কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র (১৯০৪-৮৮) ছিলেন এক অস্থির রোমান্টিক স্বপ্ন-মনের অধিকারী। তাঁর যৌবনদৃপ্ত ভাবোচ্ছ্বাস মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্ন-আকাঙ্ক্ষারই পরিচয় বহন করে। বিহারীলাল চক্রবর্তী, দেবেন্দ্রনাথ সেন, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার, অক্ষয়কুমার বড়াল এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাঙালিকে যে প্রিয়ার স্বপ্ন এনে দিয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র সেই প্রিয়াকে অস্বীকার করেননি; শুধু কর্মের জগতের বিপুল হাতছানি কবির ভাবজগতে প্রবল সংঘাতের সৃষ্টি করেছিল। স্বপ্ন-বাস্তবের সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে কখনো বিশ্বকর্মার জগৎ, কখনো স্বপ্নবাসর দুই-ই কবিকে আকুল আহ্বান জানাল। ব্যক্তিজীবনের রোমান্টিকতা ভর করে থাকে প্রিয়ার ওপর। বৃহৎ মানবজীবনের কেন্দ্রে পৌঁছাতে হলে পিছুটান থাকলে চলে না। এই পিছুটানই তো প্রিয়া। তাকে ঘিরেই মিলনের আকাঙ্ক্ষা, মিলনের উন্মাদনা, সম্ভোগ বাসনা। রবীন্দ্রনাথের প্রিয়াভাবনা, জীবনানন্দ দাশের প্রেমচেতনা তাঁর মধ্যে বিরাজমান। জগতে বাস করে প্রিয়াকে ভুলে থাকা কষ্টকর, কিন্তু কর্মের জগতের আহ্বানও অস্বীকার করা যায় না; ফলে সর্বদা একটা দ্বন্দ্ব এসে উপস্থিত হয়। এই দ্বন্দ্বই প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতার মূল উপজীব্য।

কবি যখনই প্রিয়ার ডাক অনুভব করেছেন তখনই এক মায়াময় জগতের ঠিকানা কবির সামনে উপস্থিত হয়েছে। কিন্তু কখনোই কবি নিবিঢ়ভাবে আসক্ত হয়ে বাস্তবকে উপেক্ষা করতে পারেননি। তাই সে ডাক ফিরিয়ে দিয়েছেন, কখনো সময় না থাকার দোহাই দিয়েছেন। তবু প্রেম কবিকে ছেড়ে যায়নি। প্রকৃতি প্রতিবেশ নানাভাবে প্রেমের সেই জাদুস্পর্শ উপলব্ধি করেছে। জগৎব্যাপি কর্মময়তায় গৃহবেষ্টনীর প্রিয়ার বাঁধন অমোঘ হয়ে উঠেছে :
‘উত্তর মেরু মোরে ডাকে ভাই, দক্ষিণ মেরু টানে,
ঝটিকার মেঘ মোরে কটাক্ষ হানে;
গৃহ বেষ্টনে বসি,
কখন প্রিয়ার কন্ঠ বেড়িয়া হেরি পূর্ণিমা-শশী !’
(সুদূরের আহ্বান: প্রথমা)

কিন্তু তবুও বাঁধা পড়ার অবসর নেই। সুশীতল নদীর তীরের কুটির, পারাবতের কূজন, তরুর ছায়া, আশা-ভালোবাসা-মমতার কোনো অভাব নেই; শুধু ‘মনের গ্রন্থি জটিল বড়’ খুলতে তর সহে না। ‘সোহাগের ভাষা’ শিখবার সময়ও কবির নেই। প্রকৃতির অনুপম লীলায় প্রেমের উপলব্ধিটি বড় মরমিয়া সুর তোলে।

আর একটি কবিতায় প্রিয়ার বিরহিণী রূপটি কবিকে ব্যথিত করে তোলে। এক ‘রোমান্টিক পেইন’ কবি অনুভব করেন। এই স্বপ্ন-বাসরের দৃশ্য ভোলার নয়। কবি লিখেছেন :
‘জাফরি কাটান জানালায় বুঝি
পড়ে জ্যোৎস্নার ছায়া,
প্রিয়ার কোলেতে কাঁদে সারঙ্গ
ঘনায় নিশীথ মায়া।
দীপহীন ঘরে আধো-নিমীলিত
সে দুটি আঁখির কোলে,
বুঝি দুটি ফোঁটা অশ্রুজলের
মধুর মিনতি দোলে,
সে মিনতি রাখি সময় যে হায় নাই;’
(কবি : প্রথমা)

বিশ্বকর্মা হাজার কর্মে মত্ত সেথায় কবি যেতে চান। কামারের, কাঁসারির, ছুতোরের, মুটে-মজুরের সঙ্গে কবি হাত মেলাতে চান। সারা দুনিয়ার বোঝা বইবার, খোয়া ভাঙবার, খাল কেটে পথ তৈরি করবার এবং অরণ্য উচ্ছেদ করবার শপথ নিয়েছেন কবি। তাই স্বপ্ন-বাসরে বিরহিণী বাতি মিছে সারারাত পথ চায়। জ্যোৎস্না রাত,জাফরি কাটানো জানালার মধ্য দিয়ে ঘরের মধ্যে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে বিরহিণী প্রিয়ার কোলে সারঙ্গ— অথচ সুর নেই। প্রিয় বিরহে অশ্রু ভারাক্রান্ত মুখখানির প্রকাশে যে মৌনমিনতি স্পষ্ট, তা কবির কাছে উপেক্ষিত হচ্ছে— এখানেই আত্মবিরোধের চরম পর্যায়। ‘স্বপ্ন-বাসর’ বলতে abstract কল্পনা না ‘বিবাহ-বাসর’? যদিও রাতের উপস্থাপনায় স্বপ্নের মাধ্যম তৈরি করা হয়েছে, তবুও ‘বিরহিণী’ শব্দের ব্যঞ্জনার্থ abstract কল্পনাকেই ইঙ্গিত করে। ‘হায়’ শব্দের মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে কবির পিছুটানও মারাত্মক। কারণ একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস যেন বের হয়ে আসে। তবে এই প্রিয়ার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বা জীবনানন্দের বনলতারও কোথায় যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতায় প্রেমের পাশাপাশি দ্বন্দ্ব-সংঘাতটিও বারবার ফিরে আসে। কোনো কিছুতেই কবির স্থিরতা নেই। ‘স্বপ্নদোল’ কবিতায় কবি উপলব্ধি করেছেন ‘জীবন-শিয়রে বসি স্বপ্ন দেয় দোল’— এই স্বপ্ন একান্ত জীবনসংলগ্ন। জীবন যতই শুষ্ক-পাণ্ডুর হোক প্রেম সেখানে অনিবার্য। এই কবিতাতেই বারবার প্রিয়ার আকর্ষণ জৈবিক তাড়নাকে দুর্মর করে তুলেছে :
‘অবিশ্বাসী প্রিয়ারেও অসঙ্কোচে দিব আলিঙ্গন,
যে অধর করিল বঞ্চনা
তাহারেও করি চুম্বন।’

প্রেম ক্ষণিকের হলেও সমস্ত জীবন রস নিংড়ে দিতে চান কবি তারই মৃতমুলে। কেননা ব্যথায়ও অশ্রুর মূল্যেও জীবনের এমন কিছু পরম সত্য লাভ হবে না। তাই বিষপাত্র পান করেই ‘শুধু তার সযতন অনুরাগ স্মরি’ কবির শেষ সিদ্ধান্ত। প্রেমের স্বপ্নিল মুহূর্তটি পেয়েও ইহবাদী চেতনায় ফিরে এসেছেন। রোমান্টিকতার সঙ্গে বাস্তববোধের এমন সহজ সুন্দর মেলবন্ধন প্রেমেন্দ্র মিত্র ছাড়া খুব কম কবির কাব্যেই দেখা যায়।

প্রেমের সঙ্গে মৃত্যু ভাবনাটিও খুব নিবিড়ভাবে সংযুক্ত হয়েছে। নারীর দেহ, যৌবন, রূপ-সৌন্দর্য কবিকে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি। ‘প্রেমের তপস্যা’য় কবি লিখেছেন :
‘মনে ভাবি ভালবাসব
শপথ করি এজীবন হবে প্রেমের তপস্যা।
প্রভাতের আলোকে চোখ থেকে বুকে নিমন্ত্রণ করি।
মানুষের কোলাহল চলাচল ভালো লাগে।’
(সংশয় : প্রথমা)

প্রেম প্রকৃতির বিচিত্র রূপে তখন সঞ্চারিত হয়। কিন্তু সবশেষে সবকিছুরই পরিসমাপ্তি ঘটে। অন্ধকারে বিলীন হয় জীবন। মৃত্যুর করালগ্রাসে এই নির্মম পরিণতি। প্রেমের মধ্যেও চিরন্তন বেদনাকে দেখা, আনন্দময়তার মধ্যে বিষাদের সুর ধ্বনিত করা এই বৈপরীত্যই কবিকে চির সংশয়বাদী করে তুলেছে। ‘জীবনকে ঘিরে আছে একটি বিপুল প্রচ্ছন্ন বিদ্রুপ’ এই দার্শনিক অভিজ্ঞতাটিও কবি লাভ করেছেন এ থেকেই। ‘সম্রাট’ কাব্যে প্রেমের শাশ্বত রূপটি অনেকটাই পরিণত, শান্ত ও ধীরস্থির হয়ে উঠেছে। স্মৃতির কম্পনে কবি নিমজ্জিত হলেও অনুভব করেছেন প্রেম শুধু দেহের আধারেই বন্দি থাকে না, প্রিয়তমা শরীরিণী না হলেও ক্ষতি নেই। কবি রোমান্টিক ব্যাকুলতাকে কিছুতেই ত্যাগ করতে পারেননি। ‘ঝড়ে’ এবং ‘অরণ্যে’র প্রতীকের এই ব্যাকুলতায়ও প্রিয়াকে চিহ্নিত করেছেন। একদিকে প্রেম যখন নারীর সাহচর্যে পূর্ণ, অপরদিকে তেমনি তার ঔদার্যে আকাশ কম্পমান। ‘ঝড়’ এবং ‘অরণ্যে’র মত প্রকৃতির দুই শক্তিতে রূপান্তরিত দুটি প্রতীকের মধ্যে ফুটে উঠেছে। ‘সৌরভ’ নামে আর একটি কবিতায় :
‘তোমার সৌরভ আমায় নিয়ে যাক সেই শূন্যতায়
যেখানে পথ আর কোনো দিকে নেই,
যেখানে পরম নিস্ফলতার
তীব্র মধুর হতাশা !’

প্রেম যে শুধু পূর্ণতার নয়, শূন্যতারও; আনন্দের নয়, বেদনারও; স্বপ্নের নয়, হতাশারও—এই যুগপৎ সংঘাতটি অনিবার্য পরিণতি পেয়েছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কবিতায়।