ইঁদুর

আজকাল আমাদের ঘরবাড়ি ইঁদুরে ইঁদুরে গেছে ভরে
প্রতিদিন বাড়ন্ত দাঁতের ধারে কাপড়চোপড়, লেপকাঁথা
সোফা কুশনবালিশ কেটেকুটে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলে
যত্নে রাখা খাবার পর্যন্ত নষ্ট করে ছিটায় সর্বত্র দিনেরাতে
আবার ময়লা করে জীবাণু ছড়ায় সারাক্ষণ
বাড়ির লোকেরা যারপরনাই অতিষ্ট বিরক্ত
সবখানে শুধু একটাই সুর
ইঁদুর ইঁদুর।

হাট থেকে আব্বা নিয়ে এসেছেন কড়া বিষ
সারাবাড়ি মা বিষের মিষ্টি বল তৈরি করে দিয়েছেন
সকাল বেলায় দেখা গেলো কয়েকটা মাত্র মরে পড়ে আছে
আবার সন্ধ্যায় ইঁদুরের উৎপাত হুটোপুটি
ভেবেই পাই না ইঁদুরকে কীভাবে যে দেবো স্থায়ী ছুটি।

হঠাৎ মাথায় এলো হ্যামিলন
ওর বাঁশিই কেবল পারে সমস্ত শহর থেকে ইঁদুর তাড়াতে
কিন্তু হ্যামিলন কেনো আসবে আবার
সেই যে ইঁদুর মুক্ত হলো, তারপর আমাদের শিশুদের নিয়ে
চলে গেলো কালো পাহাড়ের ওপারে আঁধারে
সে কি আসবে কখনো প্রতারক নগরে, কষ্টের দ্বারে দ্বারে?

তবু বাঁচার তাগিদে হ্যামিলন,
তোমাকে আবার আসতেই হবে আমাদের বাড়িতে শহরে
নইলে যে ইঁদুরের পেটে, প্লেগের অসুখে চলে যেতে হবে সবাইকে
জনশূন্য জনপদ হবার আগেই কাঁধে তুলে নাও ইঁদুর নিধনের দায়-কে।
১১.০৫.১৫
…………………………………………..

শকুন

টেকনাফ উপকূলে ঝাউবনে শকুনের দল খোশ গল্পে মশগুল
নোনা বাতাসের ডানা নিয়ে এসেছে সুঘ্রাণ
দূর বহুদূর থেকে ভেসে আসে মৃত্যুগন্ধ
ওই যে আকাশে উড়ে উড়ে চক্কর মারছে সাগর ঈগল
আর কয়েকটা দিন শুধু অপেক্ষার কাল গোণা
তারপর নীল ঢেউ পার হয়ে পৌঁছে যাবে
সাগরে নৌকায় ভাসমান মানুষের মৃতদেহে
একসাথে অনেক লাশের স্তূপে হবে নিরিবিলি ভোজ।

কোথাও মানুষ নেই
কে শুনবে ওদের বাঁচার চিৎকার আকুতি?
আন্দামান থেকে বঙ্গোপসাগর কূলে মানুষ এখন ব্যস্ত
মুদ্রার পেছনে
দাসের বাণিজ্যে
অস্ত্রের দখলে
নারীর নেশায়
হিংসার ভূগোলে
কে কোথায় মরে ঝরে গেলো তাতে কি বা যায় আসে
ডানা ঝাপটায় শকুনেরা আসন্ন মাংসের উৎসবে আনন্দ-উল্লাসে।

এই বুঝি ঢেউয়ে ঢেউয়ে মিশে যায় মুমূর্ষু উদ্বাস্তু প্রাণ
ঝাঁক বেঁধে শুরু হয়ে যাবে ক্ষুধাতুর শকুনের অভিযান।
১৬.০৫.২০১৫
…………………………………………..

দেবদারু

দেবদারু হয়ে কবে অঙ্কুরিত হয়েছি সে খবর কে জানে
দাদা বাবা শিখিয়েছে শিরদাঁড়া সোজা করে
সুনীল আকাশে মেলে দিতে সবুজ পাখনা
প্রতিবেশী লতাগুল্ম ঠাট্টা করেছে আমার ঋজু ও দৃঢ় ভঙ্গির জন্য
শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাত, ঝড়ের ভাবনা মাঝে মাঝে করেছে বিক্ষত
ছিন্নভিন্ন হয়েছি, আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি
বারবার মজনু শাহের মতো।

দিনমান কাকের পীড়ন
রাতভর বাদুড়ের নির্যাতন
কখনো ঝঞ্ঝার তুমুল আঘাত
কখনো হৃদয়ে হেনেছে কুঠার
বাকিটা সময় রোদবৃষ্টি শিশিরের আহারবিহার।

আমার আকাশ ছোঁয়া মাথা
মাটির গভীরে মূল বিকশিত
দুচোখ আমার এক দিগন্ত ছাড়িয়ে দশ দিগন্তপ্রসারি।

আমি এখন দেখতে পাচ্ছি তুফান আসছে
দাঁত বের করে বিনাশের আনন্দে হাসছে

তাই এখনো যাদের ভাঙাচোরা মেরুদ-
টিকে থাকার লড়াইয়ে তৈরি হয়ে নাও
উর্বর মাটিতে মাটিতে এবার ইস্পাতের শিরদাঁড়া বানাও প্রচণ্ড।
১৭.০৫.২০১৫
…………………………………………..

অজগর অন্ধকার

আজকাল একটা ভয়ের ডোরাকাটা অজগর
আমাকে সর্বদা তেড়ে বেড়ায় সমস্ত চরাচর

শিরায় শিরায় শিহরণ তুলে রাতদিন জাগায় আতঙ্ক
নিমেষে আমার পথচলা মন হয়ে যায় খাঁচার বিহঙ্গ

কোথায় ছুটবো, পিছে পিছে হিসহিস ফোঁসফোঁস
ছায়া হয়ে পায়ে পায়ে মনে মনে ছড়ায় আক্রোশ
কালবৈশাখীর সাথে ধুয়েমুছে গেছে অর্জিত সাহস

চোখের সামনে যদি গিলে খায় আত্মজের দেহমন
যদি বসায় হিংসার দাঁত যেখানে সেখানে যখন তখন
বিনাশের বিষেভরা ফণা তুলে ছোবলে উদ্যত সারাক্ষণ

তাহলে কি করে আমি হবো শিরদাঁড়া সোজা দেবদারু
ঠেকে ঠেকে জেনে গেছি প্রত্যাশী বন্ধুরা কষ্টের সজারু

আজীবন অজগর এইভাবে বিক্ষত করবে আমার ভূগোল?
এসো না একটিবার প্রতিরোধে ভেসে ভেসে দিই দোল।
২২.০৫.২০১৫
…………………………………………..

রূপান্তর -১

এইখানে মানব বসতি ছিলো কোনো একদিন
প্রাণের গুঞ্জনে কোলাহলে স্বপ্নে আনন্দে রঙিন

জীবনের আবাদে বিবাদে জীবনই ছিলো মুখ্য
কখনো ভোরের কমলতা কখনো বৈশাখী রুক্ষ

সারারাত শিশিরের স্নানে সকালের শীতলতা
আঁধার অরণ্যে জানি এখন সবই রূপকথা

ইতিহাসে নয়া বাঁক: বসতি জঙ্গলে রূপান্তর
আমাদের শৈশব কৈশোর চলে গেছে তেপান্তর

অনেক মানুষ আজ বাঘ সিংহ ভালুক শেয়াল
আমজাম ধানপাট ক্ষেতে সেগুন গরান শাল

মানুষের সংস্কৃতি সভ্যতা কৃতি বহমান ধারা
জঙ্গলে পশুর নখে ছিন্নভিন্ন বিস্মৃতির পাড়া

দিনভর জন্তুর উল্লাস রাতভর ভোজসভা
কতিপয় লোক ভয়ে ভয়ে জ্বালায় প্রাণের প্রভা

জানি না জঙ্গল থেকে কবে সেই জনপদ হবে
আমরা আবার প্রাণে প্রাণ ছুঁয়ে যাবো কলরবে।
২৩.০৫.২০১৫
…………………………………………..

মেঘবৃষ্টি ঝড়বজ্র

সারাদিনমান মেঘ জমা হও নৈঋতে ঈশানে
সমস্ত আকাশ জুড়ে ছেয়ে যাও খরার উজানে

ছিন্ন ছিন্ন মেঘপুঞ্জ ঝাঁক বাঁধ দৃঢ়তার সুরে
শত বছরের দুখে কৃষ্ণবর্ণ হও কাছে দূরে

এবার গর্জন তোলো আকাশ জমিন আদিগন্ত
ভয়ের জন্তুরা মরে যাক সাহসেরা প্রাণবন্ত

কতো যুগ খরার দহন, নেই সবুজ অঙ্কুর
আয় বৃষ্টি ঝেপে, এই মাটি হোক প্রাণের নূপুর

জন্ম নিক প্রত্যয়ের দেবদারু গগন শিরিষ
মরা নদীরা আবার কূলপ্লাবী হোক অহর্নিশ

কড় কড় ঝড় ওঠো বুকে বোধে শিরায় শিরায়
জেগে ওঠা চর ভেঙেচুরে যাক রক্তের ধারায়

আগ্রাসী আঁধার চিরে হেসে ওঠো বিদ্যুৎ-উল্লাস
আর কতোকাল দেখে যাবো বলো প্রাণের বিনাশ

পদ্মা মেঘনা যমুনা সাক্ষী, সাক্ষী ওই হিমালয়
মেঘবৃষ্টি ঝড়বজ্র শেষে হবে রবির উদয়।
৩১.০৫.২০১৫
…………………………………………..

মাকড়সা-জাল

ঘুটঘুটে রাতে জোনাকীর মতো জ্বলতে জ্বলতে
মাকড়সা-জালে আটকা পড়েছি চলতে চলতে

এই রাত যেন শত বছরের বেদনায় ভরা
জোছনার দীপ নেই প্রাণ নেই আছে শুধু জরা

ঈগলে শেয়ালে ভালুকে সিংহে ছাড়ে হুঙ্কার
এই ফাঁদে বাঁচি ওই ফাঁদে পড়ি নেই পারাপার

ধুকপুক হতে হতে যেই আমি ফেলি নিঃশ্বাস
তখনই এক মরণের জাল পরিয়েছে ফাঁস

ছটফট করি চিৎকার ধরি ত্রাতা নেই কেউ
কোথাও তোলে না কোথাও ওঠে না প্রতিবাদী ঢেউ
যতই ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা ততই ক্ষরণ
সমাধান বুঝি প্রতিরোধহীন কেবল মরণ

প্রকৃতির ধারা এভাবে এখানে এসে থেমে যাবে
অরণ্য জুড়ে রোদনের সুরে সব গান গাবে!

বহুদূরে শুনি ভেসে ভেসে আসে ওই পারুলের ডাক
ওই ‘সাতভাই চম্পা জাগরে’ বলে দেয় হাঁক

আমি একা নই হাজার মানুষ মাকড়সা-জালে
একবার সাড়া দিলে শত রবি উঠবে সকালে।
০১.০৬.২০১৫
…………………………………………..

ডালিম কুমার

কাল অজগর শিরায় শিরায় ঢুকে সব পথ রোধে
চুক চুক করে খায় হিস হিস করে ছাড়ে রোশ
পথে প্রান্তরে ঘরে ও বাইরে ফুঁসে ওঠে ক্রোধে।

আমাদের ঘর ধু ধু বালুচর কাল অজগর নাচে আর হাসে
সৃজনের ধারা মননের চারা বিনাশী ছোবলে করেছে হজম
মাঠের আবাদ খোরাকী ফসল খেয়ে ফেলে সব উল্লাসে।

মানুষের প্রাণ করে আনচান বুকে হাঁসফাঁস অবিরত
রবির উদয় গগনে উধাও হাজার রজনি এসেছে আবার
জোনাকীর কুপি জ্বলে নিভু নিভু তারাদের মতো।

সেই কবে একবার মানুষের কাছে এসেছিলো ডালিম কুমার
হঠাৎ আলোর ঝরনার মতো বাঁধ ভেঙে ছিলো মানুষের মন
কাল অজগর ছিন্নভিন্ন হয়েছিলো বারবার।

মানবহৃদয় কৃষ্ণপক্ষে হাঁপাতে হাঁপাতে জীবনবিমুখ
মাঝে মাঝে তবু জ্বলে ওঠে প্রাণ: আসতেই হবে ডালিম কুমার
মরা গাঙে বান ডেকে গান গেয়ে ময়ূরপঙ্খী ভাসবে আবার।
০৩.০৬.২০১৫
…………………………………………..

সমকাল-১

দুর্বল লোকেরা চিরকাল নীতিকথা বলে, আইনকানুন মেনে চলে
শক্তিমান কোনোদিন কোনো কিছুরই ধার ধারে না জগতে
সে-ই ঠিক করে দেয় নীতিশাস্ত্র, বিজ্ঞানের চাকা যাবে কোন পথে।

তুমি শতো মেহনত করে আবাদের মাঠে যতোই ফলাও শস্য
লাভ নেই জেনো, কোনো একটা ছুতোয় লুট করে নিয়ে যাবে সব
যদি রুখে দাঁড়াও সাহসে, তবে পলাশের রঙ হয়ে উঠবে সরব।

তুমি সুন্দরী তরুণী, সর্বভুক মাতালেরা গিলে খাবে তোমার সম্পদ
কোথাও আশ্রয় নেই, এখানে সেখানে দৌড়ে হবে শুধু ক্লান্ত
কামাতুর লোকেরা তোমাকে মনোমুগ্ধ কথার মুখোশে করবে বিভ্রান্ত।

বিদ্যার ভবনে কোনো মূল্য নেই তোমার অর্জিত সৃজিত বিদ্যার
শুধু ভড়ং ফলাও আর জিরাফের মতো উঁচু গলায় জাবর কাটো
জ্ঞানের বাড়ন্ত দেবদারু হলেও তুমি হয়ে যাবে বামনের মতো খাটো।

তিলে তিলে তুমি গড়ে তুলেছো তোমার ঘরবাড়ি প্রাঙ্গণ বাগান
নিশ্চিত হয়ো না এইখানে সুখে গর্বে ও আনন্দে হবে বসবাস
হঠাৎ বজ্রের মতো পঙ্গপাল এসে উল্লাসে করবে সর্বনাশ।

এভাবেই কাল বয়ে যাবে পদ্মা মেঘনা যমুনা হয়ে বঙ্গোপসাগর
কবরের ঘাসে হাসে সর্বজয়ী ইতিহাস, হাসে আগামীর ঘরদোর।
০৯.০৬.২০১৫