আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। কৃষক শ্রমিক পেশাজীবী ও ভাগ্যবিড়ম্বিত বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা, দুঃখ-বেদনা, প্রেম-ভালোবাসা, জৈবিক তাড়না, মানসিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও আত্মত্যাগ বিধৃত হয়েছে তার অসংখ্য গল্প উপন্যাসে। আমাদের এই ভারতীয় পমহাদেশের কালজয়ী কয়েকজন কথাসাহিত্যিকের মধ্যে তিনি অন্যতম।
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার শ্রম-সাধনা ও প্রতিভার সমন্বয়ে বাংলা ভাষায় প্রগতিশীল সাহিত্যের এক নতুন যুগের সূচনা করে গেছেন। উম্মোচন করেছেন সাহিত্যের এক স্বতন্ত্র-স্বাধীনচেতা দ্বার। অসাধারণ প্রতিভার অধিকারি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিটি সৃষ্টিই ছিল শ্রম ও সাধনা সাধ্য। তিনি তাঁর চেষ্টার দ্বারা, একাগ্রাচিত্তে সাধনার দ্বারা তাঁর প্রতিটি সৃষ্টিকে কালোত্তীর্ণ সাহিত্যের পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছেন।
সস্তা প্রচারধর্মী রচনায় তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না।

ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও মার্কসীয় অর্থনীতির দর্শন পাঠ করে এক শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা ও সমাজ বদলের রাজনৈতিকবোধ প্রবলভাবে তাঁকে আলোড়িত করে। কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেয়ার অপরাধে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য বহু প্রকাশকের দরজা চিরদিনের জন্য রূদ্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এতে করে তার কর্মনিষ্ঠা বা কর্মস্পৃহায় কোন রকম ভাটা পড়েনি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ই একমাত্র লেখক যিনি বিশেষ স্থান ও কালে স্থাপিত মানুষের অস্তিত্ব ও অস্তিত্বের তাৎপর্য সন্ধানে তাদের জীবন সম্পর্কে গভীর ভাবনায় ভাবিত ছিলেন। যা আমরা তার প্রায় সকল রচনাতেই প্রত্যক্ষ করতে পারি। শ্রেণি সমাজের একবারে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনাচার, তাদের যাপিত জীবনের সুখ-দুঃখ, চাওয়া-পাওয়া, অভাব-অনটন ইত্যাদির সফল মূল্যায়ন তিনি করে গেছেন তার বহুল আলোচিত ‘পদ্মানদীর মাঝি’ উপন্যাসে। দেশ বিদেশের নানান ভাষায় এ উপন্যাসটি অনূদিত হয়েছে। পদ্মার তীরবর্তী প্রান্তিক জনপদের জেলেদের জীবনের গভীরতম সুখ-দুঃখ তিনি ফুঁটিয়ে তুলেছেন অত্যন্ত যত্নসহকারে। ‘ঈশ্বর থাকেন ভদ্র পল্লীতে, এইখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। মানিকের এই খোদোক্তির মধ্যেই দর্পণের ন্যায় ফুঁটে উঠে জেলে পাড়ার খেটে খাওয়া তামাটে বর্ণের মানুষের যাপিত জীবনের দুঃখ চিত্র। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নিজকে একজন কলমপেষা মজুর বলে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। তিনি ছিলেন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের জীবন সংগ্রামের, তাদের সুখ-দুঃখ ও মনোজগতের সুগভীর সাহিত্যিক ভাষ্যকার। সাহিত্যিকের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা অত্যন্ত জরুরী বলে তিনি মনে করতেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় মার্কসীয় দর্শনে দিক্ষিত হাবার পর তাঁর রচনায় সামাজিক অবিচার, অর্থনৈতিক শোষণ ও অসাম্যের ভারে পীড়িত দরিদ্র ও নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের কথা, তাদের সংগ্রাম, তাদের প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কথা বলিষ্ট ভঙ্গিতে উচ্চারণ করেছেন এবং তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিল্পোত্তীর্ণ হয়েছে। সব সময়েই তার গল্প-উপনাসে মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের ভীড়। নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের জীবন যাপনের বাস্তব ও দরদী রূপায়ণ করতে গিয়ে মানিক প্রতিবাদী সাহিত্যের ভেতর দিয়ে সৃষ্টি করেছেন নতুন আদর্শ, নতুন সমাজ ও শ্রেণি চেতনা। ‘পদ্মানদীর মাঝি’, ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ ও ‘দিবারাত্রির কাব্য’ উপন্যাস তিনটি নিঃসন্দেহে চিরায়ত সাহিত্যের পর্যায়ভূক্ত হয়েছে। ভাষার গতিশীলতা, কাহিনীর গভীরতা ও বর্ণনার নিজস্বগুণে তাঁর উপন্যাসগুলি পাঠককে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখে। কাহিনীর পরিণতির জন্য তারা অপেক্ষা করে রুদ্ধশ্বাসে।

ঘটনা বহুল জীবনের অধিকারি কিংবদন্তি কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর পৈতৃক নিবাস মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরের অর্ন্তগত মালদিয়া গ্রামে হলেও ১৯০৮ সালের ১৯ মে মঙ্গল বারে তিনি সাঁওতাল পরগনার অর্ন্তগত দুমকা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম নীরদা দেবী। তিনি ছিলেন পিতা মাতার পঞ্চম সন্তান। তাঁর পিতা তাঁর নাম প্রবোধকুমার রাখলেও তাকে মানিক বলেই ডাকতেন। তাঁর পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিজ্ঞানে গ্রাজুয়েট। চাকরি করতেন সেটেলমেন্ট অফিসে কানুনগো এবং শেষে সাব-ডেপুটি কালেকটর পদে। পিতার চাকরির সুত্রে লেখকের বাল্য-কৈশোর ও স্কুলের শিক্ষাজীবন বিক্ষিপ্তভাবে অতিবাহিত হয় উড়িষ্যা, বিহার ও অখন্ড বাংলার বিস্তৃত অঞ্চলে-প্রধানত দুমকা, আড়া, সাসারাম, মেদিনীপুর জেলার বিভিন্ন অংশে, বারাসত, কলকাতা, টাঙ্গাইল প্রভৃতি স্থানে।

১৯২৪ সালে ২ মে টাঙ্গাইলে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা নীরদা দেবী মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ১৯২৬ সালে প্রবেশিকা পরিক্ষায় গণিতে বিশেষ কৃতিত্বসহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। তবে তিনি কোন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরিক্ষায় অংশ গ্রহণ করেছিলেন তা নিয়ে মত-বিরোধ আছে। ঐতিহ্য প্রকাশিত মানিক রচনাবলির মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জিতে পাওয়া যায় তিনি মেদিনীপুর জেলা স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরিক্ষা পাশ করেন। তবে তিনি টাইঙ্গালের বিন্দুবাসিনী বালক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। ১৯২৮ সালে তিনি বাঁকুড়ার ওয়েস্লিয়া মিশন কলেজ থেকে প্রথম বিভাগে আই এসসি পাশ করেন। এরপর তিনি অঙ্কশাস্ত্রে অনার্স নিয়ে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে বি এসসি ক্লাসে ভর্তি হন। এই বছরেই কলেজে সহপাঠীদের সঙ্গে তর্কে বাজি ধরে প্রথম গল্প ‘অতসীমামী’ রচনা এবং ১৩৩৫-এর পৌষ-সংখ্যা ‘বিচিত্রা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। এবং প্রথম গল্পের লেখক হিসেবে তিনি ডাকনাম ‘মানিক’ ব্যবহার করেন। তবে কৈশোর কালে তিনি যে কবিতা চর্চা করতেন তার নিদর্শনস্বরুপ প্রায় একশোটি কবিতা লেখা একটি খাতা লেখকের ব্যক্তিগত কাগজপত্রের ভেতর পাওয়া গেছে। ১৯২৯ সালে ‘বিচিত্র’তেই প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় ও তৃতীয় গল্প ‘নেকী’ (আষাঢ় ১৩৩৬) ও ‘ব্যথার পূজা’ (ভাদ্র ১৩৩৬)। প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্যর আদি রচনা এ বছরেই শুরু হয়। ক্রমে সাহিত্যচর্চায় আগ্রহ পারিবারিক মতবিরোধের কারণ হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত কলেজের শিক্ষা অসমাপ্ত রেখে সাহিত্যকর্মেই সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। এরপর বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় তাঁর গল্প-উপন্যাস ধারাবাহিক হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকলেও গ্রন্থাকার হিসেবে লেখকের প্রথম আবির্ভাব হয় ১৯৩৫ সালে। এ বছরের মার্চ, আগস্ট ও ডিসেম্বর মাসে যথাক্রমে প্রকাশিত হয় উপন্যাস জননী, গল্পগ্রন্থ অতসীমামী ও বড় গল্পের আকারে উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য। এ বছরেরই কোন এক সময় লেখক মৃগীরোগ এর আক্রমণে প্রথম আক্রান্ত হন। চিকিৎসার অতীত এই ব্যাধি ছিল তাঁর আমৃত্যু সঙ্গী। পরের ১৯৩৬ সালে একই বছরে প্রকাশিত হয় তাঁর তিনটি উপন্যাস-পদ্মানদীর মাঝি, পুতুলনাচের ইতিকথা ও জীবনের জটিলতা। পরের বছর প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ প্রাগৈতিহাসিক। এবং এ বছর তিনি মেট্রোপলিটান প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউস লিমিটেড-এর পরিচালনাধীন মাসিক ও সাপ্তাহিক ‘বঙ্গশ্রী’-পত্রিকার সহকারি সম্পাদক পদে যোগদান করেন। ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার তৎকালিন সম্পাদক ছিলেন কিরণকুমার রায়। এ বছরের শেষ দিক থেকে লেখক কলকাতার টালিগঞ্জ, দিগম্বরীতলার পৈতৃক বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি পিতা ও অপর তিন ভ্রাতার একান্নবর্তী সংসারে প্রায় এগারো বছর বসবাস করেন। ১৯৩৮ সালে তিনি কমলা দেবীর সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৩৯ সালের ১ জানুয়ারি তিনি ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার সহকারি সম্পাদকের পদ থেকে চাকরিতে ইস্তফা দেন। ‘বঙ্গশ্রী’ পত্রিকার চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে লেখকের দ্বিতীয় ও শেষ চাকরি জীবন শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী কোনো-এক সময়ে। তৎকালিন ভারত সরকারের ন্যাশনাল ওয়ার ফ্রন্টের প্রভিন্সিয়ালি অরগানাইজার, বেঙ্গল দপ্তরে পাবলিসিটি অ্যাসিস্টান্ট পদে যোগদান এবং অন্তত এ বছরের শেষভাগ পর্যন্ত উক্ত পদে নিয়োজিত। এ সময় থেকেই অল ইন্ডিয়া রেডিও-র কলকাতা কেন্দ্র থেকে যুদ্ধ-বিষয়ক প্রচার ও নানাবিধ বেতার অনুষ্ঠানে তিনি অংশ গ্রহণ করেন। ক্রমে ক্রমে তিনি দেশের প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে থাকেন। এবং ১৯৪৪ সালে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান করেন। কমিউনিস্ট পার্টি ও পার্টির সাহিত্য ফ্রন্টের সাথে তিনি আমৃত্যু যুক্ত ছিলেন। এরপর ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতি বছরই এক বা একাধিক গ্রন্থ তাঁর প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর ৩ ডিসেম্বর সোমবার অতি প্রত্যুষে নীলরতন সরকার হাসপাতালে কালজয়ী কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। নিমতলা শ্মশানঘাটে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হয়।

মানিক বন্দ্যোপাধায় যখন টাঙ্গাইল ছিলেন তখন তিনি বাবার সাথে টাঙ্গাইল শহরের রেজিষ্ট্রি পাড়ার একটি বিশাল বাড়িতে থাকতেন। বাড়িটা অনেকটা জমিদারদের বাড়ির মতো ছিল। বর্তমানেও বাড়িটি রয়েছে। কিন্তু এ বাড়িটি এখন আর সরকারি সম্পত্তি হিসেবে নেই। বাড়িটি এখন চলে গেছে ব্যক্তি মালিকানায়। এ বাড়িতে বসেই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ধলেশ্বরী নদীর মাঝিদের জীবন নিয়ে ‘পদ্মানদীর মাঝি’ রচনা করেছেন বলেন জানা যায়। তার একটি বড় প্রমাণ মেলে ‘পদ্মনদীর মাঝি’র এক জায়গায়। শহরের আকুরটাকুর নাম উল্লেখের মাধ্যমে। বাংলা সাহিত্যের অনন্য দিকপাল মানিক যে কিছু সময় টাঙ্গাইলের আলো বাতাসে বেড়ে উঠেছিলেন, টাঙ্গাইল শহরে বসবাস করেছেন, বিন্দুবাসিনী উচ্চ বালক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন তা আজ বিস্মৃত প্রায়। মানিক বন্দ্যোপাধায়ের টাঙ্গাইলের রেজেস্ট্রিপাড়ার সেই বাড়িটি এখনও প্রায় সে রকমই রয়ে গেছে কিন্তু শুধু মানিকের স্মৃতি সেখানে অনুপস্থিত।

বাংলা সাহিত্যকে মানিক হয়তো বিশ্ব সাহিত্যের দরবারে আরও উন্নীত করতে পারতেন যদি না দারিদ্র্য এবং চিকিৎসাতীত ব্যাধির যুগপৎ আক্রমণে অস্তিত্বসুদ্ধ বিপন্ন হয়ে মাত্র ৪৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া পরিত্যাগ করে স্বর্গবাসি হতেন। চরম অর্থকষ্ট, মানসিক যন্ত্রণা, দুরারোগ্য ব্যাধি ইত্যাদি বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্য দিয়েও মানিক এই স্বল্পতম সময়ের সাহিত্য সাধনায় বাংলা সাহিত্যে যে অবদান রেখে গেছেন তার তুলনা মেলা ভার। প্রায় ২ শ’ গল্প ও ৩২টি উপনাস রচনার মধ্য দিয়ে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হয়ে আছেন বাংলা সাহিত্যাকাশে কিংবদন্তি উজ্জ্বল নক্ষত্র। যার আলো যুগ-যুগান্তর ধরে হতে থাকবে প্রস্ফুটিত।