শরৎ মানেই মায়ের আগমনের ঋতু। সেই সময় আকাশে বাতাসে মায়ের আগমনের গন্ধ বিকশিত হয়। কাশবনের ছটা মানুষের মনে এক নতুন স্নিগ্ধতা শুরু করে। শারদীয়া উৎসব হিন্দুদের সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসব। শারদীয়া উৎসবকে ঘিরে মানুষের মনে কল্পনা জল্পনার শেষ থাকে না। সমস্ত দেব কূলকে ওষুরদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মা দুর্গা ওষুর বধ করেছিলেন। তারপর থেকেই দুর্গাপুজার প্রচলন। এই দুর্গাপুজাকে ঘিরে যেমন যত উল্লাস,তেমনি নারীদের মধ্যেও আমরা দুর্গার রুপ দেখতে চাই। মা দুর্গাকে নিয়ে বিভিন্ন কবি বিভিন্ন কবিতা তুলে ধরেছেন। আর শারদীয়া বিষয়ে কবিদের সেই কবিতা নিয়েই বাংলাদেশের ‘মোলাকত’ ডটকম পুজো সংখ্যা ২০২০’র আয়োজন করেছেন। আশা করি প্রথম পর্বের সকল কবিতা পাঠকদের পাঠে মুগ্ধতা রাখবে।

সকলকে ধন্যবাদ আমাদের সাথে ও পাশে থাকার জন্য।

প্রিয়াংকা নিয়োগী,
পুন্ডিবাড়ী, ভারত,
পুজা সংখ্যা ২০২০
সম্পাদিকা, মোলাকত ডটকম।

সূ চী প ত্র

মহামিলনের মঞ্চ :: বিশ্বজিৎ কর
তৈমুর খান :: দুঃখ মোচন
আমার দুর্গা :: রীতা দেব (বেরা)
দীপ না নিভে যায় :: বিজন মজুমদার
মায়ের কাছে :: রিয়াদ হায়দার
শারদ প্রাতে :: কমল কুজুর
তুই যে আমার সই :: রিয়া চক্রবর্তী
সব চরিত্র কাল্পনিক: ঝুমা মল্লিক
অপেক্ষা :: রিয়া ভট্টাচার্য
জায়গা আছে :: শংকর ব্রহ্ম
রাবণ জানতেন :: সিদ্ধার্থ সিংহ
মা আসছে এই বাংলায় :: চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু
কোন এক বনলতা সেন :: গৌতম চট্টোপাধ্যায়
শারদীয় দূর্গায় শুভেচ্ছা :: মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী
হাসি :: চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী
মায়া :: অলোক রায়
কৃত্রিম সভ্যতা :: উত্তম দেবনাথ
দুর্গা মায়ের রূপ :: সৌমেন দেবনাথ
পুজোর বার্তা :: সৌরভকুমার ভূঞ্যা
ময়না কথায় ঈশ্বরের হাত :: রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়
…………………………………………..

মহামিলনের মঞ্চ
বিশ্বজিৎ কর

দুলছে কাশফুল, বইছে বাতাস –
মা এসেছেন ঘরে,
আকাশে-বাতাসে মিষ্টি গন্ধ,
আলোর বেণুর সুরে!
থিমপুজোর লাল চোখে –
সাবেকি গেছে হারিয়ে,
“যা দেবী সর্বভূতেষু”-
মন দেয় ভরিয়ে!
১০৮ প্রদীপের তাপ –
লাগুক সকল হৃদয়ে,
ধুনুচি নাচের ছন্দ –
মন্ডপ দিক মাতিয়ে!
মহামিলনের মহামঞ্চে-
অটুট থাকুক সম্প্রীতি,
মানুষ তো মানুষের জন্য –
ধ্বনিত হোক্ ঐক্যগীতি!
…………………………………………..

তৈমুর খান
দুঃখ মোচন

ভালোবাসার সঙ্গে কখনও দেখা হয়নি
বয়সের তীরভূমি ভেঙে পড়েছে প্রবল প্রবাহে
তাড়িত আকাশ থেকে বিদ্যুৎ ঝলকানি

কখনও প্রসন্ন এসে দরজায় দাঁড়ায়নি
মেঘলা দুপুরে বিষণ্ণ বর্ষা ফুঁফিয়ে কেঁদে গেছে
কাদামাখা রাস্তায় কোনও কুশল আসেনি
আজ ফুটো হয়ে যাওয়া হৃদয় সেলাই করে
শারদীয়া কুড়োতে এসেছি পৃথিবীতে

শিশির ধোয়া একটি জবার কাছে
বলতে এসেছি আমার আমি কেমন আছে

দুর্গারা সব পুজো পেয়ে ফিরে যাক বাড়ি
আমিই শুধু নির্বাসনে দুঃখ মোচন করি
…………………………………………..

আমার দুর্গা
রীতা দেব (বেরা)

আমার দুর্গা লাল পাড় সাদা শাড়ির মূর্তি
সমাজ ভাঙ্গার অবক্ষয় হয়েছে সেও আজ যন্ত্রী
মহিষাসুরের রূপ ধরে যখন তারা আসে,
কামদুনিতে দুর্গা তখন ছিন্নভিন্ন হয়ে
লালসার আগুনে পুড়ে মড়ে ।

আমার দুর্গা জন্ম নিয়েই ডাস্টবিনে স্থান পায়
তোমার দুর্গা সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মায়
আমার দূর্গা সন্ধ্যে হলেই মুখে রং মেখে মালিক খোঁজে
তোমার দুর্গা তখন নাসায় বসে
মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার স্বপ্ন দেখে ।
আমার দুর্গা রাতের বাসে হয় ধর্ষিত
ধর্ষকেরা ছাড়া পায় আইনের বেড়া জাল করে ছিন্ন।
দামিনীরা আজও হাসপাতালে রোগশয্যায় কাঁদে
আর বীরপুরুষেরা বাসনার আগুনে তৃপ্ত হয়ে
বুক ফুলিয়ে হাটে ।
আমার দুর্গা দিনের আলোতে হয় ধর্ষিত
লোকো সমাজের সব অবক্ষয় দেখেও
চুপ করে থাকে স্বার্থপর মুখগুলো ।

আমার দুর্গা চাকরির নামে পতিতালয়ে পায় স্থান
অসুর রুপী পুরুষগুলো কামনার রসে সিক্ত হয়ে
জন্ম দেয় কতশত জারজ সন্তান।
নাম গোত্রহীন দুর্গা তখন রাস্তায় পড়ে কাঁদে
তাঁরও ঠাঁই হবে আবার কোন বেশ্যারই কোলে।
আমার দুর্গা লোকের বাড়ি এঁঠো বাসন মাজে
রাস্তার ধারে চায়ের দোকান চালিয়ে
সেও সংসার পালন করে।

আমার দুর্গা আজ মাথা তুলে হাঁটে
শিরদাঁড়া সোজা করে সেও প্রতিবাদে গর্জে ওঠে
দুষ্টের দমন শিষ্টের পালন মূলমন্ত্র তার
কোন সমাজ বা সামাজিক প্রভাব
হার মানাতে পারবে না তাকে আর।
তাই বলি
“মহিষাসুর নিরনাসি ভক্তানাং সূখদে নমঃহা
রুপাং দেহি জয়ং দেহি যশো দেহী দ্বিষো জহি”।
…………………………………………..

দীপ না নিভে যায়
বিজন মজুমদার

দীপের আলো জ্বালাতে গিয়ে
হও সবে সাবধান
একটু ভুলে জীবনের পাতা
হতে পারে খান খান !

শব্দবাজির হুংকারে ওই
জানালা গুলো কাঁপে
বয়ষ্কদের কান ঝালাপালা
বিকট শব্দের চাপে !

রকেট বাজি দিক ভ্রষ্ট হয়ে
করে দেয় বড় ক্ষতি
সীমারেখা অতিক্রম করার
না যেন হয় দুর্মতি !

একটুখানি বিবেচনা বোধ
রাখা চাই বুকে ধরে
দীপাবলি হবে তবেই মধুর
ছোট বড় সবার তরে।
…………………………………………..

মায়ের কাছে
রিয়াদ হায়দার

কাশের বনে দোলা দিয়ে শরৎ যখন আসে,
মনটা তখন উদাসী হয় স্বপ্নতরী ভাসে!
চারিদিকে ঢাক গুড় গুড় মায়ের ছবি মনে,
মা আসছেন ভূবন জুড়ে সবার ঘরের কোণে!

আদর দিয়ে সোহাগ দিয়ে করবো মা’কে স্মরণ,
শিউলি-পলাশ রাঙিয়ে দিয়ে করবো মা’কে বরণ!
তাঁর ছোঁয়াতে ধন্য হয়ে গাইবো জয়গান,
মায়ের প্রতি তাইতো সবার
অপূর্ব এক টান!

মা আসছেন ভুবন জুড়ে খুশির ঝিলিক উঠুক,
হিংসা-বিবাদ ভুলে গিয়ে সম্প্রীতি ফুল ফুটুক!
মা আসছেন শরৎ মেখে ভরিয়ে সবার প্রাণ,
চাইবো মাগো সব সমস্যার হোকনা অবসান!
…………………………………………..

শারদ প্রাতে
কমল কুজুর

শুভ্র কাশের ছোঁয়ায় রাঙানো ভুবন
ছড়ায় আলো দেখায় স্বপন,
তবু নীলের দাপটে ম্লান হয় সব
আকাশের নীল ক্রমশঃ ছড়িয়ে পড়ে
শিরায় শিরায়, করে আঘাত মানব সভ্যতায় ।

বিস্তৃত পথচলায় দেয় বাঁধা অদৃশ্য অসুর এক
সে আগুনে পুড়ে ছাই
এতো দিনের সাজানো সংসার ।
জ্ঞানী গুণী, ধনী গরীব, পাপী সাধু এক কাতারে
সব অসহায় আত্মসমর্পণের ডালা সাজায়।

শরীরের খুব ভেতরে তবু বাজে মাদল
রক্তে রক্তে পথের নেশায় লাগে দোল,
আকাশ বাতাস ওঠে ভরে
শঙ্খের মধুর আহ্বানে
দশভুজার আগমন সিংহের গর্জনে ।

দোলায় দিয়ে ভর আসেন ছুটে চিন্ময়ী
সন্তানের অমাবস্যা করতে দূর
সমুদ্রস্রোত আর নদীজলে
ভেসে ভেসে আসা শারদীয়া সুর
বিপদ মুক্ত করে আবার সবাইকে রাঙিয়ে যায়।
…………………………………………..

তুই যে আমার সই
রিয়া চক্রবর্তী

আকাশগঙ্গার পথটা ধরে
আসবি কখন তুই?
দুর্গা নামেই ডাকে সবাই
তুই যে আমার সই।

দিগন্ত ওই মিশছে যে দেখ
সবুজ মাঠের ধারে
চলনা ওদের মিলন দেখি
লুকিয়ে ঝিলের পাড়ে।

ছাতিম ফুলের গন্ধে যে
উথাল পাথাল মন,
আয়না চলে আমার বুকে
সই, আমার কথা শোন।

আকাশ লাজে রাঙা
দেখ গোধূলির প্রেমে
ও সই, তোর হাতটা ধরে
চাঁদ ও আসুক নেমে।

শহর ও গলছে রে দেখ
উদাসী দুপুর
কৈলাস ছেড়ে আয় না চলে
বাজিয়ে নুপুর।

পদ্ম পাতায় খেলবো রে
সই, সাপ মই এর খেলা
শরৎ এলো, আয় চলে তুই
আর করিস না বেলা।।
…………………………………………..

সব চরিত্র কাল্পনিক
ঝুমা মল্লিক

শরত আকাশে মেঘ আছে,
আছে মেঘের মতো ইচ্ছে ।
উড়িয়ে দিয়ে সকল বাঁধা
চলো ঘুরে দেখি দেশটা।
পাহাড় দেখবো বলে ঝর্ণা হলাম ।
কতো কথা বললাম, নিজের নাম লিখলাম।
পাহাড় ভালোবাসা দিল, সাথে নিল কঠিন শপথ।
আমাকে কঠিন তিরষ্কারে আটক করলো।
বন ডেকে ছিল।জমি দিল।নুড়ি পাথর দিল।
ভালোবাসার গল্প লিখলো নরম মাটিতে, কিন্তু
বন্য জীবজন্তু সব কেড়ে নেবে বললো।কাছাকাছি
ছিল মরুভূমি।আত্মীয় হবার আমন্ত্রণ জানালো।
বালির মতোই হলো জীবন, যন্ত্রণা আপন ।
এইটুকু সুখ, আকাশ দেখেছে সব।সত্য কথা
বলেছে, নেবার ইচ্ছে যাদের তারা নেবে শুধু সুখ।
আর দেবার বেলায় শুধু অসুখ।
…………………………………………..

অপেক্ষা
রিয়া ভট্টাচার্য

আজকাল আর ভালোবাসতে ইচ্ছে করেনা।
অনেকগুলো দিন কেটে গেছে পড়ে থাকা খুচরো গুনে।
তাকের কোনায় তুলে রাখা পারফিউমের শিশিটায় জমাট বাঁধা মরচে
একরাশ শিউলি শুকিয়ে আছে পায়ের নীচে।
আজকাল আর কথা দিতে ইচ্ছে করে না।
কাঁচ ভাঙার শব্দটা কাঁপিয়ে দিয়েছে অস্তিত্ব।
খোলামকুচির মত কথা বিক্রি করেছি সময়ের বাজারে
এবার অন্তত শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়তে চাই।
আজকাল আর অপেক্ষা করতে ভালো লাগেনা।
ঘড়ির কাঁটা থমকে গেলে আস্তাকুড়ে পড়ে থাকে বাতিল অবস্থায়।
দম দেওয়া কলের পুতুলের ঘাড় ভেঙেছে কবেই
কোনো ফেভিকলই তাকে ক্ষমতা রাখে না জুড়বার।
আজকাল ভালোটাকেই ভালো লাগেনা বিন্দুমাত্র।
পিপাসার্ত পথিকের মুখে তুলে দিই দাহ্য গরলের পেয়ালা।
পথভোলা মানুষের ইতিহাস লিখছি জাবদা খাতার পাতায়;
একদিন না হয় তাদের আবর্জনা ভেবে ছিঁড়ে ফেলে দেব।।
…………………………………………..

জায়গা আছে
শংকর ব্রহ্ম

খুব বেশী দুঃখ পেলে ছুটে আসিস আমার কাছে
তোর জন্য বুকের ভিতর আজও অনেক জায়গা আছে,
মনে ভীষণ কষ্ট হলে
ছুটে এসে বুকে আমার ঝাঁপিয়ে পড়িস,
ভালবাসা পড়লে ঝরে ধীরে ধীরে
যেমন ফুলের পাপড়ি থেকে শিশির ঝরে
মন খারাপের ভাবনাগুলো আমাকে দিস,
মান অভিমান যা আছে তোর
আমার কাছে জমা রাখিস
কেউ না চিনুক তুই তো আমায় ভাল চিনিস,
বুকের ভিতর প্রেমের গোলাপ না-ই বা ফুটুক
তোর জন্য অনেকখানি জায়গা আছে
ভীষণ রকম মন খারাপের দিনগুলোতে
চলে আসিস আমার কাছে।
…………………………………………..

রাবণ জানতেন
সিদ্ধার্থ সিংহ

যতই গণ্ডি কেটে দিয়ে যাক লক্ষ্মণেরা
আমি ঠিক তার বাইরে বের করে আনব তোমাকে
দু’বাহুতে বন্দি করে রাখব।

সূর্পণখার নাক কেটে দিয়েছে দেখে
রাবণ সীতাকে হরণ করেননি
তিনি ভাল করেই জানতেন
ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনও নারীকে ছুঁলেই
তাঁর ন’টা মুণ্ডুই তৎক্ষণাৎ খসে যাবে।
ফলে আপনারা যা ভাবছেন, সে মতলবেও নয়,
রাবণ জানতেন
সীতা আসলে লক্ষ্মী
লক্ষ্মীকে নিজের রাজ্যে রাখতে পারলে
ধন-সম্পদ-শস্যে উপচে পড়বে দেশ
তাই শুধুমাত্র প্রজাদের মঙ্গলের জন্যই
তিনি সীতাকে হরণ করেছিলেন।

যতই গণ্ডি কেটে দিয়ে যাক লক্ষ্মণেরা
আমি তার বাইরে ঠিক বের করে আনব তোমাকে
দু’বাহুতে বন্দি করে রাখব।
আমার ঘর নিষ্প্রদীপ, মলিন
তুমি থাকলে ঝলমল করে উঠবে ঘর
এবং দুয়ার।
…………………………………………..

মা আসছে এই বাংলায়
চিত্তরঞ্জন সাহা চিতু

মা আসছে সে আশাতে অপেক্ষাতে থাকি,
মনের ভেতর সেই বাসনায় তোমায় মাগো ডাকি।
এসো এসো মাগো তুমি এই বাঙালির ঘরে,
তুমি আছো থাকবে তুমি আমাদের অন্তরে।

আসলে তুমি ঢাক ঢোলকের বাজনা শুধু বাজে,
ছোট বড় সবাই তখন নতুন করে সাজে।
অঞ্জলি দেয় মায়ের পায়ে কত্তো আশা করে,
বড় হবে সবাই মাগো বই পত্তর পড়ে।

যে কটা দিন থাকো মাগো বড্ড ভালো লাগে,
মনের ভেতর হই হুল্লোড় আনন্দের সুর জাগে।
দুঃখ ব্যথা সব ভুলে যায় তোমায় কাছে পেয়ে,
তাক কুর কুর ঢাকের তালে তাইতো নেচে গেয়ে।

কিন্তু মাগো বিদায় বেলা চোখ ছল ছল করে,
দুঃখটাকে তোমায় মাগো বুঝায় কেমন করে।
ভক্তগুলোর তুমি মাগো একটু ভালবেসো,
এই বাংলায় ঘরে ঘরে বারে বারে এসো।
…………………………………………..

কোন এক বনলতা সেন
গৌতম চট্টোপাধ্যায়

কাল রাতের ভীষণ ঝড়ে
আমার বড় যত্নে লাগানো গাছটির
অনেক ডাল ভেঙে গেছে…
কিছু পাতা তো আগেই হলুদ, কালো,
বিবর্ণ হয়ে গেছিল….,
সাথে ছোট-ছোট দু’ চার কচি সবুজ পাতা
দাপট না সামলাতে পেরে বৃক্ষহীন হয়ে ঝরে গেছে…
যার ছায়ায় বসে টুপটাপ
দু’ চার ফুল ফলের আশায় থাকা আমি
আজ বহু কষ্টে এক একটি করে
সব কোমর ভাঙা সময়ের ডাল সযত্নে তুলে
সব ঝরে যাওয়া পাতাকে সরিয়ে দেওয়ার সময় একটা তছনছ হওয়া ভাঙ্গা বাসা দেখলাম..
মুখ উঁচু করতেই দেখি একটা শুকনো ডালে
এক পাখি নিজের তছনছ হওয়া বাসা দেখছে…
এক বিপর্যস্ত পাখির নীড়ে
বনলতা সেন’এর ভালবাসার এ প্রলাপ
আমি দেখিনি কখনো…
…………………………………………..

শারদীয় দূর্গায় শুভেচ্ছা
মুহাম্মদ ইব্রাহিম বাহারী

পূজা হয় রোজা হয় এই দেশে
মোলাকাত কোলাকোলি হয় হেসে
উৎসবে যোগ দেয় দুই জাতি
নেই কোনো গোলযোগ হাতাহাতি।

সম্প্রীতি ভালোবাসায় সব কিছু
কোনো জাতির হয়না মাথা নিচু
হিন্দু -মুসলিম এক সাথে
চলাচলে ভেদাভেদ নেই তাতে।

এই দেশ এই মাটি সকলের
সহনশীল সকলেই ধকলের
শারদীয় দূর্গায় শুভেচ্ছা
মিলেমিশে থাকতে খুব ইচ্ছা।
…………………………………………..

হাসি
চিরঞ্জিত ভাণ্ডারী

সে যে শোকের কষাঘাতে শুকানো একনদী
যদি প্রশান্তির প্রতিটি পাপড়ি কেটে দেয় দুষ্টকীট
কি করে ই বা গাভীন আশা মেলতে পারে অঙ্কুর।
জীবন আসলে আঁকড়ে ধরার ভরসাটুকু নিয়ে
বিশ্বাসের হাতে সঁপে দেওয়া একটি তরতাজাফুল,
এ-কূল হারালে অন্যকূলের আশে নৌকা ভাসায়
শেষমেশ খড়কুটো ধরে ডিঙতে চায় জল পিপীলিকা জীবন।
হন্যে হয়ে খুঁজলেও, যদি না পায় ধরার কোন ডাল
চোখের পাতায় মরে যায় যাবতীয় ইচ্ছের সুকুমার পরাগ।
এমন তো কিছুই না শুধু দুঃখ ভুলে থাকার সবুজ
বাসনায় যতটুকু রাখলে পাখিটির ঠোঁটে ভোরের সঙ্গীত
ঠিক ততটুকু লাবণ্যে চুবিয়ে তৃষিত আকাঙ্ক্ষা
সে যে বাজাতে চায় মনোসন্তোষের কোজাগরী ঘুঙুর ।
বহুদিন বহুদিন দুর্ভিক্ষ ছেয়ে আছে মাটি
চিবুকের নরম জোছনা মরে পড়ে আছে বালুকায়
এখন যারা জীবিত হেঁটে যাচ্ছে পথ, ছুঁয়ে দেখ
বুকের ভেতর ফুসফুস কতখানি বিকল হলে
ভুলে যাওয়া সহজ প্রিয় হাসিটির কথা।
দাও দাও ফিরিয়ে দাও সরল মানুষের সরল হয়ে থাকার দিনলিপি
ওরা একটু হাসতে চায়, ওরা একটু হাসতে চায়।
হাসি আসলে দুঃখকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেবার মহৌষধ ।
…………………………………………..

মায়া
অলোক রায়

মায়া কি কোন অদৃশ্য পিছুটান,
জন্মিলে মরিবে জেনেও কেন থাকে মায়ার টান।
অবিদ্যার কালো ছায়া করলে গ্রাস,
মায়া রূপ অদৃশ্য বল কুড়ে কুড়ে খায় নিশ্বাস।
ভ্রান্ত জ্ঞানী আজ ভ্রাম্যমাণ সবখানে,
হত না ভ্রান্ত যদি থাকতো ধারণা সম্যক জ্ঞানে।
মুক্তির জ্ঞান দেয় মায়ার স্বরূপ বলে,
তলে তলে সে নিজেই নিজেকে জানে ভ্রান্ত বলে।
আসলে দুঃখ কষ্ট যাই বলো সবই মায়ার খেলা,
এমনও তো হতে বিশ্ব জগৎ মায়ার ভেলা।
মুক্তি পাবে না থাকো যদি জীবনে টানের অবস্থানে,
পাবে মুক্তি যদি তুমি পরিচিত হও সম্যক জ্ঞানে,
বিষয় আশয়ে কিসের টান কিসের নেশা,
মায়া মুক্ত জীবন কাটানোই হোক তোমার পেশা।
ভাবছো মায়ার বন্ধন মুক্তি সে তো বড়ো দায়,
জেনো তবে মায়াময় জগতে সবাই খালি হাতেই
আসে আর খালি হাতেই ফিরে যায়।
…………………………………………..

কৃত্রিম সভ্যতা
উত্তম দেবনাথ

কৃত্রিম কাষ্ঠহাসিতে হাঁফ ধরা সমাজে
সভ্যতার ঘোলা জলে — হাবুডুবু খেতে খেতে
অকৃত্রিম অভিব্যক্তিকে মনে হয় পাগলাম।
মিথ্যার বেড়াজালে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা সমাজে
সহজ সারল্য, নিপাট সত্যকে বিশ্বাস করতে
ভীষম খেতে হয়।
মনে হয় অন্তরালে আছে কোন মতলব ভাজ।

যখন বুঝা যায়- এ’ নিপাট সত্য, অকপট সারল্য,
তখন- সেকেলে বা অচতুর ভেবে,
করুণায় আর্দ্র হয়ে উঠি।
সময়ের অযোগ্য ভেবে-
হৃদয়ে মায়ার উদ্রেক হয়।
আফসোসও করি,
শঙ্কিত হই তাঁর চলার সামর্থ নিয়।

অথচ তথাকথিত সভ্যতায় গা ভাসানো
এই কপট আমাদেরকেই-
অবচেতনে, বিবেকের বিদ্রূপাত্মক ভ্রূকুটির বেদনা সন্তাপে
নিত্য জ্বলে- মানবিক অবক্ষয়ের ভারে
ন্যুব্জ হয়ে চলতে হয়- নত শিরে।
আর তখন-
আসামী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকি,
বিবেকের কাঠগড়া।
…………………………………………..

দুর্গা মায়ের রূপ
সৌমেন দেবনাথ

মা দুর্গার চোখে তাকালে
মনটা যায় যে ভরে,
মায়ের চোখে কী যে মায়া
রাখে আকুল করে।

মায়ের হাতে তীর্যক চেয়ে
মহাদেবের ত্রিশূল,
মাগো তুমি ক্ষমা করো
করেছি কতই ভুল।

তোমার হাতে পাচ্ছে শোভা
বিষ্ণু দেবের চক্র,
পাপের চাপে আমরা সারা
হয়ো না মা বক্র।

তোমার হাতে শ্বেত শুভ্র
বরুণ দেবের শঙ্খ,
আমরা মূর্খের সর্দার মাগো
করি লম্ফঝম্ফ।

তুমি ধারণ করে আছো
অগ্নি দেবের শক্তি,
আমরা তোমায় ভুলে যাই মা
করি না তো ভক্তি।

তোমার হাতে যায় যে দেখা
ঐরাবতের ঘণ্টা,
তোমার পায়ে সঁপে দিলাম
সঁপে দিলাম মনটা।

তোমার শক্তি বৃদ্ধি কল্পে
ইন্দ্র দিলেন বজ্র,
ভুল করি মা ভুল বুঝি না
আমরা ধরার বর্জ্য।

তোমার রূপে বাড়লো চমক
দিলেন রশ্মি সূর্য,
তেমনি তোমার কৃপায় মাগো
বাড়বে শৌর্য-বীর্য।

বায়ু দিলেন বাণপূর্ণ তূণীর
আরো দিলেন ধনু,
তোমার কাছে মাগো মোরা
অণু আর পরমাণু।

ব্রহ্মা দিলেন অক্ষমালা
আরো কমণ্ডলু,
রণ সাজে সাজলেন মা যে
নয় কো আলুথালু।

ক্ষিরোদ সাগর দিলেন বস্ত্র
বিশ্বকর্মা অস্ত্র,
অসুর বিনাশে মা মাতলেন
হয়ে ভীষণ রুদ্র।

শীষনাগ দিলেন নাগহার মাকে
যম দিলেন কালদণ্ড,
মা যাবেন অসুর বিনাশে
ক্ষিপ্র তাই প্রচণ্ড।

হিমালয় দিলেন এক সিংহ
বরুণ দিলেন পাশ,
অসুর বিনাশে আমার মা
স্বর্গে দেবে বিভাস।

অমৃতের পান পাত্র দিলেন
ধনের দেব কুবের,
মহিষাসুর বিনাশে মা
হয়ে যাবেন বের।

এভাবেই মা হলেন তেজী
শক্তির সাথে যুক্ত,
মহিষাসুরকে হত্যা করে
স্বর্গ করলেন মুক্ত।
…………………………………………..

পুজোর বার্তা
সৌরভকুমার ভূঞ্যা

একটি বছর পরে আবার মায়ের আগমন
আনন্দ আর খুশির টানে নাচছে সবার মন।
কিন্তু সবাই মনে রেখো সময়টা নয় ভালো
আলোর আকাশ ঘিরে আছে রাক্ষুসী এক কালো।
অসুর এবার মণ্ডপে নেই ঘুরছে আশেপাশে
ভুল করেও পা দিও না তার বাড়ানো ফাঁসে।
একটি বার পড়লে ধরা রক্ষেটি আর নেই
জানবে না তো তখন তোমার কোথায় হবে ঠাঁই।
বিশ্ব জুড়ে মৃত্যু মিছিল চলছে হাহাকার
থাকলে জীবন এমন পুজো আসবে বারংবার।
আনন্দটা থাক না তোলা পরের বছর তরে
পুজোর কটা দিন এবার সবার কাটুক ঘরে।
হয়তো অনেক কষ্ট হবে, হয়তো বা আপশোশ
ভুল করেও দেখিও না কোনোই দুঃসাহস।
বুকের মাঝে বাঁচিয়ে রাখো একটুখানি ভয়
সেটাই হয়তো রুখতে পারে জীবন বিপর্যয়।
…………………………………………..

ময়না কথায় ঈশ্বরের হাত
রঘুনাথ চট্টোপাধ্যায়

নিরাকার আরশিতে ভবিষ্যত দোল খাচ্ছে ফিউজ বাল্ব
সাকার আরশি বাজাচ্ছে লঘু পাপে গুরু দন্ড
অমানবিকতার চওড়া পায়ে পদপিষ্ট সময়
সময়ের ভেতরে বুকচাপা বোবা অগ্নিগর্ভ
মানুষের হাঁটা এখন তারের উপর ব্যালান্স খেলা
এক হাতে ফিতে ধরা অন্য হাতে নিত্তি
বজ্র-বিদ্যুত হুমকিতে পর্যুদস্ত যাবতীয় প্রতিবাদ
পৈতৃক মুলুক ছেড়ে উড়ে গেছে দ্বীপান্তরে
স্বস্তি বলতে অন্তরালে বিশুদ্ধ ময়না কথা:
ঈশ্বরের হাতে জেগে উঠছে মর্ত্য সংস্কারের বিল…