ফররুখ আহমদ তার একটি কবিতায় লিখেছেন
এখন দেখি চারপাশে
ক্ষুদ্র আর ইতর সত্তার আনাগোনা
বাঘের পরিত্যাক্ত অরণ্যে
ঘুরে বেড়াচ্ছে সংখ্যাহীন শৃগাল
[শেরে বাংলার মাজারে/কাফেলা]
এখানে বাঘ আর শৃগালের যে উপমা কিংবা রূপক তিনি ব্যবহার করেছেন তা তার ধারালো দৃষ্টিতে সমাজ পর্যবেক্ষণের ফলশ্র“তি। লক্ষনীয় যে তিনি এখানে এমন একটি অরণ্যের চিত্র এঁকেছেন বাঘ নিজেই যে অরণ্য পরিত্যাগ করেছে। ফলে শৃগালেরা সেখানে সংখ্যাহীন, ঘুরে বেড়াচ্ছে। এসব শৃগাল যেমন আকারে বাঘের তুলনায় ক্ষুদ্র, তেমনি সত্তায় ইতর। আপাতদৃষ্টিতে আক্রমণাÍক এই সরল পঙক্তিগুলোতে আমরা যদি ফররুখ আহমদকে সন্ধান করি তাহলে বাঘের রূপকেই তাকে খুঁজে পাবো। কেননা আমরা বরাবরই দেখে আসছি ফররুখ আহমদ তার চারপাশের ক্ষুদ্র আর ইতর সত্তার আনাগোনা লক্ষ করে নিজেকে এ জনারণ্য থেকে গুটিয়ে নেয়ার প্রাণান্ত প্রয়াস চালিয়েছেন। যা বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে কিংবদন্তিতে পর্যবসিত হয়েছে।

কিন্তু না, ফররুখ আহমদকে একটি বাঘের রূপকে আবিষ্কার করাই আমাদের উদ্দেশ্য নয়। যে কবি সিন্দবাদের মতো মাহনায়কের স্রষ্টা; হাতেম তায়ী’র মতো নিবেদিত প্রাণ বিনিদ্র সন্ধানীর আবিষ্কারক; স্বর্ণ-ঈগলের মতো ‘বিশাল তৃষ্ণা’ এবং ‘গতির বিদ্যুৎ নিয়ে, উদ্দাম ঝড়ের পাখা মেলে’ যিনি আল-বোরজের চূড়া পার হয়ে যান; সিন্ধু-ঈগলের মতো যিনি ‘নির্ভীক’, নেমে পড়েন ‘দরিয়ার হাম্মামে’; যার সৃষ্ট ‘দরিয়ার শাদা তাজী’ ‘দরিয়া-মরুর মরিচিকা পানে মাতাল দু:সাহসী’র মতো ছুটে চলে ‘অন্ধ’; যিনি প্রশস্তি রচনা করেন এমন এক মাহার্গ যাঁর ‘এ-হাতে বজ্রনির্ঘোষ যবে ও-হাত এনেছে গোলাব তুলি’; যিনি ‘জড়-পিন্ড নিস্ব-সভ্যতা’ ও ‘মৃত্য-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ’-এর ‘শৃঙ্খলগত মাংসপিন্ডে পদাঘাত’ হেনে ‘জাহান্নাম দ্বার-প্রান্তে’ টেনে নেয়ার ঘোষণা দেন; যে কবির চিত্ত ‘পূর্ণ করি বুক’, ‘রিক্ত করি বুক’ ‘রাত্রির অরণ্যতটে মুক্তপক্ষ নিভৃত ডাহুক’ হয়ে ওঠে; সকাল হলে পরে যে কবি অদ্ভুত আবেগ আর উত্তেজনায় দৃষ্টান্তস্থাপনকারীর ব্যাকুলতা হরণ করে ‘সাত সাগরের মাঝি’র ঘুম ভাঙাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন সে কবিকে শুধুই একটি বাঘ হিশেবে কল্পনা করা স্রেফ বোকামী।

দুই.
বাংলাসাহিত্যে গত শতাব্দীর চারের দশকে ফররুখ আহমদের উত্থানপর্ব তার সমকালকে গভীরভাবে আন্দোলিত করেছিলো। পরবর্তী দুই দশকের মাথায় সে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়েছিলো। চারের দশক থেকে চলমান বাংলাকাব্যের ইতিহাসটা নির্মোহ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলে আমরা সহজেই এর কারণ উদঘাটন করতে সক্ষম হবো। ছয়-এর দশক থেকেই ব্যাপকভাবে, আপাতদৃষ্টিতে কোনো এক অজানা কারণ ও উদ্ভট অজুহাতে ফররুখ আহমদকে বাংলাকবিতার ইতিহাস থেকে নির্বাসনে পাঠাবার একটি অদৃশ্য পরিকল্পনা কেউ কেউ প্রণয়ন করে ফেলেছিলেন। ফলে ছয়ের দশক থেকে পরবর্তী প্রজন্ম ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে ফররুখ কাব্যভান্ডারে রক্ষিত রত্নরাজির স্পর্শ থেকে। এটা অবশ্যই সুখের কথা হতে পারতো যদি পরবর্তী প্রজন্ম ফররুখের মর্মমূল যতো গভীরে পৌঁছেছিলো সে সীমা অতিক্রম করতে পারতো অথবা পারতো অন্তত স্পর্শ করতে।

ফররুখের পরবর্তী দশক অর্থাৎ পাঁচের দশকের কোনো কবিই ফররুখের প্রভাব-প্রতাপের স্পর্শ থেকে মুক্ত ছিলেন না। ঐ দশকের সেরা কবিরা ফররুখ আহমদের প্রতি পূর্ণমাত্রায় শ্রদ্ধাশীল থেকেছেন। এদের অনেকই ফররুখের ওপর একাধিক প্রবন্ধ ও কবিতা রচনা করে তাদের শ্রদ্ধার বহিপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। ঐ দশকেরই একজন খ্যাতিনামা কবি ফররুখ গবেষক হিশেবেও প্রসিদ্ধ লাভ করেছেন। এতো কিছুর পরও, এই দশকেই শুরু হয়েছে ফররুখের কবিতাকে একপেশে, খন্ডিত দৃষ্টিভঙ্গিতে বিচার করার প্রয়াস। এই প্রয়াস যদি শিল্পবাদী [শিল্পের জন্য শিল্প] দৃষ্টিভঙ্গিও গ্রহণ করতো তবুও এর প্রয়াসীর ফররুখের কাব্যবিচারে সংকট সৃষ্টি করতে পারতো না। বরং যারাই এই প্রয়াস চালিয়েছেন তারা এর শিল্পমূল্যের সাথে জড়িত প্রাণরসটা, অন্তর্গূঢ় আকাঙখাটাকে উপেক্ষার দৃষ্টিতে দেখেই খান্ত হয়নি; বিষয়বস্তুর দোহাই দিয়ে এর শিল্পমূল্যটাকেই উপেক্ষা করে বসেছেন।

যারা ফররুখ আহমদের কাব্যকে বিচার-বিবেচনাহীন ভাষায় আক্রমণ করেছেন তাদের অন্তত একজনকে আমরা উদাহরণ হিশেবে পেশ করতে পারি। হাসান হাফিজুর রহমান ‘আধুনিকতা ও ফররুখ আহমদ’ শীর্ষক এক রচনায় লিখেছেন ‘সিরাজাম মুনীরা-ও একটি কাব্যগ্রন্থ বটে কিন্তু এর প্রকৃত কাব্যমূল্য সম্পর্কে আশা করি কারো কোনো মোহ থাকার কথা নয়।’ উদ্ধৃত বাক্যটি অবশ্যই ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থটিকে একটি যেনোতেনো গ্রন্থ হিশেবে বিবেচনা করে। একই রচনায় তিনি বলেছেন, ‘ফররুখ আহমদের মুসলিম পুনর্জাগরণবোধ এবং সে বিষয়ের বক্তব্যকে কাব্য বলে ভুল কারার কোনো কারণ নেই। কবিতায় যে ধ্যান, কল্পনা ও চিত্রায়িত স্বপ্ন ফুটে ওঠে, কাব্য হলো তাই। এ সূত্রে সামান্য হেরফের অবশ্যম্ভাবী বিপর্যয় ডেকে আনে। ফররুখ আহমদই এই সংকটের এক বিশিষ্ট প্রমাণ।’ এখানেও দেখা যায় ফররুখ আহমদের বোধ ও বিষয়কে বিবেচনাগ্রাহ্য মনে করা হয়নি বরং তিনি তার বোধ ও বিষয়কে বিপর্যয় ডেকে এনে সংকট সৃষ্টি করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন। যদিও তিনি বলেছেন, ‘অতীতটা কাব্য নয়, অতীতকেন্দ্রিক আদর্শবোধও কাব্য নয়। কাব্য অতীত নির্ভর দূরায়ত স্বপ্নটা, আদর্শভিত্তিক উদ্বুদ্ধ আকাংখাটা।’ এ ক্ষেত্রে তিনি ‘সাত সাগরের মাঝি’ কাব্যগ্রন্থকে সাফল্যের নিদর্শন হিশেবে গ্রহণ করে ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থের কাব্যমূল্য সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্মোহভাব প্রকাশ করেছেন। দুটি কাব্যগ্রন্থের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে হাসান হাফিজুর রহমান বলেছেন, ‘তাঁর সফলতা ও বিফলতার পাল্লা সমানভাবে ভারী।’ তিনি সফলতার পাল্লায় রেখেছেন ‘সাত সাগরের মাঝি’কে আর বিফলতার পাল্লায় রেখেছেন ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থকে। আমরা হাসান হাফিজুর রহমানের উল্লেখিত বক্তব্যকে ফররুখ আহমদ সম্পর্কে অনুরুপ মনোভাব পোষণকারী অন্য সকলের বক্তব্যের একটি আদর্শ হিশেবে ধরে এ সর্ম্পকে বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ খুঁজবো।

একজন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থে সাফল্যের পাল্লা যতো ভারি দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থে বিফলতার পাল্লা ততোই ভারি। এ কথাটি বিশ্বাস করা কঠিন। কথাটি শুনতে যেমন অবিশ্বাস্য লাগে বাস্তবিকও তা-ই। এতোটা শিল্প-সচেতন যার প্রথম প্রকাশ তার দ্বিতীয় প্রকাশটা কিভাবে এতোটা শিল্প-অচেতন হতে পারে, বিশেষত দুটি গ্রন্থই যখন একই আদর্শচিত্ত থেকে উৎসারিত? এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার জন্য হাসান হফিজুর রহমানের উক্ত রচনা থেকে আরেকটি বাক্য আমরা উপস্থাপন করতে পারি- ‘অবশ্য নবী ও খোলাফায়ে রাশেদীন এবং অন্যান্য ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় বিষয়ের নাম মাহা ও গুরুত্বই যদি আমাদেরকে প্রথমেই বিচলিত করে ফেলে, তাহলে আমার বলবার কিছু নেই।’ এ বাক্যে খানিকটা আক্ষেপের সুর আছে। এর কারণ এ গ্রন্থটিও সমকালে কাব্যবোধ্যারা লুফে নিয়েছিলো।

প্রকৃতপক্ষে হাসান হাফিজুর রহমানের এতোটা হতাশা ব্যক্ত করার কোনোই কারণ ছিলো না। কেননা ‘সাত সাগরের মাঝি’র পরে ‘সিরাজাম মুনীরা’র মতো কাব্যগ্রন্থ রচনা করা অনিবার্য হয়ে পরেছিলো। ‘সাত সাগরের মাঝি’র যে মূল সুর; এ গ্রন্থে ফররুখ আহমদের যে ডাক, যে আহবান; সে ডাক কিংবা আহবানে সমবেত মাঝি-মাল্লাদের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট একটি রোডম্যাপের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিলো। তাদের দুর্গম অভিযাত্রার জন্য প্রয়োজন ছিলো একটি সুনিশ্চিত আদর্শ কিংবা মডেল। ‘সিরাজাম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থে ফররুখ আহমদ সেই আদর্শ কিংবা মডেল তুলির অপূর্ব আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন। এ কাব্যগ্রন্থেও হাসান হাফিজুর রহমানের কাংখিত ‘অতীত নির্ভর দূরায়ত স্বপ্ন’ এবং ‘আদর্শ ভিত্তিক উদ্বুদ্ধ আকাংখা’ রূপায়িত হয়েছে। কাব্যগ্রন্থটির কেন্দ্রীয় আদর্শ অতীত থেকে অনাগতকালের ব্যাপ্তি নিয়েই ভাস্বর। এর মুখ্য আদর্শ ‘সিরাজাম মুনীরা মুহম্মদ মুস্তফা [সাল্লাল্লাহু আলাইহি অ-সাল্লাম]’ কবিতায় রূপায়িত হয়েছে। ৩০২ পঙক্তির ৩০টি অসমান স্তবকে বিন্যাস্ত কবিতাটির অধিকাংশ পঙক্তিই একেকটি একক আঙ্গিকগত সম্পূর্ণতা লাভ করেছে। বিশাল এ কবিতাটির একটি পঙক্তিতে ফররুখ বলেছেন- ‘কালের তীব্র ঘন্টার ঝড়ে নেমে এলো নীচে মহাখবর’ এবং অন্য একটি পঙক্তিতে বলেছেন- ‘তোমার পথের প্রতি বালুকায় এখনো উদার আমন্ত্রণ’। উল্লেখিত পঙক্তি দুটির মধ্যেই আমরা হাসান হাফিজুর রহমান কথিত ‘অতীত নির্ভর দূরায়ত স্বপ্ন’ এবং ‘আদর্শ ভিত্তিক উদ্বুদ্ধ আকাংখাটা’ খুঁজে পাবো। ফররুখ আহমদ মহামানব মুহম্মদকে স্থান ও কালের গন্ডি অতিক্রম করে এই কবিতায় এক মহাকাব্যিক প্রণয়রাগে উপস্থাপন করেছেন। যে কবি মুহম্মদের আবির্ভাবকে কালের তীব্র ঘন্টার ঝড়ে নীচে নেমে আসা মহাখবর বলে অভিহিত করেছেন এবং মুহম্মদের পথের প্রতিটি বালুকণায় এখনো উদার আমন্ত্রণ বলে ঘোষণা করেন সে কবির কাব্যবোধ নিয়ে হাসান হাফিজুর রহমানের অনুরূপ মনোভাবই পরবর্তীকালে ব্যাপকভাবে সঞ্চারিত হয়েছে।

শুধু হাসান হাফিজুর রহমানই নয়; ফররুখ আহমদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু একই দশকের কবি সৈয়দ আলী আহসানও [ফররুখের কবিতার প্রভাব একদা তার কবিতাও পড়েছিলো, পরে দিক পরিবর্তন করেছন] পুরোপুরি সততার পরিচয় দিতে পারেননি। ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতাটিকে তিনি একটি ‘সরল প্রশস্তি’ বলে উল্লেখ করেছেন। প্রকৃতপক্ষে ‘সরল প্রশস্তি’ বলতে যা বোঝায় এ কবিতা মোটেও তা নয়। রাসূল সা.-এর গোটা জীবনটাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এ কবিতায়। কবিতার গঠন ও উপস্থাপন ভঙ্গির বিশেষত্ব; চিত্রকল্প, রূপক ও উপমা ব্যবহারের চাতুর্য এবং জীবন-দর্শনের সাথে এসব অলংকরণের গভীর সম্পর্ক কবিতাটিকে আধুনিক বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলোর একটিতে পরিণত করেছে। ‘সিরাজম মুনীরা’ কাব্যগ্রন্থের অন্য কোনো কবিতাই শিল্প বিচারে এ কবিতাটির সমতুল্য নয়। গ্রন্থের ‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতাটিকে মনে হয় অনেকগুলো তারার ওপর একটি চাঁদ। এই একটি কবিতার জন্যই গ্রন্থটিকে ‘সাত সাগরের মাঝি’র সমান কিংবা বেশি মর্যাদা দেয়া সম্ভব। কবিতাটি ফররুখ আহমদের একটি বিস্ময়কর সাফল্য। সল্প পরিসরে, তাৎপর্যপূর্ণ কাব্যভাষায়, নিপুন গঠনে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুহম্মদ সা.-এর জীবন, জীবন-দর্শনও বিশ্বচরাচরে এর প্রভাবের চিত্র ফুটিয়ে তুলতে ফররুখ যতটা সার্থকতার পরিচয় দিয়েছেন আধুনিক বাংলা কবিতায় আর কারো পক্ষে তা সম্ভব হয়নি।

‘সিরাজাম মুনীরা’ কবিতাটিকে একজন অভিজ্ঞ পাঠকের দৃষ্টিতে অনুসন্ধান করে দেখা যেতে পারে- ‘কবিতাটিতে যে বিশ্বাস এবং আবেগ প্রকাশ পেয়েছে তার সঙ্গে সকল পাঠক একমত নাও হতে পারেন। সে ক্ষেত্রে তারা কবিতাটি উপভোগ করতে পারবেন কিনা সে প্রশ্ন উঠতে পারে। আমরা হোমান-ভার্জিল পড়ি এবং উপভোগ করি। যদিও আমরা তাঁদের দেবদেবীতে বিশ্বাস করি না, কারণ তাঁদের লেখা আমরা কবিতা হিশেবে পড়ি। কবিতা উপভোগ করতে হলে কবির বিশ্বাসের সাথে একমত হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। আসল কথা হলো কবি তার বিশ্বাস বা আবেগকে কবিতায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন কিনা। সার্থক কবিতার বক্তব্য বা আবেগ ফ্লাট এক্সপ্রেমেন্ট হয়ে থাকে। ফররুখ তাঁর এই কবিতাটিতে যে বিশ্বাস ও আবেগ প্রকাশ করেছেন তা উপস্থাপিত তথ্য বা ঘটনা থেকে উৎসারিত। অতএব কবিতাটি উপভোগ করতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। যদি হয়ও তাহলে কবিতা পড়ার সময় ….. থাকে ………………………………….. বলেছেন সেই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। [ফররুখের নির্বাচিত কবিতার নিগূঢ় পাঠ- সদরুদ্দিন আহমেদ]

উক্ত পাঠকের উল্লেখিত সিদ্ধান্ত হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা অনুরূপ ধারনা পোষণকারী ব্যক্তিবর্গকে ক্ষাণিকটা শিক্খিত করে তুলতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস এবং যে কারণে হাসান হাফিজুর রহমান তার উল্লেখিত রচনায় আক্ষেপ করেছেন সে কারণটি স্বয়ং তার এবং অনুরূপ ধারণা পোষণখারীদের বেলায় প্রযোজ্য বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেছেন. ‘ধর্মীয় নেতা ধর্মীয় বিষয়ের নাম-মহাÍ ও গুরুত্বই যদি আমাদেরকে প্রথমে বিচলিত করে ফেলে…’ প্রকৃতপক্ষে ধর্মীয় নেতা, ধর্মীয় বিষয়ের নাম-মাহাÍ ও গুরুত্ব হাসান হাফিজুর রহমান এবং অনুরূপ ধারনা পোষণকারী ব্যর্থ প্রতিভাবানদেরকেই প্রথমে বিচলিত করে ফেলে। তারা ধর্মীয় বিষয় সামনে এলেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, এটা অতীত এবং অতীতকেন্দ্রীক আদর্শবোধ। সুতরাং এ নিয়ে কবিতা হয় না। অপরপক্ষে ফররুখ আহমদের মতো আদর্শ ও শিল্পের প্রতি সমান্তরালভাবে প্রতিশ্র“তিশীল মহাপ্রাণ প্রতিভা হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা অনুরূপ ধারনা পোষণকারী ‘অতি আধুনিক কবি’ তথা ব্যর্থ ও সংকীর্ণচেতা প্রতিভাবানদের চোখ ফাঁটি দিয়ে সকল বিষয়কেই কবিতা করে তুলতে সক্ষম। তবুও ফররুখের এই গ্রন্থটিকে ভিন্ন চোখে দেখার কিংবা তার সামগ্রিক কাব্যকর্মকে ঐ একই অভিযোগ তুলে ভিন্ন চোখে দেখার কারণ কিংবা উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন।

তিন.
বলে রাখা ভালো, কোনো সমালোচকের আক্রমণত্মক সমালোচনার প্রতিউত্তর দেয়াও আমাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং আমরা ফররুখকে আবিষ্কার করতে চাই তার নিজস্ব শিল্পবোধের মাপকাঠি দিয়ে। আমরা একটু অনুসন্ধানী হতে চাই। ফররুখ আহমদের কাব্যবোধ কিংবা রসবোধ কতোটা তীব্র ছিলো তা আমরা একটি ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করতে পারি। ফররুখ আহমদ ঠাট্টা করে বলতো, ‘কবি সাহেব ইসলামকে এতো ভালোবাসেন যে কবিতাকে হত্যা করে ইসলামকে সম্মান করছেন’ [সতত স্বাগত- সৈয়দ আলী আহসান]। ফররুখের কথিত এই কবি যিনিই হন না কেনো কবিতার শিল্পমান সম্পর্কে ফররুখ চিত্ত কতোটা স্পর্শকাতর ছিলো তা এই ঠাট্টার মধ্যেই ধরা পড়ে। যে কবিকে নিয়ে ঠট্টা করেছেন সে কবিও ফররুখের মতোই ইসলামী আদর্শের কবি কিন্তু শিল্পের দাবি পূরণ না হওয়ায় ফররুখের এই ঠাট্টা। এতেই ক্ষান্ত হননি ফররুখ। তিনি অত্যন্ত সরল ভাষায় লিখেছেন-
কোরআন সুন্নার রোশনিতে যা হয়নি রওশন
তাকে কিছুতেই বলা চলে না ইসলাম,
আর শিল্পবিচারে যা হয়নি উত্তীর্ণ
তাকেও কোনোমতে বলা চলে না সাহিত্য
অতপর তিনি বলেন-
আর এজন্যেই
ইসলামী সাহিত্যের নামে
এমন জিনিস আমরা দেখতে পাই অনেক সময়
যা ইসলামীও নায় সাহিত্যও নয়। [হাবেদা মরুর কাহিনী]
উপরের বক্তব্য থেকে আমরা ফররুখ আহমদের শিল্পমানস সহজেই আবিষ্কার করতে পারি। তিনি ইসলামকে হত্যা করে কবিতাকে সম্মান করার পক্ষে যেমন ছিলেন না তেমনি কবিতাকে হত্যা করে ইসলামকে সম্মান করার পক্ষেও ছিলেন না। ইসলাম ও কবিতাকে তিনি একই সাথে জীবন চর্চার অবলম্বন বানিয়ে নিয়েছেন।

ফররুখ আহমদ জানতেন ‘শিল্পীর নৈপুণ্য’। তার ‘পরিমিতি বোধ’ও ছিলো গভীর। তিনি জানতেন ‘নি®প্রাণ সরোদ’ কিভাবে সুরজাল সৃষ্টি করে। অন্য দিকে মূল্যাবন সুরযন্ত্র আনাড়ির হাতে পড়লে শ্রোতাদের অবস্থা কী হয়, তাও তিনি জানতেন। ফররুখ আহমদই লিখেছেন-
শিল্পীর নৈপুণ্য বুঝি দেখে তার পরিমিতি বোধ
স্পর্শে তার সুরজাল সৃষ্টি করে নি®প্রাণ সরোদ
কিন্তু আনাড়ির হাতে পড়ে যদি যন্ত্র মূল্যবান
কিঞ্চিৎ আলাপে তার শ্রোতাদের ওষ্ঠাগত প্রাণ
[শিল্পী/হাল্কা লেখা]

পাঁচ-এর দশকের কোনো কোনো কবিকে নিয়ে একদা খুবই উচ্চাশা ব্যক্ত করা হতো। আজ সে উচ্চাশার আবরণ খসে পড়েছে। ফুরিয়ে গেছে সে আবেদন। অপরদিকে ফররুখ আহমদ ক্রম উন্মোচিত হচ্ছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের হাতে। ‘অতি আধুনিক কবি’দের জারিজুরি ফররুখ আহমদ ভালো ভাবেই জানতেন। তিনি জানতেন এদের মেয়াদকাল খুবই স্বল্প। ‘অতি আধুনিক কবিকে’ শিরোনামের অনুস্বার কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় ফররুখ বলেছেন, ‘সুরের প্রাচীন সংজ্ঞা’ ভুলে যাওয়া এইসব ‘আড়ষ্ট কাক’ ‘আঙ্গিকের ফাঁক গুঁজে নিতে কৃত্রিম বাহবা’ প্রত্যাশা করে কিন্তু শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে গলাধাক্কা খেয়ে কাব্যকুঞ্জ থেকে বিতাড়িত হয়ে শ্মশানে রাত কাটায়। এ রকম কবিদের ব্যাপারেই ফররুখ আক্ষেপ করে ঐ কবিতায় বলেছেন-
এসব হ’ত না যদি মানবতা বুকের তলায়
কিছুটা আসন পেত; কবিতা ফুটিত সাহারায়।

যদি কোন বেরসিক করে উল্টা শিল্পের বিচার
ছেড়ে যেতে রাজি আছি নির্বোধ ব্যক্তির কারবার
শুধু সচকিত হই এ সংবাদে কখনো কখনো
সমালোচনার ভার নেয় যদি ব্যর্থ শিল্পী কোনো
[মন্তব্য]
পচা শামুকের ধার
বেঁচে আছে কিংবদন্তী হয়ে
‘পা কাটার যম’ করা
চিন্তা করে দেখো স্থির হয়ে
        [শিল্প-বিচার/হাল্কা লেখা] 

চার.
হাসান হাফিজুর রহমান ও অনরূপ মনোভাব পোষণকারীদের তাৎপর্যহীন কাব্যবিচার পরবর্তী প্রজন্মকে ফররুখ থেকে কিছুটা দূরে ঠেলে দিলেও সেটা ছিলো সাময়িক। ছয়ের দশকের কবি ও খ্যাতনামা সাহিত্য সমালোচক আবদুল মান্নান সৈয়দ অনেক দেরিতে হলেও এই উপলব্ধিতে পৌঁছেছেন যে, ‘যত দিন যাচ্ছে ততোই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ফররুখ আহমদ [১৯১৮-৭৪] এক বহুমাত্রিক, বহুকক্ষময়, ক্রমবিবর্তিত, আÍঅতিক্রমী ও গতিশীল কবির নাম। এক যুগেরও আগে, যখন ফররুখ কাব্যের সঙ্গে আমার ততো ঘনিষ্ঠ পরিচয় হয়নি [এখনো তাঁকে সার্বিক জানিবার অনেক বাকি আছে], তখনো আমার মনে হয়েছিলো ‘সম্ভবত ফররুখ আহমদই চল্লিশের দশকের দুই বাংলার কবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।’ এখন এ বিষয়ে আমি সম্পূর্ণ নি:সংশয়। ফররুখ আহমদের কবিতা তথা সাহিত্য একটির পর একটি বৃত্ত অতিক্রম করে গেছে; আপাতভাবে তা সাযুজ্যরহিত; কিন্তু শেষ অবদি তা একটি মৌচাকেরই বিভিন্ন কোটরা।’ ফররুখ আহমদের মৃত্যুর বরাবর দুই দশক পরে প্রকাশিত তাঁর সম্পূর্ণ প্রেমের কাব্যগ্রন্থ ‘দলরুবা’র ভূমিকায় আবদুল মান্নান সৈদয় তার এ অভিমত ব্যক্ত করেন। আবদুল মান্নান সৈয়দের এই উপলব্দিতে পৌঁছাতে এতো দেরি হওয়ার পেছনে ফররুখ আহমকে আড়াল করে রাখার প্রচেষ্টা নিয়োজিত ব্যক্তিদের অনেক বড় অবদান রয়েছে। এসব ব্যক্তিবর্গের কল্যাণেই স্বাধীনতাউত্তর বিগত সাড়ে তিন দশক ধরে ফররুখ বিমুখীনতা সৃষ্টির প্রয়াসটি কখনো বন্ধ হয়নি। ক্ষীণ হলেও ধারাটি অব্যাহত রয়েছে এবং ক্রমেই শক্তি লাভ করছে। অজ্ঞান হেতু হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা অনরূপ ধারণা পোষণকারীরা ………………. গ্রহণ করতে পারেননি। ফলে তারা ফররুখ কাব্যবিচারে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। বাংলাভাষার সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর জীবনাদর্শ যে ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রস্ফুটিত। যার সাথে এই জনগোষ্ঠীর ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আবেগ-ভালোবাসার সম্পর্ক সেই মহান ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে রচিত কাব্যের রস আস্বাদন করা সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীর প্েকষ যেমন সহজ তেমনি কঠিন শেকড়চ্যূত কতিপয়ের পক্ষে। এদের মধ্যেও কেউ কেউ ……….এর তত্বকে গ্রহণ করে ফররুখ কাব্যের যথার্থ বিচার ও অবশ্য করেছেন। একটি উদ্ধৃতি দেয় যেতে পারেÑ ‘আমরা যারা কিছুটা বিপরীতপন্থী, তারাও তার কবিতায় ধর্মীয় চেতনা ও ঐতিহ্যের একটা অনাবিল স্বাদ পেয়ে থাকি। তাঁর বিশ্বাস আর উপলব্ধি অকৃত্রিম আর একান্ত আন্তরিক বলে, এ ধরনের ভাবাদর্শে রচিত বহু কবিতা হয়ে উঠেছে উজ্জ্বল, উচ্ছল ও হৃদয়স্পর্শী, অনড় বিশ্বাস আর আবেগের তোড়ে তিনি খাঁটি কবিতা সীমা সংঘন করেননি; বক্তব্যের উচ্চরোল অনেক সময় কবিতাকে বিঘ্ন করে, ফররুখ আহমদের বেলায় তা ঘটেনি; কবিতার মূলে কণ্ঠস্বরের দাম বাড়াবার কোশেস করেননি তিনি। খাঁটি কবির এসব লক্ষণ, তাঁর কবিসত্তার মর্মমূলে সব সময় সক্রিয় ছিলো বলে তাঁর কবিতা কখনো হয়ে পড়েনি স্রেফ প্রচার সর্বস্ব, তাঁর পাঠকের পক্ষে এটি চরম সৌভাগ্যের কথা। [তাঁর বিশ্বাস অকৃত্রিম- আবুল ফজল] এই আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা ফররুখ কাব্য বিচারের সংকটটি উদঘাটন করতে চেয়েছি এবং এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি যে, প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিতে ফররুখের কবিতাকে বিচার করতে গিয়ে অনেকেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। ফররুখ আহমদের মতো বিরল কবিসত্তার কাব্যবিচারের দৃষ্টিভঙ্গি যে ভিন্নমাত্র দাবি করে, তা যারা গ্রাহ্য করেনটি তারাই ফররুখ কাব্যবিচারের সংকট করেছেন। ………… কথিত …………………… এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে। হাসান হাফিজুর রহমান দাবি করেছেন যে, ফররুখ কাব্য ও আদর্শকে গুলিয়ে ফেলেছেন এবং এ ক্ষেত্রে তিনি একটি বড় সংকট সৃষ্টি করেছেন। বস্তুত, হাসান হাফিজুর রহমান বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, ‘সাত সাগরের মাঝি’র মতো কাব্য দ্বিতীয় বার সৃষ্টি করা যায় না এবং সেটার কোনো প্রয়োজনও নেই। এ কারণেই ফররুখ আহমদকে ভিন্ন মাত্রায় কাব্য সৃষ্টিতে হাত দিতে হয়েছে। নতুবা অনুমান করা সহজ, রিপিটেশনের মারাÍক রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়তো ফররুখের কবিতা। ফররুখ নিজেই তা হতে দেননি। তিনি তার প্রতিটি গ্রন্থকেই স্বকীয়তায়, স্বাতন্ত্র্যে, বিত্ত-বৈভবে; সর্বোপরি নতুনত্বে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। এ কারণেই ‘সাত সাগরের মাঝি’ থেকে ‘সিরাজাম মুনীরা’র অনেক দূরত্ব; অন্য কারণে নয়। এক্ষেত্রে আরও কিছু কথা উচ্চারণের দাবি রাখে। ফররুখ কাব্যের রস আস্বাদনে ……… এর ………………… তত্ত্ব সবার প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হতে পারে তাদেরই যারা ফররুখ আহমদের জীবন-দর্শনে বিশ্বাসী নয়। বরং ফররুখ যে জীবন-দর্শনে বিশ্বাস করে বাংলা ভাষী অধিকাংশ জনগোষ্ঠী সেই একই জীবন-দর্শনে বিশ্বাস করে। ফলে ফররুখের কাব্যভান্ডার তাদের নিকট অমৃতভান্ডারের মতোই। অন্য দিকে ফররুখের জীবন-দর্শনে বিশ্বাসী না হয়েও যে ফররুখ কাব্যের রস আস্বাদন সম্ভব তা আবুল ফজলের আÍকথন ও সদরুদ্দিন আহমদের বিশ্লেষণ থেকে আমরা সহজেই অনুধাবন করতে পারি। তিনি তার জীবন-দর্শনকে যেমন কবিতার ভিত্তিভূমি বানিয়েছেন তেমনি কবিতাকে বানিয়েছেন জীবন-দর্শনের নিদর্শন।

পাঁচ.
ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের একটি একক এবং সম্পূর্ণ অধ্যায়। তিনি একজন কবি। কবি হিশেবে তার রয়েছে নিজস্ব একটি পোয়েটিক ডিকশন, রয়েছে তার সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র একটি উচ্চারণ ভঙ্গি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতায় অনেকগুলো নতুন চরিত্র সৃষ্টি করেছেন। এসব চরিত্র ফররুখের কবিতায় নতুন করে প্রাণ লাভ করেছে। রূপক ও প্রতীকের নতুন নতুন ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করেছেন তিনি।

ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যের এমন এক বিরল কবি যার সাথে সহসাই কাউকে তুলনা করা বাতুলতা মাত্র। নানা প্রেক্ষিতে নানা কবির সাথে তাকে তুলনা করা যায় বটে কিন্তু সামগ্রিক বিচারে তাকে অন্য কোনো কবির সাথে সহসাই তুলনা করা যায় না। তার জীবনে ডিগবাজির কোনো ইতিহাস নেই, নেই স্খলনের কোনো অধ্যায়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি তার জীবন-দর্শনে ছিলেন অনঢ়, অটল। তাঁর সৃষ্টিকর্ম বহুরূপে, বহুমাত্রায় জীবনের নানা স্তরকে স্পর্শ করে গেছে। তিনি যখন রচনা করেন-
ওড়াও ঝান্ডা খুনেরা লাল
ওড়াও আকাশে আল-হেলাল
খঞ্জরে ভাঙ্গো জিঞ্জির ভীতি
কাঁপুক দুনিয়া টালমাটাল। [ওড়াও ঝান্ডা- আজাদ করো পাকিস্তান]
তখন তিনি যে আদর্শে উদ্বুদ্ধ; আবার তখনও যখন তিনি রচনা করেন-
আমার হৃদয় স্তব্ধ, বোবা হয়ে আছে বেদনায়
যেমন পদ্মের কুঁড়ি নিরুত্তর থাকে হীমরাতে
যেমন নি:সঙ্গ পাখি একা আর ফেরে না বাসাতে
তেমনি আমার মন মুক্তি আর খোঁজে না কথায়। [ক্লান্তি- মুহূর্তের কবিতা]
সেই একই আদর্শে অটল, উদ্বুদ্ধ। আদর্শের ফাঁকা বুলিতে তিনি মুক্তি খুঁজে পাননি। নতুন অভিজ্ঞান তথা প্রকৃত কর্মাজ্ঞে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য তার মন সিন্দবাদের মতোই স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছিলো।

এস সময় তিনি শ্লোগান দিয়ে স্বাধীনতা এনেছেন, সেই স্বাধীনতাই পরবর্তীকালে ফররুখ আহমদের মেতা একজন কবিকে পরাধীন করতে চাইলো। ফররুখ সেই পরাধীনতা থেকেও মুক্তি খুঁজলেন। খুঁজলেন স্বাধীনতা, খুঁজলেন জাতিসত্তার মুক্তি। কিন্তু জীবন-দর্শনে তিনি থাকলেন অনঢ়।

ফররুখ আহমদ ‘হাতেম তা’য়ী’ নামে একটি বিশাল কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন। এ গ্রন্থটিতে কেউ কাহিনীকাব্য বলেন; কেউ বলেন মহাকাব্য। সমকালের কোনো কোনো সমালোচক গ্রন্থটিকে ফররুখ আহমদের কবিকৃতির শ্রেষ্ঠ অবদান বলেও উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাতেম বহুমাত্রিকতায় উত্তীর্ণ। তার জ্ঞানস্পৃহা যেমন, তেমনি তার মানবিক দায়িত্ববোধ এবং একই সমান্তরালে হাতেমকে খুঁজে পাওয়া যায় উদারচিত্ত দাতার ভূমিকায়; ত্যাগী, কষ্ট-সহিষু, দুসাহসী এবং ঈমানদার হিসেবেও আমরা এখানে আবিষ্কার করি। ফররুখের বিষয় নিবৃাচন নি:সন্দেহে সার্থক। মাহকাব্যের নায়ক সৃষ্টি করার জন্য হাতেমের চেয়ে উপযুক্ত কোনো পাত্রের কথা ভাবা কঠিন, ফররুখ আহমদের মতো আদর্শের অবকাঠামো একজন কবির নিকট। সবকিছু ছাপিয়ে হাতেম তা’য়ী কাব্যে যে দুর্নিবার সংরাগ ফুটে ওঠে তা হচ্ছে অন্বেষণ। হাতেমের কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়-
মৃত্যুর ভয়ে যাত্রী থেমেছে কবে?
জানি না যা আমি দুনিয়া জাহানে- তাকে জানতেই হবে।
তার এই জ্ঞান অন্বেষণ মানবতাকে সংকট থেকে উদ্ধারের জন্য, বঞ্চিত দুই তরুণ-তরুণীকে বঞ্চনার হাত থেকে উদ্ধারের জন্য। এইভাবেই হাতেম তা’য়ীকে যতোটা রোমান্টিক তারচে বেশি ক্লাসিক চরিত্রে প্রকাশ করেছেন ফররুখ আহমদ।

সবধরণের জাতীয়তাবাদের উর্ধ্বে [ভৌগলিক এবং ধর্মীয়] এক সর্বমানবিক আন্তর্জাতিক চেতনায় রূপায়ন ঘটানোই ছিলো ফররুখ আহমদের উদ্দেশ্য। সে উদ্দেশ্য পূরণে হাতেম তা’য়ীর কোনো বিকল্প ছিলো বলে আমাদের জানা নেই। বাংলা ভাষার প্রথম আধুনিক মহাকাব্যের রচয়িতা। মাইকেল মধূসুদনের ‘মেঘনাদবদ’ যেমন রামনায়নের নবরূপায়ন তেমনি সর্বশেষ মহাকাব্যের রচয়িতা ফররুখ আহমদের ‘হাতেম তা’য়ী’ ঐতিহাসিক চরিত্র ও পুথিসাহিত্যের নবরূপায়ন। ফররুখ আহমদের এই কাব্যের বিশেষÍ তার সর্বপ্লাবী মানবিকতায়। তিনি তাঁর সৃষ্টিকর্মের সকল সত্রে এই বিশেষত্বটি অটুট রেখে ছেন। ফলে তার কাব্যকর্ম লাভ করেছে বিশেষ মাত্রা।

‘সাত সাগরের মাঝি’র বিখ্যাত সব কবিতাগুলো সমালোচকগণ প্রায়ই বিখ্যাত সব ইংরেজী কবিতার সাথে তুলনা করে থাকেন। এক্ষেত্রেও সমালোচকগণ ঐসব ইংরেজি কবিতার চেয়ে ফররুখের কবিতাকে বেশি আবেদন সৃষ্টিকারী বলে রায় দেয়। যেমন টেনিসনের ইউলিসিসের সাথে ফররুখের সিন্দবাদের তুলনার সরতে গিয়ে তারা বলেন, ইউলিসিস যেখানে স্রেফ এডভেন্সারের উত্তেজনা সৃষ্টি করে সেখানে ফররুখের সিন্দবাদের এডভেন্সার মানবিক উদ্দেশ্যপূর্ণ হওয়ায় আরও গভীর তাৎপর্য ও আবেদন সৃষ্টি করে। ডাহুক কবিতাকে কিটসের নাইটিঙ্গেল, শেলীর স্কাইর্লক জাতীয় কবিতা থেকে একই কারণে অধিক আবেদন সৃষ্টিকারী বলেও তারা রায় দেয়।

ফররুখ এই অতিমাত্রিক অর্জন করেছেন তার জীবন-দর্শন থেকেই। জীবন-দর্শনের অনন্যতাই তার কাব্য-দর্শনকে অনন্য করে তুলেছে। শুধু যে, ‘সাত সাগরের মাঝি’র বইয়েও বহু কবিতা খুঁজে পাওয়া যাবে সেগুলো কালজয়ী আবেদন সৃষ্টিকারী সুতরাং ফররুখ কাব্যবিচারের ক্ষেত্রে ফররুখের জীবন-দর্শনকে যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে। তাহলেই ফররুখ কাব্য বিচারে বিদ্যমান সংকট দূরীভূত হবে।

ছয়.
বাংলা সাহিত্য ফররুখ আহমদ সর্বাধিক সংখ্যক সার্থক সনেটের রচয়িতা বলেও প্রতীয়মান হয়। ব্যাঙগ কবিতার ক্ষেত্রে ফররুখ আহমদের রয়েছে একটি একক অবস্থান। তার সৃষ্ট অসংখ্য ব্যাঙগ কবিতার পাশাপাশি ‘ঐতিহাসিক-অনৈতিহাসিক কাব্য’ বিশেষ গুরুত্ব ও মাত্র বহনকারী। শিশু-সাহিত্য সৃষ্টিকেও তাঁর সমুজ্জ্বল ভূমিকা কারো অবিদিত হয়। তবুও ক্ষুদ্র আর ইতরসত্তার ব্যাপক আনাগোনা যেখানে সেখানে ফররুখ আহমদের বিশালত্ব পরিমাপ করাকঠিন বটে। সুতরাং বস্তুগত জীবনের মোহ থেকে স্বেচ্ছা নিবৃাসিত, কবিতায় নিবেদিত ফররুখ আহমদকে শুধুই একটি বাঘের রূপকে কল্পনা করা ঠিক হবে না। ফররুখ আহমদ বাঘের চেয়েও অধিখ ক্ষিপ্র এক প্রতিভা।