‘সৎ সাহসকে অনেকে জ্যাঠামি এবং হটকারিতা বলে মনে করে থাকেন, কিন্তু আমি মনে করি সৎ সাহস হল অনেক দূরবর্তী সম্ভাবনা যথাযথভাবে দেখতে পারার ক্ষমতা।’ আহমদ ছফার একথাগুলোর মর্মবাণী আমাদের কানে পৌঁছায়নি। বাস্তবায়নতো দূরের কথা। অথবা আহমদ ছফা কেন বাংলাদেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের আক্রমণ করে বললেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা যা বলতেন, শুনলে বাংলাদেশ স্বাধীন হত না। এখন যা বলছেন, শুনলে বাংলাদেশের সমাজ কাঠামোর আমূল পরিবর্তন হবে না।’
একথার নিগূঢ় অর্থ বুঝতে খুব বড় পণ্ডিত হবার প্রয়োজন নাই। কেবল চোখ খোলা রেখে বিবেকের চাবি দিয়ে সমাজ ব্যবস্থাকে বিশ্লেষণ করলেই সব পরিষ্কার হবে। কেননা, ‘সুবিধাবাদই বুদ্ধিজীবীদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।’ ঠিক একথা ধরে বলা যায়, বাংলাদেশে কোন প্রগতিবাদীর অস্থিত্ব নাই। সবাই প্রতিক্রিয়াশীল। তথাকথিত প্রগতিবাদীরা মুক্তমনা সেজে অন্যের স্বাধীনতাতে হস্তক্ষেপ করে। আর প্রতিক্রিয়াশীলরা পরিবর্তনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সমাজের অগ্রযাত্রাকে ব্যহত ও স্বাধীনতার অন্তরায় হয়ে থাকে। সুতরাং দু’টি দলই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।
প্রগতির মূল কথাই হলো শিক্ষার প্রকৃত আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে সামনে এগিয়ে চলা। তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি মানবিক সমাজ তৈরি এবং অন্যের স্বাধীনতার রাস্তাকে প্রশস্ত করা। তারা খেয়াল রাখেন তাদের কোন কাজ বিশেষ গোষ্ঠী স্বার্থের পক্ষে বা বিপক্ষে কাজ করবেন না এবং রাষ্ট্রের ঐক্য তৈরিতে ভূমিকা পালন করবেন। কিন্তু উল্টো পথে হাটলে প্রতিক্রিয়াবাদীদের চেয়ে আলাদা কোন কিছু নয়।
নারীবাদীরা কি প্রগতিশীল? বেশ জটিল এর উত্তর। কেননা বাংলাদেশে নারীবাদের নামে যে ধরণের মধ্যবিত্ত শ্রেণির এলিটিজম এবং পশ্চিমা বা কোলকাতার চিন্তা ও রুচির দাসত্ব লক্ষ্য করা যায় তা আমাদের শিক্ষা সংস্কৃতি সর্বোপরি চিন্তাশীলতার জন্য ক্ষতিকর। বাংলাদেশে জেন্ডার ইসলামোফোবিয়া বেশ নতুন। এর মাধ্যমে লিঙ্গভিত্কি সমস্যাকে বিদ্বেষে পরিণত করার কাজটি চলছে নিপুণভাবে। ফলশ্রুতিতে, প্রতিক্রিয়াবাদীরা সুযোগ পেয়ে যান নিজেদের এজেন্ডাকে বাস্তবায়নের জন্য।
সম্প্রতি ঢাকার পল্টনের একটি মাঠে বোরকা পরিহিত এক মা সন্তানের সাথে ক্রিকেট খেলেন দিবালোকে এবং তার ছবি ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। শুরু বিতর্ক। বিতর্কের শিরমনি প্রগতিবাদ ও প্রতিক্রিয়াবাদ। পাশাপাশি বিভিন্ন মিডিয়ার প্রশ্নবিদ্ধ সংবাদ। তিনি মাঠে এলেন এবং ক্রিকেট খেললেন এটার চেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ালো সংস্কৃতি, ধর্ম ও মূল্যবোধ।
সহজ কথা হলো এদেশের কতজন মানুষ নিজের সংস্কতি সম্পর্কে জানে? সংস্কৃতির বিবর্তণ কবে এবং কিভাবে হলো? যে সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বেড়ে উঠছে সেটা আধো বাংলাদেশের সংস্কৃতি কিনা? এ প্রশ্নের পূর্বে জানতে হবে সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে পাকিস্তান বিভক্ত হয়েছে একাত্তরে। ঠিক সাতচল্লিশে পশ্চিম বঙ্গের সাথে আমাদের থাকা হলো না এই সংস্কৃতির জন্যই।
ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যেও যে অন্তমিল রয়েছে তাও বুঝার দরকার। ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার সাথে ধর্ম ও সংস্কৃতি চলমান। উল্লেখ্য এয়োদশ শতাব্দীতে ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও শাসন ব্যবস্থার সুযোগে ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজী দিল্লী মসনদে বসেন। কয়েকশত বছরে ভারতের তথা বাংলার শিক্ষা, সংস্কুতি ও ধর্ম পাল্টে যায় দ্রুত গতিতে। আবার পলাশী পরাজের পর বাংলার এবং সিপাহী আন্দোলনে পরাজয়ের পর পুরো ভারতের ধর্ম, সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থার রূপ পুরাপুরি পরিবর্তিত হয়। এসবের পিছনে ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক কর্মকা-কে উপেক্ষা করার সুযোগ নাই।
ইংরেজদের কুট চাল বাদ দিলে সহস্র বছর এদেশে হিন্দু-মুসলিম নিজস্ব স্বাধীনতা ভোগ করে ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করেছে। দু’একটি বিষয় বাদ দিলে হিন্দু ও মুসলামনদের ভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেও পারস্পরিক সৌহাদ্যের কোন অভাব দেখা দেয়নি। কিন্তু সাতচল্লিশ পরবর্তী সময়ে ঐক্যে ফাটল তৈরি হলো। এর পিছনেও এই প্রগতিবাদ ও প্রতিক্রিয়াবাদ কাজ করেছে এবং বর্তমানেও এ ধারা বহমান আপন মহিমায়। কারো মতে নারীরা অনেক অগ্রসর হয়েছে। সত্যি কি হয়েছে?
ঝর্ণা আক্তারের মাঠে খেলা নিয়ে দু’পক্ষের যুক্তির কি কোন ভিত্তি আছে? প্রগতিবাদীরা এটিকে আফগান সংস্কৃতির সাথে দেখেছেন। কিন্তু আফগানে জবরদস্তি আছে। এখানে কি তা ছিল? বাংলার সংস্কৃতিতে কখন বোরকা নিষিদ্ধ ছিল? অথবা এ ফুটবল বা ক্রিকেট দু’টাইতো পশ্চিমা সংস্কৃতির অংশ। অথবা শর্ট, পেন্ট বা তথাকথিত স্কার্ট কি বাংলা সংস্কৃতির ধারক বা বাহক?
আবার প্রতিক্রিয়াবাদীরা ধর্ম গেল, গেল বলে যে মায়া কান্না করছেন তার ভিত্তি কী? ধর্মে কি নারীকে ঘরের বাহিরে যেতে নিষেধ করেছে? মা খাদিজা রা: ব্যবসায়ী ছিলেন। আবার মদিনার জীবনে নারী শিক্ষা বিস্তারে মহানবীর যে উদ্যোগ তা কি ভুলে গেছে প্রতিক্রিয়াবাদীরা? সহীহ মুসলিম শরীফে এসেছে মদিনার আনসারী নারীদের শিক্ষার প্রশংসা করে বললেন, ‘আনসারী নারীরা কতই না উত্তম! লজ্জা কখনোই তাদের ধর্মের বিষয়ে জ্ঞানান্বেষণে বিরত রাখতে পারেনি।’
কেবল এখানেই শেষ নয়। একবার নারীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল সা. আপনি নারীদের তুলনায় পুরুষদের বেশি প্রধান্য দেন। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে তাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলাপ করার জন্য নির্দিষ্ট দিন ঠিক করলেন এবং নানা বিষয়ে নির্দেশনা দিতেন। এমন অসংখ্য উদারহরণ রয়েছে। এছাড়াও যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো, রাসুল সা.-এর পরিবারের সব খবর আমরা এখনো জানি। কেন এবং কিভাবে? রক্ষণশীলতারও সীমা আছে কিন্তু আপনাদের বাঁকা মন্তব্যের কোন সীমা নাই।
যে প্রশ্নটি কেউ করেননি, প্রযুক্তির যুগে এবং পুঁজিবাদী আগ্রাসনের কারণে যখন সবাই খেলাধুলা বিমূখ তখন সব কিছু ঠিক রেখে একজন মা যে সাহস নিয়ে সন্তানকে ভালবাসার¯স্নেহের বন্ধনে প্রকৃত মানুষ করার চেষ্টা করছেন তখন আপনি আমি কি করছি! এ সন্তান হয়তো মোবাইল বা কম্পিউটার নিয়ে সময় পার করতো বা অন্য কোন অসৎ ছেলের সাথে মিশে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করতে পারতো। কিন্তু মায়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনিই প্রকৃত সাহসী যিনি কারো অনুকম্পা না নিয়ে সমাজের সংকীর্ণতাকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নারীর অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার হাল ধরেছেন।
কিন্তু তথাকথিত প্রগতিবাদীরা ও প্রতিক্রিয়াবাদীরা একই আচরণ করে নিজেদের কেবল জাতই চিনালেন, সমাজের কোন উপকার করেননি।