একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদমাধ্যমের নৈতিকতা নিয়ে একটি বিরাট প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তবে এবারই যে প্রথম তাই নয়, আগে থেকেই গণমাধ্যমের বিভিন্ন আপত্তিকর ভূমিকায় এ বিষয়টি উঠে আসছিল। গত রবিবারের ঐ ঘটনায় তা আরো প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। ঘটনাটি হচ্ছে বাংলাদেশের অতিপরিচিত একটি টেলিভিশন চ্যানেলের দুই সাংবাদিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার অতঃপর রিমান্ড এর ঘটনা। অতিশয় দুঃখের সাথে বলতে হয় যে ইদানীং সামান্য সংবাদ সংগ্রহের মাধ্যমে কিংবা গরম খবর ও এক্সক্লুসিভ সংবাদ পরিবেশনের নামে আমাদের দেশের সাংবাদিকগণ একটি ঘৃণিত পথ বেছে নিয়েছেন।
আর কোনো কিছুই নয়, গরম খবর পরিবেশনের নামে টেলিভিশনের টিআরপি বাড়ানো এবং এর মাধ্যমে ঐ চ্যানেলে নিজেদের অবস্থানকে সুসংহত করা কিংবা নিজস্ব খ্যাতি কুড়ানো। কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে এই অংশটি সাংবাদিকতা নামের এই মহান পেশাটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন। এটি একটি প্রকাশ্য বিষয় যে এসব খ্যাতিপ্রিয় সাংবাদিকগণ বিভিন্ন রাজনৈতিক অপকর্মকারীদের কথিত ‘কলিং’ এবং ‘দাওয়াত’ এ সাড়া দিয়ে কোনো একটি নাশকতামূলক কাজের স্থলে হাজির থাকছেন এবং তাদের ক্যামেরার সামনেই ঐ নাশকতাগুলোকে ধারণ করে তা প্রচার করছেন। অপকর্মকারীদের সাথে সম্পর্ক থাকায় এ ঘটনাগুলো কারা ঘটাচ্ছে ফুটেজে তাদের কোন রেকর্ড আসছে না।
অর্থাৎ এই অংশটি অপরাধীদের অপকর্মের সাথে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করছেন এবং নাশকতাকারীদেরকে এ সকল অন্যায় কাজে উৎসাহিত করছেন। এমনি একটি ঘটনাস্থল থেকে দুই সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। অতঃপর আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করা হয় অতঃপর সর্বশেষ রিমান্ড বাতিলও করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো তারা অবরোধকারীদেরকে ককটেল ফোটানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও অনেক নাশকতার বিষয়ে সাংবাদিকদের আগে থেকে জানতে পারার ঘটনাটি কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। সাংবাদিকদের জটলা দেখলে আগে থেকেই অনুমান করা যায় যে আশপাশে কোনো বড় ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এই ভিড় দেখে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও নাশকতার গন্ধ খুঁজে পান। ইতোমধ্যে এ বিষয়টি নিয়ে সাংবাদিকতায় সুস্থতা কামনাকারী বেশ কয়েকজন সাংবাদিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে এসকল কাজে সাড়া দেওয়ার একটি উদ্যোগও নিয়েছিলেন। তাই এ বিষয়টি উড়িয়ে দেওয়ার মতো নৈতিক সাহস সংবাদমাধ্যমের সাথে জড়িত কোনো ব্যক্তিরই নেই।
এ সকল ঘৃণিত কর্মকা-ের কারণে সংবাদমাধ্যমের মতো এমন একটি মহৎ পেশায় নিজেদেরকে জড়িত করে আমরা নিজেরাও আজ লজ্জিত। কারণ এর দায় আমাদের উপরও পড়ে। আমরা যদি এ সকল কাজকে নিরুৎসাহিত করি তাহলে এগুলো হ্রাস পাওয়ার কথা। প্রকৃতপক্ষে আমাদেরকে চাঞ্চল্যকর সংবাদ নয়, সংবাদের সঠিক চিত্রটি তুলে ধরাই প্রধান কাজ হওয়া উচিত। মিথ্যা সংবাদ লিখে কিংবা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ঘটনার সাথে কল্পনা যোগ করে সংবাদপত্রের কাটতি বাড়ানো যায় বটে, কিন্তু তা সততার পথ নয়, কোনোমতে উচিতও নয়। এটা সাংবাদিকতার পর্যায়ে পড়ে না। সাংবাদিকতায় বর্তমানে যে ধারা পরিলক্ষিত হচ্ছে তা চলতে থাকলে একসময় মানুষ সংবাদপত্র কিংবা সাংবাদিকদের প্রচারিত খবরের উপর আস্থা হারিয়ে ফেলবে। এমতাবস্থায় আমাদের নীতি হওয়া প্রয়োজন- সাংবাদিকতায় থেকে হয় সত্য বলবো, নয় এই মহান পেশাটিকে ছেড়ে দেব। কারণ, মুখে সততার কথা বলে প্রকারান্তরে মিথ্যার সাথে আপস করে একে কলঙ্কিত করার কোনো অর্থ থাকতে পারে না।