একবিংশ শতাব্দীর সভ্য সমাজে নারী কি সত্যি নির্যাতিত, নিপীড়িত, শৃঙ্খলিত, মূল্যহীন এবং দাসী? সমাজে নারী বৈষম্যের কোন রূপ কি বিদ্যমান? নারী কি তার মতো করে সব ভাবতে পারে বা করতে পারে? অপরাধের সব দায় কি কেবল নারীর? এমন হাজারো প্রশ্নের উত্তর তথা কথিত নারীবাদী, প্রগতিশীল বা উচ্চ শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীদের কাছে নাই। কেননা, কোন না কোনভাবে এরা সবাই দায়ী।
যে সমাজ প্লেটো বা এরিষ্টটল-এর মতো চরম নারী বিদ্বেষীদের মাথার তাজ মনে করে বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মত প্রচন্ড মানব প্রেমির হাতে ভবতারিণী হয়ে যায় মৃণালিনী, অথবা শেক্সপিয়রের নাটকে যখন ম্যাকবেথের স্ত্রী নামহীন লেডি ম্যাকবেথ হয়ে থাকে এবং তাদের শিক্ষায় আমাদের শিক্ষিত করা হয়, সে সমাজে নারী মুক্তি সুদূরপরাহত।
এ সমাজে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর লালসালুর জমিলাদের দেখা যায়না, বা মোহাম্মদ নজিবুর রহমান সাহিত্যরেত্নর আনোয়ারা উপন্যাসের আনোয়ার কোন গুরুত্ব দেয়া হয়না। ‘নারী পণ্য সমাজে, পরিবারে, ও সংবাদপত্রে’। এ আজো পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারেনি। এখানে নারীবাদের প্রকৃত শিক্ষা পাঠক্রমে অর্ন্তভূক্ত করে নারী-পুরুষকে মানুষরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এমনকি ব্যর্থতার কারণও নিরুপণ করতে পারেনি।
যে সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম নারী অধিকার নিয়ে অনুষ্ঠান বানায় তারাই নারীকে পণ্য বানায়। তারাই নারীকে মস্তিষ্কহীন এক দাসীতে পরিণত করে। যে সমাজে বলা হয় ‘নারী, শিশু ও প্রতিবন্দী’র জন্য সংরক্ষিত আসন, সে সমাজে নারীবাদীদের খুশি মুখ সমাজকে পুরুষতান্ত্রিক করে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিক পালন করে বৈ কি।
লিঙ্গগত পার্থক্য প্রকৃতিদত্ত। এ পার্থক্য মানব কল্যাণেই নিহিত। নারী-পুরুষের পারস্পরিক সম্পর্ক পৃথিবীকে ফুলের বাগানে পরিণত করার কথা। কিন্তু কোন কোন নারীবাদী যখন ‘পার্থক্য’ আর ‘বৈষম্য’কে এক করে ফেলেন তখনই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের মানুষেরা খিলখিল করে হাসে।
এদেশের নারীবাদীরা ’জেন্ডার সত্তাকে’ স্বীকার করেনা। কিন্তু ’শরীরতত্ত্বীয়’ পার্থক্যের কথা বলেন। এ দু’টি পরস্পর বিরোধী দর্শন বা চিন্তা। মূলত ‘জেন্ডার তত্ত্ব’ ও ‘শরীরতত্ত্বীয়’ পার্থক্যকে এক পাশে রেখে পুরুষ কর্তৃক নারীকে অধস্তন করার প্রবণতাকে চিহ্নিত ও নিরসনের পথ তৈরি করা একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত।
স্থানীয় থেকে জাতীয় পর্যায়ে সবার ভোটাধিকারের মূল্য একই হলে নির্বাচনী আসনে নারীর জন্য আলাদা পদ (সংরক্ষিত মহিলা আসন ও মাহিলা ভাইস চেয়ারম্যান) তৈরি করার মাধ্যমে ‘নারী’কে আলাদা প্রজাতি তথা ‘জাতিসত্তার’ দিকে ধাবিত করে আরো দুর্বল করা হচ্ছে। এ পদ তৈরির মধ্য দিয়ে পুরুষকে আরো দৈত্যাকার হিংস্র পেশি শক্তি সম্পন্ন এবং নারীকে আরো দুর্বল তথা অবলা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।
এ সমাজে নারীবাদী শিক্ষাকে পুরুষের চিন্তা চেতনার প্রতিপক্ষ হিসাবে দাঁড় করায় উভয় পক্ষ। পুরুষ তার একক কর্তৃত্ব হারানোর ভয়ে নারীবাদকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে এবং বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে সাধারণীকরণের মাধ্যমে নারীর প্রতি সামষ্টিক ঘৃণা ছড়ায়। অন্য দিকে কিছু নারীবাদী এর মূল শিক্ষাকে না বুঝে পুরুষের প্রতি নারীর বিদ্বেষ সৃষ্টিতে কাজ করে। এমনকি সেসব নারীবাদীরা অন্য নারীদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী ও ক্ষমতাসম্পন্ন ভাবেন। এমন ভাবণা ও আচরণে কিছু নারীবাদী যেমন পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অর্ন্তভূক্ত হয়ে যান তেমনি অন্য নারীরা পুরুষ-নারীতান্ত্রিক নিষ্পেষণের শিকার হয়ে পড়েন।
পুরুষতন্ত্রের প্রাণ ক্ষমতা। সে ক্ষমতার জন্য পুঁজিবাদী আচরণ ও সমাজের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তি বনে যাওয়া সব পুরুষ ও নারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অর্ন্তভুক্ত হয়ে যান। আবার পুরুষ বা নারী যদি একক ক্ষমতার চর্চা করেন তখন তারা পিতৃতান্ত্রিক সমাজভুক্ত হয়ে যান। এমতাবস্থায় নারী বা পুরুষ আচরণের জন্য পুরুষতান্ত্রিক বা মানবীয় চিন্তা ও চর্চার জন্য নারীবাদী হতে পারেন। এভাবে বৈষম্য ও প্রতিকারের উপায় বের করতে পারলেই নারী ও পুরুষ কেবল মানুষরূপে সমাজে পাশাপাশি চলতে পারবে। নচেৎ ব্যবদান যোজন যোজন বৃদ্ধি পাবে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি ঘটনা বিশ্লেষণ করলে উপরের বিষয়গুলি আরো স্পষ্ট হবে। যেমন সম্প্রতি (২ আক্টোবর ২০) দিনাজপুরে এক ইউএনও-এর উপর রাতের আঁধারে পাশবিক আক্রমণ করে নরপশুরা। কিন্তু প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম ‘নারী ইউএনও‘ হিসাবে সংবাদ প্রচার করে, যা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চরিত্র। এছাড়া কোন পুরুষ বা নারীকে বলতে শুনিনি রাঁতে আক্রমণ করা তথকথিত পুরুষত্বে কাজ নয়। তাই এসব পাষ-দের যেমন আক্রমণের দায়ে বিচার করতে হবে তেমনি পৌরুষত্বে উপর আঘাত হানার দায়েও বিচার করতে হবে। নচেৎ পৌরুষত্ব তথা বন্যপশুর মত আচরণ করে নিজেকে পুরুষ ভাবা উচিৎ নয় তেমনি নারীরা পৌরুষত্বের বিরুদ্ধে সমন্বিতভাবে কথা বলার সাহস না থাকলে নারীবাদী ভাবা ঠিক নয়।
ঠিক তার আগে মেজর (অব.) সিনহা নির্মমভাবে পুলিশের বিপথগামীদের হাতে নিহত হওয়ার পর বিভিন্ন মাধ্যম তার সহকারী শিপ্রার ব্যক্তিগত কর্মকে সামনে তুলে এনে জনদৃষ্টি ভিন্নখাতে নেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুঃখ হলেও সত্য কোন নারীবাদী সংগঠন বা সমাজ সচেতন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এ বিষয়ে প্রতিবাদ করেননি। কেন? নারীবাদীদের উদাসীনতা আর পুরুষতান্ত্রিকেরা ভাবলেন এক পুরুষ মারা গেলেও আরো পাঁচ পুরুষতো বাঁচবে। শিপ্রার ব্যক্তিগত কর্ম সমাজের জন্য ভয়ঙ্কর হলে তার আলাদা বিচার হতে পারে। কিন্তু এটি দিয়ে সিনহা হত্যার বিচারকে ভিন্নখাতে যেমন নেয়া যাবেনা তেমনি শিপ্রাকে হেয় করে পুরুষদের সুপ্ত বা জাগ্রত পুশুত্ববাদকে সুরসুরি দেয়া ঠিক নয়। যা সমাজের স্থিতিশীলতা এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করবে বৈ কি।
করোনাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যখাতের দুর্নীতির অব্যবস্থাপনার সুযোগে সংঘটিত অপরাধের দায়ে ডা. সাবরিনা গ্রেপ্তার হয়। তারপর থেকে সাবরিনার ব্যক্তি জীবনের নোংরা ছবি সব মাধ্যমেই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এ বিষয়েও সরকারী, নারীবাদী সংগঠন বা সুশীল সমাজ প্রতিবাদ করেনি। কেউ প্রশ্ন করেনি সাবরিনার ব্পেরোয়া জীবনের খদ্দের কারা ছিল। যদি পুরুষরাই হয়ে থাকে তাদের পরিচয় কেন প্রকাশ হলোনা? একজন নারীর অপরাধাকে কেন সব নারীর উপর চাপানো হলো? তাছাড়া সাবরিনা পথ তৈরি করেছে কিন্তু তার স্বামী আরিফ সকল অপকর্ম করেছে। তবে আরিফের জীবন নিয়ে কেন কথা হবে না? এর চেয়ে বড় পুরুষতান্ত্রিক আচরণ আর কি হতে পারে?
সম্প্রতি ঢাকার বাড্ডায় বেশ কিছু নারী স্বামীদের ধুমপান ছেড়ে দেয়ার আহ্বান করে রাস্তায় মিছিল করেছিল। এরপর সামাজিক মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে এমন ভাষায় আক্রমণ করা হলো তারা যেন স্বামীদের বিপথে নেয়ার কথা বলেছেন।
এর বাহিরে আরো একটি ছবির কথা বলা দরকার যা পুরো মানব জাতির ভারসাম্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। ছবিটিতে দেখানো হয়ে একজন মা কেবল মাত্র নয় মাস সন্তানকে গর্ভে ধারণ করার পর আর কোন দায়িত্ব পালন করেনা। কিন্তু একজন বাবা সন্তানের জন্ম গ্রহণের পর থেকে সারা জীবন তার মাথায় সন্তানের কল্যাণের কথা ভাবেন এবং সে অনুসারে কাজ করেন। এমন ছবির নিচে নারী-পুরুষের বাহবা সূচক হাজারো সমর্থন। কারো কারো মতে যাদের বাবা মারা গেছে, তারাই কেবল জীবনের অর্থ বুঝে! অর্থাৎ মা মারা গেলেও খুব একটা অসুবিধা হয় না।
এক্ষেত্রে কেউ কেউ কাজী নজরুল ইসলামের ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই।/বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।/ বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি,/অর্ধেক তার আনিয়াছে নর, অর্ধেক তার নারী।’-এ অমিয় বাণী দিয়ে সমতার কথা বলেন। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো কল্যাণকর কাজের অন্তত পঁচাত্তর শতাংশ নারীর অবদান এবং পাপের ক্ষেত্রে পুরুষের অবদান পঁচাত্তর শতাংশ। নারী পুরুষের ভোগপণ্য ও দাসী হওয়ার কারণে পুরুষের ইচ্ছায় নারীকে কাজ করতে হয়।
পুরুষ তার দৃষ্টিভঙ্গি ও আরচণ পরিবর্তন করুক সমাজে সব ধরণের বৈষম্য নিরসন হবে। এর পাশাপাশি যে সমস্ত নারীর মধ্যে পৌরুষত্ব অর্জনের চেষ্টায় মত্ত ¡ তাদের মনুষত্ব অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। নারীবাচক বা পুরুষবাচক শব্দ ব্যবহার কম করতে হবে। যেমন, নারী উপাচার্য, নারী খেলায়াড়, নারী শিক্ষক জাতীয় শব্দের পরিবর্তে কেবল ‘ক’ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ‘খ বাণু’ শব্দ ব্যবহারের মধ্যদিয়ে ‘লিঙ্গের বা জেন্ডারে’ পার্থক্যকে চাপিয়ে সবাইকে মানুষ মনে হতে শুরু করবে। অন্যথায় জটিল পুরুষ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নারী মুক্তি অসমম্ভব।