১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরে দীর্ঘ নয়মাস যুদ্ধ, লক্ষ লক্ষ শহীদের তাজা রক্ত আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে পাকিস্তানী হায়েনাদের পরাজিত করে আমরা পেয়েছি আমাদের আজন্ম লালিত স্বপ্নের দেশ বাংলাদেশ। বিশে^ও বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি আমরা। আজ আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র আমাদের আছে স্বাধীন ভূ-খন্ড-মানচিত্র, আছে জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত। ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়ের সেই সোনালি দিনে হাজার বছরের প্রিয় মাতৃভূমিতে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো বাঙালি। স্বাধীন দেশে শুরু হলো স্বাধীনভাবে সাহিত্যচর্চা। নতুন দিগন্তে নবযাত্রায় পদার্পণ করলো বাংলা সাহিত্য। স্বাধীন দেশের রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে বাঙালি সাহিত্যকরা ঢাকা কেন্দ্রীক আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিনির্মানে কলম তুলে নিলেন। আজ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আমাদের ঢাকা কেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্য বিশ্বসাহিত্যাংগনে নিজের অবস্থানকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করে চলছে। সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রথম দশকে বাংলা সাহিত্যের কবিতা, গল্প-উপন্যাস, নাটকে স্বাভাবিকভাবেই মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের মরনপন লড়াইয়ের কথা, পাক বাহিনীর পৈশাচিকতা সর্বোপরি আজন্ম লালিত স্বপ্নের স্বাধীনতার কথা-বিজয়ের কথা এসেছে। আবার এ দশকেই রচিত হয়েছে রফিক আজাদ এর ’ভাত দে হারামজাদ তা না হলে মানচিত্র খাবো’ দাউদ হায়দার এর জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ এবং পল্টনের ছড়াকার খ্যাত আবু সালেহ- এর ছড়াগুলোর মত অন্যান্য সাহিত্যও। স্বাধীনতা পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মধ্যবিত্তশ্রেনির ভাংগন, নগরজীবনের সুখ-দুঃখ-ক্লেশ, ক্রমশঃ পরিবর্তিত হওয়া গ্রামীন পরিবেশ এ সব মিলিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত হওয়া জনজীবনকে কেন্দ্র করেই আশির দশকের বাংলা সাহিত্য রচিত হয়। পুরো আশির দশকটাই স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী সোচ্চার ছিল জনগন। ’৭১ এর রণাঙ্গনের উত্তাল সময়ের পর গণতন্ত্র প্রত্যাশী মুক্তিকামনী মানুষের চেতনাকে শানিত করতেই আশির দশকের কবিরা লিখেন দ্রোহের কবিতা-ছড়া। বিরাজমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষন করে রচিত হয়েছিল একাধিক উপন্যাস-গল্প-ছোটগল্পও। আশির দশকে বাংলা নাটক কয়েকগুন অগ্রগতি অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। এ সময়ে বাংলাদেশের নাট্যকারগণ প্রচলিত বাংলা নাটকের উপর পরীক্ষা-নীরিক্ষা চালিয়ে বাংলা নাটক সাহিত্যকে বিশ^মানে উপনীত করার প্রয়াস চালান। আশির দশকে বাংলা কবিতার পর বাংলা নাটকেই সবচেয়ে বেশি সমকালীন সমাজ চিত্র স্পস্টতর হয়ে ফুটে উঠতে দেখা গেছে।
এরপর নব্বই দশকে বাংলা সাহিত্যের সব শাখাতেই ক্রম অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। কবিতার ক্ষেত্রে কবিদেরকে উত্তর-আধুনিক কবিতা চর্চায় মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। কবিতার মতো বেশকিছু শৈল্পিক মানসম্পন্ন গল্প উপন্যাস নাটকের সৃষ্টি হয়েছে নব্বই দশকে। নব্বই দশক পর্যন্ত আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এ সময়ের বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে স্বকীয় ধারায় রচিত হুমায়ুন আহমেদ এর রচনা আধুনিক বাংলা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। পাশাপাশি আমাদের ঢাকাকেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। প্রচলিত ধারা ভেংগে হুমায়ুন আহমদ সংলাপ প্রধান ধারায় গল্প-উপন্যাস রচনা কওে কোলকাতা কেন্দ্রীক পাঠকদেরকে ঢাকা কেন্দ্রীক পাঠ্যাভ্যাসে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। বলা যায় নব্বই দশকের ধারাবাহিকতায় এগিয়ে যাচেছ বাংলা সাহিত্য। সাহিত্য সমাজের দর্পন, সংস্কৃতির ধারক-বাহক। সমাজ বদলে যাচেছ, বদলে যাচেছ বিশ্ব। আধুনিক বাংলা সাহিত্য সময়ের স্রোতে এগিয়ে যাচেছ সামনে। সাহিত্যিকরা পাঠকের মন-মানসিকতাকে ধারন করে বৈশ্বিক পরিবর্তনের আলোকে সাহিত্য সৃষ্টিতে নিবেদিত রয়েছে। সময়কে ধারন করে বরন করেই বাংলা সাহিত্যের সকল শাখা-প্রশাখা সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাচেছ।

সাহিত্য আমাদেরকে শারীরীক খাবার জোগায় না তবে মানসিক ক্ষুধা নিবারনে সহায়তা করে। সাহিত্য পাঠে হতাশাগ্রস্থ পাঠক সম্ভাবনার পথ খুঁজে পায়। অমানিশার ঘোর আধার কেটে পূর্নিমার আলোর স্পর্শ পায়। সাহিত্য আমাদের হৃদয়ে অনাবিক আনন্দ দিয়ে নির্মল সতেজ করে তুলে। বানিজ্যের মাপকাঠিতে সাহিত্যের মূল্য হয়তো পাওয়া যায় না। কিন্তু সমাজ-সভ্যতার বিনির্মানে সাহিত্যের মূল্য অনেক। সাহিত্য অসভ্যতাকে তাড়িয়ে আমাদেরকে সভ্য হতে শেখায়। আমাদেরকে ইতিহাস থেকে প্রেরনা দিয়ে নতুন কিছ’ সৃষ্টি করার পথ দেখায়। ভাল সাহিত্য আমাদেরকে ভাল মানুষ হতে উদ্দীপনা জোগায়। এটা ঠিক চলমান জীবনের বাস্তবতায় ব্যাক্তিকেন্দ্রীক আর প্রযুক্তি নির্ভর জীবনের বাস্তবতায় সাহিত্যের প্রতি মানুষের আগ্রহ হারালেও সাহিত্যের অবদান শেষ হয়ে যায়নি, সাহিত্যেও প্রয়োজনীয়তাও ফুরিয়ে যায়নি। এক সময় আমাদের জীবনের সাথে সাহিত্যের একটা নিবিড় সম্পর্ক ছিল বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে। তখন পরিবারে মা-খালারা অবসর সময় কাটাতেন সাহিত্য পাঠে নিবিষ্ট থেকে। গল্পে গল্পে ঘুম পড়ানোর ধুম পড়তো নানী-দাদীদের। জ্যোস্না রাতে চাঁদেও আলোতে গ্রামের উঠোনে, খড়ের গাদায় আসর বসত গল্প পাঠের। তখন জন্মদিন-বিবাহ অনুষ্ঠানে উপহার হিসাবে বই দেয়ার রেওয়াজটা যেন আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিরি অংশ ছিল। আর আজ মোবাইল -ফেসবুক-আকাশ সংস্কৃতির বদৌলতে বই পড়া- সংগ্রহ করা থেকে আমরা যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচিছ। সাহিত্য থেকে দূরে সরে গিয়ে আমরা আমাদের মূল্যবোধকে হারিয়ে ফেলছি,নৈতিকতা বিবর্জিত হয়ে পড়ছি। সমাজের মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হলে নীতি-নৈতিকতার আলোকে সমাজ-দেশ গড়তে হলে সাহিত্যচর্চা করতে। কারন একমাত্র সাহিত্যই পারে সুস্থ মানুষ-সমাজ-দেশ গঠনে ইতিবাচক ভ’মিকা রাখতে। সাহিত্যই পারে আমাদেরকে ঋদ্ধ করে, শুদ্ধ করতে।

সাহিত্যের প্রতি আকর্ষন কমলেও অমর একুশের বই মেলা আমাদের বাঙালির সাহিত্যপ্রীতিকে উজ্জীবীত করছে। বাংলা একাডেমির একুশে বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনে সুস্থধারার বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চাকে অন্যমাত্রায় নিয়ে যাচেছ। বইমেলা বাঙালি সাহিত্যিক সৃষ্টির পাশাপাশি বাঙালি পাঠকও সৃষ্টি করছে। প্রতিবছর বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে প্রচুর সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় রচিত এসব গ্রন্থ চলমান বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করছে, এগিয়ে নিয়ে যাচেছ। প্রকাশিত সব সাহিত্যই গুনগত মানের বিচারে সাহিত্য বলে গণ্য নাও হতে পাওে তুবও এ কথা ঠিক প্রতিবছরই প্রকাশিত নতুন গ্রন্থের সংখ্যাতো বাড়ছে। আলোচিত-সমালোচিত হওয়ার মাধ্যমে যা বাংলা সাহিত্যকে একটি শক্ত ভীত গড়তে সহায়তা করতে পারে।

সাহিত্য সার্বজনীন এটা স্বীকৃত। তবুও মানতেই হবে প্রত্যেক ভাষার সাহিত্যের একটা মৌলিক বৈশিষ্ট আছে। আমাদের বাংলা ভাষা সাহিত্যের নিজস্ব বৈশিষ্ট আছে যা অন্য ভাষার সাহিত্য থেকে কিছুটা আলাদা। কারন সাহিত্য মা-মাটি-মানুষের সংস্কৃতিতে ধারন করে বরন করে গড়ে ওঠে। পাশ্চাত্য সভ্যতা-সংস্কৃতিকে ধারন করে গড়ে ওঠা পাশ্চাত্য সাহিত্যের সাথে আমাদের এ অঞ্চলের সংস্কৃতির পার্থক্য রয়েছে যা সাহিত্যের বিদ্যমান। আবার ভারতীয় উপমহাদেশের জীবনাচারের মাঝে বাঙালিদের জীবনাচারে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে যা বাংলা সাহিত্যে লক্ষনীয়। তেমনি পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ঝাড়খন্ডের বাঙালিদের জীবনাচারের সাথে আমাদের বাংলাদেশের বাঙালিদের জীবনাচারে-সংস্কৃতিতে কিছুটা ভিন্নতা থাকায় পশ্চিম বঙ্গের কোলকাতা কেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যের সাথে আমাদের ঢাকা কেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যের সুক্ষ ভিন্নতার ছাপ দেখা যায়। যা দুই বাংলার সংস্কৃতির মৌলিক পার্থক্যকে স্পষ্ট করছে। ভূ-খন্ডগত সংস্কৃতির প্রভাব সে দেশের সাহিত্যকে প্রভাবিত করবে এটা খুবই স্বাভাবিক। তাইতো ঢাকাকেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যের সাথে কোলকাতাকেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্যের সুক্ষ্ম ভিন্নতা লক্ষ্যনীয়। ইংরেজি সাহিত্যের মাঝেও এটা বিদ্যমান। বৃটিশ লেখকদের রচিত ইংরেজি সাহিত্য আর আমেরিকান ইংরেজ লেখক-সাহিত্যিকদের রচনাসমূহ মাঝে সংস্কৃতির ছাপে ভিন্নতা ষ্পষ্টতর। তেমনি আরবীভাষী বিভিন্ন ভূ-খন্ডের সাহিত্যিকদের রচনা পাঠ করলেই পাঠক বুঝতে পারে এটা কোন অঞ্চলের এ্যরাবিয়ান সাহিত্য। বলছিলাম ঢাকা কেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্য আর কোলকাতা কেন্দ্রীক বর্তমান বাংলা সাহিত্যের উপস্থাপনার প্রসংগটি নিয়ে। দুই বাংলার সাহিত্য কিছুটা যে ভিন্নতর তা আমাদের মানতেই হবে। তবে এটা সর্বজন স্বীকৃত যে বর্তমান বাংলা সাহিত্য মানেই ঢাকা ও কোলকাতাকেন্দ্রীক বাংলা সাহিত্য।

স্বাধীনতার পঞ্চাশটি বছর পেরিয়ে যাচিছ আমরা। এই অর্ধশতাব্দিতে আমরা আমাদের বাংলাদেশের সাহিত্যকে বাংলাদেশী সাহিত্য হিসাবে বিশ্ব সাহিত্যাংগনে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি কিনা তা নিয়ে নিজেদেরকেই ভাবতে হবে। সময়ের স্রোতে আজ সাহিত্যের শাখা-প্রশাখা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। কল্পকাহিনী ভিত্তিক সায়েন্স ফিকসন, ভৌতিক সাহিত্যসহ বাস্তবজীবনের নিত্যনতুন জটিলতানির্ভর জীবনপ্রনালী, পরাবাস্তবতা এসব এখন পাঠকপ্রিয়। আন্তর্জাতিকক সাহিত্যাংগনে আমাদের ভিত্তি মজবুত করতে হলে বিদেশী সাহিত্যের বঙ্গানুবাদ বাড়ানোর পাশাপাশি আমাদের বাংলাদেশী বাংলা সাহিত্যককের বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করতে হবে নিজেদের স্বার্থেই। আমাদের অনেক ভাল ভাল সাহিত্য রয়েছে কিন্তু অনুবাদের অভাবে তা বিশ্বদরবারে পৌঁছতে পারছে না। শত বর্ষ আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন পরবর্তীতে কোন বাংলা সাহিত্য কি আমরা বিশ্বদরবারে অনুবাদ করে পৌঁছাতে পেরেছি, পারি নি। এটা আমাদের ব্যর্থতা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বাংলাদেশের বাঙালি সাহিত্যিকগন নব উদ্যমে সাহিত্যের নবযাত্রায় অবগাহন করেন। ফলে পুরনো ধাচের বাংলা সাহিত্য ধারা যেমন বদলে যাচেছ তেমনি সাহিত্যের শাখা-প্রশাখার পরিধিও বাড়ছে। আশার আলো জ্বালিয়ে সাহিত্যের প্রতিটি শাখাতেই আমাদের নবীন-প্রবীন সাহিত্যিকদের পদচারনা লক্ষ করা যাচেছ। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর উপন্যাস-ছোটগল্প-নাটকে বেশ নিরীক্ষামূলক কাজ হয়েছে। ইদানিং প্রবন্ধ সাহিত্য বেশ পাঠক প্রিয়তা পাচেছ। কবিতার ক্ষেত্রেও পরীক্ষা-নীরিক্ষা চলছে আন্তর্জাতিক মানের কবিতাও রচিত হচেছ। অতিমাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভর ভোগবাদী ব্যাক্তিকেন্দ্রীক জীবনে সাহিত্যর প্রতি মানুষের আগ্রহ কমলে। প্রকৃত মানুষ হতে হলে, প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধ অনুভ’ব করতে হলে সাহিত্যের কাছে ফিরতেই হবে মানুষকে। মানুষতো আর যন্ত্র নয়। যন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষ সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তুু মানুষকে মানুষকে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে, মানুষকে মানবিক হতে হলে, প্রকৃত মানুষ হতে হলে সাহিত্যেকে ভালোবাসতেই হবে তাকে।