ছুটতে ছুটতে আমি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে এসেছি। বাড়িতে বসে ট্যাক্সি কল করলে অন্তত দশ মিনিট অপেক্ষা করতে হতো। আমার হাতে এখন নষ্ট করার মতো দশ মিনিট সময় নেই। আমাদের বাড়ির পাশেই একটি বাসস্ট্যান্ড আছে, সেখানে সবসময় হলুদ আর কালো ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ভাগ্য ভালো, দৌড়ে এসেই একটি খালি ট্যাক্সি পেয়ে সেটিতে উঠে বসলাম। মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে একটু পর পর।

কিছুক্ষণ আগে আমার মোবাইলে ফোন করে বড়মামা খুব কাঁদছিলেন। আমি মামার কথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। মামার গভীর নিঃশাস আর উত্তেজিত কণ্ঠের কথার সারমর্ম যা বুঝলাম, তাতে করে বড়মামা আমাকে এক্ষুনি চেলটেনহামে তার বাড়ি যেতে বলছেন। বাড়িতে স্নেহা- মামার মেয়ে, চার বছর বয়স, একা আছে।

আমি বললাম: স্নেহা একা থাকবে কেন? তুমি কোথায়? মামী কই?

মামার গোঙানি আর ফোঁপানির অর্থোদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে আমি দিশেহারা বোধ করি। আম্মুকে আর নানুকে কথাটা জানাবো কিনা চিন্তা করলাম। তারপর মনে হলো আগে নিজে গিয়ে দেখি আসলে কী হয়েছে। তেমন বিশেষ কিছু না হলে শুধু শুধু সবাইকে টেনশনে ফেলে কাজ নেই। তাই আমি হন্তদন্ত হয়ে একটা জিন্স আর জ্যাকেটটি গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে গেলাম। আজ শনিবার। আমার ভার্সিটি বন্ধ থাকায় দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। আলসেমি করে খাটে গড়াগড়ি করছিলাম সকাল এগারোটা পর্যন্ত। এমন সময় বড়মামার এই অদ্ভুত কলটি এলো। আমার নিজের গাড়ি গ্যারেজে দিয়েছি গতকাল সন্ধ্যায়। কয়েকদিন থেকে গাড়ির ব্রেকে চাপ দিলে বিকট শব্দ করছিল। গ্যারেজের লোকেরা বললো গাড়ির ব্রেক প্যাড আর ডিস্ক দুটোই বদলাতে হবে। আগামীকাল বিকেলের আগে গাড়ি ফেরত পাওয়া যাবে না। আজ চেলটেনহামে দ্রুত পৌঁছতে হলে ট্যাক্সি নেয়া ছাড়া আর উপায় নেই আমার।

বড়মামা আমার মায়ের দিকের পরিবারে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষ। মামার কথার উপরে আমাদের নানার পরিবারে কেউ সাধারণত কথা বলে না। মামা বরাবর খুব ভালো ছিলেন লেখাপড়ায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স পাশ করার পর একরকম নিজে নিজেই চেষ্টা করে পিএইচডি করতে লন্ডনে আসেন। বড়মামার পিএইচডি শেষ হবার আগেই আমাদের সহ মামা নিজের অনেক আত্মীয় স্বজনকে বাংলাদেশ থেকে ইউকেতে নিয়ে আসেন। আমার আব্বু বাংলাদেশে থাকেন। আব্বুকে পৈতৃক ব্যবসা দেখাশোনা করতে হয় তাই মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসেন আমাদের কাছে। আমি আর আম্মু থাকি নানুর সাথে সুইন্ডন নামের একটি জায়গায়। আমি এখানে একটি কলেজ থেকে এ-লেভেল শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। সুইন্ডনে ও আশেপাশে এখন আমাদের নিজেদের অনেক মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।

আমার প্রতিভাবান বড়মামা যেদিন চেলটেনহামে, ইউনিভার্সিটি অফ গ্লস্টারশায়ারে অর্থনীতির লেকচারার হবার অফার লেটারটি পান, সেদিন আমরা সবাই খুব গর্বিত হয়েছিলাম। মামাকে ঘিরে আমাদের সবার সেদিন সেকি আনন্দ! সবাই মিলে আমরা রাতে খেতে গেলাম হার্ভেস্টারে। হার্ভেস্টার মামার খুব প্রিয় রেস্টুরেন্ট। মেইন খাবার আর একটি ড্রিঙ্কস কিনলে সেখানে সালাদ বার থেকে যত খুশি সালাদ, ব্রেড, বান, পাস্তা, সস খাওয়া যায়।

: মামা, ইউনিভার্সিটির লেকচারার হয়ে কেমন লাগছে তোমার?
: এখনো তো ক্লাস নেইনি। কিভাবে বুঝবো! যাক কয়েকটি মাস।
: এদেশে ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা শুনেছি খুব দুষ্ট হয়। ওরা যদি তোমার কথা শুনতে না চায়? তুমি তো এখনো ব্যাচেলর আছো।
মামা হেসে বলেছিলেন, কেন? ইউনিভার্সিটির লেকচারার হতে হলে বিবাহিত হতে হয় নাকি? নাকি বয়স পঞ্চাশের উপর হলে ভালো হয়?
: তা বলিনি। কিন্তু, স্টুডেন্টরা যদি তোমার কথা না শোনে?
: শুনবে, শুনবে। আবার হেসেছিলো মামা।
: আচ্ছা মামা, চাকরি তো হলো। আমি বলতে চাচ্ছি যে এবার আমাদের একটা মামী দরকার।

আমার কথা শেষ হবার আগেই আমার সাথে যোগ দেয় আমার আম্মু, খালামনি, আর আমাদের সবাই ।

সত্যি, আমার বড়মামার তখন বিয়েটাই শুধু বাকি ছিল। আর বিয়ের বয়স চলে যাচ্ছি যাচ্ছি করছে যখন তখনো মামার বিয়েতে কোন আগ্রহই ছিল না। প্রচুর মেয়ে বন্ধু ছিল যদিও মামার। কিন্তু ওরা বেশিরভাগ ফরেইনার, বিভিন্ন দেশের। কেউই ঠিক মেয়েবন্ধুর মতো না। ওরা কেবলই বন্ধু।

: মামা, তোমার ক্লাসের কোন ছাত্রীকে যদি তোমার ভালো লেগে যায়, তাহলে কি করবে?
: বেশি পাকামো করিস না রিয়া। আমার ক্লাসে যদি ভালো কোনো ছেলে পাই তাহলে তার সাথে তোর বিয়ে দিয়ে দিবো।
বলে বড়মামা সেদিন আমার ঝুটিতে টান মেরে দিয়েছিলেন।

চোখ খুলে দেখি ট্যাক্সি এখনো A4019এ ছুটছে। আমি সিটের গায়ে মাথা হেলিয়ে আবার চোখ বুঁজে ফেলি। ড্রাইভার যদি ৭০মাইল স্পিডে টেনে চালায় তবুও আরো ৩৫মিনিট অন্তত লাগবে ল্যান্সডাউওনে আমার বড়মামার বাড়িতে পৌঁছতে। আমার মাথার ভেতরে একটা পোকা যেন ফরফর করছে সেই তখন থেকে। বড়মামাকে ঘিরে নানা কথা মনে হচ্ছে এইমুহূর্তে। সকালে মোবাইলে মামার কণ্ঠে কি যেন একটা ছিল, আমার বুকের ভেতরটা দ্রিম দ্রিম করে কাঁপছে।

অনেক্ষন পর চার্লটন পার্কের পাশ দিয়ে যাবার সময় মনে পড়লো আমার খালা ন্যান্সির কথা। আমার আম্মুর ছোট বোন। বাংলাদেশে থাকতে ন্যান্সি খালা একদিন কোত্থেকে গাট্টাগোট্টা এক চাইনিজ লোককে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো। সকালে আম্মুকে ফোনে বলেছিলো বিকেলে আমরা যেন নানুর বাসায় আসি, সবাই। কারণ বিকেলে বাড়িতে জোত্যিষ আসবে। আমরা সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে গিয়ে লোকটির চেহেরা দেখেই হতাশ, এই চাইনিজ লোকটা জোত্যিষ?

: হুম, হেলাফেলা ভাবিস না। এই লোক একবার তোর চোখের দিকে তাকালেই ভেতরের সব খবর বলে দেবে গড়গড় করে।

: গুল মেরেছে তোকে, বড় মামা টিটকারি মারে ন্যান্সি খালাকে।
কিন্তু আমার খালার বিশ্বাসে ফাটল ধরে না। একে একে আমাদের সবাইকে বসতে হয় চাইনিজ লোকটির সামনে। যতদূর মনে পরে, সবাইকেই সে ভালো ভালো অনেক কথা বলেছিলো। ভবিষ্যত উজ্জ্বল, অনেক ভ্রমন আছে জীবনে, সুখের মৃত্যু – ইত্যাদি। আমরা ভেবেছিলাম বড়মামা লোকটির কাছে যাবে না। কারণ বড়মামা খুব যুক্তিবাদী মানুষ, তিনি এইসব মানেন না। বড়মামা মনে হয় লোকটিকে একহাত দেখানোর জন্যই নিজ থেকে তার সামনে গিয়ে বসেছিল সেদিন। একটি দুটি কথার পর লোকটি মামার ডান হাত ধরে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে ছিল। বড়মামা আমাদের দিকে ফিরে বাংলায় বলেছিলো, ভং ধরেছে ব্যাটা। এইসব ভং না ধরলে এই লাইনে না খেয়ে মরতে হতো এদেরকে।

চাইনিজ লোকটি চোখ খুলে, আমার বড়মামাকে ভাঙা ইংরেজিতে যা বলেছিলো, তার সারমর্ম ছিল, মামার আকস্মিক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হতে পারে।

মামা লোকটির উপর খুব বিরক্ত হয়েছিলেন। আকস্মিক দুঘটনা মানে কী? হার্টের অসুখ! হার্ট এট্যাক! হার্ট ফেইলিওর! গাড়ি এক্সিডেন্ট! বাড়িতে গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটে আগুনে পুড়ে মৃত্যু? আজকাল স্বাভাবিক মৃত্যু আর কয়জনের হয় বলুন। দুর্ঘটনাতে মৃত্যু হবে, তার জন্য প্রস্তুত আছি বাপু। তুমি এবার যাও। বড়মামা নিজের হাত টেনে নিয়ে নিজের হাঁটুর উপর রাখেন।

লোকটি নানুর বাড়ি থেকে যাবার সময় আবার বড়মামার দিকে তাকিয়ে ছিল। মামাকে কাছে ডেকে বলেছিলো, আপনার হাতে অন্য কারোও অস্বাভাবিক মৃত্যু হতে পারে। সাবধানে থাকবেন।

লোকটি ঘরের বাইরে যেতেই আমরা সবাই হোহো করে হেসে উঠি। বড়মামার মতো ভালো মানুষ কোনদিন কাউকে খুন করতে পারে এটা খুব বোকা মানুষ ও চিন্তা করতে পারবে না। চাইনিজ লোকটি মামাকে চেনেনা তাই বলেছে এই কথা।

ট্যাক্সিওয়ালার ডাকে চোখ মেলে তাকালাম। পৌঁছে গেছি বড়মামার বাড়িতে। চেলটেনহামের যে এলাকাটিতে বড়মামা বাড়ি কিনেছেন এলাকাটি খুব শান্ত। একেকটি বাড়ি বিশাল এলাকা নিয়ে তৈরী। বাড়ির চারপাশে উঁচু দেয়াল তোলা। ইংল্যান্ডের বাড়িতে সাধারণত কেউ চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঢাকে না। কিন্তু এখানে অধিকাংশ বাড়ির বাগান পাথর বা ইটের উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরা। লোহার গেইটটি খুলে আমি দরজার কাছে গেলাম। কলিংবেল বাজালাম, কিন্তু কেউ দরজা খুললো না। বড়মামা, মামী, স্নেহা – সব কোথায় গেলো!

বাড়ির মেইন দরজাতে দরজা ধাক্কা দিতেই দেখি দরজাটি খোলা। শব্দ করে আমার মামাতো বোন ছোট্ট স্নেহাকে ডাকলাম প্রথমে, স্নেহা, স্নেহা – কোথায় তোমরা সব?

কোন শব্দ এলো না। নিচতলার সবগুলো ঘর খুঁজে ওদেরকে না পেয়ে বাগানে দেখলাম, সেখানেও কেউ নেই। একবার মনে হলো ফোন করে আম্মুকে জানাই। কেমন গা ছমছম করছে আমার। আবার মনে হলো, উপরতলায় বেডরুমে গিয়ে দেখি। হয়তো সবাই এখনো ঘুমাচ্ছে। যদিও নিজের চিন্তা নিজের কাছেই অসম্ভব মনে হচ্ছিলো। উপরতলার প্রথম ঘরটি স্নেহার। চার বছরের স্নেহা বড়মামার একমাত্র সন্তান। ওর ঘরটি এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর ঘর। মামী নিজে ইন্টেরিয়র ডিজাইন করে সাজিয়েছেন মেয়ের জন্য। হঠাৎ করে ওর ঘরে ঢুকলে মনে হয়, ডিজনিওয়ার্ল্ডের কোন রূপকথার রাজ্যে চলে এসেছি। সাবধানে স্নেহার ঘরের দরজা খুলে ভেতরে গেলাম আমি। ঘরের মাঝখানে নেটের ফুল টানানো খাটের উপর ঘুমিয়ে আছে স্নেহা। সন্দিহান বুকে এগিয়ে গেলাম ওর খুব কাছে। না, ঘুমাচ্ছে। ছোট্ট বুকটা ফুলে ফুলে নিঃশ্বাস ফেলছে খুব ধীরে। স্নেহার খাটের পাশে ফটোফ্রেমে একটি ছবি রাখা আছে। মামীর সাথে স্নেহা। আমার মামীর সৌন্দর্যে একটা কিছু আছে, তার দিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয়া যায় না।

বড়মামা যখন গ্লস্টারশায়ার ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতির লেকচারার হিসেবে ক্লাস নিতে আরম্ভ করেন, তার বছর না যেতেই আমার মামা প্রেমে পড়েন। প্রেমে পড়েন মানে ভয়ঙ্কর এক পরিস্থিতির উপস্থিত হয় তখন কয়েক মাসের মধ্যে। বড় মামার বয়স তখন আটত্রিশ। তিনি তার ক্লাসে বাংলাদেশ থেকে নতুন আসা এক একুশ বাইশ বছর বয়সী ছাত্রীর প্রেমে অন্ধ, বলতে গেলে বৈরাগীর মতো হয়ে গেলেন। আমার আম্মু আর নানুর দৃঢ় বিশ্বাস, সব ঐ মেয়েটির চক্রান্ত। সে বাংলাদেশ থেকে স্টুডেন্ট ভিসায় এসেছে তাই সে ব্রিটিশ পাসপোর্টের জন্য আমার মামার দিকে বড়শি ফেলেছে। আমার ভালোমানুষ মামাটিও টপ করে সেই বড়শি মুখে নিয়ে ধরে বসে আছেন। প্রেম ভালোবাসায় বিমুখ বড়মামার একেবারে জাহাজ ডুবি হলো তার ছাত্রী মোনালিসার চোখের সাগরে। অল্প কিছুদিনের মধ্যে ক্যাম্পাসে প্রচার হয়ে গেলো ছাত্রী শিক্ষকের ভাব ভালোবাসার ফিসফিসে গুজব।

সবাই মামাকে সাবধান করে দিলো, ইউনিভার্সিটির চাকরিটি বুঝি যায়! কিন্তু আমার বড়মামা তখন প্রেমের বাদশা সেলিম। নিজের সংকল্পে অনড়। মোনালিসাকে তার চাই। দ্যা ভিঞ্চির মোনালিসার মতো বড়মামার মোনালিসাও নাকি ঠিক তেমনি সাংঘাতিক রহস্যময় হাসি হাসতে জানে।
আমাদের বাড়িতে মোনালিসা মামীকে প্রথম দেখাতেই সবার খুব পছন্দ হলো। কিন্তু মামী কয়েক মিনিটের ভেতর সবার সামনে প্রকাশ করেন যে বাংলাদেশে তার আগে আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। সেটিও তার প্রেমেরই বিয়ে ছিল। অবশ্য মামী বলেছেন, তখন তার বয়স কম ছিল আর তিনি সাংঘাতিক সুন্দরী হওয়ায় তার গৃহশিক্ষক উনাকে নানাভাবে পটিয়ে পাটিয়ে প্রেমে ফেলেন। এখন মামীর বুদ্ধি পরিপক্ক হয়েছে। তিনি লেখাপড়া শেষ করে নিজের ক্যারিয়ারে মন দিতে চান। তাই ইংল্যান্ডে আসার আগে তিনি বাংলাদেশের স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে এসেছেন। বড়মামাকে বিয়ে করতে তার কোনো অসুবিধা নেই। তাছাড়া, বড়মামার মতো উচ্চশিক্ষিত একজনকে পাশে পেলে মামীর নিজের ক্যারিয়ার তৈরী করতে সহজ হবে, এই কথাও মোনালিসা মামী সেদিন নিজের মুখে বলেন আমার আম্মুকে।

: দেখ রিফাত, এই মেয়ে কিন্তু তোকে ভালোবাসে না। ও নিজের ক্যারিয়ারের জন্য তোকে ইউজ করবে। আমার আম্মু বোঝানোর চেষ্টা করে তার ভাইকে।

: আমিও ওকে ইউজ করবো আপা। ওকে দিয়ে আমার নিজের সব কাজ করিয়ে নেবো। রান্না করাবো। বাসন মাজাব। আমার গা টিপিয়ে নিবো। ভালোবাসবো। কিন্তু আমি ওকেই বিয়ে করবো।

: দেখ, তোর মাথাটাথা সব কেমন খেয়ে নিয়েছে মেয়েটা। কী নির্লজ্জের মতো নিজের ডিভোর্সের কথা জানিয়ে দিলো! কথাটা আপাতত লুকাতে পারতো।

: স্পষ্টবাদী মেয়েদের আমি পছন্দ করি আপা। মোনালিসা সত্য বলতে ভয় পায় না।

পাশ থেকে আমার নানুও প্রতিবাদ করেন এইপর্যায়ে।
:ছি ছি, কী অহংকারী মেয়েরে বাবা। নিজের মুখেই নিজের রূপের প্রশংসা করে কেউ অমন করে?

: চাঁদের গায়ে যখন জোছনার আগুন জ্বলে, চাঁদ নিজের মুখে উচ্চারণ করলেই কী সেই জোছনার আলো ম্লান হয়ে যায় আম্মা?

সেইসময় আমার বড়মামা মোনালিসার প্রেমে মাতাল হয়ে গুরুজনের সামনে মুখের ভাষার ভদ্রাভদ্র জ্ঞানটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলেন। কার সামনে কী বলেন সেই খেয়াল থাকতো না বেশিরভাগ সময়।

মামীর অতীতের কালো আর রূপের আত্মগর্বের কারণে আমাদের পরিবারের সবাই এই বিয়েতে আপত্তি জানায়। আমার বড়মামা একাই রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে মোনালিসা মামীকে বিয়ে করেন। তারপর নিজের বৌ নিয়ে বসবাস করতে আরম্ভ করেন চেলটেনহামের ল্যান্ডসডাউন প্যারেডে একটি বাড়ি ভাড়া করে। কয়েকমাস পর থেকে অবশ্য আমরা সবাই সেখানে যাতায়াত করতে আরম্ভ করি। মোনালিসা মামীর কোলে আসে মামীর মতোই সুন্দর আমাদের প্রিয়- স্নেহামনি। এতো স্নেহ- মমতা ছোট্ট মেয়েটির মধ্যে যে আমার নানু, আম্মু আর সবাই আমরা ভুলে গেলাম মোনালিসা মামীর সব রকম দোষের কথা।

বড়মামার বেডরুমের দরজায় একবার নক করে জোরে ডাকলাম, বড়মামা, আমি রিয়া। ভেতরে আসবো?

কোন উত্তর নেই। ভেতরে কারো হাঁটা চলার শব্দও পেলাম না। ঘরের ভেতরে পা দিয়ে দরজাতেই আমার দুই পা জমে গেলো। বেডরুমে বড় জানালাটির পাশে মামীর ড্রেসিং টেবিল। জানালার বেগুনি ভারী পর্দা সরিয়ে দেয়া আছে দুইপাশে। দিনের আলোয় ঘরের ভেতর সবকিছু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। মোনালিসা মামী সাজতে ভালোবাসেন। অনেক রকম কসমেটিক্স ছড়িয়ে আছে টেবিলের উপর। আর টেবিলের উপর মাথা রেখে বসে আছেন আমার বড়মামা। তার ডান হাতে তখন কালো পিস্তলটি ধরা। পিস্তল ধরা হাতটি টেবিলের উপরে মাথার পাশেই পড়ে আছে নিষ্কম্প। কপালের ডানপাশে গুলির গর্ত হয়ে আছে। কাত হয়ে থাকা মামার মাথার অন্যপাশ থেকে গড়িয়ে পড়েছে অনেক রক্ত। এখন রক্তের বেশির ভাগটুকু জমাট বেঁধে গিয়েছে। ড্রেসিংটেবিলের পাশ গড়িয়ে রক্ত মেঝের উডেনফ্লোরের অনেকটা ভাসিয়ে দিয়েছে। আশ্চর্য লাগছে আমার, একজন মানুষের শরীরে কত রক্ত থাকে?

আমার মস্তিস্ক বলছে, ৯৯৯ কল করতে হবে। কিন্তু আমার হাত চলছে না। মনে হয় না গলা থেকে কোন আওয়াজ বের করতে পারবো আমি। কিন্তু দেরি করা বোকামি হবে। পুলিশ আসলে অনেক প্রশ্ন করবে। কী করবো? আম্মুকে জানাবো আগে? স্নেহার যদি এখন ঘুম ভাঙে, ও যদি ওর বাবা-মাকে এভাবে দেখে?

বেডরুমের ভেতর অ্যাটাচ বাথরুমের দরজাটি দেখলাম খোলা। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম মোনালিসা মামী বেসিনের কাছে মেঝেতে পড়ে আছে। বেসিনে- মেঝেতে বমি আর রক্তের মাখামাখি। আমার অপরূপা সুন্দরী মামীর বুকে গুলির চিহ্ন। সিল্কের সাদা নাইটির উপর লাল রক্ত কৃষ্ণচূড়ার মতো ফুটে রয়েছে। মামীর ঠোঁট দুটি লিপস্টিক ছাড়াই গোলাপি হয়ে থাকতো সবসময়। এখন গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁটদুটি কেমন কালচে দেখাচ্ছে। মেঝেতে এলিয়ে পড়ে থাকা মামীর ডানহাতে প্লাটিনামের উপর ৪ক্যারেটের হীরার আংটির দিকে চোখ যায় আমার। আংটিটি এখনো মামীর আঙুলে ঝলমল করছে। লাস্ট বিয়ে বার্ষিকীতে বড়মামার দেয়া উপহার ছিল এটা। বাংলাদেশী টাকায় আংটিটির দাম পড়েছিল প্রায় ২০লক্ষ টাকা।

আমার খুব শরীর খারাপ লাগতে থাকে। আমি কাঁপা কাঁপা পায়ে দৌড়ে নিচতলায় চলে আসি। সিঁড়ির নিচে ক্লকরুমের বেসিনে ওয়াক ওয়াক বমি করার চেষ্টা করি। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। ঠান্ডা পানি দিয়ে নিজের মুখ ধুয়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসি। ভেতরে থাকতে ভয়ে দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। কিন্তু আমি চলে যেতে পারবো না। স্নেহা ওর ঘরে ঘুমাচ্ছে। বড়মামা আমাকে ফোন করে স্নেহাকে নিয়ে যেতে বলেছেন। এইটুকুন বাচ্চা একটি মেয়ে একদম একা হয়ে গেলো! আমার খুব কান্না পাচ্ছে এখন। এই এলাকার চারপাশটা এতো নীরব, কেমন ভুতুড়ে অনুভূত হয়। নিজের মোবাইল থেকে কল করলাম ৯৯৯।

অপারেটর জিজ্ঞেস করে: পুলিশ অর অ্যাম্বুলেন্স?

আমি বললাম: বোথ।

: এক্সকিউজ মি! অপারেটর আবার রিপিট করে দ্রুত, দিস ইজ ইমার্জেন্সি সার্ভিস, ইউ নিড পুলিশ অর অ্যাম্বুলেন্স প্লিজ?

আমি ক্লান্তস্বরে আবার রিপিট করলাম: বোথ প্লিজ।

আট-দশ মিনিটের মধ্যে তারা চলে আসলো। সাইরেন বাজিয়ে প্রথমে আসলো অ্যাম্বুলেন্স তারপর পুলিশ। চমৎকার মিষ্টি মুখের একজন মেয়ে পুলিশ স্নেহাকে কোলে করে নিচে নিয়ে আসলো। বাবা মায়ের ডেডবডি দেখতে দিলো না ওকে। আমি স্নেহাকে নিজের কোলের থেকে নামতে দেই না। একটু পরপর চুমু খাই ওর গালে, কপালে। এছাড়া আর কী করা উচিত আমার, বুঝতে পারি না। আম্মুকে জানিয়েছি ফোনে। তারা সবাই এখন রাস্তায়। কিছুক্ষণের ভেতর পৌঁছে যাবে এখানে। যদিও মনে হয় না পুলিশ কাউকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে দিবে। পুরো বাড়ি হলুদ ইনভেস্টিগেশন টেপ দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। বাড়ির সামনে কয়েকটি পুলিশের গাড়ি। অ্যাম্বুলেন্সও বসে আছে। যদিও এখানে ডাক্তারের আর কোনো প্রয়োজন নেই। রাস্তার পাশ দিয়ে যাবার সময় গাড়ি থেকে উৎসুক চোখে তাকায় মানুষেরা জোড়া খুন হওয়া বাড়িটির দিকে। সন্ধ্যা ছয়টার সময় পুলিশের গাড়ি আমাকে আর স্নেহাকে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দিলো। এখন শীতকাল হওয়াতে সন্ধ্যা ছয়টাতেই মনে হচ্ছে গভীর রাত। চারপাশে এতো কালো অন্ধকার!

স্নেহা দাদুর বাড়ি এসে খুব খুশি। দাদি আর ফুপির কাছে ময়না পাখির মতো কিচিরমিচির গল্প করে যাচ্ছে। একটু পরপর নিজের পাপা আর মাম্মির কথাও বলছে, কখন আসবে?

আমি গরম পানির শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। কী ঘটে যাচ্ছে? ধাতস্ত হয়ে চিন্তা করার চেষ্টা করি। যদিও আমার কোন হাত নেই এই দুর্ঘটনায়, কিন্তু বড়মামা আমাকেই কেন ফোন করে স্নেহাকে আনতে বললেন? কী জানি!

শাওয়ার করে মাথাটা একটু হালকা লাগছে আমার। একমগ ধোঁয়া উঠা চা নিয়ে নিজের ঘরে ব্যাগ থেকে ডাইরিটা বের করলাম। ড্রেসিং টেবিলের উপর বড়মামার ডেডবডির পাশে ডাইরিটা ছিল। শেষের পাতায় মামা আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু লিখেছেন। তখন আমার ডাইরি পড়ার মতো মনের অবস্থা ছিল না। পুলিশকে জানাইনি আমি ডায়রিটির কথা। গোটা ডাইরিটা নিজের ব্যাগে ভরে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম। এখন পড়বো, বড়মামার ব্যক্তিগত ডাইরি।

ডায়েরির প্রথম দিকে কিছু সাধারণ হিসাব লেখা। বেতন আর ব্যাংকের জমানো টাকার হিসাব মনে হলো। মোনালিসা মামীকে নিয়ে খুব প্রেমের কথা লেখা পাতার পর পাতা জুড়ে। স্নেহার জন্ম, স্নেহাকে নিয়ে তাদের অনেক স্বপ্নের কথা কী সুন্দর করে লেখা আছে। আমার চোখ ভিজে যায়।
ডায়রির পাতা উল্টে বুঝলাম, বড়মামা প্রতিদিন ডায়রি লিখতেন না। বিশেষ দিনে আয়োজন করে ডাইরি লিখতে বসতেন। প্রতিটি লেখা খুব যত্ন করে সময় নিয়ে লেখা। ডায়রির মাঝামাঝিতে এসে বুঝতে পারছি মামীর সাথে বড়মামার অন্তর্দ্বন্দ্ব আরম্ভ হয়েছে তখন। আমার মামার লেখা অনুযায়ী, মোনালিসা মামী সংসার করতে চাচ্ছিলেন না আর। স্বামী, কন্যা, ঘরের কাজ এইসব মামীর কাছে অসহ্য লাগছিলো। মন খারাপ হয়ে গেলো এটা পড়ে যে আমার অপূর্ব সুন্দর মামীর জীবনে আরেক রাজকুমার এসেছিল। ইন্টারনেটে ডেটিং সাইটে মাথা খারাপ করা এক সুদর্শন ও বিত্তশালী যুবকের সাথে পরিচয় হয়েছে মামীর। সেই লোকটি মোনালিসা মামীকে নিয়ে পুরো দুনিয়া ঘুরে দেখতে চায়। মামীও রাজি। কারণ, সংসার করা আর বাচ্চা পালন করার জন্য মোনালিসার জন্ম হয়নি। বড়মামার ডাইরি পড়ে বুঝলাম, গতবছর থেকেই স্বামী-স্ত্রীর ভেতর এই সমস্যা চলছে। অথচ আমরা কেউই কিছু বুঝতে পারিনি। অবশ্য, সবাই নিজেদের জীবনে এতো ব্যস্ত থাকে যে কেউ যেচে এসে নিজের কথা না জানালে অন্যের লুকিয়ে রাখা দাম্পত্যের বিবাদ আন্দাজ করা কঠিন কাজ।

ডাইরির ভেতর একটি প্লেনের টিকেটের কনফার্মেশন ইমেইল দেখলাম। মামীর নামে কাটা টিকেট। লন্ডন হিথ্রো এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি ইন্ডিয়া। আমার মনে চিন্তা হলো, মামীর নতুন প্রেমিকটি বুঝি ইন্ডিয়ান?

এরপর ডায়রিটির বেশ কিছু পাতা খালি। মাঝে মাঝে দুই এক লাইনে হতাশার কথা লেখা। একটি পাতায় একটিমাত্র শব্দ দেখলাম, “বটুলিনাম টক্সিন।” গুগল করে জানলাম, এটা একটি বিষের নাম। অবাক হলাম, মামা আর মামী দুজনেই পিস্তলের গুলিতে মারা গেছেন। কে কাকে মেরেছে? আর বিষের প্রয়োগ হলো কখন?

পাতা উল্টাতে উল্টাতে ডায়রির শেষের দিকে একটি পাতায় এসে চমকে গেলাম। পাতার উপরে আজকের তারিখ লেখা। সময়ও লেখা আছে। সকাল সাড়ে দশটা। তারমানে এটা বড়মামার মৃত্যুর ঠিক আগে আগেই লেখা! মন দিয়ে পড়তে আরম্ভ করি আমি।

প্রিয় রিয়া,

আর কিছুক্ষণ পর আমি তোমাকে ফোন করবো। আর কিছুক্ষণ পর আমি আর তোমার মামী আমরা দুজনেই চলে যাবো স্নেহা ও তোমাদের সবার কাছে থেকে অনেক দূরে।

এতদিন তোমাদের কাউকে জানাইনি লজ্জায়, মোনা আমাকে ছেড়ে চলে যেতে চাইছিলো বেশ অনেকদিন ধরেই। মোনার একজন নতুন প্রেমিক হয়েছে। আমি ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছি। মেয়েটির কথা চিন্তা করে হলেও আমার সাথে থাকতে কত অনুরোধ করেছি। কিন্তু তোমার মামীকেও তো তোমরা জানো। নিজে যা সিদ্ধান্ত নেয় তাই করে সে। মোনা আমাকে একদম সহ্য করতে পারছিলোনা। আমি কাছে গেলেই ও কেমন দূরে সরার জন্য অস্থির হয়ে উঠতো। ওর নতুন বয়ফ্রেন্ডটিকে এই বাড়িতে নিয়ে এসেছিলো। ওরা দুজনে একসাথে আমার সামনে বসে কথা বলেছে। মোনা আমার কাছে ডিভোর্স চাইছিলো। সে আমাকে ফেলে ওই লোকটির সাথে চলে যেতে চায়- একেবারে।

অনেকদিন ভেবেছি বিষয়টি নিয়ে। নিজের জন্য না, আমার মেয়েটির জীবনটাকে এভাবে নষ্ট করে দেবার জন্য মোনার অনেক বড় একটা শাস্তি পাওয়া দরকার। তাই আমি ঠিক করেছি, ওকে খুন করবো। মৃত্যুই সঠিক শাস্তি এমন মায়ের জন্য, কি বলো?

এসব কথা তোমাকে বলার কিছু কারণ আছে। আমি স্নেহাকে তোমার কাছে দিয়ে গেলাম। আমার মনে হয়েছে আমাদের পরিবারে আমার পর তুমিই ওকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসো। স্নেহার জন্য তোমার স্নেহ আমার চোখে পড়েছে। আর মেয়েটি বড় হলে কোনোদিন যদি আমাদের কথা জানতে চায়, তুমি ওকে সত্য কথাটিই বলবে। সত্য সব সময় সুন্দর না হলেও সত্যের নিজস্ব একটি দ্যুতি থাকে। যা সূর্যের মতো উজ্জ্বল।

তোমাকে যখন আমি এই ডাইরি লিখছি তখন তোমার মামী তার নিয়ম অনুযায়ী সকালের হারবাল-টি পান করছে। মোনা নিজেকে খুব যত্ন করে বরাবরই। তোমার মামীর চায়ের সাথে আমি বটুলিনাম টক্সিন নামের একটি পাউডার মিশিয়ে দিয়েছি অনেকখানি। এটা মারাত্মক বিষ। কয়েক ঘন্টার মধ্যে মোনা মরে যাবে। স্নেহাকেও আমি সকালে স্কোয়াশের সাথে হালকা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে খাইয়েছি। বাবা মায়ের মৃত্যু অতটুকু বাচ্চার চোখে দেখা ঠিক হবে না, তাই না!

মোনার শরীর থেকে প্রাণ বেরিয়ে গেলেই আমি নিজের মাথায় গুলি করবো। আমার আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছে করছে না এই পৃথিবীতে। মোনালিসাকে এতো ভালোবাসলাম, মোনাই যখন আর থাকতে চায় না আমার সাথে তাহলে আমার বেঁচে থেকে লাভ কী? মাঝেমাঝে মনে হয়েছে মোনা এভাবে আমাকে ফেলে দেয়ার বিষয়টি আমার বুকে ভালোবাসার কষ্টের চেয়েও আত্মঅহংকারে বেশি বেঁধেছে। ওকে আমি অন্যের সাথে চলে যেতে দেখতে পারতাম না…………..

: রিয়া-পু, রিয়া-পু, তুমি বল খেলতে চাও?

একটা লাল বল হাতে নিয়ে আমার ঘরে এসেছে স্নেহা। আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে হালকা করে বললাম, না আপু। তুমি খেলো।

: তোমার চোখে পানি কেন? ডাস্ট জাইছে?

কষ্ট করে হেসে বললাম, না ডাস্ট জাইছে না। তুমি কিছু খাবে স্নেহা?

: না, মাম্মি আসলে খাবো। দৌড়ে স্নেহা চলে গেলো অন্য ঘরে।

আমি বড়মামার ডাইরিটা নিয়ে ভাবতে থাকি। মামীকে যদি চায়ের সাথে বিষ খাওয়ানো হলো তাহলে আবার গুলি করার কী প্রয়োজন ছিল? গুলি তো কেবল বড়মামার জন্য প্ল্যান করা ছিল। অনেক চিন্তা করেও কিছু লাভ হলো না। ভাবলাম থাক, পুলিশের কাজ পুলিশ করুক। সারাদিনের ধকলে আমার মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে একটু ঘুমানোর ইচ্ছা হলো। বালিশে মাথা লাগাতেই আমার খুব বমির ভাব হয় আবারো। দৌড়ে বাথরুমে বেসিনের সামনে মুখ বাড়িয়ে বমি করতে থাকি আমি। সাদা বেসিনের উপর নোংরা হলদে বমির দলার দিকে তাকিয়ে আমার মাথায় ব্যাপারটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেলো।

আজ সকালে মামীর চায়ের স্বাদ নিশ্চয়ই একটু আলাদা ছিল, কারণ ঐ চায়ে বিষ মেশানো ছিল। তবে কিছু বুঝে উঠার আগেই মামী কয়েক চুমুকে বেশ খানিকটা বিষ নিজের শরীরে ঢুকিয়ে ফেলেছেন। তার শরীর খারাপ লাগতে থাকে। বড়মামার সাথে যেহেতু তার অনেকদিন থেকেই সম্পর্ক খারাপ, চায়ে বিষ মেশানোর ব্যাপারটি আন্দাজ করা বুদ্ধিমতী মামীর জন্য কঠিন ছিল না। ব্যাপারটি বোঝার সাথে সাথেই মামী দৌড়ে বাথরুমে যান। বেসিনের কাছে গিয়ে গলায় আঙ্গুল দিয়ে বমি করে বিষটুকু ফেলে দিতে চেষ্টা করেন। শেষমুহূর্তে বড়মামা আর কোন রিস্ক না নিয়ে মামীকে গুলি করেন। বাথরুমে মামীর মৃত্যু নিশ্চিত হলে বড়মামা ড্রেসিংটেবিলে বসে নিজের মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেন। আমার হিসাব নির্ভুল নাও হতে পারে, কিন্তু নিজের মনের চোখে আমি ঠিক এমন কিছুই দেখতে থাকলাম।

অবশ্য আমি খুব বেশিক্ষণ চিন্তা করার সময় পেলাম না। কারণ, আমাদের বাড়িতে সাংঘাতিক হৈচৈ শুরু হয়েছে। আমার নানু ফেইন্ট হয়ে পড়ে গেছেন ড্রইংরুমের সোফার উপরে। ছেলের মৃত্যু সংবাদ নানুকে অনেক বড় আঘাত দিয়েছে। আমি আমার মোবাইলে বাটন টিপছি ৯৯৯ আর তাকিয়ে আছি নানুর দিকে।

ফোনের অপরপাশে প্যারামেডিক্স বলে চলেছে, রোগীকে সমান একটি জায়গায় শুইয়ে দিন। রোগীকে কিছু খেতে দেবেন না। কিছু পান করতে দেবেন না। রোগী কি নিঃশ্বাস ফেলছে?

আমি বললাম: না।

: রোগী কি চোখের পাতা নাড়ছে?

আমি বললাম: না।

: রোগীর কানের লতিতে চিমটি কেটে দেখুন, মুখে ব্যথার চিহ্ন দেখা যায়?
আমি বললাম: না।

: অ্যাম্বুলেন্স না পৌঁছানো পর্যন্ত রোগীকে সিপিআর দিতে হবে। সিপিআর কিভাবে দিতে হবে আমি বলছি আপনাকে, আপনি কি তৈরী?

আমি বললাম: না। সিপিআর দেয়ার কোন প্রয়োজন নেই। আমার নানু আর বেঁচে নেই।