পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল ১৭৫৭ সালের ২৩ শে জুন। পশ্চিম বঙ্গের নদীয়া জেলার ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর প্রান্তরের আম্রকাননে এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের এক পক্ষে ছিলেন বাংলা বিহার উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবার সিরাজউদ্দৌলা। অপর পক্ষে ছিলেন রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ বেনিয়া দল। যুদ্ধে সিরাজের পরাজয় হয়, যদিও তার পরাজিত হবার কথা ছিলনা। তিনি জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার জন্য আপ্রান চেষ্টা করা সত্বেও তার নিজস্ব রাজ কর্মচারী এবং প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খান সহ অন্যান্য সেনাপতিদের অবিশ্বাস্য বিশ্বাস ঘাতকতায় সিরাজউদ্দৌলা যুদ্ধে পরাজিত হন। পরবর্তীতে তাকে বন্দী করে হত্যা করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে প্রায় দু’শত বছরের জন্য অস্তমিত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। পলাশীর পরিনতি উপমহাদেশের ইতিহাসে তো বটেই পৃথিবীর ইতিহাসেও প্রভাব বিস্তারকারী একটি ঘটনা।

পলাশীর ট্রাজেডী শুধু সুবে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর দিন নয়। এর মধ্য দিয়ে সমগ্র উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। অনেকে এটিকে পলাশীর বিপর্যয়ের দিন বলে অভিহিত করেন। যুদ্ধের দিন নয়। কেননা যুদ্ধে পরাজিত হওয়া এক কথা, কিন্তু যুদ্ধ না করে যে পরাজয় বরন করতে হয় তা সম্পূর্ন ভিন্ন। ঐতিহাসিক তপন মোহন চট্রোপাধ্যায় তাঁর পলাশীর যুদ্ধ গ্রন্থের ১৭৩ পৃষ্ঠায় লিখেছেন- “পলাশীর যুদ্ধকে একটা যুদ্ধের মতন যুদ্ধ বলে কেউ স্বীকার করে না। কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলেই আস্তে আস্তে একমুঠো কারবারী লোক গজকাঠির বদলে রাজদন্ড হাতে ধরলেন। প্রথম থেকেই তাঁরা রাজত্ব করলেননা বটে, কিন্তু বাংলাদেশের ভাগ্য নিয়ন্তা হয়ে দাঁড়ালেন। ”

তপন মোহন চট্রোপাধ্যায় তাঁর বইয়ের ১৫৮, ১৫৯ পৃষ্ঠায় আরো খোলাখুলিই লিখেছেন যে “ষড়যন্ত্রটা আসলে হিন্দুদেরই ষড়যন্ত্র” হিন্দুদের চক্রান্ত হলেও বড় গোছের মুসলমান তো অন্তত একজন চাই। নইলে সিরাজউদ্দৌলার জায়গায় বাংলার নবাব হবেন কে? ক্লাইভ তো নিজে নবাব হতে পারেন না। হিন্দু গভর্নরও কেউ পছন্দ করবে কিনা সন্দেহ? জগৎশেঠরা তাদের আশ্রিত ইয়ার লতিফ খাঁকে সিরাজউদ্দৌলার জায়গায় বাংলার মসনদে বসাতে মনস্থ করেছিলো। উমিচাঁদেরও এতে সায় ছিল। কিন্তু ক্লাইভ ঠিক করলো অন্য রকম। সে এমন লোককে নবাব করতে চায় যে ইংরেজদেরই তাঁবে থেকে তাদেরই কথা শুনে নবাবী করবে। ক্লাইভ মনে মনে মীরজাফরকেই বাংলার নবাবী পদের জন্য মনোনীত করে রেখেছিলো।

পলাশী শুধু নদী তীরের এক খন্ড জমি নয়, যুদ্ধের ময়দানও নয়। এটি হচ্ছে স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষদের রক্ত ক্ষরনের স্থান, ষড়যন্ত্রকারীদের পাহাড়সম প্রহসনের স্থান। আবার এটা দেশদ্রোহী বেইমান চিনবার স্থানও বটে। বাংলাদেশী মানুষের জন্য এই স্থান প্রেরনার বাতিঘর। যে প্রেরণা যুগিয়েছে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় সিরাজ ও তাঁর পরিবার। অন্যদিকে পলাশী লড়াকু দেশপ্রেমিক মুসলমানদের ঈমানী পাঠশালাও বটে যারা দেশের জন্য নিবেদিত প্রান হয়ে লড়াই করেছেন। । পলাশী মানে অন্য একটি কারবালা, একটি ইয়াজিদ ও একজন সিপাহসালারের আপ্রান যুদ্ধ।

ঐতিহাসিকরাই বলেছেন, পলাশীর যুদ্ধের একমাত্র নায়ক ও বীর হচ্ছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। কারণ তিনি নিজে দেশের স্বার্থেই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন। তিনি যদি ইংরেজদের সাথে সমঝোতা করতেন তাহলে দীর্ঘসময় নবাব থেকে সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু দেশের ভালবাসায় নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে ইতিহাসের নির্মম পরিনতিকে হামিুখে বরণ করে নিয়েছেন।

পলাশীর যুদ্ধের ২৫৭ বছর পরেও আজ আমাদের অনেক প্রশ্ন -পলাশীর যুদ্ধ কেন সংঘটিত হয়েছিল? কি হয়েছিল সে যুদ্ধের পরিনাম? কেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা সে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিলেন? পলাশীর ট্রাজেডীর জন্য কারা দায়ী? কেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে সিরাজের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর আলী খাঁ সহ অন্যান্য সেনাপতিগন এবং রাজ কর্মচারী জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, নন্দকুমার, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ প্রমুখরা সিরাজের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে দেশের স্বাধীনতা ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়েছিল। দেশের প্রতি প্রচন্ড ভালবাসা থাক সত্ত্বেও কেন সিরাজকে জঘন্য ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে পরাজয়ের গ্লানি মাথায় নিয়ে শোচনীয়ভাবে প্রান দিতে হলো? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদের পলাশীর ইতিহাস থেকে আরো অনেক পেছনে যেতে হবে। যাতে স্পষ্ট অনুধাবন করা যাবে কি করে ইংরেজরা দীর্ঘ মিশন নিয়ে এদেশে আগমন করেছিল এবং ১৫৭ বছরের প্রচেষ্টায় কিভাবে তারা সফলতা অর্জন করেছিল? কাদের অতিমাত্রায় ক্ষমতার লোভ ও দুর্বলতাকে পুঁজি করে ইংরেজরা আমাদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল? এর জন্য কি শুধু সিরাজউদ্দৌলাই দায়ী! না তিনি দীর্ঘ দিনের চলে আসা ষড়যন্ত্রের বিশালতাকে মোকাবেলা করতে না পেরে ষড়যন্ত্রের যবনিকাপাতের নায়ক হতে বাধ্য হলেন।

ইতিহাসের সূত্রমতে ভারতবর্ষের অতুলনীয় বৈভব ও ঐশ্বর্যের কথা জানতে পেরে প্রাচ্যে বানিজ্য করার জন্য লন্ডনে “ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” নামে একটি বনিক সম্প্রদায় গঠিত হয়। তারা রানী প্রথম এলিজাবেথ এর নিকট থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচ্য দেশে বানিজ্য সম্পর্ক স্থাপনের জন্য ১৫ বছর মেয়াদী ১টি সনদ লাভ করেন। এই সনদের বলে “ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” কয়েকটি বানিজ্য জাহাজ সুমাত্রা, মালাক্কা ও যবদ্বীপে প্রেরন করে। ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের আদেশে ক্যাপ্টেন হকিংস নামক এক ব্যক্তি মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরের (১৬০৫-২৭) দরবারে আগমন করেন। ১৬০৯ খ্রীষ্টাব্দে হকিংসের আবেদন ক্রমে সম্রাট জাহাঙ্গীর মুম্বাইর অদুরে সুরেট বন্দরে ইংরেজদের একটি কুঠি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন। ১৬১৫ সালে স্যার টমাস রো নামক জনৈক ইংরেজ সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন এবং ইংল্যান্ডের রাজার দূতরুপে আজমীর, মান্ডু ও আহমেদাবাদে তিন বছর অবস্থান করেন। তার চেষ্টায় ভারতের আরো কয়েকটি জায়গায় ইংরেজদের বানিজ্য প্রসারিত হয়। সতের শতকের মাঝামাঝি (১৬৪৪-৫০) সম্রাট শাহজাহান ভারত বর্ষের সম্রাট থাকা কালীন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। একদিন তার কন্যার পরিধেয় বস্ত্রে হঠাৎ আগুন লেগে তার প্রায় সমস্ত শরীর দগ্ধ হয়ে যায়। দেশীয় চিকিৎসায় অগ্রগতি না হওয়ায় সম্রাট ইংরেজ চিকিৎসক গাব্রিয়েলকে ডেকে পাঠান। তার চিকিৎসায় সম্রাটের কন্যা আরোগ্য লাভ করেন। চিকিৎসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ থেকে বাউটনের অনুরোধেই সম্রাট শাহজাহান ইংরেজ কোম্পানীকে বাংলাদেশে আংশিক বানিজ্যের অধিকার সম্বলিত একটি শাহী ফরমান প্রদান করেন। অতঃপর সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা সুজা বাংলার সুবেদার থাকা কালীন বাউটন তিন বছরকাল তার পারিবারিক চিকিৎসক ছিলেন। সেই সুবাদে পুনরায় বাউটনের অনুরোধে শাহজাদা সুজা দিল্লী প্রদত্ত শাহী ফরমানটি ভালকরে নাদেখেই মাত্র ৩০০০ হাজার টাকা বার্ষিক নজরানার বিনিময়ে ইংরেজদেরকে বাংলাদেশে বানিজ্য করার অনুমতি প্রদান করেন। যার প্রেক্ষিতে ইংরেজরা ১৬৫০ সালে প্রথমে হুগলীতে ও পরবর্তী পর্যায়ে পাটনা ও কাশিমবাজারে কুঠি স্থাপন করে এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন বন্দরে বিনাশুল্কে অবাধ বানিজ্য প্রসার ঘটাতে শুরু করে। বাংলায় ব্যাপক বানিজ্যিক সম্ভাবনার প্রেক্ষিতে ইংরেজরা ১৬৫৭ সালে এদেশের জন্য পৃথক এজেন্সী প্রতিষ্ঠা করেন।
একদিকে পুঁজি বৃদ্ধি অপরদিকে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ন স্থানে মোগল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় বানিজ্য কুঠি স্থাপনের মাধ্যমে “ইস্ট ইন্ডিয়াকোম্পানী” কর্তৃক শুরু হয় বাংলার বানিজ্য সম্প্রসারন অভিযান। ১৬৫৮ সালে কুঠি স্থাপিত হয় বাংলার রেশমকেন্দ্র কাশিমবাজারে। ১৬৫৯সালে সোরা (Salt-petre) সংগ্রহের জন্য কুঠি স্থাপিত হয় পাটনায়। ১৬৬৮ সালে মসলিন বস্ত্রের জন্য ঢাকায়, ১৬৭৬ সালে সুতিবস্ত্রের জন্য মালদহে। ১৬৯০ সনে কোলকাতায় স্থাপিত হয় কোম্পানির প্রধান বানিজ্য কুঠি ও স্থায়ী বাসস্থান। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৬৫২ সনে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাংলায় বানিজ্যে পুঁজি বিনিয়োগ ছিল মাত্র সাতহাজার পাউন্ড। আর ১৬৮০ র দশকে তার পরিমান বেড়ে দাঁড়ায় এক লক্ষ থেকে এক লক্ষ পনের হাজার পাউন্ডে। শায়েস্তা খান বাংলার সুবেদার থাকাকালীন সময়ে ১৬৭০ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে কোম্পানী আরো একটি ফরমান লাভ করে। এই ফরমানের শুল্ক আদায়ের ব্যাখ্যা নিয়ে কোম্পানী ও নবাব সরকারের কর্মচারীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে কোম্পানীর এজেন্টরা এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিলাতে কোর্ট অব ডিরেক্টরদের দৃষ্টি আকর্ষন করলে কোর্ট প্রতিকুল অবস্থায় নবাব কর্মচারীদের ঘুষদানের মাধ্যমে বিষয়টি ফয়সালা করার পরামর্শ প্রদান করে। এভাবে ইংরেজরাই প্রথম ঘুষদানের মাধ্যমে এদেশে দুর্নীতি বিস্তারের চেষ্টা করে। তাতেও কোন ফল না হওয়ায় এবং সায়েস্তা খান কর্তৃক নতুন ফরমান প্রাপ্তির ব্যপারে দিল্লীর দরবারে কোম্পানীর পক্ষে কথা বলার সুযোগ না দেয়ায় কোম্পানীর অবাধ ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেল, নবাব কর্মচারীগন তাদের মতো শুল্ক আদায় করে চললো।

ইব্রাহীম খান (১৬৮৯-১৬৯৭) বাংলার সুবেদার থাকাকালীন সময়ে ১৬৯৫ সালে কিছু কিছু স্থানীয় বিদ্রোহের কারনে আইন শৃঙ্খলার অবনতিতে বিচলিত হয়ে বিদেশী কোম্পানী গুলোকে তাদের স্ব স্ব প্রধান কুঠিতে দুর্গ নির্মান করে নিজেদের আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করার অনুমতি দেন। এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ইংরেজরা এদেশে রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের নিমিত্তে ১৬৯৬ সালে সুতানুটি কুঠিতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ স্থাপন করেন। যা তাদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধিতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

আওরঙ্গজেবের পৌত্র আজিম-উস-শান ১৬৯৭ সালে বাংলায় সুবেদার হলে ১৬৯৮ সালে ১৬ হাজার টাকা ঘুষের বিনিময়ে বার্ষিক মাত্র ১২শ টাকা খাজনা প্রদানের ভিত্তিতে ইংরেজদের কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নামক তিনটি গ্রামের জমিদারী প্রদান করেন। এ তিনটি গ্রামই পরবর্তীতে কোলকাতা মহানগরীতে রুপান্তরিত হয়। আজিম- উস-শান কর্তৃক জমিদারী লাভের মধ্য দিয়ে “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” প্রথম দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অনুপ্রবেশ ও জমিদারী শাসনের ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ লাভ করে। এই ক্ষুদ্র জমিদারী ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে এক সময় সমগ্র দেশই কোম্পানীর জমিদারীতে পরিনত হয়।

মুর্শিদকুলিখাঁ (১৭০৫-১৭২৭) বাংলার সুবেদার থাকাকালীন সময়ে ১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ইংরেজদেরকে তার দেওয়া ফরমানের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে কাশিমবাজার, রাজমহল ও পাটনায় ইংরেজকুঠি বন্ধ করে দেন। বিপরীতদিকে সম্রাট ফররুখ মিয়ার (১৭১৩-১৯) দিল্লীর সিংহাসনে উপবিষ্ট থাকাকালীন ইংরেজ চিকিৎসক হ্যামিলটন দ্বারা আরোগ্য লাভ করার প্রেক্ষিতে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সম্রাট শাহজাহানের ধারবাহিকতায় কোম্পানীকে প্রায় বিনা শুল্কে সমগ্র ভারতবর্ষে বানিজ্য করার লাইসেন্স দিয়ে দিলেন। যার ফলে কোম্পানী বাংলাদেশের স্থল ও নৌ পথে বানিজ্যের সুযোগ পেল এবং কোলকাতার নিকটবর্তী ৩৮টি গ্রামের মালিকানার অধিকার সহ নিজস্ব মুদ্রা তৈরী করার অনুমতি লাভ করে। ১৭১৭ সালের এ ফরমানকে ঐতিহাসিক ওরাম “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর” ম্যাগনাকাটা বা মহাসনদ নামে অভিহিত করেন।
মুর্শিদকুলি খাঁ বিচক্ষন, দুরদর্শী ও তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সম্পন্ন হওয়ার কারনে কোম্পানীকে ভু-সম্পত্তি লাভ, নিজস্ব মুদ্রা প্রচলন এবং করমুক্ত অবাধ বানিজ্যের অনুমতি দিতে রাজি না হলেও দিল্লীর আনুকুল্যের জোরে কোম্পানী তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইংরেজদের এই সাহস জোগানোর পিছনে দেশীয় কতিপয় হিন্দু জমিদার ও রাজকর্মচারীদের গোপন জোগসাজস ছিল। এত সব ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও মুর্শিদকুলি খাঁর আমলে ইংরেজ বনিক সম্প্রদায় খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। এই সব ঘটনাবলীর দ্বারা এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, মুঘল সম্রাটদের উদাসীনতা, অদূরদর্শীতা ও ব্যক্তিগত সুযোগ -সুবিধাকে অধিক প্রধান্য দেওয়া এবং বিলাসী সব চিন্তাভাবনা বাংলাদেশ তথা সমগ্র ভারত উপমহাদেশকে ধীরে ধীরে ইংরেজ শাসনের করতলগত করে ফেলে।

১৭২৭ খ্রীষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ মারাগেলে তাঁর জামাতা সুজাউদ্দিন (১৭২৭-১৭৩৯) বাংলার নবাব হন। তখন বাংলার সাথে উড়িষ্যাও যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে বিহার ও বাংলার সাথে যুক্ত হয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা নামে একটি নতুন সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। সুজাউদ্দিনের সময়েও মুর্শিদকুলি খাঁর শাসনধারা অব্যহত থাকায় সুবে বাংলার প্রায় অর্ধেক এলাকা নিয়ে গঠিত ৬১৫টি পরগনায় মাত্র ১৫টিতে জমিদারীর অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৭৩৯ সালে সুজাউদ্দিনের মৃতুর পর তাঁর দুর্বল পুত্র সরফরাজ খাঁ বাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। সরফরাজ খাঁর দুর্বলতার সুযোগে রাজদরবারে পূর্ব থেকে গুরুত্ত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনরত আলম চাঁদ, জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, যশোবন্ত রায়, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, নন্দলাল নবাব মহলের বিভেদের অজুহাতে নানা ধরনের উসকানিমুলক কর্মকান্ডের মাধ্যমে নিজেরা উত্তরোত্তর অধিক ক্ষমতা লাভের নেশায় মেতে উঠেন এবং নবাব সরফরাজ খানের বিরুদ্ধে বিহারের গভর্নর আলীবর্দী খানকে প্ররোচিত করে তাকে সক্রিয় সমর্থন দিয়ে বিদ্রোহ ঘটান।

আলীবর্দী খান ১৭৪০ সালে সরফরাজ খানকে পরাজিত করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব হিসেবে নিজেকে ঘোষনা করেন। আলীবর্দী খানের সিংহাসনে আরোহনের পূর্ব থেকেই মোগল সম্রাটদের দুর্বলতার সুযোগে মারাঠা বর্গীরা (অশ্বারোহী দস্যু) প্রায় প্রতি বছর বাংলায় হানা দিয়ে সুজলা সুফলা শস্য শ্যমলা বাংলার সম্পদ লুন্ঠন করে নারী, পুরুষ ও শিশুদের নির্যাতন চালিয়ে নিজ রাজ্যে ফিরে যেত। অন্য দিকে ১৬৯৮ সালে সুতানুটি কোলকাতা ও গোবিন্দপুর নামক তিনটি গ্রামের জমিদারী তথা খাজনা আদায়ের অধিকার লাভ করায় কোলকাতা ইংরেজদের আধিপত্য বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও মুর্শিদাবাদে রাজদরবারের ভেতরের একদল বিশ্বাসঘাতক হিন্দু রাজকর্মচারী ভারতের অন্যান্য জায়গার মত বাংলার মুসলিম শাসনের অবসান ঘটানোর জন্য গোপনে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছিল। এক দিকে হানাদার মারাঠা বাহিনী অন্য দিকে সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ বেনিয়া এবং সর্বোপরি নিজ রাজদরবারের অভ্যান্তরে ঘাঁপটি মেরে বসে থাকা শত্রু পরিবেষ্টিত প্রতিকুল অবস্থার মধ্যেই নবাব আলীবর্দী খানকে চালিয়ে যেতে হয়েছে তার দীর্ঘ ষোল বৎসরের রাজত্বকাল (১৭৪০-১৭৫৬) তাঁর রাজত্বের শেষ দিক থেকেই বাংলার হিন্দু রাজা -মহারাজাদের প্ররোচনায় “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী” নবাবকে অমান্য করতে শুরু করেছিল।

১৭৫৬ সালের ৯ এপ্রিল আলীবর্দী খানের মৃতুর পর তার নাতি ২৩ বছর বয়সের তরুন সিরাজউদ্দৌলা বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাব পদে সমাসীন হলেন। সিরাজউদ্দৌলার ছিলেন আলীবর্দী খানের কনিষ্ঠ কন্যা আমেনা বেগমের ছেলে। আলীবর্দী খান তার দূর দৃষ্টি দিয়ে সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে গভীর নিঃস্বার্থ দেশপ্রেম, বীরত্ব, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতা দেখতে পেয়ে তাকে যোগ্য উত্তরসুরী হিসেবে পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলার সিংহাসনে আরোহনের কাল ছিল কন্টকাকীর্ন। হিন্দু রাজা মহারাজা, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী এবং হিন্দু রাজ কর্মচারীদের মুসলিম নবাব বিরোধী ষড়যন্ত্রের মধ্যে তিনি ক্ষমতায় আরোহন করেছেন। এই ষড়যন্ত্রের সাথে তার সিংহাসনে আরোহনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পারিবারিক কলহ যোগ হয়ে তা ষোলকলায় পূর্ন হয়েছিল।

ক্ষমতা আরোহনের পরপরই ইংরেজদের ধারাবাহিক ঔদ্ধত্যপূর্ন আচরণ থেকে সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পেরেছিলেন যে বিদেশী ইংরেজরাই একদিন বাংলার স্বাধীনতার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। সিরাজের একমাত্র চিন্তা হয়ে উঠলো কি করে ভেতরের বাইরের এসব বহুমুখী চক্রান্তের মুখে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষা করা যায়। মুর্শিদাবাদ রাজ দরবারের বিশ্বাসঘাতক কর্মচারীদের সাথে ইংরেজদের গোপন ষড়যন্ত্রের বিষয়ও সিরাজ অবহিত ছিলেন। তাই সিংহাসনে আরোহনের পরপরই সিরাজউদ্দৌলা যে কোন মূল্যে এই দেশ থেকে ইংরেজদের বিতাড়ন করাকে তার জীবনের ব্রত হিসেবে গ্রহন করেন। রাজদরবারের কিছু গুরুত্বপূর্ন লোকের ষড়যন্ত্র এবং তাঁর নিকট আত্মীয়রা অসহযোগীতা না করলে সিরাজ অবশ্যই তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে সফলতা লাভ করতেন। সিংহাসনে আরোহনের মাত্র দেড় মাসের মধ্যে তিনি একই সাথে কৃষ্ণবল্লভকে প্রত্যার্পন করতে গভর্নও ড্রেককে আদেশ দেন এবং ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের সংস্কার বন্ধ সহ কোলকাতার চর্তুপার্শ্বের পরিখা ভরাট করার আদেশ দেন। কিন্তু ইংরেজরা নবাবের আদেশ অগ্রাহ্য করার পাশাপাশি নবাবের পত্র বাহক নারায়ন সিংকে কোলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ থেকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। এর পর নবাব ব্যবসায়ী খাজা ওয়াজিদকে একই উদ্দেশ্যে একাধিক বার কোলকাতায় পাঠান। ইংরেজরা তার সাথেও সংযত আচরণ না করায় নবাব রায়দুর্লভ ও বেগকে কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মীর মোহাম্মাদ রেজাখান হুগলীতে জাহাজ নির্মানের পথ রোধ করলেন এবং এভাবে কাশিমবাজার কুঠির পতন ঘটে। কুঠি প্রধান উইলিয়াম ওয়াটস নবাবের সামনে হাজির হয়ে অঙ্গীকার করেন যে দুর্গের সম্পসারন বন্ধ করা হবে এবং কোলকাতার এ দেশীয় কাউকে আশ্রয় দেয়া হবেনা। কিন্তু কোম্পানী প্রধান ড্রেক, কুঠি প্রধান ওয়াটস এর অঙ্গীকারের সাথে একমত না হওয়ায় ১৭৫৬ সালের ১৩ জুন নবাব ফোর্ট উইলিয়ামে পৌছান এবং কোলকাতা অবরুদ্ধ করেন। এমতাবস্থায় ১৯ জুন তারিখে কোলকাতা নাটকের অহংকারী নায়ক রজার ড্রেক তার সঙ্গীদের নিয়ে পিছন দিক দিয়ে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হন। সঙ্গে সংঙ্গে ইংরেজ শিবিরে পলায়নের হিড়িক পড়ে যায়। এক ঘন্টার মধ্যে ইংরেজদের সকল জাহাজ পলাতকদের নিয়ে ভাটি পথে পাড়ি জমায়। ২০ জুন ১৭৫৬ তারিখে কোলকাতার পতন ঘটে।

কোলকাতার পতনের পর যে সকল নর নারী আত্মসমর্পন করেছিল তাদের ব্যাপারে হলওয়েল নামক এক ব্যক্তি মিথ্যা কল্পকাহীনি বানিয়ে প্রচার করায় ইংরেজ শিবিরে ক্ষোভের আগুন সঞ্চার করার ক্ষেত্রে ভুমিকা পালন করেছিল। যেমনটি বর্তমান সময়েও পরীলক্ষিত হয়। আর সেটি হচ্ছে গভীর রাতে আত্মসমর্পনকারীদের জানালাবিহীন একটি ক্ষুদ্র প্রকোষ্ঠে বন্দী করে রাখা হয়। প্রকোষ্ঠটি এত ক্ষুদ্র ছিল যে তার মধ্যে নিদারুন মর্ম যাতনায় ছটফট করতে করেতে অনেকেই মারা যায়। ইংরেজদের লিখিত ইতিহাসে যা তথাকথিত “অন্ধকুপ” হত্যা নামে অভিহিত। যেটি পলাশী যুদ্ধের পটভুমি তৈরিতে ভুমিকা রেখেছিল। এই ঘটনা অনেক তর্ক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেকে হলওয়েলের বর্ননা সত্য বলে গ্রহন করেছেন। আবার কেউ কেউ এই ঘটনাকে একটি ডাহা মিথ্যা ও কল্পিত কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন। হলওয়েল ছিলেন বন্দীদের একজন এবং অন্ধ কুপ হত্যার গল্পটি তারই সৃষ্টি। সিরাজউদ্দৌলা ২১জুন সকালে এ ঘটনা জানতে পেরে হলওয়েলকে মুক্তি দিয়ে মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেন।

অন্যদিকে এ খবর মাদ্রাজ পৌঁছলে রবার্ট ক্লাইভ ইউরোপ থেকে আগত দুইহাজার সৈন্য ও আধুনিক গোলাবারুদসহ মাদ্রাজ থেকে দ্রুত কলকাতায় এসে পৌঁছান। ২ জানুয়ারী ১৭৫৭ সালে ইংরেজরা কলকাতা পূর্ন দখল করে নেয়। নবাব সিরাজউদ্দৌলা ইংরেজদের হুমকির মুখে পুনরায় ২০জানুয়ারী ১৭৫৭ সালে কলকাতা দখল করেন এবং মানিক চাঁদকে কোলকাতায় দায়িত্বেরেখে হুগলী অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু মানিকচাঁদ, জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, রায়দুলোর্ভ ও নন্দকুমার সহ আরো অনেকে ঘুষের বিনিময়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে কোলকাতা ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়। ঘটনার আকস্মিকতায় সিরাজ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। ঠিক এমনি সময়ে সিরাজ জানতে পারেন আফগান অধিপতি আহমদশাহ আবদালী মধ্য ভারতে বিভিন্ন নগর, শহর দখল করে চলছেন। এই আবদালী কর্তৃক এক পর্যায়ে মুর্শিদাবাদ আক্রমনের হুমকি তরুন নবাব সিরাজকে বিচলিত করে তোলে। অপরদিকে ইংরেজরা নবাবের সংঙ্গে বোঝাপাড়া করার জন্য এদেশের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হাতকরার উদ্দেশ্যে কিছুটা সময়ের প্রয়োজন অনুভব করে। এই সব কারনে ১৭৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারী নবাব ও ইংরেজদের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী ইংরেজরা কোলকাতা ফিরে যায় এবং ফোর্ট উইলিয়াম দূর্গ মেরামত ও নির্মানের কাজ করে। এ চুক্তিকে আলীনগর সন্ধি নামে অভিহিত করা হয়। যার শর্তানুযায়ী সিরাজউদ্দৌলা ১৭১৭ সালের মোঘল বাদশাহের ফরমানের মাধ্যমে ইংরেজদের প্রদত্ত সুবিধা সমুহ মেনে নেন।

এ চুক্তির পর পরই সময় ক্ষেপনের মাধ্যমে ইংরেজরা সিরাজের পরিবর্তে তাদের আজ্ঞাবহ কাউকে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এই ষড়যন্ত্রের সাথে অনেক আগে থেকেই হিন্দু রাজ কর্মচারীরা জড়িত ছিল। তাদের জোগসাজস যাতে ধরা না পড়ে সে জন্য তারা দুজন মুসলমান ইয়ার লতিফ ও মীর জাফর আলী খাঁকে নবাবীর লোভ দেখিয়ে হাত করে নেয়। অপরদিকে আলীবর্দী খাঁন যে তাঁর জীবিত কালেই সিরাজকে নবাব করতে চান তা জানতে পেরে আলীবর্দীর নিকট আত্মীয় স্বজনরা আগে থেকেই সিরাজকে হিংসার চোখে দেখতে থাকেন। বিশেষ করে সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম ও মায়মুনা বেগম শুরু থেকেই সিরাজকে মেনে নিতে পারেননি। কেননা ঘসেটি বেগমের ছেলে মোহাম্মদী বেগ এবং মায়মুনা বেগমের ছেলে শওকত জং এর ও সিংহাসনের প্রতি লোভ ছিল। আলীবর্দী খাঁনের পরিবারের এই অসন্তোষকে পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে কুচক্রী জগৎ শেঠ, উঁমিচাঁদ, রায়দুর্লভ, রাজবল্লভ, মানিকলাল, নন্দকুমার প্রমুখরা সিরাজকে সিংহাসন থেকে সরিয়ে দেয়ার কুৎসিৎ ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। এই সব ষড়যন্ত্রকারীদের সাথে ইংরেজদের যে গোপন বৈঠক হয় তাতে তাঁরা এই মর্মে একমত হন যে সিরাজকে সরিয়ে তাদের অনুগত একজন মুসলমানকে নবাব করতে হবে, যাতে জনগনের মধ্যে কোন সন্দেহ সৃষ্টি হতে না পারে। ২ মে ১৭৫৭ সালে জগৎ শেঠের বাড়ীতে বাংলা ধ্বংসের এ গোপন বৈঠকটি শুরু হয়।

বৈঠকে উমিচাঁদ, রায়দুলর্ভ, রাজবল্লভ, মীর জাফর এবং আরো কয়েক জন বিশিষ্ট ব্যক্তি যোগ দেন। ইংরেজ কোম্পানীর এজেন্ট ওয়াটসও পর্দাঘেরা পাল্কিতে চড়ে সেদিন সে গোপনে বৈঠকটিতে মিলিত হয়েছিলেন। এই বৈঠকেই সিরাজউদ্দৌলাকে সরিয়ে মীর জাফরকে বাংলার মসনদে বসাবার সিদ্ধান্ত হয়। সিরাজউদ্দৌলার সেনাপতি মীর জাফর ছিলেন এই ঘটনার অপরিনামদর্শী নির্বোধ ক্রীড়ানক। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মীর জাফর ৪ জুন ১৭৫৭ তারিখে উক্ত চুক্তি পত্রে স্বাক্ষর করেন। চুক্তি অনুযায়ী তিনি ইংরেজদেরকে সৈন্য দিয়ে সাহায্যের বিনিময়ে কয়েকটি বানিজ্য সুবিধা দিতে স্বীকার করেন এবং ইংরেজ সৈন্যদের ব্যয়ভার বহন সহ কোম্পানীর ক্ষতিপুরন বাবদ ২ কোটি টাকা দিতে সম্মত হন। উমিচাঁদকে ও ২০ লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
মীর জাফর আলী খাঁ ছিলেন আলী বর্দী খাঁর ভগ্নিপতি। আলীবর্দী খাঁর সময় থেকেই মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতার কুখ্যাতি ছিল। যার জন্য নবাব আলীবর্দীর নিকট তাকে কয়েকবার শাস্তি পেতে হয়। তবে ভগ্নিপতি ছিলেন বিধায় আলীবর্দী তাকে ক্ষমা করে পুনরায় প্রধান সেনা পতির পদে বহাল রাখেন। এই একই ভুল সিরাজউদ্দৌলাও করেছেন। মীর জাফরের ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পেরে সিরাজ তাকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে অপসারন করে জনৈক আব্দুল হাদী খানকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করেন। কিন্তু জগৎশেঠ ও অন্যান্য বিশ্বাস ঘাতকগন আগেথেকেই ষড়যন্ত্রে অংশীদার বলে তারা সিরাজকে এই মর্মে পরামর্শ দেন যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে শক্তি সংগ্রহে মীরজাফরের প্রয়োজন হবে। বিশ্বাসঘাতকদের পরামর্শে প্রভাবিত হয়ে নবাব তাদের পরামর্শ গ্রহন করেন। আত্মীয়তার কারণে সিরাজ নিজেই মীরজাফরের বাড়ীতে গিয়ে আলীবর্দীর নামে ইংরেজদের বিরুদ্ধে তাঁকে সাহায্যের জন্য এবং বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় সঠিক ভুমিকা পালনের জন্য এক আবেগময় ও মর্মস্পর্শী আবেদন জানান। সিরাজের আবেগময় আবেদনে মীর জাফর পবিত্র কুরআন শরীফ হাতে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে নবাবের পক্ষে মরনপন যুদ্ধ করার শপথ গ্রহন করেন। কুরআন হাতে নিয়ে শপথ করায় সিরাজ মীর জাফরকে বিশ্বাস করেন এবং তার তরুন সুলভ ঔদার্যে তাঁকে ক্ষমা করে পুনরায় প্রধান সেনাপতির পদে বহাল করেন। ঐতিহাসিকদের মতে এ সময় যদি মীর জাফর ও তাঁর কুচক্রী সহচরদের আসল চরিত্র সিরাজউদ্দৌলা বুঝতে পারতেন এবং তাদের বন্দী করে শাস্তির ব্যবস্থা করেন তাহলে ইংরেজরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারতোনা এবং বাংলায় ইতিহাস হয়তো অন্যভাবে লেখা হতো, কিন্তু সমকালীন ভারতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বাংলাদেশে বিদেশীদের আচরন, নিজ দরবারের কর্মচারীদের মধ্যকার অবিশ্বাস ও চক্রান্ত এবং সিংহাসন নিয়ে পারিবারিক বিদ্বেষ ও শত্রুতা এই তরুন নবাবকে যেন কিংর্তব্যবিমূড়তায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। এই জটিল পরিস্থিতিতে তিনি কাকে বিশ্বাস করবেন, কাকে করবেননা তা বুঝে ওঠাও ছিল অত্যন্ত দূরূহ।

অপর দিকে সাময়িক পদচ্যুতিতে অপমানিত হয়ে মীর জাফর বাংলায় অভ্যুত্থান ত্বরান্বিত করার জন্য পুনরায় ইংরেজ কাউন্সিলর ও সৈন্য দলকে ৫০ লক্ষ টাকা দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। এমনি একটি সুযোগের প্রতিক্ষায় ছিলেন সুচতুর ও কুটকৌশলী রবার্ট ক্লাইভ। মীরজাফরের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ইংরেজরা ১৭৫৭ সালের ১৩ ই জুন নবাবকে চরমপত্র দিয়ে কোম্পানীর ব্যবসায় বাধা দানের জন্য দায়ী করেন। এই পত্র নির্ভেজাল দেশপ্রেমিক এক তরুন নবাবকে সেদিন এক করুন ও কঠিন সত্যের সম্মুখে দাঁড় করিয়েছিল। পত্রে ক্লাইভের যে দাম্ভিকতা ও অহংকার প্রকাশ পেয়েছিল তা সহ্য করা স্বাধীনচেতা সিরাজের পক্ষে সম্ভব ছিলনা।

১৩ জুন সমগ্র ব্রিটিশ বাহিনী গুলি গোলাবারুদ নিয়ে কালা আদমীরা গঙ্গাতীরের বাদশাহী রাস্তার উপর দিয়ে পদব্রজে অগ্রসর হতে লাগল। কোলকাতা থেকে মুর্শিদাবাদ অনেক দুর পথ। পথপার্শে¦ হুগলী এবং কাটোয়ার দুগের্, অগ্রদ্বীপ এবং পলাশীর ছাউনিতে নবাবের সিপাহী-সেনারা বসে ছিলেন। তারা স্বস্ব জায়গায় বীরোচিত কর্তব্য সম্পাদন করলে হয়তো হুগলীর নিকটেই ইংরেজরা সসৈন্যে পশ্চাদপদ হতে বাধ্য হতো। কিন্তু ইংরেজদের গতিরোধ করা দূরের থাকুক কেউ একবার বীরের ন্যায় সম্মুখে অগ্রসর হবার ও প্রয়োজন মনে করলনা। ইতিহাসে কেবল এই পর্যন্তই দেখতে পাওয়া যায় যে নবাব পক্ষীয় হুগলীর ফৌজদার বা তাদের কালা সিপাহীরা ইংরেজদের যুদ্ধ জাহাজ দেখে এবং ক্লাইভের তর্জন গর্জন শুনে নিতান্ত ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কোন প্রতিরোধ না গড়ে নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেছিল।

এদিকে বিদ্রোহের সন্ধান পেয়ে সিরাজ পুনরায় মীর জাফরকে কারারুদ্ধ করার সংকল্প পরিত্যাগ করে তাকে স্বপক্ষে টেনে আনবার আয়োজন করতে লাগলেন। ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ এটিকে সিরাজউদ্দৌলার দূরদর্শিতার অভাবের উৎকৃষ্ট প্রমান হিসেবে উল্লেখ করেন। কারণ তিনি বারবার বিশ্বাস ভংগকারী মীর জাফরের উপর আস্থা স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সিরাজউদ্দৌলা সে সময় বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় এতটাই ব্যাকুল ছিলেন যে কেউ কেউ নবাবকে মীরজাফরকে কারারুদ্ধ করার জন্য উত্তেজিত করলেও সিরাজউদ্দৌলা সে কথায় কর্নপাত করলেন না। আত্মঅভিমান তুচ্ছ করে স্বয়ং সিরাজউদ্দৌলা পুনরায় ১৫ জুন মীর জাফরের বাড়ীতে উপনীত হলেন। এর আগে মীর জাফরকে রাজ সদনে ডাকা হলেও বিশ্বাস ঘাতকতা প্রকাশ পেয়ে যাওয়ায় সাহসের অভাবে তিনি রাজসদনে উপস্থিত হননি। সিরাজ মীর জাফরকে আবারও ক্ষমা করে দিয়ে আল্লাহর নামে, মুহাম্মদের নামে, মুসলমানদের গৌরবের নামে, আলীবর্দীর বংশ মর্যাদার দোহাই দিয়ে ফিরিঙ্গির ¯েœহ বন্ধন ছিন্ন করার জন্য পুন:পুন উত্তেজিত করতে লাগলেন তখন মীরজাফরকে সব কথাই স্বীকার করতে হলো। তখন আবার “কুরআন” আসলো। আবার মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ মাথায় নিয়ে, মুসলমান নরপতির নিকট মুসলমান সেনা পতি জানু পেতে শপথ করলেন আল্লাহর নামে, পয়গম্বরের নামে, ধর্ম শপথ করে অঙ্গীকার করছি, যতদিন বেচেঁ থাকবো মুসলমানদের সিংহাসন রক্ষা করব, জীবন থাকতে বিধর্মী ফিরিঙ্গীর সহায়তা করবনা। সিরাজউদ্দৌলার পুনরায় মীর জাফরের প্রতি বিশ্বাস জন্মাল। তার সব সন্দেহ দুর হয়ে গেল। হিন্দু যে ব্রাক্ষনের পাদস্পর্শ করে মিথ্যা বলতে পারে, সে কথা সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাস করতেন না পেরে একবার উমিচাঁদের ধর্ম শপথে প্রতারিত হয়ে ছিলেন। কিন্তু একজন মুসলমান যে কুরআন মাথায় নিয়ে মিথ্যা বলতে সাহস করবে তা বিশ্বাস করতে না পেরে সিরাজউদ্দৌলা আবারও প্রতারিত হলেন। গৃহ বিবাদের মীমাংসা করে সিরাজউদ্দৌলা পলাশী প্রান্তরে সসৈন্যে সমবেত হবার আয়োজন করতে লাগলেন। এমতাবস্থায় বিদ্রোহীদের প্ররোচনায় সেনাদল বেতন না পেলে যুদ্ধ যাত্রা করতে অসম্মত হল। নবাব তাদের পূর্বের বেতন পরিশোধ করার পর রায়র্দুলভ, ইয়ার লতিফ, মীর জাফর, মীর মদন, মোহন লাল এবং ফরাসী সেনা নায়ক সিনফ্রে এক এক বিভাগের সেনা চালনার ভার গ্রহন করে সিরাজউদ্দৌলার সহগামী হলেন।

পুনরায় শুরু হল বিশ্বাস ঘাতকের অবর্ননীয় ঘাতকতা। সিরাজউদ্দৌলার সাথে কোরআন শপথ করে বাংলার স্বাধীনতা রক্ষায় যে প্রতিশ্রুতি মীর জাফর দিয়েছিল সেই চক্রান্তের কর্নধার নিজেই ১৬ জুন ক্লাইভকে একটি পত্র লিখে জানিয়ে দেন যে সিরাজের সাথে মৌখিক সখ্য স্থাপন করতে তিনি বাধ্য হয়েছেন। এর কারনে ইংরেজদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি বিন্দু মাত্রও ত্রুটি করবেন না তাও লিখে পাঠান।
মীর জাফরের পাঠানো চিঠির সত্যতা যাছাইয়ের জন্য ক্লাইভ ১৮ জুন সকাল বেলা ২০০ ঘোড়া এবং ৩০০ সিপাহী নিয়ে মেজর কুটকে কাটোয়া অভিমুখে অগ্রসর হতে বললেন। কাটোয়া দুর্গ বীরবিক্রমের লীলাভুমি বলে চির বিখ্যাত। ষড়যন্তের পরিপ্রেক্ষিতে এবার দুর্গদ্বারে কোন যুদ্ধ হলো না। নবাব সেনারা ইংরেজদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য কিয়ৎক্ষন যুদ্ধাভিনয়ের পর স্বহস্তে চালে চালে আগুন ধরিয়ে দিয়ে দুর্গ হতে পলায়ন করল। বিনা যুদ্ধে ক্লাইভ ধীরে ধীরে সসৈন্যে কাটোয়া অধিকার করে নেন। নাগরিকগন জীবন রক্ষায় পলায়ন করায় এত চাল সেদিন ইংরেজদের হস্তগত হলো যে তাতে দশ সহস্র সিপাহী বছর ধরে উদর পূরন করতে পারত।
মীর জাফরের এত সহযোগীতার পরেও ক্লাইভের তার প্রতি আস্থার সংকট ছিল। না জানি তিনি চুড়ান্ত সমীরনে আমাদের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করে বসেন কিনা। তিনি অভিযান পরিচালনা নিয়ে দ্বীধা দ্বন্দে ছিলেন। ক্লাইভ স্বীকার করে গেছেন তার কেবলই ভয় পেতে লাগলো যদি পরাজিত হই তবে আর একজনও সে পরাজয় কাহিনী বহন করার জন্য লন্ডনে প্রত্যাগমন করবার সময় পাবেনা যখন ছিল ক্লাইভের বাস্তব অবস্থা তখনই ২১ শে জুন বিকালে মীর জাফরের নিকট হতে এক সঙ্গে দুইখান পত্র এসে উপনীত হল। একটি পত্র ক্লাইভের নামে, অপরটি উমরবেগের নামে। উমরবেগ ছিলেন মীর জাফরের বিশ্বস্ত অনুচর। উভয় পত্রে ক্লাইভের সন্দেহ অপসারিত হল।

ক্লাইভের বিশ্বস্ত সহচর স্ক্রাফটন লিখেছেন ২১ জুন মীর জাফরের পত্র পেয়ে ক্লাইভ ঘুরে বসে ছিলেন এবং তাঁর আদেশে ২২ শে জুন সকাল ৫ঘটিকার সময় বৃটিশ বাহিনী গঙ্গা পার হয়েছিল।
In this doubtful interval the majority of our officers were against crossing the river and everything before the face of disappointment but on the 21st of June, the colonel received a letter from meer Jaffor, which determined him to hazard a battle and he passed the river at five in the next morning Seraftion.

মীর জাফরের পত্র
That the Nabab had halted at Muncara, a village six Miles to the south of Cassimbazar and intended to entrench and wait the evening at that place, where jaffar proposed that the English should attack him by surprise, marching round by the inland part of the island.

ক্লাইভের উত্তর
That he should march to Plassey without delay and would that the next morning advance six miles further to the village of Daudpoor; but if Meer jaffor did not join him there he would make peace with the Nabab.
ক্লাইভের প্রত্যুত্তরে স্পষ্টই বুঝা যায় যে তিনি ২১ জুন অপরাহ্ন যুদ্ধ যাত্রা করেননি, তবে পত্র পাবার পর যুদ্ধ যাত্রা করতে কৃত সংকল্প হয়ে মীর জাফরকে সংবাদ পাঠিয়েছেন। মীর জাফরের উপদেশ না পেয়ে, ইংরেজরা সসৈন্যে কাটোয়ায় অপেক্ষা করছিলেন এবং সিদ্ধান্ত নেবার জন্য সমর সভার অধিবেশন আহবান করেছিলেন। মীর জাফরের উপদেশ পাওয়া মাত্র আবার ইংরেজ সেনাপতির শৌয্যবীর্য্য জাগরিত হয়ে উঠেছিল। ক্লাইভ নিজেও স্বীকার করে গেছেন যে সমর সভার অধিবেশন শেষ হলে ২৪ ঘন্টার বিশেষ গবেষনার পরে তার মত পরিবর্তন হয় এবং ২২ জুন সকালে সেনাদল গঙ্গা পার হয়।

মীর জাফরের পূর্বকথিত সংকেতানুসারে ইংরেজ বাহিনী ২২ শে জুন সকালে ভাগীরথী পার হয়ে দলে দলে পলাশীর দিকে অগ্রসর হতে লাগল। নবাব সেনারা পলাশী অধিকার করে নেয় কিনা এই আশংকায় ইংরেজরা বৃষ্টি বাদল মাথায় করে তাড়াতাড়ি ছুটে চললো এবং রাত্রি ১টার সময়ে পলাশীর আম্র বনে পৌঁছল।
২৩ জুন ১৭৫৭ সালে রজনী প্রভাত হলো। যে প্রভাতে ভারত গগনে বৃটিশ সৌভাগ্য সূর্য উদিত হবার সূত্রপাত হয়েছিল। ১১৭০ হিজরী ৫ শাওয়াল, বৃহস্পতিবার পলাশী প্রান্তরে ইংরেজ ও বাঙ্গালী শক্তি পরীক্ষার জন্য একে একে গাত্রোত্থান করতে লাগলো।

ইংরেজরা আম্রকাননের পশ্চিম উত্তর কোনে লক্ষবাগের উত্তরে উম্মুক্ত প্রান্তরে বুহ্য রচনা করলেন। সিরাজউদ্দৌলা প্রত্যুষেই মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুর্লভ কে শিবির হতে অগ্রসর হবার অনুমতি দিয়েছিলেন। তারা অর্ধচন্দ্রাকারে বুহ্য রচনা করে ধীর মন্থরগতিতে আম্রবন বেষ্টন করার জন্য অগ্রসর হতে লাগলেন। মীর মদনের সিপাহী সেনা সম্মুখস্থ সরোবর তীরে সমবেত হয়েছিল। এক পার্শ্বে ফরাসী বীর সিনফ্রে, এক পাশ্বে বাঙ্গালী বীর মোহনলাল, মধ্যস্থলে বাঙ্গালী বীর সেনাপতি মীর মদন সেনাচালনার ভার গ্রহন করলেন।
সিরাজ বাহিনীর রনহস্তী, সুশিক্ষিত অশ্বসেনা এবং সুগঠিত আগ্নেআস্ত্র যখন ধীরে ধীরে সম্মুখে অগ্রসর হতে লাগল তখন ইংরেজরা ভাবলো সিরাজ বুহ্য দুর্ভেদ্য। বেলা ৮ ঘটিকার সময় মীর মদন সরোবরতীরে কামানে অগ্নি সংযোগ করলেন। প্রথম গোলাতেই ইংরেজ পক্ষে একজন হত এবং এক জন আহত হল। তাহার পর মুহুমুর্হু কামান পরিচালনায় একের পর এক ইংরেজ সেনা ধরাশায়ী হতে লাগল। মাত্র ৩০মিনিটের যুদ্ধে ১০জন গোরা এবং ২০জন কালা সিপাহীর মৃত্যু হল। ইংরেজ সেনাদের কামান পরিচালনায় নবাবের গোলন্দাজদের ক্ষতি করতে পারেনি, তারা অক্ষত দেহে বিপুল বিক্রমে ইংরেজ সেনার মধ্যে মিনিটে মিনিটে গোলাবর্ষন করতে লাগল। এমতাবস্থায় আত্ম রক্ষার জন্য ক্লাইভ আম্র বনে লুকিয়ে বৃক্ষঅন্তরালে বসে পড়ল। নবাব সেনার বুহ্য রচনায় এবং সমর কৌশলে ক্লাইভের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠেছিল। তিনি উমিচাঁদকে ভৎসনা করে বলতে লাগলেন “তোমাদের বিশ্বাস করে বড়ই কুর্ক করেছি” তোমাদের সঙ্গে কথা ছিল যে যৎ সামান্যই যুদ্ধাভিনয় হলেই মনস্কামনা পূর্ণ হবে; সিরাজসেনা যুদ্ধ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি প্রদর্শন করবেনা। এখনযে তার সকল কথাই বিপরীত মনে হচ্ছে। উমিচাঁদ বিনীত ভাবে নিবেদন করলেন- যারা যুদ্ধ করছে তারা মীরমদন এবং মোহনলালের সেনাদল; তারাই কেবল প্রভুভক্ত। তাদের কোন রকমে পরাজিত করতে পারলেই হয়; অন্যান্য সেনা নায়কগন কেউ অস্ত্র চালনা করবেন না।

অন্যদিকে মীরমদন ধীরেধীরে সম্মুখে অগ্রসর হয়ে বিপুল বিক্রমে গোলা চালনা করতে লাগলেন। সেই সময়ে মীর জাফরের চক্রবুহ্য যদি আর একটু অগ্রসর হয়ে কামানে অগ্নি সংযোগ করতো তাহলে আর রক্ষা ছিলনা। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লতিফ, রায়দুলর্ভ যেখানে সেনা সমাবেশ করেছিলেন, সেখানেই পুতুলের ন্যায় দাঁড়িয়ে রণ কৌতুক দর্শন করতে লাগলেন। ঠিক মধ্যাহ্ন সময়ে বৃষ্টি শুরু হল;মীরমদনের অনেক বারুদ ভিজে গেল কামানগুলির উপর ঢাকনা না থাকায় তা শিথিল হয়ে পড়ল। মীর মদন আঘাত প্রাপ্ত হওয়ার পর ধরা ধরি করে তাকে সিরাজউদ্দৌলার সম্মুখে উপনীত করলে তিনি শুধু বলতে পারলেন “শত্রুসেনা আমৃবনে পলায়ন করেছে, তথাপি নবাবের প্রধান সেনাপতিগন কেউ যুদ্ধ করছেনা: সসৈন্য চিত্রার্পিতের ন্যায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মীর মদনের আকস্মাৎ মৃত্যুতে সিরাজের বল ভরসা আকস্মাত তিরোহিত হয়ে গেল। সিরাজউদ্দৌলার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়ল। কারণ দেশপেমিক মীর মদনের ভরসা পেয়ে সিরাজউদ্দৌলা শত্রুদলের কুটিল কৌশলে ভ্রুক্ষেপ করেন নি।

সিরাজউদ্দৌলা নিরুপায় হয়ে আবার ও রাজমুকুট রেখে দিয়ে ব্যাকুল হৃদয়ে মীর জাফরকে বলে উঠলেন যা হবার তা হয়েছে, তুমি ভিন্ন রাজমুকুট রক্ষা করার এমন আর কেউ নেই। মাতামহ জীবিত নেই। তুমিই এখন তার স্থান পূর্ন কর। মীর জাফর! আলীবর্দীর পূন্যনাম স্মরন করে দেশের মান সম্ভ্রম এবং আমায় জীবন রক্ষায় সহায়তা কর। নবাবের অনুরোধে আবারও মীর জাফর প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে রাজমুকুটকে কুর্নিশ করে বুকের উপর হাত রেখে বিশ্বস্ত ভাবে বলতে লাগলেন অবশ্যই শত্রু জয় করব। কিন্তু আজ দিবা অবসান প্রায় হয়ে পড়েছে; আজ সেনা দল শিবিরে প্রত্যাগমন করুক; প্রভাতে আবার যুদ্ধ করলেই হবে; সিরাজ বললেন নিশারনে ইংরেজ সেনা শিবিরে আক্রমন করলেই যে সর্বনাশ হবে? মীর জাফর সগর্বে বলে উঠলেন আমরা রয়েছি কেন?

মীর জাফরের প্রতারনায় নবাবের আবারও মতিভ্রম হলো। মীর জাফর যে কা¬ইভের পরামর্শে নবাবের সেনাদের যুদ্ধ বিরতি করতে বলল তা তিনি বুঝে উঠতে পারেননি। তিনি মীর জাফরের পরামর্শকে গুরুত্ব দিয়ে সেনা দলকে প্রত্যাগমন করার জন্য আদেশ প্রদান করলেন। নবাবের এ সিদ্ধান্ত মোহনলাল মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি তখনও বিপুল বিক্রমে শত্রুসেনার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি সমস্বরে বলে উঠলেন “আর দুই চারি দন্ডের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হবে এখন কি শিবিরে প্রত্যাগমন করার সময়? পদযাত্রা পশ্চাদগামী হলে, সিপাহী দল ছত্র ভংগ হয়ে সর্বনাশ হবে- ফিরবনা যুদ্ধ করব? মীর জাফরের মৌখিক উত্তেজনায় আত্মবিস্মৃত সিরাজউদ্দৌলা পুনরায় মোহনলালকে শিবিরে প্রত্যাগমনের নিদের্শ দিলেন। রাগে ক্ষোভে মোহনলালের নয়ন যুগল হতে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হতে লাগল। কিন্তু তিনি আর কি করেবেন? সমরক্ষেত্রে সেনাপতির আদেশ লঙ্ঘন করতে পারলেন না।

মীর জাফরের মনস্কামনা পূর্ন হল। তিনি তাৎক্ষনাৎ ক্লাইভকে চিঠি লিখে পাঠালেন। “মীর মদন গতায়ু হয়েছে, আর লুকিয়ে থাকা নিস্প্রয়োজন। ইচ্ছা হয় এখনই অথবা রাত্রি তিন ঘটিকার সময় শিবিরে আক্রমন করবেন, তাহলে সহজে কার্য সিদ্ধি হবে”। মোহনলালকে শিবিরে প্রত্যাগমন করতে দেখে, ইংরেজ সেনা আম্রবন হতে বের হতে লাগল। এতদর্শনে নবাব সেনাদের অনেকই পলায়ন করতে লাগল। কিন্তু ফরাসী বীর সিনফ্রে এবং বাঙ্গালী বীর মোহনলাল ফিরে দাঁড়ালেন; তাদের সেনাদল হটলনা। তারা অকুতোভয়ে অমিতবিক্রমে প্রানপ্রনে যুদ্ধ করতে লাগল।

ইতোমধ্যে প্রহসনের অন্যতম নায়ক রায়দুলর্ভ তাদের ষড়যন্ত্রের সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসে সিপাহী সেনাকে ইতস্তত পালায়ন করতে দেখে সিরাজউদ্দৌলাকেও পলায়ন করার জন্য উত্তেজনা প্রদান করতে লাগলেন। সিরাজ সহসা যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পরিত্যাগ না করতে চাইলেও বিপুল সেনা প্রবাহের অল্পলোকই তাঁর জন্য যুদ্ধ করছে এরুপ অবস্থা তাঁর মনে হলো, পলাশীতে পরাজিত না হয়ে রাজধানী রক্ষার জন্য মুর্শিদাবাদে গমন করাই বুদ্ধিমানের কাজ। মুসলমান ইতিহাস লেখকগনও সিরাজের সমরক্ষেত্র পরিত্যাগকে সমর্থন করে নাই। বোধ হয় পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং সেনাপতিদের ষড়যন্ত্র আচঁ করে শেষ পর্যন্ত কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় সিরাজ দুই সহস্র অশ্বারহী নিয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে রাজধানী ফিরে গিয়েছিলেন। অন্যদিকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত অবিশ্রান্ত যুদ্ধ করতে করতে মোহনলাল এবং সিনফ্রে বিশ্বাস ঘাতক নবাব সেনানায়কদের উপর বিরক্ত হয়ে সমরক্ষেত্র পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। নবাবের পরিত্যক্ত জনশূন্য পটমন্ডপের দিকে ইংরেজ সেনা মহাদম্ভে অগ্রসর হয়ে, পলাশী যুদ্ধের শেষ চিত্রপট উদঘটিত করল। সেনাপতিদের বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে এ ভাবে প্রায় বিনা যুদ্ধে পলাশী প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়ে গেল।

রাজধানীতে প্রত্যাগমন করতে না করতে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় কাহীনী চারদিকে বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ল। লুন্ঠন ভয়ে যে যেখানে পারল পলায়ন করতে আরম্ভ করল। মুঘল প্রতাপ তখন ধীরে ধীরে অস্তাচলগামী। ভারত বর্ষের রত্ম সিংহাসন বালকের ক্রীড়া কৌতুকে পরিনত হয়েছিল। সিরাজউদ্দৌলার রাজধানী রক্ষার জন্য পাত্র-মিত্রগনকে পুন:পুন: আহবান করতে লাগলেন। অন্যের কথা দুরে থাক এমনকি তার শ্বশুর মো: ইরিচ খাঁ পর্যন্ত সিরাজের আহবানে কর্নপাত না করে ধন রতœ নিয়ে প্রাণ রক্ষার ভয়ে পলায়ন করলেন। সকল দিকের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় পরও ভগ্নমনোরথ না হয়ে সিরাজ নিজেই সেনা সংগ্রহের জন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। গুপ্ত ধনাগার উম্মুক্ত করা হলো প্রভাত হতে সায়াহ্ন এবং সায়াহ্ন হতে প্রথম রাত্রি পর্যন্ত সেনাদলকে উত্তেজিত করার জন্য মুক্ত হস্তে অর্থদান চলতে লাগল। রাজকোষ উম্মুক্ত পেয়ে শরীর রক্ষক সেনাদল যথেষ্ট অর্থ শোষন করল এবং প্রাণ পনে সিংহাসন রক্ষা করবে বলে ধর্ম প্রতিজ্ঞা করে একে একে পলায়ন করতে আরম্ভ করল।

শেষ প্রচেষ্টাও বিফল হওয়ায় মাতামহের অতিসাধের হিরাঝিলের বিচিত্র রাজপ্রাসাদ এবং বঙ্গ বিহার-উড়িষ্যার গৌরবময় মোগল রাজসিংহাসন পশ্চাদরেখে নবাব সিরাজউদ্দৌলা পথের ফকিরের ন্যায় রাজধানী হতে বের হয়ে পড়লেন। চির সহচরী লুৎফুন্নেসা বেগম ছায়ার ন্যায় পশ্চাতে পশ্চাতে অনুগমন করতে লাগল। সিরাজ স্থলপথে ভগবানগোলায় উপনিত হয়ে, তথা হতে নৌকারোহনে পদ্মা প্রবাল তরঙ্গ অতিক্রম করে মহানন্দা নদীর ভেতর দিয়ে উজান বেয়ে উত্তরাভিমুখে চলিতে আরম্ভ করলেন। সিরাজউদ্দৌলা যে আত্মপ্রান তুচ্ছ করে কেবল স্বাধীনতা রক্ষা করবার জন্যই জনশুন্য রাজধানী হতে পলায়ন করেছিলেন, তাঁর পলায়ন তাঁর উৎকৃষ্ট প্রমান। কোনোরুপে পশ্চিমাঞ্চলে পলায়ন করে মাসিয়ে লা সাহেবের সেনাসহারে পাটনা পর্যন্ত গমন করা ও তথায় বিহারের শাষনকর্তা রামনারায়নের সেনাবল নিয়ে সিংহাসন রক্ষার আয়োজন করাই সিরাজউদ্দৌলার উদ্দেশ্য ছিল। সিরাজের পদাংক অনুসরন করতে গিয়ে মহারাজ মোহনলাল ও কারারুদ্ধ হলেন। মীরজাফর মোহনলালকে বিদ্রোহী সেনা নায়ক রায়দুলর্ভের হস্তে সমার্পন করলেন। মোহনলালকে দীর্ঘকাল কারাক্লেশ ভোগ করতে হলনা। রায়দুলর্ভ তার ধন সম্পদ ও জীবনহরণ করে মীর জাফরের আকাঙ্খা পুরণ করলেন। ২৯ জুন ২০০ গোরা এবং ৫০০ কালা সিপাহী সমভিবিহারে ইংরেজ সেনাপতি মন্সুরগঞ্জ আগমন করেন। ক্লাইভ বলে গেছেন “সে দিন যতলোক রাজ পথের পার্শ্বে সমবেত হয়েছিল তারা ইংরেজ নির্মূলে কৃত সংকল্প হলে কেবল লাঠি সোটা এবং ইস্টক নিক্ষেপেই তৎকার্র্য সাধন করতে পারতো”। অতঃপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্লাইভ মীরজাফরকে মসনদে বসিয়ে দিয়ে, কোম্পানী বাহাদুরের প্রতিনিধি স্বরূপ স্বয়ং সর্বপ্রথমেই “নজর” প্রদান করে মীরজাফরকে বঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার নবাব বলে অভিবাদন করলেন। অন্যদিকে সিরাজউদ্দৌলার খোঁজে চারিদিকে সিপাহী সেনা ছুটে চলল। সিরাজের নৌকা যখন বখর বরহাল নামক পুরাতন পল্লীর নিকটবর্তী হলো, তখন সহসা তার গতিরোধ হলো। আকস্মিক দুর্ঘটনায় সিরাজউদ্দৌলার সর্বনাশের সুত্রপাত হলো। সিরাজ ভেবেছিলেন তার পরাজয় বার্তা তখন পর্যন্তও দুর দুরান্তে পৌঁছায়নি। সে জন্য নদী তীরে অবতরণ করে খাদ্য সংগ্রহের জন্য নিকটস্থ একটি মসজিদে গমন করলেন। সেখানে দানশা নামক এক মুসলমান সাধু ছিল। মসজিদের লোকে ক্ষুদ্র পল্লীতে সিরাজউদ্দৌলার ন্যায় অতিথি পরায়ন নৌকা দেখে বিস্ময়াবিষ্ট হয়েছিল। মীর দাউদ ও মীর কাশেমের সেনাদল সেদিন সিরাজের খোঁেজ নিকটেই অবস্থান করছিলেন। অর্থলোভে লোকেরা তাদেরকে সিরাজউদ্দৌলার সন্ধান বলে দিল। সিরাজ ক্ষুধার অন্য গলধঃকরণ করবার ও অবসর পেলেন না, সপরিবারে মীর কাশেমের হাতে বন্দী হলেন। নিয়তির কি নিষ্ঠুর পরিনতি!
“এ কুল ভাঙ্গে, ও কুল গড়ে, এই তো নদীর খেলা,
সকাল বেলা আমীর রে ভাই, ফকির সন্ধ্যা বেলা, এই তো নদীর খেলা। ”

মীর কাশিমের নিকট বন্দী হওয়া অবস্থায় সিরাজ ছিলেন নিরস্ত্র, নিঃসঙ্গ। মীর কাশেম লুৎফুন্নেসা বেগমের বহুমুল্যের রত্নালঙ্কারগুলি আত্মসাৎ করলেন। আত্মভৃত্য বর্গের নিষ্ঠুর নির্যাতনে জীবনমৃত অবস্থায় সিরাজউদ্দৌলা বন্দীবেশে মুর্শিদাবাদে উপনিত হলেন। সিরাজউদ্দৌলার সুকুমার দেহকান্তি নিষ্ঠুর নির্যাতনে মলিন হয়ে উঠেছিল। তাকে দেখামাত্র নাগরিকদের সহানুভুতি উদ্বেলিত হয়ে উঠল। সিরাজকে তার সাধের মুর্শিদাবাদে আনা হল। যেখান থেকে বহুবার তিনি হুংকার দিয়েছেন ইংরেজদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আজ স্বাধীনতাকামী দেশপ্রেমিকের কি নিদারুন পরিনাম! ক্লাইভের নির্দেশে মীর জাফর সিরাজকে রাজমহল থেকে এনে জাফরাগঞ্জ প্রাসাদে (মীর জাফরের প্রাসাদ যা বর্তমানে নিমক হারাম দেউড়ী নামে পরিচিত) একটা ছোট্র কুঠরিতে আটক করে রাখলো। পরদিন গভীর রাতে মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে সিরাজের পিতা মাতার অতি আদরে পালিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা মোহাম্মদীবেগের তরবারীর নিষ্ঠুর আঘাতে অত্যন্ত নির্মমভাবে নিহত হলেন। হত্যার সময় ঘাতকের অট্রহাসিতে কেঁপে উঠেছিল জাফরগঞ্জ প্রাসাদ, কেঁপে উঠেছিল মুর্শিদাবাদ। সেদিন বাংলার স্বাধীন চেতা দেশপ্রেমিক নবাব ঘাতকের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে বাংলাকে, বাংলার জনগনকে অপমানিত করেননি, তিনি শুধু চেয়েছিলেন দু’রাকাত নামাজ পড়ার সময়। কিন্তু সে সময়টুকু ও তাকে দেওয়া হয়নি।

সেদিন ছিল ৩ জুলাই ১৭৫৭ সাল। সিরাজের রুপ লাবন্যময় দেহ উপুর্যপুরি তরবারির আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করেছিল মোহাম্মদীবেগ। পরদিন ৪ জুলাই সেই ছিন্ন ভিন্ন দেহ হাতীর পিঠে চাপিয়ে বের করা হল আনন্দ মিছিল। নেতৃত্বে মীর জাফরের পুত্র মীরন। চললো রাজপথ পরিভ্রমন। সেই ভয়ংকর মিছিল দেখে মুর্শিদাবাদের মানুষ শোকে বিস্ময়ে হাহাকার করে উঠল। তাদের আকুল আর্তনাদ নবাবের বেগম মহলে সিরাজ জননী আমিনা বেগমের কর্নগোচর হয়। তিনি পুত্র শোকে আত্মবিস্মৃত হয়ে অবগুণ্ঠন উম্মোচন পূর্বক রাজপথ অভিমুখে ধাবিত হলেন। যার মুখমন্ডল দর্শন ছিল যেকোন লোকের জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার, আজ তিনি পুত্রের শোচনীয় পরিনতির সংবাদে উম্মুক্ত রাজপথে সমুপস্থিত। হাতীর পৃষ্ঠ হতে পুত্রদেহ নামিয়ে তিনি তা পুন:পুন: চুম্বন করতে লাগলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে শুয়ে পড়লেন। নিষ্ঠুর মীরনের নির্দেশে তার অভদ্র দ্বার রক্ষীগন চড়-কিল-ঘুসি মেরে নবাবের কন্যা ও স্ত্রী এবং সন্তানের মৃত দেহ বক্ষে ধারন করা মা আমিনা বেগমকে জোর করে অন্দর মহলে পাঠিয়ে দিল।

অতঃপর সিরাজের দলিত-মথিত লাশ কবর দেওয়ার কোন ব্যবস্থা না করে বাজারের আবর্জনা স্তুপের মধ্যে ফেলে দেওয়া হল। সারাদিন সিরাজের লাশ পড়ে রইল মুর্শিদাবাদের বাজরের সেই আবর্জনা স্তুপের মধ্যে। নববের মৃতদেহের উপর একটি সামান্য কাপড়ের আচ্ছাদন ও দেওয়ার কেউ প্রয়োজন অনুভব করলনা। ভয়ে কেউ লাশের কাছে আসছিলনা। এই সময়ে মীর্জা জয়নুল আবেদীন নামের এক দয়ালু ওমরাহ মীর জাফরের কাছে আরজি জানালেন “আপনাদের যা লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল তাতো সাধিত হয়েছে। এবার দয়া করে মৃত দেহটি দাফনের জন্য আমাকে অনুমতি দিন”। মীর্জা জয়নুল আবেদীন মানুষটি অত্যান্ত যতœও সম্মানের সাথে বুকে তুলে নিলেন হতভাগ্য নবাব সিরাজউদ্দৌলার ছিন্ন ভিন্ন দেহ। তারপর সম্মানের সাথে লাশ ধুয়ে মুছে নৌকায় তুলে ভাগীরথী পাড়ি দিয়ে চললেন খোশবাগে। খোশবাগ ছিল নবাব আলীবর্দী খানের আনন্দ উদ্যান। এই খোশবাগের গোলাপ বাগানের এক প্রান্তে দাদু আলীবর্দী খানের কবরের পাশে অত্যন্ত সযতেœ মাটিতে অন্তীম শয়নে শুইয়ে দিলেন বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার লাশ। বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ট্রাজেডীকে বুকে নিয়ে সেই থেকে খোশবাগ নীরব-নীথর-নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিরাজ হত্যা নাটকের সমাপ্তির পর জাফর-ক্লাইভ- মীরন গংদের নির্দেশে নবাব আলীবর্দীখার বৃদ্ধা মাতা, সিরাজের খালা ঘষেটি বেগম, সিরাজের মাতা আমিনা বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা বেগম ও তার শিশু কন্যাকে সাধারণ বন্দীর মত ঢাকার বুড়িগঙ্গা তীরের জিঞ্জিরা প্রাসাদে রক্ষীদল কর্তৃক নিয়ে আসা হয়। জিঞ্জিরার নিরব নিভৃত বন্দী শালায় পাঠিয়ে ও মীর জাফর নিশ্চিত থাকতে পারেন নি। ঢাকার ফৌজদার জসারত খানকে গোপনে নির্দেশ পাঠিয়ে ছিলেন তাদের গুপ্তভাবে হত্যা করার জন্য। জসারত খান এ দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলেন। মীর জাফর পুত্র মীরণ জসারত খানের বেয়াদবিতে অসন্তুষ্ঠ হয়ে তাকে নির্দেশ দিলেন রক্ষী দলের নায়ক বাকীর খানের মাধ্যমে বেগমদের যেন মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অন্য দিকে বাকীর খানের উপর গোপন নির্দেশ ছিল বেগমদের নৌকায় করে ধলেশ্বরী নদীর অতল গর্ভে সলিল সমাধি করতে। পরিকল্পনা মাফিক এক গভীর নিশীথে সিরাজের খালা ঘষেটি বেগম ও মাতা আমিনা বেগমকে জিঞ্জিরার প্রাসাদ থেকে বের করে একটি নৌকায় ওঠানো হলো। তারা আশ্বাস পেয়েছিলেন তাদের মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সিরাজ জননী আমিনা বেগম জীবনের শেষ সম্বল কুরআন শরীফ বুকে ঝুলিয়ে তাসবিহ হাতে নি:সঙ্কোচে নৌকায় আরোহন করলেন। ওদিকে ষড়যন্ত্রকারীরা আগে থেকেই নৌকায় কয়েকটি ছিদ্র করে ছিদ্র গুলি গোজ দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিল। গভীর রাতে নৌকা ধলেশ্বরীর মধ্যেস্থলে উপস্থিত হলে অনুচরেরা নৌকার গোজগুলি খুলে দিয়ে অন্য নৌকায় আরোহন করে পলায়ন করলো। দুইজন সম্ভ্রান্ত মহিলাকে বহনকারী নৌকাটি ধীরে ধীরে ধলেশ্বরীর অতল তলে ডুবে গেল। দুজন ভাগ্য বিতাড়িতা নির্দোষ মহিলার জীবন মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল।

কথিত আছে যে মীরণ তার ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দী সিরাজের ছোট ভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে। শোনা যায় যে মেহেদীর শরীরের দুই পার্শে¦ দুইটি কাঠের তক্তা বেধে দুই পাশ দিয়ে প্রচন্ড চাপ দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়।

বন্দী অবস্থায় সিরাজপত্নী লুৎফুন্নেসা বেগম তার শিশু কন্যা উম্মে জহুরাকে নিয়ে মুর্শিদাবাদে যেতে রাজি হননি। এর একটা চমকপ্রদ কারণ ও আছে। সমস্ত বন্দীরা জিঞ্জিরা থাকা কালে মীরনের মাথায় এক নতুন ভুত চেপেছিল। তিনি লুৎফুন্নেসা বেগমকে বিয়ে করার প্রস্তাব পাঠালে লুৎফুন্নেসা তার জবাব দিলেন এই বলে “ যে নারী চিরকাল হাতীর পিঠে চড়ে অভ্যস্ত তার কি কখনো গাধার পিঠে চড়তে ইচ্ছা করে? ” তিনি তার চার বছরের শিশু কন্যাসহ বেছে নিয়েছেন ঢাকার জিঞ্জিরার লাঞ্চিত অপমানিত কারাজীবন, কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছেন তবুওমীরনের মত একটা হীনমন্য অমানুষের কাছে আত্মসমার্পন করেননি। সিরাজের সাথে বিপদে-আপদে, সুখে-দুঃখে, সকল দুঃসময়ে এই মহিয়সী নারী তাকে সান্তনা দিয়েছেন। পলাশীতে বিপর্যয়ের পর নবাব যখন ছুটে এসছেন মুর্শিদাবাদে সবাই যখন তার কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন নিঃসঙ্গ নবাবের সেই বেদনা বিধুর সময়ে নিঃসঙ্কোচে তার সঙ্গী হয়েছেন বেগম লুৎফুন্নেসা। জীবনেও তিনি যেমনি ছিলেন নবাবের সঙ্গীনী, নবাবের মৃত্যুর পরও তিনি ছিলেন তার সঙ্গিনী। বেগম লুৎফুন্নেসার শুধু একটা মাত্র আর্জি ছিল জীবনের বাকী দিন গুলি তিনি তার স্বামী সিরাজের কবরের পাশে কাটাতে চান। বহু অনুনয় বিনয় করার পর সিরাজের মৃত্যুর আট বছর পর তিনি তার স্বামীর কবরের পাশে বসবাসের অনুমতি পেলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি খোশবাগে স্বামীর কবরের পাশে অত্যন্ত দীন হীন ভাবে জীবন যাপন করেছেন। এভাবেই সিরাজের জন্য হাহাকার করতে করতে একদিন মৃত্যু অবস্থায় লুৎফুন্নেসাকে পাওয়া গেল স্বামীর কবরের উপর। নবাব সিরাজউদ্দৌলার কবরের দক্ষিনে তার পায়ের কাছে সমাহিত করা হয়েছে মহীয়সী লুৎফুন্নেসাকে।

১৭৬৫ সাল থেকে ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২১টি বছর তিনি অনাহরে অর্ধাহারে খোশবাগে স্বামীর কবরের পাশে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়েছেন একটি মাত্র কন্যাকে অবলম্বন করে। একথা ভাবতে আজও গা শিউরে ওঠে। এও কি কল্পনা করা যায়?

দেশের জন্য যারা জীবন দেয় তারা মরেও অমর। পলাশীর বিয়োগান্তক ঘটনার ২৫৭ বছর পরও আজ সিরাজউদ্দৌলা বাংলার ঘরে ঘরে একটি জনপ্রিয় নাম। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষায় সিরাজউদ্দৌলা সাফল্য লাভ করেননি সত্য কিন্তু তিনি দেশের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেননি। জীবন দিয়েছেন তবু দেশকে তুলে দেননি বিদেশী সাম্রাজ্যবাদের হতে। নবাব সিরাজ কখনো ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ক্ষমতায় আসেননি। ষড়যন্ত্র আর হঠকারীতার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে থাকার চেষ্টাও করেননি। বরং স্বাধীনতার জন্য শাহাদাত বরণ করে ইতিহাসের স্বর্ন শিখরে নিজের জায়গা করে নিয়েছেন। তাইতো সিরাজউদ্দৌলা এবং দেশপ্রেম শব্দ দু’টি সমার্থক হয়ে এক অন্যের পরিপূরক হয়ে আছে। যেমন সমার্থক শব্দ হচ্ছে মীরজাফর ও বিশ্বাসঘাতকতা। মানুষের মনের মনি কোঠায় অবস্থানরত একটি অমর কিংবদন্তী হচ্ছে সিরাজউদ্দৌলা।
“উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই
নিঃশেষে প্রান যে করিছে দান
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই”

সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে বাংলার যে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম, চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালে বৃটিশদের হাত থেকে বাংলা মুক্ত হয়। গঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামে আলাদা দুটি রাষ্ট্র। তারও ২৪ বছর পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ২০২১ সালে সেই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ সুবর্ন জয়ন্তী উদযাপিত হবার কথা। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল দীর্ঘ দু’শ বছরের গোলামীর জিঞ্জিরে আবদ্ধ থাকা হাঁপিয়ে উঠা এদেশের জনগনের জন্য আধিপত্যবাদীদের প্রদত্ত করুনা বা সান্তনা আর ৭১সালের দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হল এক অধিপত্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হয়ে আরেক আধিপত্যবাদীদের কবল থেকে মুক্ত হওয়ার জোরালো সংগ্রামের অনিবার্য পরিনতি। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আধিপত্যবাদ কিংবা সাম্রাজ্যবাদ হতে আজও আমাদের উত্তোরন হয়নি। পলাশী ট্রাজেডীর পর থেকে এখনো আমরা বিদেশীদের কৃপা ও অনুগ্রহের পাত্র রয়ে গেছি। ব্যবসায়-বাণিজ্যে তাদের পদানত থেকে গেছি। যে সম্পদ বিদেশীরা এ দেশ থেকে লুট করে নিজ দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছে আমরা সে সম্পদের অংশীদার না হয়ে যোগানদাতা রয়েগেছি। আমাদের সম্পদের জন্য তথা বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য আমরা তাদের কাছে হাত পাতছি। রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে সুদুর প্রসারী সাম্রাজ্য বিদেশীরা আমাদের উপর চাপিয়ে দিয়েছে আজও আমরা সে সাম্রাজ্যের পদতলে পিষ্ট হচ্ছি। যে শিক্ষা ও আইন ব্যবস্থার বিস্তৃতি তারা এদেশে ঘটিয়েছিল তার আলোকে আমাদের দৈনন্দিন কার্যনির্বাহ ও বিচার প্রশাসন চলছে। উপরন্তু সাম্রাজ্যবাদের কালো থাবা এখন শুধু ইউরোপ থেকেই পড়ছেনা; আরো ভয়ংকর ভাবে পড়ছে আমেরিকা থেকেও। ফলে আমরা আগে গোলামী করতাম এক সাম্রাজ্যবাদের আর এখন নতুন নতুন সাম্রাজ্যবাদের কাছে আমাদের আত্মসমর্পন করতে হচ্ছে।

পলাশী বিপর্যয়ের ২৫৭ বছর পর আজও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নিয়ে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, বাস্তব পরিস্থিতি তেমন কোন উন্নতি হয়নি। দিন দিনই বাংলাদেশ একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিনত হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যবসায় বানিজ্য থেকে শুরু করে প্রায় সমগ্র অর্থনৈতিক কর্মকান্ডই নিয়ন্ত্রন করছে এমন ব্যক্তিরা যারা বাংলাদেশের স্বাধীন জাতিসত্তায় কতটা বিশ্বসী তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিনত করার অব্যাহত প্রচেষ্টা। জাতিসত্তা বিরোধী এনজিওদের অপতৎপরতা চলছে বেপরোয়াভাবে। তা যেন এ যুগের জগৎশেঠ, উমিচাঁদ। স্বাধীনতার ৪২ বছরেও আমরা পারিনি সার্বজনীন ও সকলের নিকট গ্রহনযোগ্য কোন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে। যার মাধ্যমে সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম তৈরী হবে। গড়ে উঠেনি স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখতে নিজস্ব শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবকাঠামো। আমরা পারিনি নিজস্ব সাংস্কৃতিক চর্চার বিকাশ ঘটাতে। বার বার জনগনকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হয়েছে এবং এখনও করতে হচ্ছে। কখনো বাকশাল, কখনো স্বৈরাচার, কখনো গণতন্ত্রের লেবাসে ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে বাংলাদেশ। রাজনৈতিক চোরাবালিতে বিপন্ন হয়েছে গনতন্ত্র। ক্ষমতায় এসেছে সামরিক বাহিনী, নির্যাতিত, নিগৃহীত, অপমানিত ও লাঞ্চিত হয়েছে রাজনেতিক নেতৃবৃন্দ। ক্ষমতার লিপ্সা বা উচ্চাবিলাষী মনোভাব আজও আমাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। গনতন্ত্রের লেবাসে আজ পচন ধরতে শুরু করেছে। ফলে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় দাঁড় করানো সম্ভব হয়নি। স্বয়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো চলছে দলবাজির খেলা। পরস্পরকে গালমন্দ, ভৎসনা, কুৎসা রটনা, খাটো করার প্রশিক্ষন যত হয়েছে তার তুলনায় দেশপ্রেমের প্রশিক্ষন নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন আজ আমাদের এই দুরবস্থা? এর কারণ আমরা আমাদের জাতিসত্ত্বাকে এমন ভাবে বিসর্জন দিয়েছি যে, সামান্য স্বার্থের লোভে আমাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকেনা। জতীয় স্বার্থের চাইতে দলীয় স্বার্থ, তার চাইতেও ব্যক্তিস্বার্থ আমাদের কাছে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। দেশ প্রেমিকের ছদ্মবেশে আমাদের স্বার্থন্বেষী নেতৃবৃন্দ কথায় কথায় বিদেশীদের তোষন করছেন; তারা নিজেদের জাতীয় সিদ্ধান্ত গ্রহন করছেন বিদেশী দূতাবাসে বসে। বিদেশী দূতদের চায়ের দাওয়াতকে তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের নিয়ামক মনে করেন। সামান্য ব্যক্তি স্বার্থের লোভে জাতীয় সম্পদ উত্তোলনের দায়িত্ব অযোগ্য বিদেশী কোম্পানীর হাতে তুলে দিয়ে দেশের শত শত কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট করছেন। সুশীল সমাজের ছদ্মাবরণে এক শ্রেনীর অতি উৎসাহী বুদ্ধিজীবি রয়েছেন যারা প্রতিনিয়ত জাতীয় ঐক্য বিনষ্টে কলকাঠী নেড়ে যাচ্ছেন। যারা একদিকে গনতন্ত্রের কথা বলছেন অন্যদিকে জনগনের ম্যান্ডেট ছাড়াই অবৈধ সরকারের পদলেহন করে চলছেন। তারা জাতিকে অন্ধকারে রাখার মানসিকতা নিয়ে দালালী করছেন। এরা ঐশ্রেনীর বুদ্ধিজীবিদের সমকক্ষ যারা “অন্ধকুপ নাটক” সাজিয়ে পলাশীর যুদ্ধের অনিবার্যতা তৈরী করেছিল।

পলাশীর প্রান্তরে যখন সিরাজউদ্দৌলার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হবার সম্ভাবনা দৃশ্যমান দেখা যাচ্ছিল তখন বুদ্ধিজীবিরা এতই ঔদাসীন ছিলেন যে, তারা দেশপ্রেমিক নবাবের মৃত্যুকে নিছক ক্ষমতার হাত বদল বলেই ভেবেছিল। নবাবের লাশকে যখন মুর্শিদাবাদের রাস্তায় বেড়ানো হয়েছিল আর জনমনে তার প্রতি ঘৃনা এবং অশ্রদ্ধা সঞ্চারের চেষ্টা চলছিল, তখন প্রকৃত সত্যকে জনতার কাছে এবং ইতিহাসের পাতায় তুলে ধরার জন্য দায়িত্বশীল কণ্ঠ বা কলম বা নেতৃত্ব তখন পাল্টা প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে। আজও সুশীল সমাজের নামে এক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবিরা জাতীকে বিভক্ত ও জাতীয় ঐক্যকে বিনষ্ট করার জন্য সাম্প্রদায়িকতার শ্লোগানকে সামনে এনে এক ভয়ঙ্কর খেলায় মেতে উঠেছেন। এর পরিনতি কত ভয়াবহ দিকে যাবে তা তারা যেনে ও না জানার অভিনয় করছেন। তারা বাংলাদেশে জঙ্গী, সন্ত্রাসী, মৌলবাদের কথা বেশী প্রচার করে সুপরিকল্পিত ভাবে এদেশে আধিপত্যবাদ গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপের পরিবেশ তৈরী করতে ভুমিকা পালন করে চলছেন। কথিত আছে এ ভুমিকা পালন করতে গিয়ে তারা নিয়মিত মাসোহারাও পেয়ে থাকেন। এসবই হল এযুগের জগৎশেঠ, রায়দুর্লভ, উমিচাঁদ, রাজবল্লভ মীরজাফরদের কার্যকলাপ। দুঃখজনক হলেও সত্য যে পলাশীর বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সেদিন স্বাধীনতার শত্রুদের সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি যার প্রেক্ষিতে জাতির অলক্ষে জাতির স্বাধীনতা হারিয়ে গিয়েছিল কিন্তু এ যুগের জগৎশেঠদের আমরা ভালভাবেই চিনি। কিন্তু তার পরও তাদেরকে আমরা নেতা বানাই, তাদের হাতে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেই। তাদেরকে জাতির কর্নধার মনে করি এবং তাদেরকে দিয়ে আমাদের ভাগ্যোন্নেয়র চেষ্ট করি। এ যেন পলাশী ট্রাজেডীর অবিরাম ঘটনা প্রবাহ।

পলাশী ট্রাজেডীর পোষ্টমর্টেম করলে দেখা যায় ঘরের শত্রুর সহায়তা ছাড়া বাহিরের শত্রু বড় ধরনের ক্ষতি করতে পারেনা। আর এই ঘরের শত্রুকে চিনতে না পারা এবং বিশ্বাস ঘাতকের পবিত্র গ্রন্থছুয়ে করা শপথকে বিশ্বাস করাই ছিল পলাশী ট্রাজেডীর মূল কারণ। আজও কি সেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাত থেকে আমরা মুক্ত হতে পেরেছি? পারিনি। আজও চলছে সেই একই ষড়যন্ত্র্ শুধু পাল্টেছে কুশীলব। ১৭৫৭ সালের বাংলার মতই আজকের বাংলাদেশের ভিতরে-বাইরে চলছে এক ধরনের ষড়যন্ত্র। সময়ের সাথে সাথে পাল্টেছে ষড়যন্তের ধরন। একদা অর্থ-সম্পদ হলেও আজ তাদের লক্ষ্য এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য, ধর্ম-সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ। যা ধ্বংস করা গেলেই সম্ভব এ দেশ ও জাতির অভ্যন্তরীন প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ধ্বংস করা।

এ পরিস্থিতিতে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতিগঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারলে পলাশীর বিপর্যয় থেকে যথাযথ শিক্ষা গ্রহন করা হয়েছে বলে মনে করা যাবে। নয়তো ইতিহাসের সেই নির্মম সত্যই বাস্তবে পরিনত হবে যে, ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নেয়ার কারনেই বিপর্যয় নেমে আসে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে আজ আমাদেরকে নব্য মীরজাফর, জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভদের চিহ্নিত করতে হবে। যারা নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে দেশ জাতির স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতে তৎপর যারা দেশের সার্বভৌমত্বকে বিকিয়ে দেওয়ার জন্য ভিনদেশীদের সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত। যারা জাতির সামনে চোখের পানি ফেলে প্রতারনার আশ্রয় নিয়ে লেন্দুপ দর্জির ভুমিকায় অবতীর্ন হয়ে দেশের স্বধীনতা সার্বভৌমত্ব নস্বাতে ভূমিকা রেখে চলছেন। এর পাশাপাশী সিরাজের সুযোগ্য উত্তরসুরীদের সহযোগীতা করাও জরুরী। সিরাজ এদেশের দেশ প্রেমিকদের প্রেরনার অন্যতম প্রধান উদ্দীপক। সিরাজ আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রতীক, আমাদের জাতীয় বীর।