স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল?

ল্যাম্পপােস্টের অস্পষ্ট আলােয় একজন বয়স্ক লােকের ছায়ামূর্তি আমাদের দষ্টিগােচর হলাে। গায়ে মােটা একটি শাল জড়াননা। পৌষের শীত। লােকটা হালকা কাঁপছেও। আমরা খুলনা থেকে ফিরছিলাম। আমি আর সাজিদ। স্টেশন মাস্টারের রুমের পাশের একটি বেঞ্চিতে লােকটা আঁটসাঁট হয়ে বসে আছে। স্টেশনে এরকম কত লােকই তাে বসে থাকে। তাই সেদিকে আমার বিশেষ কোনাে কৌতুহল ছিল না। কিন্তু সাজিদকে দেখলাম সেদিকে এগিয়ে গেল । লােকটার কাছে গিয়েই সাজিদ ধপাস করে বসে পড়ল। আমি দূর থেকে খেয়াল করলাম, লােকটার সাথে সাজিদ হেসে হেসে কথাও বলছে। আশ্চর্য! খুলনার স্টেশন। এখানে সাজিদের পরিচিত লােক কোথা থেকে এল? তাছাড়া লােকটিকে দেখে বিশেষ কেউ বলেও মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনাে বাদাম বিক্রেতা। বাদাম বিক্রি শেষে প্রতিদিন ঐ জায়গায় বসেই হয়তাে রাত কাটিয়ে দেয়। আমাদের রাতের ট্রেন। এখন বাজে রাত দুটো। এই সময়ে সাজিদের সাথে কারও দেখা করার কথা থাকলে তা তাে আমি জানতামই। অদ্ভুত! আমি আরেকটু এগিয়ে গেলাম। একটু অগ্রসর হতেই দেখলাম, ভদ্রলােকের হাতে একটি বইও আছে। দূর থেকে আমি বুঝতে পারিনি। সাজিদ আমাকে ইশারা দিয়ে ডাকল। গৈলাম। লােকটার চেহারাটা বেশ চেনাচেনা লাগছে, কিন্তু সঠিক মনে করতে পারছি না। সাজিদ বলল-এইখানে বস। ইনি হচ্ছেন হুমায়ুন স্যার। হুমায়ুন স্যার? এই নামের কোনাে স্যারকে তাে আমি চিনি না। সাজিদকে জিজ্ঞেস করতে যাবাে যে কোন হুমায়ুন স্যার, অমনি সাজিদ আবার বলল-হুমায়ুন রুবায়েত আজাদকে চিনিস না? ইনি আর কি। এরপর সে লােকটার দিকে ফিরে বলল-“স্যার, এ হলাে আমার বন্ধু, আরিফ। লােকটা আমার দিকে তাকাল না। সাজিদের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠোঁটে মৃদু হাসি। আমার তখনাে ঘাের কাটছেই না। কী হচ্ছে এসব? আমিও ধপাস করে সাজিদের পাশে বসে গেলাম।

সাজিদ আর হুমায়ুন রুবায়েত আজাদ নামের লােকটার মধ্যে আলাপ হচ্ছে। এমনভাবে কথা বলছে, যেন তারা পরস্পর পরস্পরকে অনেক আগে থেকেই চেনে। লােকটা সাজিদকে বলছে-‘তােকে কত করে বলেছি, আমার লেখা আমার অবিশ্বাস’ বইটা ভালােমতাে পড়তে। পড়েছিলি? সাজিদ বলল-“হ্যাঁ স্যার। পড়েছি তাে। -তাহলে আবার আস্তিক হয়ে গেলি কেন? নিশ্চয় কোনাে তাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস? কে সে? নাম বল? পেছনে যে আছে-কী জানি নাম? -“আরিফ… -“হ্যাঁ, এই তাদড়ের ফাঁদে পড়েছিস বুঝি? দাঁড়া, তাকে আমি মজা দেখাচ্ছি…’ এই বলে লােকটা বসা থেকে উঠতে গেল। সাজিদ জোরে বলে উঠল-“না না স্যার। ও কিছু জানে না। -তাহলে? -আসলে স্যার, বলতে সংকোচ বােধ করলেও সত্য এটাই যে, নাস্তিকতার উপর আপনি যেসব লজিক দেখিয়েছেন, সেগুলাে এতটাই দুর্বল যে, নাস্তিকতার উপর আমি বেশি দিন ঈমান রাখতে পারিনি। এটুকু বলে সাজিদ মাথা নিচু করে ফেলল। লােকটার চেহারাটা মুহূর্তেই রুক্ষ ভাব ধারণ করল। বলল-“তার মানে বলতে চাইছিস, তুই এখন আমার চেয়েও বড় পণ্ডিত হয়ে গেছিস? আমার চেয়েও বেশি পড়ে ফেলেছিস? বেশি বুঝে ফেলেছিস? সাজিদ তখনও মাথা নিচু করে আছে।
লােকটা বলল-যাক গে ! একটা সিগারেট খাবাে। ম্যাচ নেই। তাের কাছে আছে? -“জি স্যার।’, এই বলে সাজিদ ব্যাগ খুলে একটি ম্যাচ বের করে লােকটার হাতে দিল। সাজিদ সিগারেট খায় না। তবে প্রয়ােজনীয় জিনিসগুলাে তার ব্যাগে থাকে সবসময়। লােকটা সিগারেট ধরাল। কয়েকটা জোরে জোরে টান দিয়ে ফুস করে একমুখ ধোঁয়া ছাড়ল। ধোঁয়াগুলাে মুহূর্তেই কুণ্ডলি আকারে স্টেশন মাস্টারের ঘরের রেলিং বেয়ে উঠে যেতে লাগল। আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি। লােকটার কাশি উঠে গেল। কাশতে কাশতে লােকটা বসা থাকে উঠে পড়ল। এই মুহূর্তে উনার সিগারেট খাওয়ার আর ইচ্ছে নেই সম্ভবত। লােকটা সিগারে”ে

করােটিকে নিচে ফেলে পা দিয়ে একটি ঘষা দিল। অমনি সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরােটি থেঁতলে গেল। সাজিদের দিকে ফিরে লােকটা বলল-“তাহলে এখন বিশ্বাস করিস যে স্রষ্টা বলে কেউ আছে? সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। -স্রষ্টা এই বিশ্বলােক, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন বলে বিশ্বাস করিস তাে? আবারও সাজিদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। এবার লােকটা একটা অদ্ভুত রকম হাসি দিল। এই হাসি এতটাই বিদঘুটে ছিল যে, তাতে আমার গা ছমছম করে উঠল। লােকটি বলল-“তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? এই প্রশ্নটি করে লােকটি আবার সেই বিদঘুটে হাসিটা হাসল। সাজিদ বলল-“স্যার, বাই ডেফিনিশন, স্রষ্টার কোনাে সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে।
যদি বলি ‘ক’ সৃষ্টিকর্তাকে সৃষ্টি করেছে, তৎক্ষণাৎ আবার প্রশ্ন উঠবে, তাহলে ক’ এর সৃষ্টিকর্তা কে? তখন যদি বলি ‘ক’ এর সৃষ্টিকর্তা ‘খ’, তাহলে আবার প্রশ্ন উঠবে ‘খ’ এর সৃষ্টিকর্তা কে? এভাবে চলতেই থাকবে। কোনাে সমাধানে যাওয়া যাবে না।’ লােকটি বলল-“সমাধান আছে। -কী সেটা? -মেনে নেওয়া যে, স্রষ্টা নাই, ব্যস!’, এটুকু বলে লােকটি আবার হাসি দিল। হা হা হা হা। সাজিদ আপত্তি জানাল। বলল-“আপনি ভুল, স্যার। লােকটি চোখ কপালে তুলে বলল-“কী? আমি? আমি ভুল? -জ্বি স্যার।’ -তাহলে বল দেখি, স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করল? উত্তর দে। দেখি কত বড় জ্ঞানের জাহাজ হয়েছিস তুই। আমি বুঝতে পারলাম এই লােক সাজিদকে যুক্তির গাঁড়াকলে ফেলার চেষ্টা করছে। সাজিদ বলল-স্যার, গত শতাব্দীতেও বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, এই মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে আছে। মানে এটার কোনাে শুরু নেই। তারা আরও ভাবত, এটার কোননা শেষও নেই। তাই তারা বলতঃ যেহেতু এটার শুরু-শেষ কিছুই নেই, সুতরাং এটি জন্য একটা সষ্টিকর্তারও দরকার নেই। কিন্তু থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির সূত্রগুলাে আবিষ্কার হওয়ার পর এই ধারণা পুরােপুরি ভ্যানিশ তাে হয়ই, সাজা পদার্থবিজ্ঞানেও ঘটে যায় একটা বিপ্লব। থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির দ্বিতীয় সূত্র বলছে-এই মহাবিশ্ব ক্রমাগত ও নিরবচ্ছিন্ন উত্তাপ অস্তিত্ব থেকে পর্যায়ক্রমে উত্তাপহীন অস্তিত্বের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই সূত্রকে উল্টো থেকে প্রয়ােগ কখনােই সম্ভব নয়। অর্থাৎ কম উত্তাপ অস্তিত্ব থেকে এটাকে বেশি উত্তাপ অস্তিতের দিকে নিয়ে যাওয়া আদৌ সম্ভব নয়। এই ধারণা থেকে প্রমাণ হয়, মহাবিশ্ব চিরন্তন নয়। এটা অনন্তকাল ধরে এভাবে নেই। এটার একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে। থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র আরও বলে, এভাবে চলতে চলতে একসময় মহাবিশ্বের সকল শক্তি নিঃশেষ হয়ে যাবে। আর মহাবিশ্ব ধ্বংস হবে। লােকটি বলল-“উফ! আসছেন বৈজ্ঞানিক লম্পু। সহজ করে বল ব্যাটা।। সাজিদ বলল-“স্যার, একটা গরম কফির কাপ টেবিলে রাখা হলে, সেটা সময়ের সাথে আস্তে আস্তে তাপ হারাতে হারাতে ঠাণ্ডা হতেই থাকবে। কিন্তু সেটা টেবিলে রাখার পর যে-পরিমাণ গরম ছিল, সময়ের সাথে সাথে সেটা আরও বেশি গরম হয়ে উঠবে-এটা অসম্ভব। এটা কেবল ঠাণ্ডাই হতে থাকবে। একটা পর্যায়ে গিয়ে দেখা যাবে, কফির কাপটা সমস্ত তাপ হারিয়ে একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। এটাই হচ্ছে থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র। -“হুম, তাে?’ -এর থেকে প্রমাণ হয়, মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। মহাবিশ্বের যে একটা শুরু আছে-তারও প্রমাণ বিজ্ঞানীরা পেয়েছে। মহাবিশ্ব সৃষ্টিতত্ত্বের উপর এ যাবৎ যতগুলাে থিওরি বিজ্ঞানীমহলে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযােগ্য, প্রমাণের দিক থেকে সবচেয়ে শক্তিশালী থিওরি হলাে-বিগ ব্যাং থিওরি। বিগ ব্যাং থিওরি বলছেঃ মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে একটি বিস্ফোরণের ফলে। তাহলে স্যার, এটা এখন নিশ্চিত যে, মহাবিশ্বের একটি শুরু আছে। লােকটা হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
সাজিদ আবার বলতে শুরু করল-‘স্যার, আমরা সহজ সমীকরণ পদ্ধতিতে দেখব স্রষ্টাকে সৃষ্টির প্রয়ােজন আছে কিনা, মানে স্রষ্টার সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে কিনা। ‘সকল সৃষ্টির একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে এবং শেষ আছে; ধরি, এটা সমীকরণ ১। ‘মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি; এটা

সমীকরণ ২।
‘এখন সমীকরণ ১ আর ২ থেকে পাইসকল সৃষ্টির শুরু এবং শেষ আছে। মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি, তাই এটারও একটা শুরু এবং শেষ আছে। তাহলে, আমরা দেখলামঃ উপরের দুটি শর্ত পরস্পর মিলে গেল এবং তাতে থার্মোডাইনামিক্সের তাপ ও গতির সূত্রের কোনাে ব্যাঘাত ঘটে নি। -হু -“আমার তৃতীয় সমীকরণ হচ্ছেঃ স্রষ্টা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। ‘তাহলে খেয়াল করুন, আমার প্রথম শর্তের সাথে কিন্তু তৃতীয় শর্ত ম্যাচ হচ্ছে
। ‘আমার প্রথম শর্ত ছিল: সকল সৃষ্টির শুরু আর শেষ আছে। কিন্তু তৃতীয় শর্তে কথা বলছি স্রষ্টা নিয়ে। তিনি সৃষ্টি নন, তিনি স্রষ্টা। তাই এখানে প্রথম শর্ত খাটে
। সাথে, তাপ ও গতির সূত্রটিও এখানে আর খাটছে না। তার মানে, স্রষ্টার শুরুও নেই, শেষও নেই। অর্থাৎ, তাকে নতুন করে সৃষ্টিরও প্রয়ােজন নেই। তার মানে স্রষ্টার আরেকজন স্রষ্টা থাকারও প্রয়ােজন নেই। তিনি অনাদি, অনন্ত। এতটুকু বলে সাজিদ থামল। হুমায়ুন আজাদ নামের লােকটি কপালের ভাঁজ দীর্ঘ করে বললেন-কী ভংচং বুঝলি এগুলাে? কীসব সমীকরণ-টমীকরণ? এসব কি? সােজা সাপ্টা বল। আমাকে অঙ্ক শিখাচ্ছিস? খধংি ড়ভ ঈধঁংধষরঃু সম্পর্কে ধারণা আছে? খধংি ড়ভ ঈধঁংধষরঃু মতে, সবকিছুর পেছনে একটা ঈধঁংব বা কারণ থাকে। সেই সূত্র মতে, স্রষ্টার পেছনেও একটা কারণ থাকতে হবে। সাজিদ বলল-“স্যার, উত্তেজিত হবেন না প্লিজ। আমি আপনাকে অঙ্ক শিখাতে যাব কোন সাহসে? আমি শুধু আমার মতাে ব্যাপারটি ব্যাখ্যা করেছি। -“কছু করেছিস তুই। খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু দিয়ে ব্যাখ্যা কর।’, লােকটা উচ্চস্বরে বলল। -স্যার, খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু বলবৎ হয় তখনই, যখন থেকে ঞরসব, ঝঢ়ধপব এবং গধঃঃবৎ জন্ম লাভ করে, ঠিক না? কারণ আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটিও স্বীকার করে যেঃ ঞরসব জিনিসটা নিজেই ঝঢ়ধপব আর গধঃঃবৎ-এর সাথে কানেক্টেড । ঈধঁংব-এর ধারণা তখনই আসবে, যখন ঞরসব, ঝঢ়ধপব, গধঃঃবৎ এই ব্যাপারগুলাে তৈরি হবে। তাহলে যিনিই এই ঃরসব, ঝঢ়ধপব, গধঃঃবৎ-এর স্রষ্টা, তাকে কী করে আমরা ঞরসব-ঝঢ়ধপবগধঃঃবৎ-এর বাটখারাতে বসিয়ে খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু দিয়ে বিচার করব, স্যার? এটা তাে লজিকবিরুদ্ধ, বিজ্ঞানবিরুদ্ধ।

লােকটা চুপ করে আছে। কিছু হয়তাে বলতে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই আবার সাজিদ বলল-“স্যার, আপনি খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু এর যে-সংজ্ঞা দিয়েছেন, সেটা ভুল। লােকটা আবার রেগে গেল। রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল-এই ছােকড়া! আমি ভুল বলেছি মানে কী? তুই কি বলতে চাস আমি বিজ্ঞান বুঝি না? সাজিদ বলল-না না স্যার, একদম তা বলিনি। আমার ভুল হয়েছে। আসলে, বলা উচিত ছিল যে, খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু-এর সংজ্ঞা বলতে গিয়ে আপনি ছােট্ট একটা জিনিস মিস করেছেন। লােকটার চেহারা এবার একটু স্বাভাবিক হলাে। বলল-“কী মিস করেছি? -“আপনি বলেছেন, খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু মতে, সবকিছুরই একটি ঈধঁংব থাকে। আসলে এটা স্যার সেরকম নয়। খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু হচ্ছে: ঊাবৎুঃযরহম যিরপয যধং ধ নবমরহহরহম যধং ধ পধঁংব; অর্থাৎ, এমন সবকিছু, যেগুলাের একটা নির্দিষ্ট শুরু আছে, কেবল তাদেরই ঈধঁংব থাকে। স্রষ্টার কোনাে শুরু নেই, তাই স্রষ্টাকে খধংি ঙভ ঈধঁংধষরঃু দিয়ে মাপাটা যুক্তি এবং বিজ্ঞানবিরুদ্ধ। লােকটার মুখ কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেল। বলল- তুই কি ভেবেছিস, এরকম ভারী ভারী কিছু শব্দ ব্যবহার করে কথা বললেই আমি তাের যুক্তি মেনে নেব? অসম্ভব। সাজিদ এবার মুচকি হাসল। হেসে বলল-“স্যার, আপনার হাতে একটি বই দেখছি। ওটা কী বই? -“এটা আমার লেখা বই: আমার অবিশ্বাস। -স্যার, ওটা আমাকে দেবেন একটু? -এই নে, ধর। সাজিদ বইটা হাতে নিয়ে উল্টাল। উল্টাতে উল্টাতে বলল-“স্যার, এই বইয়ের কোন লাইনে আপনি আছেন? লােকটা ভ্ৰ কুঁচকে বলল-“মানে?” -বলছি, এই বইয়ের কোন অধ্যায়ের, কোন পৃষ্ঠায়, কোন লাইনে আপনি আছেন? -তুই অদ্ভুত কথা বলছিস। আমি বইয়ে থাকব কেন? -কেনাে থাকবেন না? আপনি এর স্রষ্টা না? -হ্যাঁ। -“এই বইটা কালি আর কাগজ দিয়ে তৈরি। আপনিও কি কালি আর কাগজ দিয়ে তৈরি স্যার?

আই স্টপিডিটি টাইপ প্রশ্ন। আমি এই বইয়ের স্রষ্টা। এই বই তৈরির সংজ্ঞা দিয়ে কী আমাকে ব্যাখ্যা করা যাবে?
জদ আবার হেসে দিল। বলল-“না স্যার। এই বই তৈরির যে-সংজ্ঞা, সেসুজ্ঞা দিয়ে মােটেও আপনাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ঠিক সেভাবে, এই মহাবিশ্ব যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁকেও তাঁর সৃষ্টির ঞরসব-ঝঢ়ধপব-গধঃঃবৎ-ঈধঁংব এসব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না। আপনি কালি, কলম বা কাগজের তৈরি নন, তার ঊর্ধ্বে। কিন্তু আপনি ঞরসবঝঢ়ধপব-গধঃঃবৎ-ঈধঁংব-এর উর্ধ্বে নন। আপনাকে এগুলাে দিয়ে ব্যাখ্যা করাই যায়। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা হচ্ছেন এমন একজন, যিনি নিজেই ঞরসব-ঝঢ়ধপবগধঃঃবৎ-ঈধঁংব-এর সৃষ্টিকর্তা। তাই তাঁকে ঞরসব-ঝঢ়ধপব-গধঃঃবৎ-ঈধঁংব দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। অর্থাৎ তিনি এসবের ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ তার কোনাে ঞরসব-ঝঢ়ধপব-গধঃঃবৎ-ঈধঁংব নেই। অর্থাৎ তার কোনাে শুরু-শেষ নেই। অর্থাৎ তার কোনাে সৃষ্টিকর্তা নেই। লােকটা উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল-“ভালাে ব্রেইনওয়াশড ! ভালাে ব্রেইনওয়াশড! আমরা কি এই তরুণ প্রজন্ম চেয়েছিলাম? হায়! আমরা কি এই তরুণ প্রজন্ম চেয়েছিলাম? এটা বলতে বলতে লােকটা হাঁটা ধরল। দেখতে দেখতেই উনি স্টেশনে মানুষের ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভাঙার পর আমি কিছুক্ষণ ঝিম মেরে ছিলাম। ঘড়িতে সময় দেখলাম-রাত দেড়টা বাজে। সাজিদের বিছানার দিকে তাকালাম। দেখলাম, সে বিছানায় শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে। আমি উঠে তার কাছে গেলাম। গিয়ে দেখলাম সে যে বইটা পড়ছে, সেটার নাম-“আমার অবিশ্বাস। বইয়ের লেখক হুমায়ুন আজাদ। সাজিদ বই থেকে মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণায় একটি অদ্ভুত হাসি। আমি বিরাট একটা শক খেলাম। নাহ! এটা হতে পারে না। স্বপ্নের উপর কারও হাত নেই; আমি বিড়বিড় করে বলতে লাগলাম।