প্রতিদিন অপরাহ্নে সে নদীতটে ভ্রমণ করে। কখন যে ভিক্ষুরা আসবে তার স্থিরতা নেই। তাই তাকে নদীতটে আসতে হয়। তার চপল স্বভাব এখনও আছে। বালক ও কিশোরদের সঙ্গে সে একেকদিন ক্রীড়ায় মত্ত হয়। দণ্ডগুলি ক্রীড়ায় তার পারদর্শিতার কথা ইতোমধ্যে গ্রামের কিশোর ও বালকদের মধ্যে প্রচারিত হয়ে গেছে। সুতরাং সে নদীতটে এলে বালকদের মধ্যে উল্লাস দেখা যায়।
আজ সে নদীতটে এসে দেখলো বালকেরা বিমর্ষ মুখে বসে আছে। কি সংবাদ? সে সন্ধান নিয়ে জানলো যে দ্বিপ্রহরে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গেছে। ঘটনাটি সামান্য, কিন্তু মানুষের অনুদারতা এবং ক্রোধ সামান্য ঘটনাকেই প্রকাণ্ড করে তুলতে পারে।
ঘটনাটি হাস্যকরও কিঞ্চিৎ। দ্বিপ্রহরে অভিরাম উপাধ্যায় স্নানে এসেছিলেন। তাঁর অবয়ব শীর্ণাকার, এবং মস্তকে একটি সুন্দর ইলুপ্তি বিরাজমান। তাঁর তৈলসিক্ত ইলুপ্তিটি কখনও কখনও দর্পণের কাজ করে। তিনি যখন নদীজলে নেমে প্রথম ডুবটি দিয়ে সূর্যস্তব আরম্ভ করেছেন, শ্লোকের প্রথম চরণটি উচ্চারিত হয়েছে–কি–হয়নি–ওঁ জবাকুসুম সঙ্কাশং পর্যন্ত বলেছেন মাত্র, ঐ মুহূর্তে বালকদের দণ্ডপ্রহৃত গুলিটি তীরবেগে ছুটে এসে তাঁর। মস্তকের ইন্দ্রলুপ্তিটিতে আঘাত করে। আঘাতটি তীব্র হওয়ায় ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং রক্তপাত হয়। উপাধ্যায় মহাশয় কুপিত হন, উপবীত হস্তে ধারণ করে বালকটি এবং তার চতুর্দশ। পুরুষকে অভিসম্পাত করেন। তাতেও তাঁর ক্রোধ প্রশমিত হয় না, বালকটিকে তিনি ধরে নিয়ে যান নিজ গৃহে। সেখানে তাকে যথেচ্ছ প্রহার করা হয়। ঘটনার সেখানেই সমাপ্তি হয়নি, শোনা যাচ্ছে, বালকটির পিতাকে ব্রাহ্মণরক্তপাতের জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে।
বসন্তদাস মলিনমুখ বালকদের কোনোরূপ সান্ত্বনা দিতে পারে না। কারণ বিষয়টি অতিশয় স্পর্শকাতর। সে বহিরাগত, তার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ ঘটলেই ব্যাপারটি ভিন্ন আকার ধারণ করবে। সে বালকদের সঙ্গ ত্যাগ করে ভাসমান নৌকাগুলির দিকে অগ্রসর হলো।
বসন্তদাস বলিষ্ঠ, তায় যুবাপুরুষ। পুনর্ভবা তীরের উচ্চ ভূমিতে সে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার উন্নতদেহের প্রতিচ্ছায়া নদীবক্ষে এসে পড়েছিলো। পুনর্ভবার স্রোতে জল এখন গৈরিক বর্ণ। উত্তরদেশে সম্ভবত কোথাও বৃষ্টি হয়ে থাকবে–তাই জলের ঐ রূপ। ঐ গৈরিকবর্ণের জল এখন কিছুদিন ক্রমান্বয়ে আসতেই থাকবে।
নদীতীরে একত্রে একটি ক্ষুদ্র নৌবীথি ভাসমান। নৌকাগুলিতে নানান পণ্যসম্ভার। সম্ভবত এরা এখানে রাত্রিযাপন করবে। রাত্রিকালে দস্যুর ভয়, তাই এই ব্যবস্থা। বসন্তদাসের হাসি পায়, মানুষ বড়ই সহজ সরল। পথে দস্যু যা হস্তগত করে সে আর কতটুকু! পক্ষান্তরে যুগ যুগ ধরে নিজ নিজ গৃহেই অপহৃত হয়ে চলেছে তারা। গ্রামপতি নেয়, রাজপুরুষেরা নেয়, ব্রাহ্মণেরা নেয়, কায়স্থেরা নেয়–কে তাদের শ্রমলব্ধ উপার্জনের অংশ নেয় না? আশ্চর্যের বিষয়, এই চিন্তাটুকু মানুষ করতে চায় না।
সে ঐ সময় শুনলো, নৌকার এক বণিক ডাকছে, মহাশয় কি এই গ্রামবাসী?
কেন? কি প্রয়োজন? বসন্তদাস ঘুরে দাঁড়ায়।
না, জানতে চাইছিলাম। বণিকটি ইতস্তত করে বলে, এই নদীতীর নিরাপদ তো? দস্যুবৃত্তি হয় না তো?
বসন্তদাস হাসে। বলে, আপনি বড় কৌতুকের কথা বললেন, আমি এই গ্রামবাসী আর আমাকেই জিজ্ঞাসা করছেন, আমি দস্যুবৃত্তি করি কি না?
না না, আমি তা বলিনি, লোকটি অতিশয় বিব্রত বোধ করে। আপনারা এখানে নির্ভয়, বসন্তদাস তাদের আশ্বাস দেয়। বলে, এ গ্রামে কোনো দস্যু নেই–তবে আপনারা কি অধিক দূর যাবেন?
না মহাশয়, আমরা নবগ্রাম হাটে যাবো। পথিমধ্যে শুনলাম ওদিকে নাকি রাজার সৈন্যদের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে–কি ঘটনা, এখনও কিছুই বুঝতে পারছি না, আপনি কি কোনো সংবাদ জানেন?
নিকটবর্তী নবগ্রামেও কি কোনো ঘটনা ঘটেছে? বসন্তদাস স্মরণ করার চেষ্টা করে।, এমন কোনো ঘটনার কথা সে শোনেনি। তার একবার মনে হলো, পিপ্পলী হাটের ঘটনাটি বর্ণনা করে। কিন্তু পরক্ষণে চিন্তা করে, কি প্রয়োজন অহেতুক নিরীহ লোককে চিন্তাগ্রস্ত করে? সে বলে, আপনারা নির্ভয়ে থাকুন এখানে সকলই নিরাপদ।
নিরাপদ হলেই ভালো, আমরা ক্ষুদ্র ব্যক্তি, সামান্য কিছু উপার্জন করতে পারলেই গৃহের সন্তান গৃহে ফিরে যেতে চাই–আপনি আমাদের নিশ্চিন্ত করলেন, আপনাকে ধন্যবাদ।
লোকটি হয় ভয়াতুর নতুবা বাঁচাল। হয় ভয়, নয় তোষণ। এছাড়া কি মানুষের স্বাভাবিক আচরণ হতে পারে না? বসন্তদাস বিরক্ত হয় লোকটির অতিমাত্রায় শিষ্ট আচরণ দেখে। তার মনে হয়, এ তো দাসের আচরণ? কতোকাল মানুষ কেবলি দাসত্ব করে যাবে? মনুষ্যজন্মের অর্থই কি দাসত্ব? ভয় আর সন্ত্রাস কি চিরকাল মানুষকে দাস করে রাখবে? এরা কি বারেকের জন্যেও সংঘবদ্ধ হতে পারে না? বোঝে না কি যে সংঘবদ্ধ বাহুবল কি বিপুল ও প্রচণ্ড শক্তি ধারণ করতে পারে?
বারবার প্রশ্নটি তার মনে আলোড়িত হতে থাকে।
সন্ধ্যা সমাগত প্রায়। দূরে বেণুধ্বনি শোনা যায়। বসন্তদাসের নিজ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ হয়। পূর্বদেশের গ্রামগুলিতে সে ভ্রমণ করেছে বন্ধু মিত্রানন্দের সঙ্গে, প্রাচীন পুন্ড্রনগরীতেও সে গিয়েছিলো–সর্বত্রই তার এক অভিজ্ঞতা। রাজশক্তি প্রজাপীড়ন ছাড়া অন্য কাজে কোথাও ব্যবহৃত হয় না। এই রাজশক্তি যে প্রকৃতপক্ষে দুর্বল, এ সত্য কেউ স্বীকার করে না। তারা শুধু মহারাজ লক্ষ্মণ সেন দেবের হস্তীবাহিনী, অশ্ববাহিনী এবং পদাতিকের সংখ্যাটি দেখতে পায়, আর কিছু দেখতে পায় না।
ঐ সময় সে একটি বালককে দ্রুত ছুটে আসতে দেখলো। বালকটি দ্রুত নিকটে এসে জানালো, আপনি এখানে? ওদিকে আপনার সন্ধান করা হচ্ছে।
কেন? বসন্তদাস অবাক হয়।
সামন্ত হরিসেনের গৃহ থেকে দুজন প্রহরী এসেছে–তারা আপনাকে সামন্ত গৃহে নিয়ে যেতে চায়।
বসন্তদাস চমকিত হলো। কিন্তু বালকটিকে সে বুঝতে দিলো না। বললো, তুমি গৃহে যাও, আমার সঙ্গে যে তোমার সাক্ষাৎ হয়েছে এ কথাটি প্রকাশ করো না।
অতঃপর বসন্তদাস? নিজেকে প্রশ্ন করে সে। ঘনায়মান অন্ধকার, নদীর ছলোচ্ছল স্রোতধারা এবং নক্ষত্রের দিকে দৃষ্টিপাত করে সে কয়েকবার এবং নিজেকে বলে, এইবার তাহলে তোমাকে জীবনের সম্মুখীন হতে হচ্ছে–তুমি না সংঘর্ষ চাইতে না?
তুমি না হিংসা প্রতিহিংসা উভয়ের নিবৃত্তি চেয়েছিলে? বলেছিলে, যবন জাতিকে আমন্ত্রণ জানানো অনুচিত–এখন তুমি কী করবে?
অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিলো। বসন্তদাস স্থির করলো, আপাতত সে পুনর্ভবার পরপারে আশ্রয় নেবে। না, হরিসেনের সঙ্গে সাক্ষাতের কোনো বাসনা তার নেই। ঐ সময় আকাশের নক্ষত্রমালায় সে প্রিয়তমা পত্নী মায়াবতীর মুখখানি দেখতে চাইলো, কিন্তু দেখলো, শুধু মায়াবতী নয়–আরও একটি মানবীর মুখ সে দেখতে পাচ্ছে। সে বুঝলো, বালগ্রামের মন্দিরদাসী কৃষ্ণাকে বিস্মৃত হওয়া অতো সহজ নয়।
নবগ্রাম হাট থেকে শ্যামাঙ্গ ঊর্ধ্বশ্বাসেই পলায়ন করেছিলো। নিশ্চয়ই পলায়ন সেটা। তোমার নিজের অনিচ্ছায়, ভীত হয়ে, লাঞ্ছিত হয়ে, দ্রুত স্থান ত্যাগ করাকে আর কি বলা যায়? নিশ্চয়ই তাকে পলায়ন বলতে হবে। শ্যামাঙ্গ পথ ভুল করে। ঐ সময় তার দিগ্বিদিক জ্ঞান থাকবার কথা নয় এবং ছিলোও না। সে পশ্চিমাভিমুখে অগ্রসর হয়। পথ ছিলো বনভূমির মধ্য দিয়ে। ঐ বনভূমিরই মধ্যে এক পল্লীতে রাত্রিবাস করে সে তার যথাসর্বস্ব হারায়। শুনেছিলো সে যে বনভূমির পল্লীগুলিতে দস্যুদের বাস। তবু ঈশ্বরের কাছে সে কৃতজ্ঞ যে দস্যুরা তার প্রাণ হরণ করেনি। করতে পারতো–সাধারণত করাই নিয়ম–কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক, তার ক্ষেত্রে ঐ ব্যতিক্রমটি ঘটেছে।
কপর্দকহীন অবস্থায় সে বনভূমিও অতিক্রম করে। দেখে যে রাত্রিকালই বরং ভ্রমণের জন্য অধিকতর নিরাপদ। ব্যাঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। কিন্তু বরাহ ভল্লুক ইত্যাদির সঙ্গে কয়েকবারই তার সাক্ষাৎ লাভ ঘটেছে। দেখেছে, মানুষের চাইতে পশু সত্যিই কম বিপজ্জনক।
যে বর্ধিষ্ণু গ্রামটিতে প্রথম এবং সাদর আপ্যায়ন পায় তার নাম কুসুম্বী। সেখানে সে কয়েকদিন অবস্থান করে। গৃহস্থ ছিলেন কুম্ভকার–সুতরাং দরিদ্র হলেও কর্মের বিনিময়ে তারা তাকে উত্তম আশ্রয় দেয়।
সে তখন অনন্যোপায়। তাকে কিছু উপার্জন করতে হবে। তারপর তাকে আবার গৃহে প্রত্যাগমনের চেষ্টা করতে হবে। তার এখন মনে হয়, গুরু বসুদেব সম্ভবত এই সকল পরিস্থিতির জন্য শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ করেছেন। তার হাসি পায় নিজের অবস্থা দেখে। আসলেই সে মূর্খ। যে শক্তি সমগ্র সংসারে বিস্তৃত, সেই শক্তির প্রতিকূলে সে যেতে চেয়েছে কোন সাহসে? তার শক্তি কোথায় যে সুধীমিত্রের মতো সামন্তপতির ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাবে? ধর্ম আছে, শাস্ত্র আছে, সংস্কার আছে–সে নিজ ইচ্ছায় চলতে চাইলেই হলো? নীচ দস্যুর কাছে যে কৃপার পাত্র–তার আবার শিল্পী হবার সাধ?
কুসুম্বীতে অধিকাংশই ক্ষেত্ৰকর। এখানে ভূমি প্রায়শঃ সমতল এবং নদীতীরবর্তী বলে বৎসরের অধিকাংশ সময় থাকে আর্দ্র ও উর্বরা। গৃহস্থরা ধনশালী না হলেও প্রায় সকলেই সম্পন্ন। সুতরাং শ্যামাঙ্গকে অবাঞ্ছিত জ্ঞান করে না কেউ। তদুপরি সে কর্মবিমুখ নয়–কুম্ভকারের কাজগুলি সে যত্নসহকারেই নিষ্পন্ন করে। মনোহরদাস বৃদ্ধ হয়েছেন, সকল কাজ তাকে দিয়ে হয় না। ওদিকে আবার তার পুত্রটি রত্নবিশেষ। বুদ্ধিতে বাতুলপ্রায়–এবং শ্রমকাতর। অথচ এই সময়ই কুম্ভকারদের উপার্জনের কাল, দূরে–অদূরে মেলা হচ্ছে, তৈজসাদি যতো অধিক নির্মিত হবে ততোই উপার্জন বৃদ্ধি পাবে। মনোহরদাস চিন্তাগ্রস্ত ছিলেন। এমন সময় শ্যামাঙ্গকে পেয়েছেন তিনি। তাঁর আশা, শ্যামাঙ্গ যদি তার কাছে থাকে, তাহলে এ বৎসর ভালো উপার্জন করবেন। তাই তিনি শ্যামাঙ্গকে স্নেহ প্রদর্শন করতে কখনও কার্পণ্য বোধ করেন না। কিন্তু শ্যামাঙ্গের আচরণ লক্ষ্য করে মনে তার শঙ্কা জাগে। মনে হয় তরুণটি অত্যধিক রহস্যময়। একেকদিন দিগন্ত পানে এমন উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে যে ডাকলেও উত্তর পাওয়া যায় না। কিংবা বালখিল্য পুত্তলি নির্মাণের সময় এমন অভিনিবেশসহকারে সে কাজ করে, যে না দেখলে বিশ্বাস হবার কথা নয়। মনোহরদাস অবাক হন, একটিমাত্র পুত্তলি গঠনেই সে দণ্ডাধিককাল ব্যয় করে। তবে হ্যাঁ–যা করে সে, তার তুলনা হয় না। মৎস্য হোক, গোয়ালিনী হোক, মৃৎশকট হোক, পক্ষী হোক–বড় সুন্দর পুত্তলিগুলি।
শ্যামাঙ্গ যেদিন কর্ম থেকে অবকাশ প্রার্থনা করলো সেদিন মনোহরদাস বিলক্ষণ উদ্বিগ্ন হলেন। বারবার জানতে চাইলেন–বৎস, আমরা জানি তোমাকে স্বদেশে প্রত্যাগমন করতে হবে–কিন্তু তবু এখানে কি তোমার কোনো সমস্যা হয়েছে, বলো?
না না, এ আপনি কি বলছেন, শ্যামাঙ্গ বৃদ্ধকে আশ্বস্ত করতে চেষ্টা করে। বলে, আপনার কৃপায় আমার জীবন রক্ষা পেয়েছে, সে কথা কি বিস্মৃত হওয়া সহজ, আপনিই বলুন?
সে বৃদ্ধকে বোঝাতে চেষ্টা করে যে অন্যকিছু নয়–সে পার্শ্ববর্তী গ্রাম উজুবটে যাবে–সেখানে তার বন্ধু আছে কয়েকজন। তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা তার অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। সাক্ষাৎ করেই পুনরায় চলে আসবো, শ্যামাঙ্গ বৃদ্ধকে জানায়। বলে, আপনি নিশ্চিত থাকুন, আমার দ্বারা আপনার কোনোরূপ ক্ষতি আমি হতে দেবো না।
হ্যাঁ, উজুবটেই যাবে সে। দুজন যোগীর সঙ্গে অতি সম্প্রতি তার সাক্ষাৎ হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন পশ্চিমদেশাগত–সে উজুবট যাওয়ার জন্য ব্যাকুল। সঙ্গী যোগীটি প্রকৃতই যোগী, সকল ব্যাপারেই তার সীমাহীন অনাসক্তি। সঙ্গীর উজুবট গ্রামে যাবার আগ্রহ দমন করে রেখেছে সে অদ্ভুত কৌশলে। এতকাল বলে এসেছে উজুবট বহুদূর। সে এখন সে কথা বলতে পারে না, কেননা আগন্তক যোগী স্থানীয় ভাষা বিলক্ষণ বুঝতে শিখেছে। সে এখন বলে, উজুবটের গ্রামপতি এবং তার অনুচরেরা ভয়ানক যোগীদ্বেষী, একবার যদি আয়ত্তের মধ্যে পায়, তাহলে আর রক্ষা নেই।
শ্যামাঙ্গের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় যোগীটি প্রথম বুঝতে পারে যে, তার সঙ্গীটি তার সঙ্গে এতকাল চাতুরী করে এসেছে। সে শ্যামাঙ্গকে ক্রমান্বয়ে অনুরোধ করতে থাকে। জানায়, উজুবটে তার একজন গুরু অবস্থান করছেন–তাঁর কাছে একটি সংবাদ অবশ্যই উপস্থিত করতে হবে–ইতোমধ্যেই অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে তার।
শ্যামাঙ্গের মনেও একটি বাসনা ছিলো। তার বিপদগ্রস্ত অনিশ্চিত অবস্থায় বাসনাটি প্রবল হতে পারেনি–বলা যায়, সুপ্ত অবস্থাতেই বিরাজ করছিলো। কিন্তু যেই তার অবস্থা কিঞ্চিৎ স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, অমনি সে উজুবট গ্রাম সম্পর্কে সংবাদাদি সংগ্রহ করতে আরম্ভ করে দিলো। ঐ সময়ই সে নিজের মনের একটি দিক আবিষ্কার করে স্তম্ভিত হয়ে যায়। তার ধারণা ছিলো মায়াবতীর মাতাকে দেখবার জন্যই সে উজুবট যাবে। তার মাতৃময়ী মূর্তিটি তার মনে বারবার আসছিলো। এই প্রকার যখন তার মানসিক অবস্থা, ঐ সময়, একদিন মনোহরদাস একটি পুত্তলি তার হাতে এনে দিলেন। জানতে চাইলেন, এইটি কি তোমার গঠন?
কেন, কি হয়েছে? শ্যামাঙ্গ ঈষৎ শঙ্কা বোধ করে, কারণ মনোহরদাসের মুখ অতিশয় গম্ভীর ঐ সময়।
মনোহরদাস জানায়, এ কি গোয়ালিনী মূর্তি হয়েছে, তুমিই বলো?
শ্যামাঙ্গ তখন মনোযোগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। এবং চকিতেই বিমূঢ় হয়ে যায়। এ কে? এ কার মূর্তি? ক্ষুদ্র পুত্তলি–কিন্তু ভঙ্গিটি অবিকল ধরা পড়েছে–রমণীর গমনভঙ্গি ওটি–দৃষ্টি দূরে নিবদ্ধ, গ্রীবাটি ঈষৎ বঙ্কিম, দক্ষিণপদ সম্মুখে প্রসারিত। রমণীটিকে এবং নিজ মনের একটি দিক একত্রে আবিষ্কার করে সে মরমে মরে গেলো। ছি ছি–এ কোন চিত্র তার অন্তরে মুদ্রিত হয়ে রয়েছে চিরকালের জন্য? এ তো অবিকল লীলাবতী, উজুবট গ্রামের লীলাবতী!
সে মনোহরদাসকে জিজ্ঞাসা করে, তাহলে কি পুত্তলিগুলি বিনষ্ট করতে হবে?
না, তা নয়, চিন্তিত মুখে বলেন মনোহরদাস, পুত্তলি অত্যন্ত সুন্দর হয়েছে, আমার চিন্তা হচ্ছে, এই পুত্তলি অধিক সংখ্যায় বিক্রয় হবে কিনা–ক্রেতারা তো গোয়ালিনী চাইবে তোমার কাছে–এ কি গোয়ালিনী? যদি গোয়ালিনী না হয়, তাহলে বলো, এর নাম কি দেবে? মালিনী?
নাম? শ্যামাঙ্গ এই দিকটি কখনই চিন্তা করেনি। সে বললো, নাম যে কুলসূচক হতেই হবে, এমন কি কোনো বিধান আছে? নাম তো ব্যক্তির পরিচায়ক চিহ্ন মাত্র। যে কোনো নাম দিলেই হয়।
বলল, কি নাম দেবে? মনোহরদাস আগ্রহভরে শ্যামাঙ্গের মুখপানে চান।
শ্যামাঙ্গের মনে তখন একটি নামই উচ্চারিত হচ্ছে। বললো, ওর নাম দিন লীলাবতী!
লীলাবতী! মনোহরদাস ক্ষণেক চিন্তা করলেন, তারপর বললেন, উত্তম–তাই হোক, এই নতুন পুত্তলির নাম হোক লীলাবতী।
শ্যামাঙ্গ মনোহরদাসকে সন্তুষ্ট করলো বটে, কিন্তু নিজ বিবেকের নিকট সে অপরাধ বোধ করতে লাগলো। নিজ মনের এ কি রূপ দেখছে সে? কখন লীলাবতী এমনভাবে তার মানস লোকে স্থান করে নিয়েছে, সে জানতেও পারেনি। শোণিত ধারার প্রবাহ কি মানুষ জানতে পারে? লীলাবতী কি তাহলে তার শোণিত ধারার মধ্যে মিশে গিয়েছে? সে কি মিশেছে তার শ্বাসে–নিঃশ্বাসে? তার স্বপ্নে? কল্পনায়?
ছি ছি, এ কী হলো? ধিক তোকে শ্যামাঙ্গ? শতবার ধিক তোকে–বিশ্বাসঘাতক কোথাকার!
নিজেকে শ্যামাঙ্গ ধিক্কার দেয়। হ্যাঁ বিশ্বাসঘাতকতাই তো সে করেছে। লীলাবতীর কাছে সে না প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে যে তার স্বামী অভিমন্যু দাসকে এনে দেবে? আর সে নিজেই কিনা হয়ে পড়লো আসক্ত? ছি ছি, ছি ছি, শ্যামাঙ্গ বিবেক দংশনে অস্থির হয়ে ওঠে।
কিন্তু এসবই বালির বাঁধ–ক্ষণে থাকে, ক্ষণে থাকে না। বরং ঐ প্রকার বিবেক দংশন তার আবেগকে অধিকতর উদ্দীপ্ত করে তুললো। যোগীটির পীড়াপীড়ি উপলক্ষ মাত্র–এমনকি মায়াবতীর মাকে প্রণাম করার ইচ্ছাটিও উপলক্ষ বই অন্য কিছু নয়। সে যোগীটির সঙ্গে উজুবটের দিকে যাত্রা করলো।