বিশ্বমন্দার প্রভাব পড়েছে মুদির দোকানে

বিশ^মন্দার প্রভাব পড়েছে মুদির দোকানে
বেচাকেনা চলছে- ক্রেতাদের আনাগোনাও কম নয়
সবুজ মোড়কের ম্যাংগোবার, ঝাল-লবণ-মেশানো প্যাকেট বাদাম, গ্রিন-টি
পেস্ট-সবুজে টুথব্রাশের চাহিদা আছে; কোথাও কোথাও সবুজ আপেল, সুগার-ফ্রি
আদার দুধ চা, মোটাদাঁতের গোলাপি চিরুনী, রেশমি চুড়ি আর দাঁড়ি-কামানোর
ওয়ান-টাইম রেজার কিনছে কেউ কেউ।
যারা একটু ভিতু, তাদের সদাইপাতির তালিকায় জায়গা জুড়ে নিয়েছে
চকোলেট, রুমাল ও কালো কালির কলম।

পাখির ঝরে-পড়া পালকেরা মিছিল করে করে জড়ো হচ্ছে সাহারা ও
রাজস্থানে; হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের রোদ-না-পড়া বারান্দার ঝুলগুলো ভুলের
পাতা সরিয়ে আজও ফেরি করে ফেরে
দেখে-আসা কোনো সুখের সংসার!
কখনো কখনো সুখের ধূলিকণা বাউলা বাতাসে উড়ে এসে পড়ে
মাশকারা-মাখা চোখের কোণায়- লেফট-রাইট খেলতে খেলতে।
কালশিরা-পড়া ক্যান্টিনে বসে সাহসীরা চুমুক দেয় লেবুর ঠা-া শরবতে
হাত রাখে তালুতে ও জঙ্ঘায়-
কারো কারো বা ব্লাড-পেশার বাড়ে, হুশিয়ারি আসে কার্ডিয়াকের
ডেঙ্গু রোগীর চেয়ে হু হু করে বাড়ছে প্রতিদিন
পার্কে-হাঁটা প্রেসক্রিপশনধারী মানুষ!

দিব্যচোখে দূরপ্রাচ্যের সাম্য : শান্তি আর প্রগতির ক্যানভাসে আজ
ভাঙা-সোভিয়েট; চারিদিকে চিৎকার- কাশ্মির ! কাশ্মির!
জাতিতে সব রোহিঙ্গা, ভূখণ্ডে ভূখণ্ডে আরাকান।

রাই সরিষার সিন ও সিনারিও কিংবা শৈশবের গমের ক্ষেতে পাখি-তাড়ানোর ভোরে লুঙ্গির কোঁচায় আজও কি
নেতিয়ে পড়ে হাতে-ভাজা বালুমাখা মুড়ির দল?
কার বাসায় কে পাড়ে ডিম ?
সিনেমাপাড়ার বস্তিতে আগুন
হলুদ শিখায় ভেসে ওঠে রূপনগরের অট্টালিকার স্বপ্ন!

প্রগতির পেছনে জমে আছে- ডুবে আছে সব ফূর্তি!
এ-জাহান মিথুনবিরত-
সততা দিয়ে নির্মিত হয়েছে কোন সভ্যতা, কোনকালে!
কবে ফূর্তি বিক্রি হয়েছে মুদির দোকানে ?
…………………………………………..

জল ও জড়তা

আমরা কথা বলতে বলতে একটা বিন্দুতে এসে দাঁড়ালাম
যেখানে নীরব ঝর্ণাধারা তার সমস্ত না-বলা কথা
নিয়ে বয়ে যাচ্ছিল
আমরা শিখছিলাম কীভাবে আঙুলের স্পর্শে ঝর্ণার
কোমলতা ও উদ্যমতাকে অনুভব করা যায়
কামনার পাঁচ আঙুলের কৌশল রপ্ত করছিলাম আমরা
তর্জনী দিয়ে বেয়ে বেয়ে পড়ছিল চিকচিকে মৃদু পানি
যদিও সব প্রশ্নে উত্তর নেই
তথাপি তুমি সেদিন সকাল থেকে প্রায় দুপুর
পর্যন্ত অনেক ভেবে ভেবে
কনফিউশন পেরিয়ে পেয়েছিলে কিছু প্রশ্নের উত্তর
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার অন্ধকার পর্যন্ত আমরা
পরিভ্রমণ করি
লেকের স্থির পানি মাঠের উপর বিশাল আকাশ
-আমি তোমাকে সেদিন ‘আকাক্সক্ষা’ বলেছিলাম
মনে পড়ে?

মনে পড়ে কথা বলার ফাঁকে আমরা প্রজাপতি আর
ঘাসফুল তুলে রাখি
আমাদের ঝুলবারান্দার ঝুলে থাকা শাদা ফিতেয়
চাঁদ ডুবে গেলে বাসনার বাতাসে ভিরু মনে ভর করে
প্রতীক্ষার প্রলাপ আর মায়ার প্রলেপে মুখ ঢাকি
জানি, হয়তো অর্ধেক পথ এগিয়ে থেমে থাকবো
-তাই বলে কি তাকাবো না?
ছুঁয়ে দেখবো না তোমার রজনীগন্ধাজড়ানো
চুলের বেণী, বুকের উজ্জ্বলতা?
চিকন ঠোঁটের বাঁকে তোমার কনফিউশনের কিছু
সমাধান হয়তো মৃদু হাসে
আমি ‘ভালোবাসি’ বললে তুমি বলো ‘ধন্যবাদ’
কিংবা ‘সেম টু ইউ’
কিংবা উরুর উত্তাপ লুকিয়ে রেখে বলো
‘একই রকম নয়, অন্য রকম’।

তোমাকে তো কখনো বলিনি চাঁদ হাতে রাত্রি আনো
‘চাঁদের কোনো নিজস্ব আলো নেই’- লোকে বলে
সূূর্যই নাকি তার ভরসা
আমি বলি- তোমার আলোটুকু সত্যি
-কতো শার্প, কতো স্নিগ্ধ তুমি
কী নরম তোমার সমস্ত শোভা!

-আমি চেয়েছি শুধু সবুজ শান্তি
চেয়েছি উরুতে-বিছানো উদার আকাশ
মেঘ ও গাঢ় শাদাটে জল।
…………………………………………..

একই অসুখ

প্রবল হাওয়ায় ছোট্ট ঘরের জানালা কেঁপে উঠলো
কাঁপলো তার ভেতরে হিমশীতল আবেশে জমে থাকা
মানুষগুলোও
বাতাসের সাথে শরীরের গন্ধ চারিদিকে ছড়ায়-
একই অসুখে দুজন অসুখী
-কী নাম সে অসুখের?

হয়তো সেদিন দেবী-প্রতিমার প্রাসাদ পুড়েছিলো
তার মন পুড়েছিলো কিনা- সে খবর রাখেনি কেউ
হয়তো সেদিন প্রার্থনারত কোনো পুরুষের
আমলনামায় লেখা হয়েছিলো
কোনো পুরনো-বাতিল ইতিহাস।
তুরাগ কিংবা শীতলক্ষ্যা
অথবা শাদা শাদা নরম কাশবন সে-প্রবল-হাওয়ায় দুলে
উঠেছিলো খানিকক্ষণের জন্য।

মানুষ নিশ্চয় নিরাপদ ভ্রমণের ব্যাপারে খুব সতর্ক
সতর্ক নিজের নিরাপত্তা আর আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারেও
কিন্তু প্রবল হাওয়া কি ওসব মানে?
ঝুম বৃষ্টি কি ওসবে কোনো পাত্তা দেয়?
হাওয়া কিংবা বৃষ্টি কি কিছু মেনেছিলো সেদিন?
মি. টুইস্ট, কলার খোসা, পচা পেঁপে আর বিলাতির
জুস পিছনে ফেলে সতর্ক মানুষ
বেহুঁশ মানুষ
অসুখগ্রস্ত মানুষ
সন্ধ্যা নামার আগেই সেদিন ঘরে উঠেছিলো-
অসুখগ্রস্ত মানুষ সেদিন ভেবেছিলো- সবকিছুর আগে
নিরাপত্তা- অসুখের ভেতরে সুখের বারান্দা ভেঙে-চুরে
হলেও- চাই চূড়ান্ত নিরাপত্তা!
…………………………………………..

অদৃশ্য আকর্ষণ

প্রথম পরিচয়ের কিছুদিন পর কেউ নাম ধরে ডাকলে অথবা নাম মনে রাখলে
আমরা ‘ইমপ্রেসড’ হই
কথা বলার জন্য কিংবা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের জন্য
লিংক খুঁজে না পেলে হয়তো হুট করে বলে ফেলি: ‘হোয়াট টু ডু নাউ’?
অথবা বুঝতে পারি না কেন ভালো লাগলো তার ‘স্মরণক্ষমতা’
না-কি ভালো লেগেছে তাকেই- যা বলতে পারি না সহজে-
যেন ‘সহজ কথা যায় না বলা সহজে’!

পুরনো এক দর্শনের অধ্যাপকের কথা শুনেছি- তিনি বউ মরলে কাঁদেননি
ছেলে মরলে কাঁদেননি;
কিন্তু ভাই মরার পর মাটিতে গড়াগড়ি করে বিলাপ করেছেন অন্তত তিনদিন
-বউ মরলে তো নতুন বউ পাওয়া যায়, ছেলে মরলে মেলে আরো ছেলে
কিন্তু ভাই… ভাই পাবে কোথায় সে?
বর্তমানের ফিলোসফি কী বলে- তা তেমন জানা হয়ে ওঠে না
থার্টিনও এখন আর ঠিক ‘আনলাকি’ ঠেকে না
বছরের শেষ থার্টিনে কিংবা সরকারের জ্ঞানবিভাগের থার্টিনে আবির্ভূত হয়ে
দিব্বি তো সময় গুজরান করা যায়- সুখে ও নিরাপদে!

কী ‘ফার’ আর কে ‘জানা’ তা হয়তো কখনোই বুঝে উঠি না আমরা
কিংবা ‘তা-নিয়া’ ভাবি কি-না, তা-ও থাকে অজানা
কলাবাগানে গুবাক তরুর সারি আমাদের চোখে সহ্য হয়ে গেছে আজকাল-
সুপারির সারিতে কলাগাছ কিংবা কলাবাগানে সুপারি গাছ
হয়তো হরহামেশাই দেখা যাচ্ছে-
সমস্ত আয়োজনই যেন আমাদের আনন্দের জন্য- অথচ জানালার নীল পর্দা
খানিকটা সরাতে যে আমাদের কী আপত্তি-
যদি বৃষ্টির ঝাপটা আমাদের মেকআপ-করা মুখ ভিজিয়ে দেয় কিংবা রোদের
দারুণ কপটতা কেড়ে নেয় খানিক-নুয়ে-পড়া লাবণ্য!
কী এক বিবর্ণ ভয়ে আমরা গুটিয়ে থাকি প্রতি মুহূর্তে
নিজেকে হত্যা করে অতঃপর আবিষ্কারের নেশায় ডুবে থাকি প্রতিদিন-প্রতিরাত
নিজস্ব সবটুকু জলাভূমি অন্যের জন্য প্রসারিত রেখে
‘আপন আপন’ করতে করতে আপনাকেই হারিয়ে ফেলি আমরা
প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায়।

কোনোকিছুই ‘ইনভিজিবল’ নয় বস্তুর দৃশ্য-বারান্দায়
হয়তো ‘অনারেবল’ হয়ে ওঠে কেউ কেউ
জাপানের কবি মাতসুয়ো বাশো বলেছিলেন: চোখ আর চেতনা খাড়া রাখলে
‘ইনভিজিবল’ও সহজেই ‘ভিজিবল’ হয়ে ওঠে
তিনি লিখেছিলেন ৫-৭-৫ মাত্রার হাইকু
আমরা তো ৫-৫-৩ কিংবা ৩-৩-৫-৫ মিলের কবিতা লিখতে পারি
-না-কি সে-টুকুও পারি না?

যার অনুভূতির প্রাখর্যে আমরা ‘স্ট্রংলি অ্যাফেক্টেড’ হই
একবারও-কি ভেবে দেখি- সে-কি কেবল মনের বে-খেয়ালে নাম ধরে
ডেকেছে কিংবা শুধুই স্মৃতির কারণে রেখেছে মনে নাম?
ভাব কিংবা ভঙ্গির কিছুটা কি মুখস্থ করেনি?
কল্পনার রাজ্যে কি ভাসায়নি ভাসানটেকের ডোবায় বেঁধে-রাখা ডিঙি-নৌকা?
-বেহুলার জন্য লখিন্দরের কি কোনো কামনা জাগেনি কোনোকালে?
খানিক পরিসরের নিরিবিলি পায়চারির ফাঁকে কি সে দেখেনি চুল-চোখ-চিবুক
চাওয়া-না-চাওয়ার বাঁক ও বাতাস?
প্রশান্ত চোখের ছায়ায় কিংবা নবতর নিতম্বের মায়ায় সে কি অনুভব করেনি
কোনো গভীর না-বলা-কথার ঢেউ?
সমস্ত শরীরের শোভা কি পুরু চশমার কাঁচে লেপে দিয়ে গেছে ঘন কুয়াশা ঘাম?

-সামান্য, কিন্তু কী প্রশস্ত-প্রবল সে প্রথম-পরিচয়!
…………………………………………..

কেবলই হেরে যাই

নারকেলকোরা আর মুড়ি যখন তোমার সান্ধ্যকালীন খাদ্য
পাশে প্রেমিক-পুরুষের পুরু লেন্সের ভালোবাসা-
তখন আমি ফ্লাইওভারে- উড়ে চলি আদিগন্ত
অবশ্য যদিও হাওয়ায় দোলার গল্প ভবিতব্যের ওপরে ছেড়ে
দিয়ে আমরা পার করেছি কিছুই-না-ঘটা সামান্য অতীত
-‘ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে?’

শুকনো রুটি ডানহাতে- বামদিকের বাটিতে রাখা সবজিতে
চুবিয়ে অতঃপর চিবিয়ে চিবিয়ে খাও তুমি
কী নীরস- কিন্তু কী অপূর্ব!
স্কিন কালারের কামিজ তোমার সমস্ত শরীরের
দখল নিয়েছে- হয়তো ছেড়ে যাবে সন্ধ্যার অন্ধকার
নেমে আসার পরই- ফিরে যাবে ফের নিজস্ব বিবরে
তুমি বললে: ‘এখন কোথায় যাবেন?’

বনলতা, আমরা ‘ওহ!’ কিংবা ‘সরি’ বলে
‘বিজি’ হয়ে পড়ি প্রতিদিন
পেছনে পড়ে থাকে চন্দ্রিমা ও দ্রাঘিমারা
সমস্ত অনুষঙ্গগুলো কেবল হেসে ওঠে আমাদের অসহায়ত্বে
আমরা পেরোতে পারি না হীমশীতল দেয়াল
ভেতরে ভেতরে পরাধীনতা আর পরাজিতের
লজ্জাকে ঢেকে রাখি- আলো ছেড়ে অন্তরালে যে দাঁড়ানো যায়
তার ছিটেফোঁটাও ভেবে দেখি না।

বনলতা, তুমি তো জানো- আমরা কেবলই হেরে যাই।
…………………………………………..

অচেনা মানুষ

সামাজিক ব্যবসার প্রসারে এখন বিশ্বব্যাপী হৃদয়ের
বাণিজ্যের বড়বেশি মন্দা হাপিত্যেশ চতুর্দিকে
তবু লিফটের ৩০ সেকেন্ড অথবা ফোনালাপে
কিশোরগঞ্জ কাশেম স্যার কখনো কখনো প্রাধান্য পায়
গাজীপুরের জমিদারিত্ব কিংবা নিউ মডেলের না-শোনা
কাহিনি পড়ে থাকে কন্ঠস্বরের আড়ালে
মাঝেমধ্যে টিভিতে দেখা লোকগুলোকে সামনা-সামনি
দেখে ভালো লাগে, ভালো লাগে ফোনে কিংবা কানে
কথার কিছু আওয়াজ- কিছু ‘ধান্দা’র শব্দ ভাসে
এদিকে-ওদিকে।

অচেনা মানুষ কেন যে চেনা হয়ে যায় মনে মনে
ভেবে কোনো কিনারা মেলে না!
কাউকে চিনিয়ে দেবার ছলনার আশ্রয় নিতে হয়
সরাসরি কি সব কথা বলা যায়?
সরাসরি কী আর করতে পারে মানুষ!
থাকে কিছু ‘রিন’ কখনো পঁচাশি
কখনোবা নভেম্বরের প্রথম ভোর!

প্রশিক্ষণ কি খুব বেশি ভালো লাগে?
কিংবা শাশুড়ির মৃত্যুযাত্রা-
খালা কিংবা বড়োমামারা সবসময় ব্যস্ত সময়
কাটিয়ে জীবনের স্বপ্ন ও সাধ চুরমার করতে থাকে
শীতের রাতে, বিছানার উষ্ণতায় কিংবা মেঝেয়
পড়েথাকা স্মৃতিরা কেবল কাতরায়।

মানুষ সত্যিই কি অচেনা থেকে যায়?
আগে থেকে কে-ই-বা কাকে চিনে রাখে?
সবইতো তাহলে প্রকৃতির খেলা!
সবইতো তাহলে বিধাতার ‘মার্কেটিং’!!
…………………………………………..

অবিরাম অশ্রু

চৈত্রের এক নীরব প্রহরে তুমি বৈশাখের ঝড় হয়ে এলে
তোমার গায়ে তখন সবুজের মাখামাখি
তুমি তখন সারা বাংলাদেশ
সবুজ উঠানে বৃষ্টিস্নাত সদ্য লাল গোলাপ!

ধানসিঁড়ি পেরিয়ে মেঘনার ঢল হাতে নিয়ে চরম চৈত্রে
নামিয়ে দিলে বৈশাখের তাণ্ডব
চুল নখ আর চিবুকে আলোড়ন তুলে সারারাত বৃষ্টি হলো
সারা শহরে বৃষ্টি
বাতাসের সব দুর্গন্ধ লোপাট করে নামিয়ে দিলে
শান্তির হিমেল পর্দা!

সন্ধ্যা নামার আগেই তোমার নামে বৃষ্টি এলো
শাদা শাদা শিল জানালার কাঁচে আওয়াজ দিয়ে জানিয়ে
দিল অশ্রুর অবিরল ধারা-
ফাল্গুলের হলুদ তখন তোমার বড় বড় চোখের সরলতা
লুফে আমাদের নীল আকাশে তুলে দিল কথার পতাকা

কী এক কাঁপন-ধরা গলায় বলে গেলে তুমি বৃষ্টির কবিতা
জীবনানন্দের কবিতা শুনে যেন কবে কোনকালে তুমি
বলেছিলে- অপূর্ব ! অপূর্ব ! অপূর্ব !
‘এই নারী অপরূপ- খুঁজে পাবে নক্ষত্রের তীরে’-
কথাগুলো নাকি কবি তোমাকে দেখে দেখে লিখেছিলো
নলখাগড়ার মিহি কলমে

তুমি এলে- একরাশ বৃষ্টি সাথে নিয়ে
তুমি এলে- চারিদিকের অপবিত্রতা মলিনতা বিষণ্নতা
মুঝে ফেলার অশ্রু বুকে নিয়ে
চুম্বকের মতো কী এক আকর্ষণে টেনে নিলে আমার অস্তিত্ব
চোষক কাগজের মতো কী নিষ্ঠুরের মতো চুষে নিলে
আমার ঠোঁটের সমস্ত সাহস ও নিঃসঙ্গতা

তুমি যখন ছিলে না, তখন জানাও ছিল না ঝড় মানে কী
বৃষ্টি হলে কেন মন খারাপ হয়, তাও কখনো মনে হয়নি
ঝড় যে মানুষের জন্য আনন্দের অশ্রু বয়ে আনতে পারে
তাও কখনো ভাবা হয়নি।
তুমি এলে-
ইলেকট্রিসিটি চলে-যাওয়া এক অন্ধকার সন্ধ্যায় তোমার
চার্জ-না-থাকা সেলফোনে গোলাপের কোমল কণ্ঠে
তোমাকে আবিষ্কার করলাম।
তুমি এলে । তোমার আসার কোনো শেষ নেই।
তোমার চলে যাবার কোন পথ নেই।
চৈত্রের শূন্যতায় আমাকে শুষে শুষে তুমি মিলিয়ে যাবে
কোনো এক অজানা অচেনা নীল দিগন্তে!
…………………………………………..

প্রেমিকা ও পিচ্ছিল বাঁশের গণিত

পিচ্ছিল বাঁশ বেয়ে টার্গেটে পৌঁছুতে ঘোরলাগা
বানরের কতদিন লাগে?
কবি কি কবিতা লেখার জন্য প্রতিদিন কাব্যলক্ষী খুঁজে বেড়ায়?
অথবা ভালোলাগা কোনো নারী-
শেখার যেমন কোনো শেষ নেই প্রশিক্ষণেরও
জানা বা চেনার শেষে থাকে মৃত্যু-
সবুজের দুপাশে হয়তো হালকা বেগুনির ছোঁয়া কারো চোখে
তেমন ধরা পড়ে না
কিংবা কবির উলঙ্গ কবিতায় থাকে পিচ্ছিল পথ পাড়ি দেবার
নিপুণ কলা ও কৌশল।
মার্কিন ‘দশ্যু’র অবিনাশী হামলা কিংবা শিশুর ক্রন্দনের
আওয়াজ ও অশ্রুধারা দুহাতে সরিয়ে জীবনের বৈঠা আর
কতদূর চালানো যায়!
‘অমল ধবল পালে’ কি সব সময় ‘মন্দ মধুর হাওয়া’ লাগে?
লাগে না।

নারীর উরুতে পুরুষের কামড়ের দাগ হয়তো লেগে থাকে
কারো বা থাকে না। সব পুরুষ কি আর পুরুষ!
কেউ কেউ ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে গোপন লিপস্টিক বের করে
লাগিয়ে নেয় ঠোঁটে, চিরুণীর হালকা হাওয়াও বয়ে যায় চুলে
শাড়ি পরিপাটি- ভাঁজ খোলে না একটুও,
ম্যাঁড়মেড়ে জীবনে লাগে না ধবল কোনো দাগ।
আইনের ফাঁকে ডুবে থাকে নিজের প্রাপ্য ভাগ।

প্রেমিকারা সতর্ক হয়। সুন্দরীও। মামলা কখনো করে না গ্রাস
কেবল পথকে পিচ্ছিল ভেবে ভয় পেয়ে পালায় ভিতু
শেয়ালের মতো।
অথবা গণিতে পাকা রমণী কখনো প্রেমে পড়ে না।
…………………………………………..

প্রজাপতি

দুধের বাটিগুলোতে এখন আর মাছি বসে না
প্রজাপতি ওড়ে
‘প্রজাপতি মন’ খুঁজে ফেরে কালো গাই ও তার গোয়াল
কিন্তু সবতো শাদা শাদা
দুধ আর কফি এখন সহজেই আলাদা করা যায়।

অফিস আছে ফাইল আছে মাছি মারা কেরানি নেই
উত্তর কিংবা দক্ষিণ সিটিতে ঢুকে পড়েছে মাছি নিধন প্রকল্প
এই কথা খবরের কাগজে ও রেডিও-টিভিতে প্রচার হলে
ঠোঁটগুলো সব কমলালেবুর মতো নয়টি দাঁত বের করে
হাসতে থাকে অবিরাম
রমণীগুলো চায়ে চুমুক দিয়ে তাকাতে থাকে ওপরের দিকে
কোটপড়া বিবর্ণ পুরুষেরা পাশ দিয়ে যাবার সময়
আড়চোখে দেখার চেষ্টা করে পেটিকোটের আভা
আর ওপর থেকে নারীর হরিণচোখে চোখ রাখে
পরীক্ষিত পুরুষ!

প্রজাপতিরা উড়তে থাকে দুধভরা বাটির চারপাশে
গলায় ও বুকে অশ্রু মিশিয়ে বলে-
‘দরোজা বন্ধ কেন, এরা সব গেল কোথায়?’
আমরাতো দরোজার বাইরে দাঁড়ানো।

দরোজায় তালা ঝুলিয়ে সেই কবে সাত সমুদ্রের ওপারে
পাড়ি দিয়েছে ইংরেজ নাগরিক
স্বদেশের সব প্রজাপতি ও পরীক্ষিত পুরুষর অন্দরে প্রবেশের
পথ খুঁজতে থাকে সকালে ও সন্ধ্যায়!
…………………………………………..

আমাদের বারান্দা ও ওকাম্পোর বাগান

আমাদের বারান্দাগুলো কেমন যেন ঘোরানো-প্যাঁচানো
আয়েশ করে দাঁড়াবার জায়গাটুকু পর্যন্ত নেই
বাচ্চাগুলো গাছ থেকে সদ্য পেড়ে আনা ছোট ছোট
কাঁচা আম টিস্যু পেপারে জড়িয়ে
ট্যাপের পানিতে ধোবার জন্য সামনে এগিয়ে যায়
কেন যে বারান্দায় কোনো পানির কল স্থাপন করেনি প্রকৌশলী
কিংবা রাজমিস্ত্রি!

বারান্দায় পায়চারি করতে গেলে
কারো হাতে হালকা স্পর্শ করতে চাইলে
শাদা কপোলে আঙুলের আলতো টোকা দিতে ইচ্ছে করলে
দড়িতে ঝুলতে থাকা ভেজা লুঙ্গি আর পেটিকোটের পানির ছিটা
এসে পড়ে নিবিড় দুজনের মাঝ বরাবার-

কেবল বারান্দা কেন-
আমাদের বাড়িটার পরিসরও খুব ছোট
দু-চার পা হাঁটতেই প্রাচীরে ঠেকে পা
এদিক-ওদিক আর কতক্ষণ করা যায়
বিকেল গড়িয়ে দ্রুত সন্ধ্যা নামে তোমার নামে
বারান্দার ছোট্ট পরিসরে ভিরু চোখের
লুকোচুরি খেলায় যুক্ত হয় নিতম্বের নীরব নৃত্যকলা
ঢেউ খেলে চলে যায় বারান্দা পেরিয়ে
নিঃসঙ্গ কোনো ঘড়ির দিকে-
যেখানে শশীরা সব অশ্রু হয়ে যায়
প্রতিপক্ষ যেখানে পূর্ণিমা-আকাশে ঘুরে বেড়ায় নিঃশঙ্কোচে
আর আগন্তুক বৃষ্টিরা বন্ধু।

এক অপরূপ পেইন্টিং-এর সামনে দাঁড়িয়ে আধা-বোদ্ধা
আর্ট-ক্রিটিকের মতো
তোমার চঞ্চলতার দিকে তাকিয়ে থাকি মিনিটের পর মিনিট
এক পা সিঁড়িতে অন্য পা বাড়িতে তোমার-
আমি তখন পাখির চোখে পৃথিবীটাকে দেখি
এমনকি তোমাকেও।

আমাকে কেউ পাখির চোখে দেখে কিনা আজও জানা হয়নি।

বরীন্দ্রনাথ ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর বারান্দায় বসে দেখেছিলেন
লা প্লাভা নদীর নিটোল পানির ধারা
‘ভিলা ওকাম্পো’র বারান্দা আজও রবির প্রেমের অপার নিশানা
২৯ বছর বয়সের ফারাক ছিল দুজনের
বন্ধুত্বে ফাঁক ছিলো না একতিলও।
বারান্দায় কিংবা বাগানে পাশাপাশি বসে-হেঁটে পাখি দেখেছিলো
রবীন্দ্রনাথ ও আর্জেন্টিনার ওকাম্পো।
আমাদের বারান্দার ঘোর-প্যাঁচের ভেতর থেকে কি আর
দূরের গাছে বসা পাখি আদৌ দেখা যায়!
আর মধুমতি-শীতলক্ষা-আড়িয়াল খাঁ-রা তো সেই কবে চলে
গেছে বারান্দার ওপারে।
দুটোই বারান্দা- ওকাম্পোর আর আমাদের
তবে মিল নেই কোথাও!
দুটোই বাগান- আমাদের আম্রকানন আর ওকাম্পোদের
অচিন বৃক্ষ
কিন্তু ফারাক প্রায় শত শত অনুভবের।