বসন্ত তুমি ফিরে যাও

বসন্ত তুমি ফিরে যাও,
রুদ্ধ দুয়ারে আমার করো না করাঘাত,
দুস্তর দুর্মর মরু-প্রান্তর এ অন্তর আমার,
শীত কুয়াশা’য় আচ্ছন্ন এখনও;
থেকে থেকে উঠছে তাতে দুর্দান্ত দুর্মুখ মরু-ঝড়।
বসন্ত তুমি ফিরে যাও,
এখানে ফুটবে না ফুল পাতা-ঝরা গাছে,
ডাকবে না কোকিল কুহু কুহু স্বরে;
তৃষ্ণার্ত চাতক ডাকছে কেবল আর্তস্বরে-
জল দাও জল দাও এক ফোটা জল!
ক্ষুধায় কাতর বয়োবৃদ্ধ জননী আমার,
গুমরে গুমরে কাঁদছে জীর্ণ দীর্ণ ঘরের ভিতর!
যুবতী বোনটা লজ্জা ঢেকেছে কোনমতে
শতচ্ছিন্ন একখন্ড মাত্র মলিন বস্ত্রে;
উদ্ধত দীর্ঘশ্বাস রেখেছে চেপে,
অক্ষম বেকার দাদা’র দুর্দশা দেখে।
এমতাবস্থায় কি করে হায়! সুশীল বসন্ত হে,
তোমার আহবানে যৌবন বনে.
প্রণয়লীলায় মত্ত হওয়া যায়!
বসন্ত তুমি ফিরে যাও,
ক্ষমা করে দাও এ বুভুক্ষু যুবককে,
সমস্ত স্বপ্ন যার মরে গেছে অকালে;
অবাঞ্ছিত বেকারত্বের অকৃত্রিম চাপে।
……………………………………………

মরণাপন্ন মন

মুমূর্ষু মুহুর্তেও মরণাপন্ন মন তোমার কথাই ভাবছে,
বিগত দিন মাস বছরের প্রতিটি ক্ষণ যেভাবে কেটেছে
তোমার কল্যাণ কামনা করে করে;
আজ মৃত্যুযাত্রার প্রাক্কালেও মরণাপন্ন এ নিবেদিত মন,
হারিয়ে যাওয়া কারণকে স্মরণ করে তোমার কথাই
ভাবছে।
আমাকে সূর্য ভেবে সূর্যমুখী সেজেছিলে স্বেচ্ছায়,
সূর্যের প্রসংশায় ছিলে পঞ্চমুখী ফুল!
আহা! কি অপরূপ ঐশ্বর্যে মেলে দিয়েছিলে আপন
পাঁপড়ি দল!
অতল অনুরাগে মুগ্ধ আমিও ঢেলে দিয়েছিলাম আমার
অন্তরস্থ আলো তাপ সব।
আজ অচেনা নির্বাসনে যাওয়ার প্রাক-মুহুর্তে
মনে পড়ে যাচ্ছে স্মরণকালের রোমাঞ্চকর
অযুত অদ্ভুত কিছু কথপোকথন,
গোপন ইথারে যা ভেসে বেড়াচ্ছে আজও প্রতিক্ষণ।
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে মেনে নিয়ে আজ
ডুবে যাচ্ছি আমি,
তুমি হাসিমুখে সুখে থাকো তোমার নতুন পৃথিবীর বুকে,
এই শেষ কামনায় বিদায় সাথী বিদায়।
……………………………………………

কেন ডাকলে আমাকে

উদ্গত অশ্রুর মত উদ্ভূত প্রণয়ের বুদ্বুদ ওঠে
হৃদয়ের তটে,
তুমি প্রণয়িনী উল্লাসে নাচো প্রণয়-বিলাসে।
তোমার আকাশে ভাসে সাদা মেঘের ভেলা,
আমার আকাশে দিবসে নিশিতে অন্ধকারের খেলা;
কেন জাগালে অবেলায় আমাকে নিবিড় নিদ্রা হতে?
বেশ তো ছিলাম ভালো সমস্ত আলো নিভিয়ে ছিলাম
জীবনের ঘরে,
কষ্টের কারাগারে নষ্ট শয্যায় ডুবে ছিলাম একা
নিশ্চিত নিদ্রায়;
কেন তুমি তোমার প্রেমের পুলকে,
দ্যুলোকের যত দুঃখ ভোলালে,
আঁধারাচ্ছন্ন মনের সুষুপ্ত প্রেমকে
প্রদীপ্ত প্রদীপরূপে জ্বালালে?
তোমার হাতের মত সুকোমল আর সু-মসৃণ
নয় তো আমার হাত,
তোমার জাত এর মত উন্নত উদ্ভিন্ন
নয় তো আমার জাত;
তুমি যে দূর আকাশের চাঁদ।
এতকিছু জেনেও সুরঞ্জনা তুমি,
নিঃস্ব নিরঞ্জনের বুকে কেন
সুখের স্বাক্ষর আঁকতে গেলে!
কেন ডাকলে আমাকে
তোমার অমলিন অন্তরে অভয় আশ্বাসে।★
৪ঠা জুলাই ২০২০
……………………………………………

জীবনের গান যতক্ষণ

জীবনের গান যতক্ষণ যতদিন চলে
দাদরা কাহারবা ঝুমুর তালে,
ধীমা কিংবা দ্রুত লয়ে,
যতক্ষণ বহে দেহে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস;
ততদিন ততক্ষণ স্বদেশ তুমি জননী আমার
একান্ত আপন।
দিনে দিনে প্রতিক্ষণে ঋদ্ধ হয়েছে এ দেহমন
তোমারই যতনে-তোমারই অমৃতময় স্তন্যপানে।
জীবনের গোধূলি বেলায় সমস্ত খেলায় ইতি টেনে,
তোমারই কোমলকোলে নেবো তো আশ্রয় নিশ্চয়
কোন একদিন কোন এক সময়।
তার আগে যেন এ দেহমনে তোমারই প্রেম জাগে
প্রতিক্ষণে-প্রতি পলে পলে।
তোমারই প্রেমে আকুল হৃদয় সর্বদাই যেন মগ্ন থাকে
তোমারই কল্যাণ কামনায়;
তোমারই গানে তোমারই ধ্যানে।
সুখে থাকো জননী আমার যুগে যুগে শত শতাব্দী ধরে,
শত সহস্র কবি সাহিত্যিক শিল্পী সাধক প্রসবিতে;
অক্ষয় অমর হয়ে বেঁচে থাকো তুমি
জননী জন্মভূমি স্বদেশ আমার,
জগৎ জননীরূপে।
২৯,০৬,২০২০
……………………………………………

স্মৃতির কঙ্কাল

দূর-বিরহে বিম্বিত মন অকারণে বিচরণ করে
মরে যাওয়া দিনগুলোর বাঁকে বাঁকে;
মৃত অতীতের কবরগুলো খুঁড়ে খুঁড়ে,
টেনে টেনে বের করে আনে স্মৃতির কঙ্কাল।
কঙ্কালের পূর্বরূপ ভেবে ভেবে বিরূপ প্রক্রিয়ায়
এঁকে যায় প্রিয় অপ্রিয় কিছু ছবি জ্ঞাতে অজ্ঞাতে
মনের ক্যানভাসে।
কিছু কিছু ফুল ফুটে ওঠে পুনরায় মরে যাওয়া গাছে,
কিছু কিছু ভুল হুল ফোঁটায় ফের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষতে।
দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘনদী বয়ে চলে নিরবধি!
স্মৃতির কঙ্কাল টেনে প্রেম কি আর বাঁচে ?
এভাবেই চলে যায় চলন্ত প্রহর,
দিন যায়-মাস যায় স্মৃতিরা হাসায়-স্মৃতিরা কাঁদায়;
অতীত বর্তমান নিয়ে হাতে দিনে রাতে সকলেই
হেসে কেঁদে এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের পথে।
২৮,০৬,২০১৬
……………………………………………

পুষ্পবতী

জীবনখাতার প্রতিটি পাতায়,
আজকে তোমার নামটি লেখা হল,
আজন্ম লালিত-অলিখিত স্বপ্নগুলো সফল হয়ে গেল।
জীবন গড়িয়ে যায়,
যেতে যেতে পথের ধারে তোমার মত অসূর্যস্পর্শ্যা কোন
পুষ্পবতীর যদি সাক্ষাত পায়,
জীবনের কেন্দ্রস্থিত প্রণয়াভিলাসী মনটা তখন, অতি-উৎসাহী এক ভ্রমর হয়ে যায়।
আমিও তোমাকে পেলাম আমার চলার পথে,
তুমি ফুটে আছো সুরভিত পুষ্পরূপে,
বসন্ত বাতাসে দুলছে তোমার কোমল পাঁপড়ি-দল;
দেখে দেখে হতবিহ্বল মন!
স্বত:স্ফুর্ত সুখে আমি শিহরিত হলাম!
তোমার রূপ-ঐশ্বর্য্যে মুগ্ধ হয়ে আবেগবশত যেন মধুখোর এক ভ্রমর সেজে গেলাম;
আমি শুদ্ধ হলাম তোমাকে ছুঁয়ে;
আমি সুখী হলাম তোমাকে পেয়ে।
পুষ্পবতী,
তোমার স্নিগ্ধ-সুবাসে আমার হৃদয় ভরালাম।
……………………………………………

থেমে গেছে সময়ের কেকা

ফিরে গিয়েছ তুমি আমার দুয়ার হতে,
ভগ্ন হৃদয়ের দুর্দশা দেখে।
রাগে দুঃখে ক্ষোভে ছুঁড়ে ফেলেছ দূরে
সযত্নে গাঁথা বকুলমালা।
বুঝে নিয়েছ আপন জ্ঞানে,
তোমার প্রণয়ী হবার বিন্দুমাত্র যোগ্যতাও
অবশিষ্ট নেই আমার।
শুধুমাত্র রবাহূত হয়ে এসেছিলে ছুটে,
আশা’র মুকুল হয়তো ফুটেছিল মনে,
বসন্তবনে শুনছিলে সময়ের কেকা।
একা থাকার ক্ষণকে বিদায় জানাতে,
ছুটে এসেছিলে সময়ের সাথীকে পেতে,
আবেগের আগুনে পোড়াতে চেয়েছিলে আমাকে।
নিজের আগুনে নিজেই পুড়ে গেলে শেষে।
দেখলে যখন ভাবাবেগহীন আমি অদ্বৈত পুরুষ,
নিরাসক্ত মনে নির্জনে একা বসে বসে শুধু
প্রত্যাখানের মন্ত্র জপছি;
ভাবছি মহাপ্রস্থানের কথা।
ঝরে গেল তোমার আশার মুকুল,
উঠলো ঝড় বসন্ত বনে;
ধ্যানে জ্ঞানে যাকে মনে-প্রাণে বেসেছিলে ভালো,
দুর্দিনে তার জ্বালাতে পারলে না যখন প্রণত আলো।
ফিরে গেলে তুমি শূণ্যহাতে ছুঁড়ে ফেললে আশাহত মন;
বসন্তক্ষণকে পোড়ালে হতাশার আগুনে।
থেমে গেছে আমার সময়ের কেকা,
একা একা বসে ভাবছি কেবল মহাপ্রস্থানের কথা।
২২ জুন ২০১৮
……………………………………………

বললো সে কানে কানে

চৈত্রের রৌদ্রের কাছে পেতেছি দুহাত,
দাও কিছু বাসন্তি সুবাস
চৈত্র হেসে বলে,
ফাগুনের আগুনে তো পুড়েছ প্রান
আবার কেন গাইতে চাও পুরনো দিনের গান।
আমার খরতাপে কাতরস্বরে ডাকছে চাতক
ফটিকজল ফটিকজল,
একফোটা জলও দিতে পারি নি তাকে।
বৈশাখী মেঘের ফাঁকে খুঁজলাম কিছু সুখ,
বিমুখ বৈশাখ রেগে মেগে দিল ঘূর্ণিঝড়!
আশা’র ঘর ভেঙ্গে চুরমার হল তাতে।
জ্যৈষ্ঠ্য আষাঢ়ে পাতলাম দুহাত
তোমরা কিছু ভালবাসা দাও,
সমস্ত আশা নস্যাৎ করে ক্ষিপ্ত আষাঢ় সিক্ত করলো প্রবল বর্ষনে,
শ্রাবণের আকাশ কাঁদলো ঝর ঝর,
ডুবলো আশা ভালবাসা-ভাসলো সুখের ঘর
শ্রাবণের প্লাবনে।
ভাদ্র আশ্বিনের শান্ত নদী বয়ে চলে নিরবধি,
শুধালাম তাকে-তোমার কাছে কি প্রেমসুখ আছে?
হাসলো সে মিটি মিটি-বললো রাগতঃস্বরে,
বুড়ো হাবড়া বলে একি!
ধারে তার কাশবন ডেকে বলে এদিকে শোন,
সেদিন তোর গেছে চলে-যা পাস নি পঁচিশে
পাবি না তা পঞ্চাশে।
কার্ত্তিক অঘ্রানে সোনালী ধানের শীষে-
হাত বুলালাম আবেশে,
সোনালী ধান-শোনালো না প্রণয়ের গান!
মান-অভিমান বুকে চেপে,
পৌষ পেরিয়ে পৌঁছলাম শেষে মাঘের শীতে,
হিতে হলো বিপরীত-জড়িয়ে ধরলো মাঘের শীত,
বলল সে কানে কানে-আর পাবিনে ফাগুনের দেখা, মটির নীচে এখন ঘুমাবি একা নিরবে।★
……………………………………………

বাবা দিবস

বাবার প্রশস্ত হৃদয়ের ছায়ায় সুখে সুখে বেড়ে উঠছিল
শান্ত সৌম্য কোমল হৃদয়টা আমার;
সুখের সূর্যোদয় দেখছিলাম বাবার সুদৃঢ় তর্জনীর নির্দেশে।
বাবার সাথে মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে বাবা বলেছিল,
তুমি একদিন তালগাছের মত অনেক বড় হবে
আর দূর্ব্বাদলের মত দীর্ঘজীবি হবে।
বাবার আশীর্বাদ ফলে গেছে অক্ষরে অক্ষরে,
আমি বাড়তে বাড়তে পঞ্চাশ পেরিয়ে
নিসঙ্গ এক তালগাছ হয়ে গেছি;
অদ্যাবধি কেউ’ই ছুঁয়ে দেখলো না আমাকে;
কেউ বললো না ভালবাসি।
সমাজের পায়ের চাপে পিষ্ট হওয়ার জন্য-
দীর্ঘায়ূপ্রাপ্ত দূর্ব্বাঘাস হয়ে বেঁচেই আছি এখনও
পঞ্চাশোর্ধ বয়সী অকর্মার ঢেঁকি।
কানা যম এখনও চিনে না আমাকে,
জানে না আমার মৌলিক ঠিকানা;
অথচ কি আশ্চর্য! গ্রাম্য এক তরুণের করুণ আর্তনাদ শোনার আকাঙ্ক্ষায় অকস্মাৎ সে কেড়ে নিয়েছিল
অতিপ্রিয় স্নেহময় বাবাকে আমার!
একচোখা কানা যম এখনও কেন যেন নিয়ে যাচ্ছে না
আমাকে-অতিপ্রিয় আমার স্নেহময় বাবার কাছে।
১৬ জুন২০২০১৯ রোববার
……………………………………………

তামাটে হৃদয়ভূমি

বৃষ্টি স্নাত আকাশের মত স্বচ্ছসুন্দর সদ্যস্নাতা,
পিঠে ছড়ানো কেশদাম হতে টুপ টাপ জল ঝরছে
বৃষ্টিতে ভেজা নারকেল আর খেজুর পাতার মত।
আমাকে হতবাক করে সামনে দাঁড়ালে
যেন জলসিক্ত অনাঘ্রাতা শ্বেত শতদল।
প্রতিটি পাঁপড়িতে দলে উপদলে বৃন্ত বৃতিতে,
তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম অতীতের অবশিষ্টাংশ।
নেই নেই-কিছুই বাকী নেই সেখানে আর,
পরিবর্তে ঝলমল ঝলমল করে হাসছে সুখের রঙিন জল।
অতঃপর অনেক কষ্টে দীর্ঘশ্বাস চাপলাম,
তোমাকে মাপলাম সূক্ষ্ম দৃষ্টির নিক্তিতে।
একটুও বিচলিত হলে না তুমি আমার বিরহদগ্ধ
বিমূঢ় আর নীলকন্ঠ রূপ দেখে।
বর্ষার পরে শরৎ এসেছে ভূবনে তোমার,
সবুজে সবুজে ভরপুর চারদিক।
আকাশে ভাসছে ধবল মেঘের ভেলা,
বাতাসে মিশেছে ফোঁটা শিউলির সিন্ধ সুবাস;
সূর্য্যোদয় হয় প্রত্যহ ঘাসের ডগায় জমে থাকা
শিশির বিন্দুতে।
আর আমি! অনেক আগেই হারিয়েছি ফাগুন,
স্মৃতির আগুন আর গ্রীষ্মের দহনে তামাটে হয়েছে আমার হৃদয়ভূমি,
শত শ্রাবণেও ভিজবে না- তা;
দ্বিতীয় অঙ্কুরোদ্গমের কোনই সম্ভাবনা নেই সেখানে।
……………………………………………

একটি কোমল পালক

কেন যেন মনে হচ্ছে আজ তুমি আসবে,
অযাচিত ভালবাসায় ভেজাতে চাইবে আমাকে।
কারও ভালবাসা’র বৃষ্টিতে ভিজবো না আমি,
খাবো না কখনো কারও করুণার কণা।
অচেনা অন্ধকারে হাঁটছি একাকীই,
চেনা কারও মুখাপেক্ষী হয়ে থাকবো না আর;
রাখবো না কোন ঋণভার,
চুকিয়ে দেবো সব লেনা-দেনা।
জীবনের জল চঞ্চল অতি,
কখন কোথায় গাড়াবে কে-ই বা জানে;
অকারণে কেন ভাসাতে চাও,
তোমার-আবেগের প্লাবনে!
যাও ফিরে যাও ওগো পরিযায়ী পাখি,
আপন সুখের সন্ধানে।
একটি মাত্র কোমল পালক রেখে যাও এখানে-
স্মৃতির প্রাঙ্গণে।
চেম্বার-৬ জুন ২০১৮ ইং
……………………………………………

স্মৃতির ক্রন্দন শুনি

স্বাক্ষর রেখা’রা হয়তো মুছে গেছে দেহাংশ হতে,
স্মৃতিরেখা’রা নিশ্চয় জেগে আছে আজও
মন্থিত মনের-মণিকোটরে।
স্বাক্ষরতা দিবসের প্রথম প্রহরে
লজ্জায় শঙ্কায় আড়ষ্ট ছিলে;
চুপি চুপি বলেছিলে অস্ফুট স্বরে
না জানি কি হয়-না জানি কি হয়!
দ্বিতীয় প্রহরে প্রখর প্রতাপে
মধ্যাহ্ন সূর্য্যের হাসি হেসেছিলে।
বলেছিলে অতিশয় তৃপ্তস্বরে,
আর নেই ভয়-আর নেই ভয়;
এই মধুময় ক্ষণ যেন চিরঅক্ষয় রয়।
তৃতীয় চতুর্থ প্রহরে তুমিই সেরা খেলোয়ার হলে,
আমাকে হারিয়ে দিলে
দৈহিক ক্রীড়ার শতরূপ কৌশলে।
পঞ্চম প্রহরে অকস্মাৎ আসা ঘূর্ণঝড়ে,
দুজন’ই আহত হলাম!
প্রবল ঘূর্ণিবায়ুর তোড়ে ছিটকে পড়লাম দুজন’ই
বিপরীত দুই প্রান্তরে।
আজ আর দেখা নেই কথা নেই,
স্বাক্ষর দানের প্রহর নেই,
শুধুই স্মৃতির ক্রন্দন শুনি অষ্টপ্রহরে।★
১৮,০৫,২০১৭
……………………………………………

একটি চুম্বন

একটি চুম্বন চুয়ান্ন বছর পুষে রাখছি কপালে আমার,
শুকতারা’র মত জ্বলছে জ্বলছে-জ্বলছেই,
অতি শৈশবে মৃত্যুশয্যায় পরম মমতায়
এঁকে দিয়েছিল যা জননী আমার।
স্মৃতির প্রতীকরূপে প্রাপ্ত একটি চুম্বন,
চুয়ান্ন বছর ধরে সবসময় মনে করিয়ে দেয়,
শিশিরে ভেজা ঝরা শিউলির মত
মৃত মায়ের স্নিগ্ধ কোমল স্নেহাদ্র মুখ।
একান্ত প্রিয় অমূল্য আপন একটি ছবি;
অদ্যাবধি বেঁধে রেখেছি মনের মন্দিরে।
শত দুঃখের নীরে ডুবে ডুবে ডুব সাঁতারে,
হাতরিয়ে হাতরিয়ে-খুঁজে ফিরি সুখের সৈকত।
সর্বনাশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে বসত আমার,
বেদনার বারিধারা ভেজায় বারোমাস!
তবুও আশীর্বাদরূপ শেষ চুম্বনের জোরে,
বৈরী বাতাসের মাঝেও আমরণ একা-
টিকে র’বো মা জীবন সংগ্রামে।
……………………………………………

বুকের গভীরে ডুঁকরে কাঁদে

প্রণয় পুকুরের জলে,
প্রত্যহ’ই তোমার প্রতিবিম্ব ফুঁটে উঠে
সুদৃশ্য শতদল রূপে।
দেবোপম দেহসৌষ্ঠব তোমার
সাক্ষাতে আসে পথে ঘাটে মাঠে।
চেয়ে চেয়ে দেখি ধর্মের খাঁচায় বন্দিনী পাখি,
আপাদমস্তকে আবৃত বোরখা’র আড়াল হতে।
সুদর্শন তুমি-সুদর্শনা আমি,
তোমাকেই ভালবাসি চুপি চুপি:
জানি না তুমি চেনো কিনা আমাকে,
কোনদিন তো প্রত্যক্ষ করো নি রূপ-ঐশ্বর্য আমার।
অমি তো প্রতিনিয়ত দেখি’ই তোমাকে,
পথে ঘাটে মাঠে বোরখা’র আড়াল হতে।
কারনে অকারনে ধর্মান্ধরা ঢিল ছোঁড়ে
প্রণয় পুকুরের জলে,
হারিয়ে যায় দৃশ্যমান প্রতিবিম্ব তোমার
কম্পমান তরঙ্গের ফলে।
সমাজের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে,
মন ছুটে যায় তোমার কাছে,
ফাগুনের আগুন জ্বলে ধিকি ধিকি বুকের গভীরে;
শত সহস্র ইচ্ছা সত্ত্বেও পারি না নেভাতে
সে বয়সী আগুন তোমার সংস্রবে এসে!
তুমি তো পারো না দেখতে কোনদিন’ই,
আমি’ই শুধু দেখি চুপি চুপি,
আপাদমস্তকে আবৃত বোরখা’র আড়াল হতে।
বুকের গভীরে ডুঁকরে কাঁদে প্রণয় আমার!
মাথা ঠুকে ঠুকে মরে সংবিধিবদ্ধ সামাজিক পাথরে।★
……………………………………………

কেমন আছো চৈতালী

এখন তুমি কেমন আছো চৈতালী?
চৈত্রের রৌদ্র মাখানো দেহবল্লরী নিয়ে
নিশ্চয় এখনও ঝলমলে আছো।
বিগত অতীত ভুলে গিয়ে হয়তোবা এখন
উজ্জ্বল বর্তমানে নাচছো।
আমি তো সেই অন্ধকারেই আছি,
যে অন্ধকার ঢেলে দিয়ে না বলে চলে গিয়েছো
নতুন আলোতে।
তোমার কোলে হয়তো এখন দু’একটা শিশুচাঁদ দোলে,
আমার শূণ্যকোল কাঁদে ব্যর্থতার হাহাকারে।
নিঃছিদ্র অন্ধকারে বসে দিবানিশি,
এখন আমি অতীতের’ই ছবি আঁকি ছন্দ-অলংকারে।
চোখের জলের হয় না কোন রং,
অন্ধকারের মাঝে পাইনি খুঁজে আলো,
ভালো আছো জানলেই হয়তো ভালো থাকবো আমি।
দীর্ঘশ্বাসের ছোঁয়া পায় না তো আর কেউ,
বুকের মাঝে উথাল পাথাল নাচে নীল সাগরের ঢেউ।
তোমাকেই ভেবে ভেবে এখন আমি ছন্নছাড়া,
উদাসীন এক কবি।
অন্ধকারের গায়ে ছন্দ-অলংকারে আঁকছি বসে
অষ্টপ্রহরে কেবল হারানো দিনের ছবি।
……………………………………………

নীলজল

কল্পনার আকাশে তুমি পূর্ণিমার চাঁদ ছিলে,
তোমাকে ছোঁয়ার সাধ্য ছিল না কারো,
আমিও বাড়াইনি কখনোই কামনার হাত,
তুমিই বরং নুঁয়ে এসে ছুঁয়ে দিলে,
বাঁধভাঙ্গা ঢেউ বুকে নিয়ে উত্তাল তরঙ্গিনী হলে;
কঠোর সংযমের বাঁধ আমার এক পলকেই ভেঙ্গে দিলে।
পাথর প্রতিজ্ঞা আমার গলে গলে হয়ে গেল জল।
হায় কপাল! সচল নদী তুমি হলে না স্থির,
নাচতে নাচতে চলে গেলে সাগর সঙ্গমে।
এখন আর যায় না চেনা তোমাকে!
চাঁদ নও-নদী নও-নও প্রেয়সী আমার!
এখন তুমি লবনাক্ত স্বাদের অপেয়-অপাঙক্তেয় নীলজল-সজল চোখে চেয়ে থাকো কেবল
সুনীল আকাশের দিকে,
বিগত অতীতে যেখানে সুষমাময়ী চাঁদ ছিলে।
১৮-০৪-২০১৯ বৃহষ্পতিবার।