আমাদের প্রিয় শম্ভুদা, মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন! নিজের কবিতায় তিনি লিখেছিলেন-
‘আমি পৃথিবীর কত বাইরে, কত উপরে আছি!’
29 শে মে,2020 শুক্রবার সকাল আটটায় করোনার ক্রান্তিকালে আমাদের গৃহবন্দি অসহায় দশায়, আমফান ঝড়ের পর আমরা যখন লন্ডভন্ড অবস্থায় আছি ঠিক এই সময়ে নিঃশব্দে তিনি আমাদের ছেড়ে এই পৃথিবীর বাইরে সত্যি সত্যি অনেক উপরে চলে গেলেন! যেখানে আমরা আর তাঁকে কিছুতেই ছুঁতে পারবো না! দেখতে পাবো না প্রবল কষ্টের মধ্যে থাকা মানুষটির মুখে সেই অমায়িক হাসি! যিনি অবর্ণনীয় দারিদ্র্যের কষ্ট বহন করে ও সারা জীবন কেবল কবিতায় যাপন করে গেলেন! কবি শম্ভু রক্ষিত যিনি কবিতা ছাড়া অন্য কোন পবিত্রতায় বিশ্বাস করতেন না!যিনি বিশ্বাস করতেন এই পৃথিবী জুড়ে সারাক্ষণ কেবল একটি মহৎ কবিতা লেখা হচ্ছে! আর পৃথিবীর সমস্ত কবি সেই মহৎ কবিতায় কেবল লাইন সংযোজন করে যাচ্ছেন! এই মহৎ কবিতায় কবিতার লাইন সংযোজনের জন্য কবি শম্ভু রক্ষিত এর ছিল ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’! শুধু কবিতা লেখার জন্য জরুরি অবস্থায় জেলখাটা কবি শম্ভু রক্ষিত সয়েছেন পুলিশের অকথ্য অত্যাচার! তবুও ভালোবেসেছেন কবিতাকেই সারাজীবন! কারণ তিনি বলতেন কবিতা লেখা ছাড়া আর কিছুই তিনি পারেন না! কবিতা লেখা এবং মহাপৃথিবী মত সাহিত্য পত্রিকা বার করাই ছিল তাঁর জীবনের একমাত্র কাজ! তাঁর সম্পাদিত মহাপৃথিবী পত্রিকার 50 বছরে পা দেওয়াকে স্মরণীয় করে রাখতে আমাদের মত কয়েকজন অর্বাচীনদের উদ্যোগে তাঁর সুতাহাটা বিরিঞ্চিবেড়িয়ার বাড়িতে এ বছরই লকডাউন এর কিছুদিন আগেই বসেছিল মহাপৃথিবীর 50 বছর পূর্তি উৎসব! কবি শম্ভু রক্ষিতের ঘনিষ্ঠ কবি,অনুরাগী অনুজ কবি এবং প্রিয়জনদের উপস্থিতিতে এই মহতী সাহিত্য অনুষ্ঠান হয়েছিল, যা এখন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল সন্ধিক্ষণের সাক্ষী ! শম্ভুদার সজীব উপস্থিতিতে আমরা সেই মহাপৃথিবীর সাহিত্য অনুষ্ঠানের অংশীদার হিসেবে ছিলাম এটাই কেবল আমাদের কাছে সান্তনা হয়ে রইল!
বিশিষ্ট সাহিত্যিক জ্যোতির্ময় দত্ত ‘শম্ভু রক্ষিতের গান’ নামক কবিতায় লিখেছিলেন-
‘আমার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুট
পায়ে ছেঁড়া চটি
বার করি নানা কবিতার বই
কম্পোজ করে নিজেই ছাপাই
তখন যা পাই মুড়ি ছোলাভাজা
শিশির জ্যোৎস্না আমার খাদ্য-
আছে এত প্রেম এমন আবেগ
তারাদের মাঝে আমি উড়বই
এখন যদিও পায়ে ছেঁড়া চটি
বার করি নানা কবিতার বই
কম্পোজ করে নিজেই ছাপাই!’
উল্লেখিত কবিতা থেকে আমরা ষাটের দশকের বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবি শম্ভু রক্ষিত এর কবিতা যাপন সম্পর্কে যে ধারণা পেতে পারি তাঁর কবিতায় ভাষা ব্যবহারের মতো অলৌকিক ও রহস্যময়! কারণ তিনি লেখালেখির জগতে কিভাবে এলেন এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানিয়েছিলেন,আমার সব কাজকে আমি সচেতন ভাবে একজন কবির মতন করে তুলতে চেয়েছি শুধু!আর আমার বরাবরই বিঘ্নিত জীবন, একঘেঁয়ে! একবার কবে নিরুদ্দেশ হয়ে ছিলাম জীবনের অতলান্ত দেখতে! আমার সেই থেকেই বলতে পারেন কবিতার দিকে যাওয়া! কবিতা নিয়ে নয়, তাঁর অপরিচ্ছন্ন অস্বাস্থ্যকর ও রহস্যময় জীবন যাপন নিয়ে কবি ও সাহিত্য সমালোচকদের অহেতুক কৌতূহলে ব্যথিত কবি শম্ভু রক্ষিত জানিয়েছিলেন, আমার মধ্যে সেলর জোন্স এর অস্বাস্থ্যবিলাসী প্রবণতা অনেকে খুঁজে পেয়েছেন! যা অনেক শুচিবাগীশ ব্যক্তিকে আহত করেছে! তাতে আমার পরিচিত অপরিচিত হয়ে গেছেন! কবিতা তো জীবনেরই ব্যাখ্যা ও ভাষা! জীবন কবিতার ভেতরে এসে এক অদ্ভুত ক্রীড়া খেলেছে! আমার কবিতা এসেছে আমার জীবনের মধ্য থেকে! কবি শম্ভু রক্ষিত বিশ্বাস করতেন সমাজের প্রতি কবিদের দায় আছে! কারণ কবি হচ্ছেন সমাজের রক্ষক! কবিকে সমাজের দিকে শেষ পর্যন্ত দাঁড়াতেই হয়! এই হচ্ছে কবির চ্যালেঞ্জ!নিজেকে নিঃশেষে উড়িয়ে পুড়িয়ে বিলিয়ে দিয়ে তিনি দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধ করে তুলবেন! সফলতার জগত এড়িয়ে চলবেন! কবির জন্মের পরম লক্ষ্য তাই! এভাবেই থাকতে পারলে তার ভেতর দিয়ে কবিতা শক্তির একটা সাংকেতিক বিচ্ছুরণ ঘটবে এবং সর্বভূতে তা সংক্রামিত হবে! বিশুদ্ধ কবিতা কি আধ্যাত্বিক প্রেরণা থেকে আসে কিনা এই প্রশ্নে অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরে কবিতা লেখার পর কবি শম্ভু রক্ষিতের অনুভব, কবি মাত্রই বস্তুকে দেখে, জগতকে দেখে ও পেতে চায়! খন্ড খন্ড বিশেষকে দেখে বিস্ময় আবেগে চমকে যায়! বস্তুজগতকে হৃদয় আনে! বস্তুর মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে চায়! বৈদিক ঋষি কবিদের মতো মানুষের মধ্যে যে তার রূপে অগ্নি রয়েছে তাকে ফুটিয়ে তুলতে হবে জ্যোতিরূপে! এবং সেই জ্যোতি এক হয়ে যাবে দ্যুলোকের অগ্নি আদিত্যের সঙ্গে! কবির এই পথে যাওয়াই কবিতা হওয়া! কবি শম্ভু রক্ষিতের ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয়! নাম বিহীন সংখ্যা চিহ্নিত দীর্ঘ ও মাঝারি আকারের 106 টি কবিতা কাব্যগ্রন্থটিতে রয়েছে!সাহিত্য সমালোচকদের মতে বাংলা কবিতায় অলৌকিক সংযোজন ‘প্রিয়ধ্বনির জন্য কান্না’র উঠছে যে অবলম্বনহীন নির্বেদাক্রান্ত রোমান্টিসিজমের ধ্রুপদী আঙ্গিকের গতায়ত, যা নিশ্চিত কোন বৃহত্তর প্রতিন্যাসের পূর্বসূরী! আর ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে কবি শম্ভু রক্ষিতের বিশ্লেষণ- উৎস থেকে মোহনা, মোহনার ওপারে মহাসমুদ্র! অনেক পথ বেয়ে নদীর জপমালা শেষ হয় সাগরে এসে! তবু সমষ্টি নয়! সে স্বতন্ত্র, নিত্যনতুন! ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ সেই মহাসাগর! তার উৎসমুখে আদিম মৃত্যু পুনর্জন্মতত্ত্ব! তার নদীপথে দার্শনিক, বৈজ্ঞানিক, সমাজতাত্ত্বিক চেতনার নানামুখী স্রোত! সেই স্রোতে দেশ-বিদেশের বাস্তব জীবনের কত না ছোট বড় ঢেউ! সব নিয়ে মিলিয়ে উপনীত হয়েছে মোহনা মুখে ! তার ও ওপারে ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ মানব মহিমার মহত্তর জয়গান! যৌবন যার বাহন, মানুষ মহিমার সুন্দরতর শিল্পরূপ! কবি শম্ভু রক্ষিতের ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’ কেন মহৎ কাব্যগ্রন্থ তা নিচে উল্লেখিত এই কাব্যগ্রন্থের কবিতার কিছু উল্লেখযোগ্য পংক্তি থেকে আমরা অনুভব করে নিতে পারবো-
১. তুমি ঈশ্বর কন্যা, তুমি আমাকে বিশুদ্ধ কবির জনক হতে সেদিন শেখালে ব্যক্তিগত মৌলিক দৃশ্য থেকে ধূসর বিষয় নিয়ে আমি, ব্যক্ত অব্যক্তের
অবাস্তব মুহূর্তের স্বতন্ত্র আমি, আমার গভীরতর সাম্রাজ্যে
তুমি আছো তুমি নেই

২. তার আবৃত রহস্যগুলি পৃথিবীতে প্রতিধ্বনি তোলে
শুকতারা সন্ধানে যায়, আমি তোমারই মাঝামাঝি,
সুইজারল্যান্ডের মত ছোট ডজনখানেক দেশে ঢুকে যাই নিয়ম ধরে ভেসে
আমার আনন্দের উপর দুঃখের ছায়াপাত করে

৩. তোমার মধ্য দিয়ে আমি সংক্ষিপ্ত রামধনুর ঘুরপাক দেখি
এবং আমার আত্মা জুলাই মাসের পপিফুল যেন
বুদ্ধের মত আমি হাসি, আমি কাগজ ক্যানভাসহীন একটি শূন্যতা!

৪. তুমিই তো নৈশব্দের উৎস নিরবধি, তোমায় দেখে আমি পরিণত হয়েছি
জগতের সৌন্দর্য বহুদিন নির্মীয়মাণ,
তোমাকে রানী, আমি অতি নিপুণতায় রেখেছি!

৫. আজ তোমার কাজ পৃথিবী ছোঁয়া
আর লোহিততাভ আমি- আপন সৃজনশীল কর্ম নিয়ে একা
নিষ্কলঙ্ক আমার মূর্তি জলের মতো সহজ মনে হয়
অগণ্য বিস্মৃতির স্তর সরিয়ে আমি এসে দাঁড়িয়েছি
সৌর রাজ্যের সীমানা পার হয়ে আমি
মাটির কাছাকাছি কোনো দেশে উল্কার মতন, কি যেন আমার নাম

৬.ভূকেন্দ্রিক কক্ষপথ ঘুরে
তোমার সশস্ত্র বার্তা ও আমার অধঃপাতের যাবতীয় সংবাদ
প্রকৃতির রাজ্যের স্বরূপ জানো জানো তুমি জলযাত্রার পথে
তোমার তেজস্ক্রিয় মৌলিক পদার্থ কখন আবিষ্কৃত হয়
আমিও নায়কতা করতে গিয়ে আত্মবলিদান দিতে পারি
গণিতজ্ঞ শব্দের চেয়ে আমি অনেক বেশি তরঙ্গের সমীকরণ
কবিতা রসের ভোজে তোমাকে আমার আমন্ত্রণ
কবিতা আজ পর্যন্ত গবেষণালব্ধ
তুমি কবিতা দুর্যোগের মার খেয়ে ও নিশ্চিত নির্ভয় হতে পারো

৮. মৌলিক বিদ্বেষ আপন নিয়মে পদার্থের অভিজ্ঞতা সংশোধন করে ফিরে আসে অহরহ স্পন্দন অনুসৃত হয়, আকাশ থেকে বৃষ্টির মতো অঙ্গারক বাষ্প হয়ে
মস্তিষ্কের সাগরের জলরাশি, কলম্বাসের জাহাজ নিনার মতো
শুষ্ক কল্যাণের যতদূর সম্ভব সদ্ব্যবহার করতে পারে
জীবন থেকে তোমার জলকণা আবার বাষ্পাকারে আকাশে চলে যেতে পারে

৯. তুমি উজ্জ্বল পুনরুক্তিময়,মনে মনে আমি দেখি তোমার বিলুপ্ত আবাস
তোমার নিঃসঙ্গতা আমাকে উপহার দেয় দীর্ঘ আনন্দময় সমাধি
মনে হয় আমি তোমাকে পান করি, তোমাকে নিয়ে উত্তাল স্বপ্ন দেখি

১৩. আমার দুরন্ত বিমুগ্ধ উপলব্ধি ও প্রকৃতি তোমার কোনো ঘটনা
বা তোমার ভবিষ্যৎ প্রকাশে সক্ষম নয়! বুদ্ধির উপলব্ধিসহ পরিত্যক্ত
কৌতুহল শুধু তোমাকে পুরোপুরি ধরে রাখে
নানাভাবে আবিষ্ট করে, হয়তো আরও তীব্রভাবে অমোঘ শিল্প উপলব্ধি

১৪. আমার জীবন বিশুদ্ধ ভালোবাসার ও বিশ্রুত সজ্জিত ভালোবাসা
নতুন অবদানে সমৃদ্ধ করা-
বিপুলতর এক জগৎ যা পৃথিবীর গোলকের মতো বিরাট
শাত ও আধাঁর অর্থাৎ তোমার মূল্য পরিশোধ করতে না পারা

২২. আজ ভাষা নেই, তাই অভিমান, তাই উদ্ভিদবিদ্যা নিয়ে গবেষণা
স্পন্দিত রিক্ত সুহৃদ সম্পূর্ণ করেছি পরিবেশের গুনে
হে গুঞ্জনধ্বনি, প্রেয়সী, প্রেমের দেবী, সপ্রাণ মাতা
অবশেষে নিঃশ্বাস বিনষ্ট হয়ে গেল লাবণ্য প্রতিমা
আদর্শকীর্তি, এই তুমি সন্ধ্যা দীপ্ত যুদ্ধ ও জয় সব সেই তাঁরই দান

৩০. তোমার তরঙ্গায়িত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের পদচারণা, তোমার বিবর্তিত কমা
এক গম্বুজীয় রীতি – কোদলা কাঠের মতো তাই আবহাওয়া আসে
আমার দর্শনীয় গঠনের প্রকাশ, মহীয়সী, তোমার কারুশিল্পী নিয়োদের দেশে তোমার সৌন্দর্যের মায়ামন্ত্রে আমার অভিযান রূপায়নের ইতিহাস

৩৯. হৃদয় কি অদ্ভুত, কৃষির প্রথম ও প্রধান সহায়ক বৃষ
জল থেকে উঠে আকাশে যুগে যুগে সঞ্চিত স্বয়ং
কিন্তু স্নেহময় জেনেছিল ও প্রৌঢ় পূজারিণী এ চিত্র অদৃশ্য নয়
এই মৌন ভালোবাসা এই সূর্যের দান ঐ আলোক আগুন
কিছু নেই ঐ অনন্ত থাক, সরলতা থাক, সমস্ত ইন্দ্রিয় সংহত
ভ্রুক্ষেপ নেই, উদ্দেশ্যের জয়, অনুভূতি যাই করুক

৪১. বস্তুত স্বর্গের হাওয়ার উৎপ্রেরণা কল্পনার উৎস হয়েছে কবিদের কাছে অবশেষে তারপরে হীরক পাখনা মেলে
বৃষ্টির মেঘের ভিড় উড়ে গেছে সৌর রৌদ্রে
এবং অনৈসর্গিক অন্ধকারে মহাজাগতিক এক মানমন্দির পিতৃপুরুষের মত
কল্পনা রাজ্য পার হয়ে শিরীষের মাথায় শেষহীনতার দিকে ডুবে গেছে

৪৯. বাষ্প মেঘ ও বস্তুকণা রাশি হয়ে তোমায় উত্তাপ দিয়ে যাই
তোমার সঙ্গে আমার হৃদ্যতায় দিগ্বিজয়ী গভীরতা
গ্রহ বিশেষের মত জড়মান আমি
আমার উত্তাপের মাত্রাসাম্য রক্ষা প্রেমস্তোত্র শুভ্র শোনায়
তুমি পরস্পর জড়ানো বা পাক খাওয়া উদ্ভিদ ও শরীরীসত্ত্বা

৭৯. তার কাছে স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে কোন তফাৎ ছিল না! তবে বাস্তবের
চেয়ে স্বপ্ন তার কাছে অধিক সত্য ছিল! -সে চিত হয়ে শুয়ে দৃশ্যকে টুকরো
টুকরো করে ভেঙে তার দেহহীন আত্মাকে শুষে নিত

১০৪. আমি আলোকবিন্দু সম্মুখে রেখে পরিশ্রান্ত হয়ে শ্রান্ত হতে চাই, আমি প্রায় নগ্ন কৃষ্ণকায় মানুষ, আমি গৈরিক জানালার নিচে মাংসাশী ফুলের মত
তোমাকে গ্রাস করতে আশ্চর্য উৎসুক

বাংলা ভাষায় এরকম অদ্ভুত কবিতা আর কেউ কখন ও লেখেননি! বিশুদ্ধবাদী সাহিত্য সমালোচকরা এরকম অকাব্যিক ভাষায় গদ্যাকারে রচিত দীর্ঘ পংক্তিগুলিকে কবিতা বলা যাবে কিনা তা নিয়ে একসময় বিতর্কও তুলেছিলেন! যদিও এখন অনেক কবি শম্ভু রক্ষিতের দেখানো পথে দীর্ঘ পংক্তি দিয়ে কবিতা লিখছেন! কারণ এখনও পর্যন্ত কবিতার কোনো সুস্পষ্ট সংজ্ঞা পাওয়া যায়নি! শম্ভু রক্ষিতের মত উন্মাদ কবিই এরকম পংক্তি রচনা করার সাহস দেখাতে পারেন! এমন উন্মাদ কবিকে প্রকাশ্যে অনেক এড়িয়ে চললেও মনে মনে আমরা সবাই শ্রদ্ধা করি! কারণ আমরা বুঝতে পারি ইনি দিব্যউন্মাদ কবি! কবি শম্ভু রক্ষিত এমন অদ্ভুত অলৌকিক ভাষায় কবিতা রচনার দুঃসাহস অর্জন করেছেন নিজের জীবন থেকে! কবিতা রচনা আর আগেই তিনি নিজের জীবনকে করে তুলেছেন অদ্ভুত রহস্যময় ও তুলনারহিত! 23-24 বছর বয়সেই তিনি বিখ্যাত কবিদের কাছে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিলেন! ‘মহাপৃথিবী’ নামের একটি উৎকৃষ্ট সাহিত্য গুণমানে সমৃদ্ধ কবিতা পত্রিকা পাঁচ দশক ধরে প্রকাশ করেছেন! কবি শম্ভু রক্ষিত নিজের একটি কবিতার মধ্যে লিখেছিলেন- আমি পৃথিবীর কত বাইরে, কত উপরে আছি! নিজেদের কবিতা লেখার সামান্য অভিজ্ঞতায় এটুকু বোধ হয় বুঝেছি যে পৃথিবীর কত বাইরে, কত উপরে থাকলে একজন মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিত হওয়া যায় এবং এরকম মহাজাগতিক ভাষায় কবিতা লেখা যায়!

কবিতার হোলটাইমার কবি শম্ভু রক্ষিত যে সব রাজনৈতিক কবিতা লিখে শাসকের বিষ নজরে পড়েছিলেন একদা সর্বাধিক জনপ্রিয় ও বিতর্কিত ‘রাজনীতি’ নামক কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার নির্বাচিত অংশ হলো-

কবিকে এখন নিজের শহর ছেড়ে দিয়ে অন্য শহরে ঘুরে বেড়াতে হয়
কবিতা এখন একটা স্লোগান, একটা নিশান
এবং কয়েদখানা
কবি আজ কয়েদি, শিল্পঘাতিনী
কবিতা এখন দেওয়াল! যুদ্ধেরই চিহ্ন
এবং সবচেয়ে সহজ ও সবচেয়ে বিপদজনক লাফ
নতুন নতুন অর্ডিন্যান্স এখন কবিরই উদ্দেশ্যে-
শম্ভু রক্ষিতের ‘রাজনীতি’ নামক কাব্যগ্রন্থকে রাজনৈতিক কাব্যগ্রন্থে বলতে কিছুমাত্র দ্বিধা হওয়ার কথা নয়! সে দিক থেকে দেখতে গেলে ‘রাজনীতি’ কাব্যগ্রন্থ ইতিহাসেরই একটি অংশ! যে ইতিহাস ছিল আমাদের দেশের 1975 সালের জরুরি অবস্থা! দেশের জরুরি অবস্থায় নিদারুণ নির্যাতনের ভুক্তভোগী ছিলেন রাজনীতি কাব্যগ্রন্থের কবি! আপাত ছোটখাটো চেহারার এই মানুষটাই সেদিন অনেক বড় সাহস আর সচেতনতার পরিচয় দিয়েছিলেন! 1975 সালের 26 জুন জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন দেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী! সেই সূত্রে যেকোনো রকম রচনা,পত্র-পত্রিকা প্রকাশ্যে চালু হয়েছিল সেন্সরশিপ আইন! বহু লেখকই এব্যাপারে সংকট ও ভয়ের মধ্যে পড়েছিলেন! লেখকদের সেন্সরশিপ আইনের প্রতিবাদে গোপনে সাহিত্যিক জ্যোতির্ময় দত্ত নিজস্ব সম্পাদনায় ‘কলকাতা পত্রিকা’ প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন! যাতে প্রকাশিত হত খবরের কাগজে সেন্সার হাওয়া খবর এবং জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে লেখা বিশিষ্ট লেখকদের প্রবন্ধ! প্রকাশক, মুদ্রক ও সংযুক্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়েছিলেন কবি শম্ভু রক্ষিত! কলকাতা পত্রিকায় গৌরকিশোর ঘোষ, নিরঞ্জন হালদারদের লেখা প্রকাশ হতেই দারুন প্রতিক্রিয়া শুরু হয়! পুলিশ কলকাতা পত্রিকাকে বাজেয়াপ্ত করে! কলকাতা পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশককে গ্রেপ্তার করতে পুলিশ তল্লাশি শুরু করে! কয়েকবার পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বাঁচলেও শেষ পর্যন্ত পুলিশ ১৯৭৬ সালে ১৯ সেপ্টেম্বর শম্ভু রক্ষিতকে পাকড়াও করতে সমর্থ হয়! থানার লকআপে নিয়ে গিয়ে পুলিশ উলঙ্গ করে দড়ি বেঁধে উল্টো দিকে ঝুলিয়ে দিয়ে নির্মমভাবে শারীরিক নির্যাতন করে! পুলিশ ২১ দিন তাদের পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসে কবি শম্ভু রক্ষিতকে রেখে দেয় এবং তারপরও ১৪ দিন লালবাজার সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়! শেষে কবি শম্ভু রক্ষিতকে প্রেসিডেন্সি জেলে পত্রিকা প্রকাশের দায়ে ৭ মাস জেল খাটতে হয়! জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর জেলের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন চারটে নতুন কবিতা নিয়ে ‘রাজনীতি’কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল! জেলখানার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে কবি কবি শম্ভু রক্ষিতকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানিয়েছিলেন, কবিদের জন্য জেলখানা খুবই ভালো জায়গা! আপনার টাকা পয়সা থাকলে ইচ্ছে করলে পৃথিবী ভ্রমণ করতে পারবেন! কিন্তু আপনি ইচ্ছে করলে জেলখানায় যেতে পারবেন না! আমার তো মনে হয় সমস্ত কবিদের একবার করে জেলখানা ঘুরে আসা উচিত! পরবর্তীতে কবি শম্ভু রক্ষিত আপশোষের সঙ্গে জানিয়েছিলেন দেশে জরুরি অবস্থা নেই, তা সত্ত্বেও আমাদের দেশে এখনও লেখকদের সেই অর্থে লেখার স্বাধীনতা নেই! কবি শম্ভু রক্ষিতের জন্ম 1948 সালের 16 আগস্ট হাওড়া জেলার কদমতলায় মামার বাড়িতে! হাওড়ার নরসিংহ দত্ত কলেজ থেকে স্নাতক হয়ে কিছুদিন জগাছা স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন! মাস তিনেক একটি প্রেসে প্রুফ রিডারের কাজ করেছেন! এরপর থেকে তিনি স্থায়ী কিছু কাজ করেননি! কিন্তু জীবনধারণের জন্য সারা জীবন ধরে তিনি বিচিত্র সব কাজকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছেন! বসুমতি, যুগান্তরের মত দৈনিক সংবাদপত্রগুলিতে কলাম লিখেছেন!একসময় হাংরি আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন এবং ‘ব্লুজ’ নামে কলকাতা থেকে একটি পত্রিকা ও বার করতেন! ১৯৭০ সাল থেকে সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে ‘মহাপৃথিবী’নামে বাংলা ভাষার একটি উৎকৃষ্ট মানের কবিতা পত্রিকা গাঁটের পয়সা খরচ করে প্রকাশ করেছেন! হাওড়ার ঠাকুরদাসদত্ত লেনে মামার বাড়িতে শম্ভু রক্ষিতের শৈশব-কৈশোর-যৌবন কাটলেও কবির নিজস্ব বাড়ি হলদিয়া পুরসভার অন্তর্গত বিরিঞ্চিবেড়িয়া গ্রামে! টালির ছাউনি দেওয়া একচালা এই মাটির বাড়ির নাম কবি শম্ভু রক্ষিত রেখেছিলেন ‘মহাপৃথিবী’! বাড়িতে ঢোকার মুখে সামনের দরজার পাশে মাটির দেওয়ালে বসিয়ে রেখেছিলেন মার্বেল পাথরে মহাপৃথিবী নামটি খোদাই করে! যা দেখে বিস্ময়ে অবাক হয়ে যেতে হয়! কারণ গ্রামে কোন পাকার বাড়ির নামকরণ চোখে পড়লেও মাটির বাড়ির নামকরণ করার স্পর্ধা তাও আবার নিজের প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের কাব্যগ্রন্থের নামে তা কেবল কবি শম্ভু রক্ষিতই দেখাতে পারেন! কবি শম্ভু রক্ষিত জানিয়েছিলেন-‘কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা আমার প্রথম বেশ ভালো লেগেছিল! তারপর কবি জীবনানন্দ দাশের কবিতা- এই পৃথিবীতে এক স্থান আছে, সবচেয়ে সুন্দর করুন! জীবনানন্দ আমাকে দিয়েছে- কে আর হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে! আমি কৃতজ্ঞ তাঁর কাছে! উনি আমার ভেতরের জিনিস!’স্থায়ী জীবিকা, বাংলা কবিতায় স্থায়ী সরকারি স্বীকৃতির সচেতন অবহেলা ছাড়া কবি শম্ভু রক্ষিতের নিজস্ব ঘরবাড়ি,স্ত্রী অঞ্জলি, ছেলে কীর্তিকর ,দুই মেয়ে দিওতিমা ও পৃথা, গুণমুগ্ধ কবি ও পাঠক এবং মহাপৃথিবী পত্রিকা সবই ! কলেজ স্ট্রিটের কফি হাউসে যে কোন দিন গেলে দেখা পাওয়া যেত অপরিচ্ছন্ন জামা প্যান্ট পরিহিত টেবিলের এক কোণে বসে থাকা কবি শম্ভু রক্ষিত কে! হয়তো তাঁর জামাতে লেগে থাকত গতরাতে স্টেশনের ধুলো! যেকোনো কারণেই হোক লাস্ট ট্রেন ফেল করে স্টেশনে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বাড়ি ফিরতে পারেননি বলে! সকালে ঘুম থেকে উঠে কাঁধের ঝোলা থেকে কবিতার প্রুফ গুলো চুরি যায়নি বলে আশ্বস্ত বোধ করে সব ঠিক আছে বলে আবারও ধুলো ছেড়ে উঠে পড়ে হাঁটতে শুরু করতেন বাংলা কবিতার অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে! ১৭ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন কবি শম্ভু রক্ষিত! ১৯৭১ সালে কবি শম্ভু রক্ষিত এর প্রথম কাব্যগ্রন্থ- ‘সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’ প্রকাশিত হয়! তারপর ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উল্লেখযোগ্য মহৎ কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’, যা ব্যাপকভাবে পাঠকের সমাদর লাভ করে! ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তার বিতর্কিত কাব্যগ্রন্থ ‘রাজনীতি’! পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় ‘পাঠক অক্ষরগুলি’(১৯৮২), ‘সঙ্গহীন যাত্রা’(১৯৯১), ‘আমার বংশধররা’(১৯৯৭), ‘আমি কেরর না অসুর’(২০০৪) এবং ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘ঝাড় বেলুনের জোট! কবি শম্ভু রক্ষিতের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৫ সালে এবং পরবর্তীতে ২০০৫ সালে পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়!অন্য কবিদের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ গুলি হল-সাম্প্রতিক তিনজন (১৯৭৩), উত্তর-দক্ষিণ (১৯৭৪), সুব্রত রুদ্র/শম্ভু রক্ষিত (১৯৭৫), সমসূত্র (১৯৭৯), স্বরাহত নিষাদ (১৯৯০)! এছাড়া কবি শম্ভু রক্ষিত ‘বিদ্রোহ জন্ম নেয়’ নামে একটি সম্পাদিত কবিতার বই, ‘শুকনো রোদ কিংবা তপ্ত দিন অথবা নীল আকাশ প্রভৃতি’(1974) নামে একটি গল্প সংকলন এবং ‘অস্ত্র নিরস্ত্র’(১৯৭৭) নামে একটি উপন্যাসের বইও রয়েছে!
খুব সহজে শম্ভু রক্ষিতকে মনে হবে অন্যতম শ্রেষ্ঠ দুর্বোধ্য বাঙালি কবি, নৈরাজ্যবাদী, লক্ষ্যহীন, প্রতিক্রিয়াশীল, অসংযমী, দুর্বিনীত! তবুও যেন লোডশেডিং হয়ে যাওয়া কয়লা খনির অতলে কালো কালো কয়লার অঞ্চলে তিনি যেন হাতড়ে বেড়াচ্ছেন হীরকখণ্ড! সেই হীরকখণ্ড মানবতা! এই মানবতা চৈতন্য বিশুদ্ধতা বা নির্গুণ যে নয় তা কবি শম্ভু রক্ষিত জানতেন! কিন্তু তিনি সাক্ষাৎ করতে চান, করাতে চান তেমন চৈতন্য,তাঁর যাবতীয় কবিতায়! ফলে কষ্ট করেও তাঁর কবিতায় উঁকি মারে সৎবাস্তবতাবাদ,রহস্যময়তা- যার সঙ্গে তাঁর আঙ্গিকের প্রবল বিরোধ! মর্মশালী চিত্রকল্প পাওয়া যায়না তাঁর কবিতায়! পাওয়া যায় নির্মম বক্তৃতামালা যাতে আবার অভাব আছে স্থির লক্ষ্যের, যুক্তি পরম্পরার! তাঁর অনিষ্ট মানবিক সম্পর্কের সৌন্দর্য ও স্বাভাবিকতা এই কুৎসিত, কৃত্রিম, ভয়াবহ পৃথিবীতে! এই অন্বেষায়’ তিনি বিদ্রোহী! কিন্তু লক্ষে নেই কোন আলোকবিন্দু- যা রাখা তাঁর মতে কবিকৃত্য নয়! বর্তমান কালের সামগ্রিক ব্যবস্থার প্রতি তাঁর ব্যাপক অস্বীকৃতিতে তিনি সৎ!

আমি রক্তমাখা হাসি ও সূক্ষতা নিয়ে অস্পষ্ট চিৎকার করে
এবার একাকী পথে ফিরে যাব
এবং আমি ঘৃণ্য ভালোবাসা প্রেম সুন্দরের জন্য
যুদ্ধ অভাব প্রভৃতির জন্য দীর্ঘ- সবুজ হব
আহত উদ্ধত প্রিয়- পরীদের অগণিত মুখ, মুখের মিছিল নিয়ে ফিরে যাব আমি!
(ফিরে যাব আমি )

আমি কোন বীভৎস মুহূর্তে অক্ষর গুলির বোঝাও নামিয়ে নিয়েছি
তাদের মধ্যে কোথাও সৃজনীশক্তি লুকিয়ে আছে কিনা দেখার জন্যে
অতি সুস্বাদু মাছ দিয়ে তাদের করেছি ও বাতাস
বস্তুতঃ তাদের রূপসী হৃদয় রম্বাস, বৃত্ত, সামন্তরিক গড়ন নিয়েছে
(পাঠক অক্ষরগুলি)

আমার বংশধরদের মধ্যে ফসফরাসের কোন অলৌকিক বোরা নেই
তারা বেহুঁশ বর্ণের জন্য শুধু দিকচক্রবাল ছুঁয়েছে
আমি বেশক উপায় না দেখে
কি তাদের সাবাড় করেছি
(আমার বংশধররা)

আমার স্ত্রীর গোমরা মুখে বিরক্তি শূন্যতা
দেখতে দেখতে আমার চোখ লংক্লথ হয়ে যাচ্ছে
সত্যিই, আমি তার স্বামী হওয়ার অনুপযুক্ত
(আমার স্ত্রী)

বঙ্গদেশ টুপি প্রদর্শক দেশ! এই দেশে সর্বাধিক বিক্রিত বস্তুর টুপি! বঙ্গদেশে এরপরই বিক্রি মেসচর্মের ওপর লেখা টুপি বিষয়ে তথ্যপুস্তক!
সেই দেশের অধমাধম আবহমান কাল ধরেই টুপি পরে আসছে! তাদের টুপি
পরার ইতিহাস দশ হাজার বছরের! তারা টুপিকে দেবতার দূত, অপদেবতা ও মানুষের মাঝে হিসেবে ধরে! এদের টুপিদেবতার নিম্নাংশে গাধা,
উপরার্ধে ষাঁড়, সশ্মশ্রু, কৌতুকপ্রিয় তার মুখশ্রী, মাথায় মস্তকাবরণে
মহিষের শিং
(বঙ্গদেশের টুপি)

কবি শম্ভু রক্ষিত তাঁর কবিতায় দীর্ঘ লাইন লেখেন! শব্দ ব্যবহারে দুরূহতার আশ্রয় নেন যা পাঠকের কাছে তাঁর কবিতাকে অনুভব করার অন্তরায় সৃষ্টি করে! এই অভিযোগের উত্তরে কবি শম্ভু রক্ষিত রক্ষিতের স্পষ্ট অভিমত- আমার কবিতার পংক্তিগুলি টান করা স্থিতিস্থাপক সুতার মতনই আচরণ করে! পাশাপাশি পংক্তিগুলি পরস্পরকে ছেদ করে না! আমার কবিতায় বোধ সচেতনতার চেয়ে, শব্দ সচেতনতাই বেশি! যেহেতু শব্দই ব্রম্ভ, তাই আমি এই শব্দকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি! আমার রচনা গভীর নিরাশাবাদ আচ্ছন্ন করে রেখেছে বলা যায়! আর যেসব পাঠক আমার কবিতা পড়তে অসম্মত, যারা সাধারন উৎকর্ষের ধার ধারে না, তাঁরাও আমার কবিতার দিব্য সব মহিমা দেখে দেখে উদাসীন! তাঁদের বিচারের প্রহসনে বন্দি আমি! বাংলা ভাষার বিশিষ্ট কবিতা সমালোচকরা তাঁর কবিতার সঠিক মূল্যায়ন না করায় তিনি যে মনে মনে হতাশ ও ক্ষুব্ধ ছিলেন সে কথা কবি শম্ভু রক্ষিত গোপন রাখেননি! তাঁর সমসাময়িক এক কবি ষাটের দশকের বাংলা ভাষার কবিদের কবিতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ষাটের দশকের বাংলা ভাষার এই মহৎ কবিকে শ্লেষের মহাকবি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন! তাঁর সম্পর্কে এই মন্তব্য বিষয়ে কবি শম্ভু রক্ষিত জানিয়েছিলেন, আমি নিজেকে শ্লেষের মহাকবি কখনও ভাবিনি! তবে আমি সর্বনাশপন্থী কবিদের একজন! আমি কবিতায় আনুষ্ঠানিক নতুনত্বে বিশ্বাসী! আমার রচনায় তথাকথিত আস্ফালনের মুখোশ! সেই সঙ্গে অভিমান হত কন্ঠে কবি শম্ভু রক্ষিত জানিয়েছিলেন, কোনদিন উল্লেখযোগ্য কোন কবিতা না লিখেও যে কবি ক্রুর পরিহাসের শিকার হন,তাঁর সমালোচনা কিংবা প্রশংসায় কান দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই!
১৯৯৯ সালে কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মশতবার্ষিকীতে ‘ধানের রসের গল্প পৃথিবীর’ নাম দিয়ে আমরা কয়েকজন মিলে কবি জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে হলদিয়ার চকদ্বীপা স্কুলে একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলাম! সেই সাহিত্যসভায় আমাদের প্রিয় কবি মহাপৃথিবী পত্রিকার সম্পাদক কবি শম্ভু রক্ষিতকে সম্বর্ধনা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল! এর আগে কবি শম্ভু রক্ষিত এর কবিতা যাপন ও রহস্যময় জীবন যাপন নিয়ে শুনেছিলাম! হাওড়ার কদমতলায় থাকেন, গঙ্গা নদীতে স্নান করে রাস্তার প্রাইস হোটেলে খান! তাঁর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগে সবসময় থাকে বাংলাভাষার নামকরা কবিদের কবিতার সব পান্ডুলিপি! তাঁর সম্পাদিত মহাপৃথিবী নামক উৎকৃষ্ট মানের কবিতা পত্রিকায় নামকরা কবিরা কেবল লেখার সুযোগ পান! সপ্তাহান্তে বিনা টিকিটের যাত্রীদের হিসেবে রাতের শেষ ট্রেনে হলদিয়ার বিরিঞ্চিবেড়িয়ার বাড়িতে আসেন! এই সাহিত্যের অনুষ্ঠানে প্রথম আমার শম্ভুদার সঙ্গে পরিচয় হয়! সেদিন শম্ভুদা অনুষ্ঠান শুরুর কিছুটা আগেই ছোট মেয়ে পৃথাকে নিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সম্বর্ধনা নিতে! তারপর শম্ভুদার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে সংবাদ সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকায় লেখালেখির সূত্রে! মাস কয়েক পরে সংবাদ সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকার সম্পাদক কবি তমালিকা পন্ডার উদ্যোগে হলদিয়া রানিচক গভমেন্ট স্পন্সর স্কুলে এক সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয়েছিল শতবর্ষে জীবনানন্দ স্মরণ অনুষ্ঠান! সেই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়! তমালিকাদি কবি শ্যামলকান্তি দাশকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন কলকাতা থেকে গাড়িতে করে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে হলদিয়া নিয়ে আসার! অনুষ্ঠান মঞ্চে কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবি শম্ভু রক্ষিতকে দেখে অবাক বিস্ময়ে তমালিকাদির কাছে জানতে চেয়েছিলেন একে কোথা থেকে পেলে! তখন তমালিকাদি জানিয়েছিলেন শম্ভুদা প্রতি সপ্তাহেই আপনজনে আসেন! আপনজনের আরিফ,রাইহানদের সঙ্গে শম্ভুদার খুব ভাব! আপনজনের ছেলেরা শম্ভুদাকে খুব শ্রদ্ধা করে ও ভালোবাসে !ওদের টানেই শম্ভুদা আসেন !কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তখন বলেছিলেন, খুব গুণী মানুষ! শম্ভুকে কাছে যখন পেয়েছো ওকে ছেড়ো না! ওকে কাজে লাগাও! পরবর্তীতে সম্পাদকের সম্মতিতে আমরা চেয়েছিলাম সংবাদ সাপ্তাহিক আপনজন পত্রিকাতে শম্ভুদা স্থায়ীভাবে কাজ করুন এবং মাসিক একটি আর্থিক বরাদ্দের কথাও ভাবা হয়েছিল! কিন্তু স্বাধীনচেতা কবি শম্ভু রক্ষিত শুধু কবিতার জন্য নিবেদিত হওয়াই কোথাও কোন বন্ধনে জড়াতে রাজি ছিলেন না! স্বভাবতই আমাদের প্রস্তাবে তিনি রাজি হলেন না এবং তারপর থেকেই তিনি বেপাত্তা হয়ে গেলেন!সেদিন আপনজনের শতবর্ষে জীবনানন্দ স্মরণ অনুষ্ঠান মঞ্চে কোন চেয়ার-টেবিল ছিল না! মঞ্চে গদির উপর সাদা ধবধবে বেডকভার বিছানো ছিল! সমস্ত অতিথি নিচেই বসে ছিলেন আরাম করে! শম্ভুদা ও তাঁর স্বভাব মত মেয়ে দিওতিমাকে সঙ্গে নিয়ে মঞ্চের পিছনের দিকে অনুষ্ঠান চলাকালীন সারাক্ষণই চুপটি চুক্তি করে বসেছিলেন!না তিনি কোন কথা বলেননি, কোন কবিতা ও পড়েননি! সারাক্ষণ শ্রোতার ভূমিকায় ছিলেন! বেশ কয়েক বছর পরে ২০১৬ সালে হলদিয়া দুর্গাচকের এক সাহিত্য সভায় শম্ভুদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল! যেকোনো সাহিত্য সভায় শম্ভুদাকে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে মঞ্চে বসানো হলেও সাধারণত তিনি মৌন থাকেন কিছু বলেন না! খুব জোরাজুরি করলে একটি কবিতা পাঠ করেন! এদিনের অনুষ্ঠানেও তার ব্যতিক্রম ছিল না! একসময় তিনি মঞ্চ থেকে নেমে আমাদের পাশে এসে বসলেন! এর আগে আপনজনে শম্ভুদার সঙ্গে দেখা হলেই আমরা কয়েকজন বন্ধুরা শম্ভুদার কাছ থেকে আমাদের প্রিয় পত্রিকা মহাপৃথিবী’র নতুন সংখ্যা চাইতাম! শম্ভুদা ঝোলা থেকে মহাপৃথিবী পত্রিকা বার করে আমাদের হাতে দিতেন! কিন্তু কোনদিন পত্রিকার দাম চাইতেন না! কিন্তু আমরা সব সময় টাকা দিয়ে কিনতাম! সেদিনের অনুষ্ঠানেও শম্ভুদার সঙ্গে দেখা হতেই অভ্যাসমতো মহাপৃথিবী পত্রিকা চাইলাম! শম্ভুদা জানালেন শরীরটা বেশ অসুস্থ তাই অনেকদিন মহাপৃথিবীর নতুন সংখ্যা বার করতে পারছেন না! শুনে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল! শম্ভুদার শরীরটা সত্যিই অনেক টা ভেঙে গেছে! আগের মতো আর চনমনে ভাব কিনেই হাঁটাচলা দেখলেই বোঝা যায় তিনি খুব অসুস্থ ও দুর্বল!জানালেন ইচ্ছে করলেও শারীরিক কারণে এখন আর কলকাতায় যেতে পারেন না! বেশিরভাগ সময় হলদিয়ার বিরিঞ্চিবেড়িয়ার বাড়িতে কাটান! শম্ভুদা যখন আপনজনে আসতেন পারিবারিক বিষয় নিয়ে এর আগে আমরা জিজ্ঞাসা করলে দেখেছি তিনি খুব অখুশি হতেন! নিজের পারিবারিক বিষয় নিয়ে কোন কিছু বলতে শম্ভুদা কোনদিনই ভালোবাসতেন না! শম্ভুদা বলতেন কবিদের উচিত কেবল কবিদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা! অন্য পেশার লোকজন কেবল মানুষের আর্থিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক অবস্থান বিচার করেন! এরপর শম্ভু দার সঙ্গে দেখা হয়েছিল বছর দুই পরে হলদিয়ার দুর্গাচকে 2018 সালে একটি সাহিত্য ও সম্বর্ধনা সভায়! এই সাহিত্য ও সম্বর্ধনা সভার অতিথি হিসেবে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল শম্ভুদার পাশে দাঁড়িয়ে ‘প্রিয় ধোনির জন্য কান্না’ কাব্যগ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার! শম্ভুদা খুবই অসুস্থ থাকায় উদ্যোক্তারা গাড়িতে করে নিয়ে এসেছিলেন! সঙ্গে ছিলেন কবিপত্নী অঞ্জলি রক্ষিত! এদিন শম্ভুদা কথা বলার মত অবস্থায় ছিলেন না! শম্ভুদার প্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় ধোনির জন্য কান্না’র তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হওয়াই কেমন লাগছে, সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের উত্তরে কেবল বলেছিলেন খুব ভালো লাগছে!তারপর দীর্ঘ দুই দশক পরে শম্ভুদার নিজের বাড়ি সুতাহাটার বিরিঞ্চিবেড়িয়াতে তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য পত্রিকা ‘মহাপৃথিবী’র ৫০তম বর্ষপূর্তি উদযাপন অনুষ্ঠানেও শম্ভুদাকে পেলাম একই ভূমিকায়! তাঁর ঘনিষ্ঠ কবিরা তাঁর মহাপৃথিবীর কবিতা যাপন নিয়ে বললেন এবং তাঁর গুণমুগ্ধ অনুজ কবিরা তাঁর কবিতা পড়লেন এবং তাঁকে নিবেদিত কবিতা পাঠ করলেন!এসব তিনি মঞ্চে বসে দেখলেন! মাঝে মাঝে আনন্দ অশ্রুতে তাঁর চোখ চিকচিক করে উঠলো! কিন্তু এদিনও তিনি সারাক্ষণ শ্রোতার ভূমিকায় থাকলেন! কোন কথা বললেন না! কবি শম্ভু রক্ষিতের বেশিরভাগ গ্রন্থ নিজের মহাপৃথিবী প্রকাশনা সংস্থা থেকে প্রকাশিত হয়েছে! শম্ভুদা নিজেই প্রুফ দেখা কম্পোজ করা ডিজাইন করা ও ছাপার কাজ করতেন! শম্ভুদার মহাপৃথিবী প্রকাশনা সংস্থা থেকে বিভিন্ন কবি সাহিত্যিকদের প্রায় 100 টির মত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে! তার নিজের প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এক কবির কাব্যগ্রন্থ সরকারি পুরস্কার এর স্বীকৃতি পেয়েছে, অথচ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে শুধুমাত্র কবিতার জন্য সারাটি জীবন উৎসর্গ করে দিলেও কোন এক অজানা কারণে কবিতা বোদ্ধাদের সচেতন ঔদাসীন্য ওঅবহেলায় মহাপৃথিবীর কবি শম্ভু রক্ষিতের সরকারি পুরস্কারের স্বীকৃতি পেলেন না! এ নিয়ে মহাপৃথিবীর কবির কিছু যায় না আসলেও ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’র কবির এই অপ্রাপ্তি ও অস্বীকৃতি আমাদের হৃদয়কে বেদনার্ত করে তোলে !