাসু পথে হাঁটি একা;
আমার গ্রীবায় এবং কন্ঠে আগামীর নিশ্বাস।

নিহত জনক, এ্যাগামমনন্, কবরে শায়িত আজ।
……………………………………………

আল মাহমুদ
নিশিডাক

তার আহবান ছিলো নিশিডাকের শিসতোলা তীব্র বাঁশীর মত।

প্রতিটি মানুষের রক্তবাহী শিরায় কাঁপন দিয়ে তা বাজত
নদীগুলো হিসহিস শব্দে অতিকায় সাপের মত ফণা তুলে দাঁড়াতো
অরণ্যের পাখিরা ডাকাডাকি করে পথ ভুলে উড়ে যেত সমুদ্রের দিকে।

সে যখন বলল, ‘ভাইসব।’
অমনি অরণ্যের এলোমেলো গাছেরাও সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গেল
সে যখন ডাকলো,‘ভাইয়েরা আমার।’
ভেঙ্গে যাওয়া পাখির ঝাঁক ভীড় করে নেমে এল পৃথিবীর ডাঙায়
কবিরা কলম ও বন্দুকের পার্থক্য ভুলে হাঁটতে লাগলো
খোলা ময়দানে।

এই আমি
নগন্য এক মানুষ
দেখি, আমার হাতের তালু ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে
এক আগুণের জিহবা।

বলো, তোমার জন্যই কি আমরা হাতে নিইনি আগুন?
নদীগুলোকে ফণা ধরতে শেখায় নি কি তোমার জন্য–
শুধু তোমার জন্য গাছে গাছে ফুলের বদলে ফুটিয়েছিলাম ফুলকি,
আম গাছে গুচ্ছ গুচ্ছ ফলেছিল
গ্রেনেড ফল। আর সবুজের ভেতর থেকে ফুৎকার দিয়ে
বেরিয়ে এল গন্ধকের ধোঁয়া। আহ্
আমি এখন আর চোখ মেলতে পারছি না।।
……………………………………………

শহীদ কাদরী
হন্তারকদের প্রতি

বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোন উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবেনা।
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম,
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলাভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলার মানুষ

এর চেয়ে ভয়াবহ কোন কথা আমি আর শুনবোনা কোনদিন।
……………………………………………

নির্মলেন্দু গুণ
আগস্ট শোকের মাস, কাঁদো

এসেছে কান্নার দিন, কাঁদো বাঙালি, কাঁদো।
জানি, দীর্ঘদিন কান্নার অধিকারহীন ছিলে তুমি,
হে ভাগ্যহত বাংলার মানুষ, আমি জানি,
একুশ বছর তুমি কাঁদতে পারোনি। আজ কাঁদো।
আজ প্রাণ ভরে কাঁদো, এসেছে কান্নার দিন,
দীর্ঘ দুই-দশকের জমানো শোকের ঋণ
আজ শোধ করো অনন্ত ক্রন্দনে।

তোমার বক্ষমুক্ত ক্রন্দনের আবেগী উচ্ছ্বাসে
আজ ভেসে যাক, ডুবে যাক এই বঙ্গীয় বদ্বীপ।
মানুষের ত্রকত্রিত কান্না কতো সুন্দর হতে পারে,
মানুষ জানে না। এবার জানাও। সবাই জানুক।
মাটি থেকে উঠে আসা ঝিঁঝির কান্নার মতো
তোমাদের কল্লোলিত ক্রন্দনের ধ্বনি শুনুক পৃথিবী।
কাঁদো, তুমি পৃথিবী কাঁপিয়ে কাঁদো আজ।

কান্নার আনন্দবঞ্চিত, হে দুর্ভাগা দেশের মানুষ,
তুমি দুধ না-পাওয়া ক্ষুধার্ত শিশুর মতো কাঁদো,
তুমি ভাই-হারানো নিঃসঙ্গ বোনের মতো কাঁদো,
তুমি পিতা-হারানো আদুরে কন্যার মতো কাঁদো,
তুমি জলোচ্ছ্বাসে নিঃস্ব মানুষের মতো কাঁদো,
তুমি সদ্যপ্রসূত মৃত-সন্তানের জননীর মতো কাঁদো,
যুবক পুত্রকে কবরে শুইয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে আসা
বৃদ্ধ পিতার মতো তুমি উঠানে লুটিয়ে পড়ে কাঁদো।
যখন কাঁদতে চেয়েছিলে তখন কাঁদতে না-পারার
অসহায় ক্ষোভে, বেদনায় তুমি অক্ষমক্রোধে কাঁদো।

একুশ বছর পরে আজ মেঘ ফুঁড়ে উঠেছে মুজিবসূর্য
বাংলার আকাশে; উল্লাসে নয়, কান্নার মঙ্গলধ্বনিতে
আজ আবাহন করো তারে। কাঁদো, বাঙালি, কাঁদো।
এসেছে কান্নার দিন মুজিববিহীন এই স্বাধীন বাংলায়।

আজ উৎপাটিত বটপত্রের শুভ্র-কষের মতো
চোখ বেয়ে ঝরুক তোমার অশ্র“বিন্দুরাশি।
আজ কাটা-খেজুর গাছের উষ্ণ রসের মতো
বুকের জমানো কান্না ঝরুক মাঠির কলসে।
একুশ বছর পর, আজ এসেছে আগস্ট।

আগস্ট ইজ দি ক্রুয়েলেস্ট মান্থ……
আগস্ট শোকের মাস, পাপমগ্ন, নির্মম-নিষ্ঠুর,
তাকে পাপ থেকে মুক্ত করো কান্নায়, কান্নায়।
……………………………………………

মোহাম্মদ রফিক
ব্যাঘ্রবিষয়ক

আগস্টের পনেরো তারিখ উনিশ শ’ পঁচাত্তর;
অতর্কিত শিকারির পদশব্দে অরণ্য শঙ্কিত
বাদুড়ের ডানার ঝাপ্টায় গজারীর মৃত পাতা
খসে পড়ে, বনের গোপন সঙ্কেতে সচকিত
হরিণ-হরিণী, কাক কা-কা, ইতস্তত রাইফেলের
প্রক্ষিপ্ত-উন্মত্ত গুলি, বিঘ্নিত বেজির সহবাস;
বাঘের দু’চোখ বিদ্ধ সার্চলাইটে, হটে না এগোয়
আহত প্রচণ্ড ক্ষোভ আলোর চাতুর্যে মানবিক
ছলনায়, শাসায় মৃত্যুকে, জানে এই বেঁচে থাকা
শিকারির আক্রমণে অরণ্য শঙ্কিত অযথাই;
দীর্ঘদেহী সুন্দরী গরান শাল অতন্দ্র সেগুন
পাহারায়, নিজস্ব শাবকগুলো দুঃখে আঁচড়ায়
নখ, ফোঁসে; প্রমত্ত গর্জনে সাড়া তুলবে অকস্মাৎ;
বাঙালির শুদ্ধ নাম শেখ মুজিবুর রহমান।
তবে
নিজে স্বপ্ন দেখেছিল,
কাউকে কাউকে স্বপ্নও দেখিয়েছিল;
আজ শুকনো গোবরের নিচে
স্থলপদ্ম, মারা পড়ে আছে;
একটি সারস্বত জীবনের
জনপদাবলী;
ভালোবাসার মাস
সে তো পড়ে রইল ধলেশ্বরী পদ্মা বংশী বিষখালী
পেরিয়ে যতদূর বিস্তৃত মেঘনা যমুনা গজারিয়া তিস্তা;
কোথাও-বা তিরতির জলে হাই তুলছে বালি, বেগানা
হাওয়ায় ঘোমটা খুলছে তৃণ!
থমকে-যাওয়া মেঘে-মেঘে ক্ষয়ে-আসা চতুর্দিকে প্রক্ষিপ্ত সূর্যের
ছায়াভস্ম, এতটাই নিরুদ্বিগ্ন; যেন সময়ের অশ্বক্ষুরধ্বনি
থেমে আছে পলাশীর প্রান্তরসীমা ছুঁয়ে আম্রকাননে!
শুধুমাত্র একপাল অভিবাসী পাখির দঙ্গল উড়ে চলে
মাঠ-ঘাট-নদী, কচুরিপানার ঝাঁক, হোগলার ঝোট
ছেড়ে; পায়ে কাদা, মুখে ধানশিষ!
নিঃসাড় হয়ে এলো দেহ! এইমাত্র বেরিয়ে গেল শ্বাস!
জল ভাবে, চুড়ি-শাঁখা-নোয়া ভেঙে শুরু হলো
বেপথু হওয়ার কাল! পালটে নেয়
জ্যোৎস্না-ধোয়া ধবধবে সাদা থান!
রাত্তির কিন্তু গাঢ়স্বরে বলে, না!
ওই দেখো, অন্ধকার বাঁশঝাড়ে, শটিবনে, দেহখানা নড়েচড়ে,
হায় হায় জলগন্ধে ভুরভুর নিঃসীম পাথার!
……………………………………………

মুহম্মদ নূরুল হুদা
হে বাঙালি যিশু

চল্লিশ বছর যায়, তোমাকে স্মরণ করে তোমার বাঙালি;
চল্লিশ হাজার যাবে, তোমার শরণ নেবে তোমার বাঙালি।

সতত বহতা তুমি জন্মে-জন্মে বাঙালির শিরায় শিরায়
সতত তোমার পলি হিমাদ্রি শিখর থেকে বীর্যের ব্রীড়ায়
দরিয়ায় দ্বীপ হয়ে যায়, যে-দরিয়া বাংলার সীমানা বাড়ায়,
যে-দরিয়া তোমার তরঙ্গ হয়ে কাল থেকে কালান্তরে যায় :
আজন্ম বাঙালি তুমি, আমৃত্যু বাঙালি,
তুমি নিত্য-বিবর্তিত এই লালসবুজের জাতিস্মর মায়ায়-ছায়ায়।

সেই কবে নেমেছিলে মধুমতী-তীরে, অনন্তর শৈশবের ঘুরন্ত লাটিম
গঙ্গা-পদ্মা আর জাতিমা-র সুখী-দুখী নীড়ে; সীমা নয়, চিনেছো অসীম;
যৌবনে গিয়েছো চলে পল্লীমা-র কোল ছেড়ে দেশমা-র সব আঙিনায়,
তোমার পায়ের চিহ্ন এ বাংলার ঘরে-ঘরে,
সব ধর্ম-বর্ণ-গন্ধ, বাঙালির সব মোহনায়।

না, তুমি আর শরীরী মানুষ নও সব ক্ষণ-জীবিতের মতো;
না, তুমি আর অশরীরী ছায়া নও মৃত্যুময় মৌনতার মতো।
তুমি নিত্য প্রমুক্ত চিত্ততা, তুমি নিত্য স্বাধীনতা, শুদ্ধ মানবতা;
ব্যক্তি তুমি, জাতি তুমি,
তামাটে জাতির বুকে মানুষের অভ্র-অমরতা।

তোমার শরীর এক মাটি-বীজ, শস্য তার বেড়ে যায় জ্যামিতিক হারে;
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ-মাইলের সীমানায় তোমার দেহের মাপ নেই শুধু আঁকা;
তোমার অনিদ্র আত্মা অনঙ্গ উড়াল-সেতু মহাজীবনের এপারে-ওপারে,
বিশ্ববাঙালির হাতে দেশে-দেশে কালে-কালে
তুমি সার্বভৌম বাঙালি পতাকা।

ঘাতকেরা আত্মঘাতী, সময়ের রায়ে তারা নিশ্চিতই নির্বংশ সবাই,
নির্বীর্যের দেশে গত, তারা তো করে না আর বংশের বড়াই ।
বাঙালি বীরের জাতি, তুমি সেই চিরঞ্জীব মানবিক শিখা,
কালের কপোল-তলে তোমার পতাকা আঁকে বাঙালির চির জয়টীকা।

শিশু তুমি, প্রজন্মের ঘরে-ঘরে আগত-ও-অনাগত শিশু,
যিশু তুমি, তোমার শোণিত-¯্রােতে পাপমুক্ত সন্তানেরা, হে বাঙালি যিশু।
তোমার নিষ্পাপ চোখে প্রজাপতি, শাদা পাল, বিলঝিল, নদী,
হ্রদ-পথ-জনপদ ঘুরন্ত ঘুঙুর হয়ে বেজে চলে কাল-নিরবধি;
শিশু তুমি যিশু তুমি, তুমি পিতা, বাঙালির জাতিপিতা,
মানবধর্মের শিখা, আদিহীন অন্তহীন ভবিষ্য অবধি।

বাঙালি তোমাকে চায়, তুমি চাও বাঙালির ভালো :
বাঙালি মানুষ হয় বুকে যদি মুজিবের আলো।
……………………………………………

মহাদেব সাহা
কফিন কাহিনী

চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে রঙিন
রক্তমাখা জামা ছিলো হয়ে গেছে ফুল
চোখ দুটি মেঘে মেঘে ব্যথিত বকুল!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে এক শবদেহ
একজন বললো দেখো ভিতরে সন্দেহ
যেমন মানুষ ছিলো মানুষটি নাই
মাটির মানচিত্র হয়ে ফুটে আছে তাই!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি শরীর
একজন বললো দেখো ভিতরে কী স্থির
মৃত নয়, দেহ নয়, দেশ শুয়ে আছে
সমস্ত নদীর উৎস হৃদয়ের কাছে!
চারজন দেবদূত এসে ঘিরে আছে একটি কফিন
একজন বললো দেখো ভিতরে নবীন
হাতের আঙুলগুলি আরক্ত কবরী
রক্তমাখা বুক জুড়ে স্বদেশের ছবি!
……………………………………………

জাহিদুল হক
স্মৃতি

তোমার স্মৃতি কি সূর্যের মতো জ্বলে?
বাংলার পথে পথে তারা কথা বলে।
তোমার বুকের মানচিত্রের কাছে,
উজ্জ্বল সেই আগামী দিনটি জ্বলে।

পদ্মা ভোলে নি ভোলে নি মেঘনা নদী
তোমার পতাকা অমলিন নিরবধি,
তুমি আজ নেই, তবু মানুষেরা ভাবে
হঠাৎ কখনো ফেরে মুজিবর যদি।
……………………………………………

খোন্দকার আশরাফ হোসেন
স্বাপ্নিকের মৃত্যু

পায়ের পাতায় বিঁধেছে তোমার কাঁটা
তুমি যাবে দূরে যাবে দূরে যাবে দূরে
তোমার জন্যে মাঠে বিনষ্ট ধানেরা বিছায় বুক
তোমার জন্যে শামলী নদীর হৃদয় ফেটেছে রোদে
চোখের সামনে ধু ধু বালুকার মৃত্যুতে ভরা চাঁদ

তোমার দু’চোখে স্বপ্নেরা ছিল ভরা যুবতীর ক্রোধ
যেহেতু পৃথিবী খাবলে খেয়েছে ক্ষুধিত বাঘের নোখ
তুমি যাবে দূরে যাবে দূরে যাবে দূরে
তোমার জন্যে গোহালে বাছুর দুধের তৃষ্ণা ভোলে
তোমার জন্যে মেঠো ইঁদুরের দাঁতেরা শানায় ছুরি
কৃষকের চোখে নষ্ট ধানের শীষের বানানো ফাঁদ

পায়ের পাতায় বিঁধেছে তোমার কাঁটা
তুমি যাবে দূরে যাবে দূরে যাবে দূরে
তোমাকে খেয়েছে তোমার স্বপ্ন-পথিকের উদ্যম
নমিত গমের পূর্ণ খোয়াব বুকের পাঁজরে নিয়ে
ঘুমহীন চোখে হেঁটে যাও তুমি কালের হালট ধু ধু
হৃদয়ে রক্ত, জামায় ঘামের চন্দন-কর্দম

তুমি যাবে দূরে যাবে দূরে যাবে দূরে
কতটা দূরের স্মৃতির গোহালে ঝরে দুধ যেন আঠা
যেখানে বাঘেরা ভুলে যায় প্রিয় নরমাংসের স্বাদ
শিশুর চোয়ালে চুমু খেয়ে যায় পুষ্ট স্তনের বোঁটা
সিংহ-পাড়ার নীল বুনোঘাসে হরিণেরা খেলা করে

তোমার মৃত্যু দিয়ে যাবে শুধু স্বপ্নের চোরাবালি
তোমার পায়ের পাতায় বিঁধেছে গোলাপের ভুল কাঁটা
তোমার জন্যে শূন্য বাটিত জমা হবে লাল ক্রোধ
খঞ্জ পথিক উধাও চরের ভ্রান্তিতে দিশাহারা
তোমার কাফনে কর্দমমাখা পায়ের স্বপ্ন মোছে
তুমি যাবে দূরে যাবে দূরে যাবে দূরে
……………………………………………

অর্ণব আশিক
শেষ যাত্রা বঙ্গবন্ধুর

ভট ভট নেমে এল চিত্রিত যান্ত্রিক বাঘ
দূখানা পাখা তখনো হয়নি স্থির
ঝুপ করে নামে কিছু হায়ানা পিচাশ
টেনে আনে একটি কফিন।

শুয়ে আছো তুমি
পিতা শেখ মুজিবুর।

টুকরো কাঠে অনাদরে তৈরী কাফন
ভিতরে ঘুমিয়ে আছো জাতির পিতা নিশ্চুপ
রক্ত খোঁজে পদ্মা-মেঘনা- যমুনা
শিশুকালের মধুমতি বহতা হারিয়ে স্থির শোকে তখন
জানিয়ে দেয় এখানেই জন্ম তোমার
এখানেই বৃদ্ধি হওয়া তোমার বোধের
এখানেই রাজনীতি শুরু, শিক্ষা মানুষকে ভালোবাসার
তুমি মানুষ শেখ মুজিবুর, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর।

ধেয়ে আসে মানুষের ঢল, হুঙ্কার হায়ানার
হট যাও হট যাও, যেন পাকিস্তানি প্রেতাত্মার কর্কশ চিৎকার ৭১ এর
অনাদরে শেষ গোসল, কাপড় কাঁচা সাবানে শরীর ধোয়ার কাজ,
কয়েকটি আগরবাতি তখনও খুশবো ছড়ায় ভেদ করে হায়ানায় সব হুঙ্কার।
কয়েকটি কাক কা কা রবে দেয় ধিক্কার,
মানুষের ধিক্কার দেয়ার জায়গা কোথা, মানুুষ কোথা
দখল করেছে সব উর্দিপড়া হায়ানা পিচাশ।

সময় গড়িয়ে যায় শোও তুমি মাটির বিছানায়
দেখলে না তুমি তোমার শোকে পাথর এদেশ,
দেখলে না তোমার প্রিয় সহধর্মিণী পরে আছে ৩২ নম্বরের মেঝেতে,
তোমার স্নেহের রাসেল রক্তাক্ত হায়ানার বুটের আঘাতে,
অন্য পুত্ররা ক্ষত বিক্ষত লাশ, বধুদের হাতে তখনো লেগে আছে মেহেদীর রঙ;
বাংলার মানুষ থমকে গেছে জয়বাংলা ধ্বনি দিতে তোমাকে দেখে
দেখছে, শুধু নীরব অশ্রুঝরে এই বাংলার
এখানে হাজার বছেরের শ্রেষ্ঠ বাংগালী অনাদরে
সমাধিত হলো
দেয়া হলো তোমার কবর।
ভালো থেকো পিতা শেখ মুজিবুর
ভালো থেকো বাবা-মায়ের কাছে
মনে রেখ
বাংঙ্গালী প্রতিশোধ নিবে একদিন এই হত্যার।
……………………………………………

ফারুক নওয়াজ
তুমিই সত্য

তোমাকে পেয়েছি হাজার বছর প্রতীক্ষা করে-করে..
তোমাকে পেয়েছি আটচল্লিশে দাবির কণ্ঠস্বরে..
তোমাকে পেয়েছি বায়ান্নতেই, পেয়েছি বাষট্টিতে..
ছেষট্টিতেই ছয় দফা দিলে জাতিকে মুক্তি দিতে।
তোমাকে পেয়েছি ঊনসত্তরে-ঝনঝামুখর দিনে..
তুমি বাঙালির মুক্তির দূত শোষকেরা যায় চিনে।
সত্তরে তুমি জনতার রায়ে- বোঝালে তুমিই সেরা
তোমার বিজয়ে আক্রোশে কাঁপে ইয়াহিয়া-ভুট্টেরা।
বাঙালির হাতে তবু ইয়াহিয়া ক্ষমতা দিলো না ছেড়ে
সাতোই মার্চে তুমি নির্দেশ দিয়েছো আঙুল নেড়ে।
তুমি বলেছিলে, যার যা রয়েছে ঝাঁপিয়ে পড়ো তা নিয়ে
তোমার কথার প্রতিধ্বনি তুলে দেশ ওঠে গর্জিয়ে।
এলো মার্চের পঁচিশ তারিখ- এলো সেই কালোরাত
নাপাক পশুরা বাঙালি নিধনে মাতলো অকস্মাৎ।
হায়েনার দল তোমাকে বন্দি করলো সে কালো রাতে
সেই রাতে তুমি যুদ্ধ ঘোষণা পাঠালে চট্টলাতে।
তোমার আদেশ ইথারে ইথারে ভেসে যায় সারাদেশে
তোমার হুকুমে বাঙালি জাগলো মুক্তিযোদ্ধা বেশে।
তোমাকে পেয়েছি হাজার বছর প্রতীক্ষা করে-করে..
তুমিই স্বদেশ, তুমি স্বাধীনতা- তুমি কোটি অন্তরে।
তুমিই পতাকা, তুমিই জাতির অস্থি-মজ্জা , মূল;
বঙ্গবন্ধু তুমিই সত্য– বাদবাকি সব ভুল।
……………………………………………

মাৎসুও শুকুইয়া
বাংলাদেশের স্থপতি
অনুবাদ : অর্জিতা মাধুর্য

হে মহান বাংলাদেশের জাতির পিতা, স্থপতি
আমি এখনও তোমাকে ভুলি নাই
তোমার কর্মে, তোমাকে আবিষ্কার করি।
তোমার অর্জিত, তোমার প্রতিষ্ঠিত
সোনার দেশ- বাংলাদেশ!
আমি প্রশংসা করি, তোমার তারিফ করি,
তোমার জনগণের জন্য
হৃদয়ের গভীর থেকে আমার নির্মল ভালোবাসা।
প্রতি বার পনেরো আগষ্ট এলে
মনে হয়, জাতীয় শোকে জড়ানো
ডে ফর শেখ মুজিব!
আমি প্রতি দিন স্মরণ-সন্মান করি
তুমি এই দেশটির প্রতিষ্ঠাতা, নির্মাতা।
আমি প্রশংসা করি, তারিফ করি
তোমার জনগণের জন্য
আমার নির্মল ভালোবাসা।
প্রত্যাশা করি,
তারা তোমার আদর্শকে লালন করে
এগিয়ে যাবে।
তারা মিলে মিশে একসাথে সবাই
শান্তিতে বসবাস করবে।
প্রতিটি পনেরোই আগস্ট প্রত্যাখ্যান করি,
প্রত্যাশা করি, আবিষ্কার করি
তুমি জন্ম দিয়েছো একটি দেশ
তোমার প্রতিষ্ঠিত দেশের মানুষকে
আমার অকৃত্রিম ভালোবাসা!
……………………………………………

আসলাম প্রধান
বঙ্গবন্ধু

বীর-বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কীর্তি-
একাত্তরের যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ভিত্তি !
শিকলমুক্ত, স্বস্তি পাচ্ছি-
হাঁটছি-চলছি-খাচ্ছিদাচ্ছি
স্বাধীনভাবে লিখতে পারছি যে-যার মনোবৃত্তি ।
……………………………………………

হুমায়ূন কবীর ঢালী
তিনি

তিনি আছেন, থাকবেন
উপর থেকে ডাকবেন।
মাথার উপর ছায়া
পিতার আদর মায়া।
দুঃসময়ের মিতা।
তিনি জাতির পিতা।
……………………………………………

লড়াইয়ের অপর নাম স্বাধীনতা
(বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পাঠ শেষে)
আফসার নিজাম

প্রিয়পুত্র
আমরা দুশ বছর লড়াই করেছি
পৈত্রিক রাজ্যত্ব পূনরুদ্ধারের জন্য
আমরা নীল বিদ্রোহ করেছি
করেছি সিপাহী বিপ্লব
যুদ্ধের সেনানীবাস হিসেবে গড়েছি বাঁশেরকেল্লা
অতপর আমাদের ক্ষুধা দারিদ্র আর
রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হলো আজাদী
আহঃ আজাদী
আনন্দে আমরা চিৎকার করে শ্লোগান দিয়েছি
পাকিস্তান জিন্দাবাদ
জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ

প্রিয়পুত্র
আজাদীর আনন্দ আকাশ রাঙিয়ে তুলতে না তুলতেই
ঘনআঁধার করে আকাশ ছেয়ে গেলো কালোমেঘ
অবিচার আর বৈসম্যে সৃষ্টি হলো অবিশ্বাস
পিতা-পুত্রের সম্পর্কে- অনিবার্য হলো লড়াই
রাষ্ট্রভাষার লড়াই হয়ে উঠলো রাষ্ট্র গড়ার স্বপ্ন

প্রিয়পুত্র
নির্যাতন আর নিপীড়ন যখন রাষ্ট্র চালনার হাতিয়ার হয়
বিপ্লব তখন অনিবার্য
তারুণ্যের চোখে সৃষ্টি হয় মুক্তির নেশা
তখন একজন নেতার অাঙ্গুলের ইশারা আর বজ্রকণ্ঠ
হয়ে ওঠে যুদ্ধের হাতিয়ার
‘এবারে সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’
তারপর রক্ত আর ইজ্জতের বিনিময়ে
লাশের মিছিল শেষে হেঁটে আসে স্বধীনতা
আহঃ স্বধীনতা
আনন্দে আমরা শ্লোগান দেই
জয় বাংলা, জয় বাংলা।

প্রিয়পুত্র
লড়াই থেমে গেলে- থেমে যায় উন্নয়ন
প্রগতির চাকা হয়ে যায় স্তব্ধ
অতএব তুমি লড়াইয়ের ময়দানে হাজির হও
‘মনে রাখবা’
লড়াইয়ের অপর নাম আজাদী
লড়াইয়ের অপর নাম স্বাধীনতা।
……………………………………………

তাপস বিশ্বাস
তুমি ভেবো না পিতা

আজ আকাশের মন ভালো নেই
পুঞ্জিভূত ব্যথায় ভারাক্রান্ত সে
বাতাসের চোখেও বেদনার জল,
তোমার রক্তাক্ত দেহের দিকে তাকিয়ে
দীর্ঘশ্বাসের ছোঁয়ায় দিশেহারা প্রাণীকুল।
পাখিদের বুকে বইছে কালবৈশাখী ঝড়
তাদের কণ্ঠে গান নেই আজ
আছে করুণ আহাজারি, কষ্টের কাকলি।
রক্তজবার লালে মিশেছে তোমার বুকের রক্ত
রজনীগন্ধার পাপড়ি যেন কাফনের কাপড়,
বিমর্ষ ফুলেরা বিলাপে ব্যাকুল
‘পিতা নেই, বঙ্গবন্ধু নেই’।

খুনির খুন এখনো গরম
হিংসার আগুনে টগবগিয়ে ফোটে,
ট্রিগারে আঙুল চেপে চুপিসারে চলে আততায়ী
বর্ণচোরা হয়ে মিশে থাকে জনারণ্যে
মৃত তোমাকে আবার মারবে বলে।
কী অপরাধ ছিল তোমার ?
বজ্রকণ্ঠে তুমি জাগিয়ে তুলেছিলে
মুক্তিকামী বাঙালির মুক্তির চেতনা
এটাই কি অপরাধ ?
প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কাঁপিয়ে দিয়েছিলে
অত্যাচারী শোষকের ঘৃণিত আস্তানা
এটাই কি অভিযোগ ?
চিহ্নিত দেশদ্রোহীদের সাধারণ ক্ষমা দিয়ে
টেনে নিয়েছিলে তোমার বিশাল বুকে
এটাই কি ছিল ভুল ?
জানি, উত্তর পাবো না কারো কাছে।

চোখের জলে কেউ ডুবে আছে অনন্তকাল
দুঃখে, কষ্টে ভেঙে খানখান হয়েছে কারো বুক,
শোকাহত সহযোদ্ধা পবিত্র পাগল হয়ে
তোমার স্মৃতিচারণ করছে রাস্তায় রাস্তায়
কোটালীপাড়ার শেখ সেকেন্দারের মতো ;
কোটি কোটি শিশুর হাহাকার হয়ে
বাংলার পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াচ্ছে
শেখ রাসেলের অতৃপ্ত আত্মা।
অনুশোচনার পরশ পাথরের ছোঁয়ায়
এতটুকু খাঁটি হয় না তবু নরপিশাচের অন্তর,
ইতিহাসের কোনো গোপন গর্তে লুকিয়ে থেকে
চক্রান্তের নতুন জাল বুনে যাচ্ছে তবু
অস্পৃশ্য সরীসৃপ, নিন্দিত নরাধম;
বারবার পরাজিত হয়েও নেচে যায়
রক্তবীজ নামের নগ্ন দৈত্য।

প্রিয়তম পিতা
দুচোখ মেলে তাকিয়ে দেখো একবার
বেশিরভাগ ফসল নষ্ট হয়নি আজও
তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলায়।
নতুন কুঁড়িদের আগমনে উদ্দীপ্ত ফুলের বাগান
কিশোর-কিশোরীর চোখে চকচকে রোদ,
শোকেরা আজ শক্তির প্রতীক
তোমার পদচিহ্ন, পথের দিশারি।
তুমি ভেবো না পিতা
আবার আসে যদি অশুভ সময়
তোমার অস্তিত্ব মুছে দিতে চায় কেউ,
আকাশ, বাতাস, প্রাণী আর ফুলেদের দিব্যি
তোমার স্বপ্নের দিব্যি,
লাল-সবুজ পতাকার দিব্যি
লাখো শহিদের রক্তের দিব্যি,
সম্ভ্রমহারা মা-বোনের দিব্যি
সত্যের সার্থক সুনামি হবে তাহলে
ফুঁসে উঠবে পবিত্র জলরাশি,
প্রচণ্ড জলোচ্ছ্বাসে চিরতরে ভেসে যাবে
সব ময়লা, সব আবর্জনা
পুণ্যস্নান ক’রে শুদ্ধ হবে বাংলা মা।
.
……………………………………………
শেখ একেএম জাকারিয়া
ছবি

সবাই দেখে খেলার ঘরে, সবই আছে সাজানো
খুকু দেখে কী যেন নেই, তারই ঘরে টাঙানো।
বর ও কনে দু’টি পুতুল,
আছে কেমন দাঁড়িয়ে,
কীসের তরে
উতলা হয়,
হাত দু’খানা বাড়িয়ে?
পুতুল পাশে পালকি আছে, আছে দু’জন বেয়ারা,
পাশেই মাটির হাঁড়ি আছে, আছে মাটির পেয়ারা ।
শাড়ি- ব্লাউজ-লুঙ্গি আছে,
আরও আছে গ্লাস-থালা,
তারই পাশে
বসে আছে,
বর-কনেরই মা খালা।
পান রাখিবার পানদান আছে, সাথে আছে পানখিলি,
তারই পাশে দু’টি পুতুল, কাটছে মাথায় নখবিলি
এর পরেও ভাবছে খুকু,
কী যেন নেই তার ঘরে,
কিসের ভাবনা
তাড়া করে,
শোকের মাতম হৃদ চরে।
ঘড়ি আছে, চশমা আছে, আছে মাটির ঘরবাড়ি,
খেলনা আছে হরেক রকম, তবুও তার মন ভারি।
হঠাৎ খুকু লাফিয়ে উঠে
দৌড়ে গেল মার ঘরে
যা ভেবেছে তাই পেয়েছে,
‘হু্ররে মুখে
বের করে।
পড়লো মনে ভাবছিল যা, উঠলো ধরায় লাল রবি,
টানিয়ে দিল খেলার ঘরে, শেখ মুজিবের শ্বেত্ ছবি।
……………………………………………

সৌমেন দেবনাথ
পনেরো আগস্টের এলিজি

সবুজের কার্পেটে মোড়া
বাংলা নামক এই ব-দ্বীপ,
এই ব-দ্বীপে জন্মেছিলো
সিংহ মানব শেখ মুজিব।

টুঙ্গিপাড়ার ছোট্ট ছেলে
ছিলো যে তার লক্ষ্য,
আপন কর্মে আপন চেষ্টায়
একদিন হলো বটবৃক্ষ।

শতাব্দী শ্রেষ্ঠ প্রবাদ পুরুষ
সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি,
গ্রেফতারের পর গ্রেফতার তবুও
দেয়নিকো বিবেক জলাঞ্জলি।

রক্ত যার বোঝে না পরাজয়
আমজনতার বীর,
বের হয়ে আসতো বীরদর্পে
নয় নত যার শীর।

একটি অঙ্গুলির নির্দেশে
জাগে গণজোয়ার,
যার যা আছে নিয়ে হাতে
হয় সবাই হাতিয়ার।

কণ্ঠ গর্জনে আপোষহীন
জয়ের জন্য জেদি,
গণআন্দোলনে শত্রুর
কাঁপতো শাসন বেদি।

জেনেছে ঐ গোটা বিশ্ব
কেমন তোমার ব্যক্তিত্ব,
মুজিব যে তেজস্বী পুরুষ
কাঁপতো পাকি অস্তিত্ব।

তার হুংকারে বাংলা ছাড়ে
বন্য কুকুর সেনা,
রক্ত আর ঐ সম্ভ্রম দিয়ে
স্বাধীন দেশটি কেনা।

স্বপ্ন ছিলো স্বাধীন বাংলার
থাকবো না কারো অধীন,
বাঙালিকে সব এক করে
বাংলাকে করলো স্বাধীন।

স্বাধীন বাংলার স্বপ্ন দেখতে
বাংলা ছিলো সত্ত্বা,
সেই বাঙালি করলো তোমায়
করলো তোমায় হত্যা।

কিসের লোভে কিসের তরে
ওরা হলো হন্যে,
তলে তলে বুদ্ধি আটলো
বলো কিসের জন্যে।

সহজ সরল ছিলে বলে
বোঝনি তো ছকটা,
কিছু বিপদগামী সেনা
বিদ্ধ করলো বুকটা।

তোমায় মেরে হয়নি ক্ষ্যান্ত
মারলো গোটা পরিবার,
বাদ গেলো না শিশু রাসেল
ধিক ধিক এ ঘৃণ্যতার।

বাংলাদেশটা করলে সৃষ্টি
নিজের আত্মবলে,
তোমায় মোরা স্মরণ করি
স্মরণ আঁখিজলে।

আমরা প্রচার করবো সদা
মুক্তিযুদ্ধের সঠিক তথ্য,
নব প্রজন্ম জানবে যে
বঙ্গবন্ধুর জীবন কাব্য।

মুজিব অমর মুজিব অক্ষয়
মৃত্যুঞ্জয়ী অবিনাশ,
মুজিব শাশ্বত মুজিব অব্যয়
মুজিব একজন ইতিহাস।
……………………………………………

মিশকাত উজ্জ্বল
পনেরো আগস্ট

যে দাঁড়কাকটি প্রতি ভোরে ডেকে ডেকে ক্লান্ত
যে ব্যাকুল সারথি তৃষ্ণার্ত চাতকের মতো মেঘজলের প্রার্থনারত;
যে প্রিয় আসবে বলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রতীক্ষায় রাখে
যে স্বৈরিণী নিপুণ ছলে ভেঙেছে হৃদয়টাকে—
সে–ও বড় বন্ধু বটে।
যে সুহৃদ রক্তের ঋণের কথা দিব্যি ভুলে যায়
যে স্বজন জীবনকে ফেলে দেয় ঘোর অমানিশায়;
যে হাভাতে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার কড়া নাড়ে
যে রমণীর সতীত্বের নিলাম হয় রাতের আঁধারে—
তাকেও বন্ধু বলি।
যে যুবক পনেরো আগস্টের শোকমিছিলে না যায়
যে কবি যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে লিখে না বজ্রবাণী কবিতায়
যে বৃদ্ধের মনে গোপনে চলে জঙ্গিবাদের বীজ চাষ;
যে প্রজন্ম জন্মোৎসবের আড়ালে জাতীয় শোককে করে উপহাস—
সে আমার বন্ধু নয় কস্মিনকালেও।
……………………………………………

শ্যামসুন্দর সিকদার
পনেরো আগস্টের শক্তি

এখনো কি পনেরো আগস্টে বাংলায় ভোরের লাল সূর্য ওঠে?
এখনো কি সেদিনের মতো ভোরের পাখিরা আগাম বার্তায় আতংকিত হয়ে কাঁদে?
এখনো কি আগস্ট মাসে বাংলার আঙ্গিনায় মন খারাপের শোকার্ত ফুল ফোটে?
পঁচাত্তরের পনেরো আগস্টে ভোরের সূর্যের ঘুম ভাঙ্গেনি এবং ফুলের প্রাণে ঘ্রাণ আসেনি,
কালঘুমের ভেতর রক্তাক্ত বত্রিশ নম্বরের অধিবাসীরা সূর্যের সঙ্গে জেগে ওঠেনি!
সোনার বাংলায় শত্রুরা সেদিন আগুনে দিয়েছে ঘৃত ঢেলে এবং জ্বলবে তা জন্ম-জন্মান্তরে,

সেদিন সূর্যের ঘুম ভাঙ্গেনি বলেই কাকপক্ষীরা কোরাসে কেঁদেছে রক্তাক্ত মুজিবকে দেখে,
বত্রিশ নম্বরে হুঙ্কার ছাড়ে ধ্বংসের লেলিহান শিখা, যেন উন্মাদনায় খুন যাবে সবুজ প্রান্তরে!
সেদিন ভোর হলো না, পনেরো আগস্টে কোনোদিন হবে না ভোর, যদিও আসে ফিরে ফিরে;
সব বাঙালি জাগ্রত থাকবো নক্ষত্র হয়ে, ফি বছর শোকদিবসের বাণী লিখবো সব দেয়াল ঘিরে।
ভালো হতো, বাঙালি বলেই শর্তহীন ভালোবেসে জাতিরজনক শত্রুকে এতটা প্রশ্রয় না দিলে;
ভালো হতো, যদি নতুন মীরজাফর-কুলাঙ্গার নির্মমতায় পিতার রক্তে মানচিত্র রঞ্জিত না করতো,
ভালো হতো, পনেরো আগস্ট তারিখটা ক্যালেন্ডারের পাতা হতে চিরতরে মুছে ফেলা গেলে!
বাঙালিরা পৃথিবীর ঘূর্ণয়মান গতির সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখেই এখন পনেরো আগস্টকে লাল বৃত্তে বন্দি রাখে।
বাঙালিরা শোকে-শক্তিতে এখন সকালে উদিত সূর্যের মতো মানবিক সত্ত্বায় তারুণ্যে উজ্জীবিত থাকে।