এ বছর পহেলা বৈশাখ আসছে এক অনিশ্চিত করোনা কালে। বেড়ে গেছে সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার। সরকার আবার পুরোদমে লকডাউনে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কাজেই এবারের পহেলা বৈশাখে অন্যান্য বছরের মত বিপুল মানুষের ঢল হবার সম্ভাবনা নেই।

এই সুযোগে আমরা একটু ভাবতে পারি পহেলা বৈশাখ নিয়ে। পহেলা বৈশাখ হল বাংলা বর্ষের প্রথম দিন। এই বাংলা বর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। তাকে এই কাজের জন্য উপযোগী ক্যালেন্ডার তৈরি করে দিয়েছিলেন একজন জ্যোতির্বিজ্ঞানী। তার নাম ছিল শাহ ফতেহ উল্লাহ সিরাজী। তিনি ইরানের সিরাজ নগর থেকে উপমহাদেশে এসেছিলেন। সর্বশেষ তিনি এই পূর্ব বাংলায় এসেছিলেন। এখানেই তার মৃত্যু ও কবর হয়েছে। তার নামেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার নামকরণ হয়েছে।

এই নতুন বঙ্গাব্দ প্রবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল এখানকার সমৃদ্ধ কৃষি অর্থনীতির রাজস্ব আদায় প্রক্রিয়াকে একটি নিয়মমাফিক ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা। এই কারণে এই বর্ষপঞ্জির সঙ্গে স্থানীয় প্রাকৃতিক ঋতুচক্র এবং কৃষিফসল চক্রের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। এই সূত্রেই এসেছে হালখাতার প্রচলন ও ব্যবহার। যা হল এই গ্রামীন কৃষি অর্থনীতি ভিত্তিক সভ্যতা, সংস্কৃতি এবং জীবনশৈলীর লিখিত দলিল। আর এর সঙ্গে ছিল জীবন মৃত্যুর যাবতীয় পর্ব ও অনুষঙ্গের কালানুক্রমিক সময় ব্যবস্থাপনা আকারে প্রচলিত পঞ্জিকার ব্যবহার। এসব কিছু এক অর্থে অসাম্প্রদায়িক ও সর্বজনীন ছিল এটা বলা যায়।

কিন্তু আধুনিক উত্তর-ঔপনিবেশিক কালে পহেলা বৈশাখের নামে যে শহুরে নাগরিক উৎসব ম্যানুফ্যকচার করা হয়েছে তা মুঘল প্রবর্তিত প্রাকৃতিক ও কৃষি অর্থনীতি ভিত্তিক গ্রামীন জনগোষ্ঠীর জীবনচর্যা থেকে অনেক ভিন্ন। এটি মূলত বাঙালি জাতিবাদী শহুরে মধ্যবিত্ত উদ্ভাবিত একটি কার্নিভাল। যা ষাটের দশকের বাঙালি জাতিবাদী কথিত সেক্যুলার আন্দোলনের অনুসঙ্গ হিশেবে ধীরে ধীরে আজকের অবয়ব নিয়েছে। যার সূচনা হয় সূর্যোদয় অবলোকন করে রমনা বটমূলে সূর্যবন্দনার মধ্য দিয়ে। যা হল এক ব্রাহ্ম রাবীন্দ্রিক সূর্যপূজার বাংলাদেশীয় ছায়ানটীয় সংস্করণ। আর এই উৎসবের শেষ হয় এদেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলে কথিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা নামক এক কাপালিক পৌত্তলিক জশনে জুলুস আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে এই দুটি নব্য বাঙালি জাতিবাদী নাগরিক বৃহত্তর হিন্দু-ব্রাহ্ম-সনাতন পূজা-প্রথা প্রভাবিত সাংস্কৃতিক রূপকল্পকে “অসাম্প্রদায়িক” ও “সর্বজনীন” বলে প্রচার করা হয়। ভাবটা এমন যে যেহেতু এগুলিতে কোনোরকমের ইসলাম বা মুসলিম-প্রভাব নেই কাজেই এগুলি হিন্দু-মুসলিম সকল সম্প্রদায়ের জন্য প্রযোজ্য এবং কাজে কাজেই “অসাম্প্রদায়িক” ও “সর্বজনীন”। কিন্তু এই নাদান ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী বাঙালি জাতিবাদীরা এটা খেয়ালই করে না যে তাদের এই “অসাম্প্রদায়িকতা” ও “সর্বজনীনতা” তাদেরকে বাঙালিত্বের নামে বৃহত্তর হিন্দু-ব্রাহ্ম-সনাতন সংস্কৃতির অনুগামী করে তুলছে। ফলে তারা ক্রমশঃ তাদের স্বকীয়, বিশিষ্ট ও স্থানীয় পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য হারাচ্ছে। এভাবে তাদের অজান্তে তারা স্প্যানিশ রিকনকুইস্টার মত ইন্ডিয়ান রিকনকুইস্টার শিকার হচ্ছে।