কবি ফররুখ আহমদের গল্পকার পরিচিতি আমাদেরকে একরকম অবাকই করে। বাংলা সাহিত্যের সাধারণ পাঠক হয়তো বিস্ময় মানবেন কথাকার ফররুখের পরিচয় জেনে। আর এ বিস্ময় মূলত দু’টি কারণে হতে পারে- ক. তাঁর গল্পগুলি প্রায় অনালোচিত বলে। খ. সাহিত্যচর্চার প্রথম দিকে গল্প লিখলেও পরবর্তীকালে সাহিত্যিক-খ্যাতির (না-কি কবি-খ্যাতির চূড়ান্ত পর্বে) এ ভুবন থেকে সরে ছিলেন বলে।
ফররুখের প্রথম কবিতা প্রকাশের (রাত্রি, বুলবুল, শ্রাবণ ১৩৪৪) পরের মাসে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প (অন্তর্লীন, ‘মাসিক মোহাম্মদী’; ভাদ্র ১৩৪৪)। এবং পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে তাঁর আরো চারটি গল্প প্রকাশিত হয় ‘বুলবুল’ ও ‘মাসিক মোহাম্মদী’ পত্রিকায়। আর সমকালে (১৩৪৪-৪৬) ‘বুলবুল’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’ এবং ‘সওগাতে’ তাঁর ১৬টি কবিতা প্রকাশিত হয়। এ হিসাব থেকে অনুমিত হয়। কবিতার প্রতিই ফররুখের ঝোঁক ছিল বেশি। আমরা ফররুখ আহমদের গল্পগুলিতে সমকালীন কলকাতার জীবনচিত্র, মানুষের চিন্তার প্রচ্ছন্নতা আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক-আভাসের ছায়ার ছাপচিত্র পাই। যেন তিনি বর্ণিত চরিত্র আর ঘটনামূহকে পাঠকের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাচ্ছেন তাদের প্রবণতার স্পষ্ট অভিব্যক্তি সমেত।
কথাশিল্পী ফররুখের অন্তত সামান্য পরিচিতি পাওয়া যায় খান সাহেব মোহাম্মদ হেদায়েত উল্লাহর মূল্যায়ন ভাষ্য থেকে- “তরুণ কথা-সাহিত্যিকদের মধ্যেও কয়েকজনের উদ্যম আশাপ্রদ বলিয়া মনে হইতেছে। আবু রুশদ, ফররুখ আহমদ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, নাজীরুল ইসলাম প্রভৃতির রচনা সাময়িক সাহিত্যের পৃষ্ঠায় ইতঃস্তত ছড়াইয়া আছে বটে, কিন্তু এ সম্পর্কে ইহাদের নাম উল্লেখ না করিলে আমাদের বক্তব্য অসম্পূর্ণ থাকিয়া যাইবে বলিয়া মনে হয়। কারণ সত্য-সত্যই ইহাদের মধ্যে শক্তির পরিচয় লক্ষ্য করা গেছে।” [১৯৩৯ সনে (১৩৪৬) অনুষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মেলনে’র কথা-সাহিত্য শাখার সভাপতির ভাষণ, সূত্র : মাসিক মোহাম্মদী, জ্যেষ্ঠ ১৩৪৬]।
‘মৃত-বসুধা’ গল্পে তারুণ্য শক্তির অহমিকা আর বার্ধক্যের নিস্তাপ-নিস্তরঙ্গ জীবনাবেগের হিসেব-নিকেশের গল্প। এ গল্পে আছে যথেচ্ছ যৌরাচার, ক্ষমতার অপ-প্রয়োগ আর অসংযমী জীবনের উত্তাপ-উত্তেজনা। সাথে আছে অনুতাপবোধের অসহায়ত্ব। দারুণ প্রতাপশালী রউফ সাহেব, যিনি সময়ের পরিক্রমায় বার্ধক্যের স্তিমিত ভুবনে এখন নিমজ্জিত- এ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র। থিতিয়ে-পড়া রউফ সাহেবের পরিচয় ফররুখ আহমদ তুলে ধরেছেন এভাবে-
“সমস্ত যৌবন যিনি প্রমত্ত উদাসীন্যে পার হয়ে এসেছেন, বৃদ্ধ বয়সে সেই কারণে যদি তিনি অতিরিক্ত পরিশ্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে অভিযোগ করার কোনো কারণ নাই। তাঁর জীবন বর্তমানে প্রাচীন মৃত্তিকার মত শষ্যহীন অনুর্ব্বর। সেখানে ফুল ফোটে না। ফসল উৎপন্ন হয় না। তিনি তাকিয়ে থাকেন শূন্য আকাশের পানে শূন্যতার মন নিয়ে।”
নারীর অসহায়ত্ব, সবকিছু মেনে নেওয়ার কষ্টে আছে ‘মৃত-বসুধা’য়, আছে নারীর অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রতিবাদও। রউফ সাহেবের ঘরে স্ত্রী, মা এবং তার রক্ষিতা- এরা পেষনের শিকার। অন্যদিকে তার মেয়ে লতিফা স্পষ্টত প্রতিবাদীর প্রতিকৃতি। পিতার যাপিত জীবনের সমূহ উদ্ধত্যের পিঠে চাপ চাপ আঘাত নিক্ষেপ করেছে লতিফা- তার আচরণে, কথায় এবং দেহভাষায়। গল্পটিতে, বলা চলে, দুটি অধ্যায় কাহিনীর মূল বিষয়ের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা আছে। পিতার জীবনের পাপাচারকে কন্যার অহমিকা আর পাপবৃত্তির আড়ালে একরকম শোধ-শোধ খলার আয়োজন করেছেন গল্পকার। শেষত পাঠকের মনে প্রতাপশালী রউফ সাহেবের জন্য করুণার উদ্রেক করেন ফররুখ। ইতিবাচক সমাজ-অভিব্যক্তি প্রকাশ করাও তাঁর একটি প্রচ্ছন্ন উদ্দেশ্য বলে ধরে নেওয়া যায়।
‘মৃত-বসুধা’ গল্পের আরেকটি বিষয় হলো অবলা প্রাণীর সাথে মানুষের সম্পর্কের শীতলতার প্রকাশ। গৃহপালিত ঘোড়ার প্রতি রউফ সাহেবের মমতা সত্যিই সত্যিই পাঠকের বিস্ময়ের মুখোমুখি করে।
গল্পটিতে লেখক চমকপ্রদ বর্ণনাভঙ্গির ছাপ রাখতে পেরেছেন। গল্পটিতে পড়তে পড়তে আমরা অনাকানে প্রকৃতি, প্রতীক, আর দারুনসব মোহাচ্ছন্নতায় যেন আবদ্ধ হতে থাকি। আর অনুভব করতে থাকি কথাশিল্পীর কথা বুননের শক্তির সৌন্দর্য্য। যেমন: “যেদিন শেষ রাত্রির চাঁদ যখন দিগন্তের মুখে মুখ বাড়িয়েছে, তখন রউফ সাহেবের হৃদপিন্ড ছিঁড়ে রক্ত বেরুতে লাগল তীর ঝলকে ঝলকে। লাল টকটকে তাজা রক্ত হাতে উঠিয়ে নিয়ে দেখতে ইচ্ছা হয়। যৌবনে এই রঙে ছিল অপরিসীম প্রাবল্য, বহুবর্ষ নির্জীব থাকার পর তারা আবার প্রকাশিত হয়েছে। বেলা শেষে অস্ত যাবার সময় যারা আকাশ রক্তরঞ্জিত করে দিয়ে যেতে শেষ রশ্মির কোন কার্পণ্য নেই।”
‘বিবর্ণ’ গল্পে আছে নদীভাঙন, অনিশ্চিত জীবন, অবরুদ্ধ থাকবার যন্ত্রণা আর যুক্তি কামানার প্রাবল্য। গল্প কাঠামো গতানুগতিক নয়। গল্প আরম্ভের আগে গল্পকার গল্পের একটি পূর্বাভাস দিয়েছেন। আর সেই আভাসস্থলে বর্ণনাভঙ্গিতেও সৃষ্টি করেছেন আকর্ষণধর্মীতা। গল্পকার যেন এ গল্পে ভাষ্যকারের ভূমিকায় অবতীর্ণ। যেমন তিনি বলেছেন:
“অনেকদিন আগে আড়িয়াল খাঁর তীরে সাবেকী আমলের প্রকান্ড থামওয়ালা বাড়ীর বারান্দায় বসে আড়িয়াল খাঁর সাথে হাসিনার পরিচয় হয়। ভাটী পথে হাটুরিয়া দল নদীর স্রোতে পড়ে তীব্র বেগে উধাও হয়ে যেত আর বর্ষাকালে দিগন্ত মথিত করে ঘোলা পানির ঢেউ বিরাট অজগরের মত গড়িয়ে তীরে এসে প্রবল বেগে আঘাত করত। মধ্য নদী দিয়ে তলোয়ারের মত চকচকে স্থির ধারালো প্রবাহ বয়ে যেত।”
বাড়ির বাইরে প্রায়-না-যাওয়া এক নারীর হৃদয়ের আর্তনাদ শুনতে পাই আমরা এ গল্পের ক্যানভাসে। শুনতে পাই যুক্তির আনন্দের উচ্ছাস। ছেলে মাকে বেড়াতে নিয়ে যাবে, মা-র শ্রান্তি আর অবসাদের অবসান ঘটবে- এ উল্লাসে মা-র মন যেন হো হো করে হেসে ওঠে। গল্পকারের ভাষ্য !
“বাইরে বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনে ওর মনটা ঝড়ের মত দুলছে। কত দিন কত যুগ যেন সে মাটির উপর দিয়ে হাঁটতে পায় নি। শিশুর মত ওর মন চঞ্চল হয়ে উঠল। আকাশ আর পৃথিবীর অসীম মুক্তির মধ্যেও বেড়াবে। হাসিনার ক্লান্ত দেহটা প্রজাপতির মত লঘু হয়ে ওঠে এক নিমেষে। দিন-রাত্রির সমস্ত গ্লানি হাসিনা ভুলে যায়।”
‘অন্তর্লীন’ গল্পে মানুষের জিজ্ঞাসা -পিপাসু মন, জীবনের সরল হিসেব-নিকেশ, যৌনাকাক্সক্ষার অন্তরালে নারীর মাতৃত্ব-বাসনা, প্রকৃতির অপ্রতিরোধ্য সব বিধান, নৈরাশ্য-আশাভঙ্গের ছায়া, জীবনসমাপ্তির হাতছানি- এতসব বিষয় আর চিন্তার সমাবেশ পাঠক-চিত্তকে আন্দোলিত করে।
শাহরিয়ার-রিহানা দম্পতি, চিন্তার অসমান্তরাল প্লাটফরমে দাঁড়িয়ে। পথিক শাহরিয়ারের জীবনে রিহানা নীড়ের স্বপ্ন জাগিয়েছে। কিন্তু সন্তান-লাভ সম্পর্কে দুজনের অভিব্যক্তি এক নয়। কাকের বাচ্চা দেখে রিহানার মনে প্রবল আবেগের উদ্রেক হয়। এক সময় শাহরিয়ারের মন-খারাপ হয়ে পড়ে। গল্প থেকে কিছুটা পাঠ-
“শাহরিয়ার স্তব্ধ হয়ে গেল। সে এতদিন অমার্জ্জনীয় ভুল করে এসেছে। সে জানত যে নারী ও পুরুষের দৈহিক কামনা একই রকম। কিন্তু দৈহিক ক্ষুধার উপরও যে নারীর মনে সন্তানের জন্য আর একটি ক্ষুধা আছে সে কথা পুরুষ হয়ে সে জান্তে পারে নি। অবশ্য নারীর সন্তান কামনা তার কাছে মহৎ নয়। সে জানে প্রভুত্বকামী প্রকৃতির অন্যান্য কৌশলের মত নারীর অন্তরালে সন্তান কামনা জাগানোও আর একটি প্রয়োজনীয় কৌশল।”
অবশ্য শাহরিয়ারের এ ভাবনায় পরিবর্তন ঘটে। যে কর্মঠ জ্ঞান-দীপ্ত সন্তানের স্বপ্ন দেখে। গল্পের পরিণতিতে শাহরিয়ার মৃত্যুচিন্তায় আচ্ছন্ন হয়। ‘যেন তার চারদিকে’ কী বিপুল নৈরাশ্য সমস্ত আকাশের আলো নিভিয়ে আনছে- কালো শবাচ্ছাদন বস্ত্রের মত আকস্মিক মেঘে তারাগুলো ঢেকে যাচ্ছে। সর্বোপরি ‘অন্তর্লীন’ গল্পে মাতৃত্বের সত্যাসত্য উজ্জীবিত হয়েছে। জয় ঘোষিত হয়েছে নারী জাতির চিরায়ত বাসনার। ‘যে পুতুল ডলির মা’ গল্পে ফররুখ আহমদ বলতে চেয়েছেন, পুতুল খেলার বয়স এক সময় শেষ হয়ে যায়। সাংসারিক কর্মব্যস্ততায় ঢাকা পড়ে জীবনের সব গতিময়তা। কিন্তু মনের ভেতরে খেলতে থাকে এক অতৃপ্ত কান্নার সুর। যদিও পুতুল খেলা নিছক আনন্দের ব্যাপার, তারপরও এর প্রভাব মানবজীবনে নেহায়েত সামান্য নয়। প্রতীকি-বর্ণনায় গল্পকার পুতুল খেলার বয়স পার হওয়া এক নারীর মর্বিড চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর বর্ণনার অংশ বিশেষ-
“ঘরের মধ্যে যখন আলো জ্বলছে বাইরে তখন উঠেছে ঝড়ের তান্ডব। বদ্ধ ঘরে থেকেও তার আভাস পাওয়া যায়। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছে নগর-পথ। হয়তো রাশি রাশি কাগজের টুকরো উড়ছে। কাগজের খন্ড বিক্ষিপ্ত টুকরো শূন্যপথে ঘুরে মরছে। ওরা যেন মানুষের অতৃপ্ত প্রতিলিপি। তৃপ্তিহীন জীবনের অকারণ বোঝা বয়ে ঘুরে মরছে।”
জীবনের দুর্বোধ্যতা এ গল্পের অন্য একটি বিষয়। তবে গল্পের দুর্বোধ্যতা আঁকতে গিয়ে অধ্যায় বিভাজনে সতর্কতার পরিচয় দিতে পারেননি গল্পকার। অধ্যায় ৪ ও ৫ বিভাজন অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।
‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’ গল্পে কাজ-পাগল মানুষের চরিত্রের প্রবণতা, কাজে ফাঁকি দেয়ার কৌশলাদি, কর্ম-ব্যস্ততার আর সততার অন্তরালে ভয়াবহ স্খলন আর মানুষের প্রতি মানুষের বিরাট আস্থার অবসান- এসব চিন্তার বিবরণ দিয়েছেন ফররুখ। হারুন এ গল্পের গতি-কাঠামোর কেন্দ্র শক্তি। সে অন্যসব চরিত্রের তুলনায় ভিন্নতর। তার সম্পর্কে লেখক বলেছেন:
“ওর-বয়সী সাধারণ তরুণদের সাথে হারুনের একটা পার্থক্য আছে। যে পার্থক্যটা কিংবা সহজে ধরা যায় না। সহজ অবস্থায় হারুন অত্যন্ত মিশুক প্রকৃতির, অন্তত তাই মনে হয়। কিন্তু আর একটা দিক আছে সেখানে হারুন অত্যন্ত ভাবপ্রবণ। তারুণ্যের প্রথম স্তর থেকেই হারুনের চরিত্রের এই দুয়ের বিপরীত মুখী স্বভাব দ্রুতগতিতে বেড়ে উঠেছে। তাই দিনের বেলায় সে অত্যন্ত সহজ ও মিশুক, আর রাত্তিরে গম্ভীর ভাবপ্রবণতার আবছায়ায় রহস্যময়।”
ওয়াজেদ সাহেবের দারুন ব্যক্তিত্ব আর আলেমার মানব-কল্যাণ প্রত্যাশী মনোভাব হারুনকে আকৃষ্ট করে। ক্রমে আলেমা তাকে সন্তান-আদরে মোহাবিষ্ট করে তোলে। হারুনের জীবন যেন- মা আলেমাময় হয়ে ওঠে। কিন্তু এক সময় আলেমার চরিত্রের প্রকৃত পরিচয় পেয়ে হারুন ভীষণ যন্ত্রণাবোধে কাতর হয়। আশা আর আশাভঙ্গের গল্প, বিশ্বাস আর বিশ্বাসহন্তার ভয়াবহতার গল্প ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’। হারুন, ওয়াজেদ, আলেমা-রা যেন প্রতিদিনের এই পৃথিবীতে সদা বিরাজমান। লেখকের এই চমৎকার ভাবনা-প্রকাশ সত্যিই পাঠক মনকে ভিন্নতর খোরাক যোগায়। ফররুখ আহমদ কবি। কবির ভাবপ্রবণতা তার গল্পের পরিসর জুড়ে ও বহমান। তবে প্রকৃত এ কবি মাত্র পাঁচটি গল্পের বুনন ও বিষয়-ভাবনায় আমাদের কাছে কথাশিল্পী পরিচয়টি স্পষ্ট করে তুলেছেন, তা অন্তত বলা যায়। মানুষ, প্রকৃতি, প্রকৃতির সত্যাসত্য, মানব-মনের বিচিত্র প্রবণতা, জীবনের যন্ত্রণা, আনন্দ-প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ফররুখের গল্পে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানো।