হামদ ও নাত আরবি শব্দ। উভয়টি পরিভাষাও। পরিভাষাও আবার কাব্যশাখার। হামদ মানে আল্লাহ-প্রশস্তি, আর নাত মানে রাসুল-প্রশস্তি। বন্দনা, প্রশস্তি ও প্রশংসা-শব্দ যেটাই বলি- কাব্যসাহিত্যের সমবয়সী। প্রাচীনতম কাব্যের বেশির ভাগই ব্যক্তিবন্দনায় আকীর্ণ। বিশেষ করে রাজা-রাজড়া, ওজীর-আমলা ও বীর-যোদ্ধাদের বন্দনা। আবার কিছু-কিছু কাব্যে পাওয়া যায় বিরক্তিকর দেব-দেবী-বন্দনাও।
কাব্যসাহিত্যে এতোসব বন্দনা যখন আছে, তা হলে আল্লাহ ও রাসুল বন্দনা থাকা বিচিত্র নয়। হামদ তথা আল্লাহ-প্রশস্তির ধারা অবশ্যই প্রাচীন থেকে প্রাচীনতম কাল বেয়ে চলে আসছে- যখন থেকে কাব্যসাহিত্য অস্তিত্ব লাভ করেছে পৃথিবীর বুকে। এ ধারায় খোদাবিশ্বাসী-অবিশ্বাসী নির্বিশেষ সকলেই অংশগ্রহণ করেছে। কারণ, এ মহাবিশ্বমণ্ডল যিনি সৃষ্টি করেছেন, তাঁর বন্দনা সকলেই গাইবেন- সেটাই স্বাভাবিক।
নাত তথা রাসুল-প্রশস্তির ধারাটিও রাসুলের জীবদ্দশায়ই চালু হয়েছিল। তবে সাহাবায়ে কেরাম ইসলামের প্রচার-প্রসার ও কাফিরদের প্রতিরোধে খুব বেশি ব্যস্ত থাকায় তাঁর জীবদ্দশায় ধারাটি তেমন বিকাশ লাভ করতে পারে নি। রাসুলের জীবনে সর্বপ্রথম নাতকার কাব বিন যুহাইর। তিনি সর্বপ্রথম রাসুলের শানে সুদীর্ঘ কবিতা লিখেন ‘বানত সু’আদ’ নামে। আর নবী সা. খুশী হয়ে তার পেছনের সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন এবং নিজের ডোরাকাটা চাদর তাকে পরিয়ে দেন। এ স্বর্ণসূত্র ধরে হামদ-নাত আজ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে, বিশেষ করে আরবি-ফার্সি-উর্দু-বাংলা প্রভৃতি মুসলিম ভাবধারাপুষ্ট ভাষাসমূহে, এক স্বতন্ত্র কাব্যধারার মর্যাদা পেয়েছে।
উক্ত ভাষাচতুষ্টয় ছাড়াও ইংরেজি, ফরাসি, তুর্কি, জার্মান, লাতিন, হিন্দি ইত্যাদি ভাষায়ও রাসুল-প্রশস্তিমূলক কবিতা রচিত হয়েছে প্রচুর পরিমাণে। বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন ভাষায় হামদ-নাত লিখে যারা খ্যাত হয়েছেন, তাদের কয়েকজন হলেন : মুহাম্মদ শরফুদ্দীন বুসীরী (১২১২-১২৯৬), ফেরদৌসী (৯৩৫/৩৭/৪১-১০২০), ফরীদুদ্দীন আত্তার (১১১৯-১২২৯), মাওলানা রুমী (১২০৭-১২৭৩), হাফিজ সিরাজী (১৩২৫-১৩৯০), শেখ সাদী (১১৮৪-১২৯১), আবদুর রহমান জামী (১৪১৪-১৪৯২), আমীর খসরু হেলভী (১২৫৩ – ১৩২৫), ফৈজী, ইকবাল (১৮৭৫-১৯৩৮) প্রমুখ। মহাকবি গ্যাটেও (১৭৪৯-১৮৩২) নাত রচনা করেছেন জার্মান ভাষায়।

২.
বাংলা সাহিত্যে হামদ-নাত ধারাটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ। নাত ধারাটি সমৃদ্ধতর। বাংলা কাব্য-সাহিত্যের মধ্যযুগ থেকে হামদ ও নাতকাব্য রচিত হতে শুরু করে নিখাদ আন্তরিকতার সঙ্গে। এ যুগে নাত রচনা করেন : সৈয়দ সুলতান, শেখ চান্দ, শাহ মোহাম্মদ সগীর, আলাওল, মোহাম্মদ খান, দৌলত কাজী, সৈয়দ মর্তুজা, হায়াত মামুদ, সৈয়দ হামজা, মুনশী জান মোহাম্মদ, শাহ গরীবুল্লাহ, মোহাম্মদ দানেশ, খাতের মোহাম্মদ, মালে মোহাম্মদ প্রমুখ। আধুনিক যুগে হামদ ও নাতকাব্যে দুর্দান্ত দাপট নিয়ে আবির্ভূত হন কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬)। নজরুলের সমসাময়িক ও পরবর্তীদের মধ্যে যারা নাত লিখে খ্যাত হয়েছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গোলাম মোস্তফা, জসীমউদ্দীন, বে-নজীর আহমদ, বন্দে আলী মিয়া, কাজী কাদের নেওয়াজ, আজিজুর রহমান, ফররুখ আহমদ, তালিম হোসেন, শাহাদাৎ হোসেন, রওশন ইজদানী, আ. ন. ম বজলুর রশীদ, আফজাল চৌধুরী, আবদুর রশীদ খান, আবদুর রশীদ ওয়াসেকপুরী, আবদুল হাই মাশরেকী, আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দীন, মতিউর রহমান মল্লিক প্রমুখ। ফররুখ পরবর্তী অনেক কবিও হামদ-নাত রচনা করেছেন। বিশেষ করে নাতরচনায় আন্তরিকতা ও দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন। তাদের মধ্যে যারা এখনো জীবিত ও লেখকতায় সক্রিয় তাদের মধ্যে মোহাম্মদ মাহফুজউল্লাহ, আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, আবদুস সত্তার, ওমর আলী, আসাদ সৌধুরী, মুহম্মদ নুরুল হুদা, সাজ্জাদ হোসাইন খান, রূহুল আমীন খান, সৈয়দ শামসুল হুদা, আবদুল মুকীত চৌধুরী, মুকুল চৌধুরী, আবদুল হাই শিকদার, আবদুল হালীম খাঁ, মোশাররফ হোসেন খান, জহু-উশ শহীদ, মসউদ-উশ শহীদ, হোসেন মাহমুদ, আসাদ বিন হাফিজ, হাসান আলীম, রিফাত চৌধুরী, সায়ীদ আবু বকর, আহমদ মতিউর রহমান, তমিজ উদদীন লোদী, বুলবুল সরওয়ার, শেখ তোফাজ্জল হোসেন, নুরুল ইসলাম মানিক প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আরো দীর্ঘ ফিরিস্তির জন্য কৌতূহলী পাঠকরা মুকুল চৌধুরী-সম্পাদিত ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন-প্রকাশিত ‘মহানবী সা.কে নিবেদিত কবিতা’ সংকলনটি দেখতে পারেন।
উল্লেখ্য যে, ফররুখের পর এই পর্যন্ত হামদ-নাত কবিতার ক্ষেত্রে একজন কবি ও একটি কবিতাগ্রন্থকে কেউ অতিক্রম করতে পারে নি এবং আমি মনে করি- এটি তাবৎ বাংলাকাব্যে হামদ-নাতের এক অমর-অনতিক্রম্য গ্রন্থ হিসেবে সগৌরবে বেঁচে থাকবে- সেটি হলো আবদুল মান্নান সৈয়দের (১৯৪৩-২০১০) ‘সকল প্রশংসা তাঁর’। প্রকাশের (১৯৯৩) মাত্র দু’দশকে গ্রন্থটির বহু সংস্করণ বের হয়েছে এবং গ্রন্থটির ওপর প্রকাশিত হয়েছে প্রায় দশটির মতো স্বতন্ত্র আলোচনা। বর্তমান নিবন্ধকারেরও একটি আলোচনা ছাপা হয়েছে সংগ্রাম সাহিত্যে (১৯-৪-২০১১)।

৩.
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) বাংলাসাহিত্যের একজন মৌলিক প্রতিভাধর ও স্বভাবকবি হিসেবে তাঁর সৃষ্টির বিভিন্ন দিক নিয়ে সন্তোষজনক আলোচনা হলেও তাঁর কবিকীর্তির একটি উজ্জ্বল দিক নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয় নি। সে উজ্জ্বলতম দিকটি হলো তাঁর হামদ-নাতকাব্য। অন্যান্য সমালোচক ও গবেষকরা তো বটেই, ফররুখ-অনুরাগী সমালোচক ও গবেষকগণও এ-দিকটি নির্মমভাবে এড়িয়ে গেছেন! ‘নির্মমভাবে’ বলছি এজন্য যে, মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ রচিত ‘বাংলাকাব্যে ফররুখ আহমদ : তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্যের স্বরূপ’ গ্রন্থে ‘ফররুখ-চর্চা : সেকালে ও একালে’ শিরোনামে ফররুখ আহমদকে নিয়ে রচিত গ্রন্থ ও তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকার বিশেষ সংখ্যার একটি জরিপ দিয়েছেন। সেখানে মৌলিক ও স্বতন্ত্র ১০টি গ্রন্থ, ১৯টি বিশেষ সংখ্যা এবং ৪৮টি স্বতন্ত্র প্রবন্ধের কথা সন্নিবেশিত হয়েছে এবং লেখক প্রত্যেকটি গ্রন্থ ও পত্রিকার সূচিও লিপিবদ্ধ করেছেন। এতো দীর্ঘ ফিরিস্তিতেও ফররুখের হামদ-নাতকাব্য সম্পর্কে কোনো লেখা দেখা যায় নি। সবচেয়ে বিস্ময়ের কথা হলো, আবদুল মান্নান সৈয়দের মতো কৃতবিদ্য গবেষক, যিনি আবার ফররুখ-অনুরাগী সমালোচক ও গবেষকদের মধ্যেও অন্যতম, তিনিও ফররুখের হামদ-নাত সম্পর্কে তেমন কোনো আলোচনা করেন নি। ফররুখকে নিয়ে তাঁর গভীরাশ্রয়ী গবেষণাগ্রন্থ ‘ফররুখ আহমদ : জীবন ও সাহিত্য’-এ ফররুখের পাণ্ডুলিপির পরিচায়ন পরিচ্ছেদে ‘মাহফিল’ গ্রন্থের নামটুকু শুধু উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁর হামদ-নাত ও তাতে তাঁর শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে কোনো আলোচনাই করেন নি। সেই সঙ্গে তাঁর গ্রন্থে সন্নিবেশিত ফররুখকে নিয়ে লিখিত গ্রন্থ ও পত্রিকার বিশেষ সংখ্যাগুলোতেও (১২ পৃষ্ঠাব্যাপী) কোথাও এ-বিষয়ে কোনো রচনার সাক্ষাৎ মেলে নি। এমনকি ফররুখ একাডেমী পত্রিকার একুশটি সংকলনেও এ বিষয়ে কোনো স্বতন্ত্র প্রবন্ধ দেখা যায় নি। কোনো কোনো প্রবন্ধে আংশিকভাবে ও প্রসঙ্গক্রমে তাঁর ইসলামি গান-গজলের কথা এসে গেছে মাত্র। তবে এই কিছুদিন আগে মুকুল চৌধুরী ‘ফররুখ আহমদের ইসলামি গান-গজল’ নামে মাহফিল গ্রন্থের একটি আলোচনা লিখেন সংগ্রাম সহিত্যে (২১ অক্টোবর ২০১১)। সেটাও কিন্তু হামদ-নাত নিয়ে স্বতন্ত্র-মৌলিক কোনো আলোচনা নয়। তাই বলা যায় ফররুখ আহমদের কবিকীর্তির এ একটি উপেক্ষিত ও অবহেলিততম দিক।
কেন-কিভাবে এ দিকটি অনালোচিত থেকে গেছে, তার প্রকৃত কারণ ও রহস্য ডুবুরি গবেষকরাই বেশি বলতে পারবেন। ফররুখের হামদ-নাত নিয়ে স্বতন্ত্র আলোচনা না হওয়ার একটি কারণ হতে পারে সংখ্যাল্পতা। তাঁর হামদ-নাত কবিতা সংখ্যায় খুবই অল্প। মাহফিল কাব্যগ্রন্থে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র একত্রিশটি হামদকবিতা ও বারোটি নাতকবিতা। তাছাড়াও তাঁর হামদ-নাতকবিতাসহ অন্যান্য ইলামি গান-গজল গ্রন্থবদ্ধ হচ্ছে বহুপরে। মৃত্যুর তেরো বছর পর। এমনকি তাঁর হামদ-নাতধর্মী বহু কবিতা ও গান এখনো গ্রন্থভুক্ত হয় নি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে, বেতারকেন্দ্রের বিভিন্ন ফাইলে। এসব কারণ সাধারণ সমালোচক ও গবেষকদের বেলায় হয়তো প্রযোজ্য, কিন্তু সিরিয়াস সমালোচক ও গবেষকদের বেলায় কিছুতেই প্রযোজ্য নয়। সংখ্যাস্বল্পতা কোনো কারণই হতে পারে না। কারণ, শিল্পসফলতা সংখ্যাধিক্যে নয়, শিল্পের নৈপুণ্যে, সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্যে।
ফররুখ আহমদের অন্যান্য কবিতার মতো হামদ-নাতকবিতাও স্বমহিমায় ও স্বদর্পে দাঁড়িয়ে আছে কবিতার বহুকৌণিক গুণে ও মানে : কাব্যগুণে, শিল্পনৈপুণ্যে, শব্দের কুশলী ব্যবহারে, ছন্দের মোহিনী চন্দনে, রূপক-উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্পের চাতুর্যে, সর্বজনপাঠ্যতায় ও আবৃত্তিযোগ্যতায়। পাঠ করা যাক তাঁর একটি হামদ,
আসমান আর জমিনে যা আছে সকলি প্রভু তোমার
ধূলিতল থেকে দূর নীহারিকা, গ্রহ, তারা বেশুমার।
পুষ্পিত বন, গহীন কানন লতা পল্লব দল
পৃথ্বি ললাট-ধূ ধূ মরু মাঠ, সমুদ্র উচ্ছল
নি®প্রাণ আর প্রাণবন্ত যে সৃষ্টির সম্ভার।
অনুকণা থেকে বিপুল বিশ্ব-ক্ষুদ্র, বৃহৎ যত
সৃষ্টি তোমার নির্দেশে তব আছে প্রভু অনুগত
অদৃষ্ট বা দৃষ্টিগোচর রওশন ‘নূর’ ‘নার’।
(হামদ : দুই, মাহফিল, পৃ.১)

মুখর অথবা মৌন সকলে প্রশংসা গাহে তব
প্রাচীন বনানী অথবা সবুজ তৃণদল অভিনব
ঝর্ণার ধারা, সাগর, সাহারা-প্রসারিত বিয়াবান।
অঝোর বর্ষা বারি-বর্ষণে তব বন্দনা গায়,
অতল গভীর সুর ওঠে জেগে প্রশান্ত দরিয়ায়,
তারার মিছিলে তোমার তারিফ গাহে যে সারা জাহান।
(হামদ : তিন, মাহফিল, পৃ.২)

৪.
ফররুখ আহমদের হামদ-নাতকবিতা মূলত সংকলিত হয়েছে ‘মাহফিল’ গ্রন্থে যা প্রকাশিত হয় কবির মৃত্যুর তেরো বছর পর ১৯৮৭-এ। প্রকাশ করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। গ্রন্থে কবি হামদ ও নাত বলে চিহ্নিত করেছেন কিছু-কিছু কবিতাকে। হামদ নাম দিয়ে চিহ্নিত করেছেন ৩১টি এবং নাত নাম দিয়ে চিহ্নিত করেছেন ১২টি। মোট ৪৩টি কবিতা। নাম দিয়ে চিহ্নিত না করলেও উক্ত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে আরো কিছু হামদ-নাত পাওয়া যায়। হামদ যেমন : ‘তাসমিয়া’, ‘আল কুরআন’, ‘হে মালেকু মুল্ক’, ‘ভয় কর তুই আল্লাহকে’, ‘যার অন্তরে ভাই আছে শুধু’, ‘আল্লাহ ছাড়া কারুর কাছে’ ইত্যাদি। নাত যেমন : ‘রবিউল আউয়াল’ ১-৩, ‘ঈদে মিলাদুন্নবী’ ১-২, ‘সে এলো, সে এলো’, ‘নবী মুহাম্মদ স.’ ইত্যাদি। উক্ত গ্রন্থে কবি খৈয়াম, সাদী ও জামীর কিছু নাতও অনুবাদ করেছেন কবি।
উল্লেখ্য যে, হামদ মানে শুধুই প্রশংসা বর্ণনা করা নয়। হামদের আরো ব্যাপক অর্থও রয়েছে। দোয়া, মোনাজাত, আল্লাহর সঙ্গে মিলনের আকুতি, দেশ-ধর্ম-জাতির সংকটমুহূর্তের সদরদ বর্ণনা ইত্যাদিও হামদের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেছেন কেউ কেউ। সেই হিসেবে ফররুখের হামদকবিতা সংখ্যায় অনেক বেড়ে যায়। কারণ, উক্ত গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে দোওয়া ও মোনাজাত নামে ৩৫টি কবিতা রয়েছে। ঠিক তেমনিভাবে নাতের পরিধিও সুবিস্তৃত। রাসুলের জীবনী, তাঁর চরিত্রের বর্ণনা, মদীনা থেকে দূরে অবস্থানের জন্য দুঃখপ্রকাশ, অপরাধের জন্য অনুশোচনা, সুপারিশপ্রার্থনা, লজ্জাশ্র“নিবেদন, রাসুলের কৃতিত্ব ও অবদানের আলোচনা, দরূদ-সালামের আলোচনা ইত্যাকার বিষয়ও নাতকবিতার অন্তর্ভুক্ত।
হামদ-নাতকবিতার উক্ত ব্যাপক অর্থ ধরলে ফররুখ আহমদের হামদ-নাতকবিতা সংখ্যায় আর অল্প থাকে না। তখন ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪), ‘সিরাজুম মুনীরা’ (১৯৫২) ও ‘কাফেলার’ (১৯৮০) -এর অন্তর্ভুক্ত অনেকগুলো কবিতাকে হামদ-নাতকবিতা বলে বিবেচনা করা যায়। বিশেষ করে সিরাজুম মুনিরা-কে তো পুরোপুরিই নাতকবিতা বলা যায়। কোনো কবিতাকে বা কবিতাগ্রন্থকে হামদ বা নাতকবিতার অন্তর্ভুক্ত বললে তাতে সে সৃষ্টির জাত ও মান যায় না, বরং বাড়ে। মান যায় বলে যা আজ মনে করা হচ্ছে, সে ধারণা মূলত সাহিত্যে সাম্রাজ্যবাদী মনমানসিকতারই বিষফসল। আসল দেখার বিষয়টা হলো কবিতাটি যথার্থে কবিতা হয়েছে কিনা। বিষয়, ধর্ম-নীতিকথা-হামদ-নাত, যাই হোক কবিতাকে প্রকৃত কবিতা করে তুলতে পারার কারণেই তো আজ খৈয়াম, হাফিজ, রুমী, সাদী, জামী ও ইকবাল অমর বিশ্বকবি হিসেবে শিরোপা ও স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাই ফররুখের সিরাজুম মুনীরাকে নাতকবিতা বললে তার মানকে ম্লান করা হয় না বলে আমি বিশ্বাস করি।

৫.
ফররুখের হাম-নাত এবং অন্যান্য ইসলামি গান ও গজলের বক্তব্য- কোথাও বা পুরোপুরি কোথাও বা আংশিকভাবে- কুরআন ও হাদিসভিত্তিক। তাঁর লেখা হামদ ও নাতের পরতে পরতে ছড়ানো রয়েছে কুরআন ও হাদিসের বক্তব্যের নির্যাস। রয়েছে কোথাও বা শাব্দিক অনুবাদের মতো, আবার কোথাও বা ভাবার্তে বা বিশ্লেষণমূলকভাবে। যেখানে তিনি কোনো আয়াত বা হাদিসের সরাসরি তর্জমা করেছেন, সে ক্ষেত্রে তিনি ব্রাকেটে তা চিহ্নিত করে দিয়েছেন। যেমন,

হামদ : ষোল
(সুরা ত্বীনের ভাবানুসরণে)
গড়েছ মানুষ সেরা উপাদানে/রাব্বুল আলামীন
পরিবর্তনে করেছ তাকেই/আসফালা সাফেলীন।
তার বিশ্বাস, তার আচরণ/হয় কলুষিত, ক্লিন্ন যখন
পাশবিকতার নিম্নে সে নামে/ক্লেদাক্ত, ধূলি-লীন।
মানুষ তখন অধম সবার/বিশ্বে মেলে না তুলনা যে তার
নিকৃষ্ট এ সৃষ্ট জগতে/জানি সব চেয়ে দীন।
নীচ কর্মের এই পরিণতি/তোমার বিচারে পায় দুর্গতি
বিশ্বাসী যারা করে সৎ কাজ/ফল পায় অমলিন।
দেয় তোমার বিচারে অপবাদ যারা/মিথ্যাবাদী ও ভ্রষ্ট যে তারা
অপক্ষপাত তোমার বিচার/জানি যে তুলনাহীন।

এ হামদটি কুরআন করীমের ৯৫ নং সুরা ত্বীনের ভাবানুসারে রচিত। এভাবে তাঁর ‘মাহফিল’কাব্যগ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত একত্রিশটি হামদের মধ্যে তিনটি হামদ কুরআনের ভাবানুবাদস্বরূপ রচিত। যেমন হামদ : এক সুরা ফাতেহা ভাবানুসারে রচিত, হামদ : ষোল সুরা ত্বীনের ভাবানুসারে রচিত এবং হামদ : চব্বিশ আয়াতুল কুরসীর ভাবানুসারে রচিত। এছাড়াও উক্ত কাব্যগ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত অন্যান্য ইসলামি গানে কুরআন করীমের ১০৭ নং সুরা মাউনের ভাবানুসারে রচিত একটি গজন এবং সুরা বাকারার ১৮৬ নং আয়াতের ভাবানুসরণে রচিত একটি মোনাজাত রয়েছে। এসব হচ্ছে যেখানে কবি নিজেই ভাবানুসরণে তর্জমা বলে চিহ্নিত করেছেন। কবির চিহ্নিত হামদ-নাত ছাড়াও আরো বহু হামদ-নাতে সরাসরি কুরআনের কোনো আয়াতের অনুবাদ বা কোনো প্রসিদ্ধ হাদিসের অনুবাদ পাওয়া যায়। উদাহরণ এন্তার রয়েছে। শুধু একটি হামদ দেখা যাক,
হামদ : কুড়ি
হে মালেকুল-মুলক-প্রভু!/কুল আলেমের সম্্রাট মহান/
তোমার বিপুল বিশ্ব থেকে/ইচ্ছামত রাজ্য করো দান।
মালিক যখন ইচ্ছা তোমার/নাও, কেড়ে সে রাজ্য আবার/
ইচ্ছামত দাও সম্মান/ইচ্ছামত দাও অপমান/
ইচ্ছামত দাও তুমি কল্যাণ/সুনিশ্চিত সবার পরে/
প্রভু তুমি সর্বশক্তিমান।
দিনকে মেলাও রাতে মাঝে/রাতকে মিশাও দিনের মাঝে/
জীবন থেকে আনো মরণ/মরণ থেকে আনো জীবন/
তোমার মহান ইচ্ছামত/দাও জীবিকা; রিজিক অফুরান।

উক্ত হামদটিতে কুরআন করীমের ৩ নং সুরা (আলে ইমরান)-এর ২৫-২৬ নং আয়াতের মূল বক্তব্যটাই প্রতিলিপিত হয়েছে। তবে আয়াতদ্বয়ের সরাসরি অনুবাদ নয়। সরাসরি অনুবাদ না হওয়াটা ভালোই হয়েছে। কারণ, আরবি ভাষা, উপরন্তু ‘না গদ্য না কবিতা’র মতো কুরআনী ভাষাকে বাঙলায়িত করার যে অনতিক্রম্য জটিলতা, তা থেকে সহজে উত্তরিত হয়েছে। ফলে এসব হামদের বয়ন ও বুনন কবির স্বরচিত কবিতার মতোই সুস্থ, গতিময় ও টসটসে প্রাণবান হয়েছে। এখানেই ফররুখ আহমদের শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য নিহিত।
ফররুখের হামদকবিতার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি ‘আসমাউল হুসনা’ তথা কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর গুণবাচক নিরান্নব্বইটি নাম কবিতায় নিয়ে আসার চেষ্টা করেছেন -ভাবানুবাদের মাধ্যমে। এমনকি তিনি ৪৬টি নাম সরাসরি আরবিকে বাংলায় প্রতিবর্ণিকরণ করে ব্যবহার করেছেন। যেমন, ‘রাব্বুন’, ‘নূর’, ‘আলেম’ (আলিমুন), ‘ইলাহ’, ‘যুলজালালি ওয়াল ইকরাম’, ‘মালিক’, ‘আউয়াল’, ‘আখের’, ‘ওয়াহেদ’, ‘আহাদ’, ‘লতিফু’, ‘খবীর’, ‘খালিকু’, ‘বারি’, ‘মুসাব্বির’, ‘হাইয়ু’, ‘কাইয়ুমু’, ‘হাদী’, ‘মুনয়িমু’, ‘মুনতাকিম’, ‘মুয়িজ্জু’, ‘মুযিল্লু’, ‘জব্বার’, ‘কহ্হার’, ‘কাদির’, ‘মুকতাদির’, ‘সামীয়ু’, ‘বাসীর’, ‘রাজ্জাক’, ‘মতীন’, ‘গাফফার’, ‘গফুর’, ‘সাত্তার’, ‘সবুর’, ‘আলিয়ু’, ‘আজিম’, ‘মাবুদ’, ‘মাকসুদ’, ‘মাওলা’, ‘ওয়ালি’, ‘ওয়াদুদ’, ‘জাহের’, ‘বাতেন’, ‘হাজের’, ‘নাজের’ ‘মওজুদ’, ইত্যাদি।
যেসব পঙক্তিতে তিনি আল্লাহর গুণবাচক আরবি নাম, যার অর্থ তুলনামূলকভাবে একটু কঠিন, ব্যবহার করেছেন, সে পঙক্তির আগে বা পরে তার অর্থ ও ব্যাখ্যা করে দিয়েছে আশ্চর্য এক কুশলী ভাষায়। কয়েকটি উদাহরণ দেখা যাক,

আল্লাহ ‘হাদী’ কর তুমি সুপথ প্রদর্শন/হিদায়াতের আলোকে দিল কর যে রওশন।
হে ‘মুয়িজ্জুল মুযিল্লু’ হক মাওলা মহিয়ান/বান্দাকে দাও সম্মান আর দাও যে অসম্মান।
সর্বশক্তিমান হে মহান মালিক বিশ্ব ধরিত্রীর/সবার পরে শক্তি হে ‘কাদিরুল মুকতাদির’।
হে ‘সামীয়ুল-বাসীর’’- প্রভু শোন তুমি সকল কথা/সকল কিছু দেখো তুমি, রাখো তুমি সব ক্ষমতা।
তুমি ‘আলিয়ুল আজিম’ হে প্রভু! মহিমা যে অতুলন,/তব উন্নত মহিমা যে অতুলন।

কিছু কিছু কবিতায় আল্লাহর নামসমূহের কুশলী ব্যবহার খুবই লক্ষ করার মতো। পঙক্তির শেষ শব্দ হিসেবে ব্যবহার করেছেন আরবি নামগুলো। তাতে পূর্বাপরের ছন্দমিল ও অন্ত্যমিলের এক মনমাতানো সুরতাল সৃষ্টি হয়েছে। আর এখানেই ফররুখের শক্তি ও স্বাতন্ত্র্য সবিশেষ চিহ্নিত হওয়ার মতো। যেমন,

তোমাদের দেওয়া রূপ আলোকে ফুলের হাসি, রোশনি, রবির
জ্যোতিষ্কদের আলোর মিছিল;-‘ইয়া লতিফুল খবীর।’
সর্বশক্তিমান হে মহান মালিক বিশ্ব ধরিত্রীর/সবার পরে শক্তি হে ‘কাদিরুল মুকতাদির’।
অটল হে দ্বিধা-দ্বন্দ্বহীন/তুমি রাজ্জাক, তুমি মতীন।
পায় সান্ত্বনা, শান্তি-নূর/তুমি গাফফার, তুমি গফুর।
পায় নবরূপ পাহাড় তুর/তুমি সাত্তার, তুমি সবুর।

তাঁর নাতকবিতার ক্ষেত্রেও উপরিউক্ত বক্তব্যগুলো প্রযোজ্য। সেখানেও কবি রাসুলের গুণাবলি, রাসুলের প্রতি ভালোবাসা ও প্রেমনিবেদন কুরআন-হাদিসসম্মত পদ্ধতিতে করেছেন। কুরআন-হাদিসের আলোকে রাসুলের যেসব গুণ সর্বাগ্রে উল্লেখ্য, কবি সেগুলোর কথাই বেশি আলোচনা করেছেন। যেমন, কালিমা তাইয়িবার শেষাংশ ‘মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’, কালিমায়ে শাহাদতে বর্ণিত, ‘আবদুহু ওয়া রাসূলুহু’, কুরআনকথিত ‘উসওয়াতুল হাসান’, ‘রাহমাতুল্লিল আলামীন’, ‘খাতামুন নবীয়ীন’, বিশুদ্ধ হাদিসে বর্ণিত ‘শাফিউল মুজনাবিন’, ‘সাইয়েদুল মুরসালীন’, ইত্যাদি। এমনকি কোনো কোনো কবিতায় কবি কুরআনের এক টুকরো আয়াত এবং উত্তরসূরী কোনো কবির কিংবদন্তীতুল্য কোনো পঙক্তিও জুড়ে দিয়েছেন নিজের কবিতার সঙ্গে। যেমন,

তোমায় জেনে অর্থ বুঝি, ‘‘অ-রাফায়ানা-লাকা-জিকরাক’’
পাও যে আসন উর্ধ্বে সবার- রাহমাতুল্লিল আলামীন।

‘জাহাঁ রওশনাস্ত আজ জামালে মুহাম্মদ’
হে অপরূপ সৃষ্টি খোদার/জাহান তোমার জামালে রওশন
খোদার রহম বিলিয়ে দিতে/ধূলির ধরায় তোমার আগমন।
প্রথমোক্ত কবিতায় কুআনের ৯৪ নং সূরার ৪ নং আয়াতটি হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছে। আয়াতের অর্থ : ‘আমি তোমার মর্যাদা উঁচু করে দিয়েছি।’ দ্বিতীয় কবিতায় একজন ফার্সি কবির একটি ফার্সি পঙক্তি সরাসরি উদ্ধৃত করা হয়েছে। মহৎ ও উন্নত কবিতার ক্ষেত্রে এ ধরনের উদ্ধৃতি দোষের কিছু নয়, বরং সম্মানের। প্রায় সব মহৎ কবির কবিতায় এ ধরনের উদ্ধৃতি আছে, অন্য বড়কবির কোনো পঙক্তির অনুবাদ আছে, আছে অন্যভাষার বিখ্যাত কবির কবিতার ভাবানুবাদ।
হামদ-নাতে কবির শব্দচয়নও ঐতিহ্যানুসারী- তাঁর অন্যান্য কবিতার মতো। ফররুখের পূর্বে আধুনিক বাঙালি কবিদের মধ্যে অনেক কবি আরবি-ফার্সি শব্দ সংযোজন করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ ও তাতে নতুন রূপ সৃষ্টি করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু -একজন নজরুল ছাড়া- বিষয় ও ভাবের সঙ্গে ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত গতি ও সঠিক সঙ্গতি রক্ষা করতে সক্ষম হন নি। নজরুলের পরে এই একজন ফররুখ আহমদই আরবি-ফার্সি-উর্দু শব্দের আশ্চর্য কুশলী ব্যবহারের মাধ্যমে বাঙালি মুসলিম মানসের সুপরিচিত সাংস্কৃতিক পরিবেশকে সার্থকভাবে রূপায়িত করেছেন। তাঁর এ দক্ষতা কবিতায় যেমন, তেমনি তাঁর হামদ-নাত ও অন্যান্য ইসলামি গানেও আশ্চর্য এক শিল্পসুষমায় মণ্ডিত হয়ে ব্যবহৃত হয়েছে।
ফররুখ আহমদের হামদ-নাতধর্মী কবিতা ও গানসমূহ গভীরভাবে পাঠ করে গবেষকরা তাঁর শক্তি, স্বাতন্ত্র্য এবং পুরো বাংলাকাব্যে তাঁর প্রভাবের কথা পাঠকদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন। আমি শুধু বিষয়টির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তার প্রতি সামান্য ইঙ্গিত করলাম। দেশলাইয়ের কাঠিতে লাগিয়ে দিলাম একটু আগুন। চাইলে আরো অনেকে বাতি জ্বালাতে পারে।