“তাকদির বনাম স্বাধীন ইচ্ছা’, স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত?

সাজিদের ব্যাগে ইয়া মােটা একটি ডায়েরি থাকে সব সময়। ডায়েরিটা প্রাগৈতিহাসিক আমলের কোনাে নিদর্শনের এত। জায়গায় জায়গায় হেঁড়া। ছেড়া জায়গার কোনােটাতে সুতাে দিয়ে সেলাই করা, কোনাে জায়গায় আঁঠা দিয়ে প্রলেপ লাগানাে, কোনাে জায়গায় ট্যাপ লাগানাে। এই ডায়েরিতে সে তার জীবনের নানা উল্লেখযােগ্য ঘটনাগুলাে লিখে রাখে। বলে রাখি, সাজিদের ব্যক্তিগত ডায়েরিতে আমার এক্সেস অনুমতিপ্রাপ্ত। এই ডায়েরির মাঝামাঝি কোনাে এক জায়গায় সাজিদ আমার সাথে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটিও লিখে রেখেছে। তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় টিএসসিতে।। সে আমার সম্পর্কে লিখেছে‘ভ্যাবলা টাইপের এক ছেলের সাথে সাক্ষাৎ হলাে আজ। দেখলেই মনে হবে। জগতের কঠিন বিষয়ের কোনাে কিছুই সে বুঝে না। কথা বলার পরে বুঝলাম, এই ছেলে অত্যন্ত বুদ্ধিমান, কিন্তু দেখতে হাবাগােবা। ছেলেটার নাম-আরিফ। ৫ই মার্চ, ২০০৯। এই ডায়েরিতে নানান বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথাও লেখা আছে। একবার কানাডার টরেন্টোতে সাজিদ তার বাবার সাথে একটি অফিসিয়াল ট্যুরে গিয়েছিল। সেখানে অনেক সেলেব্রিটির সাথে বিল গেটসও আমন্ত্রিত ছিলেন। বিল গেটস সেখানে দশ মিনিটের জন্য বক্তৃতা রেখেছিলেন। সেই ঘটনাটিও ডায়েরিতে লেখা আছে। সিলেট শাহজালাল ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এ্যান্ড টেকনােলজি’র কম্পিউটার সাইন্স ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর ড. জাফর ইকবালের সাথে সাজিদের একবার বই মেলায় দেখা হয়ে যায়। সেবারের বইমেলায় জাফর স্যারের বই ‘একটুখানি বিজ্ঞান’ এর দ্বিতীয় কিস্তি আরাে একটুখানি বিজ্ঞান প্রকাশিত হয়। বই কিনে বের। হওয়ার পথে জাফর স্যারের সাথে দেখা হয়ে যায় সাজিদের। অটোগ্রাফ নিয়ে। স্যারের কাছে হেসে জানতে চাইল স্যার, একটুখানি বিজ্ঞান পাইলাম। এরপর পাইলাম আরাে একটুখানি বিজ্ঞান। এটার পরে, আরাে আরাে একটুখানি বিজ্ঞান কবে পাচ্ছি? সেদিন নাকি জাফর স্যার মিষ্টি হেসে বলেছিলেন-“পাবে, পাবে।’ নিজের সাথে ঘটে যাওয়া এরকম অনেক ঘটনাই ঠাঁই পেয়েছে সাজিদের ডায়েরিটাতে। ডায়েরির আদ্যোপান্ত আমার পড়া ছিল। কিন্তু সেমিস্টার ফাইনাল সামনে চলে আসায় গত বেশ কিছুদিন তার ডায়েরিটা আর পড়া হয়নি।

সেদিন থার্ড সেমিস্টারের শেষ পরীক্ষাটি দিয়ে রুমে এলাম। এসে দেখি সাক ঘরে নেই। তার টেবিলের উপরে তার ডায়েরিটা খােলা অবস্থায় পড়ে আছে। ঘর্মাক্ত শরীর। কাঠফাটা রােদের মধ্যে ক্যাম্পাস থেকে হেঁটে বাসায় ফিরেছি। ৯ মুহুর্তে বসে ডায়েরিটা উল্টাব, সে শক্তি বা ইচ্ছে কোনােটাই নেই। কিন্তু ডায়েরিটা বন্ধ করতে গিয়ে একটি শিরােনামে আমার চোখ আটকে গেল। আমি সাজিদের টেবিলেই বসে পড়ি। লেখাটির শিরােনাম ছিল-ভাগ্য বনাম স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি-স্রষ্টা কি এখানে বিতর্কিত? বেশ লােভনীয় শিরােনাম। শারীরিক ক্লান্তি ভুলেই আমি ঘটনাটির প্রথম থেকে পড়া শুরু করলাম। ঘটনাটি সাজিদের ডায়েরিতে যেভাবে লেখা, ঠিক সেভাবেই তুলে ধরছিকয়েকদিন আগে ক্লাসের থার্ড পিরিয়ডে মফিজুর রহমান স্যার এসে আমাকে দাঁড় করালেন। বললেন-“তুমি কি ভাগ্য, আই মিন তাকদিরে বিশ্বাস করাে?’ আমি আচমকা অবাক হলাম। আসলে এই আলাপগুলাে হলাে ধর্মীয় আলাপ । মাইক্রোবায়ােলজির একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে এসে এসব জিজ্ঞেস করেন, তখন খানিকটা ব্ৰিতবােধ করাই স্বাভাবিক। স্যার আমার উত্তরের আশায় মুখের দিকে চেয়ে আছেন। আমি বললাম-“জি, স্যার। অ্যাজ এ্যা মুসলিম, আমি তাকদিরে বিশ্বাস করি। এটি আমার ঈমানের মূল ছয়টি বিষয়ের মধ্যে একটি। স্যার বললেন-“তুমি কি বিশ্বাস করাে যে, মানুষ জীবনে যা যা করবে তার সবকিছুই তার জন্মের অনেক বছর আগে তার তাকদিরে লিখে দেওয়া হয়েছে? -“জ্বি স্যার, আমি উত্তর দিলাম। -“বলা হয়, স্রষ্টার ইচ্ছা ছাড়া গাছের একটি ক্ষুদ্র পাতাও নড়ে না, তাই না? -বলুন স্যার। -ধরাে, আজ সকালে আমি একজন লােককে খুন করলাম। তাহলে কি আমার তাকদিরে পূর্বনির্ধারিত ছিল না? -“জ্বি, ছিল। -“আমার তাকদির যখন লেখা হচ্ছিল, তখন কি আমি জীবিত ছিলাম? -না স্যার, জীবিত ছিলেন না। -“আমার তাকদির কে লিখেছে? কার নির্দেশে লেখা হয়েছে? -ভ্ৰষ্টার। -“তাহলে, সােজা এবং সরল লজিক এটাই বলে, আজ সকালে যে খুনটি আমি। করেছি, সেটি মূলত আমি করিনি। আমি এখানে একটি রােবট মাত্র।

আমার ভেতরে একটি প্রােগ্রাম সেট করে দিয়েছেন স্রষ্টা। সেই প্রােগ্রামে লেখা ছিল যে, আজ সকালে আমি একজন লােককে খুন করব। সুতরাং আমি ঠিক তাই-ই করেছি, যা আমার জন্য স্রষ্টা পূর্বে ঠিক করে রেখেছেন। এতে আমার কোনাে হাত নেই। ডু ইউ অ্যাগ্রি, সাজিদ? -“কিছুটা স্যার, আমি উত্তর দিলাম। মফিজুর স্যার এবার হাসলেন। হেসে বললেন-“আমি জানতাম তুমি কিছুটাই একমত হবে, পুরােটা নয়। এখন তুমি আমাকে নিশ্চয়ই যুক্তি দেখিয়ে বলবে স্যার, স্রষ্টা আমাদের একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। আমরা এটা দিয়ে ভালাে-মন্দ বিচার করে চলি, রাইট? -“জ্বি স্যার। -“কিন্তু সাজিদ, এটা খুবই লেইম লজিক। ডু ইউ নাে? ধরাে, আমি তােমার হাতে বাজারের একটি তালিকা দিলাম। তালিকায় যা যা কিনতে হবে, তার সবকিছু লেখা আছে। এখন তুমি বাজার করে ফিরলে। তুমি ঠিক তাই তাই কিনলে যা আমি তালিকায় লিখে দিয়েছি এবং তুমি এটা করতে বাধ্য। এতটুকু বলে স্যার আমার কাছে জানতে চাইলেন-বুঝতে পারছ? আমি বললাম-“জ্বি স্যার। -“ভেরি গুড! ধরাে, তুমি বাজার করে আসার পর, একজন জিজ্ঞেস করল, সাজিদ কী কী বাজার করেছ? তখন আমি উত্তর দিলাম, ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে, তা-ই কিনেছে। বলাে তাে, আমি সত্য বলেছি কিনা? আমি বললাম-“নাহ, আপনি মিথ্যা বলেছেন। স্যার চিল্কার করে বলে উঠলেন-এক্সাক্টলি । ইউ হ্যাভ গট দ্য পয়েন্ট মাই ডিয়ার। আমি মিথ্যা বলেছি। আমি তালিকাতেই বলে দিয়েছি তােমাকে কী কী কিনতে হবে। তুমি ঠিক তা-ই কিনেছ, যা আমি কিনতে বলেছি। যা কিনেছ সব আমার পছন্দের জিনিস। এখন আমি যদি বলি- ‘ওর যা যা খেতে মন চেয়েছে, সে তাই তাই কিনেছে’, তাহলে এটা একটা ডাহা মিথ্যা কথা হবে, তাই না? -“জ্বি, স্যার। -ঠিক স্রষ্টাও এভাবে মিথ্যা বলেছেন। দুই নাম্বারি করেছেন। তিনি অনেক আগে আমাদের তাকদির লিখে তা আমাদের গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছেন। এখন আমরা সেটাই করি, যা স্রষ্টা সেখানে লিখে রেখেছেন। এ্যান্ড অ্যাট দ্যা এন্ড অফ দ্য ডে, এই কাজের জন্য কেউ জান্নাতে যাচ্ছে, কেউ জাহান্নামে। কিন্তু কেন? এখানে মানুষের তাে কোনাে হাত নেই। ম্যানুয়ালটা স্রষ্টার তৈরি। আমরা তাে জাস্ট পারফর্মার। স্ক্রিপ্ট রাইটার তাে স্রষ্টা। স্রষ্টা এর জন্য আমাদের কাউকে জান্নাত, কাউকে জাহান্নাম দিতে পারেন না। যুক্তি তাই বলে, ঠিক? আমি চুপ করে রইলাম। পুরাে ক্লাসে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে তখন। স্যার বললেন-“হ্যাভ ইউ অ্যানি প্রােপার লজিক অন দ্যাট টিপিক্যাল কোয়েশ্চান, ডিয়ার? আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম। স্যার মুচকি হাসলেন। সম্ভবত ভাবছেন, উনি আমাকে এবার সত্যি সত্যিই কুপােকাত করে দিলেন। বিজয়ীর হাসি। আমাকে যারা চিনে তারা সবাই জানে, আমি কখনাে কারও প্রশ্নের উত্তর দিতে সময় নিই না। আজকে যেহেতু তার ব্যতিক্রম ঘটল, বন্ধুরা আমার দিকে ড্যাব। ড্যাব চোখ করে তাকাল। তাদের চাহনি দেখে মনে হচ্ছিল, এই সাজিদর্কে তারা চেনেই না। কোনােদিন দেখেনি। ক্লাসে আমার বিরুদ্ধমতের যারা আছে, তাদের চেহারা তখন মূহুর্তেই উজ্জ্বল বর্ণ ধারণ করল। তারা হয়তাে মনে মনে ভাবতে লাগল- ‘মােল্লাজির দৌঁড় ঐ মসজিদ পর্যন্তই। আমি মুখ তুলে স্যারের দিকে তাকালাম। মুচকি হাসিটা স্যারের মুখে তখনও বিরাজমান। আমি বললাম-স্যার, এই ক্লাসে কার সম্পর্কে আপনার কী অভিমত? স্যার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন। স্যার জিজ্ঞেস করেছেন কী আর আমি বলছি কী। স্যার বললেন-বুঝলাম না। -মানে, আমাদের ক্লাসের কার মেধা কী রকম, সে বিষয়ে আপনার ধারণা কেমন? -ভালাে ধারণা। ছাত্রদের সম্পর্কে একজন শিক্ষকেরই তাে সবচেয়ে ভালাে জ্ঞান থাকে। আমি বললাম-“স্যার, আপনি বলুন তাে, এই ক্লাসের কারা কারা ফার্স্ট ক্লাস পাবে। আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে? স্যার কিছুটা বিস্মিত হলেন। বললেন-“আমি তােমাকে অন্য বিষয়ে প্রশ্ন করেছি। তুমি আউট অফ কনটেক্সটে গিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করছ, সাজিদ। -না স্যার, আমি কনটেক্সটেই আছি। আপনি উত্তর দিন। স্যার বললেন-“এই ক্লাস থেকে রায়হান, মমতাজ, ফারহানা, সজীব, ওয়ারেস, . ইফতি, সুমন, জাবেদ ও তুমি ফার্স্ট ক্লাস পাবে। আর বাকিরা সেকেন্ড ক্লাস পাবে।

স্যার যাদের নাম বলেছেন, তারা সবাই ক্লাসের ব্রিলিয়্যান্ট স্টুডেন্ট। সুতরাং স্যারের অনুমান খুব একটা ভুল না। আমি বললাম-স্যার, আপনি এটা লিখে দিতে পারেন? – ‘হােয়াই নট, স্যার বললেন। এই বলে তিনি খচখচ করে একটা কাগজের একপাশে যারা ফাস্ট ক্লাস পাবে তাদের নাম, অন্যপাশে যারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে তাদের নাম লিখে আমার হাতে দিলেন। আমি বললাম-স্যার, ধরে নিলাম যে, আপনার ভবিষ্যদ্বাণী সম্পূর্ণ সত্য হয়েছে। মানে, আপনি ফার্স্ট ক্লাস পাবেন বলে যাদের নাম লিখেছেন, তারা সবাই ফাস্ট ক্লাস পেয়েছে, আর যারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে লিখেছেন, তাদের সবাই সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে। -হুম, তাে? -“এখন, স্যার বলুন তাে প্লিজ, যারা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে, কেবলমাত্র আপনি এই কাগজে তাদের নাম লিখেছেন বলেই কি তারা ফার্স্ট ক্লাস পেয়েছে? -নাহ তাে। -“যারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে, কেবলমাত্র আপনি এই কাগজে লিখেছেন বলেই কি তারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে? স্যার বললেন-‘একদম না। -তাহলে মূল ব্যাপারটি কী স্যার? স্যার বললেন-মূল ব্যাপার হলাে, আমি তােমাদের শিক্ষক। আমি খুব ভালাে জানি পড়াশােনায় তােমাদের কে কেমন। আমি খুব ভালাে করেই জানি, কার মেধা কেমন। সুতরাং আমি চোখ বন্ধ করেই বলে দিতে পারি কে কেমন রেজাল্ট করবে। আমি হাসলাম। বললাম-“স্যার, যারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে, তারা যদি আপনাকে দোষ দেয়? যদি বলে, আপনি সেকেন্ড ক্লাস’ ক্যাটাগরিতে তাদের নাম লিখেছেন বলেই তারা সেকেন্ড ক্লাস পেয়েছে? স্যার কপালের ভাঁজ লম্বা করে বললেন-“ইট উড বি টোট্যালি রং! আমি কেন এর জন্য দায়ী হবাে? এটা তাে সম্পূর্ণ তাদের দায়। আমি শুধু তাদের মেধা, যােগ্যতা সম্পর্কে ধারণা রাখি বলেই অগ্রীম বলে দিতে পেরেছি যে, কে কেমন রেজাল্ট করবে।

আমি এবার জোরে জোরে হাসতে লাগলাম। পুরাে ক্লাস আমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। আমি থামলাম। বললাম-“স্যার, তাকদির তথা ভাগ্যটাও ঠিক এ রকম। আপনি যেমন আমাদের মেধা, যােগ্যতা, ক্ষমতা সম্পর্কে ভালাে ধারণা রাখেন, সম্ভার তেমনি তার সৃষ্টি সম্পর্কে জানেন। আপনার ধারণা মাঝে মাঝে ভুল হতে পারে। কিন্তু স্রষ্টার জানাতে কোনাে ভুল নেই। স্রষ্টা হলেন আলিমুল গায়েব। তিনি ভতবর্তমান-ভবিষ্যৎ সব জানেন। সব। ‘আপনি আমাদের সম্পর্কে পূর্বানুমান করে লিখে দিয়েছেন যে, আমাদের মধ্যে। কারা কারা ফার্স্ট ক্লাস পাবে, আর কারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে। এর মানে কিন্তু এই নয় যে, আপনি বলেছেন বলে আমরা কেউ ফাস্ট ক্লাস পাচ্ছি, কেউ সেকেন্ড ক্লাস। পাচ্ছি। আমরা যে যা রেজাল্ট করছি, সেটা তার মেধা, যােগ্যতা ও পরিশ্রমের আল্টিমেট ফল। ‘তাে স্রষ্টা যেহেতু তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে সব জানেন, কাজেই তিনি সে অনুযায়ী আমাদের তাকদির লিখে রেখেছেন। তাতে লেখা আছে দুনিয়ায় আমরা কে কী করব। এর মানেও কিন্তু এই নয় যে, তিনি লিখে দিয়েছেন বলেই আমরা কাজগুলাে করছি। বরং এর মানে হলাে এই তিনি জানেন যে, আমরা দুনিয়ায় এই এই কাজগুলাে করব। তাই তিনি তা অগ্রীম লিখে রেখেছেন তাকদির হিসেবে। ‘আমাদের মধ্যে কেউ ফাস্ট ক্লাস আর কেউ সেকেন্ড ক্লাস পাবার জন্য যেমন কোনােভাবেই আপনি দায়ী নন; ঠিক সেভাবে মানুষের মধ্যে কেউ ভালাে কাজ করে জান্নাতে, আর কেউ খারাপ কাজ করে জাহান্নামে যাবার জন্যও স্রষ্টা দায়ী নন। স্রষ্টা জানেন যে, আপনি আজ সকালে একজনকে খুন করবেন। তাই তিনি সেটা আগেই আপনার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। এটার মানে এই নয় যে স্রষ্টা লিখে রেখেছেন বলেই আপনি খুনটি করেছেন। এর মানে হলাে-স্রষ্টা জানেন যে, আপনি আজ খুনটি করবেন। তাই সেটা অগ্রিম লিখে রেখেছেন আপনার তাকদির। হিসেবে। স্যার, ব্যাপারটা কি এখন পরিষ্কার?’। স্যারের চেহারা কিছুটা ফ্যাকাসে মনে হলাে। তিনি বললেন-“হুম। এরপর স্যার কিছুক্ষণ চুপ থাকলেন। তারপর বললেন-“আমি শুনেছিলাম তুম। কদিন আগেও নাস্তিক ছিলে। তুমি আবার আস্তিক হলে কবে? আমি হা হা হা করে হাসলাম। বললাম স্যার এই প্রশ্নটা কিন্তু আউট অফ কনটেক্সট।

এটা শুনে পুরাে ক্লাস হাসিতে ফেটে পড়ল। স্যার এবার ক্লাসের একাডেমিক লেকচার শুরু করলেন। ক্লাসের একদম শেষদিকে স্যার আবার আমাকে দাঁড় করালেন। বললেন-বুঝলাম স্রষ্টা আগে থেকে জানেন বলেই লিখে রেখেছেন। তিনি যেহেতু আগে থেকেই জানেন, কে ভালাে কাজ করবে আর কে খারাপ কাজ করবে, তাহলে পরীক্ষা নেওয়ার কি দরকার? যারা জান্নাতে যাওয়ার তাদের জান্নাতে, আর যারা জাহান্নামে যাওয়ার তাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিলেই তাে হতাে, তাই না? আমি আবার হাসলাম। আমার হাতে স্যারের লিখে দেওয়া কাগজটি তখনও ধরা ছিল। আমি সেটা স্যারকে দেখিয়ে বললাম-“স্যার, এই কাগজে কারা কারা ফাস্ট ক্লাস পাবে, আর কারা কারা সেকেন্ড ক্লাস পাবে, তাদের নাম লেখা আছে। তাহলে এই কাগজটির ভিত্তিতেই রেজাল্ট দিয়ে দিন। বাড়তি করে পরীক্ষা নিচ্ছেন কেন? স্যার বললেন-‘পরীক্ষা না নিলে কেউ হয়তাে এই বলে অভিযােগ করতে পারে যে, স্যার আমাকে ইচ্ছা করেই সেকেন্ড ক্লাস দিয়েছে। পরীক্ষা দিলে আমি হয়তাে ঠিকই ফার্স্ট ক্লাস পেতাম। আমি বললাম-‘একদম তাই, স্যার। স্রষ্টাও এজন্য পরীক্ষা নিচ্ছেন, যাতে কেউ বলতে না পারে: দুনিয়ায় পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে আমি অবশ্যই আজকে জান্নাতে থাকতাম। স্রষ্টা ইচ্ছা করেই আমাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছেন। ক্লাসের সবাই হাততালি দিতে শুরু করল। স্যার বললেন-“সাজিদ, আই হ্যাভ অ্যা লাস্ট কোয়েশ্চান।’ -ডেফিনেইটলি, স্যার, আমি বললাম। -“আচ্ছা, যে মানুষ পুরাে জীবনে খারাপ কাজ বেশি করে, সে অন্তত কিছু না কিছু ভালাে কাজ তাে করে, তাই না? -“জ্বি স্যার। -তাহলে, এই ভালাে কাজগুলাের জন্য হলেও তাে তার জান্নাতে যাওয়া দরকার, তাই না? আমি বললাম- স্যার, পানি কীভাবে তৈরি হয়? স্যার আবার অবাক হলেন। হয়তাে বলতে যাচ্ছিলেন যে, এই প্রশ্নটাও আউট অফ কনটেক্সট। কিন্তু কী ভেবে যেন চুপসে গেলেন। বললেন-“দুই ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেনের সংমিশ্রণে। আমি বললাম-“আপনি এক ভাগ হাইড্রোজেন আর এক ভাগ অক্সিজেন দিয়ে পানি তৈরি করতে পারবেন?
-কখনােই না।’ -ঠিক সেভাবে, এক ভাগ ভালাে কাজ আর এক ভাগ মন্দ কাজে জান্নাত পাওয়া যায় না। জান্নাত পেতে হলে হয় তিন ভাগই ভালাে কাজ হতে হবে, নতুবা দই ভাগ ভালাে কাজ, এক ভাগ মন্দ কাজ হতে হবে। অর্থাৎ, ভালাে কাজের পালা। ভারী হওয়া আবশ্যক। সেদিন স্যার আর কোনাে প্রশ্ন আমাকে করেননি। ডায়েরিতে সাজিদের লেখা এক নিশ্বাসে পুরােটা পড়ে ফেললাম। কোথাও একটুও থামিনি। পড়া শেষে যেই মাত্র ডায়েরিটা বন্ধ করতে যাবাে, অমনি দেখলাম, পেছন থেকে সাজিদ এসে আমার কান মলে ধরেছে। বলল-“তুই তাে সাংঘাতিক লেভেলের চোর। চুরি করে আমার ডায়রি পড়ছিস। আমি হেসে বললাম-“হা হা হা। ভুলে গেছিস যে, এই ডায়রি পড়ার এক্সেস তুই নিজেই আমাকে দিয়েছিলি! সাজিদ জিহ্বায় কামড় দিয়ে বলল-সেটা আমার উপস্থিতিতে কিন্তু! আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে দিতে বললাম, ‘স্যারকে তাে সেদিন ভালাে জব্দ করেছিস রে । দোস্ত!’ কথাটা সে কানে নিল বলে মনে হলাে না। নিজের সম্পর্কে কোনাে কমপ্লিমেন্টই সে আমলে নেয় না। গামছায় মুখ মুছতে মুছতে খাটের উপর শুয়ে পড়ল। আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম। বললাম-“সাজিদ…’। -হু’ -একটা কথা বলব? -বল।’
-“জানিস, এক সময় যুবকেরা হিমু হতে চাইতাে। হলুদ পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে, মরুভূমিতে গর্ত খুঁড়ে জ্যোত্স দেখার স্বপ্ন দেখতাে। দেখিস, এমন একদিন আসবে, যেদিন যুবকেরা সাজিদ হতে চাইবে। ঠিক তাের মতাে। কথাগুলাে বলেই আমি সাজিদের দিকে তাকালাম। দেখলাম, ততক্ষণে সে ঘুমিয়ে। পড়েছে। অঘাের ঘুম…। এক প্রশান্ত মুখের দিক থেকে আমি চোখ ফেরাতে পারছি না।