ছড়া নিয়ে ছেলেমী করার ঝোঁকটা সম্ভবত ছড়ার জন্মেতিহাসের সাথেই সম্পর্কিত। কিন্তু এই ঝোঁকের মধ্যে যদি দায়বদ্ধতার কোন ছোঁয়া না থাকে তাহলেই তা হয়ে উঠে বিপর্যয়কর। কেমন বিপর্যয় ? হতে পারে ছড়াকে তার আত্মপরিচয় থেকে হটিয়ে দেয়া বা অন্য কিছুকে ছড়া নামে প্রতিস্থাপিত করা ! মানুষের ভীড়ে মানুষের মতো কতকগুলো হনুমান গরিলা ওরাংওটাং বা এ জাতীয় কিছু প্রাণী ছেড়ে দিয়ে এক কাতারে মানুষ বলে চালিয়ে দিলে যা হয়।

মানুষের দুই পা দুই হাত থাকে, ওগুলোরও দুই পা দুই হাত। পায়ের উপর ভর করে এরা সবাই হাঁটে। মেরুদণ্ড কিছুটা কুঁজো করে হাঁটা মানুষের মধ্যেও রয়েছে। বিশেষ করে বার্ধক্য আক্রান্ত মানুষের জন্য। মাঝে মাঝে বাঁদরামী সুলভ আচরণ মানুষও করে। তাহলে কি মানুষ আর হনুমান গরিলা এক হয়ে গেলো ! বিবেচনার বাহ্যিক দৃষ্টি ঝাপসা হলে দু’টোর মধ্যে তফাৎ ঘুঁচে যাওয়া বিচিত্র নয়। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রাণীগুলোর সংখ্যাধিক্য ঘটতে থাকলে এক সময়ে হনুমান গরিলাই যদি মানুষের পরিচয়ের প্রতিনিধিত্ব করতে থাকে, তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু আছে কি ? তবুও হনুমান গরিলার দ্বারা মানুষের স্থান দখল করা সম্ভব নয়। পার্থক্যের ভুলে কিছুকাল দাপাদাপি করলেও ঠিকই এদের আসল পরিচয়গুলো বেরিয়ে আসে। কোন্ আসল পরিচয় ? এটা হলো অন্তর্গত স্বভাব, আচরণের প্রকৃতি আর সৃজনশীল প্রণোদনায় মানুষের সাথে এদের মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য।

কিন্তু এখানেও কি সমস্যামুক্ত আমরা ? কীসের নিরিখে নির্ধারণ করবো মানুষ আর গরিলার অন্তর্গত স্বভাবের ভিন্নতা, আচরণের প্রকৃতিগত বিভেদ বা সৃজনশীল প্রণোদনার পার্থক্য ? সেই নির্ধারণসূত্রটা জানা হয়ে গেলে পার্থক্য নির্ণয় করা আর দুরুহ থাকে না। তাই প্লাস্টিক সার্জারি করিয়ে একটা হনুমান বা গরিলাকে মানুষের পূর্ণ আকৃতি দেয়া হলেও মানুষের স্থান দখল করা তার কখনোই সম্ভব নয়, প্রকৃতিগতভাবেই। তেমনি ছড়া নিয়ে আমাদের জটিলতার শেষ নেই। ছড়া তো কোনো প্রাণী নয় যে গুঁতো দিলেই তার প্রকৃতিগত ভাষা বা স্বভাবসুলভ আচরণ দিয়ে নিজের ধাত বা পরিচয়টা জানিয়ে দেবে ! ছড়া একটা শিল্প, অক্ষরের কারুকাজ, মূর্ত চেহারায় বিমূর্ত ব্যঞ্জনাধারী শব্দ বা শ্র“তিশিল্প। কবিতা, পদ্য, গান, পুথি, পাঁচালী এসবও তো একই পদের জিনিস, অক্ষরের কারসাজিই। তাহলে ছড়া কেন ছড়া ? কীসের নিরিখে আমরা তা নির্ধারণ করবো ?

মানুষের জীবনে উদ্ভুত জটিল জটিল সমস্যাগুলোকে সহজ সরল উদারভাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে পারলে নাকি হাইপার টেনশন, ব্লাড প্রেসার, ডায়াবেটিস ইত্যাদি অসহ্য জঞ্জালগুলো ঘাড়ে নিয়ে ডাক্তারের কাছে সকাল-বিকাল দৌঁড়ানোর ঝামেলা বহুলাংশে হ্রাস পেয়ে যেতো। হয়তো খুবই সত্য কথা। তাই বলে হনুমান গরিলার সাথে মানুষের প্রকৃতিগত পার্থক্যের জটিলতাগুলোকে খুব উদার প্রাণে সরলীকরণ করে যত্রতত্র পারস্পরিক কোলাকুলি করার দৃশ্যটা নিশ্চয়ই মানুষ জাতির জন্য সহজগ্রাহ্য হয়ে উঠবে না। তাই কিছু কিছু জটিলতাকে সহজ করে দেখার সুযোগ নেই। অতএব ছড়া কেন ছড়া, বা ছড়া কী বা এর বৈশিষ্ট্যই বা কী, কোন্ কোন্ শর্ত পূরণ করলে একটা শব্দশিল্পকে আমরা ছড়া বলবো এ ধরনের কোনো নির্ধারণসূত্র কি কোথাও পেয়েছি আমরা ?

ছড়া কেন ছড়া ?

কান টানলে যে মাথা আসে তার পেছনে সঙ্গত কারণ হলো, যিনি কান টানেন, হয়তো মাথা আসার জন্যই টানেন। টানের চোটে কানটা মাথা থেকে আলগা হয়ে চলে আসুক এটা বোধ করি তিনিও চান না। তাছাড়া আলগা হয়ে যদি এসেই যেতো তাহলে ওই বাড়তি অংশটা কি আর কান থাকতো ? না কি এর গুরুত্ব থাকতো ! আলগা করতে চাইলে কষ্ট করে কেউ টানাটানি না করে কানটা কেটেই নিয়ে আসতো। অতএব, ছড়া কেন ছড়া, আলোচনার এই কান ধরে টান দিলে আরো যেসব প্রাসঙ্গিকতার ডিপো ঐ মাথাটি চলে আসে তা এড়ানোর কোন উপায় থাকে কি ? উপায় থাকে না বলেই অদম্য কৌতূহলবশে কাউকে না কাউকে এখানে নাক গলাতে হয়। আর নাক গলাতে গেলে যা হয়, নাকটা গলে যাক্ বা খশে পড়ুক বা আস্তই থাকুক, কিছু না কিছু অভিজ্ঞতা তো ঘটেই। আজকাল আমরা যতই অলস বা অসমর্থ হই না কেন, আমাদের পূর্বসূরীদের অনেকেই যে এতে নাক গলিয়েছেন তা তো নিশ্চিৎ। তাঁদের অভিজ্ঞতা ধার করেই আমরা না হয় আমাদের আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি।

ছড়া কেন ছড়া, তা জানতে হলে আমাদেরকে চলে যেতে হয় ছড়ার কোষ্ঠিবিচারে। আর তখনি নানা প্রসঙ্গ এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরবে আমাদেরকে। ছড়া কী, ছড়ার উৎপত্তি, বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ ইত্যাদি ইত্যাদি এবং রথি মহারথিরা কে কী বলেছেন এর তূল্যমূল্য বিচারে। সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ পন্থা হচ্ছে ছড়াকে ছড়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে মানেমানে কেটে পড়া। এবং কঠিন পন্থা হচ্ছে ছ্যাচড়া জোঁকের মতো ছড়ার পিছে লেগে থেকে ছড়াকে ছ্যাড়াবেড়া ব্যতিব্যস্ত করে তোলা। এছাড়া আরেকটা মধ্যপন্থা রয়েছে। নিজেকে আড়ালে আবডালে রেখে এখান ওখান থেকে খুঁটে খুঁটে যা যতটুকু দরকার হজম পরিমাণ নিয়ে একটা মিশ্রব্যঞ্জন বানিয়ে ফেলা। অতএব কোন ক্রমবিচার না মেনে এই মধ্যপন্থায় খানিকটা আগানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।

সাহিত্য বিচারে বাংলা ছড়ার বিশাল ভাণ্ডারকে দুটি অংশে ভাগ করা যেতে পারে। (১) লোকছড়া, এবং (২) আধুনিক ছড়া। ছড়ার যে অংশ অজ্ঞাত রচয়িতার মৌখিক সৃষ্টি, তাই লোকছড়া। আর আধুনিক যুগে লেখকদের রচিত ছড়াই আধুনিক ছড়া। কত্তো সহজ সংজ্ঞা ! আসলে কি তাই ? আধুনিক যুগের কোন লেখক যদি নিজেকে অজ্ঞাত রেখে কোন মৌখিক সৃষ্ট ছড়া বাজারে ছেড়ে দেন, তাহলে কি তা লোকছড়া হয়ে যাবে ? এমন নির্বোধ প্রশ্নের পেছনেই আসলে লুক্কায়িত রয়েছে লোকছড়ার প্রকৃত রূপবিচার। অতএব আমাদেরকে এবার আরেকটু পেছনে যেতেই হয়।

শব্দটা ‘ছড়া’ না হয়ে অন্য কিছুও তো হতে পারতো। কিন্তু অন্য কিছু না হয়ে কেন ছড়া হলো, অর্থাৎ ‘ছড়া’ শব্দের ব্যুৎপত্তি নিয়েই বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যে মতপার্থক্য দেখা গেল তার সুরাহা আজও হয়নি। কেউ বলেন এটা সংস্কৃতমূল শব্দ, কেউ বলেন দেশজ। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তো তাঁর ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ গ্রন্থে ‘ছড়া’ শব্দের দীর্ঘ বিবর্তনকে রীতিমতো সংজ্ঞায়িত করে ফেলেছেন এভাবে-

সং. ছটা > প্রা. ছডা > প্রা.ম. ছিটা > ছড়া

পণ্ডিতদের মধ্যে রাজশেখর বসু (চলন্তিকা অভিধান), যোগেশচন্দ্র রায় (বাঙ্গালা শব্দকোষ) প্রমুখ তাঁকেই সমর্থন করছেন। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ বসু (বিশ্বকোষ) আবার কিছুতেই তা মানতে নারাজ। তাঁর মতে ‘ছড়া’ শব্দটি সম্পূর্ণ দেশজ। তার পালে হাওয়া লাগিয়েছেন আরেক পণ্ডিত সুকুমার সেন। তবে উনবিংশ শতাব্দির পূর্বে যে ছড়া শব্দটি বর্তমান অর্থ বহন করতো না এবং আধুনিক যুগে এসে এর অর্থগত বিবর্তন ঘটেছে তা মেনে নিয়ে শব্দের ব্যুৎপত্তিগত এই মত-ঠেলাঠেলি বাদ দিয়ে আমরা বরং ছড়ার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্যবিচারের দিকেই নজর দিতে পারি।

উনিশ শতকের শেষে এসে ছড়া সম্পর্কিত তাত্ত্বিক ও তথ্যমূলক আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। কিন্তু গত এক শতাব্দিকাল জুড়ে বিশেষজ্ঞদের মত প্রতিমত ও মতামতের বিস্তর চালাচালি হলেও ছড়ার কোন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদৌ সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবু প্রত্যক্ষভাবে সংজ্ঞা প্রদান করা না হলেও ওইসব আলোচনাগুলোতে ছড়ার বৈশিষ্ট্য নিয়ে যেসব চিন্তা ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে তাই আমাদেরকে ছড়ার রূপবিচারে আগ্রহী করে তোলে। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের মতোই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই এক্ষেত্রে আমাদের অগ্রণী পুরুষ। তাঁর হাত দিয়েই বাংলা লোকছড়ার সংগ্রহ শুরু হয় এবং তিনিই এই লোকছড়াকে সাহিত্য পত্রিকার মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রথম প্রকাশের উদ্যোগ নেন। পাশাপাশি এগুলোকে ছেলে-ভুলানো ছড়া বা মেয়েলি ছড়া নামে অভিহিত করে এ সম্পর্কিত আলোচনারও সূত্রপাত ঘটান তিনি।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ছিন্নপত্রাবলী’তে ৫সেপ্টেম্বর ১৮৯৪ এর একটি পত্র-বিচিত্রায় উল্লেখ করেন- ‘…ছড়া’র একটা স্বতন্ত্র রাজ্য আছে, সেখানে কোনো আইন কানুন নেই- মেঘরাজ্যের মতো।…’

আসলেই কি তাই ? রবীন্দ্রনাথেরই সংগৃহীত একটি লোকছড়া শুনি আমরা।

‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদী এলো বান।
শিব ঠাকুরের বিয়ে হল, তিন কন্যে দান।
এক কন্যে রাঁধেন বাড়েন, এক কন্যে খান।
এক কন্যে না খেয়ে বাপের বাড়ি যান।।’

এখানে উল্লেখ্য যে, পরবর্তীতে এই লোকছড়াটি কিঞ্চিৎ পরিবর্তিতরূপে শিশুপাঠ্যে অন্তর্ভূক্ত হয়। ‘নদী’ শব্দের জায়গায় ‘নদে’ এবং ‘না খেয়ে’ শব্দযুগল হয়ে যায় ‘রাগ করে’। এতে অবশ্য ছড়ার অর্থগত বা চিত্রগত কোন ব্যাঘাত ঘটে না। তবে রবীন্দ্রনাথের ‘কোনো আইন কানুন নেই’ কথাটি বোধ করি আমাদের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করে দেয়। কাল্পনিক কোনো টাইম মেশিনে চড়ে যদি এ মুহূর্তে কয়েকশ’ বছর পেছনে চলে যাই তাহলে কী দেখবো আমরা ? টাপুর টুপুর বৃষ্টিঝরা বর্ষায় নদীতে যে প্লাবন নামে তাতে চলাচলের একমাত্র মাধ্যম পায়ে হাঁটা পথগুলো চারদিকের থৈ থৈ বর্ষায় তলিয়ে গেলে যোগাযোগের সর্বত্রগামী মাধ্যম নৌ চলাচল হয়ে উঠে সহজলভ্য। মাঠ-ঘাট পানিতে তলিয়ে গিয়ে মানুষগুলো যখন পরিপূর্ণ বেকার হয়ে উঠে, বসে বসে খাওয়া আর পুঁথি-পাঁচালির আসর, গান বাজনা এসব বিনোদনে নিজেদের ডুবিয়ে দেয়া ছাড়া আর কী করার থাকে এদের। শুরু হয়ে যায় সামাজিক অন্যান্য পার্বন উৎসবও। এবং তখনই আমাদের প্রাচীন গ্রাম-বাংলায় দীর্ঘ অবসরে বিয়ে-বাদ্যিরও ধুম লেগে যায়। অতএব শিব ঠাকুরের বিয়ের মৌসুম যে এটাই তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রাচীন ব্রাম্মণ্য সমাজে যে বহুবিবাহের চল খুব জোরেশোরেই ছিলো এটাও স্বীকৃত। তাছাড়া মেয়ে আইবুড়ো হওয়ার আগেই কন্যাদান সম্পন্ন না হলে যে ব্রম্মপাপ ঘনিয়ে আসে তাতে একত্রে তিন কন্যা একপাত্রে দান করা ছাড়া কন্যাদায়গ্রস্ত পিতার গতিই বা কী ! বর্ণহিন্দু সমাজের এই শাস্ত্রীয় কূপমণ্ডুকতাকে দুটোমাত্র চিত্রকল্পিত শ্লেষযুক্ত বাক্যের অটুট বাঁধনে যে লোককবি এতো চমৎকারভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, তাতে আইন-কানুনের ব্যত্যয় কি চোখে পড়ে কোথাও ? শাস্ত্র রক্ষার্থে তিনকন্যে যখন তিন সতীন হয়ে উঠে, আবহমান বাঙালি সমাজে এর কী দুঃসহ ফলাফল প্রতিফলিত হতে থাকে তাও সেই লোককবি পরবর্তী দুটি বাক্যের অনিবার্য চিত্রকল্প এঁকে ঠিকই বুঝিয়ে দেন গোটা সামাজিক চিত্রের বিশদ রূপ। প্রতিটা শব্দে শব্দে বিশদভাবে ভাবলে আমাদেরকে যে কাব্যের নিয়ম-কানুন ভুলে বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকতে হয় তা অস্বীকার করি কী করে ! সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ এটাকে ছেলেভুলানো ছড়া বলতেই পারেন। তবে আমাদেরকে এটাও ভুলে গেলে চলে না যে, শাস্ত্রের কলা বিচার কি এইসব প্রাচীন লোকছড়ার আগে চালু হয়েছে, না কি পরে ?

১৩০১ বঙ্গাব্দে তাঁর ‘লোকসাহিত্য’ রচনায় ‘ছেলেভুলানো ছড়া-১’ পর্বে তিনি বলেন- ‘…ছড়াগুলিও শিশু-সাহিত্য, তাহারা মানবমনে আপনি জন্মিয়াছে।… ইহার মধ্যে ভাবের পরস্পর সম্বন্ধ নাই,… কতকগুলি অসংলগ্ন ছবি নিতান্ত সামান্য প্রসঙ্গসূত্র অবলম্বন করিয়া উপস্থিত হইয়াছে।… গাম্ভীর্য নয়, অর্থের মারপ্যাঁচ নয়, সুরময় ধ্বনিই ছড়ার প্রাণ।… ছড়াও কলাবিচারশাস্ত্রের বাহির, মেঘবিজ্ঞানও শাস্ত্রনিয়মের মধ্যে ভালো করিয়া ধরা দেয় নাই।… এবং ছড়াগুলিও ভারহীনতা অর্থবন্ধনশূন্যতা এবং চিত্রবৈচিত্র্য-বশতই চিরকাল ধরিয়া শিশুদের মনোরঞ্জন করিয়া আসিতেছে- শিশুমনোবিজ্ঞানের কোনো সূত্র সম্মুখে ধরিয়া রচিত হয় নাই।…’
সাহিত্য যখনো তার লেখ্যরূপ পায়নি, মুখে মুখে রচিত শ্লোক, গান বা ছড়াই যখন সকল সামাজিক কর্মকাণ্ডের শ্র“তিমাধ্যম হয়ে বহমান, আধুনিক শাস্ত্রবিচারিক পণ্ডিতদের আবির্ভাব নিশ্চয় এর পূর্বে ঘটে নাই ! বরং লোকায়ত সাহিত্য থেকেই যে পরবর্তী কলাশাস্ত্রের উদ্ভব, তা কি আমরা ধারণা থেকে বলতে পারি না ? সে ক্ষেত্রে আমাদের অজ্ঞাত সেই সব লোককবিদের সৃজনশীল প্রয়াসকেই আমরা শাস্ত্রসূত্রের লোকায়তিক উৎস হিসেবে ধরে নিয়ে ঐতিহ্যিক আবর্তনটাকে উপলদ্ধির রসবিচারে সিঞ্চিত করে নিতে পারি না ? তবে এটা ঠিক যে মানুষের বিচারবোধ তার সমকালীন জ্ঞান ও ভাবনার দ্বারাই প্রভাবিত ও প্রয়োগযোগ্য হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর সমকালীন বিচার ও বিশ্লেষণবোধের নিক্তি দিয়েই সংগৃহীত লোকছড়াগুলোকে যাচাই বাছাইয়ে উদ্যোগী হয়েছিলেন তা আমাদেরকে মেনে নিতেই হয়। এবং সাহিত্য বিচারে এটাই স্বাভাবিক।

‘ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি আমার বাড়ি এসো।
শেজ নেই, মাদুর নেই, পুঁটুর চোখে বোসো।।
বাটা ভরে পান দেব, গাল ভরে খেয়ো।
খিড়কি দুয়ার খুলে দেব, ফুড়ুৎ করে যেয়ো।।

১৩০১-১৩০২ বঙ্গাব্দে ‘ছেলেভুলানো ছড়া-২’ পর্বে রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘আমাদের অলংকারশাস্ত্রে নয় রসের উল্লেখ আছে, কিন্তু ছেলেভুলানো ছড়ার মধ্যে যে রসটি পাওয়া যায়, তাহা শাস্ত্রোক্ত কোনো রসের অন্তর্গত নহে।… ছেলে ভুলানো ছড়ার মধ্যে তেমনি একটি আদিম সৌকুমার্য আছে- সেই মাধুর্যটিকে বাল্যরস নাম দেওয়া যাইতে পারে। তাহা তীব্র নহে, গাঢ় নহে, তাহা অত্যন্ত স্নিগ্ধ সরস এবং যুক্তি-সংগতিহীন।’

রবীন্দ্রনাথ কথিত অলংকারশাস্ত্রের এই নয়টি রস হচ্ছে শৃঙ্গার বা আদিরস, বীররস, রৌদ্ররস, হাস্যরস, করুণরস, ভয়ানক, বীভৎস, অদ্ভুত এবং শান্তরস। রস তো আর এমনি এমনি টস টস করে না ! তার পেছনে নয়টি স্থায়ী ভাব রয়েছে বলে পণ্ডিত-মহলে স্বীকৃত। ভাব থেকেই রসের উৎপত্তি। রতি স্থায়ী ভাব থেকে শৃঙ্গার বা আদিরস, উৎসাহ থেকে বীররস, ক্রোধ থেকে রৌদ্ররস, হাস থেকে হাস্যরস, শোকভাব থেকে করুণরস, ভয় থেকে ভয়ানক, জুগুপ্সা থেকে বীভৎস, বিস্ময় থেকে অদ্ভুত এবং শম স্থায়ী ভাব থেকে শান্তরস। রসশাস্ত্র অনুসারে এই নয়টি স্থায়ী ভাব নাট্য বা কাব্যে বিভাব, অনুভাব ও ব্যভিচারী ভাবের সংযোগে নয়টি রসে সার্থক পরিণতি লাভ করে।

আমাদের সহজ সরল অশিক্ষিত লোককবিরা দুহাজার বছরের পুরনো সংস্কৃত অলংকার শাস্ত্র অধ্যয়ন ও বুৎপত্তিলাভ করে অবশেষে মুখে মুখে ছড়া কাটতে শুরু করেছিলেন বললে বক্তাকে যে পাগলা-গারদের লোহার গরাদে পুরে দিতে দেরি হবে না সেখানে বোধ করি কারোরই সন্দেহ থাকার কথা নয়। কিন্তু পণ্ডিতজনদের এমন পিলে চমকানো গবেষণা কি আর থেমে থাকে তাতে ? তাই রবীন্দ্রনাথের উপরে উদ্ধৃত ভাষ্যকে সর্বতোভাবে মেনে নেয়ার আগে তাঁরই সংগ্রহ থেকে আরেকটি ছড়া শুনে নেই আমরা-

কে মেরেছে, কে ধরেছে সোনার গতরে।
আধ কাঠা চাল দেব গালের ভিতরে।।
কে মেরেছে, কে ধরেছে, কে দিয়েছে গাল।
তার সঙ্গে গোসা করে ভাত খাওনি কাল।।
কে মেরেছে, কে ধরেছে, কে দিয়েছে গাল।
তার সঙ্গে কোঁদল করে আসব আমি কাল।।
মারি নাইকো, ধরি নাইকো, বলি নাইকো দূর।
সবেমাত্র বলেছি গোপাল চরাও গে বাছুর।।

অথবা রবীন্দ্রনাথের নিজের রচনাকৃত একটা ছড়াও শুনে নিতে পারি আমরা-

ভোলানাথ লিখেছিল তিন চারে নব্বই
গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্ব্বই।
তিন চারে বারো হয় মাস্টার তারে কয়
লিখেছিনু ঢের বেশি এই তার গর্বই।

এসব রচনায় শুধুই কি বাল্যরস, না কি অন্য কোন রসও রয়েছে তা বিজ্ঞ গবেষকদের জন্যই থাক।

১৩৪১ বঙ্গাব্দে ‘ছন্দ’ রচনার পদ্যছন্দ বিষয়ক এক জায়গায় রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন- ‘…যতিকে কেবল বিরতির স্থান না দিয়ে তাকে পূর্তির কাজে লাগাবার অভ্যাস আরম্ভ হয়েছে আমাদের ছড়ার ছন্দ থেকে। ছড়া আবৃত্তি করবার সময় আপনি যতির যোগান দেয় আমাদের মনে।…ছড়ার রীতি এই যে, সে কিছু ধ্বনি জোগায় নিজে, কিছু আদায় করে কণ্ঠের কাছ থেকে; এ দুইয়ের মিলনে সে হয় পূর্ণ।…’
আশ্বিন ১৩৪৪ বঙ্গাব্দে ‘ছড়ার ছবি’ রচনায় রবীন্দ্রনাথ বলেন- ‘…ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ঘরাও ছন্দ।…এর ভঙ্গীতে এর সজ্জায় কাব্য সৌন্দর্য সহজে প্রবেশ করে, কিন্তু সে অজ্ঞাতসারে। এই ছড়ায় গভীর কথা হালকা চালে পায়ে নূপুর বাজিয়ে চলে, গাম্ভীর্যের গুমোর রাখে না।… ছড়ার ছন্দকে চেহারা দিয়েছে প্রাকৃত বাংলা শব্দের চেহারা।… বাংলা প্রাকৃত ভাষায় হসন্ত-প্রধান ধ্বনিতে ফাঁক বুজিয়ে শব্দগুলিকে নিবিড় করে দেয়।’

কবিগুরুর সাথে দ্বিমত থাকলেও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের এইসব প্রণিধানযোগ্য মন্তব্যগুলো থেকে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর গবেষণা-সন্দর্ভ ‘ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে রবীন্দ্র-ভাবনায় ছড়াসম্পর্কিত বৈশিষ্ট্যের যে নির্যাস দাঁড় করান তা হচ্ছে: (১) ছড়া নির্দিষ্ট নিয়ম-কানুনের অধীন নয়, (২) ছড়ায় ভাব পরস্পর সম্বন্ধহীন ও যুক্তিসঙ্গতিবিহীন, (৩) ছড়ার চিত্র অসংলগ্ন, (৪) অর্থবোধের চেয়ে সুরময় ধ্বনিই ছড়ার প্রাণস্বরূপ, (৫) ছড়া কলাবিচার-শাস্ত্র কিংবা শাস্ত্রীয় রসে বিচার্য নয়, (৬) ছড়ায় যতির ভূমিকা শুধু বিরতির জন্য নয় এবং (৭) ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত ভাষার ছন্দ এবং শব্দও প্রাকৃত।

উল্লেখ্য, এগুলো ছড়ার জন্য স্বতসিদ্ধ কোন নির্ধারণসূত্র নয়। রবীন্দ্রভাবনায় ছড়ার বৈশিষ্ট্য। যেহেতু লোকায়ত ছড়াগুলোর আদ্যান্ত পাঠ করেই আমাদেরকে পরবর্তীকালের আধুনিক ছড়ার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করতে হয়, তাই লোকছড়াভিত্তিক আমাদের রথি-মহারথিদের আলোচনাগুলোকে বিবেচনায় নিয়েই আমাদেরকে প্রশ্ন উত্থাপনের পরবর্তীধাপে পা রাখতে হয়। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে বিশেষজ্ঞ পণ্ডিতদের দ্বারস্থ তো হতেই হয়। আলোচনা যখন ছড়া নিয়ে, রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি যোগীন্দ্রনাথের নাম তো অনিবার্যভাবেই এসে পড়ে। কিন্তু তিনি আবার এসব তর্ক-বিতর্কে না জড়িয়ে ছড়া সংগ্রহ ও রচনার মধ্য দিয়েই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন।

আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মউ,
কথা কও না কেন বউ ?
কথা কব কী ছলে,
কথা কইতে গা জ্বলে !
-(তোতা পাখি/ খুকুমণির ছড়া)

যোগীন্দ্রনাথ কর্তৃক সংগৃহীত এই লোকছড়াটিই পরবর্তীকালে আমাদের দেশের শিশু পাঠ্যে যে বিবর্তিত রূপ নিয়ে পঠিত হতে থাকে, তা হচ্ছে এরকম-

আতা গাছে তোতা পাখি
ডালিম গাছে মৌ,
এত ডাকি তবু কথা
কও না কেন বৌ !

সেই যোগীন্দ্রনাথ সরকার কর্তৃক সংগৃহীত ও ১৩০৬ বঙ্গাব্দে লোকছড়ার প্রথম সংকলিত গ্রন্থ ‘খুকুমণির ছড়া’র ১ম সংস্করণের ভূমিকায় রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী বলেন- ‘…বয়স্ক মানবের চরিত্র বিভিন্ন দেশে বিভিন্নরূপ।…কিন্তু শিশু-চরিত্র বোধ করি সর্বদেশেই ও সর্বকালেই একরূপ।… মানব-শিশু যখন সূতিকাগার হইতে প্রথম বাহির হইয়া সংসারের সহিত পরিচয় আরম্ভ করে, তখন শাদা চামড়া ও কাল চামড়া উভয়েরই অভ্যন্তরে ঠিক একজাতীয় বুদ্ধিবৃত্তি বর্তমান থাকে। যাঁহাদের অবকাশ আছে, তাঁহারা বাঙ্গালীর ছেলের ‘ছড়া’ ও ইংরেজের ছেলের ‘নার্শারী গান’ মিলাইয়া দেখিবেন, উভয়ের মধ্যে কি অদ্ভুত রকমের সৌসাদৃশ্য বর্তমান।… কেবল শিশু-প্রকৃতি কেন, বয়স্ক মনুষ্যের প্রকৃতিতেও যে অংশটুকু মানবজাতির সাধারণ, তাহারও পরিচয় এই বিভিন্ন দেশের ছড়া-সাহিত্যে সুস্পষ্ট পাওয়া যাইবে।…
…বাঙ্গালীর শিশুসাহিত্য বা ছড়া সাহিত্য, যাহা লোকমুখে প্রচারিত হইয়া যুগ ব্যাপিয়া আপন অস্তিত্ব বজায় রাখিয়াছে, কখন লিপিশিল্পের যোগ্য বিষয় বলিয়া বিবেচিত হয় নাই, সেই সাহিত্য সর্বতোভাবে অতুলনীয়।…’
অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী ছড়ার অভিন্ন রূপ এবং মানবজাতির নৃতাত্ত্বিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বা মনস্তাত্ত্বিক সাযুজ্যের কারণে আবহমান লোকছড়ার মধ্যেও এই মিল বা অভিন্নতা দেখা যায়। এবং এই লোকছড়া উচ্চমানের অতুলনীয় সাহিত্য হিসেবে বিবেচিত। অতএব, প্রসঙ্গটা যখন এবার সাহিত্যের মধ্যেই নাক গলিয়ে দেয়, তখন আর এইসব ছড়ার সাহিত্যকীর্তি হিসেবে বিচার-বিশ্লেষণই বা বাদ থাকে কী করে ! রবীন্দ্রনাথের সুরে সুর মিলিয়ে এবার ছন্দবিশারদরাও ঝাঁপিয়ে পড়লেন নিক্তি-পাল্লা নিয়ে।

১৩৪৮ বঙ্গাব্দে মোহিতলাল মজুমদার তাঁর ‘বাংলা কবিতার ছন্দ’ গ্রন্থে ছড়ার ছন্দ নিয়ে বৈশিষ্ট্যময় মন্তব্য করেন- ‘এই ছন্দের সাধারণ রূপটির প্রধান উপাদান দুইটি-
১. ইহার ধ্বনিস্থানের সংখ্যা সর্বদাই চার,এবং
২. আদ্য বর্ণের ঝোঁকটিকে সমৃদ্ধ করিবার জন্য ধ্বনিস্থানের উপযুক্ত অবকাশে হসন্তের সন্নিবেশ।’

চৌধ্রী বাড়ির মৌধ্রি পিঠা,
গয়লা বাড়ির দই;
সকল চৌধ্রী খেইতে বৈছে,
বুড়া চৌধ্রী কই ?
বুড়া চৌধ্রী গাই দুয়ায়,
গাইয়ে দিল লাথ;
সকল চৌধ্রী মইরা গেল
শনিবারের রাইত্ !
-(চৌধ্রী / খুকুমণির ছড়া)

আবার সুকুমার সেনের মতে ছড়াই সর্বকালের আদিম কবিতার বীজ। ‘বিচিত্র সাহিত্য’ গ্রন্থে ‘লোকসাহিত্য’ বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে সুকুমার সেন বলেন- ‘…লোকসাহিত্যের যে শাখাটি অন্তপুরের আঙিনায় স্নিগ্ধ ছায়া বিস্তার করেছে তা ঘুমপাড়ানি ও ছেলেভুলানো ছড়া। এই ছড়ার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সর্বদেশের সর্বকালের আদিম কবিতার বীজ, বাণীর প্রথম অঙ্কুর। আদি মানবজননীর কণ্ঠের অর্থহীন ছড়ার টানা সুর ছন্দের জন্ম দিয়েছে।… ছেলেভুলানো ছড়া কবিতাই। তবে তার নির্মাণরীতি সাধারণ কবিতার থেকে আলাদা। সাধারণ কবিতা লেখবার সময় কবির কল্পনা বিচরণ করে ভাব থেকে রূপে, রস থেকে ভাষায়। ছড়া কবিতায় লেখকের কল্পনা যায় রূপ থেকে ভাবে, ভাষা থেকে রসে, এবং তাতে রূপের ও ভাবের মধ্যে, ভাষা ও রসের সঙ্গে কোন রীতিসিদ্ধ যোগাযোগ বা সঙ্গতি আবশ্যিক নয়।…’
মোদ্দা কথা, রসবিচার শাস্ত্রিকরাও এবার চিপেচিবড়ে রস বের না করে আর ছড়াকে ছাড়ছেন না। এদিকে মুহম্মদ আবদুল হাই তো মনে করেন সমগ্র মধ্যযুগে ধর্মীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্বে সত্যিকার সাহিত্যশাখা হলো ছড়া। ১৩৫১ বঙ্গাব্দে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দিন সম্পাদিত ‘সওগাত’ পত্রিকার ২৬ বর্ষ ১২ সংখ্যায় তিনি তার মতামত এভাবে তুলে ধরেন- ‘…মধ্যযুগের কাব্য-সাহিত্যের আলোচনাক্রমে সেই যুগের বৈশিষ্ট্যবর্জ্জিত অথচ প্রকৃত সাহিত্যের উপাদান সমন্বিত একটি সাহিত্য-শাখার নাম করা যাইতে পারে- তাহা, ছড়া ও গ্রাম্যগীতিকা।’

তাহলে বুঝুন এবার ঠেলা ! সাহিত্যে লেটার মার্ক নিয়ে দৌঁড়ে এগিয়ে থাকা ছড়াকে আর পায় কে ! ফলে ছড়া নিয়ে যে ঔৎসুক্য দেখা দিলো, তাতে করেই লোকায়ত ছড়া থেকে প্রাণশক্তি আহরণ করে আমাদের আধুনিক ছড়ার ধারাটাও চলিষ্ণু হয়ে উঠলো এবার। ছড়ার বই প্রকাশ দেরিতে হলেও ছড়ার রচনাকাল বিচারে যোগীন্দ্রনাথ সরকারই বাংলা আধুনিক ছড়ার অগ্রপুরুষ হিসেবে স্বীকৃত।

…ওই তো ওখানে/ ঘুড়ি ধরে টানে,/ ঘোষেদের ননী;
আমি যদি পাই,/ তা হলে উড়াই/ আকাশে এখনি !
দাদখানি তেল,/ ডিম-ভরা বেল,/ দুটা পাকা দৈ,
সরিষার চাল,/ চিনি-পাতা ডাল,/ মুসুরির কৈ !…

…এসেছি দোকানে-/কিনি এই খানে,/ যত কিছু পাই;
মা যাহা বলেছে,/ ঠিক মনে আছে,/ তাতে ভুল নাই !
দাদখানি বেল,/ মুসুরির তেল,/ সরিষার কৈ,
চিনি-পাতা চাল,/ দুটা পাকা ডাল,/ ডিম-ভরা দৈ।
–(কাজের ছেলে/যোগীন্দ্রনাথ সরকার)

ছড়া সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ আমাদের চোখে উপরে উদ্ধৃত রচনাটিকে কেউ যদি ছড়া বলে স্বীকার না করেন, তাহলে হয়তো কোমর বেঁধে এখনি ঝগড়া করতে লেগে যেতে প্রস্তুত হয়ে আছি আমরা। ইস্কুলপাঠ্যে মুখস্থও করে এসেছি, অনেকটা না বুঝেই। কিন্তু আশুতোষ ভট্টাচার্যের মতো পরবর্তী আরো পণ্ডিতজনেরা যখন স্পষ্ট করে দেন যে, ছড়ার বৈশিষ্ট্যের অন্যতম শর্ত হলো…ছড়া কবিতার মতো দীর্ঘ না হওয়াই নিয়ম;… , বা …ছড়া হবে বাহুল্যবর্জিত, দৃঢ়বদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত,… তখন কি আমরা বিভ্রান্ত না হয়ে পারি ? সে ক্ষেত্রে উপরোক্ত তিন স্তবক ও ছত্রিশ পঙক্তিতে বিন্যস্ত ‘কাজের ছেলে’ রচনাটি কি এক কথায় ছড়া থেকে খারিজ হয়ে যায় না ! একইভাবে তাঁর ‘মজার দেশ’, ‘কাকাতুয়া’ ইত্যাদি রচনাগুলোর মতো আরো কতকগুলো রচনা খারিজ করে দিয়ে এই খারিজের দৃষ্টান্ত অন্যদের মধ্য থেকে টানতে থাকলে খারিজ তালিকা যে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠতে থাকবে, তা হজমের সামর্থ কি আছে আমাদের ? না থাকলে তা বোধ করি আমাদেরকে এবার আয়ত্তে আনতেই হবে। কেননা লোকছড়ার সাথে আধুনিক ছড়ার যে বিরোধের সূত্রপাত শুরুতেই পেয়ে যাই আমরা তার কোন সুরাহা এখনো হয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই। নইলে এই খড়গ-হস্ত থেকে রবীন্দ্রনাথও রেহাই পান না কিছুতেই। যদিও বিশাল সাহিত্যকৃতির বিপুল ভাণ্ডারে অন্য সবদিকে রবীন্দ্রনাথকে আমরা পেলেও ছড়াকার হিসেবে তাঁকে আমরা খুব একটা সার্থকভাবে আবিষ্কার করতে পারি না।

তাঁদের সমসাময়িক ও পরবর্তী গঠনকালে আধুনিক ছড়া রচনায় আরো অনেকেই এগিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে উপেন্দ্রকিশোর, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সুকুমার রায়, গুরুসদয় দত্ত, সুনির্মল বসু, অন্নদাশঙ্কর রায় অন্যতম হলেও একমাত্র সুকুমার রায় ছাড়া আর কাউকেই আধুনিক ছড়া সাহিত্যের আদর্শ হিসেবে অনিবার্য প্রভাব নিয়ে রাজত্ব করতে দেখি না আমরা। সুকুমার তাঁর ছড়ায় যে হাস্যরস, স্যাটায়ার, হিউমার, ননসেন্স ইমেজ দিয়ে এক বিদ্রুপাত্মক কৌতুকময় জগৎ গড়ে তুলেন, ছড়া সাহিত্যে সুকুমার ঘরাণা হিসেবেই তা প্রতিষ্ঠিত হয়ে দাপটের সাথে এখনো রাজত্ব করে যাচ্ছে।

সব লিখেছে এই কেতাবে দুনিয়ার সব খবর যত
সরকারী সব অফিসখানার কোন্ সাহেবের কদর কত।
কেমন ক’রে চাট্নি বানায়, কেমন ক’রে পোলাও করে,
হরেক রকম মুষ্টিযোগের বিধান লিখছে ফলাও ক’রে।
সাবান কালি দাঁতের মাজন বানাবার সব কায়দাকেতা,
পূজা পার্বণ তিথির হিসাব শ্রাদ্ধবিধি লিখ্ছে হেথা।
সব লিখেছে, কেবল দেখ পাচ্ছিনেকো লেখা কোথায়-
পাগলা ষাঁড়ে র্কলে তাড়া কেমন ক’রে ঠেকাব তায়।
-(কি মুস্কিল!/আবোল তাবোল/সুকুমার রায়)

মাত্র ছত্রিশ বছরের স্বল্পায়ুর কারণেই কিনা জানি না, সুকুমার রায়কে ছড়া সম্পর্কিত তাত্ত্বিক কোনো আলোচনায় আমরা পাই না। অন্যদিকে দীর্ঘায়ু হবার কারণেই হয়তো ছড়াকার হিসেবে সার্থকতা না পেলেও অন্নদাশঙ্কর রায়কে নিরেট তাত্ত্বিক আলোচনায় উঠে আসতে দেখি আমরা।

অন্নদাশঙ্কর রায় যখন তাঁর সমাজতত্ত্ব নিয়ে আবির্ভূত হন ছড়া-আলোচনায়, তখন তিনি আর ছড়ার লোকায়ত পর্যায়ে নেই। সরাসরি চলে এসেছেন আধুনিক ছড়ার উঠোনে। অর্থাৎ আলোচনার একটা পর্যায়ে এসে আমাদের পণ্ডিত ব্যক্তিগণ লোকায়ত ছড়াগুলো কীভাবে রচিত হয়েছে তার নমূনা মাথায় রেখে আধুনিক ছড়া কীভাবে লিখিত হওয়া উচিৎ এই প্রাসঙ্গিক আলোচনায়ও নিজেদের সম্প্রসারিত করে দেন। অর্থাৎ ছড়ার বৈশিষ্ট্য কী এবং কী হওয়া উচিৎ, এ বিষয়টা তাঁদের মাথায় জেঁকে বসে গেছে। তাঁর মতে ছড়া রচনা হওয়া উচিৎ শ্রমজীবী মানুষ এবং নিষ্পাপ শিশুদের জন্য জনসাহিত্য হিসেবে। রবীন্দ্রনাথের মতো তিনিও ছড়ার ক্ষেত্রে ধ্বনি, মেজাজ, রস, অসংলগ্নতা, চিত্রময়তা ও মিলের ওপর জোর দেন। এছাড়াও তিনি ইমেজ, ফান, আর্ট, আনইভেন্নেস, আকস্মিকতা, যুক্তাক্ষর বর্জন প্রত্যেকটি বৈশিষ্ট্য যুক্ত করে ছড়াতত্ত্বে রীতিমতো নতুন মাত্রা সংযোজন করতে উদ্যোগী হন। ‘উড়কী ধানের মুড়কী’ গ্রন্থের তৃতীয় সংস্করণের ভূমিকায় তিনি বলেন- ‘…ছড়া লেখার উপকরণ আসে সমসাময়িক ঘটনা বা পরিস্থিতি থেকে।…’

তেলের শিশি ভাঙলো বলে
খুকুর ’পরে রাগ করো,
তোমরা সবাই বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো
তার বেলা ?
-(অন্নদাশঙ্কর রায়)

এখলাসউদ্দিন আহমদ সম্পাদিত ‘ছড়ায় ছড়ায় ছন্দ’-এ ছড়ার রূপবিচার করতে গিয়ে অন্নদাশঙ্কর তাঁর মতামতটা তুলে ধরেন এভাবে- ‘…পুরাতন ছড়া যেন একটা ভাঙ্গা আয়নার জোড়া দেওয়া এক রাশ টুকরো। একটাকে আরেকটার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপায় নেই। কতকগুলি টুকরো বেমালুম হারিয়ে গেছে। কতকগুলিকে ভুল জায়গায় বসানো হয়েছে। সেই জন্যে সেই আয়না দিয়ে আমরা অতীতের মুখ দেখতে পাচ্ছিনে। পাচ্ছি একরাশ ইমেজ। কিন্তু ধ্বনি মোটামুটি ঠিকই আছে।
ছড়া মুখে মুখে কাটবার জিনিস, লেখনীমুখে রচনা করবার জিনিস নয়। লেখনি তাকে ধরে রাখতে পারে, কিন্তু চোখ দিয়ে পড়ার জন্যে নয়, কান দিয়ে শোনার জন্য। কান যদি বলে, এ ছড়া নয়, তবে এ ছড়া নয়। এ পদ্য।…’
অথচ মজার ব্যাপার হচ্ছে অন্নদাশঙ্কর নিজেও ছড়ার নাম দিয়ে দীর্ঘ বেয়াল্লিশ চরণের পদ্য লেখা থেকে নিজেকে নিবৃত রাখতে পারেন নি !

গোরা কবর ! ফাঁসি-দিয়া বর
চহটার ঘাট ! কটক নগর !

‘বর’ মানে বট, সেই গাছে জানো
গতযুগে হতো ফাঁসি লটকানো
গোরাদের ওই গোরস্থানেও
ভয় হানা দেয় কালার প্রাণেও।…

…রাত কেটে যায় গোরুর গাড়ীতে
বেলা বয়ে যায় নদী পাড়ি দিতে।
কী বিশাল নদী ! মাঝখানে চর
নাও থেকে নেমে হাঁটি বরাবর।…
-(মামার বাড়ী যাওয়া/ ছোটদের ছড়া/ অন্নদাশঙ্কর রায়)

কলকাতা থেকে মার্চ ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ধীমান দাশগুপ্ত সম্পাদিত সংকলন ‘একশো ছড়া’এ ছড়া বিষয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের স্পষ্টোক্তি- ‘… কবিতার মতো ছড়ার নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, ছড়া বানাবার। ছড়া হয় আকস্মিক, ইররেগুলার। সেখানে আর্ট আছে, আরটিফিসিয়ালিটির স্থান নেই।
ছড়া হবে ইররেগুলার, হয়তো একটু আন্ ইভেন। বাকপটুতা, কারিকুরি নয়। কবিতা থেকে ছড়া আলাদা। ছড়াকে কবিতার মধ্যে ঢোকাতে গেলে কবিতাকে ব্যাপ্ত করে নিতে হয়। কবিতা তো যে কোনো ভাবেই হয়, যে কোনো ছন্দে, এমনকি গদ্যেও। ছড়ার কিন্তু একটাই ছন্দ, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ছড়ার ছন্দ, একটু দুলকি চালে চলে, শাস্ত্রসম্মত নামও একটা আছে তার। ছড়া ঐ ছন্দেই লেখা যায় শুধুই।… আর ছড়ার মিল। দু সিলেবল হবেই, তিন সিলেবল হলে আরও ভালো হয়। আর শেষে কোন যুক্তাক্ষর থাকবে না।…
ভাব ও ছন্দ তো থাকবেই, এ ছাড়াও ছড়ায় থাকবে ইমেজ ও মিল। ছড়ার ইমেজ মিল রেখে আসে না, পারম্পর্য কম।… ছড়া হলেই হালকা, সরস হবে তা কেন ? সব কিছু নিয়েই ছড়া হয়েছে, বীভৎস রস নিয়েও হয়েছে।…
আধুনিক ছড়ায় লোকছড়ায় কালেকটিভ সেন্সটা নেই।… আজ সীরিয়াস লোকেরাও ছড়া লিখছেন। ছড়ার মধ্যে সত্যি কিছু না থাকলে এটা হত না। তবে সব ছড়াই তো আর ছড়া নয়, বেশীর ভাগই পদ্য।’
তাঁর মতের সাথে কে কতটুকু একমত হবেন বা না হবেন সে ভিন্ন কথা। কিন্তু ছড়া নিয়ে অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতো এমন স্পষ্টোক্তি সম্ভবত খুব কম জনই এভাবে করেছেন। এক্ষেত্রে বাড়তি কোন মন্তব্য না করে তাঁরই অন্য একটি রচনা থেকে তাঁকে তাঁর কথা দিয়ে ছড়ার ছন্দটাকে মাত্রা বিচারে যাচাই করে নিতে পারি আমরা। সেক্ষেত্রে ছ’মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত পর্ব-অতিপর্বে বিভাজিত নিম্নোক্ত রচনাটিকে তাহলে কোন্ বিচারে আমরা পদ্য না বলে ছড়া বলবো ?

শুনহ ভোটার ভাই,
সবার উপরে আমিই সত্য
আমার উপরে নাই।
আমাকেই যদি ভোট দাও আর
আমি যদি হই রাজা
তোমার ভাগ্যে নিত্য ভোগ্য
মৎস্য মাংস খাজা।
শুনবে আমার নাম ?
আমি টুইডেলডাম।…
-(শুনহ ভোটার ভাই/ বড়োদের ছড়া/ অন্নদাশঙ্কর রায়)

ছড়া নিয়ে বৈশিষ্ট্যসূচক মন্তব্য ও আলোচনা আরো অনেকেই করেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছড়াকে চিত্রশিল্প ও সংগীত শিল্পের দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করেছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লোকসাহিত্য সংক্রান্ত বিভিন্ন রচনায় ছড়াকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিচারের জন্য সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। মুহম্মদ এনামুল হক সুকুমার সেনের মতো ছড়ায় লোকসাহিত্যের প্রাচীন রূপের সন্ধান করেছেন। ডাক ও খনার বচন এবং মন্ত্রের সাথে ছড়ার পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে তিনি তাঁর ‘মণীষা-মঞ্জুষা’ গ্রন্থে মন্তব্য করেন যে, …ছড়ায় উপদেশ নাই, চিত্র আছে। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর ‘কবিতার কথা ও অন্যান্য বিবেচনা’ গ্রন্থে লোকসাহিত্য প্রসঙ্গে ছড়া-নির্মাণের পদ্ধতিকে অসচেতন প্রয়াস মনে করে মন্তব্য করেন যে, ‘… সচেতন বুদ্ধির কুশলতায় ছড়াগুলো নির্মিত হয়নি- এগুলো অপরিমিত অবকাশের আনন্দ সঞ্চয়।’ আর নীলরতন সেন ১৯৭৮ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সঞ্জীব সরকার সম্পাদিত ‘লোকায়ত সংস্কৃতির পরিপ্রেক্ষিত ও রূপরেখা’ সংকলনে লোক কাব্যের ছন্দ বিষয়ে বলতে গিয়ে ছড়ার উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন- ‘…ছড়ায় আবৃত্তির সুর বা গীতের পঠন ভঙ্গি থাকায় তা ঝোঁকালো, সুরাশ্রয়ী এবং উচ্চারণে দ্রুত সংকোচন-বিবর্ধন মাত্রিক।… স্বভাব আবৃত্তির ব্যত্যয় এতে বাঞ্ছনীয় নয়।’

পুয়াপুড়ি ভুল্লাভুল্লি, যাওরে বারিয়া।
দামান কন্যা ঐ তো যায় বন্ধোর মাঝে দিয়া।।
আগে দামান পাছে কন্যা, তার পাছে বৈরাতি।
চলছৈন দেখা যায় যেমন আছে রীতি।।
দান জেহেজ বড় নায় ভোর ভারটি কম।
ভাবে বুঝলাম কন্যার বাপ কাটুয়ার যম।। (সিলেট)
-[সংগ্রহ: ওয়াকিল আহমদ]

তবে ছড়া নিয়ে সম্ভবত সবচেয়ে বড় কাজটি করেন আশুতোষ ভট্টাচার্য। লোকছড়াকে প্রথম একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণার বিষয় হিসেবে নিয়ে তিনি বাংলা ছড়াকে আন্তর্জাতিক ফোকলোর-চর্চার পদ্ধতিতে বিচারের পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের ছড়ার সঙ্গে বাংলা ছড়ার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য বিচার করেন এবং ছড়ার সংজ্ঞা, ছন্দ, শব্দ-ব্যবহার প্রভৃতিও নির্দেশ করেন। লোকসাহিত্যের অন্যান্য শাখার সঙ্গে ছড়ার পার্থক্য, ছড়ার আঞ্চলিক পাঠান্তরের কারণ, ছড়ার কল্পনার জগৎ, ছড়া ও শিশু কবিতার পার্থক্য প্রভৃতি বিষয়েও তিনি নতুন উপাদান যুক্ত করেন। আশুতোষ ভট্টাচার্যের দীর্ঘসময়ে একাধিক গ্রন্থের সহস্রাধিক পৃষ্ঠায় আলোচিত ছড়া-তত্ত্বের মূল সূত্রসমূহকে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ তাঁর গবেষণা সন্দর্ভ ‘ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে খুব সংক্ষিপ্তভাবে নিম্নরূপ তুলে ধরেন:

‘…যাহা মৌখিক আবৃত্তি করা হয়, তাহাই ছড়া, যাহা তাল ও সুর-সহ গান করা যায়, তাহাই সঙ্গীত।…ছড়ার সুর বৈচিত্র্যহীন, সঙ্গীতের সুর বৈচিত্র্যময়।…
…ছড়ায় কোন কাহিনীও থাকে না; ইহার মধ্যে যাহা থাকে, তাহাকে চিত্র বলিতে পারা যায়; কিন্তু সেই চিত্রও স্বয়ংসম্পূর্ণ নহে,…
…ছড়ার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এই যে, ইহার একটির অংশের সঙ্গে আর একটির অংশ অতি সহজেই জুড়িয়া যায়, তাহার ফলেই একই ছড়ার মধ্যে ভাব ও চিত্রগত বিভিন্নতা দেখিতে পাওয়া যায়। ছড়ার পদগুলি পরস্পর সুদৃঢ়ভাবে সংবদ্ধ নহে, বরং নিতান্ত অসংলগ্ন;…
…ছড়ার ছন্দের বিশিষ্ট লক্ষণ এই যে, ইহা শ্বাসাঘাত-প্রধান।…প্রতি পর্বের স্বর সংখ্যা গণনা করিয়া মাত্রার হিসাব পাওয়া যায় বলিয়া অনেকে ইহাকে স্বরমাত্রিক বা স্বরবৃত্ত ছন্দ বলেন। ইহার প্রত্যেক পর্বের আদিতে ঝোঁক পড়ে বলিয়া ইহাকে প্রাস্বরিক ছন্দ বা বল-প্রধান ছন্দও বলে; এতদ্ব্যতীত ইহা ছড়ার ছন্দ, লৌকিক ছন্দ, প্রাকৃত ছন্দ ইত্যাদি নামেও পরিচিত, তবে স্বরবৃত্ত নামটিই ইহার বহুল প্রচলিত।’
-[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’। ক্যালকাটা বুক হাউস, কলকাতা। ১৯৫৭।]

‘বাংলার ছড়াগুলির একটি প্রধান গুণ এই যে, লোক-সাহিত্যের অন্যান্য কোন কোন বিষয়ের মত ইহারা যে কেবল মাত্র আঞ্চলিক, অর্থাৎ একই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ, তাহা নহে, -অনুসন্ধানের ফলে দেখা গিয়াছে যে, এক একটি ছড়া যে কোন ভাবেই হোক, বাংলাদেশের এক প্রান্তে রচিত হইলেও কালক্রমে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত অনায়াসেই বিস্তার লাভ করিয়াছে। যে সকল সাংস্কৃতিক উপকরণ দ্বারা সমগ্র বাঙ্গালীর মধ্যে কালক্রমে একটি অখণ্ড ঐক্য সৃষ্টি হইয়াছে, ছড়া তাহাদের অন্যতম;… ইহার প্রধান কারণ, ছড়ার মধ্যে সহজ আনন্দের যে ভাবটি প্রকাশ পায়, তাহার একটি সার্বজনীন আবেদন থাকে। যেখানে তথ্য ও তত্ত্ব, সেখানেই বিশিষ্টতা; কিন্তু ছড়াগুলিতে যেমন কোন তথ্য নাই, তেমনই কোনও তত্ত্বও নাই;…’
-[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯। ]

‘…ছড়ার মধ্যে শব্দ অপেক্ষা সুরের প্রয়োজন অধিক।…
…ছড়ায় অপরিচিত বিদেশী শব্দ কদাচ ব্যবহৃত হয় না। ছড়া শিশুর ভাষা, বিজ্ঞের ভাষা নহে;…
…শব্দের উচ্চারণ বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করিয়াই ছড়া প্রধানতঃ রচিত হয়, শব্দই ছড়ার প্রাণ-স্বরূপ, অর্থ ইহার গৌণ মাত্র।…
…বাস্তবে এবং কল্পনায় মিলিয়াই ছড়ার জগৎ গড়িয়া উঠে, কেবলমাত্র অবিমিশ্র বাস্তবও যেমন ইহাতে থাকে না, তেমনই অবিমিশ্র কল্পনার উপাদানেও ইহা সৃষ্টি হয় না। সাহিত্য মাত্রেরই ইহা স্বাভাবিক ধর্ম।…’
‘…ছড়ার মধ্যে যেমন চিত্রের অসংলগ্নতা দেখা যায়, ইহার আনুপূর্বিক বর্ণনার মধ্যেও তাহাই অনুভব করা যায়। কিন্তু চিত্রগুলি পরস্পর অসংলগ্ন হইলেও একটি অখণ্ড সুর ইহাদের মধ্য দিয়া প্রবহমান; ছড়ার ইহাই বৈশিষ্ট্য।’…
-[ আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯। ]

‘…ছড়া তাহার অন্তরঙ্গ ও বহিরঙ্গ পরিচয়ে লোক-সাহিত্যের অপরাপর শাখা হইতে স্বতন্ত্র। ইহারা স্বপ্নদর্শী মনের অনায়াস সৃষ্টি; ইহাদের শিল্পরূপও কোন ব্যক্তি কিংবা সমাজের সচেতন প্রতিভার সৃষ্টি নহে। ইহাদের মধ্যে বৈদগ্ধ অপেক্ষা স্বতঃস্ফূর্ত রসধারা, মস্তিস্ক অপেক্ষা হৃদয়ের স্থান অনেকখানি বেশী।…
…সকল শিশু-কবিতাই ছড়া নহে।
…শিশু-কবিতা আর সাহিত্যিক ছড়ায় পার্থক্য কোথায় ? কোন তৌল ব্যবহার করিয়া উভয়ের মধ্যকার দূরত্বটুকু জানিয়া লইব ? ছড়া এই শব্দটি শ্রবণ মাত্র একটি বিশেষ কাব্যবৈশিষ্ট্য আমাদের মনে ভাসিয়া উঠে; একটি সংস্কার অন্তরে সক্রিয় হইয়া উঠে। ইহারা শুধুমাত্র তাহাদের ছন্দ-প্রকরণেই অন্যতর, তাহাই নহে- ইহাদের বক্তব্যের মধ্যেও একটি স্বাতন্ত্র্য আছে। এই শ্রেণীর কবিতায় উদ্ভট বিষয়, অবাস্তব পরিস্থিতি, বক্তব্যের অসম্পূর্ণতা, চিত্রের অসমীচীনতা বর্তমান থাকে। ইহাতে একটি বিশেষ বিষয় কখনও পরিপাটিভাবে শেষের দিকে অগ্রসর হয় না। কিন্তু শিশু-কবিতার ছন্দ সাধারণত পয়ার আশ্রয়ী। অধিকন্তু তাহাতে অসম্ভব বিষয়ের বর্ণনা থাকিলেও কখন উদ্ভট অসামঞ্জস্য দেখা যায় না। একটা সুষ্ঠু পরিণতি সেখানে সম্ভাব্য।…’
-[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘বাংলার লোক-সাহিত্য’, ২য় খণ্ড। ক্যালকাটা বুক হাউস। ১৩৬৯।]

‘…প্রচলিত ছড়ার চিত্রগুলো খাপছাড়া হলেও একটি বিশেষ রীতি অনুসরণ করেই তাদের চিত্রগুলো পরিকল্পিত হয়। বিশেষত সে সকল পরিকল্পনা যে সচেতন মনের প্রয়াস, তা কিছুতেই বুঝতে পারা যায় না।…
…প্রচলিত লেখার ছড়াগুলোর মধ্যে যে সকল চিত্র থাকে, তা শিশুর জ্ঞান এবং বিশ্বাস অনুযায়ী সত্য; তা কখনও সচেতনভাবে উদ্ভট করে রচিত হয় না।…
…ছড়া কবিতার মতো দীর্ঘ না হওয়াই নিয়ম;…
…ছড়ার ছন্দ প্রাকৃত বাংলা শব্দ দ্বারা গঠিত; প্রাকৃত বাংলারও যে একটা সাধুরূপ আছে, ছড়ায় তা ব্যবহার করা হয় না, বরং তার পরিবর্তে নিতান্ত গ্রাম্য এবং আঞ্চলিক শব্দ দ্বারাই তা গঠিত হয়।…
…বাংলা ছড়ার কতকগুলো সাধারণ শব্দ সম্পদ আছে,…’
–[আশুতোষ ভট্টাচার্য। ‘রবীন্দ্রনাথ ও লোক-সাহিত্য’। এ.মুখার্জী অ্যান্ড কোম্পানী প্রাঃ লিঃ,কলকাতা। অগ্রহায়ণ ১৩৮০।]

উপরোক্ত মতামতগুলোকে জারিত করে বাংলা ছড়ার মোটামুটি কিছু বৈশিষ্ট্য আমরা এবার হয়তো চিহ্ণিত করে নিতে পারি। এ ক্ষেত্রে এই মতামতগুলোর অনুসরণে গবেষক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ ছড়ার যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে সংক্ষেপে উপস্থাপন করেন, তা হলো:
১. ছড়ায় যুক্তিসঙ্গত বা বিশিষ্ট ভাব কিংবা ভাবের পারম্পর্য নেই।
২. ছড়ায় ঘটনার ধারাবাহিকতা বা আনুপূর্বিক কাহিনী থাকে না।
৩. ছড়া ধ্বনি প্রধান, সুরাশ্রয়ী।
৪. ছড়ায় রস ও চিত্র আছে, তত্ত্ব ও উপদেশ নেই।
৫. ছড়ার ছন্দ শ্বাসাঘাত প্রধান প্রাকৃত বাংলা ছন্দ।
৬. ছড়া বাহুল্যবর্জিত, দৃঢ়বদ্ধ ও সংক্ষিপ্ত।
৭. ছড়ার ভাষা লঘু ও চপল।
৮. ছড়ার রস তীব্র ও গাঢ় নয়, স্নিগ্ধ ও সরস।

আলোচিত মতামতগুলোর ভিত্তিতে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়। যেমন:
ক) ছড়া ও সঙ্গীতের পার্থক্য:
১. ছড়া আবৃত্তি বা ধ্বনিনির্ভর। অন্যদিকে সঙ্গীত তাল ও সুর নির্ভর।
২. ছড়ার সুর একটানা বৈচিত্র্যহীন। অন্যদিকে সঙ্গীতের সুর বিচিত্র বা বৈচিত্র্যময়।
খ) ছড়া ও শিশু-কবিতার পার্থক্য:
১. ছড়ার বিষয়বস্তু উদ্ভট, অসঙ্গত। শিশু-কবিতার বিষয়বস্তু সাধারণত সুসঙ্গত হয়ে থাকে।
২. ছড়ার আকার হ্রস্ব। শিশু-কবিতার আকার দীর্ঘও হয়ে থাকে।
৩. ছড়ার ছন্দ শ্বাসাঘাত প্রধান প্রাকৃত বাংলা ছন্দ অর্থাৎ স্বরবৃত্ত। কিন্তু শিশু-কবিতার যে কোন ছন্দ হতে পারে।
৪. ছড়ার পরিণতি আকস্মিক। অন্যদিকে শিশু-কবিতার পরিণতি সুষ্ঠু ও পরিকল্পিত।

হাজার বছরের পথপরিক্রমায় ছড়ার যে ঐতিহ্যিক উত্তরাধিকার বহন করছি আমরা, তাকে অক্ষত ও সুশৃঙ্খল রাখার প্রত্যয়ে আমরা আসলেই কি সৎ ও আন্তরিক কিনা তা এখনো স্পষ্ট হয়ে উঠেনি। তাহলে হয়তো আমাদের জন্য মানুষের ছদ্ম-পরিচয়ধারী গরিলার মতোই ছড়ার নামে অছড়ার উৎপাত নিয়ন্ত্রণে অবশ্যই বাংলা ছড়ার নির্ধারণসূত্রটাকে সুষ্ঠুভাবে ধারণ করা সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যগুলোকে যদি আমরা ক্লাসিক ছড়ার শর্ত হিসেবে জুরি বানিয়ে নিই তাতে বাংলা ছড়ার কোন ক্ষতি বৃদ্ধি ঘটবে কিনা বা প্রয়োজনীয় আইডেণ্টিটি তৈরি হবে কিনা, তা হয়তো ভাবনার সময় হয়েছে এখন। কিন্তু আধুনিক ছড়া লিখিয়েরা যে কষ্টিপাথরে যাচাই করেই নিজেদেরকে শোধরে নেয়ার সুযোগটুকু পেতে পারেন, সেই পাথরটাকেই আরেকটু নিখাদ করে নেয়া যায় কিনা তা-ও আগে যাচাই করে নিতে হবে। কেননা লোকছড়া ভিত্তিক যে পর্যালোচনাগুলো বিশ্লেষণ করে ছড়ার বৈশিষ্ট্য নির্ধারণী শর্তগুলো সমন্বিত করার প্রয়াস দেখতে পাই আমরা, তাতে আধুনিক ছড়ার বৈশিষ্ট্যকে কতোটা ধারণ করা গেছে তা প্রশ্নের উর্ধ্বে এখনো অবস্থান নিতে পারে নি বলেই ধারণা। যা ছড়া হয়নি, তা হয়তো কবিতা বা পদ্য হবে। ওগুলোও সাহিত্যের এক একটা মাধ্যম। কিন্তু ছড়াকে ছড়া হয়ে উঠতে বা ছড়াকে ছড়ার মতো থাকতে দিতে আমাদের আপত্তি থাকার কথা নয়। অথচ একালে এসে খুবই দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা নিয়ে কাউকে খুব একটা আলোকপাত করতে এখনো দেখছি না আমরা। এটা কি আমাদের অক্ষমতা না কি আমাদের সৃজনক্ষমতাহীন সুবিধাবাদ জিন্দাবাদ, তাও ব্যবচ্ছেদ করে নেয়াটা জরুরি বৈ কি। নইলে শুধু শুধু ছড়ার চরিত্র হননই ঘটতে থাকবে, সাহিত্যের আদৌ কোন উপকার হবে কিনা সন্দেহ। দিগম্বর কী, তাই না জানলাম যদি, আমাদের বোধশূন্যহীন দিগম্বর অবস্থার ছড়াছড়ির অবসান ঘটবে কি কখনো ?

কৃতজ্ঞতা:
০১) ছড়ায় বাঙালী সমাজ ও সংস্কৃতি/ সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ/ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পৌষ ১৩৯৫, ঢাকা।
০২) বাংলা লোকসাহিত্যের ধারা/ ওয়াকিল আহমদ/ বইপত্র, এপ্রিল ২০০৭, ঢাকা।
০৩) কাব্যতত্ত্ব – অন্বেষা/ নরেন বিশ্বাস/ অনন্যা, আগস্ট ২০০২, ঢাকা।
০৪) নির্বাচিত প্রবন্ধ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর/ সম্পাঃ রবিশংকর মৈত্রী/ শুভ প্রকাশন, বইমেলা ২০০৫, ঢাকা।
০৫) খুকুমণির ছড়া/ যোগীন্দ্রনাথ সরকার/ ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, বইমেলা ২০০৬, কলকাতা।
০৬) অন্নদাশঙ্কর রায়ের শ্রেষ্ঠ ছড়া/ সম্পাঃ দাউদ হায়দার/ চারদিক, মার্চ ২০০৪, ঢাকা।
০৭) শিশু কিশোর কবিতার হাজার বছর/ সম্পাঃ কামরুন নাহার শিমুল ও কাজী ইমদাদ/ অনিকেত, ফেব্র“য়ারি ২০০৭, ঢাকা।