ফররুখ আহমদকে ‘রোমান্টিক কবি’, ‘মুসলিম জাগরণের কবি’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। তাঁর এ পরিচয়ের যথেষ্ট ভিত্তি আছে; কিন্তু যে কথাটি তেমন গুরুত্ব পায়নি সেটি হলো : তিনি একজন ক্ষুধিত মানুষের কবি। তাঁর বহু কবিতায় তিনি ক্ষুধিত মানুষের কথা লিখেছেন, মজলুম জনতার দুঃখ-বেদনায় ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। বর্তমান প্রবন্ধে এ বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে।
‘পাঞ্জেরী’ কবিতায় তিনি রূপকের মাধ্যমে জাতির- মুসলিম জাতির- বর্তমান দুর্দশার একটি করুণ চিত্র এঁকেছেন। ঘন কুয়াশার মধ্যে দিক-চিহ্নহীন সমুদ্রে লক্ষ্যহীনভাবে জাহাজ চলেছে। পাঞ্জেরী- মাস্তুলে অবস্থানকারী দিক-নির্দেশক- ঘুমিয়ে আছেন। এক শ্রান্ত অবসাদগ্রস্ত নাবিক দাঁড় টেনে চলেছে। নাবিক পাঞ্জেরীকে জেগে ওঠার জন্য জোর তাগিদ দিচ্ছে। তিনি জেগে না উঠলে কি হবে তার একটা ভয়ঙ্কর চিত্র আঁকা হয়েছে। বন্দরে কিসের গর্জন শোনা যাচ্ছে। এ গর্জন ক্ষুধার্ত মানুষের গর্জন, তাদের বিক্ষোভের শব্দ। পাঞ্জেরী জেগে না উঠলে তারা ক্রোধে ফেটে পড়বে, সবকিছু ভেঙে চুরমার করে দেবে। ক্ষুধিত মানুষের এ তীব্র ভ্রুকুটি, এ বিক্ষোভ একটা পটভূমিতে স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে একটা নাটকীয়তা আছে এ অর্থে যে বক্তব্যটি পূর্বে উল্লিখিত ঘটনার অনিবার্য পরিণতি। পরিণতি এখনো ঠিক সংঘটিত হয়নি, কিন্তু এর সুস্পষ্ট আভাস দেয়া হয়েছে। আমরা জানি ক্ষুধিত মানুষ দু’ভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ঃ অনাহারের যন্ত্রণা নীরবে সহ্য করে, অথবা প্রতিবাদ জানায়, বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ক্ষুধিত মানুষের শেষোক্ত প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত কবিতার পরিসমাপ্তিতে উল্লেখ করে কবি জাতির কর্ণধারদের নিষ্ক্রিয়তার বিরুদ্ধে ধূমায়িত অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
‘সাত সাগরের মাঝি’ কবিতায় অনুরূপ বক্তব্য পেশ করা হয়েছে অনুরূপ পরিস্থিতিতে। এখানে পাঞ্জেরীর পরিবর্তে মাঝিকে সম্বোধন করা হয়েছে। বক্তা মাঝি-মাল্লাদের কেউ নন। তবে তিনি মাঝির দীর্ঘ ঘুমের প্রেক্ষিতে তাকে জাগিয়ে তোলার নানা কৌশল অবলম্বন করেছেন। অচল জাহাজের ছবির পাশাপাশি একটি সচল বেগবান জাহাজের চিত্রকল্প স্থাপন করে মাঝিকে জেগে ওঠার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরপর দুয়ারে গর্জনের শব্দের বিবরণ দিয়েছেন। এ গর্জন সাপের গর্জন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে তা নয়- এ গর্জন ক্ষুধিত মানুষের বিক্ষোভের গর্জন। তারা বেসাতী চায়- ক্ষুধা নিবারণে খাদ্য চায়। তা না দিলে তারা সব ভেঙে চৌচির করে দেবে। এখানে ‘পাঞ্জেরী’-তে উল্লিখিত ক্ষুধিত মানুষের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার পুনরুক্তি করা হয়েছে। কিন্তু সে সঙ্গে আর একটি ভয়ঙ্কর অবস্থার উল্লেখ করা হয়েছে। তারা পথ ছেড়ে নিচে নেমে যাবে অর্থাৎ তারা বিপথে যাবে, তাদের নৈতিক অধঃপতন হবে। তারা সর্বনাশের দিকে ছুটবে। জনতার বিপদগামিতার এ চিত্রকল্প একটি নতুন সংযোজন। এ চিত্রকল্পে বক্তার উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।
কবিতাটির মাঝামাঝি স্থানে আবার ক্ষুধিত মানুষের প্রসঙ্গ টানা হয়েছে। মাঝিকে উদ্দেশ্য করে বক্তা বলেছেন :
এবার তোমার রূদ্ধ কপাটে মানুষের হাহাকার
ক্ষুধিত শিশুর কান্নায় শেষ সেতারের ঝঙ্কার
এখানে এখন প্রবল ক্ষুধায় মানুষ উঠছে কেঁপে
এখানে এখন অজস্র ধারা উঠছে দু’চোখ ছেপে।
উপরোক্ত লাইনগুলোতে বক্তার দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। আগে যেখানে ক্ষুধিত মানুষের ভাঙচুরের চিত্রকল্প ব্যবহার করা হয়েছে, এখন সেখানে মানুষের হাহাকার, মৃত্যুপথযাত্রী শিশুর ক্ষীয়মাণ কান্না, অজস্র মানুষের চোখ ছাপিয়ে-পড়া অশ্র“র বন্যার চিত্রকল্প। ক্ষুধিত মানুষের বর্ণনায় এ নব নব চিত্রকল্প জাতির ঘুমন্ত কর্ণধারদের জেগে ওঠার জন্য উদ্বুদ্ধকরণের কৌশল বলে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ‘পাঞ্জেরী’ ও ‘সাত সাগরের মাঝি’ রূপকধর্মী কবিতা, যেখানে বাস্তব জগতের চিত্র প্রত্যক্ষভাবে প্রকাশ পায়নি। এর প্রত্যক্ষ প্রকাশ ঘটেছে ‘লাশ’ ও ‘আওলাদ’ কবিতায়। ‘লাশ’ কবিতায় পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রেক্ষিতে অনাহারজনিত একজন মানুষের মৃত্যুর সকরুণ চিত্রকল্প আছে। কলকাতার এক কালো পিচ-ঢালা পরিচ্ছন্ন প্রশস্ত রাজপথে- ‘তার ক্ষুধিত অসাড় তনু বত্রিশ নাড়ির চাপে মুখ বুজে পড়ে আছে অসাড় নিথর।’ এখানে একটি লাশের কথা বলা হলেও এ লাশটিকে যে একটি প্রতিভূ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তা নিম্নোক্ত লাইনগুলোতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে :
আকাশ অদৃশ্য হ’ল দাম্ভিকের খিলানে, গম্বুজে
নিত্য স্ফীতোদর
এখানে মাটিতে এরা মুখ গুঁজে মরিতেছে ধরণীর প’র।
‘এরা’ শব্দটি ইঙ্গিত করছে যে এ লোকটির মতো আরো অনেকে অনাহারে মৃত্যুবরণ করছে। আর এ অকাল মৃত্যুর জন্য বক্তা সমাজ ও সভ্যতাকে দায়ী করছেন। তিনি এতটা উত্তেজিত ও বিক্ষুব্ধ যে লাশের কথা প্রায় ভুলে গিয়ে আক্রোশে ফেটে পড়েছেন। এ কোন্ সভ্যতা যেখানে নেতারা জনতার সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তাদেরকে নর্দমার পাশে ফেলে দিচ্ছে ? এ আক্রোশ শেষ পর্যন্ত অভিসম্পাতে রূপ নিয়েছে। এ অভিসম্পাত শুধু তার নিজের পক্ষ থেকে নয়, সকল উৎপীড়িত মানুষের পক্ষ থেকে :
আজ এই উৎপীড়িত মৃত্যুদীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও:
ধ্বংস হও
তুমি ধ্বংস হও।
‘আউলাদ’ কবিতায় ক্ষুধিত মানুষের বিস্তৃত বিবরণ দেয়া হয়েছে। তারা সারে সারে কাতারে কাতারে কাস্তে কোদাল লাঙ্গল নিয়ে ভারবাহী পশুর মতো চলেছে মরু, মাঠ, বন পার হয়ে কাজের সন্ধানে। এরা খেটে খাওয়া বঞ্চিত মেহেনতী মানুষের দল। অমানুষিক পরিশ্রম করে গতর খাটিয়েও তারা তাদের দু’বেলা মুখের অন্ন জোটাতে অক্ষম। সমাজের সুবিধাভোগী বিত্তবান মানুষেরাই এ খেটে খাওয়া মানুষের দুঃসহ বঞ্চনাপূর্ণ জীবনের জন্য দায়ী। তাদের বঞ্চনাপূর্ণ দুঃসহ জীবনের উত্তরাধিকারিত্ব বয়ে চলেছে তাদের অসহায় শিশু- সন্তানেরাও। কবি এসব শিশুদের কথা তুলে ধরেছেন এভাবে :
চলে দল বেঁধে শিশু ওষ্ঠে তুলি জীবনের
পানপাত্র সুতীব্র বিস্বাদ
মানুষের বুভুক্ষু মুমূর্ষু আউলাদ।
তারা জড় সভ্যতার নির্মম শিকার। তাদের দুর্দশার আরো ভয়ানক চিত্র আঁকা হয়েছে :
আমি দেখি পথের দু’ধারে ক্ষুধিত শিশুর শব,
আমি দেখি পাশে পাশে উপচিয়ে প’ড়ে যায়
ধনিকের গর্বিত আসব,
আমি দেখি কৃষাণের দুয়ারে দুর্ভিক্ষ বিভীষিকা,
আমি দেখি লাঞ্ছিতের ললাটে জ্বলিছে শুধু অপমান টিকা,
গর্বিতের পরিহাসে মানুষ হ’য়েছে দাস,
নারী হ’ল লুণ্ঠিতা গণিকা।
আমরা দেখেছি ‘লাশ’ কবিতায় অত্যাচারীদের সময় আসলে জাহান্নামে টেনে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেয়া হয়েছে এবং তাদেরকে ‘ধ্বংস হও’ বলে অভিসম্পাত দেয়া হয়েছে। কিন্তু এর কোনটাই কার্যকর নয়। তাই ‘আউলাদ’-এ ভিন্ন পন্থা অবলম্বনের কথা বলা হয়েছে। বক্তা এবার মানুষের কাছে কোন ফরিয়াদ জানাবেন না ঃ
এবার আল্লাহর আদালতে
আমাদের ফরিয়াদ
ক্ষুধিত লুণ্ঠিত মানুষের এই রিক্ত ফরিয়াদ।
আর এ ফরিয়াদ কি বৃথা যাবে ? তিনি কোরআনে বিবৃত সামুদ, ফেরাউন ও নমুরুদের উল্লেখ করেছেন। এসব শোষকরা ধ্বংস হয়ে গেছে, তাদের সভ্যতা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোরআনের এসব উদাহরণের আলোকে তার ফরিয়াদ যে ব্যর্থ হবে না এ সম্বন্ধে তিনি নিশ্চিত। বস্তুত তিনি চোখের সামনে এখনই তার আলামত দেখতে পাচ্ছেন। অনেকটা নাটকীয়ভাবে তিনি একটি নতুন জাতির উত্থান প্রত্যক্ষ করছেন ‘দুর্গম উপলে’। তাদের দামামা বাতাসে বেজে উঠেছে, তিনি তাদের দামামার স্বর শুনতে পাচ্ছেন- ‘বলিষ্ঠ বক্ষের তলে সুকোমল অন্তরের স্বর’। এ প্রেক্ষিতে তার শেষ প্রার্থনা :
: আর যেন ক্লিষ্ট নাহি হয়,
আর যেন ত্রস্ত নাহি হয়,
পথে দেখি পীড়নের ফাঁদ,
আর যেন ভ্রষ্ট নাহি হয়
মানুষের ভবিষ্য দিনের আউলাদ।
এ ধরনের প্রার্থনা ছাড়া মানুষের কি আর কিছু করার নেই ? ক্ষুধিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা লাঘবের জন্য আমরা কি ঐ আল্লাহর বিচারের জন্য অপেক্ষা করে থাকবো ? ‘সিরাজাম মুনীরা’ ও ‘ওমর দরাজদিল’ কবিতায় এ সম্বন্ধে কিছু বক্তব্য আছে। মহানবী স. তাঁর কৈশোরে ক্ষুধার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। কবি বলেন :
কিশোর কণ্ঠ জ্বলে পিপাসায়; জলে ক্ষুধাতুর পাকস্থলী,
বত্রিশ নাড়ী ছিঁড়ে পড়ে বুঝি ক্ষুধার ধমকে ধমনী কাঁপে
বাবলা কাঁটার বিক্ষত দেহ, পিঠ নুয়ে আসে বোঝার চাপে
আঁসু ঝরে আর কলিজার খুন ঝরে সিরিয়ার বালুর মাঠে,
খেজুর কান্ত উপাদান শিরে কিশোর তোমার রজনী কাটে।
কোন সে অটল কারিগর তার কঠিন আঘাতে অনবরত
বার বার হানে আর চেয়ে দেখে হ’ল কিনা তার মনের মতো।
উপরোক্ত লাইনগুলোতে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। কৈশোরে তার ক্ষুধার অভিজ্ঞতা। সে সময় ক্ষুধায় যন্ত্রণায় তার বত্রিশ নাড়ি ছিড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে, জীবিকার জন্য কঠিন শারীরিক পরিশ্রম তাকে করতে হয়েছে আয়েশ-আরাম থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছেন। কিন্তু এ কঠোর কঠিন অভিজ্ঞতা আল্লাহর পূর্ব-পরিকল্পিত। এভাবে তিনি ভবিষ্যতের নবী তৈরি করেছেন যাতে তিনি দ্বীন-দুনিয়ার কষ্ট অনুভব করতে পারেন ঃ
হাজার ব্যথার আগুনে পোড়ায়ে মরুর হাপরে হাজার দিন,
সুন্দরতম তব অন্তর ব্যথার রঙে কে করে রঙিন।
তখন তোমার বিশাল হৃদয় বুঝেছে দুঃখ দীন দুখির
জীবন কাটিয়ে অনশনে হায় বুঝেছো কী জ্বালা ভুখা প্রাণীর
জেনেছে বন্দী বনি-আদমের দুঃখ; কোথায় ব্যথা নারীর।
কোন কারিগর দিয়েছে তোমার ঐ সুবিশাল নয়নে নীর ?
ক্ষুধিত মানুষের দুঃখ, ব্যথিত মানুষের যন্ত্রণা অনুভব করতে হলে নিজের জীবনে সে অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। আল্লাহর পরিকল্পনামাফিক মহানবী স.-এর জীবনে সে অভিজ্ঞতা ছিল, তাইতো তিনি ‘ব্যথিত মানুষের ধ্যানের ছবি’ হতে পেরেছিলেন। কিন্তু ক্ষুধার অভিজ্ঞতা শুধু তাঁর কৈশোরের সঞ্চয় নয়। তিনি যখন মক্কা-মদিনার ‘রাজা’ তখনও তাঁর গৃহে অভাব মেটেনি, উনানে খাবার চড়েনি, কত রাত কেটেছে ক্ষুধায় :
জ্বলে না কুটিরে চেরাগ, জ্বলে ও ব্যথিত বক্ষে প্রেমের শিখা
জ্বলে ও মাটির শামাদানে লাল ফিরদৌসের স্বপ্ন লিখা।
ক্ষুধিত মানুষের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি কি হওয়া উচিত তার দৃষ্টান্ত মহানবী স. রেখে গেছেন। এ দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে দেখি ‘আল ফারুক’ নামে পরিচিত ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর বিন খাত্তাব (রা)-কে। একদিকে ‘সে জালিম, পাপীর অত্যাচারীর শিবিরে দৃপ্তকায়’ ‘আবার দেখি সে ক্ষুধিত জনের শিয়রে একাকী কাঁদে’ !
যে বিরাট দেহী দরদীর হাতে
তৃপ্ত এতিম শিশুর বুক,
সে শিশু জানেনা- তার ক্ষুধায় যে
রান্না চড়ালো- সেই ফারুক।
অতন্দ্র তার দীঘল রজনী
দুঃস্থ গরীব দীন সেবার
অনাথ নারীর দরজায় এসে
কাজ করে যেন ভৃত্য তার।
তিনি জনতার কাছে মজুর হয়ে আহার্য পান, বেতন পান, জনতার সাথে ইসলামী জয়কেতন বহন করে চলেন। আজ পৃথিবীর দিকে দিকে তাই ‘ওমরপন্থী’ লোকের একান্ত প্রয়োজন :
পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ী দেবে যারা প্রান্তর প্রাণ-পণ,
উষর রাতের অনাবাদী মাঠে ফলাবে ফসল যারা
দিক দিগন্তে তাদের খুঁজিয়া ফিরিছে সর্বহারা।
যাদের হাতের দোররা অশনি পড়ে জালিমের ঘাড়ে,
যাদের লাঠির ধমক পৌঁছে অত্যাচারীর হাড়ে
আগুনের চেয়ে নিষ্কলঙ্ক, উদ্যত লেলিহান
যাদের বুকের পাঁজরে বহে দরদের বান
সে ভয়ঙ্কর সেই প্রশান্ত মধ্যদিনের রবি,
এই মজলুম দুনিয়ার খা’ব- নিত্য ধ্যানের ছবি।
খলিফা ওমরের (রা) দু’টি বৈশিষ্ট্যের কথা এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। একদিকে তিনি ছিলেন গরিবের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাদের দুঃখ লাঘবের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। অন্যদিকে জালিমের প্রতি তিনি ছিলেন খড়গহস্ত। দুটো বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটা সম্পর্ক আছে এ অর্থে যে শোষণের ফলেই সাধারণ মানুষ দুর্দশার শিকার হয়। খলিফা ওমর (রা) সেটা জানতেন। তাই তাঁর মধ্যে কঠোরতা ও কোমলতার সংমিশ্রণ ঘটাতে পেরেছিলেন। উৎপীড়ন এখনো আছে। তাইতো ওমরের মতো মানব-দরদী মনীষীর আমাদের প্রয়োজন আছে; তাইতো তাঁর মতো মহৎ-প্রাণ মানুষের জন্য আমরা অপেক্ষা করে আছি।
উপরের আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ফররুখের চিন্তায় ক্ষুধিত মানুষ একটা বিরাট স্থান দখল করে আছে। তিনি যখন জাতির জাগরণের কথা বলেছেন তখন ক্ষুধিত মানুষের প্রসঙ্গই তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে এসেছে। জাতিকে জাগাতে হবে, কারণ নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার না দিলে তারা বিক্ষোভ করবে, বিপথে যাবে। এসব একজন সমাজ-সচেতন কবির কথা। তিনি সমাজ-সচেতন বলেই ‘লাশ’ ও ‘আউলাদ’-এর মতো কবিতা লিখতে পেরেছেন যেখানে সমাজের বঞ্চিত, নিপীড়িত মানুষের এমন মর্মস্পর্শী চিত্র আঁকতে পেরেছেন। তিনি সমাজ-সচেতন বলেই বুঝতে পেরেছেন যে, একশ্রেণীর মানুষের দুর্দশা ও বঞ্চনার জন্য সমাজের সুবিধাভোগী, স্বার্থপর, বিত্তবান মানুষের শোষণই এর প্রধান কারণ। তাই তিনি শোষণের বিরুদ্ধে এমন সোচ্চার হতে পেরেছেন। তাঁর এ দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে মহানবী স. ও খলিফা ওমর (রা) প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছে। তাঁদের মধ্যে তিনি দেখেছেন সামাজিক সমস্যা সমাধানের জলন্ত উদাহরণ- অনির্বাণ আলোকবর্তিকা।
এখানে নজরুল ইসলামের সঙ্গে ফররুখ আহমদের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। নজরুলও ছিলেন দুর্গত মানবতার কবি। তাঁর কবিতায়ও আমরা দেখি গণমানুষের জন্য সুতীব্র দরদ ও উৎপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। কিন্তু তাঁর সঙ্গে ফররুখের তফাৎ এই যে নজরুল সমসাময়িক সাম্যবাদী আন্দোলনের প্রভাবেই এ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছিলেন বলে অনেকে মনে করেন। পক্ষান্তরে, ফররুখ আহমদ প্রেরণা খুঁজেছেন ইসলামের নবী ও খলিফা ওমরের মধ্যে। তিনি একদিকে মহানবীর স. দরদী মনের ওপর জোর দিয়েছেন, অন্যদিকে ওমরের চরিত্রে কঠোরতা ও কোমলতার সংমিশ্রণের ওপর গুরত্ব আরোপ করেছেন এবং ‘ওমরপন্থী’ লোকের জন্য প্রহর গুণছেন।