“‘শান্তিনিকেতনে ভদ্রলোকের পক্ষে থাকা অসম্ভব’, চাকরি ছাড়ার নোটিশে অপমানিত মুজতবা আলী ১৯৬১ সাল। নানা দেশ ঘুরে, নানা কাজে ইস্তফা দিয়ে আবারও শান্তিনিকেতনে ফিরে এসেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। ১৮ আগস্ট যোগ দিলেন ইসলামিক হিস্ট্রি ও জার্মান ভাষার রিডার হিসাবে। শান্তিনিকেতনের প্রাক্তন ছাত্র সুধীর রঞ্জন দাস তখন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। তিনিই অ্যাড-হক ভিত্তিতে তাঁকে নিয়োগ করেন।

বিশ্বভারতীর দরজা খুলে গেল আবার। সেইসঙ্গে স্মৃতির দরজাও। একদিন কবিগুরুর চিঠি পেয়ে সেই যে বছর পনেরোর বালক ছুটে এসেছিল এখানে। সেই থেকে জীবনকে অন্যভাবে চিনতে শিখেছেন মুজতবা। কিন্তু সেইসঙ্গে যে আরও অভাবনীয় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করে ছিল এই আশ্রমেই, সেটা তখনও বোঝা যায়নি। এই আশ্রমই যে তাঁকে একদিন ‘পাকিস্তানের চর’ অপবাদ দিয়ে বহিষ্কার করবে।

তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা শুরু হয় ১৯৬৪ সাল থেকেই। কলকাতা শহরের বেশ কিছু পত্রিকা এই প্রতিযোগিতায় সামিল হয়েছিল। ওই বছরই ‘বেতার জগৎ’ পত্রিকার শারদ সংখ্যায় তাঁর বহু আগে লেখা একটি বেতার ভাষণ পুনর্মুদ্রিত হয়। আর সেই লেখাকেই হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন সমালোচকরা। ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় বেতার-সমালোচনা বিভাগে যার পর নাই মিথ্যাচার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক আচরণের অভিযোগ আনা হয়। এমনও বলা হয়, ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার সুযোগ নিয়ে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দু দেবদেবীদের অপমান করে চলেছেন। অবশ্য পরিমল গোস্বামীর মতো কোনো কোনো যুক্তিবাদী মানুষ তখন মুজতবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

ইতিমধ্যে আবার ঢাকায় নানা পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় বলা হয় আলী নাকি ‘হেঁদু’ হয়ে গিয়েছেন। সেইসঙ্গে ভাষা-আন্দোলনের অজুহাতে তিনি পাকিস্তানের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন বলেও অভিযোগ তোলা হয়। এর মধ্যে সৈয়দ মুজতবা আলীর বয়স ৬০-এর কোঠা পার করে। অর্থাৎ নিয়ম মেনে তাঁর অবসর নেওয়ার সময়। কিন্তু তখন অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নিজস্ব ক্ষমতার বলে অনেকেই আরও ৫ বছর কাজে বহাল হচ্ছিলেন। ১৯৬৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ৬১-তে পা রাখার পরেও চাকরি ছাড়ার কোনো নোটিশ পাননি তিনি। অতএব তিনিও আরও ৫ বছর নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন বলেই আশা করেছিলেন।

কিন্তু সবসময় যা ভাবা হয়, তা তো হয় না। নোটিশ এল ১৯৬৫ সালের ৩০ জুন। কিন্তু এমন অসময়ে চাকরি থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার কোনো কারণ জানানো হল না। রাগে, ক্ষোভে শান্তিনিকেতন ছাড়লেন মুজতবা। উঠলেন বোলপুরের একটা ভাড়া বাড়িতে। যাওয়ার সময় বন্ধু হীরেন্দ্রনাথ দত্তকে বলেই দিলেন, “আমি জীবনে আর শান্তিনিকেতনে ফিরব না।” শিল্পী-বন্ধু বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়কে বলে যান, “আমি যাচ্ছি। এখন হয়তো আমি শুনবো যে তুমি মারা গেছো, নয়তো তুমি শুনবে আমি মারা গেছি।”

ততদিনে আবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ লেগে গিয়েছে। আর এই সময় নানা ধরনের সন্দেহ আর অবিশ্বাসের বীজ ছড়িয়ে চলেছে প্রচার মাধ্যম। তাঁদের কুৎসিত আক্রমণের মুখে পড়লেন সৈয়দ মুজতবা আলী। ‘মুজতবা আলী আসলে পাকিস্তানের চর’, ‘তাঁর পরিবার থাকে পাকিস্তানে, তাঁর স্ত্রী পাকিস্তান সরকারের চাকুরে, তাহলে তিনি এখানে কেন?’ –এমনই নানা ধরণের কটুক্তি প্রকাশিত হতে থাকে তাঁর নামে। আর সেই অপপ্রচারে পাল্লা দিয়ে সামিল হয় শান্তিনিকেতনের একসময়ের বন্ধুরাও।

যে আশ্রম এক সময় তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় তীর্থ হয়ে ছিল, সেটাই এখন তাঁর জীবনের এক অন্ধকার অধ্যায়। কিছু কিছু চিঠিতে সেই হতাশার আভাস পাওয়া গিয়েছে। কলকাতায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, “শান্তিনিকেতনে ভদ্রলোকের পক্ষে থাকা অসম্ভব (আমি সর্ব সম্পর্ক ছিন্ন করে দূরে বোলপুর শহরে থাকি)। ওদের কালোবাজারের সামনে মারোয়াড়ি লজ্জায় ঘোমটা টানে। …বিশ্বভারতীর পাঠকদের দিয়ে আমি তিনদিনের ভিতর ‘বাপ্পো বাপ্পো’ রব ছাড়াতে পারি। কিন্তু ইনডাইরেক্টলি বিশ্বভারতীকে ‘hurt’ করতে মন যায় না। আর লড়বো কার সঙ্গে? এরা পারে দু ছত্র বাংলা লিখতে! কী উত্তর দেবে? তবে হাঁ, ওদের চামড়াটি আল্লার ‘কেরপায়’ গন্ডার।…”

এইসব খবর সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে যায় ঢাকা শহরেও। সেখান থেকে চিঠি লিখে হুমায়ূন কবির সাগরময় ঘোষের কাছে সব ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলেন। শান্তিনিকেতনের কতিপয় ব্যক্তির দিকে সন্দেহের তীর ছুঁড়েছিলেন সাগরময় ঘোষও। তিনি উত্তরে লিখেছিলেন “আমার ধারণা শান্তিনিকেতনে কিছু অর্বাচীন লোকজন এসে জড়ো হয়। তাঁরা মুজতবাকে ভালোভাবে জানতেন না। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় তাঁরাই রটিয়েছিলেন যে, মুজতবার পরিবার-পরিজন থাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং তিনি এখানে। সুতরাং সৈয়দদা পাকিস্তানের চর!”

এরপর একবার ঢাকায় গিয়েছিলেন তিনি। শরীর তখন একেবারেই ভেঙে পড়েছে। এদেশে ফিরে কলকাতাতেই থাকতে শুরু করলেন ১৯৬৮ সালে। ১৯৭২ সাল পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলে সেখানে নাগরিকত্ব পান। ১৯৭৪ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের পিজি হাসপাতালে জীবনাবসান হল সৈয়দ মুজতবা আলীর। সারা জীবন হাসিঠাট্টা আর রসিকতার মধ্যেই আসর মাতিয়ে রাখতেন যিনি, তিনিই শেষ জীবনে এভাবে বিষাদে ঢাকা পড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু আজও মানুষকে আনন্দ দিয়ে যায় তাঁর কুট্টিরা। এসবের মধ্যেই ঢাকা পড়ে গিয়েছে সেই অন্ধকার সময়ের কাহিনি। হয়তো ভালোই হয়েছে।”

তথ্যসূত্র: বিজন বিহারী পুরকায়স্থের লেখা ‘সৈয়দ মুজতবা আলী’ অবলম্বনে সৌম্যদীপ গোস্বামী, প্রহর.ইন, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২০