এ হাত এক পথ

আমাকে ভেবেছো কি প্রিয়?
ভাবনায় না আসি যদি বাস স্টপেজের এই কর্কশ সিট গুলি কিভাবে তপস্যার তবে তপবন?
তোমারে দেখায়ে বাড়ায়েছি আমার এ কোমল হাত, এ পথ, জলঙ্গী নদী।
আমারে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভেসে যাওয়া চুম্বন-নাও বেয়ে
ফিরে যাও তুমি ওই কিভাবে আমার পরান-পরিযায়ী?

এ পথ বেয়ে কত কাছে আসে ধোঁয়াশা জড়ানো ব্যথিত সন্ধ্যার ফালি।
কত কালি নিয়ে আসিছে রাত্রি মাটি হবে ব’লে, ফুটাবে ব’লে স্বপ্নিল ফুল।
আরও গাঢ় হও তমসা-জল। গুলে যাই শৈত্যপ্রবাহে।

বিন্দু বিন্দু তখনই হব উড়ন্ত, ভোরের কুয়াশা ফুল
আমার ই স্পর্শ তৃষা জড়ায়ে আমি ঝরিবো
এ নয় কি তোমার উঠোন গাল?
ভাবিছো কি আমারে বুকের গোপনে
জানালা হয়েছে কি সকলি তোমার পাঁজর?
তাই কী এ ছুটন্ত গাড়ি দলে দলে ভীরু প্রজাপতি
উড়িছে পাতাল উপর?

আমারে দেখায়ে সকলি তোমার কাজ
হয়েছে কি গো সমুদ্র সুখে দুলে ওঠা ঝাউবন?
আমারে দেখায়ে তোমার ও দৃষ্টি
বলো নি গো বলো
ভীষ্মের জীবন উৎসর্গের অখন্ড প্রতিশ্রুতি?
…………………………………………..

মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ দান

এ ঠোঁট। যুবতী কুন্তী।
অন্ধকারে ডুবে আছে এ ঠোঁট ফসলের ক্ষেত এক।
তুমি সূর্য কিরণ থেকে বেড়িয়ে আসা রোদ্দুর। তুমি দিন।
আমাদের সঙ্গম হোক সালোকসংশ্লেষ।

চুম্বন পূর্বে তুমি জড়িয়ে ধরেছো পৃথিবী।
এ প্রবল টান। মহাকর্ষণ।
বিগত ফলিয়ে আমি কলঙ্কিত রাত্রি। তুমি দিন।
এ চুম্বন হোক এক গোধূলি। অবশ্যম্ভাবী।

যদি আমি আকাশ হই।
তোমার বুক আর বিস্তৃত মৃত্তিকা।
আমাদের স্পর্শ তবে হোক অনন্ত দিগন্তীকা।

জ্যোৎস্না চেয়ে চেয়ে তুমি চাঁদের মুখ থেকে
খুলে দিলে নিকষ অমাবস্যা। ওড়না।
ও চাঁদ খোলা বুক। কোজাগরী। ভরা পূর্ণিমা।
এ পার্বণে কাঁপা কাঁপা তারা ছুঁয়ে বলেছিলে হে মৃদু আলোরাশি ভালোবাসি।

তোমার ও গভীর চোখে সমুদ্র উত্তাল।
দৃষ্টি বেয়ে নেমে এসেছিল একে একে উন্মাদ ঊর্মি।
কচুরিপানা ছুঁয়ে থাকা আমি
মোহনা কিনেছি। এক নদী।

তোমার জোয়ার স্রোতে মিশে যায় কুলকুল সকল আমার উলু ধ্বনি।
এ বুক জেনেছি কর্ণের।
তুমি , কবজ কুন্ডলী। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো জীবন।
জন্মদাত্রীর সকল জরায়ু… কুন্তীর।
এ জীবন চেয়ে নেওয়া মৃত্যুই হোক তবে শ্রেষ্ঠ দান।
ওই কুন্তী একটি চিতারও জঠর।
…………………………………………..

গাছ ভালোবাসে শীত

বাস স্টপেজে তোমার জন্য বেশ খানিকটা শূন্যতা রেখে গেলাম ,
যদিও সন্ধ্যে ভ‘রে ফ্যাকাশে আজান। ব্যঞ্জনবর্ণের মত ক্লান্ত মানুষের চোখে জ্বলছিল ব্যস্ততা, পা বেয়ে উড়ে যাচ্ছিল শেষবেলার কপতের উড়ান।

আর কিছুক্ষণ পর তুমি ছুঁয়ে যাবে নিশ্চিত এ শূন্য উপহার
ভ‘রে যাবে বুক দীর্ঘশ্বাসে।
কেননা এ এক অমোঘ টান এই পথের মত, ঘুড়ির সূতোর মত গন্তব্য উড়িয়ে চলে যাচ্ছি দৃষ্টির অন্ত:পুরে।
যেখানে এ মন পেড়িয়ে সমুদ্র সৈকত।
অসংখ্য ঢেউ-ফুলে ঘ্রাণ নিয়েছি আমি, গভীর সুবাসে।

আর কিছুক্ষণ পর তুমি বুঝে যাবে নিশ্চিত।
এ ছিল এক কোণ।
যে কোণে মহাকাশ থেকে নেমে আসে শীত।
রুক্ষ পাতায় তার মহাকাশ-সঙ্গম।

শীত বলে- এই নাও গাছ ছুঁয়েছি তোমার ঠোঁট। মেলে দাও তোমার বলিষ্ঠ বাহু।
সবুজ। সবুজ। সবুজ। যৌবন। মাঠ প্রান্তর।

মন তুলে সে বুকের উপর ধরিল, তাহাই ফুটিল রঙিন ফুল।
এ গাড়ির হর্ণ, আলো যত— শূন্যতা ছুঁয়ে আকাশের ঝিকিমিকি তারা।
বাস স্টপেজে আমি শুধু শূন্যতা রেখে আসি নি গো।
রেখেছি নিহারীকা আলো ও।
…………………………………………..

মৃত্যু-দূষণ

আকাশীদের সঙ্গম বন্ধ করতে পারলে বন্ধ হবে মৃত্যু যোগ।
কারণ এখানে স্তনবৃন্ত ধরে থাকে যে ঠোঁট…
তার শরীর জুড়ে একটি গাছের কান্ড।
মেরুদণ্ডের মত ডালপাতাহীন প্রশাখায় খেজুর রসের উৎস্রোত।
মৃত্যু চিরে তাই এখানে জন্মাতে হয়।
বন্ধ হলে সঙ্গম… বন্ধ হবে জন্ম।

মহাকাশে রতিলীলাময় শূন্য জেন্ডারে আমার পর্যবেক্ষণ আছে
কারণ ওদের বিশৃঙ্খল যৌনচারণে এখানের মৃত্যু এত সস্তা।
মহিলা-শূন্যের গোলাকাকৃতি ওই ডিম্বাণু আমি টিউবেকটমি করে দিতে চাই।
পুরুষ-শূন্যে ভ’রে যে রূপান্তর কীট।
সে কীট আমি কেটে হলুদ ব্যাগে ভ’রে ভ্যাটে ফেলে দেব।
গরু, ছাগল, কুকুরের দল… দলা দলা শূন্য গিলে…
দেহ থেকে মুক্ত তখনই মৃত্যু-দূষণ।
হে বুভুক্ষু পেট… তুমি সত্যিকারের শূন্য দাও।
…………………………………………..

অস্পৃশ্য

সেন্ট ফ্রানসিসের মমি দেখে ফিরছিলাম আর মোমবাতির আলোয় জ্বলে উঠছিল গোয়ার সৈকত।
ক্যাশিনোয় অজস্র কল্পনা ভাসছিল, তোমার হাতে ছিল চান্স আর আমার হাতে ভবিষ্যৎ।

দেখছিলাম নাচছিল ঢেউয়ে ঢেউয়ে প্রমোদ ইচ্ছেগুলো।
শনশন হাওয়ায় আমার বয়স লুকাচ্ছিল আর হোভারক্রাপ্টে সাঁতরাচ্ছিল কিছুক্ষণ।
উত্তাল ঢেউ উজ্জাপন শেষে সন্ধ্যা নামছিল পশ্চিম ঘাট পর্বতমালায়,প্যারশ্যুটের তাবুতে উড়াল কিছু।
তবু তোমাকে হারিয়ে দিতে পারিনি কাজুবনের পাহাড়ী রাস্তায়।

তোমাকে রেখে আসতে পারিনি জিজাসের ক্রুশে যেখানে একটি গাঁদা ফুলের মালা আর মোমবাতি জ্বালিয়েছিলাম।
ভেবেছি ছুঁড়ে ফেলে দেব তাই সন্তর্পণে সাগরপাড়ে এসে কুড়িয়েছি একটি ঝিনুক।
একটা অতীত ভরেছি তাতে যে বিকেল কেনা ছিল আমাদের,
যে রাস্তায় ছড়ানো ছিল আমাদের যত ফিজুল কথা।

আমি পারি নি তবু, শেষ মিনিটগুলো ইচ্ছার কেমন দবদব ছিল, দাউদাউ ছিল।
ফেলে দিলে আর কিই বা রইল জীবন, তারচেয়ে… বরং
ভরিয়ে দেব তোমার নামে থুথুর উপর থুতু।
…………………………………………..

বছর-খিদে

আর কিছুটা ক্লান্তি… বালিশে যদি না রাখি
আমার কেমন ‘ঘুম-বমি’ পায়।
পেট উগরে বেড়িয়ে আসবে যেন সেই ঠোঁট,
তোমার মুখে ঢলে পড়া… সেই পড়ন্ত দুপুর।

কতদিন ধ’রে চেষ্টা করে যাচ্ছি কোনো একটি দুপাপড়ির গোলাপ ফুটলেই…
কোনো একটি মাছরাঙা মাছ ভাসলেই, এ ইচ্ছে আমার উড়িয়ে দেব ঈগলের মত।

এ আশায় কত কত বিকেল পুতেছি নদীতীরে…
ধান-রোয়া উৎসব দেখেছি কত, বাতাসী সঙ্গীত শুনেছি তাদের, উপকার রঙ মাখা কাদাটে হাসিগুলো যেন শরীরের বিলে শাপলার ফুল।

অথচ আজ তাদেরই দিকে তাকালে মনে হয়
তুমি ওদেরও ভিতরে আয়ু নিয়ে খেলা করো,
আর ছলনা কথায় থামিয়ে দাও অপেক্ষার আশা।
সেজন্য হয়ত আজও দুঠোঁটের গোলাপ ফোঁটে নি কোথাও।

বলো, সেই তো সামান্য গঙ্গাজলে ফেলে দেওয়া এতটুকু আপশোস,
একটু বিষাদ
আর গায়ত্রীমন্ত্রের প্রতিটি অক্ষরের সাথে জুড়ে যাওয়া এত গুলো নির্বোধ বছর।
কেন যে আমার এ নৈবেদ্য সহ্য হয় না,
আমি জানি না।

বছর বছর ঘুমোতে চাই আমি…
না ঘুমোলে, বালিশে না শুইয়ে রাখলে আমার সমস্ত ইচ্ছে
ঈশ্বরীর মত নামধারী আসলে অসুরী আমির
সেই ‘বছর’ খিদে পায়।
…………………………………………..

ভালোবাসতে শেখো পাথর

এবার একটি পুংকেশর দিয়ে বোনা বিছানা চাই।
ফুল হব।
এতদিন মেধা জ্বালিয়ে হেঁটেছি আমি অনেক পথ।
এবার রূপ জ্বালিয়ে নিভিয়ে দেব তোমার সমস্ত রাতের নিশুতি লন্ঠন।

যদি দেখো নিবিড় আমায়, দেখবে বিছানায় ঘুমোতে জানে চাঁদ।
জোনাকিরা গলার হার, হাতের বাজু, নিতম্ব কানের অলংকার।
তুমি রাত রঙের হয়ে ছেপে থেকো।

ঈষাণ কোণ থেকে উঠে এলে নিরক্ষীয় উত্তাপ
আমি ভিজে ভিজে মৌসুমী নামের এক বায়ু কন্যা হব।
ধাক্কায় আর ঝরে যেতে চাই না মাঠেঘাটে, ট্রেনেবাসে, উদ্যানে।
হিমালয় তোমার বুকের পাটা নিয়ে মুছে যাও এবার।
পাথর তোমরা সব এবার ভালো বাসতে শেখো
হালকা হাওয়ার মত আর উড়তে উড়তে উড়ে যাও।
উড়ে যাও অন্য কোথাও।

কেননা এখানে উত্তর থেকে শীত আসা দরকার।
গঙ্গোত্রী হতে নেমে আসবে তাহলে স্বর্গ
কৈলাশ থেকে বঙ্গোপসাগরে ভাসতে ভাসতে হিমবাহ আমার সিনডেরেলার মত মায়াবী সিনারিও
আমার বাড়ির ছাদে রাখবে তার তুষার রাত।
সমস্ত শীত আমার ওড়নার ভিতর।কুঁচকে থেকো না চাদর।টান টান হও।
…………………………………………..

পরিণত ঈশ্বর

রাষ্ট্র তুমি ফ্যামিলি স্ট্যবিলাইজেশনের মত একটি ধর্মের ট্রে সাজিয়ে রাখতে পারো।
সাজানো থাকবে একাধারে মালা ডির মত মুসলিম, লাইগেশনের মত হিন্দু, ভ্যসেকটমির খ্রিস্টান,
কপারটির বৌদ্ধ, কন্ডোমের মত শিখ আর।

জন্ম, পরিবার, পরিচয় নয়;
স্কুলের পাঠ্যতালিকায় পরীক্ষা হবে বারবার।
যেভাবে আমরা জেনে যাই হিমালয় আছে উত্তরে
তিন দিকে আর সমুদ্রজল।
ভূগোল বই জুড়ে সৈকত হাওয়া… পৃষ্ঠা উড়ে ছটফট।

যেভাবে আমরা জেনে যাই বিম্বিসার রাজা, মগোধ ছিল যার অগাধ বিলাসিতা।
ইতিহাস বই জুড়ে সেজেছি কত লক্ষীবাঈ, ঢাল তরোয়ালে ঝনঝন যুদ্ধের দামামা।
রসায়ন পড়ে কী হবে রাষ্ট্র, যদি ভক্তিরসে নাই ভেজে মায়ের বৃদ্ধাবস্থা?
পদার্থ পড়ে আর কতখানি শিখেছি আমরা… পারিবারিক মাধ্যাকর্ষণ?
রাষ্ট্র আগে আদর্শ পরিবার হও… তারপর নাহয় বিজ্ঞানী জন্ম দিও।

আমাকে তো প্রশ্ন করা হয় কী তোমার জাত?
আমাকে তো এও প্রশ্ন করা হয় st sc obc নাকি other?
আমাকে তো জাত মেনে ঘন্টা, উলু, শাঁখ বাজানো, আজান দিতে হয়।
আমাকে তো মন্দির, মসজিদ অথবা গীর্জায় যেতে হয়।
আমাকে তো ছুটি দেয় সরকার ধর্মীয় উৎসব উজ্জাপনে।

এত কিছু যখন রাষ্ট্র জানে… ধর্মের মর্ম শিক্ষা কেন জানবে না তাহলে পাঠ্যপুস্তক?
কেন বিভ্রান্ত ছড়াবে ইমাম, পুরোহিত, ফাদার?
প্রতিটি শিশুর অধিকার আছে কিনা বলো জানবে… পৈতে, বোরখা, গেরুয়ার অন্তর্নিহিত ভাব?
তবেই তো প্রতিটি স্কলার হবে প্রকৃত পুরোহিত।
প্রকৃত ইমাম। প্রকৃত ফাদার মাদার।

আমরা পুজো করি যখন; বলো ঈশ্বর জ্ঞানের অধিকার আছে কিনা?
আজান শুনি যখন বলো অর্থ জানার প্রয়োজন আছে কিনা?
প্রার্থনা বুকে ওরা কী পড়ছে বিশেষ, বলো জানার দরকার কিনা?
নাহলে ওই মেকাপী টিকটক;
সস্তা আনন্দে কেমন ভ’রে গেছে পরিবেশ!
নাহলে বেআব্রু মালিশ নেশা কেমন লেগে আছে দেখো রাষ্ট্রের লিঙ্গে;
নাহলে পরিবার এখানে কেন আজ একটি অভিনীত সমাজ?

এখনো সময় আছে ভেবে দেখো রাষ্ট্র… মা শরীর জন্ম দিতে জানে
কিন্তু মন জন্মাও তুমি, জ্ঞান, বিবেক, বুদ্ধি, ভালোলাগা।
এসব অধিকার শিশুকে লুকিয়ে রেখে তুমি কী ধর্ম বিদ্বেষের খেলা দেখছো না দেশ?
অনেক হয়েছে এবার নতুন সিলেবাস ভাবো।
স্কুলের একটি পিরিয়ডে সাজিয়ে রাখো সমস্ত ধর্মের ট্রে।

শিক্ষা শেষে যুবক কে বলো রাষ্ট্র- ‘বল ব্যটা এখন তোর ধর্ম কী?’
শিক্ষা শেষে জিজ্ঞাসা করো দেশ
‘বল মেয়ে তোর ঈশ্বর কে?’
…………………………………………..

প্রশ্বাসী খাঁদ

একটা খাঁদে পড়ে আছি।
বিবর্ণ বাতাস ঘিরে অজস্র শব্দের কঙ্কাল
ফেলে গেছে কারা।
আমি তাতে কবিতার মেদ জমাই।
আর এক একটি শরীর জেগে ওঠে গর্তের ভিতর।
জনগণ হয়ে ওঠে কবিতারা।
আমি ওদের একটি দেশ দিলাম;
ওরা তার ভিতর বেচে আছে।বই।

এইতো আমার খেলাঘর, এই ই জীবন হয়ত,
বর্ণ-সন্যাসী। আমি।
তবু তো সংসারী ভাষা শিখে
রক্তপ্রবাহ জানে প্রতিটি মাইটোকনড্রিয়া আমাদের ফুসফুস।
প্রতিটি লাইসোজোমই পাকস্থলী।
প্রতিটি কোষ আমারই মত জনগণ।আছে মন।

মিশে যাই দেশ আমি উপত্যকা বোধে
ঝরনার পতন জানা, পিচঢালা পথের ভিতর কাদার গুমরে ওঠা, উড়ে যাওয়া মেঘের মত ফিরে আসি বিছানায়।
তোমাদের কথার ভিতর ডুবে যেতে যেতে পানকৌড়ির ডানায় পড়ন্ত রোদ মেখে নিই।
তখনই বুঝি এ ডুব, এ সাঁতার, এ ওড়া, এ পতন
আমার নয়।

ভরে গেছে সেই খাদ। সেইসব কঙ্কাল পুড়ে গেছে সৎকার শেষে।
এই ইরেজার শেষবার মুছে দিক আমারও যে ‘দেশ’ আছে।
…………………………………………..

অনুগল্প

এইমাত্র যে অফিসে ঢুকলো তার চোখদুটো ক্রমশ জল হয়ে যাচ্ছে।
অদ্ভূত কিছু ভেবে আমি তাকিয়ে রইলাম আর তাকিয়ে রইলাম।
কান্নার দিনগুলো তো পৃথিবীতে আর নেই। বিলুপ্ত দিন।
তাই খনিজজল কিনা ভাবছিলাম।
হতেই পারে। নোনতা যখন।

মানুষের হৃদয়ে কি একটি মাটির স্তর নেই? যেখানে বৃষ্টি পড়ে? আকাশও পড়ে? ফুলগাছ হয়? অরণ্য ইত্যাদি?

কি হয়েছে বলো।
আমার ব্যস্ত কথাগুলোকে ও ওর কথা দিয়ে থামিয়ে দিল।
এখানেও গতি তবে।এবং এখানেও ব্রেক।

ও মুখ খুলতেই ওর কতগুলো কিলবিলে বাচ্চা বেড়িয়ে এল।
হামাগুড়ি দিয়ে আমার বুকের ভিতর কেন ঢুকে যাচ্ছে?

আমার মনটাকে ওরা হাতে নিয়েছে বুঝতে পারছি।
চটকাচ্ছে।
আমি ব্যাথা পাচ্ছি। ভীষণ ব্যাথা পাচ্ছি। আমার চোখগুলো কেমন হ্যাবলার মত ক্যাবলার মত পুরোনো শতাব্দীর দাহ দেখছে।

ওর বাচ্চাগুলোকে একসাথে রাখলে একটি বাক্যের মত দেখায়…
দিদি তোমাদের সাথে দেখা করতি আসলাম সোমবার বাংলাদ্যাশ চলে যাচ্ছি মা আসতিছে।দিদি আর থাকতি পারলাম না।

না।
এ কেমন আর্তনাদ?কেন ই বা?
ও কে? কেউ তো না।
তবু কিছু প্রশ্ন বড়শির মত।

ওকে বিঁধে দিয়েছি… তোমার ছেলের কী ভবিষ্যৎ নিয়ে যাচ্ছো?
খবর দেখো না?মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারো কী ওখানে?
হুঁ তেমন না। তারজন্যি তো বাপমায় এহেনে বিয়ে দিইলো।

তবে?
এই প্রশ্ন যেন সেই বহুউল্লিখিত…. বহুকালের… অনুরত্তের… নির্বাধ… সপ্তর্ষিমণ্ডল।
আকাশ তবে তোমার বুকেও আছে।
…………………………………………..

চেরা দিবস

আমাকে আর নৃশংস শ্বাস ফেলে ফেলে
কাটতে হয় এক একটি দিন।
এ নিঃশ্বাস, ধারালো তরবারি এক, দিন কেটে ফালি ফালি,
রক্ত নয়, জল নয়, বেড়িয়ে পরে অতীত সাজানো সব রাত্রি।

হয়ত তাই মেডুসার মত অন্ধ ঘরে অভিশাপ গিলে নিরুপায় বিষ জ্বালি,
বিষ উগরে বিষ খাই আবার।আর দেওয়াল চুঁইয়ে নামে আকাশ।
প্রতিটি নিঃশ্বাস এখানে, যেভাবে ছোড়ে তরবারি।

এভাবেই কবিতা আরও ঘণীভূত হয়ে বেইমানি অক্ষর লেখে।
বিরহ বিরহ স্রোত ওঠে অক্ষর থেকে।
এতটা গভীর এ অক্ষর, এতটা ঢেউ জানে…
নিধনের শোকে ভরা এ যেন আদিম কোনো সুর।

গান হয় এরা, গুনগুন গান হয় অক্ষর।
যেভাবে পাহাড় সন্ধি বেয়ে ধোঁয়া ধোঁয়া মেঘ ওড়ে।
তানসেনের সুরেলা উচ্চতা বেয়ে আকাশে উঠে যায় অক্ষর
যেখানে শূন্যতায় ভ’রে থাকে শীত।
অথবা আবেগে ভিজে গেলে অক্ষর গান হয়,
বৃষ্টি নামায় মৃত্তিকায়,গাছে ফোটায় ফাগুনের ফুল।
সুগন্ধ ওড়ে।

সুগন্ধ সে আমার প্রশ্বাসে ঢুকে যায়।
আমার প্রশ্বাসে ঢুকে যাই ‘আমি’ যেন।
বুক ভ’রে প্রশ্বাস নিই সেই দিন।

ফুলমাখা দিন থেকে উড়ে আসছে গোধূলির ছিড়ে ফেলা আংশিক সূর্য,
উড়ে আসছে ‘আমি-ছোঁয়াচে’ তোমার সেই রোগ।
তোমার নাকের সীমান্ত বেয়ে নেমে যাচ্ছিল যেন স্বর্গের দিগন্ত।
বুক ভ’রে প্রশ্বাস নিচ্ছি যেন আমাকে আমি।

সে সব সুখ… হে সব সুখ…
তোমার গা বেয়ে এখন ধ্বংসের সূর্য ওঠে।
আমি আজ প্রেম বিভাজিকা। ওই যে পাহাড় কোলে কচি কচি জল ছিল যে “আমি”
সে আমি এখন থিতানো ফল্গুধারা,স্মৃতি আছে জীবন্ত আমার, দেখো ঝরছে ঝরনা ওই।
তথাপি ফিরে যাবার পথ নেই আর,এতটা উল্টো অতীত।
সরীসৃপের মত এখন বুকে হেঁটে নদী… মুখ আমার চেনে শুধু মৃত্যু মোহনা।
…………………………………………..

উত্তাপ হীন আলো

তোমার ঘুমের সাথে আমার ঘুম গুলে একটি সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রির রাত হয়।
যেখানে তুমি রাত ফুঁড়ে একটু একটু করে আলোর মত স্পষ্ট হয়ে ওঠো।
আর তোমার দেখাদেখি আমিও একটু একটু করে আরও উজ্জ্বল হই।
এভাবেও তবে মানুষ জন্মায়,এভাবেও তবে হয় দিন।

আমরা তখন পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি ছানার মত ডানা খুলি।
আর ভিজে রঙ নিয়ে উড়ে যাই দূর বহুদূর যেখানে গাছেরা গর্ভবতী
যেখানে ঠোঁটেরা ফুটে থাকে ফুলের মত।
আমরা ফ্যাকাশে ফুল ছুঁয়ে দিই, রঙিন হয়ে যায় এভাবেই পাপড়ি।

অথবা তোমার ঘুমের সঙ্গে… আমার ঘুম গুলে গেলে… একটি দুরন্ত নদী প্রবাহিত হয়।
ওখানে যুবক জলে নেমে আসে নিরীহ জ্যোৎস্না,
ঢেউয়ের শরীর জুড়ে তখন ঝিকমিক জ্বলে যাওয়া জোনাকি, জোনাকির মত ভেঙে যাওয়া চাঁদ আর আর্যদৃষ্টিতে তাকায়।

রাত মাখা তখন সে আলোজয়ী পরী।
তাপহীন আলো ফেলে বুঝিয়ে দেয়,এ আলোর গায়ে হাত রাখা যায়।পুড়ে যায় না হাত।
এ আলো দিয়ে মোছাও যায় না… রাত।
শুধু স্বপ্নের ভিতর ঢুকতে গেলে এ আলোর… চাঁদকে ঠিকরে জন্মাতে হয়।
যেভাবে কোনো এক “মেধাবী” মেয়ের চোখ ঠিকরে জন্মায় ভালো বাসা।

সুতরাং আমাদের এ ঘুমে গুলে যাওয়া রাত্রি,
অবহেলার নয় গো কিছু… চাইলেই ভুলে যাওয়া যায় না।
এ ঘুম জন্ম দিতে মহাকাশ থেকে জিতে আসে পৃথিবীতে… অন্ধকার।

তুমি এসব জানো ব’লেই সারারাত জেগে থাকো।
আমি এসব জানি বলেই সিগারেটের ঝাঁঝালো ধোঁয়ায় পুড়িয়ে ফেলো রাত।
শুকিয়ে দাও নদী, মরে যায় প্রজাপতি। ঝরে যায় ফুল। এত তীব্র তবে আমার অপরাধ?

বছর শেষে পুরোনো হয় সবকিছু,পর্ণমোচি ঝরায় তার বিগত সব সবুজ ভুল।
নদীও প্লাবন ডাকে, গ্রহন-প্রেমে চাঁদও হয় নতুন।
শীত আসে, শীত যায়।
আবার ফোটে ফুল।

ফুলেরা আবার শুকায়। পচা পাপড়ি ঠোঁটে নিয়ে বাড়তে থাকে অসম আকৃতির ফল।
বীজ হয়।
আবার হয় চারা।ঝড় মাখে শাল, পলাশ, সোনাঝুরি… সেগুন, পিয়াল…
তবু আমার অন্যায় শুকায় না, অন্যায় এত শক্ত…, ডিকমপোজড হয় না।

অথবা গ্রানাইট তোমার বুক।
অথবা জ্বলন্ত লাভায়ও তবে কিছু অক্ষত থাকে।
এ ভাবনায় অনেক অবলা ঘুম সতীদাহে জ্বলে গেছে।
মৃত্যু হয়েছে তোমারও প্রতিটি দিন, আগুন সাক্ষীর ওই সিগারেট জ্বলে।

অনেক হল, এবার আমার কথা শোনো তুমি।
গ্লাসে ভরবার মত হৃৎপিন্ড ভর্তি করে খাও পুরোঢোক
ছোটবেলার সেই চন্দমিত্তু।
তারপর চিরে ফেলো তোমার গর্ভবতী ওই স্টেথোস্কোপ।
বেড়িয়ে পড়ুক হুড়মুড় করে জমানো সব লাভ-ডাভ।
কেননা ও শব্দটি “তো” আমার ও তবে।