প্রান্তিক থেকে বীরভূম প্রান্তিক, বৈকালিক সাহিত্য আড্ডা থেকে বৈকালিক, চরৈবেতি, চমচম ইত্যাদি মুরারই থেকে প্রকাশিত পত্রিকার তিনিই অন্যতম অভিভাবক। মুলত তাঁকে বাদ দিয়ে এলাকায় সাহিত্য-সংস্কৃতির মঞ্চ ভাবা অসমীচীন ছিল। খুবই জনপ্রিয় এবং উদার ও সম্প্রীতির মানুষ ছিলেন তিনি। আমৃত্যু তিনি ছোটবড় আটখানা উপন্যাস ও দু’শোর বেশি গল্প লিখে গেছেন। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে ‘বাঁশলোইয়ের বান ‘প্রথম দিকের রচনা। ‘আলকাপের রাজা’ তাঁর নিজের গ্রাম এদরাকপুরে দেখা আলকাপের ওস্তাদ ‘কাসিম’কে নিয়ে লেখা। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ লিখেছেন আলকাপের একজন ওস্তাদ ‘ঝাঁক সু’কে নিয়ে “মায়া মৃদঙ্গ”। কথা প্রসঙ্গে তিনি জানান যে, ‘সিরাজ সাহেব বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক, আমি তো তাঁরই অনুগামী এবং অনুসরনের একজন লোক।’ মোটের উপর রাঢ়বাংলার রাঙামাটির দেশ বীরভূমের লাভপুরের তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুর্শিদাবাদের খোসবাসপুরের সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ এই দুই জাত লেখকের পথ ধরে হেঁটে গেছেন তাঁদেরই উত্তরসূরী আবদুর রাকিব।

১৯৩৯ সালে এলেন আর ২০১৮ এর ২১ নভেম্বর চলেও গেলেন। কথা ছিল ২রা ডিসেম্বর কলকাতা যাবেন। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন এক বুক ব্যথা ও দুঃখ চাপা দিয়ে। তাঁর সাহিত্য জুড়ে ছড়িয়ে এবং জড়িয়ে থাকলো বাঁশলোই নদী, পাইকরের ক্ষ্যাপা কালী, আলকাপের ওস্তাদ কাসিম,স্থানীয় মাটি-মানুষ-ফকির-পীর-দরবেশ-সাধুসন্ত সকলেই। বর্ধিষ্ণু মুসলিম সমাজের চলমান জীবন চরিত্র যা নিম্নবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত সমাজের দেখা, না-দেখা ঘটনাবলী, অন্দরমহলে সংঘটিত মুসলিম নারী ও শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের নানান ঘটনা তাঁর লেখনীতে বারবার ছুঁয়ে গেছে।

পৃথিবীর মানুষের কাছে মহান ও মহৎ ব্যক্তিকে তুলে ধরতে এক বা একাধিক জনকে ছায়াসঙ্গী হতে হয়। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য দেবকে চিনতে পারতাম না যদি জগাই মাধাই সঙ্গ না দিত, অপরদিকে স্বামী বিবেকানন্দ মানুষের দরবারে শ্রীরামকৃষ্ণকে অবতার হিসেবে তুলে আনেন। তেমনি মরমী দরদী লেখক আবদুর রাকিবও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন চারণ কবি গুমানি দেওয়ান এর জন্যই। কবি গানের অন্যতম স্রষ্টা তথা মনোরঞ্জনের ধারক ও বাহক কবি গুমানি দেওয়ানকে জানতে, চিনতে সহায়তা করেন তিনিই। মুর্শিদাবাদের খেঁকুল জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার সময়ে গুমানি দেওয়ান এর সাথে পরিচিত হন। তাঁর সংগৃহীত সাক্ষাৎকার “কাফেলা” পত্রিকাতে প্রকাশিত হলে, কবি গুমানি আপ্লুত হয়ে তাঁর সমস্ত জীবন কথা, আলকাপের কথা, আলকাপের বাণী, চিচিংফাঁক শব্দের আঘাতে গুপ্তধন সমূহ প্রকাশ্যে আনয়ন করেন। পালাগানের প্রস্তাবনা, গানের কলি, বিশেষ বিশেষ ছড়া থেকে আসরের বিবরণ, বিষয় নির্বাচন, ভূমিকা বর্ণনা ইত্যাদি সুচারুরূপে আলোচনা করেন। কবি গুমানি দেওয়ান এর স্মৃতি ছিল খুবই প্রখর, সেই স্মৃতি থেকেই অনর্গল বলে যেতে পারতেন ধুয়া, পয়ার ছন্দে রচিত গান। যন্ত্রণার গর্ভজাত সন্তান হিসেবে ভূমিষ্ঠ হয় “চারণ কবি গুমানি দেওয়ান” ১৯৬৯ থেকে ১৯৬৮ এই সময়কালের মধ্যে।

তিনি ছিলেন একজন নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। মুলত নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের কথা, তাদের জীবন জীবিকা, প্রেম-অপ্রেম, শিক্ষা-অশিক্ষা, সৌহার্দ্য-বিদ্বেষ ইত্যাদি প্রত্যক্ষ করেছেন নিয়ত, আর তার সেই অবলোকনের প্রতিটি প্রতিফলন লক্ষ করা গেছে তাঁর সাহিত্যে, সৃষ্টিতে, গল্পের কাহিনী বিন্যাসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বাংলার জনজীবনের ভাগ্যাকাশে দুর্ভিক্ষ ও দারিদ্র্যের যে ছাপ স্পষ্ট হয়েছিল, সেই হাভাতে সময়ের মধ্যে লালিত পালিত হয়েছেন- কষ্ট, সহিষ্ণুতা, তাঁকে মহৎ হতে বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করে। পরিশ্রমী ও কষ্টসহিষ্ণু হয়েও প্রাক্ যৌবনে একটা পলায়নী মনোবৃত্তি তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল। সাহিত্যই সেই মনোবৃত্তির পোষকতা করেছিল বলেই তিনি সাহিত্য জগতে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। সমাজের দুঃখ, যন্ত্রণা, দৈন্যতা, জীবন বিকৃতি দেখে মননে মননে ক্ষরিত হয়েছেন বারবার, জীবন সৌন্দর্যের ছবি দেখতেন, সেই দর্শনের ছায়াপথ বেয়ে একজন সফল সুসাহিত্যিক হয়ে উঠতে পেরেছেন।

অনেকেই জেনে আশ্চর্য হয়ে পড়েন যে, তিনি কবিতা লিখেছেন। প্রথম জীবনে কয়েক বছর এক নাগাড়ে কবিতা লিখে গেছেন “পয়গাম” পত্রিকাতে ,সেই ১৯৬৬-৬৭ সালের দিকে। মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশিত সমবায়িক কবিতা সংকলন ”কবিতা একাল” এ আমার চোখকে নিয়ে কবিতা আছে। ‘সলসেবেরির ফাঁসী মঞ্চ’ কবিতা ছাড়াও প্রেমের কবিতা, তাঁর অজানা প্রেমিকাদের উদ্দেশ্য লেখা যৌবনকালের প্রকাশিত, অপ্রকাশিত বহ কবিতা আজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। যৌবনের সুন্দর সৌহার্দ্যময় প্রেম ভালবাসার স্মৃতিবিজড়িত কবিতা কালের গর্ভে একদা নদী স্রোতের পলিমাটিতে বিমিশ্রিত ও স্থিত হয়ে জমে আছে। তাকে তুলে আনার দায়িত্ব সকলের।

তাঁর সাহিত্য-তরিকে দ্রুতগতিতে চালিত করতে সহায়তা করেছে “কাফেলা মাসিক”; পরবর্তীতে “নতুন গতি” তাতে প্রাণসঞ্চার ঘটিয়েছে। “দৈনিক কলম” এর সাহিত্য বিভাগ সামলেছেন কিছুদিন। নতুন গতি সম্পাদক এমদাদুল হক নুর ছিলেন তাঁর একান্ত গুণগ্রাহী, ক্রমোত্তরণের ডিঙি, চড়াই-উৎরাই পথে শক্ত সাঁকো, সমর্পিত চিত্তের উচ্চার্থ অক্ষরমালা। নতুন গতি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অনন্য জীবনীমালা অভ্যন্তরের বিষাদ সিন্ধু, সাহিত্যজীবন চিত্রাবলী “পথ পসারীর পত্রোত্তর” গ্রন্থ। বহু ব্যথা বুকে নিয়ে আমি শুধু সামলে চলি। কাউকে ত্যাগ করি না, বিমুখ হই না কারও প্রতি আমি তাদের মতো চেতনিক নই বলে প্রবৃত্তি জয়ের গল্প ফাঁদি। তিনি “সুদাম মালী” ছদ্মনামে ফিচার লিখেছেন, যা আমরা অনেকেই জানি না। নেতিবাচক চিন্তা পরিহার করে ইতিবাচক ভাবনার কথা বলতেন প্রায়শঃই। আধুনিক জীবনের বিচ্যুতিকে, ব্যভিচারী সমাজকে ছোটগল্পের মাধ্যমে কীভাবে প্রাণবন্ত ও আদর্শে গৌরবান্বিত করা যায় তার কৌশল দেখিয়ে গেছেন। মিনি গল্পও তিনি লিখেছেন পোস্টকার্ড ফর্মে। তাঁর লেখক ও মানব সত্ত্বা ছিল এক ও একক। তাঁর ক্ষেত্রে জীবন ও সাহিত্য আলাদা ছিল না, একই সরলরেখার দুই বিন্দুর পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্ত। তাঁকে এই রাঙামাটির এক অনন্য, অনবদ্য যশস্বী ব্যক্তিত্ব বলতে কুণ্ঠাবোধ নেই। তিনি ছিলেন একজন মুসলিম সমাজের তথা লোকের নির্ভর যোগ্য প্লাটফর্ম, মুসলিম লেখকের প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রভৃমি, প্রশ্ন ও সমস্যা সমাধানের মুশকিল আসান। তাঁর মৃত্যুতে সাহিত্যের অপূরণীয় ক্ষতি। বর্তমানতার পতাকাবাহী না হয়ে কেন স্মৃতিস্পর্শী মূল্যবোধের আনাচে কানাচে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, এ সকল প্রশ্ন তাঁর লাখ টাকার প্রশ্ন ছিল।

আবদুর রাকিবের ব্যক্তিসত্তা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠে আসতে পারে না। তিনি একজন নির্ভেজাল রসগ্রাহী সাহিত্যিক, কঠোর সাধনা করে এক বিন্দুতে অবস্থান করতে পেরেছেন। জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রাজ্ঞ করেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তি জীবনের, সাংসারিক জীবনের নানা টানাপোড়েনও তাঁকে মাঝে মাঝে বিচলিত করতো, তার চিত্র বিভিন্ন গল্পের উপস্থাপনায় প্রত্যক্ষ করা যায়। তিনি একজন সফল কথাশিল্পী ও কথাকার নিঃসন্দেহে।

প্রাবন্ধিক আবদুর রাকিব
তিনি শুধুই গল্প লিখে গেছেন, তা নয়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নানাধরণের, নানান স্বাদের প্রবন্ধও লিখেছেন। মহম্মদ বাজার বেসিক ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণকালীন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহাশয়ের উৎসাহ পেয়ে এবং তৎকালীন জেলা অবরোধ বিদ্যালয় শ্রী বীরেন গুপ্তের পরামর্শে চারখানি প্রবন্ধ “শিক্ষক” পত্রিকাতে প্রকাশিত হলে প্রাবন্ধিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েন। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন- “সেদিন আযীযদা যদি মত পরিবর্তন না করতেন, যদি ‘আলকাপের রাজা’ ছাপতেন। যদি ‘নবকল্লোল’ আর ‘দেশ’ আমাকে ফিরিয়ে না দিত।যদি অসীম বর্ধনও ধোঁকা না দিতেন। তবে হয়তো আমার সামনে খুলে যেত উপন্যাসের এক একটি নতুন একটি দিগন্ত। টুকটুক করে একটি, দুটি গল্প লিখব। সম্ভব হলে প্রবন্ধ। প্রবন্ধের মোহও কম নয়।” হ্যাঁ তিনি প্রবন্ধ লিখতেন, প্রবন্ধে পরিশ্রম সাপেক্ষ হলেও পরিস্থিতি পর পর অনেক প্রবন্ধ লিখিয়েছে। মাসিক ‘কাফেলা’ তে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ সম্পর্কে একটি সগর্ভ প্রবন্ধ লিখে খ্যাতি পান। এরপর লিখলেন ‘চারণ কবি গুমানি দেওয়ান’ যা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অনন্য উপাদান, পাঠকের কাছে এক বিরল উপহার। সাহিত্যমহলে সাড়া পড়ে, ২০০২সালে বাম সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে বইটার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। যাই হোক, বিভিন্ন ধরনের মননশীল প্রবন্ধে তাঁর সৃষ্টিশীলতা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির অভিনিবেশ, অপরিমেয় জ্ঞানের সুলুক সন্ধান পাওয়া গেছে।

উপন্যাসিক আবদুর রাকিব
উপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জেদ করে সাহিত্যের পথে পা বাড়ান ও সফল হন। কিন্তু আবদুর রাকিব উপন্যাসিক হতে পারেননি। সেই মনঃকষ্ট তিনি সকপটে লিখেছেন। কোন ব্যক্তি যখন তার প্রথম সন্তানকে হারান, তখন তার মনে যে যন্ত্রণা, হতাশা দুঃখ-কষ্ঠের আগুন মনে ধিকিধিকি করে জ্বলে ওঠে, তেমনি তিনিও সেই জ্বালা যন্ত্রণার, অভিমান নিয়ে চলে গেলেন। ‘আলকাপের রাজা’ বইয়ের পান্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া কিংবা মেরে দেওয়া তাঁর পক্ষে সহ্য করা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি কেন উপন্যাস লিখেননি, তাঁর স্বীকারোক্তি থেকে জানা গিয়েছে।

বাস্তব জীবনের ভিত্তি ভূমিতে যে, উপন্যাসের বীজ প্রোথিত, তা তিনি জানতেন, বিশ্বাসও করতেন। আধুনিক শিল্প নির্ভর নাগরিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে যে উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, তা তিনি স্বীকার করতেন । মধ্যযুগের ‘রোম্যান্স’ উপন্যাসে থাকে মূল দুটি চরিত্রের উত্থান পতন, টানা পোড়েন, দ্বিধা দ্বন্দ্বের দুরন্ত খেলা।

বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে রূপক উপন্যাস হিসেবে রমাপদ চৌধুরীর ‘হৃদয়’ নামকরণ এক রূপক অর্থের আভাস দিচ্ছে, কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ কল্পনামূলক রূপক কাহিনী রূপে অভিহিত। বস্তুত পক্ষে এই উপন্যাসে নারী পুরুষেরা সাংকেতিকতার রহস্যের আবরণে আবৃত। গল্পের মধ্যে বিমূর্ততা ও অবাস্তবতার ছায়া প্রতিফলিত। বিমল করের ‘বাবুঘাটের কুমারী মাছ’ নাম বলা যেতেই পারে। আবদুর রাকিব শেষ জীবনে একখানি উপন্যাস আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। বই আকারে প্রকাশিত হলে পাঠক মুখ দিতে পারে। তাঁর একমাত্র উপন্যাস “বাঁশলোইয়ের বান”, যা পড়ে অনেকেই আপ্লুত হবেন। এটা রূপক, না সামাজিক অথবা মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস, ঠিক করা কঠিন। বাস্তবিকক্ষেত্রে অনেকাংশে তিনটি উপাদানই উপন্যাসের মধ্যে জড়িয়ে আছে। বাঁশলোই একটি নদীর নাম- যে নদী ছোটনাগপুর মালভূমির বক্ষ থেকে পাঁচ পাহাড়ের জলধারা নির্গত হয়ে গঙ্গা-ভাগিরথীর সঙ্গে মিশে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই পূর্ববাহিনী হয়ে। তার জলে পুষ্ট হয়েছে এলাকার জনজীবন, জীবিকা, যার উভয় তীরে সভ্যতার নানান ঘটনা জড়িয়ে আছে, তাকে জনমানসে উপস্থাপনা করা হয়েছে এই উপন্যাসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অদ্বৈত দেবমল্লের ‘তিস্তা একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি উপন্যাসেও যে সকল জীবন্ত চরিত্রকে দেখতে পাওয়া গেছে, এই উপন্যাসেও তার ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে, এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত, প্রত্যন্ত এলাকার মাটির গন্ধ তাদের গায়ে লেগে আছে। আতামিঞা এক জীবন্ত চরিত্র যা সচরাচর তৎকালীন গ্রামবাংলার বাস্তব জীবনের প্রতিফলন। চরিত্রগুলোর মধ্যে দানিশ,মাসুম, সালিমা, ননী ডাক্তার, জুহি, সন্ধ্যারাণী, জরিনা বিবিকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যাবে। শব্দটীকা হিসেবে ঘোড়াবান, বিঝিঁ, আমসোপরি, কয়াল, নিদ খুব কাছের মনে হয় । বর্তমানতার পতাকাবাহী না হয়ে কেন স্মৃতিস্পর্শী মূল্যবোধের আনাচে কানাচে উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে, এ সকল প্রশ্ন তাঁর লাখ টাকার প্রশ্ন ছিল।”

আবদুর রাকিবের ব্যক্তিসত্তা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠে আসতে পারে না। তিনি একজন নির্ভেজাল রসগ্রাহী সাহিত্যিক, কঠোর সাধনা করে এক বিন্দুতে অবস্থান করতে পেরেছেন। জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে প্রাজ্ঞ করেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তি জীবনের, সাংসারিক জীবনের নানা টানাপোড়েনও তাঁকে মাঝে মাঝে বিচলিত করতো, তার চিত্র বিভিন্ন গল্পের উপস্থাপনায় প্রত্যক্ষ করা যায়। তিনি একজন সফল কথাশিল্পী ও কথাকার নিঃসন্দেহে।

প্রাবন্ধিক আবদুর রাকিব
তিনি শুধুই গল্প লিখে গেছেন, তা নয়, বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় নানাধরণের, নানান স্বাদের প্রবন্ধও লিখেছেন। মহম্মদ বাজার বেসিক ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণকালীন বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ মহাশয়ের উৎসাহ পেয়ে এবং তৎকালীন জেলা অবরোধ বিদ্যালয় শ্রী বীরেন গুপ্তের পরামর্শে চারখানি প্রবন্ধ “শিক্ষক” পত্রিকাতে প্রকাশিত হলে প্রাবন্ধিক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েন। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন “সেদিন আযীযদা যদি মত পরিবর্তন না করতেন, যদি ‘আলকাপের রাজা’ ছাপতেন। যদি ‘নবকল্লোল’ আর ‘দেশ’ আমাকে ফিরিয়ে না দিত। যদি অসীম বর্ধনও ধোঁকা না দিতেন। তবে হয়তো আমার সামনে খুলে যেত উপন্যাসের এক একটি নতুন একটি দিগন্ত। টুকটুক করে একটি, দুটি গল্প লিখব। সম্ভব হলে প্রবন্ধ ।প্রবন্ধের মোহও কম নয়।” হ্যাঁ তিনি প্রবন্ধ লিখতেন, প্রবন্ধে পরিশ্রম সাপেক্ষ হলেও পরিস্থিতি পর পর অনেক প্রবন্ধ লিখিয়েছে। মাসিক ‘কাফেলা’তে রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ সম্পর্কে একটি সগর্ভ প্রবন্ধ লিখে খ্যাতি পান। এরপর লিখলেন ‘চারণ কবি গুমানি দেওয়ান’ যা বাংলা লোকসাহিত্যের এক অনন্য উপাদান, পাঠকের কাছে এক বিরল উপহার। সাহিত্যমহলে সাড়া পড়ে, ২০০২সালে বাম সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দফতরের উদ্যোগে বইটার দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। যাই হোক, বিভিন্ন ধরনের মননশীল প্রবন্ধে তাঁর সৃষ্টিশীলতা, স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গির অভিনিবেশ, অপরিমেয় জ্ঞানের সুলুক সন্ধান পাওয়া গেছে।

উপন্যাসিক আবদুর রাকিব
উপন্যাসিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় জেদ করে সাহিত্যের পথে পা বাড়ান ও সফল হন। কিন্তু আবদুর রাকিব উপন্যাসিক হতে পারেননি। সেই মনঃকষ্ট তিনি সকপটে লিখেছেন। কোন ব্যক্তি যখন তার প্রথম সন্তানকে হারান, তখন তার মনে যে যন্ত্রণা, হতাশা দুঃখ-কষ্ঠের আগুন মনে ধিকিধিকি করে জ্বলে ওঠে, তেমনি তিনিও সেই জ্বালা যন্ত্রণার, অভিমান নিয়ে চলে গেলেন। ‘আলকাপের রাজা ‘ বইয়ের পান্ডুলিপি হারিয়ে যাওয়া কিংবা মেরে দেওয়া তাঁর পক্ষে সহ্য করা অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি কেন উপন্যাস লিখেননি, তাঁর স্বীকারোক্তি থেকে জানা গিয়েছে।

বাস্তব জীবনের ভিত্তি ভূমিতে যে, উপন্যাসের বীজ প্রোথিত, তা তিনি জানতেন, বিশ্বাসও করতেন ।আধুনিক শিল্প নির্ভর নাগরিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে যে উদ্ভব ও বিবর্তনের ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, তা তিনি স্বীকার করতেন । মধ্যযুগের ‘রোম্যান্স’ উপন্যাসে থাকে মূল দুটি চরিত্রের উত্থান পতন, টানা পোড়েন, দ্বিধা দ্বন্দ্বের দুরন্ত খেলা।

বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রে রূপক উপন্যাস হিসেবে রমাপদ চৌধুরীর ‘হৃদয়’ নামকরণ এক রূপক অর্থের আভাস দিচ্ছে, কিংবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘দিবারাত্রির কাব্য’ কল্পনামূলক রূপক কাহিনী রূপে অভিহিত। বস্তুত পক্ষে এই উপন্যাসে নারী পুরুষেরা সাংকেতিকতার রহস্যের আবরণে আবৃত। গল্পের মধ্যে বিমূর্ততা ও অবাস্তবতার ছায়া প্রতিফলিত। বিমল করের ‘বাবুঘাটের কুমারী মাছ’ নাম বলা যেতেই পারে। আবদুর রাকিব শেষ জীবনে একখানি উপন্যাস আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেছেন। বই আকারে প্রকাশিত হলে পাঠক মুখ দিতে পারে। তাঁর একমাত্র উপন্যাস “বাঁশলোইয়ের বান”, যা পড়ে অনেকেই আপ্লুত হবেন। এটা রূপক, না সামাজিক অথবা মনস্তত্ত্বমূলক উপন্যাস, ঠিক করা কঠিন। বাস্তবিকক্ষেত্রে অনেকাংশে তিনটি উপাদানই উপন্যাসের মধ্যে জড়িয়ে আছে। বাঁশলোই একটি নদীর নাম যে নদী ছোটনাগপুর মালভূমির বক্ষ থেকে পাঁচ পাহাড়ের জলধারা নির্গত হয়ে গঙ্গা-ভাগিরথীর সঙ্গে মিশে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই পূর্ববাহিনী হয়ে। তার জলে পুষ্ট হয়েছে এলাকার জনজীবন, জীবিকা, যার উভয় তীরে সভ্যতার নানান ঘটনা জড়িয়ে আছে, তাকে জনমানসে উপস্থাপনা করা হয়েছে এই উপন্যাসে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ অদ্বৈত দেবমল্লের ‘তিস্তা একটি নদীর নাম’ ইত্যাদি উপন্যাসেও যে সকল জীবন্ত চরিত্রকে দেখতে পাওয়া গেছে, এই উপন্যাসেও তার ছায়া লক্ষ করা যাচ্ছে। ফলে, এই উপন্যাসের চরিত্রগুলো জীবন্ত, প্রত্যন্ত এলাকার মাটির গন্ধ তাদের গায়ে লেগে আছে। আতামিঞা এক জীবন্ত চরিত্র যা সচরাচর তৎকালীন গ্রামবাংলার বাস্তব জীবনের প্রতিফলন। চরিত্রগুলোর মধ্যে দানিশ, মাসুম, সালিমা, ননী ডাক্তার, জুহি, সন্ধ্যারাণী, জরিনা বিবিকে চোখের সামনে দেখতে পাওয়া যাবে। শব্দটীকা হিসেবে ঘোড়াবান, বিঝিঁ, আমসোপরি, কয়াল, নিদ খুব কাছের মনে হয়।

ওই শব্দগুলোর ব্যবহার নিত্য শোনা যায়, মনে আবেগ সৃষ্টি করে। আমরা পেয়েছি পাকড়াবাবুর আমবাগান, শ্যামচাঁদের মেলার মাঠ, কালাপীরের দরগা, লম্বাপাড়ার কারবালা খেলা, সাবুইয়ের দড়ি পাকানো, জাঁজগাঁর মেলা, ননী ডাক্তারের ঘোড়া, নুমান পণ্ডিত, ধরণী পাহাড়, শিশির লাল ঔষধ, আতামিঞার আমদরবার ইত্যাদি। নামকরণ থেকে যে চিত্রকল্প তৈরি হয়েছে তাতে চরিত্রগুলোর জীবন্ত রূপ ফুটে উঠেছে।

শুধু তাই না, উপন্যাসের যে সকল বাস্তব অবাস্তব ঘটনা সাজানো হয়েছে তা এলাকার গ্রামবাংলার স্মৃতিবিজড়িত, ভৌগোলিক ভূখণ্ডে সন্ধান করলে সচক্ষে প্রতীয়মান হয়, তাই সেগুলোর আকর্ষনও কম নয়। নয়াগ্রাম, হরিশপুর, কুসুমগাছি, পাঁচগাছি, পারাইপুর, গোকুলনগর, কাঁধাপাড়া, রাজেন্দ্রবাটি, পলশা, পাঁচগাছিয়া, বালিয়া, ফতেপুর, পাটাগাছি, মুখলিশপুর, নওদা, কাঁটাগড়িয়া, কাঠিয়া, কামালপুর, বসন্তপুর, জালালপুর, সমরপুর যা বাঁশলোই নদীর উভয় পাড়ে এবং পাগলা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত। চরিত্রগুলো কল্পনার রহস্যে, রূপকের ছত্রছায়ায়, সামাজিক জীবনের ঘনঘটায়, মনস্তত্ত্বমূলক স্বাদের সন্ধানে সম্পৃক্ত।

বর্ষাকালে বাঁশলোই নদী পাগলপারা, উন্মত্ত হস্তিকুলের মতো দুরন্ত হয়ে ওঠে। তিনি এক জায়গাতে লিখেছেন , “বড়রা বলাবলি করে, বাঁশলোই নদীতে নাকি ঘোড়াবান আসে, ঘোর বর্ষায়।” যে কথাই দিয়ে তিনি উপন্যাসের শুরু। ঘোড়াবান এখানে রূপক, আবার প্রতীকও। ঘোড়াবান বলতে সাধারণত হড়কা বানকে বুঝায়। হঠাৎই পশ্চিমাকাশে ঘন কালোমেঘ জমলে ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমির বুক জেগে ওঠে এবং তার বুক নিঃসৃত জলধারা মিশে জলস্ফীতি ঘটে নিম্নগামিনী হয়ে বহে যায়। “রুক্ষ্ম রাঙা মাটির উপর দিয়ে, সবদিক থেকে গড়িয়ে আসা গেরুয়া পানির ঢল নামে বাঁশলোইয়ে। তখন নদীত্ব জাহির করে। নিষ্প্রাণ পায় প্রাণের ঘ্রাণ। বৃদ্ধ যযাতি পায় পুরুষ যৌবন। দুর্বল কামাল হয় শান্ত অশান্ত, সুন্দর-অসুন্দর, নিরীহ নিষ্ঠুর। গৈরিক জলরাশির বিপুলত্ব নিয়ে, বল্গাহীন দুর্ধর্ষ ঘোড়ার মতন বাঁশলোই ছুটে আসে উত্তর বীরভূমের সবুজ সমতলে, আর মুর্শিদাবাদের মাটি ছোঁয়ার আগে থামে না।” এতদাঞ্চল ব্রাত্যই ছিল সাহিত্যের আঙিনায়, বিশেষত উত্তর বীরভূমের এই প্রান্তিক এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত আকাঙ্ক্ষিত শিক্ষার দৈন্যতা, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের আর একটি বড় সমস্যা এলাকায় সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিমদের বাস। অধিকাংশই কৃষি নির্ভরশীল।

আধুনিকতা প্রবেশ করার ফলে মানুষের আর্থিক নির্ভরতা বেড়েছে, তাই মানুষ শিক্ষার আলোক পেলেও অনালোকিত থেকেই গেছে ।ব্রিটিশ আমলে জমিদার, জোতদারদের যে ভূমিকা থাকে এখানেও তা ছিল। জমিদারের ক্রুর চরিত্রের আলাদা সাম্পান ছিল না,যা উপন্যাসের ভেতরে পর্যবেক্ষণ করা গেছে। জমিদারগণ কীভাবে প্রজাদের উপর নিপীড়ন চালাতো, গরীব প্রজাদের কষ্টার্জিত সম্পদ তাঁরা নানাবিধ কৌশলে লুঠ করতো তার কিছু কিছু চিত্র ও বর্ণনা দেখা যাচ্ছে। “পাঁচগাছির ধুলুরা যে পরিমাণ ধান ধার করে নেবে, সময়ে তার দেড়গুণ দিয়ে শোধ করতে হবে।” ‘কাঁচা ধানের কড়চা’ স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবিতে একবার বিশ বোল বাবু, একবার বিশ শব্দগুলো আজও কানে বাজে, আদিবাসী পুরুষের কষ্টময়, আকুতিপূর্ণ নিবেদন শব্দ বীণার ছড়ে গুমরে গুমরে ওঠা স্বরধ্বনি আজও কেঁদে বেড়ায় নিশীথ রাতে।

উপন্যাসের মূল যে সুর রূপকতা, মনস্তত্ত্বকতাবাদ আমাদের বিচলিত করে তার প্রকট চিত্র সেখানে খুঁজে পাওয়া যাবে। উপন্যাসে এক নায়ক ও অসম এক নায়িকার মনে যে ভালবাসার শীতমেঘ জমে ওঠা এবং পরিনতি কী হতে পারে, তার সঘন বৃত্তান্ত আপ্লুত করে। লেখকের লেখার মুন্সিয়ানা অবাক করে। এখানে নায়কের পিতা একজন জাত কয়াল, ধান মেপে দেওয়া নেওয়া তার কাজ। একজন স্বল্প শিক্ষিত মানুষ জীবিকার তাগিদে মন না চাওয়া কাজ করতে বাধ্য হয়। তারও মনে প্রেম আসে, ভালবাসা থাকে। প্রৌঢ়ের মনের মধ্যে যে প্রাণোচ্ছ্বল ঢেউ জেগে ওঠে, তিনি নিখুঁত শব্দ বন্ধনে বেঁধে ফেলেছেন, উপন্যাসের মাত্রা বজায় রেখে বলেছেন, ‘সালিমাকে টেনে আনে বুকের কাছে। সালিমা ফিসফিস করে মৃদু আপত্তি জানিয়ে বলে, এই ছাড়, মাসুম ঘুমায়নি। “দুরন্ত মন বাগ মানেনা, যেমন দুরন্ত ঘোড়াবান তখন বাঁশলোই নদীতে ছুটে যাচ্ছে, দানিশের উথালপাতাল নদেও ফুঁসে উঠে ঘোড়াবান।” মনের কথা মনে থাকে, মুখে আসে না, কিন্তু ঠোঁট হাসে। রমনতৃপ্ত নারী ভাবে পাগলা ঘোড়ার মতো বন্য আবেগে, শীৎকারে, যে পুরুষ তার যৌবনপুষ্ঠ পেলব তনুকে যেভাবে তছনছ করে, তা ঘোড়াবান নয় তো কী; নারীও তো নদী বটে।” কী সুন্দর ভাবে কাব্যিক ভাষায় উপমা ব্যবহার করে উপন্যাসের মান তুলে ধরেছেন, নিঃসন্দেহে অতুলনীয়।

অনেকে এর মধ্যে রাজনৈতিক গন্ধ খুঁজে পান, কিন্তু তা বলে একে রাজনৈতিক উপন্যাস বলা যায় না। তিনি পুরোপুরি সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছেন। যদিও কিছু রাজনৈতিক ঘটনা জুড়ে গেছে, সময়ের নিরিখে। এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা দিবসের রাতে দুই ধরনের পতাকা উত্তোলন করার চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে। সেদিনের মুর্শিদাবাদ পরদিনের সিদ্ধান্তে ভারতে যুক্ত না হলে আজকের ইতিহাস আলাদা হয়ে থাকত।

তিনি উপন্যাস বেশি লেখার সুযোগ পাননি, কিন্তু কিছু প্রায়োপন্যাস novelette লিখেছেন। তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন যে, ”আমার প্রথম প্রায়োপন্যাস ‘ব্যবধান’, যার পরিবর্তিত নামকরণ ‘শেষ মিলনের লগ্নে’। তাছাড়া তাঁর অন্যান্য লেখা বিশেষ করে, কাফেলা মাসিক পত্রিকাতে প্রকাশিত ‘দূর পাল্লার দৌড়’, জঙ্গিপুর সংবাদের পূজা সংখ্যায় ‘কক্ষপথ,’ ধূসর পাণ্ডুলিপি পত্রিকায় ‘সমুদ্রগামিনী, ইত্যাদি। এই সকল লেখা পড়ে তাঁকে একজন সফল উপন্যাসিক হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করবে।

পরিশেষে, বলা যেতেই পারে যে, একগুচ্ছ ঘটনায় পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া গূঢ় পারম্পর্যে গড়ে ওঠে উপন্যাসের প্লট। Forster উল্লেখ করেছেন যে, The basis of a novel is a story and a story is a narrative of events arranged in time sequence উপন্যাস জীবনের এক সুসংবদ্ধ শিল্পিত রূপ, এক প্রকার মায়া দর্শন, যাতে সমাজের মৃত-জীবিত, আলোকিত অনালোকিত, আলোচিত অনালোচিত দিকসমূহের বিচিত্র চিত্র প্রতিবিম্ব হয়ে মনজগতে বিরাজ করে, জীবনের সুপ্ত চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। আবদুর রাকিব সকল উপন্যাসিক হতে পারতেন, সমৃদ্ধ হতে পারতো আরও সৃষ্টির তাগিদে। সেই আক্ষেপ রয়ে গেছে পাঠকের আমদরবারে।