চৈত্রের দাবদাহে অশ্বত্থছায়া বড়ই শ্রান্তিহারক। নতুবা এতো শীঘ ক্লান্তি অপনোদন সম্ভব ছিলো না। দণ্ড দুই আগেও তার দৃষ্টি ছিলো অস্বচ্ছ। দৃশ্যবস্তু বিচিত্র বিভঙ্গে দোলায়িত হচ্ছিলো। কঠিন পথ বারেক মনে হচ্ছিলো সম্মুখে ঢেউয়ের মতো উপরে উঠছে, আবার মনে হচ্ছিলো, ক্রমেই নেমে যাচ্ছে অতলে। পদক্ষেপও তখন স্ববশে ছিলো না। প্রমত্ত মাদকসেবীর মতোই সে টলে টলে যাচ্ছিলো। কখনও বামে, কখনও দক্ষিণে।
সে বড় বিচিত্র অবস্থা। এখন স্মরণ হলে কৌতুক বোধ হয়। অবশ্য তখনও তার কৌতুক বোধ হচ্ছিলো। কৌতুক বোধ হবারই কথা। কারণ প্রথমে তুমি দেখলে বংশবীথিকার বিনত শাখায় একটি বনকপোত। পরক্ষণে সেই ক্ষুদ্রাকার পাখিটি হয়ে গেলো একটি উর্ধলক্ষী মর্কট–মুহূর্তেক পরে সেই মর্কটও আর থাকলো না, নিমিষে হয়ে গেলো একটি বিশুষ্ক বৃক্ষশাখা। চক্ষু কচালিত করলে অতঃপর তুমি আর কিছুই দেখলে না। বংশবীথিকা না, বনকপোত না, মর্কট না–বিশুষ্ক শাখাও না। কী অদ্ভুত কাণ্ড আসলে কিছুই নেই সম্মুখে। শুধুই ক্রোশ ক্রোশ ব্যাপ্ত কুশক্ষেত্র। গ্রাম নেই দিগন্ত রেখায়, বৃক্ষরাজি গোচরে আসে না, প্রান্তরের বিস্তৃতি কেবলই দূর থেকে দূরে প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে, আকাশসীমা ধূসরতায় বিলীন।
শ্যামাঙ্গ অশ্বত্থের ছায়ায় শয়ান অবস্থায় নিমীলিত চোখে নিজ অভিজ্ঞতা স্মরণ করে। সে বোঝে, তার মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব ছিলো না। তার সৌভাগ্য যে ঐ সময় দূর থেকে একটি পথিক দল তাকে দেখতে পায়। তার কিছুই স্মরণ নেই, কখন সে ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলো, কখন ছুটে এসেছিলো পথিক দল এবং কীভাবেই বা তারা শুশ্রূষা করে তার জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছে।
প্রৌঢ় লোকটি ঐ সময় কাছে এসে জানতে চাইলেন, এখন সুস্থ বোধ করছেন তো?
শ্যামাঙ্গ কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা খুঁজে পায়নি এতোক্ষণ। এবার বললো, আপনারা আমার প্রাণরক্ষা করেছেন–আমি কীভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো জানি না
থাক, থাক, এখন ওসব কথা নয়–আপনি বিশ্রাম নিন, পথিক প্রৌঢ়ের কণ্ঠে প্রগাঢ় মমতা প্রকাশ পায়।
অশ্বত্থের পাতায় পাতায় চৈত্রের বাতাস শব্দ করে যাচ্ছিলো। শ্যামাঙ্গ সেই শব্দ শুনতে শুনতে আবার নিমীলিত–চক্ষু হলো। তার মনে হচ্ছিলো, প্রৌঢ় পথিক অহেতুক তার জন্য চিন্তিত হয়ে রয়েছেন। সে এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। একবার ভাবলো, উঠে দাঁড়ায়, কিন্তু পরক্ষণে মনে হলো, কী দরকার প্রৌঢ় লোকটিকে অস্থির করে, আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলেই বা ক্ষতি কি? ততক্ষণে নদীতীর থেকে লোকটি ফিরে আসুক।
প্রৌঢ় পথিক ঐ সময় পুনরায় কাছে এসে উপবেশন করলেন। বললেন, আপনি কি আমাদের সঙ্গী হবেন?
শ্যামাঙ্গ বুঝতে পারে না, কী করবে। কিছু পূর্বে প্রৌঢ়ের আরও একজন সঙ্গী এই প্রশ্ন করেছিলো। তখনও সে কিছু বলতে পারেনি। নৌকাযোগে এরা যাবে দক্ষিণে, বাণপুরের দিকে–আর তাকে যেতে হবে আত্রেয়ী তীরে, রজতপটে। কিছুদূর পর্যন্ত সঙ্গী হওয়া যায়। তারপর তাকে আবার একাকীই পথে নামতে হবে। সে অকপট হলো প্রৌঢ়ের কাছে। বললো, আমার গন্তব্য তো আপনার জানা, আপনিই বলুন, আমার কি কর্তব্য–আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আপনি পরামর্শ দিন।
প্রৌঢ়টি কিছু বলতেন হয়তো। কিন্তু ঐ সময়ই প্রেরিত লোকটিকে ছুটতে ছুটতে আসতে দেখা গেলো। সে জানালো যে অনতিবিলম্বে একখানি নৌকা যাত্রা করবে তাদের গন্তব্যের উদ্দেশে।
যারা লম্বমান হয়ে ছিলো অশ্বত্থ তলে, তারা লম্ফ দিয়ে উঠলো এবং যাত্রার জন্য প্রস্তুত হতে আরম্ভ করলো। প্রৌঢ়টিও ঈষৎ চঞ্চল হলেন। তবু তিনি পুনরায় জানতে চাইলেন, আপনি কি যাবেন আমাদের সঙ্গে?
শ্যামাঙ্গ এবারও কোন উত্তর দিতে পারে না।
শেষে নিজেই বললেন প্রৌঢ়, আপনাকে একাকী এভাবে রেখে যেতে প্রাণ চায় না। আর যদি সঙ্গে নিয়ে যাই, তাহলে পরে গৃহে প্রত্যাবর্তনের কালে আপনার অধিকতর কষ্ট হবে, সেও এক চিন্তার বিষয়।
কথাটা ঠিক। সত্যিই যদি পুনর্ভবার স্রোতোবাহী হয়ে দক্ষিণে যেতে হয় তাকে, তাহলে মধ্যপথে তাকে নৌকা থেকে নামতে হবে এবং দীর্ঘতর পথ অতিক্রম করতে হবে পদব্রজেই। ঐ পথ আবার অরণ্য–সঙ্কুল।
শ্যামাঙ্গ যাবে কি যাবে না সেই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার পূর্বেই পথিক দল অশ্বত্থ তল পরিত্যাগ করলো। এক যুবকের স্কন্ধে দেহভার রেখে ধীর পদক্ষেপে শ্যামাঙ্গও হেঁটে এলো নদীতীর পর্যন্ত। সেখানেও একটি বটবৃক্ষ ছিলো। শ্যামাঙ্গ বটতলে উপবেশন করে চতুর্দিকে চেয়ে দেখলো, ছায়াদায়ী বৃক্ষ একটি নয়, কয়েকটি। তার অনুমান হলো, পুনর্ভবা তীরের অধিবাসীরা সজ্জন। স্থানটি তার ভালো লাগলো। বিশ্রামস্থলটি ভারী মনোরম।
পর পারে একটি ধবল গাভী চরছে–দুটি ছাগ শিশুকে তাড়না করে ছুটছে একটি শ্যামলী বালিকা। নদীর জলস্রোত ভারী ধীর। তীরের নৌকাগুলি ভাসমান কিন্তু স্থির। মনে হয় না, তাদের নিচে জলস্রোত বইছে।
পথিকেরা কাল বিলম্ব না করে নৌকায় আরোহণ করলো। তারা কেন যে অস্থির হয়ে উঠেছিলো বলা দুষ্কর। কেনো নৌকাটি শীঘ্র যাত্রা করবে এমন মনে হচ্ছিলো না।
নৌযানটি বৃহৎ নয়, তবে এই স্বল্প পরিসর নদীতে ওটিকে বৃহৎই দেখাচ্ছিলো। যাত্রী এবং নানাবিধ সামগ্রীতে পূর্ণ হয়ে রয়েছে বলে অনুমান হলো। কারণ যাত্রীদের অনেকেই আচ্ছাদনীর বাইরে বসে আছে। নৌযানটির বহির্দেহে নানান কারুকার্য। ঐ প্রকার কারুকার্য সে আত্রেয়ী তীরে কখনও দেখেনি।
প্রৌঢ় পথিক তখনও নৌকায় আরোহণ করেননি। তার মধ্যে কেমন ইতস্তত একটি ভাব। কি ভাবছিলেন তিনিই জানেন। শেষে কাছে এসে জানতে চাইলেন, আপনি সুস্থ বোধ করছেন তো? ভেবে দেখুন, আমাদের সঙ্গে যাবেন কিনা। আপনি একাকী, তায় এমন অপরিচিত স্থান
শ্যামাঙ্গ লক্ষ্য করলো ঐ সময়, প্রৌঢ়ের চক্ষু দুটিতে বড় মায়া। প্রিয়জনের জন্য আন্তরিক উদ্বেগ ফুটে আছে তার মুখভাবে। সে বললো, অহেতুক উদ্বিগ্ন হচ্ছেন আপনি, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
ঐ কথার পরও প্রৌঢ় আশ্বস্ত হলেন কি না বোঝা গেলো না। খুব ধীর পদক্ষেপে, অনিশ্চিত ভঙ্গিতে, তিনি নদীর দিকে অগ্রসর হলেন।
প্রৌঢ়ের গমন পথের দিকে দৃষ্টি রেখে শ্যামাঙ্গ ক্ষুদ্র একটি নিঃশ্বাস ফেললো। ঐ মুহূর্তে নিঃসঙ্গ লাগলো নিজেকে। সে উঠে বসলো। এইভাবে শয়ান অবস্থায় সে কতক্ষণ থাকবে? তার এবার ওঠা উচিত। একাকিত্বই তার ভবিতব্য। কখনও তো সে সঙ্গলাভ করতে পারেনি। গুরুদেব তাকে ত্যাগ করেছেন, সতীর্থ বন্ধুরা তার সঙ্গী হয়নি কখনও, আর এ তো মাত্রই দণ্ড দুয়েকের সান্নিধ্য। তবে ভারী সজ্জন এদেশের লোক। বিশেষত প্রৌঢ়টি একেবারেই আপনজনের মতো আচরণ করছিলেন। তার মনে হলো, প্রৌঢ়ের কথা শুনলেই হয়তোবা তার জন্য ছিলো ভালো।
দ্বিতীয় দীর্ঘ নিঃশ্বাসটি নির্গত হওয়া মাত্রই সে নিজেকে ধরে ফেললো। বুঝলো, তার মনের মধ্যে আশ্রয় লাভের একটি বাসনা আবার জেগে উঠতে চাইছে। আসলেই কি তার লতার স্বভাব? সহকার শাখা দেখলেই অবলম্বনের জন্য লোলুপ হয়ে ওঠে? ধিক তোকে, ধিক দুর্বলচিত্ত কাপুরুষ! তোর শিক্ষা হয় না এতো কিছু কাস্ত্রে পরও। ঐ একাকী নদীর বটতলে বসে বসে সে নিজেকে ধিক্কার দিতে আরম্ভ করলো।
কিন্তু তখনও বিস্ময়কর ঘটনাটি ঘটেনি।
সে পশ্চাতের দৃশ্যাবলীতে মনোনিবেশ করেছে তখন। না, নৌকাটির দিকে সে আর দৃষ্টিপাত করবে না। সে দেখছিলো দুটি বালককে। দূরের বৃক্ষতলে দণ্ডগুলি খেলায় তারা মত্ত। ভাবছিলো, বালক দুটিকে ডাকলে কেমন হয়। ঐ সময় দৃষ্টি ফিরিয়ে আনতেই সে দেখলো, প্রৌঢ় ব্যক্তিটি আবার উঠে আসছেন। এ আবার কি কাণ্ড! লোকটির মস্তিষ্কে কি দোষ আছে? নৌকা ওদিকে প্রস্তুত–আর উনি চলে আসছেন? তার মনে কৌতূহল জাগ্রত হয়।
পশ্চাতে একজন যুবক চিৎকার করে ডাকছে, তবু প্রৌঢ়ের ভ্রূক্ষেপ নেই।
তার মনে হলো, লোকটি বোধ হয় তাকে নিয়ে যাবার জন্য আসছেন। সে মনে মনে কঠিন হলো। না, আর সে পরনির্ভর হতে যাবে না। প্রৌঢ়টি নিকটে এলে সে হাসলো, কি সংবাদ, আবার যে ফিরলেন?
হ্যাঁ ফিরলাম, তোমার ব্যাপারে নিশ্চিত বোধ করতে পারছি না।
এবার শ্যামাঙ্গ উঠে দাঁড়ালো। বললো, দেখুন আপনার বিশ্বাস হয় কিনা–আমি প্রকৃতই এখন একজন সুস্থ ব্যক্তি।
শ্যামাঙ্গকে দেখতে লাগলেন প্রৌঢ়টি। তাঁর দৃষ্টি যেন সরতে চায় না। হঠাৎ জানতে চাইলেন, বৎস, কিছু মনে করো না, তুমি সম্বোধন করছি বলে, সত্যিই কি তুমি আত্রেয়ী তীরের লোক?
এ আবার কি রহস্য! শ্যামাঙ্গ হতচকিত হয়। বলে, এ আপনি কি বলছেন? আপনাকে মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আমার কি লাভ?
প্রৌঢ় অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, আমার কেমন মনে হচ্ছে তোমাকে একাকী রেখে যাওয়া আমার উচিত নয়। তুমি আমাদের সঙ্গে চলো–দুদিন আমরা তঙ্গন তীরের মেলায় অবস্থান করবো। তারপরই আবার ফিরে আসবো। তোমার মন্দ লাগবে না, এ অঞ্চলের মেলায় নানান উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক ক্রিয়াকারে সমাবেশ হয়।
শ্যামাঙ্গ হাসলো, না মহাশয়, সত্বর গৃহে ফেরা আমার বিশেষ প্রয়োজন।
প্রৌঢ় অধোমুখে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর আবার শ্যামাঙ্গের মুখোমুখি হলেন। বললেন, তুমি বিরক্ত হয়ো না বস। একটি কথা জিজ্ঞাসা করি, অর্থ–সামগ্রী কিছু আছে তো তোমার? না হলে কিন্তু পথিমধ্যে বিপদ হতে পারে।
শ্যামাঙ্গের এতোক্ষণে যেন সম্বিৎ হয়, সত্যিই তো, ও চিন্তা তো তার মস্তিষ্কে আসেনি। সে কটিদেশে দুহাত স্পর্শ করে আশ্বস্ত হয়না, কটিবন্ধনে স্থলীটি অক্ষতই আছে। বললো, আমার সঙ্গে কিছু পাথেয় অবশ্যই আছে–কিন্তু আমি কৃতজ্ঞতার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না–আপনি আমার প্রতি এতো স্নেহশীল হয়ে উঠেছেন যে
প্রৌঢ় শ্যামাঙ্গের কৃতজ্ঞতা–ভাষণ সম্পূর্ণ শুনলেন না। বলে উঠলেন, বস, তোমাকে কি বলবো বলো, আমি একজন হতভাগ্য পিতা। আমার একটি বন্ধু পুত্র ছিলো–নিজের পুত্র নেই–ওকেই আমি পুত্রবৎ স্নেহ করতাম, আমার কন্যাটিও ওকে বড় ভালবাসতো, কিন্তু গত বছর এমনই সময়ে দস্যুহস্তে সে–
আর বলতে পারলেন না। বাকরুদ্ধ অবস্থায় থাকলেন কিছুক্ষণ। ক্ষণেক পরে আবার বললেন, আমার কন্যা বিশ্বাস করে না যে সে নেই–সে অপেক্ষা করে আছে, চন্দ্রদাস ফিরে আসবে এবং তার বিবাহ হবে।
প্রসঙ্গটি করুণ। প্রৌঢ় পথিকের আবেগ বিহ্বল ভাব, তাঁর মুখের তুমি সম্বোধন এবং সর্বোপরি শ্যামাঙ্গের জন্য তাঁর উদ্বেগ বিচলিত করে দিলো শ্যামাঙ্গকে। সে কী বলবে ভেবে উঠতে পারছিলো না। বিমূঢ় দৃষ্টিতে সে প্রৌঢ়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলো। এই প্রৌঢ়কে কী বলবে সে? তাকে অবলম্বন করে তাঁর ব্যাকুল চিত্ত হয়তো উদ্বেল হয়ে উঠেছে। নিজের কন্যার বেদনা–ভার বহন করতে করতে তাঁর হৃদয় ক্লান্ত, এখন যদি তাঁর আশা হয়ে থাকে যে, বান্ধবহীন স্বজনহীন একাকী পথিক তার বেদনার ভার কিছুটা লাঘব করতে পারবে, তাহলে কি সেটা তার অপরাধ?
ঐ সময় সমস্বরে চিৎকার আরম্ভ হয় নৌকা থেকে। তাতে শ্যামাঙ্গ সচকিত হয়। বলে, আপনার সঙ্গীরা ওদিকে বড় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।
হ্যাঁ, যাই আমি, প্রৌঢ় পশ্চাতে দেখে নিলেন বারেক। তারপর বললেন, বৎস, এটি তুমি রাখো, পথে তোমার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রৌঢ় পথিক চলে গেলেন। জয় গঙ্গা মাতা বলে নৌকাটি ভাসলো স্রোতের অনুকূলে। প্রৌঢ় প্রদত্ত বস্ত্রখণ্ডে কুণ্ডলীকৃত বস্তুটি হাতে নিয়ে শ্যামাঙ্গ বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। নৌকাটি দৃশ্যের বাইরে চলে গেলে তার সম্বিৎ ফিরলো। তখন সে কুণ্ডলীকৃত বস্ত্রখণ্ড খুলে দেখলো। অবাক হবার মতোই ব্যাপার। মাত্রই দণ্ড দুতিনের পরিচয়। কিন্তু তবু এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তার শুশ্রূষা করেছেন, সাধ্য মতো চেষ্টা করেছেন সুস্থ করে তুলতে–তদুপরি আবার এই দান! দেখলো বস্ত্রখানি উত্তরীয় এবং তারই এক কোণে গ্রন্থিবদ্ধ কয়েকটি মুদ্রা। তার মনে হলো এই দান স্নেহধন্য। সে পরম শ্রদ্ধাভরে দান গ্রহণ করলো।
কি বিচিত্র এই সংসার। কোথাও সে বিতাড়িত হচ্ছে। আবার কোথাও তাকে স্নেহডোরে বাঁধবার জন্য ব্যাকুল বাহু প্রসারিত হয়ে আছে। তার ইচ্ছা হলো প্রৌঢ় পথিকের গ্রামে গিয়ে কন্যাটিকে দেখে আসে একবার। আহা কি আকুল প্রতীক্ষায় দণ্ড পল অনুপল কাটছে বালিকাটির। বালিকা না তরুণী সে কিছুই জানে না। এ কিসের প্রতীক্ষা করছে তরুণীটি–জীবনের না মরণের? শবরীর প্রতীক্ষার কাহিনীটি তার মনে পড়ে। একটি মৃত্যলকে চিত্রটি সে উত্তীর্ণও করেছিলো। কিন্তু হায়, গুরু বসুদেব বুঝতে চাইলেন না।
সে ধীরপদে নদীতীর ধরে অগ্রসর হলো। যে বালক দুটি দণ্ডগুলি নিয়ে খেলছিলো তারা শ্যামাঙ্গকে দেখেও যেন দেখলো না। শ্যামাঙ্গ যখন জানতে চাইলো, বাপু হে, তোমাদের নিবাস কোন গ্রামে? তখন সীমাহীন বিরক্তি নিয়ে তারা শ্যামাঙ্গের আপাদ মস্তক দেখে নিলো। অতঃপর একটি বাক্যও ব্যয় না করে হাত তুলে এমন একটি দিক নির্দেশ করলো যেটি পূর্ব–পশ্চিম, উত্তর–দক্ষিণ, ঊর্ধ্ব–অধঃ সব দিকই হতে পারে।
পথক্রমণ করতে করতে সে অনুভব করলো শরীরে এখনও তার অবসাদ, সর্বাঙ্গে ব্যথা অনুভব হচ্ছে। সূর্য এখন মুখোমুখি। দেখে মনে হচ্ছে, পশ্চিমাকাশে একখানি উত্তপ্ত তাম্রস্থালী কেউ যেন সংলগ্ন করে রেখেছে।
তার কেবলি মনে হতে লাগলো নীলাম্বর তাকে ভুল পথের সন্ধান দিয়েছে। সে বলেছিলো, পুনর্ভবা তীরের নবগ্রাম হাটে গিয়ে উপনীত হলে তখন আর সমস্যা থাকবে না তোমার। কিন্তু কোথায় সেই নবগ্রাম হাট? সে জানে, নবগ্রাম হাটে আত্রেয়ী তীরের অনেক গো শকট আসে। আত্রেয়ী তীরে একবার পৌঁছাতে পারলে তখন গৃহ গমন তো এক দণ্ডের ব্যাপার।
সে নদীতীর ধরে অনেকখানি পথ অতিক্রম করে। কিন্তু না, কোনো কোলাহল তার কানে আসছে না। পথে লোকই নেই–কোলাহল করবে কে? কিছুক্ষণ অতিক্রান্ত হলে পথিমধ্যে সে একটি তরুণীর সাক্ষাৎ পায়। তরুণীটি একটি গাভীকে তাড়না করে নিয়ে যাচ্ছিলো। তাকে দেখে শ্যামাঙ্গ দাঁড়ালো। ইতস্তত হচ্ছিলো, কিন্তু জিজ্ঞাসা না করেও পারলো না। সে খুবই বিনয়ের সঙ্গে দুহাত জোড় করে যথাবিহিত সম্মান প্রদর্শন করে বললো, ভদ্রে, আমার নমস্কার গ্রহণ করুন। আপনি বলতে পারেন, এই গ্রামের নাম কি?
তরুণীটি অপাঙ্গে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হানলো চকিতে, তারপর বললো, মরণ! নাটগীতের আর স্থান পাওনি?
দেখুন, আমি দূরের লোক, এ অঞ্চলের পথঘাট কিছুই চিনি না।
পথের রমণীকে তো ঠিক চিনতে পারেন দেখছি।
ঐ তীক্ষ্ণ মন্তব্যে শ্যামাঙ্গ বুঝতে পারে এ অঞ্চলের রমণীরা ক্ষুরধার জিহ্বার অধিকারিণী। প্রয়োজন নেই বাপু তোমাদের সঙ্গে কথার–তোমাদের খুরে দণ্ডবৎ একশতবার, মনে মনে এই বলে সে পুনরায় সম্মুখের দিকে অগ্রসর হলো।
আরও কিছুক্ষণ হাঁটবার পর অতিশয় ক্লান্তি বোধ হয়। অবশেষে শ্যামাঙ্গ একটি বটবৃক্ষের নিচে মৃত্তিকা বেদীতে প্রথমে উপবিষ্ট ও পরে অর্ধশয়ান হলো। তার সন্দেহ হতে লাগলো, নবগ্রাম হাট নিশ্চয়ই দূরে। নীলাম্বর শূকরপুত্রটা তাকে এভাবে বিপদে ফেলবে, কল্পনাও করা যায় না।
বিল্বগ্রাম থেকে প্রত্যুষেই সে বেরিয়ে এসেছিলো। কেননা গুরু বসুদেব যা করেছেন তারপর সেখানে থাকবার, কি বিলম্বের, কোনই অবকাশ ছিলো না। বিগ্রাম থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার সময় নীলাম্বর বলে দিয়েছিলো–বন্ধু, তুমি পথ ধরে গেলে দুতিন দিন সময় লাগবে, আবার পরিশ্রমও হবে। বরং তুমি প্রান্তরে নেমে যেও–পশ্চিমে পুনর্ভবা তীর, মাত্রই ক্রোশ তিনেক পথ–সেখানে নবগ্রাম হাটে তুমি আত্রেয়ী তীরের শকট পাবে।
সেই কথা শুনে এই অবস্থা তার। প্রাণ চলে যাওয়া বিচিত্র কিছু ছিলো না। সে তো রৌদ্র ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় কাতর হয়ে ভূলুণ্ঠিত হয়ে পড়েছিলো। যদি পথিকের দলটি না দেখতে পেতো তাকে–তাহলে ঐভাবে জ্ঞানহারা অবস্থাতেই তার প্রাণবায়ু নির্গত হয়ে। যেতো! পরিশেষে তার শরীর ভক্ষ্য হতো শকুন এবং শৃগালের।
নদী এখানে বঙ্কিম। তীরে কিছু লোক দেখা যাচ্ছে। শ্যামাঙ্গ তীর ত্যাগ করে পথে উঠলো। অদূরে একটি বিশাল অশ্বত্থ বৃক্ষ এবং তলে মৃত্তিকাবেদী। বেদী না বলে মণ্ডপ বলাই সঙ্গত–বিস্তৃত চত্বরের মতো একেবারে। শ্যামাঙ্গ সেখানে গিয়ে উপবেশন করলো। তৃষ্ণা বোধ হচ্ছিলো। বারেক ইচ্ছা হলো নদীর জল পান করে আসে। কিন্তু এমন আলস্য তাকে পেয়ে বসলো ঐ মুহূর্তে যে সে উঠলো না। বরং আরও অলস ভঙ্গিতে অর্ধশয়ান হলো।
চৈত্রের অপরাহ্ন বড় ধীর। সূর্য পশ্চিমাকাশে সংলগ্ন, এমন স্থির যে মনে হয় না কখনও নিচে নামবে। স্থানটি নির্জন নয়। অদূরে কয়েকজন গ্রামবাসী কিছু দেখবার জন্য সমবেত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে এবং ঐ স্থান থেকেই একেক সময় সোল্লাস চিৎকার ধ্বনি উঠে আসছে। কৌতূহলী হয়ে সে উঠে বসলো। লক্ষ্য করে দেখলো, স্থানটি নিচু এবং জলাশয়। সম্ভবত পুনর্ভবারই একটি মৃত শাখা। ঐখানেই মৎস্য শিকার হচ্ছে।
পুনর্ভবার মূল স্রোত এখানে বঙ্কিম। নদী খাত যেটি সরল, সেইটিই মৃত। এমন ঘটনা সাধারণত দেখা যায় না। তবে নদীর মতিগতি তো রমণীরই মতো, সুতরাং সেটি বোঝাও মানুষের সাধ্য নয়।
নদীতীরের ভূমি ঢেউয়ের মতো–কোথাও উন্নত কোথাও অবনত। বেলাভূমিতে স্থানে স্থানে বদরীকুঞ্জ–এখন বিগতফল এবং নিষ্পত্র। ইতস্তত মনসাকণ্টক ও দীর্ঘ তৃণের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঝোপ। শঙ্খচিল উড়ছিলো–দূরে টিট্রিহি টিট্রিহি রবে টিট্রিভ পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিলো। শ্যামাঙ্গের মনে হলো, চরাচর বড় শান্ত। চৈত্রের নদীস্রোত যেমন, তেমনি এ অঞ্চলের জীবনধারাও।
অবশ্য ওদিকে নদীবক্ষে কোলাহল হচ্ছিলো। কিন্তু সেই কোলাহল চরাচরব্যাপী নিঃশব্দতাকে যেন আরও অধিক প্রকট করে তুলছিলো।
সে লক্ষ্য করলো, যারা স্রোতহীন মৃত নদীর জলকে কর্দমাক্ত করে তুলেছে তারা ধীবর নয়, নিতান্তই সাধারণ গ্রামবাসী। তাদের মধ্যে বৃদ্ধ আছে, যুবক আছে, এমনকি বালক–বালিকারাও রয়েছে। ওদের সোল্লাস চিৎকারই থেকে থেকে কানে আসছিলো। এবং ঐ চিৎকারই বুঝিয়ে দিচ্ছিলো যে এই সমবেত মৎস্য শিকার জীবিকার প্রয়োজনে নয়, নিতান্তই আনন্দের কারণে।
সে মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলো। জালপাশ থেকে মৎস্যের উল্লম্ফ পলায়ন, তরুণ ও বালক–বালিকাদের সোল্লাস চিৎকার, নিষিক্ত কৃষ্ণদেহে রৌদ্রের প্রতিফলন–সব একত্রে একটি অসাধারণ দৃশ্য বলে তার মনে হলো। কৌতুক এবং উল্লাস, শক্তি এবং আনন্দ, জল এবং মানবসন্তান–এমন একত্রে আর কখনও তার দৃষ্টিগোচর হয়নি। সে মুগ্ধ নয়নে দেখছিলো এবং তার মনে নানান চিত্র মুদ্রিত হয়ে যাচ্ছিলো।
তার মনে হচ্ছিলো যেন একটি দীর্ঘ চিত্রমালা তার চোখের সম্মুখে গ্রথিত হচ্ছে। ঐ সময়ই আবার গুরু বসুদেবের কথা স্মরণ পথে উদিত হচ্ছিলো। বসুদেব তাকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেননি। বারবার নিষেধ করেছেন। ঘুরে ফিরে এসে দেখেছেন তার কাজ। স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, দেখো, কোনোভাবেই যেন তোমার ফলকে ব্রাত্য প্রসঙ্গ না থাকে– শাস্ত্রানুশাসন বিচ্যুত হয়ো না।
সে একদিন প্রশ্ন করেছিলো, কেন গুরুদেব, ব্রাত্য মুখচ্ছবিতে অপরাধ কি?
অপরাধ? গুরু বসুদেবের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছিলো। বলেছিলেন, অপরাধের কথা তো বলিনি, বলেছি প্রয়োজনের কথা। মন্দির গাত্রে যে মৃত্তিকাপট থাকবে তাতে পবিত্র ভাবটি থাকা চাই। ম্লেচ্ছ ব্রাত্যের মন্দিরে প্রবেশের অধিকার না থাকলে তাদের প্রসঙ্গ কেমন করে মন্দির গাত্রের মৃত্তিকাপটে উত্তীর্ণ হতে পারে বলো?
শ্যামাঙ্গ বুঝতে পারেনি তখনও। জানতে চেয়েছিলো, গুরুদেব, বুঝতে পারছি না, ব্রাত্যজন অপবিত্র হতে পারে, কিন্তু মৃৎপট, কি শিলাপট–এসব তো আর মানুষ নয়, নিতান্তই মৃত্তিকা অথবা শিলা–এসবের আবার পবিত্র অপবিত্র কি?
বসুদেব ঈষৎ বিরক্ত হয়েছিলেন। বলেছিলেন, মূখের মতো কথা বলো না শ্যামাঙ্গ, মৃত্তিকা ও শিলা তো পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বত্র, কিন্তু দেবতার পীঠস্থান কি সর্বত্র? সকল মৃত্তিকাই কি দেবতা হয়, বলো? সকল শিলাই কি দেবতা?
সে বিভ্রান্ত বোধ করছিলো, সে জানতো, গুরু বসুদেব প্রতিমা নির্মাণশাস্ত্রে সুপণ্ডিত। কিন্তু ধর্মশাস্ত্রেও যে তার প্রবল অধিকার এ তথ্য তার জানা ছিলো না। তার বুদ্ধি বিভ্রান্ত হচ্ছিলো–কিন্তু হৃদয় বিভ্রান্ত হয়নি। সেখান থেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উঠে আসছিলো। সে নীরব থাকতে পারেনি। বলেছিলো, গুরুদেব, তাহলে দেবতা কী? ভগবান কী? জগত কি দেবসম্ভূত নয়?
এই প্রশ্নে বসুদেব চমকে উঠেছিলেন। সম্ভবত নিদারুণ ব্ৰিত বোধও করেছিলেন। শেষে বলেছিলেন, জটিল তর্ক করো না শ্যামাঙ্গ, দেবতার পীঠস্থান ধর্মসিদ্ধ–তুমি শুধু এইটুকু মনে রাখবে যে ধর্মই সত্য, পরম ব্রহ্মই সত্যব্রহ্মজ্ঞান যার আছে সেই ব্রাহ্মণের নির্দেশই পালনীয়–আর অন্য কিছু সত্য নয়, পালনীয় নয়।
শ্যামাঙ্গের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, বসুদেব যা বলেছেন তা তার আদেশ। কিন্তু তবু সে নিজের কথাটি না বলে পারেনি। খুব ধীর কণ্ঠে বিনীতভাবে সে জানিয়েছিলো প্রভু, আমি ইতোমধ্যে মৃঙ্কলকে কিছু মানবী মূর্তি উৎকীর্ণ করেছি।
মানবী মূর্তি? বসুদেবের ভ্রূ কুঞ্চিত হয়ে উঠেছিলো মুহূর্তে। বলেছিলেন, দেবপীঠে মানবী মূর্তি কেন থাকবে? এখনই বিনষ্ট করো, কোন পটে–কোন ফলকে তোমার সেই মানবী মূর্তি, দেখি?
শ্যামাঙ্গকে তখন তার রৌদ্রশুষ্ক ফলকগুলি একে একে দেখাতে হয়েছে। রামায়ণ কাহিনীর চিত্রমালা পরিস্ফুটনের দায়িত্ব ছিলো তার। জানকীর বরমাল্য দান, রামের বনগমন, হনুমানের গন্ধমাদন বহন ইত্যাদি নানান প্রসঙ্গ সে মৃৎফলকগুলিতে উত্তীর্ণ করেছিলো। এবং ঐসব ফলকের সঙ্গে সঙ্গে আরও কটি মানবী মূর্তির ফলকও ছিলো। প্রেমিকের কণ্ঠলগ্না ব্যাধ তরুণীর প্রণয়দৃশ্য ছিলো একটি, একটি ছিলো শবর যুবতীর প্রতীক্ষার দৃশ্য আর ছিলো মাতৃময়ী ধীবর রমণীর সন্তানকে স্তন্য দানের দৃশ্য।
বসুদেব দেখে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন। বলেন, এ কী করেছো তুমি? এসব কেন করেছো? দেব মন্দিরের সঙ্গে এসবের প্রসঙ্গ কোথায়?
শ্যামাঙ্গ সবিনয়ে বোঝাতে চেয়েছে, প্রভু, শ্রীরামচন্দ্র বনবাসে ছিলেন সেই প্রসঙ্গেই আমার শবর যুবতীর কথা মনে হয়েছে–আর ধীবর মাতা গোদাবরী তীরের। বনবাসের দৃশ্যে অরণ্যচারী ব্যাধ যুবক–যুবতীর প্রণয় কি একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক হবে?
না, বসুদেব কঠিন কণ্ঠে বলে উঠেছেন, এ হয় না, প্রাসঙ্গিকতার ব্যাপারটি তুমি ছলনাক্রমে আনছো। এ কেমন মুখাবয়ব, এ কেমন মুখভাব বলো? এ মানবিক লালিত্যে কি প্রয়োজন? কেন তোমার ফলকচিত্রে কেবল নমনীয় পেলব রেখা? কেন এই বৃত্তাকার ভঙ্গি? ঋজুতা কোথায়, দৃঢ়তা কাঠিন্য কোথায়? ওষ্ঠ কেন এমন বিলোল হবে? এ হয়নি সব ভুল হয়েছে তোমার। শ্রীরামচন্দ্রের কি এই মুখাবয়ব হয় কখনও? জানকী আর যক্ষিণী মূর্তিতে যে কোনো পার্থক্য নেই। এসবে কাজ হবে না–বিনষ্ট করো এসব।
ঐ কঠিন রুক্ষ নির্দেশ যেন এখনও বক্ষের নিচে এসে আঘাত করে। শ্যামাঙ্গ স্মরণ করে শিহরিত হলো।
ঐ সময় কাতর আর্তনাদ করে উঠেছিলো শ্যামাঙ্গ। আকুল প্রার্থনার মতো করে বলেছিলো, গুরুদেব, এসব মূর্তিতে যে আমার আবেগ স্পন্দিত হয়েছে, রক্ত ধারার ছন্দ যে এদের রেখায় বিধৃত হয়ে রয়েছে। দেখুন আপনি, এই ব্যাধ তরুণ–তরুণীর মুখভাবে সঙ্গীত মর্মরিত হচ্ছে কি না?
বসুদেব প্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন–কেন যে হঠাৎ অমন আচরণ করলেন, শ্যামাঙ্গ এখনও কারণ ব্যাখ্যা করতে পারবে না। বসুদেব বলে উঠেছিলেন, মূর্খ, তুমি শ্যামাঙ্গ, একেবারেই মহামূর্খ। তোমার স্মরণে থাকা উচিত যে এসব নির্মিত হচ্ছে তোমার পিতৃধনে নয়। এসব নির্মাণের বিপুল ব্যয়ভার বহন করছেন কায়স্থ কুলতিলক মহাসামন্ত সুধীমিত্র। সুতরাং তার আদেশ–নির্দেশই তোমাকে মান্য করতে হবে। তুমি আদেশের দাস মাত্র–তাঁর আদেশ পালনের জন্যই তোমাকে অর্থ দেওয়া হচ্ছে–প্রতিমা নির্মাণশাস্ত্র ব্যাখ্যার জন্য নয়।
ঐ সময় সুধীমিত্রের আশ্রিত উদ্ধব দত্ত এসে দাঁড়িয়েছিলো কাছে, কাজ ছেড়ে উঠে এসেছিলো সতীর্থ নীলাম্বর। নীলাম্বরই তাকে সরিয়ে আনে বসুদেবের সম্মুখ থেকে।
সরিয়ে এনে বলে, কাজটা তুমি ভালো করোনি বন্ধু।
শ্যামাঙ্গ তখনও ক্ষুব্ধ। জানায়, কিন্তু আমার অপরাধ কোথায়? গুরুদেব সেটা তো আমাকে বলছেন না–কেবলই ধর্মের কথা আর শাস্ত্রের কথা বলছেন।
শ্যামাঙ্গ ঐ বিতর্কের কথা জীবনে ভুলবে না। তার সাধ এবং আশা সে জলাঞ্জলি দিয়ে এসেছে সুধীমিত্রের ঐ মন্দিরেই। না, আর সে শিল্প রচনায় যাবে না।
ঐ গুরুদেবই তাকে সংবাদ পাঠিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সুধীমিত্রের বিল্বগ্রামে। বলেছিলেন, মৃত্যলকের কাজ আর কেউ করে না–মহাসামন্ত সুধীমিত্র সম্মত হয়েছেন, তাঁর নির্মিত মন্দিরে মৃঙ্কলকও থাকবে। তুমি এ সুযোগ হারিও না। সুযোগ পেয়ে সে ধন্য মনে করেছিলো নিজেকে। আশা ছিলো তার, সমস্ত শিক্ষা ও সাধনার ফলকে নিঃশেষে ঢেলে দেবে ঐ মন্দির গাত্রের মৃৎফলকগুলিতে। দেবপীঠে প্রস্তর প্রতিমার পাশাপাশি শোভা পাবে মৃৎফলকগুলিও। যুগান্তরের মানুষ জানবে আত্রেয়ী তীরবাসী শ্যামাঙ্গ নামক এক মৃৎশিল্পীর হাতের কাজ ঐ সুষমাময়ী শবর কন্যা, ঐ প্রণয়দীপ্ত ব্যাধমিথুন, ঐ মমতাময়ী ধীবর জননী আর রামায়ণ কাহিনীর চিত্রময় ফলকমালা। জনক নন্দিনী যেন বা গৃহেরই বনিতা, লক্ষণ যেন নিজেরই অনুজ, শ্রীরামচন্দ্র একান্তই আপন সুহৃদ। সে দিনের পর দিন পরিশ্রম করে যাচ্ছিলো। বসুদেব প্রথমে বাধা দেননি। শিষ্যের উপর তার অগাধ বিশ্বাস ছিলো সম্ভবত। কিন্তু তারপর যেন কী হলো–শ্যামাঙ্গের কাজ মনোযোগ দিয়ে দেখতে আরম্ভ করলেন। প্রথম প্রথম তিনি কিছুই বলেননি। তবে এও মনে হচ্ছিলো, শ্যামাঙ্গকে বোধ হয় আর তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। কেউ তার কানে কোনো কথা তুলেছিলো কিনা বলা কঠিন। তবে শ্যামাঙ্গের কাজ দেখবার সময় তাঁর ভ্রূর কুঞ্চন রেখা সর্বদাই জাগরূক থেকেছে। অবশেষে এই ব্রাত্য প্রসঙ্গ নিয়ে ঘটনা।
শ্যামাঙ্গের এখন মনে হয়, যে ঘটনাকে আকস্মিক বলে মনে হচ্ছিলো প্রকৃতপক্ষে তা প্রায় অনিবার্যই ছিলো। প্রশ্নটা তো এসে যাচ্ছিলো দৃষ্টিভঙ্গির। মূর্তি নির্মাণ কেন? শিল্প কেন? এই সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছিলো গুরুদেবকে এবং তার নিজেকেও। আর প্রশ্নগুলি এমনই যে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে নীলাম্বরের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। নীলাম্বর প্রস্তর–শিল্পী, প্রচলিত প্রতিমালক্ষণশাস্ত্র তার ভালোভাবে অধিগত। ছেদনী দিয়ে কঠিন প্রস্তরে সে অতি সূক্ষ্ম কাজটিও সম্পন্ন করতে পারে। বেশ কয়টি বিষ্ণুমূর্তি সে ইতোমধ্যে নির্মাণ করেছে। সে শ্যামাঙ্গের কথা একেবারেই বুঝতে পারে না। বলে, অহেতুক তুমি গোলযোগ সৃষ্টি করেছে। ভালোভাবে চিন্তা করে দেখো–শিল্প কি? অলঙ্করণ বই তো নয়–যার যা রুচি সেই প্রকারই তো অলঙ্করণ হবে। সেক্ষেত্রে তোমার নাসিকা অনুপ্রবেশ করবে কেন, বলো? গুরুদেব তো ঠিকই বলেছেন। সুধীমিত্র তার মনোমতো বস্তুটিই গ্রহণ করবেন। মনোমতো না হলে সেটা তিনি কেন গ্রহণ করবেন? গুরুদেবকে নিয়োগ করেছেন, এই প্রকাণ্ড কর্মশালা নির্মিত হয়েছে, কত দূর দূর দেশ থেকে বহু অর্থ ব্যয় করে উপাদান সামগ্রী নিয়ে আসা হচ্ছে। প্রতিদিনই প্রায় বিপুল অর্থ ব্যয়–এ সবের উদ্দেশ্য তো ঐ একটিই–নির্মিত বস্তুটি যেন তাঁর মনোমতো হয়। তাঁর মনোস্তুষ্টি করা ছাড়া গুরুদেবের এক্ষেত্রে আর কী করণীয় থাকতে পারে, বলো?
শ্যামাঙ্গ বিরক্তি বোধ করেছে নীলাম্বরের কথায়। বলেছে, মিত্র নীলাম্বর, তুমি আমার কথা বুঝবে না। যদি বুঝতে, তাহলে মৃত্তিকা নিয়েই কাজ করতে।
নীলাম্বর ঐ কথার পর শ্যামাঙ্গকে পরিত্যাগ করেছে। ঐ কটি দিন ছিলো অশেষ যন্ত্রণার। একটি কথাই বারবার তার মনে আলোড়িত হচ্ছিলো। গুরু বসুদেব কেমন করে বললেন যে তিনি আদেশের দাস? তুমি বলতে কি তিনি তার মতো সকল শিল্পীকে বুঝিয়েছেন? শিল্পী কি ক্রীতদাস? রাজানুগ্রহ ব্যতিরেকে কি শিল্পীর অস্তিত্ব নেই? ধীমান বীটপাল কি রাজাদেশের দাস ছিলেন? প্রথা এবং অনুশাসন ছিন্ন করেন যে শিল্পী তিনি কি ক্রীতদাস হতে পারেন? বসুদেবই তো জানিয়েছেন যে, একদা বরেন্দ্রভূমির মৃৎশিল্পীরা মৃত্যলকে উত্তীর্ণ করেছেন জনজীবনের দৃশ্যমালা। যোগীভিক্ষু, মৃগয়া প্রত্যাগতা ব্যাধরমণী, শৃঙ্গার মগ্ন মানব–মানবী, ঢাল তরবারি হস্তে বীর ধটিকা পরিহিতা বীরাঙ্গনা–এসব দৃশ্যে উত্তীর্ণ মৃৎফলক সোমপুরী মহাবিহারের প্রাচীর গাত্রে এখনও শোভা পাচ্ছে। ঐসব কাজ যে গৌরবের বস্তু–একথাও গুরু বসুদেবই জানিয়েছেন। তাহলে তিনি এখন এমন কথা কেন বলছেন?
সে জানে, বসুদেব যৌবনকালে দরিদ্র জীবনযাপন করতেন। রাজানুগ্রহ লাভের চেষ্টা কখনই করেননি। কখনও তাঁর কেটেছে আত্রেয়ী তীরে, গ্রাম জনপদগুলিতে, কখনও গিয়েছেন রামাবতী পুন্ড্রনগরে, কখনও সোমপুরে। প্রতিমালক্ষণশাস্ত্র তাঁর নখদর্পণে। মৌর্য ও গুপ্ত যুগের প্রতিমা নির্মাণকলা কেমন করে গৌড়ীয় রীতির সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে একাকার হয়ে গেছে–সমস্ত কিছু জানেন তিনি। কী নিষ্ঠা তাঁর, কী সাধনা! চিন্তা করলে বিস্ময় লাগে। অথচ সেই বসুদেবই এখন কী হয়েছেন। তার আচরণ হয়ে উঠেছে দুর্বোধ্য। মহাসামন্ত সুধীমিত্রের আদেশ কি এতোই দুর্লঙ্ঘ্য? তার মনে প্রশ্ন জাগে।
মনে অপরিসীম বেদনার ভার। কাজে মন বসে না। এমনকি সমাপ্তপ্রায় কাজগুলি সম্পন্ন করতেও সে উৎসাহ পাচ্ছিলো না। রৌদ্রশুষ্ক ফলকসমূহ যে অগ্নিদগ্ধ করবে, সে উদ্যমটুকুও তার ঐ সময় ছিলো না।
ঐ সময় একদিন বসুদেব স্বয়ং এলেন এবং কিছু ফলক বেছে বেছে একদিকে পৃথক করে রেখে অবশিষ্টগুলির দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, শ্যামাঙ্গ, এসব অপ্রয়োজনীয় এসব ভেঙে ফেলে নতুন করে প্রস্তুত করো।
একেবারেই অবিশ্বাস্য! বসুদেবের মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করা যায় না। তবু শ্যামাঙ্গ জানিয়েছিলো, গুরুদেব, মার্জনা করবেন–এগুলি আমার বহুবর্ষের সাধনার ফল–এগুলি বিনষ্ট করা যাবে না।
বসুদেব কঠিন স্বরে জানতে চেয়েছিলেন, কেন, অদগ্ধ মৃৎফলক বিনষ্ট করা তো কষ্টসাধ্য কাজ নয়।
তা নয়, কিন্তু এ সমস্তই শিল্পকর্ম।
শিল্পকর্ম? বসুদেবের ক্রুদ্ধস্বর চিৎকার হয়ে উঠেছিলো। বলেছিলেন, শিল্পকর্ম কাকে বলে তুমি জানো? এসব যা রচনা করেছো–শুধুই জঞ্জাল, বুঝেছো? এসব জঞ্জাল বিনষ্ট করতে কোনো কষ্টই হয় না।
দেখো, এইভাবে নষ্ট করা যায়, ভালো করে দেখে রাখো। দেখতে দেখতে ক্রুদ্ধ, ক্ষিপ্ত বসুদেব পদাঘাতে মৃৎফলকগুলি ভাঙতে আরম্ভ করে দেন। রক্তিম চক্ষু, উন্মাদ পদতাড়না, তীব্র চিৎকার–সব মিলিয়ে তখন তাকে অন্য এবং অচেনা মানুষ বলে মনে হচ্ছিলো। শ্যামাঙ্গ বিমূঢ় হয়ে দেখছিলো, কিছু বলতে পারেনি।
শ্যামাঙ্গ পারেনি, কিন্তু বসুদেব পেরেছিলেন। বলেছিলেন, তোমাকে এখানে আর প্রয়োজন নেই–তুমি এবার যেতে পারো। আমি তোমার মঙ্গল চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার স্পর্ধা এবং দুর্বিনয় একেবারেই সীমাহীন–আর আমি তোমার মুখদর্শন করবো না।
এখানে তোমার স্থান হবে না শ্যামাঙ্গ, এক সময় শান্ত স্বরে জানিয়েছেন বসুদেব। বলেছেন, সুধীমিত্র তোমার সমস্ত মৃৎফলক অযোগ্য বলে বিবেচনা করেছেন–আমি অনুরোধ। করেছিলাম, কয়েকটি ফলক যেন গ্রহণ করেন, কিন্তু দেখলাম, কাজ হলো না–তুমি যাও।
শ্যামাঙ্গ কিছুই বলেনি অতঃপর। গুরু বসুদেবকে প্রণাম করে প্রায় রাত্রি শেষে বিল্বগ্রাম থেকে সে বিদায় নিয়েছে।