গ্রাম, গ্রাম্য জীবন এবং গ্রাম্য পরিবেশ-প্রকৃতির সাথে যাঁর ছিল আত্মার সম্পর্ক, প্রল্লীর প্রকৃতি ও মানুষের সহজ-সরল রূপটি প্রতিয়মান হয়েছে যার লেখনিতে- তিনি মাটি ও মানুষের কবি জসীমউদ্দীন। ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে তাঁর মাতুলালয়ে জন্ম গ্রহণ করেন। ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে আমরা তাঁর জন্ম শত বার্ষিকী পালন করেছি। রবীন্দ্র-নজরুলের মতো জসীমউদ্দীনও বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য ও স্বতন্ত্র ধারার কবি। তাঁর কবিতার কলা-কৌশল ও গঠন শৈলিতে আমরা গ্রাম্য আবহকে মূর্ত হতে দেখি। কিন্তু তাই বলে তিনি পরিপূর্ণভাবে গ্রাম্য কবি নন। কারণ কাব্য রচনায় তিনি উপমা উৎপেক্ষা রূপক প্রয়োগে যথেষ্ট অনুশীলনের পরিচয় দিয়েছেন এবং কাহিনী নির্মাণে উপন্যাসের গঠন-প্রকৃতি অবলম্বন করেছেন। জসীমউদ্দীন কল্লোল যুগের একজন প্রতিনিধিত্বশীল কবি হয়েও এবং আজীবন নগরে বাস করেও তাঁর কবিতা লোক ঐতিহ্যসমৃদ্ধ। এবং এটি তাঁর মনন, স্বভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই সম্ভব হয়েছে। মূলত জসীমউদ্দীনের কবিস্বভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির জন্য সর্বাত্মক আধুনিকতার যুগেও তিনি একটি নির্দিষ্ট কাব্যভুবন নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন এবং কবিপ্রতিভার গুণে বিশিষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। সবচেয়ে অবাক ব্যপার এই যে, জসীমউদ্দীন আধুনিক যুগের আধুনিক কবি হওয়া সত্ত্বেও পল্লী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। অথচ কল্লোল যুগের প্রায় সব কবিই নগর-চেতনায় প্রাণিত ও উদ্বুদ্ধ হন এবং কবিতার নতুন বিষয়বস্তুর জন্যে বিশ্বসাহিত্যের দ্বারস্থ হন, কেননা পল্লী প্রকৃতি ও লোক-ঐতিহ্যের মোহন রূপ আধুনিক কবিদের চেতনায় ও মননে সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়। ফলে নগরই হয়ে উঠে আধুনিক কবিতার উপাদান ও উপকরণের ক্ষেত্র। বলা ভালো, বিশ্ব সাহিত্যেও এ চেতনা সামান্য ছিলনা। চার্লস ল্যাম (১৭৭৫-১৮১৪), চার্লস ডিকেন্স (১৮১২-১৮৭৬), ভিক্টর হিউগো (১৮০২-১৮৫৫), অনারিদে বালজাক (১৭৯৯-১৮৫০), আনাতোল ফ্রাঁস (১৮৪৪-১৯২৪), শার্ল বোদলেয়ার (১৮২১-১৮৬৭) প্রমুখের লেখায় নগর-চেতনার প্রবল উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। অথচ জসীমউদ্দীন পল্লী প্রকৃতি, পল্লীর বিষয় বস্তু ও জীবনের পাচুর্যকে মনের মাধুরী মিশিয়ে উপস্থাপন করেছেন। তাইতো তিনি পল্লী কবি।

জসীমউদ্দীন কাব্যক্ষেত্রে আত্মপ্রকাশ করেন ‘কবর’ কবিতাটি নিয়ে। এর পর তাঁর প্রতিভার বিশিষ্টতায় সহজ এবং সতেজ উপমনা ব্যবাহারের মাধ্যমে গ্রাম-প্রকৃতির মধ্যে যে অনায়াস সহজতা বিদ্যমান তার পরিচয় তিনি ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন তাঁর রাখালী, বালুচর, ধানক্ষেত, হাসু, রঙিলা নায়ের মাঝি, এক পয়সার বাঁশী, নক্সীকাথার মাঠ, সুজন বাদিয়ার ঘাট, মাটির কান্না ইত্যাদি গ্রন্থে। জসীম উদ্দীনের সুবিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘রাখালী (১৯২৭) প্রকাশের মাধ্যমেই তাঁর মূল্যায়ন সমালোচকদের পক্ষে সহজ হয়ে পড়ে। ‘কবর’ কবিতাটিও রাখালী গ্রন্থভুক্ত। এই সুপ্রসিদ্ধ কবিতাটি কল্লোল পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হবার সঙ্গে সঙ্গে জসীমউদ্দীন কেড়ে নিয়েছিলেন তাৎক্ষণিক খ্যাতি-নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার মতো, জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেনের মতো। ‘কবর’ কবিতা খ্যাতি কুড়িয়েছিল বাইরনের (১৭৮৮-১৮২৪) ‘চাইল্ড হ্যারল্ড’, শেলীর (১৭৯২-১৮২২) ‘প্রোমিথিয়ুস আনবাউন্ড’, কীটসের (১৭৯৫-১৮২২১) ‘ওড টু নাইটিঙ্গল, এবং ওড্ অন এ গ্রিসিয়ান আর্ন’, কোলরিজের (১৭৭২-১৮৩৪) অলৌকিক রোমান্টিকতা মূলক কবিতা ‘দ্য রাইম অব্ অ্যানশিয়েন্ট ম্যারিনার’, ম্যাথু আর্নল্ডের (১৮১২-১৮৮৮) ‘দি ফরসেকেন মারমেড’, লুইস ক্যারলের (১৮৩২-১৮৯৮) ‘এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’, রবার্ট ফ্রস্টের (১৮৭৪-১৯৬৩) ‘নর্থ অব বোস্টন’ প্রভৃতি কবিতা ও গ্রন্থের মতো।

জসীমউদ্দীন আধুনিক উপন্যাসের রীতি প্রকৃতি অনুসারে প্রেমের পূর্বরাগ, মিলন, এবং বিরহকে যুক্তি সহকারে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি যে সমস্ত উপমা ব্যবহার করেছেন সেগুলির উপাদান গ্রাম থেকে সংগৃহতি। কিন্তু উপমার ব্যাখ্যাসূত্র প্রধানত নাগরিক। উপমান এবং উপমেয়ের মধ্যে একটি যুক্তিসহ নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা সূত্র আছে যা বুদ্ধিদীপ্ত আধুনিক কবিতার লক্ষণ। একটি বিষয় এখানে গুরুত্বপূর্ণ যেখানে নবীন কাব্যজগতের নামজাদা কবিরা ইউরোপের সাহিত্য আন্দোলনে প্রভাবিত নন শুধু, মুগ্ধ অনুসরণকারি। রবীন্দ্র-নজরুলের রূমান্টিকতাকে দূরে সরিয়ে রেখে এজরা পাউন্ড (১৮৮৫-১৯৭২), টি এস এলিয়ট (১৮৮৮-১৯৬৫), জেমস জয়েস (১৮৮২-১৯৪১) প্রমুখ কবিগণ প্রেমেন্দ্র মিত্র, জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু, বিষ্ণু দে ও অমিয় চক্রবর্তী সবার মননে গেঁথে বসেছে। কিন্তু এরই মাঝে জসমিউদ্দীন সবাইকে উপেক্ষা করে তাঁর নিজ দেশ, মানুষ, প্রকৃতি ও পল্লীর বর্ণনায় ছিলেন অবিচল। আর শব্দ চয়নে খুব সাধারণ হয়েও অসাধারণ প্রযোগ সৃষ্টি করে গেছেন অনন্য জীবনমুখী, পল্লী-নিবিষ্ঠ কাব্যমালা। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ অতীতাচারী। তিনি পিপাসিত মনে মুক্ত বাংলার প্রকৃতি আর সহজ সরল মানুষ তার সঙ্গে পল্লী জীবনের অবহেলিত, উপেক্ষিত, দরিদ্র করুণ জীবনের সংবেদনশীলতা, আবেগ, অনুভূতি, অনুভব লিপিবদ্ধ করে গেছেন সত্য নিষ্ঠভাবে। তিনি লোকজ ও লৌকিক প্রাত্যাহিক ঘটনা যেগুলো গ্রাম বাংলার শেকড়কে চেনায় তা আমাদের সামনে তুলে এনে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পুরনো কিন্তু চিরায়ত জীবনযাপন প্রণালী সাহিত্যে অমর করে গেছেন। তাই জসীমউদ্দীন শুধু বাংলা সাহিত্যের একজন অগ্রগণ্য কবি নন তিনি লোকসাহিত্য সংগ্রাহকও। যেটি বাংলা সাহিত্যের লোকশিল্প বা লোককথা বা ফোকলোরকে নতুন মাত্রা দিয়েছে; তিনি দীনেশ চন্দ্র সেন এক সাথে ময়মনসিংহ গীতিকা সংগ্রহ করেন। লোকজ কাহিনী ও লৌকিক জীবনে শিল্পবোধের প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন তাঁর এক দাদার কাছ থেকে। তিনি ছিলেন তাঁর বাবার এক চাচা। যার নাম ছিল দানু মিয়া। যিনি অন্ধ ছিলেন। এবং জীবনভর কেচ্ছা-কাহিনী, লোকজ ছড়া, গান, পালা গেয়ে বেড়াতেন। সেই অন্ধ দানু মিয়ার প্রভাব বহুলাংশে কবির রচনায় আমরা দেখতে পাই। জসীম উদ্দীন নিজেই তাঁর ‘জীবন কাহিনী’ নামক গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। গ্রন্থটির ৪৫ পৃষ্ঠায় তিনি উল্লেখ করেছেন-

আমার কবি জীবনের প্রথম উন্মেষ হইয়াছিল এই দাদার গল্প, গান ও কাহিনীর ভিতর দিয়া। সেই ছোটবেলায়ই মাঝে মাঝে আমাকে গানে পাইত। নিজে মনোক্তি করিয়া ইনাইয়া বিনাইয়া গান গাহিয়া যাইতাম। দাদা একদিন একজনকে বালিতেছিলেন, ‘পাগলা গানের মধ্যে কি যে বলে কেউ শোনে না। আমি কিন্তু শুনি মনোযোগ দিয়া ওর গান।’ কি অন্তর্দৃষ্টির বলেই না আমার রচক-জীবনের প্রথম আকুলি-বিকুলি তিনি ধরিতে পারিয়াছিলেন।

সেই থেকেই জসীমউদ্দীনের মনের গভীরে প্রোতিত হয় মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসার মমতাপ্লুত ছবি, সেই সঙ্গে প্রকৃতি প্রেমের অনবদ্য রূপমাধুরি। বংলার রূপ চিত্রায়ণে কবির যে শিল্পানুভূতি, তার সঙ্গে মানবপ্রেম ও প্রকৃতিপেমের একটা সুহৃদ সম্পর্ক রয়েছে। কবির হৃদয়ের গভীর পল্লী ও পল্লীর জনসমাজের প্রতি যে ঐকান্তিক প্রীতি ও দরদ, তাতে তাঁর অবচেতন মনের শিল্পভাবনা মিশে তাঁর কাব্যের সমগ্রতার যে রূপায়ন, সমকালিন সাহিত্যসমাজে তাই তা এক স্বতন্ত্রধর্মী সাহিত্য কৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়। তাঁর শিল্পমানস মানবজীবনের প্রতি গভীর দরদ ও ভালোবাসায় নিবেদিত ছিলো বলে তিনি ছিলেন নিরবচ্ছিন্নভাবে শ্যামল বাংলার মাঠঘাট, নদীনালা, খালবির, ক্ষেতখামার ও চাষাভুষার জীবনরূপায়ণের এক মননশীল প্রতিনিধি।

অন্ধ দানু মিয়ার ভবিষ্যৎ বাণীর প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই জসিম উদ্দীনের দেহতত্ত্বের গান, ভাওয়া গান ও লোক সংগীতের মাঝে। একেবারে নিন্মশ্রেণির মানুষসহ সাধারণ খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষের জীবনচিত্র অত্যন্ত সরল, সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায় জসীম উদ্দীন উপস্থাপন করেছেন। উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় বেদে-বেদেনীদের সেই গান যা মানুষের মুখে মুখে আজও শোনা যায়:

ও বাবু সেলাম বারে বার,
আমার নাম গয়া বাইদ্যা বাবু

বাড়ি পদ্মাপাড়।


অভিজাত শ্রেণির কাছে ‘অছ্যুৎ’ অভিধায় পরিচিত এসব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে জসীমউদ্দীনের মেলামেশা দীর্ঘদিনের। তাই তিনি এদের আচার-সংস্কৃতি-জীবনধারা সব কিছু আযত্ত্বে নিতে পেরেছিলেন। এ পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি তাঁর রচিত পল্লীগীতিগুলোতে ভাউলতত্ত্বের ভেদ অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যেমন:

ও নাও বাইও বাইও ভাই মাঝিয়ারে

ছল ছল কল কল, সুষায় নদীর জল,


অথবা

তুমি সাবধানে চালাইও মাঝি আমার ভাঙা তরীরে।
ঢেউয়ের উপর ঢেউ ছুটেছে ঢেউয়ে করি ভর,

গগন নামিয়া নাচে সেই না ঢেউয়ের পররে।


অথবা

তুমি কবে খুলিয়া নাও
আমি যেন জানিরে রঙিলা নার মাঝি!
ও রঙিরা নার মাঝি!

বাউলতত্ত্বের গান ছাড়াও জসীম উদ্দীন বেশ কিছু পল্লীগীতি রচনা করেছেন। এসব গানে বাঙালির জীবনের চিরায়িত প্রেম উপজীব্য হয়েছে। যেমন:

সোনার বরণী কন্যা সাজে নানা রঙে,
কালো মেঘ যেন সাজিলরে।
সিনান করিতে কন্যা হেলে দুলে যায়,

নাদীর ঘাটেতে এসে ইতি উতি চায়।


এছাড়া লোকসংগীতের কথা বলতে গেলে বলতে হয়-বাঙালির লোকসংগীতে সুরের ও ভাবের যে বৈচিত্র আছে, উপমহাদেশের আর কোন অঞ্চলের লোকসংগীতে তেমনটি নেই। লোকসংগীতের এ বিশাল ভান্ডার সৃষ্টি ও সংগ্রহে যে সকল মহাত্মা নিরলস পরিশ্রম করেছেন তাদের মধ্যে জসীমউদ্দীম অন্যতম। তিনি পল্লী এলাকার মানুষের মুখে মুখে পঠিত গীত-পুঁথি-ছড়া ইত্যাদি সংগ্রহ করতেন। এসব সংগ্রহকালে তিনি গ্রামীণ জনপদের আনন্দ বেদনার কাব্যগাঁথার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হন, মানুষকে ভালোবেসে একজন খাঁটি মানবপ্রেমী হয়ে ওঠেন।
জসীমউদ্দীন পালাগান, গাজীর গান, জারী, লোকগীতির আসরে যেতেন, উপভোগ করতেন।

পালাগান, গাজীর গান, জারী-সারি, ভাটিয়ালি, মুর্শীদি, মারফতি, ঘাটু গান, কৃষ্ণলীলা, গম্ভীরা, কবি গান, সাপুড়ে গান ইত্যাদি লোকসংগীত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও এগুলোর উপর বিস্তর গবেষণাও করেন তিনি। জসীমউদ্দীন তাঁর দীর্ঘ জীবনে প্রায় দশ হাজারেরও অধিক লোক গান সংগ্রহ করেছিলেন। যা বাংলা লোকসংগীতের এক অনন্য ভান্ডার।

নদীর সাথে বাংলার মানুষের যোগসুত্রতা অত্যন্ত নিবিড় ও সুপ্রাচীন। ভাটিয়ালী গান এদেশের নদী অববাহিকার মানুষের প্রাণের খোরাক। নদী, নৌকা, মাঝি ও তাদের জীবনের সুখ, দুঃখ ও আনন্দ বেদনার কথাগুলো অত্যন্ত সহজ শব্দে গানের সুরে জসীমউদ্দীন সাজিয়ে তুলেছেন। যেমন: উজান গাঙের নাইয়া/ ভাটি গাঙের নাইয়া/ তুমি কইবার নি পাররে নদী/গেছ কতদূর? অথবা , ‘আমি বায়া যাইয়া কোন ঘাটে/ লাগাব রে সোনার নাও…/নায়ের মাস্তুলে কাঁন্দিয়া কয় হায়রে/ কি করো মাঝিয়া ভাই রে../ ওই যে পালের টান মোর না সহে পরানে রে/ দয়াল চাঁন রে..’

লোকসংগীতের বাইরেও জসীমউদ্দীনের আধুনিক বিখ্যাত গান রয়েছে। যেমন: আমার সোনার ময়না পাখি/ নিশিতে যাইও ফুলবণে, ও ভোমরা/ আমায় ভাসাইলি রে, আমায় ডুবাইলি রে, অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে/ প্রানো সখি রে ঐ শুন কদম্ব তলে বংশী বাজায় কে ইত্যাদি।

গ্রাম এবং গ্রামের জনগোষ্ঠীর প্রতি অকৃত্রিম দরদী ছিলেন বলেই তাঁর কাব্য নাগরিক কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত পল্লীর সহজ-সরল জীবনের অমর রচনা হিসেবে মর্যাদা পায়। তাঁর সুজন বাদিয়ার ঘাট, নক্সীকাঁথার মাঠ ইত্যাদি গাঁথাকাব্যে পল্লীবালার অনুরাগের সঙ্গে পল্লীবালকের হৃদয় জুড়ে কবি যে গ্রাম বাংলার অসাধারণ লোকায়ত চিত্র অঙ্কন করেছেন তাতে নিশ্চয় আমরা বিশ্বজনীনতার ছাপ লক্ষ করি।

জসীমউদ্দীনের কাব্যের পাত্রপাত্রীরা কবির অনুভূতির গভীরতায় গড়ে উঠেছে, যার রূপায়ণ বস্তু সর্বস্ব না হওয়ায় প্রকৃতি তাদের গভীর মমতায় আপন করে নিয়েছে। পাশাপাশি দুটি গ্রামের অবস্থান, তাদের মধ্যে ঝিল এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ছবি তুলে ধরেছেন তা সত্যিই আমাদের গ্রামবাংলার প্রতিনিধিত্ব করে। উপখ্যানের নায়ক রূপাই ও নায়িকা সাজুর অবয়বের চমৎকার উপমা আমরা দেখতে পাই। উদাহরণ স্বরূপ-

রূপাইয়ের ক্ষেত্রে:

কালো চোখের তারা দিয়েই সকল ধরা দেখি
কালো দাতের কালি দিয়েই কেতাব কোরান লিখি

সাজুর ক্ষেত্রে:

লাল মোরগের পাখার মতো ওড়ে তাহার শাড়ী
ভোরের হাওয়ায় যায় যেন গো প্রভাতি মেঘ নাড়ি।

আবহমান বাংলার মাঠঘাট শুকিয়ে চৌচির হওয়া এবং হঠাৎ ঝড় এসে ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার চিত্রটি অঙ্কিত হয়ে কাহিনী এগিয়ে যায় রূপাই ও সাজুর পরস্পরের প্রতি অন্তরের টান ও আবেগের দিকে। যেমন:

এমনি করিয়া দিনে দিন যেতে দুইটি অরুণ হিয়া
এ উহারে নিল বরন করিয়া বিনে-সূতী মালা দিয়া।

এছাড়া বর্ষাকালের শ্যামল-সবুজ তমাল তরুর সঙ্গে নক্সীকাঁথার মাঠের রূপাইয়ের যৌবন-সুন্দর দেহটিকে উপমিত করে তিনি যে কবিতা রচনা করেছেন, তার শিল্পগুণ কবির বিরল কৃতির স্বাক্ষর। যেমন:

ঝালি লাউয়ের ডগার মত বান্দ দুখান সরু
গাখানি তার শাওন মাসের যেমন তমাল তরু।

মহৎ কবিতার জন্ম হয় সৃষ্টির প্রতি স্রষ্টার অন্তরলদ্ধ ভালোবাসার গভীরতা থেকে। জসীমউদ্দীন রূপাইকে সে ভাবেই অঙ্কণ করেছেন। তিনি গ্রামবাংলার লোকায়ত জীবন ও তার চিরায়ত প্রকৃতিকে প্রেম ও সৌন্দর্যের ডোরে বেঁধে শ্বাশত শিল্পের মহিমায় রূপদান করেছেন। তার নক্সীকাঁথার মাঠে যেমন গ্রামের দুটি চাষী পরিবারের ছেলেমেয়ে রূপাই এবং সাজুর প্রেমের কাহিনীর রূপায়ণ করেছেন। ঠিক তেমনি পল্লীর দুই যুবক-যুবতী সোজন ও দুলীর প্রেমের চিত্রায়ণ ‘সোজন বাদিয়ার ঘাট’। এদের প্রেমের চিত্র অঙ্কণ করতে গিয়ে কবি যে আন্তরিকতার প্রকাশ ঘটিয়েছেন, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গ্রামের দুই যুবক-যুবতীর সহানুভূতি। গ্রামের অখ্যাত যুবক-যুবতীর ভালোবাসাকে মানবজীবনের চিরন্তন হৃদয়বৃত্তির অপ্রতিরোধ্য উচ্ছাসের ধারায় কবি অবলোকন করেছেন বলে এই প্রেমের শ্বাশত সত্য সহজেই ধরা পড়ে। পল্লীর রূপ-শোভা, সুগন্ধ ও সৌন্দর্য বর্ণনার পাশাপাশি কবি রূপাই এবং সাজুর যে প্রেমগাঁথা অঙ্কন করেছেন তা কোনো অংশে লাইলি-মজনু, শিড়ি-ফরহাদ, ত্রিস্তান ও ইসোল্ট এর মতো বিখ্যাত প্রেম কাহিনীর চেয়ে ক্ষুদ্র নয়, বরং পল্লীর ছোট্ট প্রেম কাহিনীকে কবি মহিয়ান করেছেন তাঁর অসাধারণ শিল্প সৃষ্টির মাধ্যমে।

নক্সীকাঁথার মাঠ কাব্যোপন্যাসে কবি বাংলার মনোমুগ্ধকর প্রকৃতি যেমন একেছেন তেমনি দৈনন্দিন গ্রাম্য জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলোকে বিবৃত করেছেন। বাংলার মানুষের হৃদ-স্পন্দন তাঁর কবিতায় এখনও জীবন্তাকারে পাওয়া যায়। এদিক দিক দিয়ে দেখলে তাঁর কবিতার নৃতাত্ত্বিক গুরুত্বও অপরিসীম। মোটকথা পল্লী প্রকৃতি, পল্লীর মানুষের প্রেম-বিরহ, বেদনা ও চাষাভুষার জীবনরূপায়ণের অপ্রতিদ্বন্ধি শিল্পী কবি জসীমউদ্দীন শতভাগ স্বার্থক ও সফলকাম।