স্রষ্টা কেন মন্দ কাজের দায় নেন না?

মফিজুর রহমান স্যারের ক্লাস। স্যার হালকা-পাতলা গড়নের। বাতাস এলেই যেন ঢলে পড়বেন। খুবই খারাপ অবস্থা শরীরের। ভদ্রলােকের চেহারার চেয়ে চোখ দুটি অস্বাভাবিক রকম বড়। দেখলেই মনে হয় যেন বড় বড় সাইজের দুটি জলপাই কেউ খােদাই করে বসিয়ে দিয়েছে। তবে ভদ্রলােক খুবই ভালাে মানুষ। উনার সমস্যা একটিই-ক্লাসে উনি যতটা না বায়ােলজি পড়ান, তার চেয়ে বেশি দর্শন চর্চা করেন। ধর্ম কোথা থেকে এল, ঠিক কবে থেকে মানুষ ধার্মিক হওয়া শুরু করল, ‘ধর্ম আদতে কী আর, কী নয়’ এসবই তার আগ্রহ ও আলােচনার কেন্দ্রবিন্দু। আজকে উনার চতুর্থ ক্লাশ। পড়াবেন Analytical Techniques & BioInformatics। চতুর্থ সেমিস্টারে এটা পড়ানাে হয়। স্যার এসে প্রথমে বললেন-‘Good Morning, Guys.’ সবাই সমস্বরে বলল-‘Good Morning, Sir.’ এরপর স্যার জিজ্ঞেস করলেন-সবাই কেমন আছাে? স্যারের আরও একটি ভালাে দিক হলাে উনি ক্লাসে এলে এভাবেই সবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন। সাধারণত হায়ার লেভেলে যেটা সব শিক্ষক করেন না। তারা রােবটের মত ক্লাসে আসেন, যন্ত্রের মত করে লেকচার পড়িয়ে বেরিয়ে যান। সেদিক থেকে মফিজুর রহমান নামের এই ভদ্রলােক অনেকটা অন্যরকম। আবারও সবাই সমস্বরে উত্তর দিল। কিন্তু গােলমাল বাঁধল এক জায়গায়। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন উত্তর দিয়েছে এভাবে-“আলহামদুলিল্লাহ ভালাে। স্যার কপালের ভাঁজ একটু দীর্ঘ করে বললেন-“আলহামদুলিল্লাহ্ ভালাে বলেছাে কে কে? অদ্ভুত প্রশ্ন। সবাই থতমত খেলাে। একটু আগেই বলেছি স্যার একটু অন্যরকম। প্রাইমারি লেভেলের টিচারদের মত ক্লাসে এসে বিকট চিৎকার করে Good Morning বলেন, সবাই কেমন আছে জানতে চান। এখন ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার জন্য কি প্রাইমারি লেভেলের শিক্ষকদের মত বেত দিয়ে পিটাবেন না কি?

সাজিদের তখন তার প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক বাবুল চন্দ্র দাশের কথা মনে পড়ে গেল। এই লােকটা ক্লাসে কেউ দুটোর বেশি হাঁচি দিলেই বেত দিয়ে আচ্ছা মতাে পেটাতেন। উনার কথা হলাে-হাঁচির সর্বোচ্চ পরিমাণ হবে দুটি। দুটির বেশি হাঁচি দেওয়া মানে ইচ্ছে করেই বেয়াদবি করা। যা হােক, বাবুল চন্দ্রের পাঠ তাে কবেই চুকেছে, এবার মফিজ স্যারের হাতেই না গণপিটুনি খাওয়া লাগে। ক্লাসের সর্বমােট সাতজন দাঁড়াল। এরা সবাই আলহামদুলিল্লাহ ভালাে বলেছে। এরা হচ্ছে-রাকিব, আদনান, জুনায়েদ, সাকিব, মরিয়ম, রিতা ও সাজিদ। স্যার সবার চেহারাটা একটু ভালাে মত পরখ করে নিলেন। এরপর ফিক করে হেসে দিয়ে বললেন-বসাে।’ সবাই বসল। আজকে আর মনে হয় একাডেমিক পড়াশােনা হবে না। দর্শনের তাত্ত্বিক আলাপ হবে। ঠিক তাই হলাে। মফিজুর রহমান স্যার আদনানকে দাঁড় করালেন। বললেন-“তুমিও বলেছিলে সেটা, না? -“জ্বি স্যার।’, আদনান উত্তর দিল। স্যার বললেন-“আলহামদুলিল্লাহর অর্থ কি জানাে? আদনান মনে হয় একটু ভয় পাচ্ছে। সে ঢোঁক গিলতে গিলতে বলল-“জ্বি স্যার, আলহামদুলিল্লাহ্ অর্থ হলাে: সকল প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর। স্যারও বললেন-“সকল প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর। স্যার এই বাক্যটি দুবার উচ্চারণ করলেন। এরপর আদনানের দিকে তাকিয়ে বললেন-বসাে। আদনান বসল। এবার স্যার রিতাকে দাঁড় করালেন। স্যার রিতার কাছে জিজ্ঞেস করলেন-“আচ্ছা, পৃথিবীতে চুরি-ডাকাতি আছে? রিতা বলল-“আছে।’ -“খুন-খারাবি, রাহাজানি, ধর্ষণ? -“জ্বি,আছে। -কথা দিয়ে কথা না রাখা, মানুষকে ঠকানাে, লােভ-লালসা এসব? -“জ্বি, আছে। -“এগুলাে কি প্রশংসাযযাগ্য? -না।’

তাহলে মানুষ একটি ভালাে কাজ করার পর তার সব প্রশংসা যদি আল্লাহ্র হয়, মানুষ যখন চুরি-ডাকাতি করে, লােক ঠকায়, খুন-খারাবি করে, ধর্ষণ করে, তখন সব মন্দের ক্রেডিট আল্লাহকে দেওয়া হয় না কেন? উনি প্রশংসার ভাগ পাবেন, কিন্তু দুর্নামের ভাগ নিবেন না-তা কেমন একপেশে হয়ে গেল না? রিতা মাথা নিচু করে চুপ করে আছে। স্যার বললেন-“এখানেই ধর্মের ভেল্কিবাজি। ঈশ্বর শুধু ভালােটা বােঝেন, কিন্তু মন্দ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। আদতে, ঈশ্বর বলে কেউ নেই। যদি থাকত, তাহলে তিনি এরকম একচোখা হতেন না। বান্দার ভালাে কাজের ক্রেডিটটা নিজে নিয়ে নিবেন, কিন্তু মন্দ কাজের বেলায় বলবেন-উহু, ঐটা থেকে আমি পবিত্র। ঐটা তােমার ভাগ। স্যারের কথা শুনে ক্লাসে যে কজন নাস্তিক আছে, তারা হাততালি দেওয়া শুরু করল। সাজিদের পাশে যে নাস্তিকটা বসেছে, সে তাে বলেই বসল-মফিজ স্যার হলেন আমাদের বাংলার প্লেটো। স্যার ধর্ম আর স্রষ্টার অসাড়তা নিয়ে বলেই যাচ্ছেন। এবার সাজিদ দাঁড়াল। স্যারের কথার মাঝে সে বলল-“স্যার, সৃষ্টিকর্তা একচোখা নন। তিনি মানুষের ভালাে কাজের ক্রেডিট নেন না। তিনি ততােটুকুই নেন, যতটুকু তিনি পাবেন। ঈশ্বর আছেন। স্যার সাজিদের দিকে একটু ভালােভাবে তাকালেন। বললেন-“শিওর? -“জ্বি। -তাহলে মানুষের মন্দ কাজের জন্য কে দায়ী? -মানুষই দায়ী।’, সাজিদ বলল। -ভালাে কাজের জন্য? -তা-ও মানুষ। স্যার এবার চিৎকার করে বললেন-‘এক্সাক্টলি, এটাই বলতে চাচ্ছি। ভালাে-মন্দ এসব মানুষেরই কাজ। সুতরাং এর সব ক্রেডিটই মানুষের। এখানে স্রষ্টার কোনাে হাত নেই। তিনি এখান থেকে না প্রশংসা পেতে পারেন, না তিরস্কার। সােজা কথায়, স্রষ্টা বলতে কেউই নেই। ক্লাসে পিনপতন নীরবতা। সাজিদ বলল-মানুষের ভালাে কাজের জন্য স্রষ্টা অবশ্যই প্রশংসা পাবেন। কারণ মানুষকে স্রষ্টা ভালাে কাজ করার জন্য দুটি হাত দিয়েছেন, ভালাে জিনিস দেখার জন্য দুটি চোখ দিয়েছেন, চিন্তা করার জন্য মস্তিষ্ক দিয়েছেন, দুটি পা দিয়েছেন। এসবকিছুই স্রষ্টার দান। তাই ভালাে কাজের জন্য তিনি অবশ্যই প্রশংসা পাবেন।

স্যার বললেন-“এগুলাে দিয়ে তাে মানুষ খারাপ কাজও করে, তখন? -এর দায় স্রষ্টার নয়। -হা হা হা। তুমি খুব মজার মানুষ দেখছি। একই সাথে কিছুটা বােকাও বটে! হা। হা হা। সাজিদ বলল-“স্যার, স্রষ্টা মানুষকে একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। এটা দিয়ে সে নিজেই নিজের কাজ ঠিক করে নেয়। সে কি ভালাে করবে, নাকি মন্দ করবে। স্যার তিরস্কারের সুরে বললেন-ধর্মীয় কিতাবাদির কথা বাদ দাও। কাম টু দ্যা পয়েন্ট অ্যান্ড বি লজিক্যাল। সাজিদ বলল-“স্যার, আমি কি উদাহরণ দিয়ে বােঝাতে পারি বিষয়টা?” -অবশ্যই।’, স্যার বললেন। সাজিদ বলতে শুরু করল‘ধরুন, খুব গভীর সাগরে একটি জাহাজ ডুবে গেল। ধরুন, সেটা বার্মুড়া ট্রায়াঙ্গাল। কোনাে ডুবুরিই সেখানে ডুব দিয়ে জাহাজের মানুষগুলােকে উদ্ধার করতে পারছে না। বার্মুডা ট্রায়াঙ্গালে তাে নয়ই। এই মুহুর্তে ধরুন সেখানে আপনার আবির্ভাব ঘটল । আপনি সবাইকে বললেন-“আমি এমন একটি যন্ত্র বানিয়ে দিতে পারি, যেটা গায়ে লাগিয়ে যেকোনাে মানুষ খুব সহজেই ডুবে যাওয়া জাহাজের মানুষগুলােকে উদ্ধার করতে পারবে। ডুবুরির কোনাে রকম ক্ষতি হবে না।’ স্যার বললেন-“হুম, তাে? -‘ধরুন, আপনি যন্ত্রটি তৎক্ষণাৎ বানালেন এবং একজন ডুবুরি সেই যন্ত্র গায়ে লাগিয়ে ডুবে যাওয়া মানুষগুলােকে উদ্ধার করতে সাগরে নেমে পড়ল। ক্লাসে তখন একদম পিনপতন নীরবতা। সবাই মুগ্ধ শ্রোতা। কারও চোখের পলকই যেন পড়ছে না। সাজিদ বলে যেতে লাগল-ধরুন, ডুবুরিটা ডুব দিয়ে ডুবে যাওয়া জাহাজে চলে গেল। সেখানে গিয়ে সে দেখল, মানুষগুলাে হাঁসফাঁশ করছে। সে একে একে সবাইকে একটি করে অক্সিজেন সিলিন্ডার দিয়ে দিল। তাদেরকে একজন একজন করে উদ্ধার করতে লাগল। স্যার বললেন-“হুম। সাজিদ বলছে-‘ধরুন, সব যাত্রীকে উদ্ধার করা শেষ। বাকি আছে মাত্র একজন। ডুবুরি যখন শেষ লােকটাকে উদ্ধার করতে গেল, তখন দেখল, এই লােকটাকে সে আগে থেকেই চিনে।

এতটুকু বলে সাজিদ স্যারের কাছে প্রশ্ন করল-স্যার, এরকম কি হতে পারে না? স্যার বললেন-“অবশ্যই হতে পারে। লােকটা ডুবুরির আত্মীয় বা পরিচিত হয়ে যেতেই পারে। অস্বাভাবিক কিছু নয়। সাজিদ বলল–জ্বি। ডুবুরি লােকটাকে চিনতে পারল। সে দেখল, এটা হচ্ছে তার চরম শত্রু। এই লােকের সাথে তার দীর্ঘদিনের বিরােধ চলছে। এরকম হতে পারে না, স্যার? -“হ্যাঁ, হতে পারে। সাজিদ বলল-“ধরুন, ডুবুরির মধ্যে ব্যক্তিগত হিংসাবােধ জেগে উঠল। সে শত্রুতাবশত ঠিক করল যে, এই লােকটাকে সে বাঁচাবে না। কারণ লােকটা তার দীর্ঘদিনের শত্রু। সে এই চরম সুযােগে প্রতিশােধপরায়ণ হয়ে উঠল। ধরুন, ডুবুরি ঐ লােকটাকে অক্সিজেনের সিলিন্ডার তাে দিলই না, উল্টো উঠে আসার সময় লােকটার পেটে একটা জোরে লাথি দিয়ে এল। ক্লাসে তখনও পিনপতন নীরবতা। সবাই সাজিদের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। স্যার বললেন-“তাে, তাতে কি প্রমাণ হয়, সাজিদ? সাজিদ স্যারের দিকে ফিরল। ফিরে বলল-‘Let me finish my beloved sir’। -‘Okey, you are permitted. Carry on.’, স্যার বললেন। সাজিদ এবার প্রশ্ন করল-“স্যার, বলুন তাে, এই যে, এতগুলাে ডুবে যাওয়া মানুষগুলােকে ডুবুরি উদ্ধার করে আনল, এর জন্য আপনি নিজে কি কোনাে ক্রেডিট পাবেন? স্যার বললেন-“অবশ্যই আমি ক্রেডিট পাবাে। কারণ, আমি যদি ঐ বিশেষ যন্ত্রটি
বানিয়ে দিতাম, তাহলে তাে এই লােকগুলাের কেউই বাঁচত না। সাজিদ বলল-“একদম ঠিক স্যার। আপনি অবশ্যই এর জন্য ক্রেডিট পাবেন। কিন্তু পরবর্তী ব্যাপার হচ্ছে, ‘ডুবুরি সবাইকে উদ্ধার করলেও, একজন লােককে সে শত্রুতাবশত উদ্ধার না করে মৃত্যুকূপে ফেলে রেখে এসেছে। আসার সময় তার পেটে একটি জোরে লাথিও দিয়ে এসেছে। ঠিক? -হুম। -“এখন স্যার, ডুবুরির এমন অন্যায়ের জন্য কি আপনি দায়ী হবেন? ডুবুরির এই অন্যায়ের ভাগটা কি সমানভাবে আপনিও ভাগ করে নেবেন?

স্যার বললেন-“অবশ্যই না। ওর দোষের ভাগ আমি কেন নিব? আমি তাে তাকে এরকম অন্যায় কাজ করতে বলিনি। সেটা সে নিজে করেছে। সুতরাং এর পুরাে দায় তাকেই বহন করতে হবে।’ সাজিদ এবার হাসল। হেসে সে বলল-“স্যার, ঠিক একইভাবে, আল্লাহ্ তা’আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আপনি যেরকম ডুবুরিকে একটা বিশেষ যন্ত্র বানিয়ে দিয়েছেন, সেরকম সৃষ্টিকর্তাও মানুষকে অনুগ্রহ করে হাত, পা, চোখ, নাক, কান, মুখ, মস্তিষ্ক এসব দিয়ে দিয়েছেন। সাথে দিয়েছেন একটি স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি। এখন এসব ব্যবহার করে সে যদি কোনাে ভালাে কাজ করে, তবে তার ক্রেডিট স্রষ্টাও পাবেন। ঠিক যে রকম বিশেষ যন্ত্রটি বানিয়ে আপনি ক্রেডিট পাচ্ছেন। আবার সে মানুষ যদি এগুলাে ব্যবহার করে কোনাে খারাপ কাজ করে, গর্হিত কাজ করে, তাহলে এর দায়ভার স্রষ্টা নেবেন না। যে রকম ডুবুরির ঐ অন্যায়ের দায় আপনার উপর বর্তায় না। আমি কি বুঝাতে পেরেছি, স্যার? ক্লাসে এতক্ষণ ধরে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল। এবার ক্লাসের সকল আস্তিকেরা মিলে একসাথে জোরে জোরে হাততালি দেওয়া শুরু করল। স্যারের জবাবের আশায় সাজিদ স্যারের দিকে তাকিয়ে আছে। স্যার বললেন-“হুম। আই গট দ্যা পয়েন্ট।’, এই বলে স্যার সেদিনের এত ক্লাস শেষ করে চলে যান।