‘যখন কবিখ্যাতি পেয়েছেন তখন তিনি দেখলেন প্রকাশক তাঁর দশটা বই ছাপলে বলে পাঁচটা ছেপেছি, আটটা বই বিক্রি হলে বলে তিনটা বিক্রি হয়েছে। এটা করা হয় রয়েলিটির টাকা কম দেয়ার জন্য। এরপর তিনি ঠিক করলেন নিজেই প্রকাশনা সংস্থা খুলবেন। এই ভাবনা মতে তিনি অতঃপর ‘পলাশ প্রকাশনী’ নামে নিজেই প্রকাশনী দেন এবং ছাপা বই মুটে’র মাথায় চাপিয়ে নিজেই বাংলাবাজারে নিয়ে বিপণনের ব্যবস্থা করেন। এই দেশের প্রকাশনা শিল্পের হাল বোঝার জন্য ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগের এই ঘটনাটাই যথেষ্ট।’ (পল্লী কবি জসীম উদ্দীন-আহমদ মতিউর রহমানঃ পৃষ্টা-৬৮) এই তিনিটা হচ্ছেন আমাদেরই মাটি ও মানুষের কবি জসীম উদ্দীন। একশ্রেণির প্রকাশকদের হাতে প্রতারিত হয়ে নিজেই প্রকাশনা সংস্থা খুলেছেন। নিজের বই কাঁধে চাপিয়ে বাংলাবাজারে বইফেরি করেছেন। আজকের এই প্রকাশনা শিল্প মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জসীম উদ্দীনদের অবদানের কারণে।

তখন ১৯৫৪ সাল। জসীম উদ্দীন তখন ‘সং পাবলিসিটি অফিসার’। চাকরির বেতন দিয়েই কিনলেন বাণিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের পাশে একটুকরো জমি। জমিটির বর্তমান ঠিকানা হচ্ছে ১০, কবি জসীম উদ্দীন রোড, ঢাকা ১২১৭। কবি জসীম উদ্দীনের ঢাকার নিবাস। বাড়িটির নাম ‘পলাশ বাড়ি’। ১৯৫৬ সাল থেকে আমৃত্যু কবি এখানে বসবাস করতেন। সেই পলাশবাড়ি থেকেই ‘পলাশ প্রকাশনী’ নামকরণের উৎপত্তি। বিখ্যাত ‘পলাশ প্রকাশনী’ থেকে প্রকাশ হয়েছে পল্লী কবির অমর রচনাগুলি। প্রকাশনা জগতে তাই পলাশ প্রকাশনীর নাম খ্যাত হয়ে আছে আজও।

জসীম উদ্দীনের নাম বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাভাষী কিংবা ইংরেজি সাহিত্য নিয়েও যারা পড়াশোনা করেছেন-নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছ্ নেই। বিশ্বব্যাপী তাঁর নাম ছড়িয়ে গেছে ‘নকশী কাঁথার মাঠ’র ইংরেজি অনুবাদের মাধ্যমে। ১৯৩৯ সালে ‘ঞযব ঋরবষফ ড়ভ ঃযব ঊসনৎড়রফবৎবফ ছঁরষঃ’ অনুবাদ করেন মিসেস ই.এম.মিলফোর্ড নামের একজন বিদেশিনী। ড.ভেরিয়ার এলউইন এর ভুয়সী প্রশংসা করে বলেন: ’আমি জানি না ‘নকশী কাঁথার মাঠ’ কাব্যকে লোককাব্য বলা যাবে কি না, কিন্তু লোকজীবন নিয়ে যে এ কাব্য পড়ে উঠেছে তা অতি সহজেই অনুমেয়।’ ১৯৫৯ সালে ‘মাটির কান্না’ কাব্যগ্রন্থটি রুশ ভাষায় এবং ১৯৬৯ সালে ইউনেস্কোর উদ্যোগে ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’ কাব্যগ্রন্থটি লন্ডন থেকে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ‘The Gypsy Wharf’ নামে।

‘আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ফুল তুলিতে যাই
ফুলের মালা গলায় দিয়ে/মামার বাড়ি যাই।’ (মামার বাড়ি)
‘আসমানীদের দেখতে যদি তোমরা সবে চাও
রহিমুদ্দির ছোট্ট বাড়ি রসুলপুরে যাও।’ (আসমানী)
‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে
তিরিশি বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ (কবর)

এধরনের অবিস্মরণীয় পংক্তির অমর রচয়িতা কবি জসীম উদ্দীন। একটা নয়, এরকম শত শত পংক্তি রয়েছে। তারপর আছেঃ ‘রাখাল ছেলে, রূপাই, নিমন্ত্রণ, ধানের কাব্য, বনবোজন, পল্লী জননী, রাখালী, আমার বাড়ি, প্রতিদানসহ অনেকগুলি জনপ্রিয় কবিতা, জারি গান, সারি গান এবং ছড়ার রূপকার তিনি। কয়েকটি গানের কলি হচ্ছেঃ নিশিথে ফুলও বনে যাইও রে ভোমরা, আমার সোনার ময়না পাখি, আমার গলার হার খুলে নে, আমায় ভাসাইলি রে, আমায় এতো রাতে কেন ডাক দিলি, নদীর কুল নাই কিনার নাই, প্রাণ সখিরে ঐ শোন কদম্ব তলায় ইত্যাদি। গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবনবোধ, পল্লী বাংলার অপরূপ প্রকৃতি ও সৌন্দর্য তাঁর লেখার প্রধান উপজীব্য বিষয়। তিনি মাটি ও মানুষের সন্তান এবং একজন খাঁটি কবি। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কিন্তু তাদের ধারায় নয়, তাঁর ধারা একদম স্বতন্ত্র ছিলো!

বাংলা সাহিত্যে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরেই জসীম উদ্দীনের স্থান। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী’ লিখে পল্লীকবি নামে খ্যাত হন । পুরো নাম মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন মোল্লা। ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম আনসার উদ্দিন মোল্লা। তিনি পেশায় একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন। শৈশবে তিনি পিতার চাচা দানু মোল্লার অনুরক্ত ছিলেন। এই দানু মোল্লার সাহচর্যে তিনি রূপকথা ও নানা কিসিমের কিচ্ছা কাহিনি শুনে পল্লী অন্তঃপ্রাণ মানুষের ভেতর প্রবেশ করেছেন লেখার মাধ্যমে। তাঁর সাহিত্যকর্ম বাংলাসাহিত্যের এক বিরাট সম্পদ। তাঁর অনন্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে : ’রাখালী (১৯২৭), ‘নকশী কাঁথার মাঠ (১৯২৯)’, ‘বালুচর (১৯৩০), ধানখেত (১৯৩৩), সোজন বাদিয়ার ঘাট (১৯৩৪), মাটির কান্না (১৯৫১), রঙিলা নায়ের মাঝি (১৯৫৬) এবং সুচয়নী (১৯৬১)। এছাড়া অনেক স্মৃতিকথা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনি, নাটক ও গানের প্রখ্যাত নির্মাতা তিনি। তাঁর আত্মমর্যাদাবোধ অত্যন্ত প্রখর। স্বৈরাচারি শাসকদের রক্তচক্ষুকে তিনি পরোয়া করতেন না। ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও টিভিতে রবীন্দ্র সঙ্গীত প্রচার বন্ধ ঘোষণা করলে তিনি এর তীব্র বিরোধিতা করেন। ১৯৭৪ সনে বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করতেও দ্বিধা করেন নি।

ভাষার মাস চলছে। যথারীতি অমর একুশে বইমেলাও চলছে। লেখক ও প্রকাশকদের নির্ঘুম দিন-রজনী যাপন হচ্ছে। জনপ্রিয় লেখকদের কখন, কোন বই প্রকাশ হচ্ছে পাঠকদেরও বেশ কৌতুহল রয়েছে। নবীন লেখকরা বিড়ম্বনা এবং প্রকাশকদের দ্বারে দ্বারে ধর্না দিচ্ছেন। বইমেলার দুই-তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে। স্বভাবতই টেনশনে সাহিত্যপ্রেমিরা। ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষ্যে রাজধানী ঢাকায় বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী এবং চট্টগ্রামে এম এ আজি স্টেডিয়ামের জিমনেশিয়াম চত্ত্বরে চসিক এবং চট্টগ্রাম সৃজনশীল প্রকাশক পরিষদ এবং বিভিন্ন সংগঠনের সহযোগিতায় ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ দিনব্যাপী অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়েছে। এছাড়া সিলেট, রাজশাহী, খুলনাসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহরেও বইমেলা চলছে। এবারে চট্ট্রগামেও রের্কড সংখ্যক ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রকাশনা অংশগ্রহণ করে মেলাকে অধিক গুরুত্ববহ করে তুলেছে। দেখা গেছে, অনেক সময় মেলা কর্তৃপক্ষের কঠিন শর্তারোপ অনেক সময় নবীন প্রকাশকদের বিব্রত করে! দেশের প্রকাশনা শিল্পকে এগিয়ে নিতে নবীন প্রকাশকদের নিয়ম মেনে কাজ করার সুযোগ অবারিত করা উচিত।

অত্র নিবন্ধ শুরু করেছিলাম প্রকাশক ও লেখকদের নানা মতপার্থক্য, প্রতারণা এবং চুক্তি অনুযায়ী কাজ না করার কারণে লেখককে নিজের বই নিজেই প্রকাশ করে প্রকাশক বনে যেতে! জসীম উদদীনের পলাশ প্রকাশনীর জন্ম এভাবেই। এধরনের ঘটনা হরহামেশাই ঘটছে। এক লেখক বন্ধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাঁর ঝাল এভাবে ঝাড়েন! ” প্রকাশক চুক্তির শর্ত মতো বই ছাপাবে না। চুক্তি ভঙ্গ করবে নিজের মতো করে। সময়মতো স্টলে বই তুলবে না। আপনার বই যদি বেশি বিক্রি হয় তো তার প্রকাশিত অন্যান্য লেখকের বই চালানোর জন্যে আপনার বই স্টলে রাখা বন্ধ করে দেবে। যোগাযোগ করতে চাইলে ফোন বন্ধ পাবেন। মেসেঞ্জারে মেসেজ দিলে রিপ্লাই দেবে না। আপনার হাতে পায়ে ধরে বই প্রকাশ করতে নেওয়া প্রকাশকও আপনার মেসেজ সিন করবে না। দূরের লেখক হলে আপনার বইগুলো আলুর মতো বস্তা ভরে কুরিয়ার করবে। বই নষ্ট হলে আপনার ক্ষতি হবে আর প্রকাশকের কচু হবে।” এই প্রকাশনার শিল্পের সংকট এবং নীতি-নৈতিকতা ধ্বসের এই জন্য দায়ী কে? অথবা প্রকাশনা শিল্প এগিয়ে নিতে কার কী দায়িত্ব? এ নিয়ে সবসময় কথা উঠে। কিন্তু সংকটের সুরাহা তিমিরেই থেকে যায়। প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণনের বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার। লেখক, প্রকাশক, পাঠক এবং কর্তৃপক্ষ কেউ দায়িত্ব এড়াতে পারেননা। সবার যৌথপ্রচেষ্টায় একটি জ্ঞানভিত্তিক সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার আশা করা করা যায়।