সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠছিলাম। এ সময়, চার তলায় এক ছোট বাচ্চা যখন দৌড়ে এসে আমাকে ‘মামা’ বলে জড়িয়ে ধরলো, আমি প্রথমেই বিস্মিত হয়ে পড়ি। ভেবেই পাচ্ছি না কোন সম্বন্ধে আমি তার মামা হই? ওপরের তলার একশ এক নম্বর প্লাটটি ভাড়া নিয়েছি মাত্র দুদিন হলো। এ শহরে ওই প্লাটের সদস্য ব্যতীত আমার আর কেউ পরিচিত আছে বলে জানা নেই। কিন্তু অপরিচিত শহরে যখন এতো আপন সম্বোধন শুনছি এক রকম বিস্মিত হবোই বৈকি।

সঙ্কিত মনে বাচ্চাটির চিবুক স্পর্শ করে তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। কিন্তু সে আমার দুহাত ধরে দোলতে দোলতে শুধু হাসে কোন উত্তরই দেয় না। তখন দরজার আড়াল থেকে একটা শব্দ এলো, ‘অন্তু।’ আমি তার মুখ থেকে মুখ ফিরিয়ে, রহস্যময় দৃষ্টিতে দরজার দিকে তাকাই এবং সেও জবাব দেয়, ‘জ্বী, মা।’ দরজার আড়াল থেকে আবার শব্দ আসে,
-‘তোর মামাকে ভেতরে আসতে বল।’
আরে! অপরিচিত শহরে এ তো সেই পরিচিত সুর, যেই সুর না শোনার নেশায় সাত বছর ধরে ভবঘুরের মত বহু পথ ঘুরেছি। এত বছর পর হঠাৎ সেই সুর আমার হৃদয়ে ঘন্টার মত বেজে ওঠল। হয় তো এখন পাশের ছাদে দাঁড়িয়ে লিমা বলছে, ‘সৌরভ ভাই, আজ বিকেলে কি একটু সময় হবে?’
এখানে আমার চোখে কর্ণফুলীর মত কোন নদী নেই, কাছে কোথাও নদীর ওপারের মত লোকালয় আছে কি না জানি না। তাই এই বিকেলের সময় নিয়ে কিছু ভাবছি না।

আমি সেই দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। আমার উপস্থিতিতে আমাকে তার ঘরে প্রবেশের অনুরোধ করে চোখের নিমিষেই সে ভেতরে ঘরে চলে যায়। ঘরে প্রবেশের পর অন্তু আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে একটি আরামকেদারায় বসালো- পাশে সেও বসলো।

এ বসার ঘর সাজানোর ব্যপারে হয় তো লিমার মতামত বেশি প্রাধান্য ছিল; এক পাশে বই ভর্তি শেলফ অন্য পাশে অ্যাঁকরিয়াম আর অ্যাঁকরিয়ামের দুপাশে কামড়ে ধরেছে দুটি কৃত্রিম গাছ, এক কোনে কাঠের মাছ, তার ওপর চেপে বসা কাঠের ঈগল, দেয়াল দেখে বোধ হয় এ যেন গ্রামীণ ছোঁয়ায় পুরো তুলির আঁচড় এবং সোজা ওপরে তাকাতেই চোখে পড়ে দেয়ালের গায়ে ঝুলে আছে এক অচেনা ভদ্রলোকের ছবি।

যখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তাম, আমাদের বাসা ছিলো কালুরঘাটে। আমাদের দালানের গাঁ ঘেঁষে সমান উচ্চতায় ছিলো আরেকটি দালান। সেই দালানে লিমার আপু আর দুলাভাই থাকতো- সাথে সেও। মায়ের কাছে শুনেছি লিমার দুলাভাই তার কি যেন দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়। তাই দু ঘরের আসা-যাওয়া ছিলো খুব যত্নের। মাঝে মধ্যে তাদের বাসায় আমিও যেতাম; যত্নের খাতিরে নয়- বরঞ্চ লিমার প্রতি আমার মনের মধ্যে যে ভালোবাসার সঞ্চার হয়েছে, সেই মোহে।

যেদিন দুপুরের রোদে খোলা চুলে লিমাকে তাদের ছাদে হাঁটতে দেখি, সেদিন থেকে কোন কারণে অকারণে আমি ছাদে ওঠতাম। কখনো কখনো দূরে তাকিয়ে আকাশ দেখার অভিনয় বা ছাদের এপাশ ওপাশ পায়চারি করে যেতাম। তখন পাশের ছাদে ভেসে আসতো কারো হেঁটে আসা পদধ্বনি, ভেজা কাপড় শুকাতে দেয়ার শব্দ। কিছুক্ষণ পর ওছাদ থেকে প্রতীক্ষার বাণী ডাক দিয়ে বলতো, ‘সৌরভ ভাই, দুপুরের রোদে দাঁড়িয়ে একা একা কী করো’?
আমি ওদিকে এক পলক তাকিয়ে উত্তর দিতাম, ‘আকাশ দেখি’।
-‘প্রতি দিন রোদে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখা কি শেষ হবে না’?
-‘জানি না কবে শেষ হয়’?
এভাবে কথার ছলে দুজনের প্রায় পার হয়ে যেতো দুপুরের খাবার সময়। এরই মাঝে কথার ফাঁকে নিচের সিঁড়ি ঘর থেকে কানে বাজতো ইমা ভাবির চিৎকার, ‘লিমা- এ লিমা, তোর কাপড় শুকাতে দিতে আর কত দেরি হবে রে- ভাত খাবি না’?
তখন ‘আপু আসছি’ বলে সে ভৌ দৌড়।

এক দিন বিকেলে শাকিল ভাই, ভাবি ও লিমা পতেঙ্গা সি-বীচ বেড়াতে যাওয়ার কথা। পাশেই যখন আছি তাদের কোনো কিছুর বাইরে আমি নই। তবে নিজে বেশি উৎসুক হলেও অনুরোধেরও কিছুটা তোয়াক্কা ছিলো। ঠিক সেদিনও।

পড়ন্ত বিকেলে সমুদ্র সৈকতে ভাই ও ভাবি যখন পাথরের ওপর বসে গল্পে মগ্ন, তখন আমি আর লিমা সাগরের কিনারা বেয়ে হাঁটছিলাম। ইচ্ছে করছিলো সাগরের ঢেউ এর মত সমস্ত কথা লিমার সম্মুখে উজাড় করে বলে দিই, কিন্তু সেদিন আমার এরূপ কোন সাহস জন্মেনি। তাই সেদিনের ভীরুতা নিজকে আজ পুরুষ ভাবতেও ঘৃণা লাগে। পশ্চিমে সাগরের বুকে ডুবে যাওয়া সূর্য দেখে লিমাকে বলেছিলাম, ‘দেখ সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে’।
-‘হুম’।
-‘তবে এখনি কি আমাদের দূরত্বের সময় আর দুজনের দুই পথ’?
-‘সে কি, বাসা পাশাপাশি হলেও কি দূরত্ব বাড়ে’?
আসলে এ দূরত্ব স্থানের নয়, এ দূরত্ব মনের- তাই বলার মত কোন কথা খোঁজে না পেয়ে এবার জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভালোবাসা সে শব্দ সম্পর্কে কিছু জানো’?
সে মৃদু হেসে আমাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো, ‘হঠাৎ এ প্রশ্ন’?
-‘তেমন কিছু না, এমনি জানার ইচ্ছে’।
-‘ও, দেখে তো মনে হয় কারো প্রেমে পড়েছো’।
আমি কম্পিত স্বরে বললাম, ‘হয় তো’।
-‘সে সৌভাগ্যবতী কি জানে’?
-‘জানি না, জানে কি না’।
-‘তাকে জানিয়েছো কখনো’?
কিছুক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে থেকে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললাম, সময় হোক- এমনিতেই জেনে যাবে।
সে কিছুটা সঙ্কিত হয়ে বললো, সময়ের আগে সব যদি এলো মেলো হয়ে যায়?
কিছু বলার চেষ্টায় ছিলাম, তারপর আমিও নীরব। তখন কারো মুখের দিকে আর কারো চোখ নেই, কেবল দুজনের চোখে দেখি ডুবে যাওয়া সূর্য। কিছুক্ষণপর শাকিল ভাইয়ের কণ্ঠে শোনা যায় ফেরার ডাক।
সেদিন আসার পথে আমি আর লিমা কোনো কথায় বলি নি।বলতে গেলে সাড়া পথ দুজনেই চুপচাপ। শুধু দুকান দিয়েই শুনেছি ভাই আর ভাবির যত কথা।

লিমার এইচএসসি পরীক্ষার দুদিন পর তার আর কোন খোঁজ পাই নি। তার সকল গন্তব্যে তার অস্তিত্বের কোন চিহ্নও নেই। প্রতিদিনের মত দুপুরের রোদে তার পায়ের পদধ্বনি, কাপড় শুকাতে দেয়ার শব্দ, ভেজা চুলের গন্ধ পাশের ছাদ থেকে আর আসে না। যদিও সি-বীচ থেকে ফেরার পর থেকে তার সব কিছুতেই এড়িয়ে চলা ভাব। পূর্বের মতো ছাদে এলেও শোনা যেতো না পুরনো সেই ডাক। ধরে নিয়ে ছিলাম হয় তো পরীক্ষার চাপে পড়ালেখায় ব্যস্ত। কিন্তু পরীক্ষা শেষে তার সেই মায়া ভরা ডাক তো দূরে থাক, তাকে এক পলক দেখাও দূর সাধ্য। তখন মনের ভেতর একটা তীক্ষ্ণ ব্যথা অনুভব করলাম।

সন্ধ্যায় ইমা ভাবির কাছে গিয়ে জানতে পারি- আগের দিন লিমা তার মা বাবার কাছে চলে গেছে। সেদিন বুঝতে পারি নি কোন অপরাধের দায়ে তার চলে যাওয়ার সংবাদ পাওয়ার আমি অযোগ্য ছিলাম; ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশে না কি কাপুরুষের মতো একাকী ভালোবাসে যাওয়ায়?

তবুও এতো দিন প্রতীক্ষায় ছিলাম কোন এক দিন দেখা হবে ; কাছাকাছি দুটি ছাদের ওপরে নতুবা কোন শহরের পথে, কোন সমুদ্র অথবা নদীর পাড়ে।

এসব ভাবতে ভাবতে ভেতরের ঘর থেকে কাপ প্লেটের টুংটাং শব্দ শোনা যায় সাথে সাথে চুড়ির শিঞ্জন।

তৎক্ষনাৎ নাস্তা আর চায়ের কাপ হাতে এক বধূ আমার সম্মুখে এসে দাঁড়িয়ে আছে। তার চেহারায় বয়সের সামান্য চাপ, চোখের নিচে কালো দাগ পড়ে গেছে। লিমার পূর্বের রূপের চেয়ে এরূপ সামান্য ফিকে। তার লাজুক চেহারার দিকে আমি সজল চোখে তাকিয়ে থাকি। সে নিচের দিকে তাকিয়ে কোমল সুরে জিজ্ঞসা সুলভ বলে, ভালো আছেন?
আমিও একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টায় উত্তর দিলাম, ‘হ্যাঁ, আলহামদুলিল্লাহ ভালো’।
তখন বধূ সজ্জিত লিমা অন্তুকে কাছে টেনে ইশারায় বুঝিয়ে দিল, অন্তু তার ছেলে। অন্তুর বাবা বা তার পরিবার সম্পর্কে সে আর কিছুই বললো না। ধরে নিলাম দেয়ালের গায়ে ঝুলন্ত ছবিটি অন্তুর বাবার। আর জানতে চাইলাম না সেদিন না বলে চলে যাওয়ার বিষয়। তাকে কাপুরুষের মতো আজো বলতে পারি নি আমার ভালোবাসার সেই মানুষটি লিমা।

এমন সময় অফিসে যাওয়ার নাটক করে বেড়িয়ে এলাম লিমার ঘর থেকে।