অনিন্দ্য এক সুন্দরি রিয়া, চাকরিও করে ভালো বেতনে,
উপচে পড়া যৌবন ও শারীরিক গঠনের টগবগে এক তরুণি। রিয়া কোন কাজ নিয়ে কোথাও গেলে জেন্ডার বৈষম্য ঘটে এ অভিযোগ করেন। আর করবেই না বা কেন? কারণ রিয়ার দেহের প্রতি ভাজে ভাজে অপার সৌন্দর্য। দৈহিক সৌন্দর্যের এক মূর্ত প্রতীক রিয়া।
রিয়াকে একবার দেখলেই যে কেউ প্রেমে পড়তে বাধ্য। তাকে দেখে মনে মনে কেউ যে প্রেমে পড়েনি তা বলা মুশকিল নয়।রাহানের সাথে রিয়ার পাঁচ বছরের বৈবাহিক জীবন অথচ বোঝার কোন উপায় নাই যে সে একজন বিবাহিতা নারী। একবার তো নামকরা এক ধনাঢ্য ব্যক্তির উচ্চশিক্ষিত একমাত্র ছেলে রিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। সে বিবাহিতা জেনেও অনেক পথ মাড়িয়ে ছিল সেই ধনীর দুলাল। শুধু তাই নয় এতে ছিল অনেক লোভনীয় অফার । টাকাপয়সা গাড়ি-বাড়ি ব্যাংক ব্যালেন্স কোনো কিছুরই কমতি ছিল না তাতে, শুধু লুফে নিলেই রিয়া হয়ে যেতো অন্য গ্রহের ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন আহলাদী জীবন। কিন্তু রাহানের প্রতি তার ভালোবাসার জোর এত বেশি ছিল যে এসব কিছুকে সে কোনমতেই পাত্তা দেয়নি।

রাহানের সাথে সেই টানাপোড়নের ছিমছাম জীবন নিয়েই চিরদিন খুশি থাকতে চেয়েছে। তাদের বৈবাহিক জীবনে তারা বেশ খুশি ছিল। অভাব-অনটন থাকলেও ভালোবাসার কাছে তা কিছুই ছিল না। রিয়াও মনে প্রাণে তাই বিশ্বাস করতো ভালোবাসার কাছে অর্থ-সম্পদ, বিত্ত বৈভব কিছুই না। যে ঘরে প্রেম ভালোবাসা আছে টাকা-পয়সা না থাকলেও সে ঘরে সুখ আছে, কিন্তু টাকা পয়সা আছে প্রেম নাই সে ঘরে কখনোই সুখ থাকতে পারে না।

রিয়া ও রাহান দম্পতির পাঁচ বছরের দাম্পত্য জীবন এই পাঁচ বছরে একটি সন্তান নেওয়ার চেষ্টা যে করেনি তা কিন্তু নয়।অনেক চেষ্টা করেছে তারা।
দেশে তো বটেই দেশের বাইরেও গিয়েছিলেন তারা কিন্তু পরীক্ষানিরীক্ষা করে জানতে পারে, রিয়ার সন্তানধারণের সক্ষমতা নাই। কখনোই সে সন্তানের মা হতে পারবে না।
অবশ্য এজন্য রাহানের কোন প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও রিয়া কিন্তু পুরোটাই ভেঙে পড়েছিল।
কারণ মাতৃত্বটা যেকোনো নারীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। সংসার জীবনে সুখী হওয়ার জন্য এটা অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং খুব জরুরী। বর্তমান সমাজ ও পারিবারিক জীবনে এটাকে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হয়। অনেকে পরিবারেই বন্ধার অভিযোগ ওঠে এমনকি সংসার পর্যন্ত ভেঙ্গে যায়, যতই সুন্দরী হোক না কেন বংশ রক্ষা না হলে তার জীবনে নিষ্ঠুর অভিশাপ নেমে আসে। আমাদের সমাজ ও পারিবারিক জীবনে নারীর বন্ধ্যাত্বকে কোনক্রমেই মেনে নেওয়া হয় না। রিয়ার জীবনেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি — সমাজের চিরাচরিত নিয়মটা তাকে স্পর্শ করে গেছে।
রাহান রিয়াকে মৌখিক সান্ত্বনা দিলেও বেশ কিছুদিন থেকে তার মাঝে একটা উদাসীনতা লক্ষ্য করছে রিয়া। চঞ্চল স্বভাবী চিরচেনা মানুষটা কেমন ভারি স্বভাবের হয়ে গেছে।
ইদানীং রাহান আরও সংকোচিত ব্যবহার করছে, রিয়া সবকিছু বুঝতে পারছে কিন্তু সে রাহানকে এ নিয়ে কিছুই বলছে না কারণ– সমস্যাটা তো তাকে নিয়েই। দুর্বলতা বলতে যা বোঝায় সেটুকু তো তারই তাই রিয়া সব সময় চুপ থাকে। রাহানের উদ্ভট আচরণ মুখ বুজে সহ্য করে যায়। বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়।
এখন সে প্রায়শই বাহিরে ডিনার সেরে আসে এই পাঁচ বছরে যা কোনদিন করেনি।
তাকে সে কোন বিচারেই দোষী করতে পারছে না কারণ রাহানের এমন আচরণের জন্য দায়ী সে নিজেই ।
রিয়ার যদি সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা থাকতো তবে এমনটা কখনোই হত না।
তবে রাহান প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতো রিয়াকে।
চার বছরের প্রেম ও পাঁচ বছরের বৈবাহিক জীবনে রিয়া ভালো করেই চিনেছে রাহানকে।
অতীতের অনেক সুখস্মৃতি মনে করে মাঝেমাঝে রিয়ার চোখ জলে পূর্ণ হয়ে উঠে।
নীরবে নির্জন তার চোখে বন্যা বয়ে যেতো সবার অলক্ষ্যে কোনদিন কারও কাছে অভিযোগ করতো না, এমনকি রাহানের প্রতিও তার কোন অভিযোগ ছিল না। রাহান যদিও তাকে এড়িয়ে চলতো তবুও রিয়ার ভালোবাসা তার প্রতি একচুলও কমেনি।
রিয়ার এমতাবস্থায় আমি চলে যাই সুদূর আমেরিকায়। রিয়া আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু একই ফ্লাটে থাকতাম আমরা।
তিন বছর পরে দেশে ফিরে জানতে পারলাম রিয়া ভীষণ অসুস্থ তার একটি কিডনি নষ্ট হয়ে গেছে অপরটিও হুমকির মুখে, ডাক্তার বলেছে দ্রুত অপারেশন করতে কিন্তু অপারেশন করা সম্ভব হয়নি। রিয়াকে ছেড়ে রাহান কবেই চলে গেছে।
এত অসুস্থ স্ত্রীকে ছেড়ে কোন স্বামী চলে যেতে পারে বিশ্বাসই করতে পারছি না।
এই কথাগুলো শুনলাম কেয়ারটেকার করিম চাচার মুখে।
করিম চাচা এই সোসাইটির পুরনো লোক, খুবই বিশ্বাসী।
আমি করিম চাচার মুখের কথা শেষ না হতেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছিলাম। করিম চাচা বললেন— ছোট সাহেব কোথায় যান? রিয়া ম্যাম এখন এখানে থাকেন না। রাহান সাহেব চলে যাওয়ার পরে উনি এখানে মাত্র দুইমাস ছিলেন।তারপরে হঠাৎ এক সকালে দেখি, উনি কাউকে কিছু না বলে চলে গিয়েছেন।
করিম চাচার কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমার মুখ থেকে কোন কথা বেরুলো না। শুধু একটা দীর্ঘনিশ্বাসের শব্দ পড়ে গেল।
আমার নীরবতা ভাঙালেন করিম চাচা, উনি মিনমিন গলায় বললেন— ছোট সাহেব, রিয়া ম্যামের দরজার সামনে একটা খাম পেয়েছি আর তাতে আপনার নাম লেখা ছিল বলে খুলে পড়ে দেখার সাহস করিনি, এই নিন।
আমি খামটি নিয়ে রুমে গেলাম–
খামটি খুলতে যেন শক্তি পাচ্ছি না সমস্ত শরীর কাঁপছে।
তবুও অনেক কষ্টে খামটি খুললাম।
দেখি আমাকে লেখা রিয়ার প্রথম ও শেষ চিঠি।
রিয়ার চিঠি পড়ে কান্না থামাতে পারছি না–
(আমার প্রিয় পাঠকদের বলছি– আপনারা আমাকে ক্ষমা করবেন, রিয়ার চিঠিতে কী লেখা ছিল তা আমি আপনাদের বলতে পারবো না।)
আমি সকালের অপেক্ষা করতে লাগলাম, আজ রাতটা যেন শেষই হচ্ছে না।
অপেক্ষা ও অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে রাত্রি কাটালাম, ভোর হতেই বেরিয়ে পরলাম রিয়ার সে চিঠিটা হাতে। সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে গেল কিন্তু রিয়ার চিঠির সাথে চিত্র মিললো না। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি।
আধো অন্ধকারে হাঁটছি গলিপথে হঠাৎ চোখ পড়লো একটি বাড়ির বারান্দায়। রিয়ার ছবির সাথে মিলে গেল সে রাস্তা বাড়ি ও বারান্দা।
আমি এগিয়ে গেলাম, দেখি রিয়া একলা বারান্দায় চেয়ারে বসে সন্ধ্যার রাস্তা দেখছে…. রিয়ার হঠাৎ আমার চোখ পড়ে যায়। এক ঝলক দেখেই রিয়াকে খুব উচ্ছ্বসিত হতে মনে হল।
সবার চোখ বাঁচিয়ে প্রায়ই ওকে দেখতে ছাদে যেতাম। রিয়া যে আমাকে দেখতে চাইতো না তাও কিন্তু নয়।
আমাকে একদিন ছাদে না দেখলে সেও জানালার দিকে তাকাতো, বারান্দার দিকে চেয়ে থাকতো।
বেলকুনিতে কতবার পায়চারি করতো।
পরিশেষে যদি দেখতে না পেত, তবে করিম চাচাকে ডেকে বলতো- কিগো করিম চাচা, তোমার ছোট সূর্য আজ বোধহয় উদয় হয়নি? করিম চাচাও মজা করে বলতো- ম্যাম ছোট সূর্যে আজ গ্রহণ লেগেছে গ্রহণ ।

পরপুরুষের সাথে প্রেম নিয়ে উচ্ছ্বাস রিয়া কোনদিনও করতো না। তবে বেশ বুঝতে পারতো আমি ওকে পাগলের মত ভালোবাসি।
একটা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক করতে রিয়া কখনোই চায়নি।
অনেকবার তাকে চিঠি দিয়েছিলাম কিন্তু সে কখনোই আমাকে লিখেনি।
বেশ একটা গোপন সম্পর্ক গোপনেই রয়ে গেছে আজ অব্দি।
এতক্ষণ দুজনেই নিরব ছিলাম হঠাৎ হকচকিত রিয়া বললো- এসেছো বস। আমি জানতাম তুমি আসবে।
আমি আজ স্বার্থপরের মতো তোমাকে ডেকেছি, আমি জানি আমি একা আর আমার এই একাকিত্বের জন্য তোমাকে ডাকিনি। তোমাকে দেখেছি তোমাকে বিশ্বাস করা যায় বলে। রিয়া আরও অনেক কথা বললো কিন্তু কথাগুলো অস্পষ্ট।
রিয়ার সব কথা শুনে আমি বিমর্ষ হয়ে গেলাম, আমি যেন এক জ্যান্ত লাশের সাথে কথা বলছি। মনটা ভেঙ্গে গেল।
রিয়ার শারীরিক অবস্থা এতোটা খারাপ যে কথা বলতেই দম আটকাচ্ছে।
রিয়ার কোন কথা না শুনে তাকে নিয়ে ছুট দিলাম হাসপাতলে। রিয়ার শারীরিক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর,
নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে তাকে সাথে চলছে অপারেশনের প্রস্তুতি।

আজ রিয়ার অপারেশন হবে, তাকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে অপারেশন থিয়েটারে।
রিয়া আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে মায়াবী দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে সাথে যেন কৃতজ্ঞতাবোধের ছাপ পরিলক্ষিত।
আমিও হাঁটছি সাথে সাথে।অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার আগে রিয়া অক্সিজেন মাক্সের উপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে একটা ফ্লাইং কিস দিলো…