নজরুলোত্তর বাংলা কাব্যের শ্রেষ্ঠতম প্রতিনিধি, মানবতাবাদী ও ইসলামী রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪)-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ ‘কাফেলা’। কবি ফররুখ আহমদের জীবনকালে তাঁর মাত্র ছয়টি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবি-পরিকল্পিত আরো আটটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের জন্য প্রস্তুত ছিল। কিন্তু নানা কারণে তা মুদ্রিত হয়নি। এ আটটি কাব্যগ্রন্থ হলো : ‘কাফেলা’, ‘হে বন্য স্বপ্নেরা’, ‘ইকবালের নির্বাচিত কবিতা’, ‘হাবেদা মরুর কাহিণী’, ‘তসরিব নামা’, ‘ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য’, ‘দিলরুবা’ ও ‘অনুস্বার’। এয়াড়া কবি লেখা আরো অনেক কবিতা অগ্রন্থিতভাবে (মুদ্রিত ও অমুদ্রিত) পাওয়া যায়।
‘কাফেলা’ কাব্যগ্রন্থটি ১৯৮০ সালে ১ম প্রকাশ করে ইসলামিক ফাউণ্ডেশন বাংলাদেশ। বইটিতে ৩৪ টি কবিতা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। কবিতাগুলো হলো : কাফেলা, কাফেলা ও মন্জিল, তায়েফের পথে, মদীনার মুসাফির, খলিফাতুল মুসলেমিন, এজিদের ছুরি, বেলাল, আলমগীর, কোন বিয়াবানে, নতুন সফর, নতুন মিনার, কাফেলার প্রতি, দুই মৃত্যু, হে আত্মবিস্মৃত সূর্য, জাগো সূর্য প্রদীপ্ত গৌরবে, বৈশাখ, ঝড়, বর্ষায়, পদ্মা, আরিচা-পারঘাটে, দ্বীপ নির্মাণ, সৃষ্টির গান, স্বর্ণ-ঈগল, ইন্কিলাব, কিস্সাখানির বাজার, পুঁথির কাহিনী অবলম্বনে, ঈদের স্বপ্ন, ঈদের কবিতা, নয়া সড়ক, শেরে বাংলার মাজারে, শিকল, বিরান শড়কের গান, মেঘনা-তীরের চাষীকে, ইবলিশ ও বনি আদম। এই বইয়ের কবিতাবলীকে প্রধানত দুই শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত : মুসলিম ইতিহাস-পুরাণ, ইসলামী আদর্শ ও ঐতিহ্যভিত্তিক। দ্বিতীয়ত : স্বদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, নৈসর্গিক সৌন্দর্য-মহিমা, মাটি-মানুষকেন্দ্রিক কবিতা। বইটি দেশভাগের পর প্রকাশিত হলেও, এটি কবির পরিকল্পিত প্রাথমিক-পর্বের গ্রন্থাবলীরই অন্যতম। এই গ্রন্থে প্রকাশিত অধিকাংশ কবিতাই ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৮ সালে (মাসিক মোহাম্মদী, মাসিক সওগাত, নও বাহার, পাকিস্তানী খবর, মঞ্জিল, মাহে নও, নওজোয়ান) প্রকাশিত।
এ গ্রন্থের ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট ফররুখ গবেষক ও সম্পাদক মোহাম্মদ মাহ্ফুজউল্লাহ্। তিনি উল্লেখ করেছেন, “ফররুখ আহমদ -এর কবিতার যে স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য, আদর্শ-আশ্রিত প্রতিভাসে বক্তব্য বিষয় ফুটিয়ে তোলা, রূপক ও প্রতীকের ব্যবহার; তা ‘কাফেলা’র অন্তর্গত কবিতাবলীতে দৃষ্টিগ্রাহ্য ও অনুভবযোগ্য। মধ্যপ্রাচ্য তথা আরব-জাহানের পটভূমিতে রচিত কবিতাবলীতে যেমন, তেমনি বাংলাদেশের পটভূমিতে রচিত কবিতাবলীতেও এ ব্যাপারটি লক্ষ্য ও অনুভব করা যাবে। এ গ্রন্থের অন্তর্গত নদী-নিসর্গ, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতীক-রূপেই ফররুখ আহমদ -এর দৃষ্টিতে ধরা দিয়েছে, এবং তিনি আদর্শ-আশ্রিত প্রতিভাসেই তা রূপায়িত করেছেন।” (ফররুখ আহমদ : কাফেলা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১৯৮০, ভূমিকা দ্রষ্টব্য)
‘কাফেলা’ কবির কাব্য-কুশলতার পরিচয় যেমন বিধৃত তেমনি এতে কবি-মানসের বিবর্তনও সুস্পষ্ট। কবির জীবন-দৃষ্টি, ভাব ও অনুভূতির ক্ষেত্রে যে উত্তরণ ঘটেছে তা এক সুনির্দিষ্ট পরিণতির দিকে অগ্রসর হয়েছে গ্রন্থের প্রথম ও নাম কবিতা ‘কাফেলা’য়। এই কবিতায় কবির দৃষ্টিভঙ্গির সাক্ষাৎ পাওয়া যায়।
ধূলির তুফান তুলি ওরা চলে রাত্রিদিন মরুর হাওয়ায়
ক্রমাগত ছায়া ফেলে ঘন জলপাই বনে, খেজুর শাখায়,
কোথায় চলেছে তারা কোন দূর ওয়েসিসে কিংবা সাহারায়;
জানি না কোথায়!
ঊটের ঘন্টার শব্দে ম্লান মরু-বালু ওড়ে, মুছে যায় বেলা,
ঝড়ের প্রশ্বাসে তার গ’ড়ে ওঠে ভেঙ্গে পড়ে ধরণীর ঢেলা,
ওরা সব দল বেঁধে উটের সারির আগে তবুও একেলা
চ’লেছে কাফেলা।
সাইমুমের স্রোতোবর্তে, গোবির বালুকা পথে, তারার বিস্ময়
ওড়ায়ে দু’রঙা ধূলি ঘূর্ণাবেগে কাফেলার নব পরিচয়
মুহূর্তে মুহূর্তে এই নার্গিস-ফোটানো দীর্ঘ পথের কিনারে;
মঞ্জিলের দ্বারে…
মহান আল্লাহর সৃষ্টির শুরু থেকে এ আদিম কাফেলা চলেছে তার লক্ষ্যপ্রাণে, তার সাথে সাথে সৃষ্টি করে যাচ্ছে নব নব ইতিহাস। সকল বাঁধা অতিক্রম করে কাফেলা তার নিজস্ব গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে নিরলস ক্লান্তিহীন দুর্গম পথের অভিযাত্রী হয়ে। কাপেলা যে ইতিহাস রচনা করে চলেছে, কবির স্বচ্ছন্দ বর্ণনায় সেই ইতিহাসের পটে পটে চিত্রপট তৈরি করে। যেমন :
জেরুজালেমের মাঠে তবু ভ্রাম্যমাণ সেই সুবিপুল ঝড়ে
জলপাই-শাখা হ’তে একে একে সবুজের চিহ্ন ঝ’রে পড়ে,
হেরেম বন্দর ফের নতুন ঊষার রাগে হ’য়েছে রঙিন;
শুরু হ’লো দিন।
পাথরে প্রশান্ত যেথা আতশী-পেয়ালা আর শাহ্ জামশীদ
কাফনের কালো নেশা নেকাব প্রচ্ছন্ন যার নাহি ভাঙে নি’দ
দু’পাশে ঘুমায় তার ইরানের শাহ্জাদী; ওঠে হাহাকার
নিঃশব্দ নিসাড়।
কখন সুরার পাত্র আল্ বোরজের প্রান্তে চূর্ণ হ’ল তার
ম্লান হ’য়ে নিভে এল বিলোল কটাক্ষ কত তম্বী জোহরার
আঙুর বনের হাওয়া থেমে যায়, নেমে আসে ধরণীর বেলা;
থামে না কাফেলা।
এ কাফেলা যে মরু-ঝড় তুলেছে, সে ঝড় একসময় আল বোরজের প্রাৗেল্প ইতিহাসের জীর্ণ পত্র ঝরে পড়ে, নব সভ্যতার ঊষার আলোয় উদ্ভাসিত হতে থাকে রোম-পারস্যের শাহী বালাখানা। দিগন্তের সে সোনালী আলোর রশ্মি কবি অবলোকন করেছেন, সে মরু-আলোর স্বপ্নে তাঁর মন ছিলো উন্মুখ। দুর্গম পথের আঁধারে আবদ্ধ সে আলোর বিচ্ছুরণ কাল-বিবর্তনের সাথে আবার পৃথিবী প্রান্তরকে আলোকিত করে তুলবে- কবির মনের এ অন্তহীন ভাবনার বীজ রোপন করেছেন ‘কাফেলা’ কবিতার শেষ পঙতিগুলোতে :
এরু বালুকার পথে অন্তহীন পদচিহ্ন এঁকে তারা চলে
দুই রঙ শাদা-কালো দিন-রাত্রি তাহাদেও সম্মুখে উছলে,
অন্ধকার নীড় হ’তে সূর্য-আলোকিত তনু টেনে আনে পাখী
অন্তরালে থাকি’…
এখনো চলেছে তারা ধূলির তুফান তুলে আকাশের গায়
ক্রমাগত ছায়া ফেলে ঘন জলপাই বনে, খেজুর শাখায়,
কোথায় চলেছে তারা কোন দূর ওয়েসিসে কিংবা সাহারায়;
জানি না কোথায়…
‘কাফেলা’ কবিতাটি যেন কবির অন্তহীন ভাবনার জগৎ ও জীবন স্বপ্নকেই মূর্ত করে তুলেছে। পৃথিবীর সীমাহীন প্রান্তরে কবি এক বোহেমিয়াণ। কবি সেই দুর্গম পথের যাত্রী হয়ে কাফেলার দলে মিশে সৃষ্টির আদিম লগ্ন থেকে দিগ-দিগন্ত পরিভ্রমণ শেষে আলোর দ্যুতিমালা আহরণ করে মানবজাতিকে তা উপহার দিয়েছেন।
‘কাফেলা’র দ্বিতীয় কবিতা ‘কাফেলা ও মনজিল’ -এ এসে কবি তাঁর স্বচ্ছ জীবনদৃষ্টি ফুটিয়ে তোলে। কবির মন এখানে কিছুটা দ্বিধান্বিত। একদিকে মনজিলের সুখ-শান্তি কবি-মনকে আকর্ষণ করে, অন্যদিকে অন্তহীন কাফেলার ক্ষান্তিহীন কঠিন পথচলার নেশাও কবির মনকে চঞ্চল করে তোলে। তাই মনযিলের আনন্দময় শান্তির নীড়ের প্রতি আকর্ষণ তাঁকে ধরে রাখতে পারে না। কবি বলেন :
মঞ্জিলের বাঁশী বলে, “নীড় বাঁধো এখানে তোমার।”
কাফেলার ধ্বনি বলে, “নয়, নয়, নয় আজো নয়।”
মঞ্জিলের বাঁশী বলে, “আনন্দের এসেছে সময়।”
কাফেলার ধ্বনি বলে, “র’য়েছে দুঃসহ গুরুভার,
নতুন মঞ্জিল পানে রেখায়িত, দিগন্ত যাত্রায়
সংকেত র’য়েছে প’ড়ে।” বাঁশী বলে, “ভোল সেই কথা,
অন্তহীন বালু পথে মনে করো সেই নিঃসঙ্গতা,
সেই অবিশ্রাম গতি, দুর্বহ পথের গুরুভার-”
…………………………………………..
কাফেলার পদধ্বনি মুছে যায়, নামে অন্ধকার,
মুসাফির দল তবু চলে সেই দীর্ঘ পথ চিনে;
দিগন্তে উজ্জ্বল হয়ে ফুটে ওঠে দৃষ্টি সেতারার।
‘কাফেলার পরবর্তী কবিতা ‘তায়েফের পথে’। মক্কার নিকটবর্তী তায়েফ নগরীর ইতিহাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন কবি এই কবিতায়। নবুয়ত লাভের পর হযরত মোহাম্মদ স. তায়েফবাসীদের নিকট দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে গেলে তা গ্রহণ না করে তায়েফের অধিবাসীরা মোহাম্মদ স.কে নির্মমভাবে নির্যাতন করে রক্তাক্ত করে দেয়। এই ঘটনায় স্বয়ং আল্লাহ পাক জিব্রাইল আ.কে পাঠিয়েছিলেন তায়েফবাসীদের উপযুক্ত শাস্তি দেয়ার জন্য। কিন্তু হযরত মোহাম্মদ স. আল্লাহর কাছে প্রাণ খুলে তায়েফবাসীদের জন্য দোয়া চাইলেন, যাতে তায়েফবাসীকে আল্লাহ হেদায়াত দান করেন এবং ইসলামের জন্য কবুল করেন। সে করুণ ইতিহাসের অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়েছেন কবি এভাবে :
হারালো তোমার নিশীথারণ্যে সাথী কাফেলা,
আজ পথ চলা সংগীবিহীন শুধু একেলা।
প্রতি পাথরের পথ লঙ্ঘিতে প্রলয়াঘাত
দুর্গম তার প্রতিবন্ধকে শোণিতপাত
প্রবল আঘাত, বাঁধায় আহত শুষ্কাধর!
তায়েফের পথে বেলা প’ড়ে এল সওদাঘর!
পরবর্তী কবিতা ‘মদীনার মুসাফির’। রাসূল স.-এর হিজরতের পর মক্কা থেকে আগত মোহাজির হিসেবে ইসলামের প্রথম চার খলিফা রাসূল স.-এর সাথে ছিলেন। ইসলামের এ চার মহান ব্যক্তিত্বের পরিচয় ও গুণাবলী তথা রাসূল স.-এর ইসলামী সমাজ-ব্যবস্থায় তাঁদের তুলনা ও ভূমিকা সম্পর্কে এই কবিতায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এখানে যেমন আত্মগত ভাবের প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি ঐতিহাসিক সত্যের আলোকে একটা উন্নত, মহৎ সমাজ ব্যবস্থার পরিচয় বিধৃত হয়েছে। যেমন :
তোমাকে পৌঁছিতে হবে সুবহে-সাদেকের আগে মরু-মদীনায় মুক্ত দ্বারে
যেখানে স্বপ্নের মত খোর্মা-বীথিকা শুধু দুলিয়াছে রাত্রির জোয়ারে
যেখানে বহিয়া বোঝা একমনে চলিয়াছে খলীফা ওমর
যেখানে সত্যের সংগী সিদ্দীক বেঁধেছে তার ঘর
যেখানে সিংহের মত ফিরেছে নির্ভীক আলী হায়দর।
………………………………………………..
তোমার ঘুমন্ত মনে তুলুক দুঃসহ ঝড়, গতি চঞ্চলতা।
তোমার মসৃণ সুপ্তি মুছে নিক সে মাটির তীব্র খরোতাপ
শৃগাল দুর্বলচিত্তে জাগা’ক সে কুষ্ঠাহীন সিংহের প্রতাপ।
তোমার সংকীর্ণ ঘর করুক সে মানুষের উন্মুক্ত বন্দর
তোমার দুর্বল চিত্তে পাঠাক সে বিজয়ের সহস্র খবর।
…………………………………………
তবু আজ অকুণ্ঠিত উটের লাগাম ধরো মদীনার পথে মুসাফির
ভেঙ্গে চলো জেহাদের তীব্রোল্লাসে বাধা ও প্রচীর,
ভেঙ্গে চলো সাবধানী কারুণের মুঠি।
ভেঙ্গে চলো উত্তাল ভ্রু-কুটি
তোমার মঞ্জিল যেথা বহুদূর মানুষের ঘর
নবীজীর ঘুমন্ত শহর।।
গ্রন্থের পরবর্তী কবিতা ‘খলিফাতুল মুস্লেমিন’ -এটি এককভাবে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারূক রা. সম্পর্কে রচিত। ইসলামি রাষ্ট্রের অধিনায়ক ওমরের পরিচয়, দায়িত্ববোধ ও কর্তব্যনিষ্ঠা সম্পর্কে এখানে বলা হয়েছে :
মহাকাল বাড়ানো অংগুলি
তোমার মুখের পানে অসীম সম্ভ্রমে…
এদীনার দীপশিখা নিভে গেল ক্রমে
তবুও চলেছ পথে ভারী বোঝা টেনে,
উল্কা তীর হেনে
আদম-ছুরাত
বলে গেল তার, দীর্ঘ রাত,
খেজুর শাখায় পরে
তারা জরে পড়ে-
বেদনার সুতীব্র দাহন
করিয়াছে তোমারে উন্মাদ,
কোন কন্টকিত রাত্রি, কোন মরু-বাঁধ
পারে নাই রুধিতে ও গতি
মানুষের দ্বরে দ্বারে অব্যাহত তবু মুক্ত গতি।
মুসলিম ইতিহাস-পুরান, ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্যভিত্তিক কবিতার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আরো যেসব কবিতার নাম উল্লেখ করা যায় তা হলো : এজিদের ছুরি, বেলাল, আলমগীর, কোন বিয়াবানে, নতুন সফর, নতুন মিনার, কাফেলার প্রতি, দুই মৃত্যু, হে আত্মবিস্মৃত সূর্য, জাগো সূর্য প্রদীপ্ত গৌরবে, স্বর্ণ-ঈগল, ইন্কিলাব ইত্যাদি। এ সকল কবিতায় মুসলিম চরিত্র, ইসলামি আদর্শ-ঐতিহ্য ও নবজাগরণের উদ্দীপ্ত চেতনার প্রকাশ ঘটেছে, যা ‘কাফেলা’ কাব্যে কবির বক্তব্যের ঋজুতা, আন্তরিকতা, ভাবের প্রকাশ ও প্রাণময়তা কবিতার আবেদনকে নিঃসন্দেহে হৃদয়গাহী করে তুলেছে।
ফররুখ আহমদ তাঁর স্বদেশের মাটিতে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভীতে, এবং প্রাকৃতিক পরিবেশেও যে গভীরভাবে নিজস্ব আদর্শ, বৈশিষ্ট্য ও স্বকীয়তার নোঙর বেঁধে রেখেছিলেন তা এ গ্রন্থের দ্বিতীর ভাগের কবিতাগুলো পড়ে তা উপলব্ধি ও অনুভব করা যায়। যেমন : বৈশাখ, ঝড়, বর্ষায়, পদ্মা, আরিচা-পারঘাটে, মেঘনা-তীরের চাষীকে ইত্যাদি কবিতা সমূহ এখানে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের মাটি-মানুষ, প্রকৃতি ও নিসর্গের সাথে কবির মমত্ব ও সম্পর্ক কত নিবির, গভীর ও অবিচ্ছেদ্য তা এ কবিতাগুলো পাঠে সম্যক উপলব্দি অনুভূত হবে। কিন্তু ফররুখ আহমদ নিসর্গের রূপ-সৌন্দর্য বর্ণনায় এবং প্রকৃতিক অনুধ্যানে সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং স্বতন্ত্র পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরেছেন। এ স্বাতন্ত্র্য দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনবোধে কবির নিজস্ব বিশ্বাস ও চেতনায় অপরূপভাবে মহিমান্বিত। এখানে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো :
বৈশাখ! তোমার স্রষ্টা জব্বার, কাহহার যিনি রহীম রহমান;
তাঁর ইশারায় জানি ফুলের পাপড়ি মেলে অগ্নিকুণ্ডে শিখা লেলিহান,
অশেষ রহমত যাঁর বৃষ্টিধারা নিয়ে আসে জীবনের নব রূপায়ন,
ধ্বংসের সমাধি স্তুপে সবুজ ঘাসের শীষে দেখা দেয় জান্নাত নূতন;
শহীদী লহুর স্পর্শে প্রাণবন্ত হয় ফের এ জমিন- কারবালার থাক;
তোমার ধ্বংসের সুরে অনাগত সৃষ্টি স্বপ্নে মন তাই উধাও বৈশাখ।।
(বৈশাখ)
প্রতিক্ষিত ক্ষণে আসে শিলাবৃষ্টি দুরন্ত ঝঞ্ঝায়,
বৈশাখী ধ্বংসলীলা তারপর হয় অবসান,
প্রশান্তির বার্তা আনে মিকাইল অঝোর বর্ঘায়…
চমর ধ্বংসের শেষে আসে নব সৃষ্টির আহবান,
তাইতো পরম কাম্য এ বিপ্লব- এ ঝড়ের গান।
(ঝড়)
বঙ্গোপসাগর থেকে এল ভেসে মেঘের কাফেলা
জীবনের বার্তা নিয়ে স্নিগ্ধ, শ্যাম-মমতা মেদুর,
পাড়ি দিয়ে বহু পথ, বালু-বক্ষ সমুদ্রের বেলা
………………………………………….
রুদ্ধগতি জীবনের দিয়ে তাই নতুন আহবান
ভোলায়ে মৃত্যু বা সুপ্তি, স্বপ্নালস রাত্রির আরাম,
ডবশ্রান্ত যাত্রীর প্রাণে তুলে তাই সমুদ্রের গান
এ বর্ষার নদী চলে (জিন্দেগানি পায় তার দাম
মঞ্জিলের মধ্যপথে চায় না যে নিষ্ক্রিয় বিশ্রাম)।
(বর্ষায়)
হে পদ্মা, প্রমত্ত নদী! হিমাদ্রির দুরন্ত সন্তান
কাটায়ে শৈশব তুমি সুদুর্গম পার্বত্য উপলে
উত্তপ্ত নিদাঘে কবে শুনেছ প্রাণের কলতান,
………………………………………..
জেনেছ সে দিন কেন বিশ্বে এই গতির স্পন্দন
হে পদ্মা, প্রমত্ত নদী! স্রষ্টার শক্তির নিদর্শন।
(পদ্মা)
বর্ষার মেঘের নীচে ছায়াচ্ছন্ন আরিচায় এসে
মনে হ’ল পারঘাট যেন এক নিষ্প্রাণ কবর
(জীবনের সব চিহ্ন মুছে গেছে এখানে নিঃশেষে)!
………………………………………………..
কী দুরন্ত গতিবেগ! কী উদ্দাম আনন্দ-অম্লান
যৌবনের কলোচ্ছ্বাসে গেয়ে যায় জীবনের গান।
(আরিচা-পারঘাটে)
‘কাফেলা’ গ্রন্থের আরো কিছু কবিতায় ফররুখ আহমদ -এর সজাগ দৃষ্টিভঙ্গিও নিদর্শন পাওয়া যায়। যেমন : দ্বীপ নির্মাণ, সৃষ্টি গান, ঈদের স্বপ্ন, নয়া সড়ক, শিকল, বিয়ান শড়কের গান, মেঘনা-তীরের চাষীকে। এ সকল কবিতাও কবির দেশপ্রেম, মাতৃত্বের প্রতি মমত্ববোধ, মানবিকতার পরিচয়, প্রকৃতি ও নিসর্গের প্রতি গভীর টান -এ সকল অনুভব সদায় উপস্থিত।
এ গ্রন্থ প্রসঙ্গে ফররুখ-গবেষক মুহম্মদ মতিউর রহমান লিখেছেন, “প্রকৃতি, মানবিক স্বপ্ন-কল্পনা ও আদর্শ-ঐতিহ্যের প্রত্যয়-দৃঢ় দ্যোতনার এক অপূর্ব সমন্বয় এবং রূপক প্রতীকের ব্যবহার, শব্দের অনায়াস কারুকাজ এ কাব্যের শরীরে এক দীপ্তিমান লাবণ্য ছড়িয়ে দিয়েছে। আবেগের সাথে কবির অভিজ্ঞতা ও চৈতন্য মিলিত হয়ে এ কাব্যের সম্ভাবনাকে অবারিত করেছে। একদিকে স্বকীয় ইতিহাস-ঐতিহ্যের সুগভীর চেতনা, অন্যদিকে স্বদেশের মাটি, মানুষ ও প্রকৃতির সাথে কবির গভীর আবেগময় সম্পর্কের দ্যোতনা এ কাব্যে সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি লাভ করেছে। এ দু’য়ের এক সুন্দর সমন্বয় ঘটেছে এখানে।” (অধ্যাপক মুহম্মদ মতিউর রহমান : ফররুখ প্রতিভা, হেরা পাবলিকেশন্স, ২য় সংস্করণ, জুন ২০০৮, পৃ. ১৫৪)
‘কাফেলা’ কাব্য ফররুখ আহমদের একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। এতে কবির একটা সামগ্রিকতার দিক আছে। তিনি একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের দৃশ্যপট বর্ণনা করেছেন, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের অপরূপ প্রকৃতির সৌন্দয়ের বর্ণনা দিয়েছেন। সে সাথে কবির দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে। ফলে ফররুখ আহমদেও কবি-মানসের সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় এতে ফুটে উঠেছে।