পৃথিবীর সমস্ত কবিকেই লিখতে হয় ব্যর্থ প্রেমের কবিতা। যদি কোনো কবি প্রেমে ব্যর্থ না হন, তাহলে তিনি কবি হিসেবেও পূর্ণতার স্পর্শ লাভ করতে পারেন না। অর্থাৎ কবি হতে গেলে প্রথম শর্ত তাঁকে প্রেমে ব্যর্থ হতে হবে। কথাগুলো বলেছিলেন বর্ষিয়ান সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়। কোন কবি প্রেমে ব্যর্থ হননি? আমরা একজন তরুণও খুঁজে পাইনি সেই কবির নাম। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাব্যগুলি যেন ব্যর্থ প্রেমেরই ফসল। কোনো না কোনোভাবে কবিরা ব্যর্থ হয়েছেন। কারও প্রেম ছিল নীরব, কারও প্রেম ছিল সরব। বৈষ্ণব সাহিত্য ব্যর্থ প্রেমেরই হাহকার। কবিরা ব্যক্তিজীবনকে লুকিয়ে ফেলেছিলেন রাধাভাবের আড়ালে। রবীন্দ্রনাথ তাই প্রশ্ন করেছিলেন:
“সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি,
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমচ্ছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান
বিরহ-তাপিত। হেরি কাহার নয়ান,
রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?
বিজন বসন্তরাতে মিলনশয়নে
কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহুডোরে,
আপনার হৃদয়ের অগাধ সাগরে
রেখেছিল মগ্ন করি! এত প্রেমকথা—
রাধিকার চিত্তদীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা
চুরি করি লইয়াছ কার মুখ, কার
আঁখি হতে!” (বৈষ্ণব-কবিতা: সোনার তরী)

বৈষ্ণব কবিরা ব্যক্তি হৃদয়ের ভাঙনকে, রক্তক্ষরণকে, যন্ত্রণা-বিচ্ছেদ-দহনকে রূপ দিয়েছিলেন বৈষ্ণব পদে। আত্মযন্ত্রণার তিল তিল উপলব্ধিকে শব্দের মারণবাণে গেঁথে ছিলেন। তাই মিলনেও ছিল বিচ্ছেদের সুর। পেয়েও হারানোর ভয়। আবার বিচ্ছেদেও ভাবসম্মেলনে পৌঁছানোর অবকাশ। কত বৈচিত্র্যময় এই যাপনের সংশ্লেষ তা প্রেমিক মাত্রই অনুভব করেন। আর এই উপলব্ধির ক্রিয়াগুলিই সৃষ্টির ক্ষেত্রকে উর্বর করে। সম্পৃক্ত হয় সৃষ্টি। জীবনানন্দ দাশ লিখেছেন:
“জীবন হয়েছে এক প্রার্থনার গানের মতন
তুমি আছ ব’লে প্রেম, —গানের ছন্দের মতো মন
আলো আর অন্ধকারে দুলে ওঠে তুমি আছ ব’লে!
হৃদয় গন্ধের মতো—হৃদয় ধূপের মতো জ্ব’লে
ধোঁয়ার চামর তুলে তোমারে যে করিছে ব্যজন !”
(প্রেম: ধূসর পাণ্ডুলিপি)

কবি জীবনের পবিত্রতা ঘোষণা করতে পারেন শুধু প্রেমের কারণেই। হাজার বছর ধরে পথ হাঁটতেও পারেন প্রেমের কারণেই। প্রেম শুধু হৃদয়েই বহন করেন কবি। যে বিচ্ছেদ প্রেমকে চিরস্থায়ী করে যায়, সেই প্রেম তো অনিঃশেষ। এই প্রেমের স্ফুরণ সারাজীবন ধরে চলতে থাকে। ধূপের মতন তার দহনের গন্ধ। পুষ্পের মতন তাকে প্রস্ফুটিত করে। গানের ছন্দের মতন তাকে দোলায়। আর তার পোড়া ধোঁয়ায় বাতাস করে। সেই প্রেমই যে ব্যক্তি জীবনকে বৃহত্তর মানবিক আলোয় উদ্ভাসিত করে, একনিষ্ঠ সম্যক মূল্যবোধের নিরিখে জাগ্রত করে, স্পন্দিত বিনয়ী ও মরমি করে তোলে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রেমিক কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একটি কবিতায় তা উল্লেখ করেছেন:
“প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত
ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক
অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে
হেঁটে যাই

সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না
আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই
রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট
অন্ধ মানুষের শাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে
খসে পড়ে
আমার দু‘হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ
ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে
মনে হয় খুব আপন

আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা
প্যান্ট শার্ট পরে
আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে
আমি নিজেই আদর করি
খুব গোপনে

আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ
আমার সর্বাঙ্গে কোথাও
একটুও ময়লা নেই
অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয় হয়ে থাকে আমার
মাথার পেছনে

আর কেউ দেখুক বা না দেখুক
আমি ঠিক টের পাই
অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য
আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও
আঘাত না লাগে
আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।”
(ব্যর্থ প্রেম: দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়)

একজন পরিপূর্ণ মানুষ, একজন পরিপূর্ণ প্রেমিক এবং একজন পরিপূর্ণ কবি হতে গেলে তো এরকমই হতে হয়। নিজেকে ভালোবাসা, মানুষকে ভালোবাসা, দেশ ও সমাজকে ভালোবাসার এরকমই বিরাট হৃদয় লাভ করা যায়। সুতরাং কেউ ফিরিয়ে দিলেও সেই ফেরানোটাই প্রেরণা হয়ে ব্যক্তিকে দার্শনিক করে তোলে। মানবিক গুণসম্পন্ন আত্মসচেতন উদ্যমী কর্মযজ্ঞের শরিক করে তোলে। সুতরাং সৃষ্টির উৎসমূলে এই ব্যর্থতারই মূল্য অপরিসীম। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন: ‘বিচ্ছেদের দুঃখে প্রেমের বেগ বাড়িয়া ওঠে।’ আমরা জানি, বিবাহের থেকে ‘ভালোবাসা’ কথাটি অনেক বেশি জ্যান্ত। কেননা, প্রেমিক স্বামী হলে প্রেমের মৃত্যু অনিবার্য। প্রেমে যে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই তা প্রতিটি প্রেমিকই জানে। আর তাই প্রেমকে বিসর্জন দিতে পারে না। সারাজীবন বহন করে নিয়ে যায়। কেউ নির্মাণ করে তাজমহল। কেউ রচনা করে কাব্য সাহিত্য। কেউ আঁকে ছবি। কেউ গৃহ সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করে। এই প্রেমই তাঁকে জীবনের পথে হাঁটায়।

প্রেমিক কবি জন কিটস চিরন্তন বিচ্ছেদ জেনেও জীবনের পরপারে প্রেমকেই সঙ্গে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। তাই প্রেমিকা ফেনী ব্রাউনকে লিখেছিলেন:
“My sweet love…Send me the words “Good night” to put under my pillow.”

প্রেমের যে অসীম শক্তি তা খুবই কম বয়সেই উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁর সমস্ত কাব্যই হয়ে উঠেছিল প্রেমের কাব্য। প্লেটোনিক-লাবের মধ্যে এসেছিল দুঃখ যন্ত্রণা। হাহাকারের ছায়া। বিচ্ছেদের মধ্যেই, বিরহের মধ্যেই জাগরুক হয়েছিল বিরাট আত্মা। যে আত্মাকে প্রতিটি হৃদয়ই ধারণ করে। বিচ্ছেদ যে অনিবার্য তা চণ্ডীদাসও বুঝেছিলেন, বলেই লিখেছিলেন:’দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।’ যাকে আমরা বিচ্ছেদ বলে ধরে নিই তার মধ্যেই থাকে ‘Beauty is truth, truth beauty’. রবীন্দ্রনাথ শেষ জীবনে পৌঁছে এই সত্যের দারুণ মূল্য লাভ করেছিলেন আঘাতে আঘাতে। কী ছিল তাঁর সেই আঘাত?

ব্যক্তিজীবনে রবীন্দ্রনাথের যাত্রা শুরু হয়েছিল প্রেমের মধ্য দিয়েই, অথচ কোনো প্রেমই মিলনে মধুরেণ সমাপয়েৎ হয়ে ওঠেনি। যেসব নারী রবীন্দ্রজীবনে বেশি প্রভাব ফেলেছিলেন তাঁরা হলেন: মারাঠি কন্যা আন্না তড়খড়, কাদম্বরী বৌঠান, আর্জেন্টিনার ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো এবং রবীন্দ্ররচনার গুনমুগ্ধ পাঠিকা হেমন্তবালা দেবী। মুম্বাইয়ে অবস্থানকালে মারাঠি কন্যা আন্না তড়খড়ের রূপে-গুণে কবি মুগ্ধ হন। তাঁকে সারাজীবন ভুলতে পারেননি। কম বয়সে বিদুষী বুদ্ধিমতী এই মহিলা কবির কাছে একটি ডাকনাম পেয়েছিলেন ‘নলিনী’। কাব্য ভাবনারই এক অনন্য ফসল এই নলিনী। কবির প্রথম জীবনে লেখা বহু কাব্য-গল্প-নাটকে এই নামটি পাওয়া যায়। কবির সঙ্গে নলিনীর দীর্ঘ পত্রবিনিময় হত। মাসাধিক প্রেমের তরঙ্গ জীবন-সমুদ্রের তীরভূমিকে যে নাড়িয়ে দিয়েছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ‘নলিনী’ নামের একটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন:
“লীলাময়ী নলিনী,
চপলিনী নলিনী,
শুধালে আদর করে
ভালো সে কি বাসে মোরে,
কচি দুটি হাত দিয়ে
ধরে গলা জড়াইয়ে,
হেসে হেসে একেবারে
ঢলে পড়ে পাগলিনী!
ভালোবাসে কি না, তবু
বলিতে চাহে না কভু
নিরদয়া নলিনী!
যবে হৃদি তার কাছে,
প্রেমের নিশ্বাস যাচে
চায় সে এমন করে
বিপাকে ফেলিতে মোরে,
হাসে কত, কথা তবু কয় না!
এমন নির্দোষ ধূর্ত
চতুর সরল,
ঘোমটা তুলিয়া চায়
চাহনি চপল
উজল অসিত-তারা-নয়না!
অমনি চকিত এক হাসির ছটায়
ললিত কপোলে তার গোলাপ ফুটায়,
তখনি পালায় আর রয় না!”

কবির বয়ঃসন্ধির সংবেদনশীল দিনগুলিতে রোমান্সের তীব্র দাহ সৃষ্টি করেছিলেন কাদম্বরী বৌঠান। তিনি ছিলেন জ্যোতি দাদার সহধর্মিণী। রবীন্দ্রনাথের কাব্য জীবনের মূল ভিত্তিকেই তিনি সংগঠিত করেছিলেন। দুজনে সমবয়সী হওয়ায় খুনসুটির সঙ্গে মনের মিলও ছিল অসম্ভব। তিনি সেই সময়ই যে সাহিত্য রচনা করতেন তার মূল লক্ষ্যই ছিল এই নারীটি। তাঁকে নিয়ে ‘ভারতী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন: “সেই জানালার ধারটি মনে পড়ে, সেই বাগানের গাছগুলি মনে পড়ে, সেই অশ্রু জলে সিক্ত আমার প্রাণের ভাবগুলিকে মনে পড়ে। আর একজন যে আমার পাশে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহাকে মনে পড়ে, সে যে আমার খাতায় আমার কবিতার পার্শ্বে হিজিবিজি কাটিয়া দিয়াছিল, সেইটে দেখিয়া আমার চোখে জল আসে। সেই ত যথার্থ কবিতা লিখিয়াছিল। তাহার সে অর্থপূর্ণ হিজিবিজি ছাপা হইল না, আর আমার রচিত গোটাকতক অর্থহীন হিজিবিজি ছাপা হইয়া গেল।” বৌঠানের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কতটা গভীর ছিল তাই লেখা থেকেই বোঝা যায়। মান-অভিমান থেকে লুকোচুরি খেলা সবই চলত। তাঁর বিচ্ছেদ রবীন্দ্রনাথকে কাতর করে দেয়। এই ছাপ আমরা দেখতে পাই ‘চারুলতা’ এবং ‘নষ্টনীড়ে’।

হেমন্তবালা পাঠিকা হলেও হৃদয়ের উষ্ণ আদান-প্রদান ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তা অনেক চিঠিপত্রেই স্পষ্ট। একটি চিঠির কিছুটা অংশ এরকম: “আপনি আমার দেবতা, আমার কল্পলোকের রাজা। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমার পূর্ণপূজা আপনার চরণে দিতে পারছি না। আপনি কি আমার মন দেখতে পারছেন না?” রবীন্দ্রনাথ ঠিকই তাঁর মন দেখতে পেয়েছিলেন। কিন্তু মিলনান্তক হয়ে ওঠেনি সেই সম্পর্ক বলেই তা স্মরণে জীবন্ত হয়ে গিয়েছিল।

জীবনে প্রেম আসে বলেই ব্যর্থতাও আসে, যে ব্যর্থতা বিচ্ছেদের হাহাকারে পরিণত হয়। আর্জেন্টিনার মেয়ে ৩৪ বছর বয়স্কা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়েও তা হয়েছিল ৬৩ বছরের রবীন্দ্রনাথের। সেই মিলন-বিরহ যাপনের নানা মুহূর্তগুলি ‘পূরবী’ কাব্যে গেঁথে ছিলেন। কাব্যটি উৎসর্গ করেছিলেন ‘বিজয়াকে’। এই বিজয়া আসলে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোরই নাম যা রবীন্দ্রনাথ রেখেছিলেন। প্রথম দেখার মুগ্ধতাকে ‘বিদেশী ফুল’ নামে কবিতায় প্রকাশ করেছিলেন। ‘ভালোবেসে সখী নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখো মনের মন্দিরে’; নিজে কখনোই হারাতে চাননি বলেই নামটি লেখার এমন আকুলতা। শেষ পূরবীর রাগিণীর সুরে বিষাদের সুরই বেশি উঠেছে। জীবনের শেষ পর্বে পৌঁছেও তা ভুলতে পারেননি। তাই ‘শেষ লেখায়’ কবির আবেদন:
“বিদেশের ভালোবাসা দিয়ে
যে প্রেয়সী পেতেছে আসন
চিরদিন রাখিবে বাঁধিয়া
কানে কানে তাহারি ভাষণ।
ভাষা যার জানা ছিল নাকো
আঁখি যার করেছিল কথা
জাগায়ে রাখিবে চিরদিন
সকরুণ তাহার বারতা।”

এই ‘সকরুণ বারতা’য় কোথাও যেন ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাস লেপ্টে আছে। যেতে নাহি দিব বললেও তবু যেতে দিতে হয়। হারিয়ে যাবার বেলায় একমাত্র সান্ত্বনা হিয়ার মাঝে বেঁধে রাখার। ভালোবাসা যে কেবলই যাতনাময়!

কবি নজরুলের জীবন ও সাহিত্য প্রেমের ব্যর্থতার দীর্ঘশ্বাসে পূর্ণ। যে ধূমকেতুর মতন আলোকবলয় নিয়ে সাহিত্যাকাশে তিনি উদিত হয়েছিলেন তাতে চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল সবার। কিন্তু তাঁর মধ্যেও ‘অশান্ত রোদন’ বিরাজ করছিল। গানে কবিতায় বারবার বেজে উঠেছিল সেই যন্ত্রণার স্বরলিপি। কুমিল্লার সৈয়দা খাতুন বা নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মিলনের স্বপ্নে প্রতিটি মুহূর্ত বিভোর হয়ে যায়। কিন্তু সেই মিলনে বাধা হয়ে দাঁড়ায় নজরুলকে ঘরজামাই রাখার পাকা বন্দোবস্ত করার কারণে। নজরুল বিয়ের আসর ত্যাগ করে পালাতে বাধ্য হন। কিন্তু সেই নার্গিসকে কখনোই ভুলতে পারেননি। গানে কবিতায় চিঠিতে বারবার সেই প্রসঙ্গ এসেছে। হৃদয়ে খচখচ করে বিদ্ধ হয়েছে বেদনার কাঁটা।’শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এল না।’ নজরুল আর কখনোই যাননি দৌলতপুরে। ১৭ বছর কবির জন্য প্রতীক্ষা করেছিলেন নার্গিস। এর মধ্যে কয়েকবার চিঠিপত্রে যোগাযোগ হয়েছিল। নার্গিসের এক অভিমানক্ষুব্ধ চিঠির উত্তরে নজরুল লিখেছিলেন: ‘’দেখা? না-ই হলো এ ধুলির ধরায়। প্রেমের ফুল এ ধুলিতলে হয়ে যায় ম্লান, দগ্ধ, হতশ্রী। তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাস, আমাকে চাও, ওখান থেকেই আমাকে পাবে। লায়লী মজনুকে পায়নি, শিরি ফরহাদকে পায়নি, তবু তাদের মতো করে কেউ কারো প্রিয়তমকে পায়নি।’’

নজরুলের সঙ্গে নার্গিস ছাড়াও আরও কয়েকজন নারীর প্রণয়ের সম্পর্ক ছিল। সেগুলোর কোনওটি হয়ত একপাক্ষিকও ছিল। যেমন ফজিলাতুন্নেসা। একবার নজরুল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজে’র দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করার নিমন্ত্রণ পান। সম্মেলনে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষিতা নারী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এই সম্মেলনে ফজিলাতুন্নেসা ‘নারী-জীবনে আধুনিক শিক্ষার আস্বাদ’ নামে একটি প্রবন্ধ পাঠ করেন। তাঁর বক্তব্য শুনে নজরুল মুগ্ধ হন এবং তাঁর প্রেমে পড়ে যান। এ প্রেমটি ছিল প্রমীলা দেবীকে বিবাহ করার পর তাঁর বিবাহত্তোর প্রথম প্রেমে পড়া। ফজিলাতুন্নেসা হয়তো একটু প্রশ্রয় দিয়ে থাকবেন কিন্তু নজরুল বিষয়টি থেকে বের হতে পারেননি। তিনি উপযাজক হিসেবে বারবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। যাই হোক, প্রেমটি একপাক্ষিক হবার কারণে এর শাখাপ্রশাখা বিস্তার লাভ করেনি। ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে কোনো এক রাতে গলার হারের স্মৃতি নিয়ে নজরুল লিখেছিলেন:
“নাই বা পেলাম আমার গলায় তোমার গলার হার,
তোমায় আমি করব সৃজন, এ মোর অহংকার।…
নাই বা দিলে ধরা আমার ধরার আঙ্গিনায়
তোমায় জিনে গেলাম সুরের স্বয়ম্বর সভায়।”

পরে তিনি তাঁর ‘সঞ্চিতা’ কাব্যগ্রন্থটি ফজিলাতুন্নেসাকে উৎসর্গ করার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন, যদিও ফজিলাতুন্নেসা সেই আগ্রহে জল ঢেলে নিজের আপত্তি দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দেন। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংল্যান্ড চলে যান ফজিলতুন্নেসা। সেখানে শামসসুজ্জোহা নামের এক উচ্চশিক্ষিত যুবকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। দেশে ফিরে এসে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। এই বিয়ের সংবাদ শুনে বিরহকাতর নজরুল লিখেছিলেন:
“বাদল বায়ে মোর নিভিয়া গেছে বাতি
তোমার ঘরে আজ উৎসবের বাতি
তোমার আছে হাসি আমার আঁখি জল
তোমার আছে চাঁদ, আমার মেঘদল।”

আরও চারজন নারীর সঙ্গে তাঁর প্রণয়ের কথা শোনা যায়, যার সবই হয়তো একপাক্ষিক ছিল। এসব প্রেমকে অবশ্য প্রেরণা হিসেবে চিহ্নিত করাই যুক্তিযুক্ত হবে। এঁরা হলেন উমা মৈত্র, রাণু সোম, শামসুন্নাহার এবং জাহানারা বেগম। গানে কবিতায় এঁদের জন্যও ব্যর্থ বেহাগ বেজে উঠেছে বারবার। কবি পাননি বলেই তাঁর বাঁশিও থামেনি:
“দূরের প্রিয়া! পাইনি তোমায় তাই এ কাঁদন-রোল!
কূল মেলে না,—তাই দরিয়ায় উঠতেছে ঢেউ-দোল!
তোমায় পেলে থাম্ত বাঁশী,
আস্ত মরণ সর্বনাশী।
পাইনি ক’ তাই ভ’রে আছে আমার বুকের কোল।
বেণুর হিয়া শূন্য ব’লে উঠবে বাঁশীর বোল।”
(গোপন-প্রিয়া)

এই না পাওয়াই স্রষ্টার উজ্জীবনকে আরও স্বয়ংক্রিয় করে তুলেছে।

মীনাক্ষী দেবীকে বিয়ে করার পরই শক্তি চট্টোপাধ্যায় যেন প্রেমকেই খুন করেছেন, কেননা তারপরেই তিনি লিখেছিলেন: ‘সোনার মাছি খুন করেছি ভর দুপুরবেলা’। প্রেম যে সোনার মাছি তা উপলব্ধি করতে তাঁর দেরি হয়নি। কিন্তু প্রেমে পড়া তো কখনোই থেমে থাকেনি। আর যে প্রেম নিষিদ্ধ, তাকে তো পাওয়ারও আশা নেই। তবু কিছু মুগ্ধতা, কিছু আকর্ষণ, কিছু স্মরণ আর চেয়ে থাকার মধ্য দিয়েই এই শূন্যতার নিবৃত্তি। তখনই লিখলেন ‘পরস্ত্রী’:
“যাবো না আর ঘরের মধ্যে অই কপালে কী পরেছো
যাবো না আর ঘরে
সব শেষের তারা মিলালো
আকাশ খুঁজে তাকে পাবে না
ধরে-বেঁধে নিতেও পারো তবু সে-মন ঘরে যাবে না
বালক আজও বকুল কুড়ায় তুমি কপালে কী পরেছো
কখন যেন পরে?
সবার বয়স হয়
আমার
বালক-বয়স বাড়ে না কেন
চতুর্দিক সহজ শান্ত
হৃদয় কেন স্রোতসফেন
মুখচ্ছবি সুশ্রী অমন, কপাল জুড়ে কী পরেছো
অচেনা,
কিছু চেনাও চিরতরে।”

অভিমান আর যন্ত্রণা একসঙ্গেই কবির রক্তক্ষরণকে আরও তীব্র করে দিল। কুমারী প্রেমিকা যখন কপালে সিঁদুর পরল তখনই সে হয়ে গেল পরের স্ত্রী। তারপর তার প্রতি আর কোনো অধিকার আছে? কিন্তু প্রেম তা মানতে চায় না। অভিমানে বিচ্যুত হতে চায় প্রেমিকার আকাশ থেকে। হাজার হাজার তারার মাঝে তাই তাকে আর দেখা যাবে না। আজ তাই চেনা প্রেমিকাও অচেনা হয়ে যায়। ‘চাবি’ কবিতায় প্রেমিকার হারিয়ে যাওয়া চাবি কবি যত্নে তুলে রাখেন। যে তোরঙ্গ নিয়ে চলে গেছে তাতো চাবি ছাড়া খুলবে না। কিন্তু এ চাবিই তো সেই প্রেম। তা কি আর ফেরত নেবে প্রেমিকা? কবি উপলব্ধি করেন:
“অবান্তর স্মৃতির ভিতর আছে
তোমার মুখ অশ্রু-ঝলোমলো
লিখিও, উহা ফিরত্ চাহো কি না”
এভাবেই প্রেমিক বহন করেন স্মৃতিকে, বেদনাকে, অশ্রুময় মুখচ্ছবিকে।

প্রেমিকা যখন অন্যের স্ত্রী, তার সঙ্গে জীবনযাপন, তার সঙ্গে আড্ডামারা গল্পগুজব, বাদাম ভাজা খাওয়া, কোলে মাথা রেখে ঘুমানো, ওড়না কিংবা বেণী ধরে টান মারা, ঘর পর্যন্ত রেখে যাওয়া যখন আর সম্ভব নয়, তখন মনে মনে স্বপ্নেই সব কাজ সারতে হয়। ব্যর্থ প্রেমিকের স্বপ্নই মাধ্যম। স্বপ্নেই যা খুশি করা যায়। আদর করা যায়, অথবা চুমু খাওয়া যায়, অথবা আরও কিছু। জয় গোস্বামী ‘স্বপ্নে’ নামে একটি কবিতায় লিখলেন:
“স্বপ্নে তোকে বাড়ির দিকে এগিয়ে দিতে যাই
স্বপ্নে এসে দাঁড়াই পাড়ার মোড়ে
কখন তুই ফিরবি ভেবে চারিদিকে তাকাই
টান লাগাই তোর বিনুনি ধরে।

স্বপ্নে আমি ভিক্টোরিয়ায় তোর পাশে দাঁড়াই
স্বপ্নে বসি ট্যাক্সিতে তোর পাশে
স্বপ্নে আমি তোর হাত থেকে বাদাম ভাজা খাই
কাঁধ থেকে তোর ওড়না লুটোয় ঘাসে।

তুলতে গেলি – কনুই ছুঁলো হাত
তুলতে গেলি – কাঁধে লাগলো কাঁধ
সরে বসব? আকাশভরা ছাতে
মেঘের পাশে সরে বসল চাঁদ।

ক’টা বাজলো? উঠে পড়লি তুই
সব ঘড়িকে বন্ধ করল কে?
রাগ করবি? হাতটা একটু ছুঁই?
বাড়ির দিকে এগিয়ে দিচ্ছি তোকে…

স্বপ্নে তোকে এগিয়ে দিই যদি
তোর বরের তাতে কি যায় আসে?
সত্যি বলছি, বিশ্বাস করবি না
স্বপ্নে আমার চোখেও জল আসে!”

প্রেমিকের চোখেও জল আসে বারবার স্বপ্নে! বাস্তবের উপলব্ধি স্বপ্নেও পৌঁছে যায় এবং সেখানে তা তখন স্বপ্ন-বাস্তব। স্বপ্নে এই পাওয়া mysticism এরই এক রূপ। ঘরেতে এল না সে যে, মনে তার নিত্য যাওয়া আসা।

ব্যর্থ প্রেম অনেক সময়ই মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তবু এই মৃত্যু যে শুধু আত্মহত্যা নয়, স্বেচ্ছামৃত্যু কিংবা স্বেচ্ছা নির্বাসন তা বলাই বাহুল্য। বেঁচে থেকেও মৃত-মনকে বয়ে নিয়ে বেড়ানো। এ কী কম যন্ত্রণার! কবিতাতে সেসব কথাও উঠে আসে। না, কবি কবিতার কাছে বসে ছলনা করতে জানেন না। এই সময়ের কবি শ্রীজাত ‘সাঁকো’ কবিতায় সে কথাই লিখলেন:
“চলে গেলে কেন?’–এ-প্রশ্ন করা সোজা।
‘থাকলেই হতো’– এ-কথা বলাও সহজ।
দূর থেকে তবু কিছুতে যায় না বোঝা,
কার বেঁচে থাকা কতখানি ভারবহ।

মুখে মৃদু হাসি লেগে থাকে যতদিন,
আমরা সকলে ধরে নিই, ভাল আছে।
ভিতরে ভিতরে আয়ু হয়ে আসে ক্ষীণ…
কে আর জীবনে বাঁচার জন্য বাঁচে!

ভিড়ের মধ্যে একা হয়ে যাওয়া লোক,
চড়া আলোতেও মনখারাপের ভয়।
চশমার নীচে ঢাকা পড়ে যায় চোখ…
অবসাদ কোনও কুশলকাব্য নয়।”

যে অবসাদ বারবার ফিরে এসেছে বাংলা কবিতায় তার মূলে যে প্রেম ছিল, প্রেম চলে যাওয়ার পর এখন শুধু শূন্যতা কিংবা একাকিত্বের ভয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কবিদের লেখায়। মৃতের মতো তাঁদের বেঁচে থাকা এবং প্রতিমুহূর্তে আয়ু ক্ষয় করা এ ছাড়া আর কী আছে? অভিমান ফুঁসে ফুঁসে উঠেছে। একাকী জীবনের পথ পরিক্রমায় ক্লান্ত বিধ্বস্ত পথিককেই বারবার ঘুরে ফিরে আসতে দেখেছি।বিখ্যাত কবিরাও এই পথের পথিক হয়ে উঠেছেন। এমনি তাঁদের কিছু কবিতার পংক্তি:
১,
যাতায়াত: হেলাল হাফিজ
“কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না, কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না; কেউ জানে না।
নষ্ট রাখীর কষ্ট নিয়ে অতোটা পথ একলা এলাম
পেছন থেকে কেউ বলেনি করুণ পথিক
দুপুর রোদে গাছের নিচে একটু বসে জিরিয়ে নিও,
কেই বলেনি ভালো থেকো সুখেই থেকো।
যুগল চোখে জলের ভাষায় আসার সময় কেউ বলেনি
মাথার কসম আবার এসো।
জন্মাবধি ভেতরে এক রঙিন পাখি কেঁদেই গেলো
শুনলো না কেউ ধ্রুপদী ডাক,
চৈত্রাগুনে জ্বলে গেলো আমার বুকের গেরস্থালি
বললো না কেউ তরুন তাপস এই নে চারু শীতল কলস।”

কবিতার পরতে পরতে সেই অভিমানের মেঘ ঘন হয়ে জমে গেছে। জন্মাবধি ভেতরের রঙিন পাখিটি কেবল কেদেঁই গেছে। চৈত্র মাসের আগুনে হৃদয়ের বসন্তকাল পুড়ে গেছে। কেউ শীতল কলসের প্রেম-জল দান করেনি।

২,
একা : বীথি চট্টোপাধ্যায়
“আমার চোখে বসন্ত দারুণ চৈত্রমাস
চতুর্দিকে শিমুল-পলাশ কৃষ্ণচূড়ার ত্রাস।

ঝড় উঠেছে নিখুঁত কালো বৃষ্টি ভেজা রাত
আঁচল দিয়ে দুঃখ ঢাকি কোথায় তোমার হাত ?
স্তব্ধ যদি ভালোবাসা প্রেমের-কম্পন
ফিরিয়ে দাও কিশোরীকাল প্রথম চুম্বন।”

প্রেম বিহনে দুর্যোগপূর্ণ বসন্তকাল চৈত্র মাসের ঝড়ঝাপটায় সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। পলাশ শিমুল কৃষ্ণচূড়া কেউ আর ডাকেনি। সবাই যেন ত্রাস সৃষ্টি করেছে, অবিশ্বাসের ত্রাস। প্রথম জীবনের স্পর্শ, কম্পন ও চুম্বন আজ আর কে ফিরিয়ে দেবে? অভিমানাহত প্রেমিকা আজ গভীর ব্যথাতুর।

৩,
কষ্ট : রোদয়ান মাসুদ
“আমাকে কষ্ট দিতে চাও?
দাও!
আমি কষ্ট নিতেই এসছি।
আমাকে কাঁদাতে চাও?
কাঁদাও!
আমি কাঁদতেই এসেছি।
আমাকে হারাতে চাও?
হারাও!
আমি হারতেই এসেছি।
আমাকে সাগরে ভাসাতে চাও?
ভাসাও!
আমি ভাসতেই এসেছি।
আমাকে পোড়াতে চাও?
পোড়াও!
আমি পুড়তেই এসছি।
আমাকে বুকে টেনে নাও
নিবে না?
আমি সবকিছু সয়েই এসছি।”

সব কষ্ট, সব যাতনা, সব দাহ সহ্য করেও প্রেম-সাগরে ভেসে থাকতে চান কবি। যাকে আত্মোৎসর্গ বলি, কবির কাছে তা আত্মবিসর্জনও। প্রেমে যে জয় নেই, আত্মবিসর্জনেই তার জয়।

৪,
ফিরে এসো চাকা-৭২: বিনয় মজুমদার
“যাক, তবে জ্ব’লে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয়।
সব শান্তি দূরে থাক, সব তৃপ্তি, সব ভুলে যাই।
শুধু তার যন্ত্রণায় ভ’রে থাক হৃদয় শরীর।
তার তরণির মতো দীর্ঘ চোখে ছিলো সাগরের
গভীর আহ্বান, ছায়া, মেঘ, ঝঞ্ঝা, আকাশ, বাতাস।
কাঁটার আঘাতদায়ী কুসুমের স্মৃতির মতন
দীর্ঘস্থায়ী তার চিন্তা; প্রথম মিলনকালে ছেঁড়া
ত্বকের জ্বালার মতো গোপন, মধুর এ-বেদনা।
যাক, সব জ্ব’লে যাক, জলস্তম্ভ, ছেঁড়া ঘা হৃদয়।”

‘তার’ ‘তাকে’ সর্বনামগুলিই যে প্রেমিকা গায়ত্রী দেবীর তা বলাই বাহুল্য। গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রেসিডেন্সি কলেজের ইংরেজি বিভাগের এক সুন্দরী ছাত্রী। প্রেমে কখনো তাঁর দিক থেকে কবি কোনো সাড়া পাননি। কিন্তু তবুও ভালোবেসে ছিলেন আর সেই একপক্ষীয় ভালোবাসা বিচ্ছেদের বহু যোজন দূরত্ব রচনা করেছিল। কিন্তু কবি সামলে উঠতে পারেননি। এই ব্যর্থতার একটি প্রেমেই কবিকে সারাজীবনই অন্ধ করে দেয়। কবি মনে মনে তাঁর সঙ্গে সংসার পেতেছেন। আকাশ বাতাস জগৎজুড়ে তাঁকেই উপলব্ধি করেছেন। অর্থ-সুখ, যশ-খ্যাতি সব ত্যাগ করে এক কৃচ্ছ্র সাধনায় জীবন অতিবাহিত করেছেন। কবিতায় ঢেলে দিয়েছেন সমূহ উপলব্ধিকে। প্রেমময় জীবনবোধের তীব্র আরোকে তৈরি করেছেন শব্দের দ্রবণ। নিজেকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে এই প্রেমের ব্যর্থতার আগুনের যে যজ্ঞভূমি নির্মাণ করেছেন তা চিরদিন জাজ্বল্যমান হয়ে থাকবে। নির্ঘুম প্রহর হয়ে থাকবে প্রতিটি প্রেমিক হৃদয়েরই। কবির শেষ আবেদন:
“তুমি যেন ফিরে এসে পুনরায় কুণ্ঠিত শিশুকে
করাঘাত ক’রে ক’রে ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে
আড়ালে যেও না; আমি এত দিনে চিনেছি কেবল
অপার ক্ষমতাময়ী হাত দুটি, ক্ষিপ্র হাত দুটি—
ক্ষণিক নিস্তারলাভে একা একা ব্যর্থ বারিপাত ।”
এর থেকে কেউ পায় কি নিস্তার কখনো? কবিও পাননি। প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমিকও পায় না ।

৫,
হে আমার বিষণ্ন সুন্দর : রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
“এতো ক্ষয়, এতো ভুল জমে ওঠে বুকের বুননে,
এই আঁখি জানে, পাখিরাও জানে কতোটা ক্ষরণ
কতোটা দ্বিধায় সন্ত্রাসে ফুল ফোটে না শাখায়।
তুমি জানো নাই— আমি তো জানি,
কতটা গ্লানিতে এতো কথা নিয়ে, এতো গান,
এতো হাসি নিয়ে বুকে নিশ্চুপ হয়ে থাকি।

বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে বলি এইতো জীবন,
এইতো মাধুরী, এইতো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত।

তুমি জানো নাই- আমি তো জানি।
মাটি খুঁড়ে কারা শস্য তুলেছে,
মাংসের ঘরে আগুন পুষেছে,
যারা কোনোদিন আকাশ চায়নি নীলিমা চেয়েছে শুধু,
করতলে তারা ধ’রে আছে আজ বিশ্বাসী হাতিয়ার।

পরাজয় এসে কন্ঠ ছুঁয়েছে লেলিহান শিখা,
চিতার চাবুক মর্মে হেনেছো মোহন ঘাতক।
তবুতো পাওয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মুখর হৃদয়,
পুষ্পের প্রতি প্রসারিত এই তীব্র শোভন বাহু।

বৈশাখী মেঘ ঢেকেছে আকাশ,
পালকের পাখি নীড়ে ফিরে যায়-
ভাষাহীন এই নির্বাক চোখ আর কতোদিন?
নীল অভিমানে পুড়ে একা আর কতটা জীবন?
কতোটা জীবন!!”

কবি রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ(১৯৫৬-১৯৯১) আশির দশকের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। কবি তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ এবং করুণ পরিণতির কথা আমরা জানি। যে ভগ্ন হৃদয়ের হাহাকার তিনি কবিতায় লিপিবদ্ধ করেছিলেন তা প্রেমের অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে। প্রেমের ক্ষরণ, দীর্ঘশ্বাস, তাপন, নির্বাসন সবই ফুটে উঠেছে কবিতায়। ক্ষয়, ভুল, ক্ষরণ, সন্ত্রাস, গ্লানি নিয়ে কবি স্তব্ধ, নির্বাক। বেদনার পায়ে চুমু খেয়ে ভেবেছেন জীবন এরকমই। সুনীল রাত এসে ঠোঁট ছুঁয়েছে।এও তো সেই বিষ যা মৃত্যুর দিকে নিয়ে গেছে কবিকে। চারিদিকে অবিশ্বাসের বাতাবরণে কুচক্রী কৌশলীর চক্র। কবি একাকী প্রেমবিহীন নীলঅভিমানে পুড়ে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন। ‘খুব কাছে এসো না’ কবিতায় কবির আর একটি বিখ্যাত পংক্তি স্মরণযোগ্য:
“রাত্রি বলবে নেই, নক্ষত্র বলবে নেই
শহর বলবে নেই, সাগর বলবে নেই
হৃদয় বলবে- আছে ”

এই না থাকার মধ্যেও থাকা মিস্টিসিজম এরই গভীর উপলব্ধি। প্রেমিক হৃদয় কখনোই শূন্যতাকে শূন্য হিসেবে গ্রহণ করে না। সুফি সাধক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন রুমি তাঁর একটি কবিতায় বলেছেন:

“There is a candle in your heart,
ready to be kindled.

There is a void in your soul,
ready to be filled.

You feel it, don’t you?
You feel the separation
from the Beloved.”

অর্থাৎ তোমার হৃদয়ে একটি মোমবাতি আছে, জ্বলতে প্রস্তুত। তোমার আত্মায় একটি শূন্যতা আছে, পূর্ণ হতে প্রস্তুত। তুমিও এটা অনুভব করছ, তাই না? তুমি প্রিয়তমের কাছ থেকেও বিচ্ছিন্নতা অনুভব করছ। এই বিচ্ছিন্নতাই আশাকে জাগিয়ে রাখছে। তাই শূন্যতার মধ্যেও পূর্ণের পরশ। প্রেমের বিচ্ছেদ যে প্রেরণাও দান করে তা আগেই দেখেছি। রুদ্র মুহাম্মদের কবিতায় ‘বিষণ্ণ সুন্দর’ একসঙ্গেই বিরাজ করছে। এই বিষণ্ণ সুন্দরকে ধারণ করেছিলেন বিখ্যাত কবি সিলভিয়া প্লাথও। তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেন:

“Perhaps someday I’ll crawl back home, beaten, defeated. But not as long as I can make stories out of my heartbreak, beauty out of sorrow.” অর্থাৎ সম্ভবত একদিন আমি বাড়িতে ফিরে হামাগুড়ি দেব, মারধর করব, পরাজিত হব। তবে যতক্ষণ না আমি আমার হৃদয় বিদারক ঘটনাটি প্রকাশ করতে পারি, দুঃখকে সুন্দর করে তোলে না। এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি যে ফার্নেসের আগুনে নিজের মুখমণ্ডলকে জ্বালিয়ে দেওয়ার মধ্যে দিয়ে মৃত্যুর স্বাদ অনুভব করা তা বুঝতে পারা যায়। রুদ্র মুহাম্মদও কি তিল তিল করে সেই স্বাদই পেতে চেয়েছিলেন?

এসময়ের আর এক কবি ব্যর্থ প্রেমের উপলব্ধিকে যেভাবে বহন করে চলেছেন তা সরাসরি কবিতায় উল্লেখ করলেন। ব্যর্থ প্রেম যে স্বাক্ষর রেখে যায়, একটি সংবেদনশীল হৃদয়ের কাছে তা কম নয়:
“কিছুই দাওনি তুমি
এমন একটা ডাহা মিথ্যা, কখনো বলবো না আমি।
তুমি
একাকীত্ব দিয়েছো, নির্জনতা দিয়েছো, অবসাদ দিয়েছো—
শয়ন স্বপন ভরে, স্মৃতির একরাশ পরিহাস দিয়েছো।”

কবির নাম অরুণ মাজী। কবিতার নাম ‘প্রেমে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই’। এটিই চরম সত্য, বাস্তবতার নিরিখে একে অস্বীকার করা যায় না। স্বপ্নময় যে রোমান্টিক মুহূর্তগুলি জীবনে দাগ কেটে যায়, তার বিচ্ছেদের পর শুধু স্মৃতিময় এক শূন্যতার বিরাট জগৎ বিরাজ করে। আর অবসাদ, নির্জনতা, একাকিত্বের ভার বহন করতে হয় সমস্ত জীবন। হয়তো কবিতা সৃষ্টির মুহূর্ত এগুলিই। এটা উপলব্ধি করেই পার্সি বিশি শেলি ‘টু এ স্কাইলার্ক’ কবিতায় লিখেছিলেন: ‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought.’ কবিতা যে মধুর যন্ত্রণার গান তা সকলেরই জানা।

সাম্প্রতিককালে ব্যর্থ প্রেমিকের সংখ্যা হুহু করে বেড়ে চলেছে। ইন্টারনেটের যুগে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এসএমএস, ভিডিও কল, ফোন প্রেমের কত মাধ্যম। প্রেম যেমন সহজেই পাত্র-পাত্রী খুঁজে নেয়, তেমনি সহজেই তা ভেঙেও যায়। এর মধ্যেও কিছু প্রেম তো অবশ্যই সৎ, অবশ্যই তা হৃদয়ের আবেগ থেকে সঞ্চারিত এবং স্বপ্নমুকুলে প্রস্ফুটিত। সেই প্রেমের বিচ্ছেদবেদনা মনে দাগ রেখে যায়। ব্যক্তিহৃদয়কে খান খান করে দেয়। কবি জসীমউদ্দীনের ‘নকশিকাঁথার মাঠে’র রুপাই-সাজুর মতো সেসব প্রেমিক-প্রেমিকা হয়তো নকশিকাঁথা বোনে না, বাঁশিতে সুরও তোলে না। নকশিকাঁথার নায়ক-নায়িকারা হয়তো লেখাপড়া জানত না বলেই তারা ওসব করেছিল। কিন্তু আজকের দিনের নায়ক-নায়িকারা লেখাপড়া জানে বলেই কবিতা লেখে। চিঠি লেখে। মেসেজ পাঠায়। ফোনকল করে। ছবি আঁকে। তাদের হৃদয়শূন্যতায় কষ্টের মাছেরা যন্ত্রণার বুদবুদ তোলে। সেইসব শব্দই কবিতা হয়ে বেজে ওঠে। আসুন দেখি কেমন লিখছে এই সময়ের কবিতায় তাঁদের ব্যর্থ প্রেমকে? বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের এক ঝাঁক তরুণ কবির সাম্প্রতিকের লেখা ব্যর্থ প্রেমের কিছু উদাহরণ:

১, শাহারিয়ার ইমন:
“আজ আমার সময় কাটে বিষণ্ণতায়,
প্রতিটি মুহূর্ত থাকে অমানিশার আঁধারে ডুবে।
না ভাল লাগে গান, না ভাল লাগে কবিতা
তোমার শূন্যতা কী দিয়ে পাবে পরিপূর্ণতা।
রাত কি থাকে ভাল চাঁদ বিহনে
পাখি কি গায় গান একাকি ভুবনে।
নদী কি সুখ পায় সাগরের মোহনায় না মিলে,
তেমনি তোমাকে ছাড়া রহিব আমি কেমনে ।”

২, শফিক তপন:
“আমি বুঝি নাতো কেন
মনটা আমার ছুটে চলে তোমারই পিছু পিছু,
যতই ভাবি ততই দেখি
তোমায় আমি ভালবেসে পেলামনাতো কিছু।”

৩, ফয়জুস সালেহীন:
“‘আকাশ’ তুমি জান না বিচ্ছেদের কী স্বাদ !
তোমার বুকেতো চিরদিনই থাকে চাঁদ ।
মাঝে মাঝে তোমরা খেল মান-অভিমানের খেলা আমাবস্যায় চাঁদ না উঠিলে কিঞ্চিৎ পাও বিরহের জ্বালা ।
অভিমানের পালা শেষে
পূর্ণিমায় চাঁদ আবার ফিরে আসে
আমার চাঁদ যে চলে গেছে
সাত আসমানের অন্য এক আসমানের কাছে ।
শেষ হবে না আর তার অভিমানের পালা ,
এ হৃদয়ে থাকবে শুধু বিচ্ছেদের জ্বলা ।”

৪, পিন্টু পোহান:
“আর তুই সেদিনের পর থেকে
কথা বলা বন্ধ করে দিলি
বন্ধ করে দিলি সুপ্রভাত জানানো
প্রতিদিন ইনবক্সে ঢুকে ব্যর্থ হতে হতে একদিন
হাল ছেড়ে দিলাম আমিও।

তারপর কেটে গেল কত না বছর
ব্যর্থ প্রেমের ক্ষত মুছে নিয়ে এগিয়েছে জীবন জোয়ারে।
আজ তুই…
তুই ফোন করে বললি তুই ভালো নেই।
আমার ব্যগ্রতা দেখে বললি, থাম! থাম!
সময় না হলে রোগ কিছুতে সারে না
তুই যে অপেক্ষাই করতে শিখলি না!
এতই অসহ্য তোর আমার এই গার্হস্থ্য জীবন!”

৪, শুভেন্দু বিশ্বাস:
“তুমি কি জানো আমি কবি হয়ে গেছি ?
তোমাকে নিয়ে হাজার কবিতা লিখেছি,
যখন আমি কল্পনার রাজ্যে প্রবেশ করি
শুধু তোমাকেই বারবার খুঁজে পাই।”

৬, পুলক মণ্ডল:
“কখনো সখনো মনখারাপ করা সময়
ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়ে নামতে থাকে হৃদয়জুড়ে—