নারী হয়েছিলাম

নারী হয়ে ওঠার আগেই
আমি তোমার প্রেমিকা হয়ে উঠলাম।
তুমি মুগ্ধতায় আগলে ছিলে।
জন্মান্তরে অবিশ্বাসী তুমিও
মাথায় বিলি কাটতে কাটতে কৌতূহলী হতে-
‘অ্যাই, আগের জন্মে তুমি আমার মেয়ে ছিলে বুঝি?’
আমি হাসতাম।
তোমার স্পর্শে মাদকতা ছিল না, ছিল না কামনার ঝড়,
আদরমাখা ভালোবাসায় দাগ ছিল না।
দাগ হলো যেদিন আমি নারী হয়ে উঠলাম।
আমি তোমার কাছে নারী হইনি,
হয়েছিলাম কারো চোখের হিংস্র চাহনিতে।
আস্তাকুঁড়ে পতিত হতে হতে আমি তোমাকে খুঁজেছি,
তোমার আদুরে হাতের ছোঁয়া।
তলিয়ে যেতে যেতেও আমি দেখেছি,
মাথায় বিলি কাটছো তুমি
ফিসফিসিয়ে বলছ, ‘পরের জন্মে তুমি আমার মেয়ে হবে!’
…………………………………………..

শুধুই তোমাকে চাই

হয়তো হঠাৎ
কোনো এক অবেলায় দেখা হবে রাস্তার মোড়ে।
চায়ের কাপের টুংটাং আওয়াজের আড্ডায়
তুমি ঝড় তুলবে।
আড্ডায় ঝড় তুমি তুলতেই পারো, খুব পারো
আমার চেয়ে ভালো আর কে-ই বা জানে!
কথার ফুলঝুড়ি ছুটিয়ে
দিব্যি আমাকেই তো বশ করে ফেললে।
চায়ের চুমুক থেকে মুখ তুলে, আড্ডা ফেলে
তুমি আমার সামনে এসে দাঁড়াবে, ঠিক দাঁড়াবে।
আমার হাতের মুঠোয় তখন ছোট ছোট আঙ্গুল
তোমার চোখের সামনে অপার বিস্ময়।
আচ্ছা তখনো কী তোমার
এমন ভুবন দোলানো হাসি থাকবে?
ওমন নির্ঝঞ্ঝাট হেসেই বলবে,
‘মেয়েটার দেখছি তোমার মতোই বোঁচা নাক!’
জানো মুখের দিকে তাকিয়ে
কখনোই তোমার দুঃখ-বেদনা স্পর্শ করতে পারিনি।
একচোট হেসে নিয়েও
তুমি কী কঠিন কথাগুলো বলে ফেলতে!
আবার চোখ-মুখ শক্ত করে
হাসির গল্প শুনিয়ে সবাইকে হাসাতে।
মানুষ রহস্যপ্রিয় বলেই
তোমার সবটুকু পড়ে ফেলার সাহস
আমার কখনোই হয়নি।
আমার ভয় হতো, শংকা হতো
যদি সবটা পড়ে ফেললে
তোমার প্রতি আমার আর আগ্রহ না থাকে!
সেই শংকায় নিজেকে প্রবোধ দিতাম।
এখন হয়তো তোমার দুঃখ-বেদনা
ছুঁয়ে দেবার অধিকারও আমার থাকবে না।
তবুও জানতে ইচ্ছে করবে
তোমার কী একটুও কষ্ট হচ্ছে না?
থাক ওসব।
আমি এ প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই না।
এই যে পিছুটান, দীর্ঘশ্বাস
আমার কী একটা নেই, কী একটা নেই ভেবে হাহাকার
এক জীবনে এত দুঃখ পুষে রাখতে পারব না।
বুকের ভেতরে একজন, ওপরে আরেকজনের দুই সত্ত্বা
আমি এত ভার বইতে পারব না।
সাত জনমের জীবন নয়
এক জীবনে শুধুই তোমাকে চাই।
…………………………………………..

বাঙ্গালি হবো

আজ আমি বাঙালি হবো, দেশকে ভালোবাসব।
কেউ একটা লাল-সবুজের পতাকা এনে দেবে?
গালে পতাকার ছবি এঁকে দেবে?
একটা সবুজ পাঁড়ের শাড়ি, মুঠোভর্তি লাল চুড়ি।
রবীন্দ্র সরোবরের লেকের কোনে বসে আমি জাগরণের গান শুনব।
এ সঙ্গীত আমার মর্ম স্পর্শ করার ফুরসৎ পাবে না।
আমি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে সেলফি তুলব, আপলোড করব।
কমেন্ট আসবে, ‘বাহ! শাড়িটা সুন্দর তো, দাম কত রে?’
‘অনেক দাম। দেশপ্রেমিক তো, দামি ব্র্যান্ডের শাড়ি ই আজ পড়েছি!’
লাল-সবুজের পতাকার ট্যাটু ধুয়ে যাবে, ধুয়ে যাবে দেশপ্রেম।
পতাকার জায়গা হবে ঘরের কোনে, পরদিন ভাগাড়ে।
আমি বাঙ্গালি, দেশকে ভালোবাসব একদিনের জন্য!
…………………………………………..

কথোপকথন

-আবার দেখা!
-পৃথিবীটা গোল, নয় বাঁকা!
-দিব্যি আগের মতোই আছো।
-জীবন এইতো ‘যেমন খুশি তেমন বাঁচো।’
-আজও মনে পড়ে?
-যখন ঝুম বৃষ্টি পড়ে।
-কখনো হও না উতলা?
-বিরহে পুড়ি একলা।
-মনে হয় না আবার ডাকি?
-কী দরকার! যদি আবারও দাও ফাঁকি?
-নতুন মানুষ…
-যদি হয় অমানুষ?
-তাই বলে একলা রবে?
-একলা তো করেছ সেই কবে!
-আমি ভালো নেই।
-হারিয়েছ জীবনের খেই?
-ক্ষমা করে দিও।
-যেখানেই থাকো, ভালো থেকো প্রিয়।
…………………………………………..

জীবন

চল্লিশের কোঠা হলো শেষ,
আয়নায় দেখে নিয়ে আধা পাকা কেশ,
ভাবলে জীবন তো কেবল অর্ধেক শেষ।
ভেবেছ যে শিশু চারে হারিয়েছে প্রাণ,
সে কী পেয়েছে বেঁচে থাকার ঘ্রাণ?
তার জীবনের অর্ধেক কত?
ভেবে নিয়ে স্রষ্টার কাছে হও নত।
জীবনের অর্ধেক, পুরোটার নেই মানে,
কবে তোমার সময় হবে স্রষ্টা ঠিকই জানে।
হেলায় হেলায় কালক্ষেপণ,
ক্ষণকাল পৃথিবী, পরকাল আপন।
পুণ্যের বোঝা রেখো ভারী,
অসময়েই সাড়ে তিন হাত হতে পারে বাড়ি!
…………………………………………..

আমাদের গন্তব্য কোথায়?

পৃথিবী তার সংকীর্ণতার কথা জানিয়ে দিলো,
বিশুদ্ধ বাতাস অভিমানিনী হলো,
সমুদ্র আর হাতছানি দিয়ে ডাকছে না,
পাহাড় আর মায়া বাড়াচ্ছে না।
আমাদের আর কোথায় যাওয়ার আছে?
চার দেয়ালের ঘিরে ফেলা বন্দীত্বদশার
মুক্তির মিছিলে
যোগ দিয়েছে কাতর প্রাণ।
দেয়ালে মুখ থুবড়ে পড়ছে
ডানা ঝাপটে বেড়ানো আহত পাখি।
প্রেমিকের উদ্বিগ্ন কন্ঠে
চোখে শান্তি পাওয়ার আকুলতা।
স্বজনের সাময়িক বিয়োগ
দীর্ঘস্থায়ী প্রস্থানের আয়োজন করেছে।
আমরা কী-ই বা করতে পারছি?
ব্যথাতুর হৃদয়ে অশ্রু বিয়োগের পূর্বেই
আমরা শিউরে উঠছি।
প্রিয়দের পথের পথিক হবো না তো!
আমাদের ব্যথা রূপ নিয়েছে শংকায়,
মৃত্যুর পূর্বেই নিদারুণভাবে মরে যাচ্ছি।
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে মৃত্যুদূত হানা দেয়ার পূর্বেই
আমরা যেন ছুটছি হাশরের ময়দানে।
আমাদের কোথায় গন্তব্য?
কোথায় ই বা থামব?
চাওয়া-পাওয়ার হিসেবে এত কেন গড়মিল?
দেয়ালে টুটি চেপে ধরলে
প্রকৃতিও ঘুরে দাঁড়ানোর প্রস্তুতি নেয়।
বিশুদ্ধতার অভিযানের সম্মুখযুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার আগেই,
আমরা তাকে মুক্ত করি।
প্রকৃতি বাঁচুক মুক্তিতে,
মানুষ বাঁচুক প্রকৃতিতে।
ব্যক্তিত্বের নিলাম
আমাদের ব্যক্তিত্ব মাঝেমধ্যে বাজারে ওঠে,
নিলাম হয়
কিংবা চড়া দামে কিনে নেন ব্যক্তিগত ক্রেতা।
তারপর অন্তঃসারশূন্য আমাদের যাপন চলে।
খুব ভালো থাকার পরিবর্তে আমরা ভয়ার্ত হয়ে উঠি।
এই বুঝি ব্যক্তিত্ব কেনা-বেচার খবর রটে গেল!
কেতাদুরস্ত পোষাকের মুখোশটা খসে,
এই বুঝি বেরিয়ে এলো ভেতরকার অমানুষটা!
কিংবা লেগে গেল চরিত্রহীন তকমা।
আভিজাত্যের সর্বসুখের নেশায় বিভোর হয়ে,
ব্যক্তিত্বকে বিকিয়ে আমরা বেশ সুখী হয়ে উঠি।
আমাদের সুখ এতটুকুই।
এরপর আমাদের অজান্তেই মনুষ্যত্বে পচন ধরে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজস্ব আলাপনে
ভেতরের পশুকে স্পষ্টই দেখতে পাওয়া যায়।
কী বিভৎস হিংস্রতা!
বিশালতার জায়গা দখল করে ক্ষুদ্রতা।
চোখের সামনে খসে পড়ে মেরুদন্ডের হাড়।
ন্যায়ের সাথে বোঝাপড়ার দ্বার রুদ্ধ হয় চিরতরে।
হীনমন্য মন আর কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না।
অন্যায়ের আপোষে একমুখী অন্ধকারেই,
আজন্ম সংসার পেতে বসে মন।
ঠিক মন নয় ,দেহ।
মনুষ্যত্বের বিলীনে মনের আর অস্তিত্ব কোথায়!
আমাদের যেন আর কিছুই করার নেই।
একবার নিজেকে বিকিয়ে দেয়ার লোভটা পেয়ে বসলে,
শুধু অপেক্ষা ব্যক্তিত্বের বাজারদরের উত্থান-পতনের।
…………………………………………..

এবার বসন্তে

কতকাল ভালোবাসিনি,
প্রেমের গন্ধে আকুল হইনি।
হঠাৎ সাতরঙা মাদকতার হাতছানি!
আমি ভীষণ মুগ্ধতায় তাকিয়েছিলাম।
চোখের নিচের কালচে দাগে মায়া জমা রইল।
আদর জমে রইল রুক্ষ চুলে,
আমি ভালোবাসলাম কপালের কাটা দাগটাকেই।
প্রেমের প্রদীপ জ্বাললাম মৃদু হাসিতেই।
অনাদরের প্রলেপ পড়ে যাওয়া অন্তঃপুরে দারুণ সাড়া পড়ল।
জানান দিল, এ বসন্ত তোমার।
কত বসন্তে রং ছোঁয়নি আমায়!
আবিরের ছোঁয়া লাগেনি গালে, চিবুকে।
একা হেঁটেছি ধূসর পথে।
এ বসন্তে আকাশ হও, রং লেপ্টে দিই তোমার গালে।
…………………………………………..

দোষী

দোষ তোমার
তুমি কেন বের হবে সংসার ফেলে?
সমাজের বারণ, কেন বাধা মাড়িয়ে এলে?
দোষ তোমার
তুমি হাতে তুলে নিলে বই
কথার পিঠে কথা, মুখ যেন খই।
দোষ তোমার
গায়ের পোশাক নেই ঠিকঠাক
একটু হলেই দেখা যেত শরীরের বাঁক।
দোষ তোমার
কেন বাড়ি ফিরবে রাত-বিরেতে?
জানো না সমাজের রক্তচক্ষু কুৎসায় মাতে?
দোষ তোমার
তুমি নারী
সবার ‘আমার আমি’ তার,
শুধু তুমি যখন যার দখলে, তার-ই।
…………………………………………..

সুদিন আসবে

আমাদের শহরে একদিন স্বস্তির বাতাস বইবে
খুব ভোরে কাকের কর্কশ ডাকাডাকিও
ঠিক যেন সুরের মতন অনুরণিত হোবে।
বিকেলবেলা চায়ের দোকানটাতেও ভীড় লেগে থাকবে।
পানসে চায়ের জন্য চাওয়ালাকে কথা শোনাতে
একদম ইচ্ছে করবে না।
হোক পানসে,
তবুও এক ভীড়টা তো বিলীন হয়নি
হারিয়ে যায়নি অতল গহ্বরে।
প্রেমিকের হাত যেন খুঁজে পাবে
কোটি বছর পরে হাতের স্পর্শ।
তিরতির করে স্রোতের মতো বয়ে যাওয়া বিরহে
স্থায়ী ভাটা পড়বে।
চেনা পথটাকে মনে হবে
কত বছর এই পথে হাঁটিনি!
গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগার এই শহুরে জীবনকে
বড্ড প্রশান্তির মনে হবে।
সমুদের নোনাজলও অমৃতের স্বাদ এনে দেবে।
পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে যাবে ক্লান্তিহীন তনু।
জানালার ফাঁক গলে প্রিয়মুখের অপেক্ষায়
সময়কে দীর্ঘায়িত করতেও আনন্দ হবে।
জমে থাকা কথারা ইথারে দিব্যি ভেসে বেড়াবে।
মুক্ত বাতাস গ্রহণ করার দিন আসবে।
সুদিন আসবে, আসবেই।