আয়িশা রা. ও মুহাম্মাদ সা.-এর বিয়ে

এবং কথিত নাস্তিকদের কানাঘুষা। আমরা চারজন বসে টিএসসি তে আড্ডা দিচ্ছিলাম। রাকিব, শাহরিয়ার, সাজিদ আর আমি। আমাদের মধ্যে শাহরিয়ার হলাে খেলাপ্রেমিক। ফুটবল ক্লাব বার্সেলােনার চরম ভক্ত। কেউ পুরাে সপ্তাহে কোনাে ম্যাচ না দেখে শাহরিয়ারের কাছে আধঘণ্টা বসলেই হবে। শাহরিয়ার পুরাে সপ্তাহের খেলার আদ্যোপান্ত তাকে কাগজেকলমে বুঝিয়ে দেবে। ইপিএলে কোন দল টপে আছে, ম্যানচেস্টার সিটির দায়িত্ব নিয়ে পেপ গার্দিওলা কী রকম দলটাকে পাল্টে দিল, সিরি আ-তে জুভের অবস্থান কোথায়, ইব্রাকে ছেড়ে দিয়ে ফ্রেঞ্চলিগে পিএসজির অবস্থা কেমন, বুন্দেসলিগাতে বায়ার্ন আর ডর্টমুন্ড কী করছে, লা লিগাতে বার্সা-রিয়ালের দৌড়ে কে এগিয়ে, রােনালদোর ফর্ম নেই কেন, মেসিকে ছাড়া বার্সা সামনের ম্যাচগুলা উতরে যেতে পারবে কি না, নেইমার সেরা না বেল, সুয়ারেজ নাকি বেনজেমা ইত্যাদি ইত্যাদি বিশ্লেষণের জন্য শাহরিয়ারের জুড়ি নেই। এত কঠিন কঠিন স্প্যানিশ, জার্মেইন, ফ্রেঞ্চ আর ইতালির নামগুলাে সে কীভাবে যে মনে রাখে আল্লাহ মালুম। খেলার খবর বলতে শুরু করলে তার আর থামাথামি নেই। ননস্টপ বলে যেতে পারে। এজন্যে আমাদের বন্ধুমহলে শাহরিয়ার স্পাের্টস চ্যানেল নামে পরিচিত। রাকিব হলাে আগাগােড়া পলিটিক্স স্পেশালিস্ট। দুনিয়ার রাজনীতি কখন কোথায় কীভাবে মােড় নিচ্ছে তার সমস্ত রকম আপডেট থাকে রাকিবের কাছে। গুলির মুখ থেকে ট্রাম্পের বেঁচে আসা থেকে শুরু করে হিলারির ম্যালেরিয়া পর্যন্ত সব খবর তার নখদর্পণে। তবে, ইদানিং সে ব্যস্ত ‘পাক-ভারত যুদ্ধ নিয়ে। কাশ্মীরের উরিতে হামলা নিয়ে পাক-ভারতের মধ্যে যে যুদ্ধ যুদ্ধ ভাব বিরাজ করছে, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই যাচ্ছে সে। রাকিব মনে করছে, উরির হামলাটা আসলে ভারতের একটি ব্লাইন্ড গেম’। এটা নিয়ে চলমান ব্রিফিঙের মাঝখানে হঠাৎ নিলয়দার আগমন। নিলয়দা আমাদের চেয়ে সিনিয়র মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের ছাত্র। আমাদের চেয়ে ঢের সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সাথে তার বন্ধুত্বসুলভ আচরণ দেখে বােঝার উপায় নেই যে, নিলয়দা এত সিনিয়র লেভেলের কেউ।
তার হাতে একটি পত্রিকা। পত্রিকা হাতে নিলয়দা আমাদের পাশে এসে বেঞ্চে বসল। নিলয়দাকে দেখে সাজিদ আরেক কাপ রঙ চা-র অর্ডার করল। চা চলে এলে নিলয়দা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল-বাকস্বাধীনতার মূল্য পৃথিবীর কোথাও নেই, বুঝলি? কোত্থাও নেই। কথাগুলাে এমনভাবে বলল যে, নিলয়দাকে খুব মর্মাহত দেখাল। নিলয়দা কোন পয়েন্ট থেকে কথাগুলাে বলল তা আমাদের কারও মাথাতে আসেনি তখনও। রাকিব বলে উঠল-নিলয়দা কি পশ্চিমবঙ্গের ধর্মীয় কটুক্তির দায়ে গ্রেফতার হওয়া জনৈক ব্যক্তির কথা বললেন? নিলয়দা রাকিবের কথার প্রত্যুত্তরে কোনকিছু বলল না। তার মানে রাকিবের ধারণা ঠিক। অন্য সময় হলে রাকিবের এরকম উপস্থিত বুদ্ধির বহর দেখে নিলয়দা তার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলত সাবাশ। কিন্তু আজ খুব ফ্রাস্টেটেড থাকায় নিলয়দা খুব অফ মুডে আছে বলে মনে হচ্ছে। ব্যাপারটা খুব শর্টলি ব্যাখ্যা করল রাকিব। পশ্চিমবঙ্গের এক নাস্তিক তরুণ, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে নিয়ে কটুক্তি করার ফলে সাইবার আইনে গ্রেফতার হয়েছে পরশু দিন। এটাকে নিলয়দা বলছে বাকস্বাধীনতার উপর আঘাত। সাজিদ তার চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে বলল-এতে দোষের তাে কিছু দেখছি না দাদা। ছেলেটা দোষ করেছে, সে তার শাস্তি পাচ্ছে। What’s wrong?’ নিলয়দা মুখের রং পরিবর্তন করে বড় বড় চোখে সাজিদের দিকে তাকাল। বলল-একজন পঞ্চাশাের্ধ বুড়া লােক ৯ বছর বয়সী একটা মেয়েকে বিয়ে করলে দোষ নেই, তা নিয়ে কথা বললেই দোষ হয়ে যায়, না?’ সাজিদ বলল-কথা বললে তাে দোষ নেই দাদা, কিন্তু অশ্লীল ভাষায় কটুক্তি করাটা দোষের। একটি ধর্মের পবিত্র নবীকে নিয়ে এরকম খিস্তি করাটা মূল্যবােধ বিরােধী তাে বটেই, এটা সংবিধান বিরােধীও। -“গােষ্ঠী কিলাই তােমার এরকম মূল্যবােধ আর সংবিধানের। সাজিদ বুঝল নিলয়দা খুব ক্ষেপে আছে। তাকে সহজে বােঝানাে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। সাজিদ বলল-দাদা, মনে আছে তােমার? আমি তখন সবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তােমার সাথেও প্রথম পরিচয় হয় তখন। এক সন্ধ্যায় হুমায়ূন আহমেদের মেয়ের বয়সী শাওনকে বিয়ে করার ব্যাপারটা নিয়ে যখন আপত্তি উঠেছিল, তখন তুমি কি বলেছিলে? তুমি বলেছিলে যে, বিয়ে একটি বৈধ সামাজিক বন্ধন। যখন তাতে দুটি পক্ষের সম্মতি থাকে, তখন সেখানে বয়স, সামাজিক স্ট্যাটাস কোনােকিছুই ম্যাটার করে না। আমি হুমায়ুন আহমেদের বিয়ের ব্যাপারটি নিয়ে কনভিন্স। হুমায়ুন আহমেদ শরিয়া ও রাষ্ট্রীয় আইনসম্মত একটি বৈধ কাজ করেছেন। হুমায়ুন আহমেদের বেলায় যে-কথাগুলাে প্রযােজ্য, সে-কথাগুলাে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বেলায় কেন প্রযােজ্য হবে না? এটা ডাবল স্টান্ডার্ড নয়? নিলয়দা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর বলল-“তাই বলে বলতে চাচ্ছিস, ৯ বছরের অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে বিয়ে করা বৈধ হয়ে যাবে? সাজিদ হাসল। বলল-দাদা, আমি মােটেও তা বলছি না। আমি প্রথমত বােঝাতে চাইলাম যে, বিয়ে একটা সামাজিক বন্ধন। -তাে? সামাজিক বন্ধন ধরে রাখতে ৯ বছরের কিশােরী বিয়ে করতে হবে নাকি? সাজিদ উঠে দাঁড়াল। আমি জানি এখন সে লেকচার শুরু করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং আয়িশা (রাঃ)-এর বিয়ে নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ লেকচার দেওয়ার জন্য সে মেন্টালি প্রস্তুতি নিচ্ছে। যা ভাবলাম তাই। সাজিদ বলতে শুরু করল‘দাদা, প্রথমে বলে রাখি, যারাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর আয়িশা (রাঃ)-এর বিয়ে নিয়ে আপত্তি তুলে, তাদের প্রথম দাবি: মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নাকি যৌন লালসায় কাতর ছিলেন। সেজন্যে তিনি নাকি কিশােরী আয়িশা (রাঃ)-কে বিয়ে করেছিলেন।। তাদের এই দাবি যে কতটা বাতুলতা আর ভিত্তিহীন, তা ইতিহাস থেকে আমরা দেখব। আমরা জানি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেছিলেন। ২৫ বছর বয়সে হজরত খাদিজা (রাঃ)-কে। বলাবাহুল্য, যখন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ২৫ বছরের একজন টগবগে তরুণ, ঠিক সেই সময়ে তিনি বিয়ে করলেন চল্লিশাের্ধ একজন মহিলাকে, যিনি কিনা আবার একজন বিধবা ছিলেন। খাদিজা (রাঃ) যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোনাে বিয়ে করেননি। খাদিজা (রাঃ)-এর গর্ভেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অধিকাংশ সন্তান-সন্তনি জন্মগ্রহণ করেছিল। বলাে তাে দাদা, তােমাদের ভাষায় যিনি একজন। যৌনকাতর মানুষ, তিনি কেন তার পুরাে যৌবনকাল একজন বয়স্ক, বয়ােবৃদ্ধা মহিলার সাথে কাটিয়ে দিলেন?
‘তুমি হয়তাে বলবে, খাদিজা (রাঃ)-এর প্রচুর ধন-সম্পত্তি ছিল, পাছে এগুলাে হারানাের ভয়ে হয়তাে তিনি আর বিয়ে করেননি। তােমার জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি, এটা ইতিহাস সম্মত যে, সম্পদশালী খাদিজা (রাঃ) নিজেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন; মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম না। তার উপর , খাদিজা (রাঃ) নিজেই যেখানে একজন বিধবা ছিলেন, সেখানে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও যদি সেই অবস্থায় আরেকটি বিয়ে করতে চাইতেন, তাতে বাধা দেওয়ার অধিকার খাদিজা (রাঃ)-এর থাকার কথা নয়। তাহলে এখান থেকে আমরা কী বুঝলাম? আমরা বুঝলাম যে, মুহাম্মাদ (সাঃ) যৌনকাতরতা থেকে কিশােরী আয়িশা (রাঃ) কে বিয়ে করেননি। নিলয়দা সাজিদের কথার মাঝে প্রশ্ন করল-“তাহলে কিশােরী আয়েশাকে বিয়ে করার হেতু কি? সাজিদ বলল-‘Let me finish please’ । আয়িশা (রাঃ)-কে বিয়ে করার একটা হুকুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর কাছ থেকে পেয়েছিলেন। কারণ জ্ঞানে-গুণে আয়িশা (রাঃ) ছিলেন তৎকালীন আরব কন্যাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। তার সেই প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও বিচক্ষণতা যাতে পুরােপুরিভাবে ইসলামের কল্যাণার্থে ব্যবহার করা যায়, সেজন্য হয়তাে এই হুকুম।। স্পাের্টস চ্যানেল শাহরিয়ার এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল-“সাজিদ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা (রাঃ)-কে বিয়ে করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে হুকুমপ্রাপ্ত; এই কথার ভিত্তি কী? সাজিদ শাহরিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলল-নবীদের স্বপ্নও একপ্রকার ওহি, এটা জানিস তাে? -হ্যাঁ।
-বুখারির হাদিসে আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজরত আয়িশা (রাঃ)-কে একবার বললেন-“(হে আয়িশা)! আমি তােমাকে দুইবার স্বপ্নে দেখেছিলাম। একটি রেশমের উপরে কার যেন মুখচিহ্ন। আমি যখন রেশমের উপর থেকে আবরণ সরালাম, আমি দেখলাম সেটা তােমার মুখাবয়ব। তখন কেড একজন আমাকে বলল, “(হে মুহাম্মাদ) এটা তােমার স্ত্রী। আমি বললাম, যাদ এটা আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত হয়, তাহলে এটাই হবে। বুখারির এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, আয়িশা (রাঃ) যে ন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রী হবেন, সেটা আল্লাহর থেকেই হুকুমপ্রাপ্ত।
শাহরিয়ার আবার বলল-“কিন্তু তুই যে বললি, তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ইসলামের কল্যাণার্থে ব্যবহারের জন্যই এই হুকুম, তার দলিল কী? সাজিদ বলল-এটা তাে সর্বজনবিদিত সত্য কথা। সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর পর সবচেয়ে বেশি যিনি হাদিস মুখস্থ করেছিলেন, তিনি হজরত আয়িশা (রাঃ)। শুধু তাই নয়, আয়িশা (রাঃ)-এর ছিল কোরআনের অগাধ পাণ্ডিত্য ।। এমনকি বড় বড় সাহাবিরা পর্যন্ত তাঁর কাছে ফতােয়ার জন্য আসতেন। তাঁর ফিকহি জ্ঞান অনেক বেশি ছিল। আবু মূসা আল আশআরি (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন-এমন কখনাে হয়নি (ফিকহি বিষয়ে) আমরা কোনােকিছুর সমাধানের জন্য আয়িশা (রাঃ)-এর কাছে গেলাম কিন্তু সন্তোষজনক উত্তর পাইনি।’ অর্থাৎ, আয়িশা (রাঃ)-এর এই যে জ্ঞান, প্রজ্ঞা-এর জন্য তিনি আল্লাহ কর্তৃক উম্মুল মুমিনীন হিসেবে সিলেক্টেড হয়ে যান। ‘এছাড়াও, তৎকালীন আরবে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যেত। তখনকার প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। এটা ঠিক, যুগের সাথে সাথে সেটা পাল্টিয়েছে। এখন মেয়েদের অনেক চিন্তাঃ ক্যারিয়ার গড়াে, পড়াশােনা করাে, বিদেশ যাও, উচ্চ ডিগ্রির সার্টিফিকেট নাও।। ‘তখন আরবের মেয়েদের চাকরি করার দরকার হয়নি, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে পড়ার রীতিও তখন ছিল না। ঘরােয়া পরিবেশে তারা ধর্মীয় জ্ঞানার্জন করত। এর জন্য, কম বয়সেই তাদের বিয়ের রীতি ছিল। ‘তখন মেয়েদের কম বয়সেই যে বিয়ের রীতি ছিল, তা আয়িশা (রাঃ)-এর জীবনের আরেকটি ঘটনা থেকেই বােঝা যায়। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথে বিয়ের আগে আয়িশা (রাঃ)-এর আরেকজনের সাথে বিয়ে ঠিক হয়। তার নাম ছিল জুবায়ের। কিন্তু, আবু বকর (রাঃ) ইসলাম গ্রহণ করায় বিয়েটা ভেঙে যায়। এর থেকে কী প্রমাণ হয় না, তখন মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ের প্রচলন ছিল? তাছাড়া, তখনকার মক্কার কোনাে বিধর্মীরা। এই বিয়ে নিয়ে আপত্তি তােলেনি। তারাও জানত, এটা খুব স্বাভাবিক একটি ব্যাপার। অথচ ইসলাম আর নবীর বিরুদ্ধে ওদের যে-শত্রুতা ছিল, তাতে ওদেরই কিন্তু এটা নিয়ে আগে ঝাপিয়ে পড়ার কথা ছিল। নিলয়দা বলল-মুহাম্মদ তাে এসেছিলেন রীতি ভেঙে রীতি গড়ার জন্য। তিনি এই অদ্ভুত রীতি ভাঙলেন না কেন? সাজিদ বলল-“দাদা, ঠিক বলেছ। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম এসেছিলেন রীতি ভেঙে রীতি গড়ার জন্য। কিন্তু তিনি সেসব রীতি ভাঙার জন্য
এসেছিলেন, যা অনৈতিক, যেমন কন্যা শিশুকে জীবন্ত দাফন। তিনি আরবের সেসব কালচার পাল্টে দিয়েছেন, যা জাহেলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু, অল্প বয়সে বিয়ে সেরকম কোনাে ব্যাপার নয়। বিজ্ঞান আমাদের বলে, মেয়েরা পুরুষের চেয়ে দশগুণ তাড়াতাড়ি ম্যাচিউরড হয়। সেটা ফিজিক্যালি এবং মেন্টালি দুভাবেই। তাছাড়া, তখনকার আরবে কম বয়সে বিয়ে হওয়ার পরও মেয়েরা খুব নরমালিই সন্তান জন্ম দিত। এটা কোনাে সমস্যা ছিল না। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এটা চেঞ্জ করার তাে দরকার ছিলই না। যা দরকার ছিল, তা তিনি করেছেন। তুমি কি আশা করছ যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন তৎকালীন আরবদের উটের ব্যবসা তুলে দিয়ে তাদের শেয়ার ব্যবসা শেখালেন না, কেন তিনি খেজুরের ব্যবসা তুলে দিয়ে সেখানে চকোলেট আর রসমালাইয়ের ব্যবসার প্রচলন করলেন না? তুমি হয়তাে ভাবছ, তঙ্কালীন আরবের বালকদের উট চরানাে থেকে মুক্তি দিয়ে কেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের হাতে একটি করে কম্পিউটার এবং একটি করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিলেন না? সাজিদের কথা শুনে আমি, রাকিব আর শাহরিয়ার হা হা হা হা করে হাসতে লাগলাম। সাজিদ বলল-“মানুষ মাত্রই তাঁর সমাজের সুষ্ঠু নিয়মগুলাের সাথে মিলিয়ে চলতে বাধ্য। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না দাদা। তাছাড়া, এত অল্প বয়সে বিয়ে কেবল ১৪০০ বছর আগে ছিল তা নয়, শিল্পবিপ্লবের পরেও অনেক উন্নত দেশে বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়েদের সর্বনিম্ন বয়সসীমা ১০-এর নিচে ছিল।
তাছাড়া, ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পারি, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আরও ৫০০ বছর পরে, ইংল্যান্ডের রাজা জন ৪৪ বছর বয়সে ১২ বছর বয়সী রানী ইসাবেলাকে বিয়ে করেছিলেন। এ ব্যাপারগুলাে তখনকার সমাজে, যুগে খুব স্বাভাবিক ছিল, যেমন স্বাভাবিক সঙ্গম করে সন্তান জন্ম দেওয়া। তাছাড়া, উপমহাদেশেও যে খুব ছােট বয়সে বিয়ের একটি রীতি ছিল, তা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছােটগল্প হৈমন্তি থেকেই আমরা দেখতে পাই। লেখক সেখানে দেখিয়েছেন, তখনকার সময়ে ৮ থেকে ১১ বছরের মধ্যে মেয়েদের বিয়ে হতাে। হৈমন্তির বিয়ের স্বাভাবিক বয়স পেরিয়ে যাওয়ায়, অর্থাৎ, ১৭ হয়ে যাওয়ায় তার শাশুড়ি সেটা সবার কাছ থেকে লুকোতে চাইছিলেন। হৈমন্তিকেও মিথ্যে বলার জন্য শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এখান থেকেই বােঝা যায়, রবীন্দ্রনাথের সময়েও ৮ থেকে ১১ বছর বয়সে মেয়েদের বিয়ে ছিল একটি স্বাভাবিক ঘটনা। ‘সেই গল্পে আমরা ‘পণপ্রথা’র কুফল সম্পর্কে একটি আভাস পেলেও, কোথাও কিন্তু বিয়ের বয়স নিয়ে উচ্চবাক্য দেখিনি। বরং, হৈমন্তির বয়স বেশি হয়ে যাওয়াতেই

কিছুটা আপত্তি দেখা গেছে। এখান থেকে বুঝতে পারি, রবীন্দ্র আমলেও কম বয়সে বিয়ের একটি প্রচলন ভারতবর্ষেই মজুদ ছিল।’ সাজিদের এই লেকচারে নিলয়দা সন্তুষ্ট হলাে না। যতই ত্যানা প্যাঁচাও, একজন বয়ােবৃদ্ধ লােক একজন ৯ বছর বয়সী কিশােরীকে বিয়ে করেছে, এটাকে তুমি কোনােভাবেই ডিফেন্ড করতে পারাে না। সে প্রফেট হােক আর যাই-ই হােক’- নিলয়দা বলল। আমি ভাবলাম, এইবার সাজিদ পরাজিত হবে। হাল ছেড়ে দিয়ে হতাশ গলায় বলবে-নাহ! আর পারলাম না দাদা। কিন্তু না। সাজিদের মধ্যে আমি তেমন কিছুই দেখলাম না। সে খুব স্বাভাবিক। মুচকি একটি হাসির রেখা তার ঠোঁটে। সে আরেক কাপ চায়ের অর্ডার করল। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল-“দাদা, নতুন কমিটিতে পদ পেয়েছ শুনলাম। নিলয়দা বলল-“হুম, সাহিত্য সম্পাদক। সাজিদ বলল-“হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী সম্পর্কে নিশ্চয় অনেক কিছু জাননা। -হ্যাঁ। বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে জানি এবং সকলেরই জানা উচিত। -একদম ঠিক। বঙ্গবন্ধু আমাদের আইডল। নিলয়দা বলল-“শুধু কি আমাদের আইডল? বঙ্গবন্ধু পুরাে বাঙালি জাতির আইডল। “জ্বি, সেটাই দাদা। আমি হৃদয়ের গহীন থেকেই বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি। আচ্ছা দাদা, তুমি জাননা বঙ্গবন্ধুর স্ত্রীর নাম কী ছিল? নিলয়দা অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলল-“কি সব বলছিস তুই? জানব না কেন? বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা বেগম। সাজিদ বলল-“দাদা, তুমি জাননা, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসার জন্ম কোন সালে? নিলয়দা কিছুক্ষণ ভাবলেন। বললেন-“ভুলে গেছি রে! বিসিএসের জন্য যখন প্রিপারেশান নিচ্ছিলাম, তখন পড়েছিলাম।’ সাজিদ তার ফোন বের করে সেখান থেকে গুগলে ‘বেগম ফজিলাতুন্নেসা লিখে সার্চ দিল। রেজাল্ট দেখাল বেগম ফজিলাতুন্নেসার জন্ম ১৯৩০ সালে। সাজিদ সেটা নিলয়দাকে দেখাল।
নিলয়দা বলল-“হুম, মনে পড়েছে। কিন্তু তাতে কী হয়েছে? হঠাৎ এই ব্যাপারে। চলে গেলি কেন? সাজিদ বলল-“দাদা, তুমি জানাে, বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কত সালে বিয়ে হয়? নিলয়দা ‘না’-সূচক মাথা নাড়ল। সাজিদ আবার উইকি থেকে দেখাল। বঙ্গবন্ধুর সাথে বঙ্গমাতার বিয়ে হয় ১৯৩৮ সালে । সাজিদ বলল-“দাদা, ১৯৩৮ থেকে ১৯৩০ বাদ দিলে কত থাকে? নিলয়দা বলল-‘৮…’ সাজিদ বলল-“জুি দাদা, একদম ঠিক বলেছ। ১৯৩৮ থেকে ১৯৩০ বাদ দিলে। থাকে ৮। ঠিক ৮ বছর বয়সের বেগম ফজিলাতুন্নেসার সাথে বঙ্গবন্ধুর বিয়ে হয়। আচ্ছা দাদা, আমি কি এটাকে বাল্যবিবাহ বলতে পারব? এই শরীয়াসম্মত বিয়ের জন্য কি বঙ্গবন্ধুকে ব্লেম করা নৈতিকভাবে ঠিক হবে? নাহ । মােটেই ঠিক হবে । না। ‘এখন বলাে তাে, বিংশ শতাব্দীর বঙ্গবন্ধু যেটা পেরেছেন, ১৪০০ বছর আগের মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন পারবে না? কেন তাকে ধর্ষক, যৌনকাতর, যৌন লিলু ডাকা হবে? তাঁকে এবং আয়িশা (রাঃ)-কে নিয়ে অশ্লীল কথা লিখে কেউ আইনের হাতে ধরা পড়লে তাঁর জন্য কেন তােমার মন কাঁদবে? আকাশ থেকে পড়লে যা হয়, নিলয়দার অবস্থাও তখন তেমন। নিলয়দা এরকম একটা জবাব পাবেন তা হয়তাে কল্পনাও করেনি। চায়ের বিল দেওয়ার জন্য সাজিদ এগিয়ে গেল। গম্ভীর, রাজনীতিপ্রিয় রাকিব। এসে বলল-“দোস্ত, পরানটা ঠাণ্ডা করে দিয়েছিস একদম। বিলটা আমাকে দিতে দে, প্লিজ? সাজিদ মুচকি হাসল।
রেফারেন্স :
Jala-Ul Afhaam by Imam Ibnul Qaiyum Sahih Al bukhari, Volume 5, Book 58, Hadith 234 ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, শেখ মুজিবুর রহমান