মধ্যযুগে গদ্যনির্ভর কথাসাহিত্য বা গল্পসাহিত্যের প্রচলন না থাকলেও আখ্যানকাব্য বা কাহিনীকাব্যের প্রচলন ছিল। এ কাহিনীকাব্যের পথ ধরেই সূচনা ঘটে আধুনিক গদ্যনির্ভর কথাসাহিত্যের। আধুনিক কথাসাহিত্য মূলত তিন ভাগে বিভক্ত: ১. উপন্যাস, ২. বড়গল্প, ৩. ছোটগল্প।
প্যারীচাঁদ মিত্র, কালীপ্রসন্ন সিংহের হাত দিয়ে গদ্যরীতিতে লেখা কথাসাহিত্যের উন্মেষ ঘটে, বক্সিকমচন্দ্র, মীর মশাররফ হোসেন, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র প্রমুখের হাতে যার আত্যন্তিক বিকাশ ঘটে। বাংলা সাহিত্যে ছোটগল্প রচনার সূত্রপাত মূলত রবীন্দ্রনাথের হাতে। এক্ষেত্রে তাঁর সার্থকতাও সুবিদিত। প্রবল শক্তিমত্ত ও বিরল প্রতিভাধর এ কবিসত্তার সৃষ্টিশীলতা বহুমাত্রিকতায় শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করে বিভাসিত হয়ে ওঠে। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ একদিকে তাঁর কাব্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী শিল্প-সুষমা নিয়ে বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে তীব্র আলো বিকিরণ করেছেন, একই সাথে তিনি একজন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্প-রচয়িতা ও সাহিত্যের অন্যান্য শাখায়ও বিপুল অবদান রাখেন এবং সফলতা অর্জন করেন।
উপন্যাস জীবনের ভাঙাগড়া, আবেগ-অনুভূতির সংলাপনির্ভর ঘটনার বিবরণ। এতে মূল চরিত্রকে ঘিরে অন্যান্য অসংখ্য চরিত্র, ঘটনা, সময় ও সমাজের নিবিড় চালচিত্র দানা বেঁধে ওঠে। উপন্যাসের অবয়ব গড়ে ওঠে মূল-শেকড় থেকে কাণ্ড-শাখা-প্রশাখা বিস্তৃতি লাভ করে। অন্যদিকে গল্প হচ্ছে জীবনের খন্ডিত রূপ, বিশেষ কোন ঘটনা বা পরিবেশ-প্রতিবেশকে কেন্দ্র করে। এ গল্পও কালের প্রবহমানতায় নানাবিধ নাম পেয়েছে। যেমন-বড়গল্প, ছোটগল্প, মিনিগল্প, অনুগল্প প্রভৃতি।
বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথই ছোটগল্পের জনক হিসেবে খ্যাত এবং তাঁর প্রদত্ত ‘ছোট প্রাণ ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখকথা’-এ নির্দেশনাই আধুনিক গল্পকারদের প্রণোদনা বা আদর্শ। দৈনন্দিনতার খন্ড খন্ড অংশ নিয়েই গড়ে ওঠে পূর্ণাঙ্গ মানবজীবন। জীবনের ছোট ছোট আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রাপ্তি-বঞ্চনা দাগ কেটে যায় কালের অক্ষরে। জীবনঘনিষ্ঠ লেখক কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনের সেইসব মিশ্র অনুভবকে নিবিড়ভাবে উপলদ্ধি করে শব্দচিত্রে রূপ দিয়ে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ছোটগল্প। এসব গল্পে সৃষ্ট প্রণোদনা পাঠকদের সাথে সাথে উত্তরকালের অনেক কবিকেই বিমুগ্ধ আকর্ষণে টেনে নিয়েছে, অভিষেক ঘটিয়েছে গল্প রচনার ভিন্ন আরেক ভুবনে। রবীন্দ্রনাথের পরে আরো অনেকেই ছোটগল্প রচনায় ব্যাপক অবদান রেখেছেন ও সাফল্য লাভ করেছেন। রবীন্দ্র-পরবর্তী শ্রেষ্ঠ কবি প্রতিভা কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। তুলনামূলকভাবে ফররুখের অবদান এক্ষেত্রে যথেষ্ঠ না হলেও ছোটগল্প রচনায় তাঁর যে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে, প্রসঙ্গগত এখানে সে বিষয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়াস পাবো।
ফররুখ আহমদ মূলত কবি। তবে প্রথম জীবনে কবিতা রচনার ফাঁকে ফাঁকে তিনি কয়েকটি গল্প রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। এ পর্যন্ত তাঁর পাঁচটি ছোটগল্পের সন্ধান পাওয়া গেছে। তারমধ্যে ‘মৃত বসুধা’ অন্যতম। ফররুখ গল্প রচনা-প্রয়াসে কতটা সফল হয়েছেন, তা তর্কসাপেক্ষ ব্যাপার। এক্ষেত্রে নির্মোহতার নিরিখে একথা বলা যায়, ছোটগল্পে অন্তত রবীন্দ্রনাথের মত এতটা সার্থকতার পরিচয় দিতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। যদিও ভিন্নতর সাহিত্য-উপাদানের চর্চায় তাঁর নিরীক্ষাধর্মিতা একেবারে এক ফুৎকারে উড়িয়ে দেবারও নয়।
আধুনিক সাহিত্যধারায় ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে কবি ফররুখ আহমদের স্বল্প বিচরণকেও এ প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করাই মনে হয় যুক্তিসিদ্ধ ও সুবিবেচনাপ্রসূত। অন্যথায়, আবেগান্ধ মূল্যায়ন একদেশদর্শী হতে বাধ্য। একথা সত্যি যে, বাংলা সাহিত্যে কবি ফররুখ আহমদ অত্যুজ্জ্বল অনন্য এক নাম। মৌলিক সৃজনশীলতা, নিরাপোষ আদর্শবাদিতা, সুনিপুণ শিল্পকুশলতা, স্বাতন্ত্র্যিক কাব্যভাষার সফল নির্মাতা ছিলেন তিনি। স্বর্ণালী ইতিহাসের প্রোজ্জ্বল মিথ রোমান্টিক স্বপ্নচারিতায় জারিত করে তিনি যে রঙিন মখমল বয়ন করেছিলেন, তার তুলনা বিরল। বালুকাবেলা, মরূদ্যান, খেজুরবীথিকা, বেদুঈন, সাইমুম ঝড়ের খোয়ারের সাথে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার যে মিলন-মিতালী তিনি ঘটিয়েছেন অপূর্ব দক্ষতায়, তা এক কথায় অনন্য। বাংলা সাহিত্যে এর দৃষ্টান্ত মেলা ভার।
বাংলা-বিযুবের কবিতায় এ আলোর পাখি গল্পের অঙ্গনেও বিচ্ছূরণ ঘটাতে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে বৈ কি। তাঁর সে পক্ষ-সঞ্চারী সক্ষম প্রয়াসে জন্ম নিয়েছে ‘মৃতু বসুধা’, ‘বিবর্ণ’, ‘অন্তর্লীন’, ‘যে পুতুল ডলির মা’ ও ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’র মত গল্পসমূহ। যদিও ফররুখের গল্পলেখক হয়ে ওঠার অনুশীলন-নিরীক্ষা দীর্ঘকাল চলেনি। তিনি মাত্র কয়েকটি গল্প লেখার পর একাজে বিরতি দিয়েছেন। পরবর্তী জীবনে তাঁকে আর কখনো গল্প লেখায় মনোযোগী হতে দেখা যায় নি। অবশ্য জীবনের গল্প তিনি সবর্দাই ভিন্নমাত্রায় ও ভিন্নআঙ্গিকে পরিবেশেন করার প্রয়াস পেয়েছেন। তাঁর রচিত বিখ্যাত ‘হাতেম তা’য়ী’, ‘হাবেদা মরুর কাহিনী’, ‘ঐতিহাসিক অনৈতিহাসিক কাব্য’, ‘তসবিরনামা’, ‘সিকান্দার শা-র ঘোড়া’(অসমাপ্ত উপন্যাস) ইত্যাদি তারই উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কারণ, ফররুখের রোমান্টিক চিন্তা-কল্পনা ও জীবনবাদী ভাবনা কাব্য রচনার অধিকতর উপযোগী ছিলো। তাই পরবর্তীকালে তিনি কবিতা রচনায় অধিকতর স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেছন। তাঁর পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ে হয়ত ধরা পড়েছিল আরবি প্রবাদের সেই ভাষ্যটি- ‘লি কুল্লি ফানিন্ রিজাল’-অর্থাৎ প্রত্যেক বিষয়ের জন্য পৃথক লোক রয়েছে/সব কাজ সবার দ্বারা যথাযথভাবে হয় না।
কাব্যজগতের দিগন্ত ডিঙিয়ে সীমাহীন সীমানায় উড়াল দেওয়ার যে অদম্য ক্ষমতা ফররুখের ছিল, তার খুব কমই গল্পের সৃষ্টি-প্রয়াসে কাজে লাগাতে পেরেছেন। তাঁর এ সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় রেখেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, তিনি গল্পের পটভূমি নির্মাণে যথেষ্ট সচেতনতার পরিচয় দিতে পেরেছেন। এ সচেতন-প্রয়াসের পরিচয় মেলে লেখকের ‘মৃত বসুধা’ গল্পেও।
ফররুখের কাব্যধারার মূল সুর মানবতাবাদ। জড়ত্বের শৃঙ্খল থেকে মানুষের মুক্তি, আত্মার মুক্তির তিনি ছিলেন দুঃসাহসী দরদী নকীব। বস্তুবাদ, ভোগবাদিতা, জৈবিক তৃপ্তি উদ্গ্র প্রয়াসের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাঁর বহু কবিতা, বিশেষত ব্যঙ্গকবিতায় এ প্রয়াস লক্ষণীয়। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, জগতের সকল অশান্তির মূলেই রয়েছে উৎপীড়ন, অধিকার বঞ্ছনা, মানবতা ও মানবাত্মার লাঞ্ছনা। বন্দী মানবাত্মার এ বেদনার্ত হাহাকার তিনি তাঁর সংবেদী সত্তায় অনুভব করেছিলেন। যার বিশ্বস্ত পরিচয় মেলে তাঁর ‘মৃত বসুধা’ গল্পটিতে।
ফররুখ আহদের ‘মৃত বসুধা’ গল্পটি কলকাতা থেকে মোহাম্মদ আকরম খাঁ সম্পাদিত ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকার কার্তিক ১৩৪৪ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়। এতে চরিত্র হিসেবে এসেছে খন্দকার রউফ, তদীয় স্ত্রী সুফিয়া, রাহেলা, পাঁচীর মা, লতিফা, ফরিদ ও একটি ঘোড়া। পরোক্ষে এসেছে এক দঙ্গল জীর্ণতাগ্রস্ত বৃদ্ধ ও খন্দকারের সহযোগী কিছু পাপাচারী প্রজা।
ফররুখের কাব্যভাষায় যেমন ছিল বিভ্রান্ততাড়িত মানুষের পথ দেখানো; এ গল্পের পথনির্দেশ প্রয়াস জোরালোভাবে লক্ষণীয়। এ গল্প রচনাকালে এদেশ ছিল বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের যাঁতাকলে নিপিষ্টতায় অন্তলগ্নপ্রায়। শতাব্দীকাল আগে থেকেই বিদেশী বেনিয়াদের পদলেহন করে এ বাংলার ভূগোলময় গজিয়ে উঠেছিল শত শত রাজা, জমিদার, তালুকদার শ্রেণী। এরা বিদেশী শক্তিমান তস্করদের তোয়াজ তোষামোদ করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সচেষ্ট ছিল। তাদের মনোরঞ্জন করতে অর্থ-বিত্ত, কর-খাজনা, ভেট-বেগার, নারী-তাড়িসহযোগে সর্বোত-প্রয়াসের কমতি ছিলনা। একদিকে জলসাঘরে নূপুরের নিক্কন, শরীর-সুরাহী, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উপর আরো অসহনীয় করের বোঝা। প্রবল-প্রমত্ত রাজা-প্রজাদের থেকে শুরু করে খুচরা জমিদার-তালুকদার-কারোই ভোগবাদিতার ঘাটতি ছিল না। শক্তিহীন অসহায় কৃষক প্রজাদের বউ-ঝিরা পর্যন্ত ছিল তাদের নোংরা-নষ্ট তৎপরতার উপচার-উপকরণ।
উন্মত্ত যৌবনের দুর্বিনীত ক্ষুধা অবলীলায় মিটিয়ে গেছে যেসব উদ্ধত শক্তি, জীবনের পড়ন্তবেলায় তার দীর্ঘশ্বাস সময় হিসাব-নিকেশ করছে; হিসাব মেলাতে চাইছে, তাদের একদার দোসর পাপিষ্ঠ প্রজাসমষ্টি। বিগত যৌবনের আক্ষেপ এ ধূসর বার্ধক্যে এসে চিত্তবিক্ষেপ ঘটায়। এখানে সৃষ্টি নেই, তারণ্য নেই। বহুবর্ষী নিসর্গ-অটবিও এদের মৌনসাক্ষী হয়। ‘মৃত বসুধা’য় ফররুখ আহমদের পটভূমি চিত্রণ এখানে উল্লেখ করার মত। লেখকের বর্ণনা-
“নদীর ঘাটে প্রাচীন অশ্বথের তলায় বৈকালিক আসর বসে গ্রাম্য বৃদ্ধদের। যারা পা বাড়িয়েছে মৃত্যুর কোঠায়, যারা এসে পৌঁছেছে জীবনের সীমান্তে, সেই বিশ্রামের শেষ আসর এখানে। ”
এখানে ‘নদীর ঘাট’ পরপারের পারাপার প্রতীকে চিত্রায়িত ‘প্রাচীন অশ্বথ’ বার্ধক্যের ইঙ্গিত, বৈকালিক আসর জীবনের পড়ন্তবেলা নির্দেশিত। জীবনের সীমান্তে আসা গ্রাম্য বৃদ্ধরা বিশ্রামের শেষ আসর বসিয়েছে এখানে। এরা কি জীবন নদী পার হয়ে ওপারে যেতে সক্ষম হবে? এ সংশয়ের জবাব পরক্ষণেই লেখক দিয়েছেন এভাবে-
“নতুন কথা বলা, নতুন পথে চলা এদের নিষেধ। তাই পুরাতনের দিকে এদের নজর পড়ে বেশী।… অনেক দিন আগে ঝড় উঠেছিল এদের জীবনে। সে ঝড় সম্পূর্ণ শান্ত হয়ে গেছে। তার দৌরাত্ম্য নাই। শক্তি নাই-এমনকি উপদ্রবের চিহ্ন পর্যন্ত নাই। সব শেষ হয়ে গেছে। এখন আছে উদ্যমহীন শেষ অপেক্ষা।”
এই হচ্ছে যৌবনের মত মহামূল্যবান সম্পদের অপচয়ের অনিবার্য পরিণতি। লেখক এদের অক্ষমতা-অথর্বতাকে তর্জনী উঁচিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। এদের সৃষ্টিশীলতা নেই, আশাপ্রদ কোন ভবিষ্যতের দিকে তাকাবার শক্তিও নেই। এদের নজর পেছন দিকে। উদ্দাম তারুণ্যের সকল ক্ষমতা তিরোহিত। এরা এখন বিলীনের অপেক্ষায়। এদের সঞ্চয়, সৃষ্টি কিছুই নেই।
লেখক এখানে যৌবন ও বার্ধক্যের তুলনামূলক চিত্র অপূর্ব কুশলতায় তুলে ধরেছেন। তিনি এ-ও তুলে ধরেছেন যে, এরা জীবনের অন্তিমক্ষণে উপনীত হয়েও আপন পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য অনুতাপ করে না; করে গতায়ূ যৌবনের জন্য। লেখক বলেন-
“অতীতের ভুলের জন্য এরা অনুতাপ করে কঠোর প্রায়শ্চিত্তের মধ্য দিয়ে, কিন্তু বোঝে না যে সে অনুতাপ বার্ধক্যের,-পাপের নয়্”
এ ব্যর্থ-জনম প্রজাকুলের প্রতিভূ-পুরুষ ‘মৃত বসুধা’ গল্পের জড়াক্লান্ত নায়ক খন্দকার রউফ সাহেব ক্ষয়িষ্ণু সামন্ত সমাজের ক্ষুদ্র এক সংস্করণ। তিনি এখানে অক্ষয়-অসহায় এক ট্র্যাজিক হিরো। যিনি একদার অবারিত যৌবনের মদালসায় মন্ডরমণীমোহন এ ক্ষুদ্রকায় সামন্ত-প্রতিভূ-তার পাপ-ভ্রষ্টতার মাশুল গণনায় বড় বেশি ক্লান্ত আজ। লেখকের ভাষ্য-
“এদের দলের একজন-সোনাগাঁয়ের বৃদ্ধ রউফ সাহেব। তাঁর দীর্ঘ শ্বেত শ্মাশ্র“, শ্বেতবসান যেন বার্ধক্যের ধূসর চিন্তা। তাঁকে দেখলে মনে ভক্তি আসতে পারে। অনেক ঝড়-ঝাপ্টা পাড়ি দিয়ে তাঁর জীবন সেই বন্দরে এসে লেগেছে, যেখান থেকে কৃষ্ণতর মৃত্যু ছাড়া আর কিছু দেখা যায় না। মরণ-মোহনার আশাহীন সৈকতে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ত আর কিছ দেখতে চান নাই, মৃত্যুর জন্যই হয়ত নীরবে অপেক্ষা কর্চ্ছিলেন। কিন্তু সে মরণ এত পীড়াদয়ক তা কে জানত। … তাঁর জীবন বর্তমানে প্রাচীন মৃত্তিকার মত শস্যহীন, অনুর্বর। সেখানে ফুল ফুটে না, ফসল উৎপন্ন হয় না।”
পাশ্চিমা বিষাক্ত পুঁজিবাদের বঙ্গ-ভারতীয় উপজাত এ শ্যাওলা পড়া জং ধরা জামিদারতন্ত্রের আর সে মৃত্যুও যে খুব একটা সুখের নয়, বরং ভয়ানক রকমের পীড়াদায়ক, তা চিহ্নিত করতে তিনি একেবারেই দ্বিধাগ্রস্ত হন নি। গল্পের নায়ক রউফ সাহেব যৌবনের ‘অপরিমিত শক্তি অসামান্য সৌন্দর্য’ নিয়ে তাকে ভোগ করেছেন পূর্ণমাত্রায়। লেখকের ভাষায়-
“শয়তানের হাতে বন্দী মানবের মত তিনি ছিলেন যৌবনসঙ্গী অসহায়।” তিনি যখন ‘ইস্পাতের মত দৃঢ়, দেওদারের মত উন্নত শীর্ষ’ পূর্ণ যুবক, তখন তাঁর ‘শক্তিশালী দুঃসাহসী এবং সুপুরুষ’ খ্যাতি ছিল। “কিন্তু সে খ্যাতি আশে-পাশের লোকের কাছে বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছিল অবাধ চারিত্রহীনতার জন্য। তাঁর মত সিদ্ধহস্ত শিকারী ছিল না আর কেউ এ অঞ্চলে।” উপযুক্ত বযসে তার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু স্ত্রী সুফিয়ার প্রতি তার তেমন টান ছিল না; মধ্যরাতে তিনি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে যেমেন তাঁর অবাধে অপরিমিত ভোগাকাক্সক্ষা নিবৃত্তির জন্য। তার এই বৈবিকতার তৃষ্ণা মেটাবার সহযোগী ছিল তারই কতিপয় দুশ্চরিত্র প্রজা। এরা তার যৌব-তৃষ্ণা মেটাবার খোরাকির যোগান দিত কোন না কোন হতভাগী কৃষক-কন্যাকে উঠিয়ে এনে। তাদেরই একজন রাহেলা। সে বহু কাকুতি-মিনতি করেছে তার ইজ্জত ভিক্ষা দেওয়ার জন্য দুশ্চরিত্র রউফ তাতে কর্ণপাত করে নি। পূত-পবিত্র এক পল্লীবালার সমস্ত সম্ভ্রম লুট হয়ে গেল নির্লজ্জ এক দানবীয় শক্তির কাছে। ত্রস্ত-চকিত দৌড়ক্লান্ত এক হরিনী-শাবক আত্মসমর্পণ করল ক্ষুধার্ত এক নেকড়ের কাছে। এ যেন কুষ্টিয়ার নীলকর রেনী আর ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যানে’র আরেক সংস্করণ।
এ নির্লজ্জতার কাহিনী এলাকাময় চাউর হয়ে গেলেও প্রতিকারের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস নিতে পারে নি কেউ। লজ্জায় রউফ-পত্নী সুফিয়া নিজ গায়ে কোরোসিন ঢেলে আগুন দিয়ে ভবলীলা সাঙ্গ করে। নিহত বধুর বৃদ্ধা শ্বাশুড়ি পুত্রের লাম্পট্য-কলঙ্ক দেখে শয্যাশায়ী হয়ে শেষ নিঃশাষ ত্যাগ করে। অন্যদিকে অর্থ-বিত্ত-প্রাচুর্যের দৈন্যতায় একে একে সকল কর্মচারী কেটে পড়ে। কেবল থেকে যায় অর্ধবৃদ্ধ কাজের মহিলা-পাঁটীর মা।
একদিকে বিত্তশালী রউফ সংসার, সমাজ-ধর্মীয় অনুশাসনের তোয়াক্কা না করে রাহেলাকে প্রতিনিয়ত লুট করে। যদিও রাহেলা তাকে ঠিক পছন্দ করে না বরং ঘৃণাই করে; তবু অসহায় অক্ষমতাকে নিয়তির লিখন বলে মেনে নেয়। ইতিমধ্যেই রাহেলা সন্তান-সম্ভাবা হয়ে পড়ে। বিষয়টি রউফ সাহেবের অজানা থাকে না। তার ভেতরে কী এক বোধ জন্মে-তিনি রাহেলাকে বিয়ে করবেন, করে অনাগত শিশুটাকে স্বীকৃতি দেবেন। তিনি মুনশী সাহেবের কাছে এ ব্যাপারে আলাপ করেন। কিন্তু ঐ রাতেই রাহেলা অকালে এক সন্তানের জন্ম দিয়ে শাড়ির আঁচল গলায় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। এ বীভৎস দৃশ্য দেখে রউফ সাহেব ঠিক থাকতে পারেন নি। একসময়কার দুঃসাহসী এ ব্যক্তিটিও ঘটনার বিহবলতায় মূর্ছা যান। পরে অবশ্য তাঁর চেতনা ফিরে আসে।
পিতৃপরিচয়হীন এ শিশু-কন্যাটির জন্মদাতা যে তিনি নিজে, একথা তিনি মনে মনে স্বীকার করে নেন। তার পরিচর্যার ভার দেন গৃহপরিচারিকা পাঁচীর মা’র উপর। সে মাতৃস্নেহে পালন করে যায় অর্পিত দায়িত্ব। এ কন্যা লতিফার প্রতি জনকের সন্তানবাৎসল্য উপচে ওঠে, তার প্রতি পিতৃ-দায়িত্ব পালনে সদা সচেষ্ট থাকেন। কিন্তু লতিফার এ অপত্য স্নেহ সহ্য হয় না। সে জন্মদাতাকে ঘৃণা করে। সে ক্রমেই বেপরোয়া ও উদ্ধত হয়ে ওঠে। জানে তার নষ্ট জন্মের ঘৃণ্য কাহিনী। মনে হয়, রউফ সাহেবের অপবিত্র-অনাচারী মিলনের ফসল বলে লতিফার ভেতর দিযে বিষয়বৃক্ষের ডালপালা বিস্তার লাভ করে। ক্রমে লতিফা যৌবনবতী হয়। প্রবিবেশী যুবক ফরিদের প্রতি সে আকৃষ্ট হয়, ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে আসে। এ মেলামেশা রউফ সাহেবের পছন্ন হয় না। তিনি বার্ধক্যের অক্ষমতার ভেতরেও লতিফাকে শাসন করতে চান। কিন্তু পিতৃ-রক্তধারার উচ্ছ্বল অবাধ্যতা তাকে আরো দুর্বিনীত করে তুলে। একদিন রাত্রিতে পাঁচীর মা জানায়, লতিফাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সম্ভবত ফরিদ-সান্নিধ্যে মিশে গেছে। নিরুপায় নিঃসঙ্গ রউফ সাহেব আস্তাবলের দিকে এগিয়ে যান। বৃদ্ধ, অথর্ব, ক্ষুধার্ত ঘোড়াটির গায়ে, গলায় হাত বুলিয়ে দেন; একমুঠো খড় খেতেও দেন। কিন্তু হায় খেতেও পারছে না সে। যেন সে অক্ষম রউফ সাহেবেরই আরেক প্রতিরূপ। অশ্ব-সান্নিধ্যে আরো কিছুক্ষণ কাটিয়ে একটু রাত করেই তিনি নিজ বিছানায় ফিরে আসেন। কয়েকদিন ঠান্ডা আর কাশিতে দুর্বল হয়ে পড়েন। অবশেষে রক্তবমি করে একদিন মারা যান। মৃত্যুর পূর্বক্ষণে লতিফাকে ডাকেন। কিন্তু কোথায় লতিফা। লেখক দৃশ্যের সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে- “না, লতিফা আসে নাই- তার আসার প্রয়োজন নাই।”… ভোরের দিকে রউফ সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন চিরদিনে জন্য। বড়ো কষ্টকর তাঁর নিঃসঙ্গ জীবন-ক্লান্তি, অবসাদ আর নৈরাশ্যে ভরা।….নদীর পরাপারে মাঠখানি সম্পূর্ণ শস্যহীন হয়ে হাহাকার কর্চ্ছে। বোধ হয় ওখানে আর শস্য ফলবে না কোনদিন। বসুধা ওখানে মৃত-উৎপাদিকাশক্তিহীন।”
এভাবে বোধ হয় প্রাপ্ত হয় শেষ পরিণতি-অত্যাচারের, অবিচারের, অনাচার-অমানবিকতার। রউফ সাহেব যেমন ক্ষমতা আর প্রবৃত্তির দাস হয়ে দলে গেছেন অন্যের স্বপ্ন-সৌন্দর্য-অধিকারকে, মাড়িয়ে গেছেন সমাজ, ধর্ম, নৈতিকতাবোধকে; তেমনি সব হারানোর কষ্টকে পুঁজি করে তাকেও নিতে হয়েছে বিয়োগান্তক চিরবিদায়। মানবতার অবমাননার নির্মম নির্দেশে লেখক এখানে যথেষ্ট মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। লেখক ফররুখ আহমদের ‘মৃত বসুধা’ গল্পে কাহিনী, সময়, পরিবেশ আর পাত্র-পাত্রীদের বিকাশ ও পরিণতিকে সামন্তযুগের দৃশপটে যথেষ্ট সচেতনভাবে সংস্থাপিত করতে পেরেছেন। একদিকে বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের অন্তিম লগ্ন চলছে, পাশাপাশি তাদের পোষিত এদেশীয় পাপেট সামন্তগোষ্ঠীরও মরণঘন্টা বাজতে শুরু করেছে। শোষণ-নিপীড়ন, সীমাহীন অনাচার ও ভোগাকাক্সক্ষার নির্লজ্জ প্রদর্শনীতে সমাজের পঁচন দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। রউফ সাহেবের একদার যৌবন-উশৃঙ্খলতা বার্ধক্যের পড়ন্ত বেলাভূমে বিষণ্ন বেদনা গাঢ়তর হয়ে এসেছে। গার্হস্থ জীবনের পবিত্র নারী-স্ত্রী অথবা মায়ের প্রতি অবহেলা তাদের সাথে সংযোগ ছিন্ন করে চিরতরে। নাচারী ভোগের সামগ্রী লাঞ্ছিত নারীসত্তা জন্মের গ্লানি লুকোতে আত্মহননের পথ বেছে নেয়। নষ্ট জন্মের আত্মজা-ফসলও বার্ধক্যের নিঃসন্তঙ্গতায় বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অনিশ্চিতে যাত্রা করে। অক্ষম-অসহায় মুহূর্তে সঙ্গ নিতে একদার কৃকর্মের ভারবাহী অবোধ-নির্বাক পশু ঘোড়ার কাছে।
অধঃপতিত মানবসত্তা বুঝি প্রতীকী ও আক্ষরিক উভয় অর্থেই পশুর সমান্তরালে নেমে আসে। এ উষার অনুর্বর জীবন-মৃত্তিকায় সুস্থ-সুন্দর সজীব সম্ভাবনার কোন শস্য জন্মাবার উপযুক্ততা থাকে না। আর এর ভেতর দিয়েই আরেকবার প্রমাণ করে আবহমান বাংলার চিরায়ত ব্রতকথা ও তোর মানবজমিন রইল পতিত। আবাদ করলে ফলত সোনা। এই চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়ায়ই কবি ফররুখ হয়ে উঠেন গল্পকার ফররুখের প্রতিচ্ছবি।