কাকশিয়ালি, চুনকুঁড়ি খুঁজতে গিয়ে ছ্যাবলাখালের দেখা মেলে। নদী নয়, নদীর কঙ্কাল। চারদিক থেকে কড়াল থাবা বসিয়েছে মানুষরা। সাপের মাথায় পারা পড়লে যেমন এঁকেবেঁকে কুঁকড়ে যায়, নদীটাও সে রকম কুঁকড়ে আছে। আহ্ কত নির্মমভাবে মানুষ একে হত্যা করেছে! করুণমুখ পানে চেয়ে মায়া লাগে। নদীর নাম জানতে ইচ্ছা করে না বরং ওর তলপেট দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে ওপারের অন্য গ্রামে ঢুকে যাই। মাঝে মাঝে ধানীজমিতে সার করে লাগানো খেজুরগাছ খানিক মন ভোলালেও সুন্দরবনের ছবি এসে আমাকে নোনা গন্ধের গল্প শোনায়। সুন্দরবন- আহা মধুময় নীলডুমুর কলাগাছিয়া। মনে আছে সাতক্ষীরা পৌঁছে পরদিনই বাসে চেপে চলে গেছি মুন্সীগঞ্জ। তার পর শ্যামলাবাজার থেকে ভাড়ার মোটরসাইকেলে খাল ধরে বন বরাবর গাবুরার দিকে চালিয়ে গেছি। দুপুরবেলা টঙ-দোকানে বসে চা খেতে খেতে শুনেছি বাঘ চিংড়ি আর কাঁকড়ার গল্প। এর পর বহুবার সুন্দরবনে যেতে হয়েছে, কাজে কিংবা আনন্দে। খেজুরময় সাতক্ষীরার নোনা হাওয়াকে ভালোবেসে বোহেমিয়ান চলে গেছি হরিনগর গ্রামে। হরিনগরের মৌয়াল সুন্নত গাজীর মুখটা এখনো ঝুলে আছে আমার সামনে।

বনগামী বাসগুলো পদে পদে থামে না, দূরের মুন্সীগঞ্জকে মনে রেখে একটানা দক্ষিণে চলতে থাকে। সাতক্ষীরা থেকে কালীগঞ্জ। তার পর দেবহাটা পার হয়ে শ্যামনগরের শেষপাতে এসে লাস্টস্টপেজ। গোটাকয়েক ঝাপতোলা দোকান এবং ছোট একটা বুনো বাসস্ট্যান্ড নিয়ে শ্যামলাবাজার-মুন্সীগঞ্জ। বাজার আর বনের ফারাক শুধু খোলপেটুয়া নদী। মুন্সীগঞ্জ, হরিনগর, কলাগাছিয়া কিংবা নীলডুমুরের মতো গ্রামগুলো এতই বনবর্তী যে ক্ষুধার্ত বাঘেরা হামেশাই নদী সাঁতরে লাগোয়া এসব গ্রামে ঢুকে পড়ে। তার পর মওকা মতন দু-একজনকে হত-আহত করে তাদের হাড়-মাংস চিবিয়ে আবার বনে ফিরে যায়। দু-চার ঘর বাদেই পাওয়া যায় বাঘে খাওয়া মানুষের গল্প। ‘বিধবাদের গ্রাম’র একটি অনন্য উদাহরণ। এ গ্রামে যেসব বিধবারা আছেন তাদের স্বামীদের কোনো না কোনো সময় বাঘে খেয়েছে। মাসে, ছয় মাসে দু-একজনকে বাঘে ধরে, কেউ মারা পড়ে কিংবা কদাচিত কেউ বা আহত-আধখাওয়া হয়ে ফিরে আসে-এ রকম ঘটনা এখানে খুব বেশি আমল পায় না।

এতকিছু জেনেও অরণ্য পিয়াসীরা জীবন হাতে হরদম মুন্সীগঞ্জ কিংবা পার্শ্ববর্তী নীলডুমুর ঘাট থেকে নৌকা ছাড়ে। তার পর সামর্থ্য ও সাহস মতো ঢুকে পড়ে ম্যানগ্রোভের রহস্যবনে। বনবাহিত নদীগুলো ডালে ডালে গিয়ে এক সময় গভীর বনের অলিগলিতে হারিয়ে গেছে। বুনোগলিতে বয়ে বেড়ানো বাতাস এক সময় নদীতে ঢেউ তোলে। বাওয়ালি ও মৌয়ালদের নৌকোগুলো ভয়হীন চলে গেলেও ভয়ভরা চোখে আগুন্তুকরা চেয়ে থাকে ঘন হেতাল বনের দিকে। নোনামাটিতে জ্বলে থাকা ম্যানগ্রোভ, থোকা থোকা শ্বাসমূলের ফলার ফাঁকে ঝাঁক ঝাঁক হরিণের পায়ের ছাপ আর বাঘের চামড়ার ডোরাকাটা হলুদ কল্পনারা যেন তাদের একেকটা মর্মাহত বিকালকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। বনজ আলোর অপার্থিব মুগ্ধরসে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পর্যটকমন। বাঘের কামড়ে দলের কেউ মারা পড়লে, তল্লাটে গাছে সঙ্গী বাওয়ালিরা লাল কাপড় বেঁধে দেয়। সেসব লাল কাপড়ের সিগন্যাল এবং কলাগাছিয়ার ফরেস্ট গার্ডদের ঝোলানো সতর্কবাণী সংবলিত সাইনবোর্ড অবহেলা করে পর্যটকরা আরও গভীরে যেতে চায়। ঘোরের মধ্যেই ঢুকে পড়ে নোনামাটির জঙ্গলে। নিশিতে পাওয়া প্রকৃতিপ্রেমীদের সামনে কেওয়া, গড়ান, গোলপাতা পশুর সুন্দরীরা জবান খোলে বোধহয়। তার পর বাঘের জলজ্যান্ত পদছাপ তাদের শিরদাড়া কাঁপিয়ে তোলে। তখন হুঁশ হয়। সুন্দরবনের সব সুন্দরকে একটানে দেখা হয় না। রহস্য আর আকাক্সক্ষায় বুকে ফিরে আসে বনপিপাসুরা।

বনজীবী ছাড়াও সাতক্ষীরাজুড়ে আছে বিবিধবর্ণের মানুষ। ঘোনার চৌদালি সম্প্রদায় কিংবা গাংনিয়ার রাজবংশী অথবা দৌলুইপুরের ভগবানিয়া-কার কথা বলব! লাবসার পাশে বয়ে চলেছে বেতনা। নরম বেতনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে লেখা হয়েছে গাজী-কালু-চম্পাবতী। দেবহাটার মধ্যপথে সখিপুরের সুস্বাদু দুধ-চায়ের কথা ভাবতে ভাবতে টাউন শ্রীপুরের ইছামতি থেকে দুই বাংলার হাওয়া এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাকে। মন চলে যায় আশাশুনির দরগাপুর পার হয়ে বেহারাগ্রামে। বিচিত্র জাতি-উপজাতি আর প্রাচীন নানাবিধ পুরাকীর্তিতে পরিপূর্ণ এই সুন্দরবনী অঞ্চল-সাতক্ষীরা। আদিবাসীদের মধ্যে মুন্ডা কিংবা নিদেনপক্ষে গাছীদের কথাই ধরা যাক। পথের লোকজনকে গাছী বললে উত্তর না দিয়ে মুখপানে চেয়ে থাকে। পরে দু-চারজনকে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি- এ অঞ্চলে গাছি মানে শিবলি।

সাতক্ষীরার কোনো কোনো গ্রাম নিবিড় ছায়াঘেরা। যেমন হরিণখোলা কিংবা ভোমরার ঘোনার কথাই ধরা যাক। দ্বিতীয়বারের মতো হরিণখোলা পার হয়ে মুন্ডাদের গ্রাম আসনানগরে গিয়েছিলাম গত বর্ষায়। নেপাল, গোপাল, তেজান মুন্ডাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে বেলা গড়িয়ে গেল। তার পর বেদম কাদাপথে সাতক্ষীরা শহরের দিকে ফিরতে থাকি। পাশের গ্রামের কিছু হিন্দু পোলাপানও আমাদের সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে শুরু করে। একজন বলল, ওরা গুলকে কি বলে জানেন? বলে গিরগিল্লা, আর গুল খাওয়া মানে হলো গিরগিল্লা খাতুন। গিরগিল্লা বলেই একে অপরের গায়ে ধাক্কা দিয়ে হাসতে লাগল- ওরা ডাকে কেমন করে শোনেন, মনে করেন গোবিন্দকে ডাকবে, বলবে ‘গোবিন্দ কুত কুত’ মানে গোবিন্দ এদিকে আয়। ছেলেগুলো ফের আগের মতো হি হি করে ওঠে। ওদের কাছ থেকেই জানতে পারলাম মুন্ডারা ইঁদুরকে বিলখাসি এবং কেঁচোকে ‘উঠোন বরবটি’ বলে। মুন্ডাপাড়া থেকে হাফ কিলোমিটার দূরে বাঁকের মুখের ব্রিজ পেতে গিয়ে মাগরিবের আজান পড়ে গেল। ব্রিজের পর থেকেই মূলত মূল কাদার শুরু। আগেরবার ফেরার পথেই স্থির করেছিলাম, এবারই শেষ। এ রকম বিটকেল কাদার পথে আর নয়। কিলোখানিক আসার পর বাধ্য হয়েই মূল রাস্তা ছেড়ে দিলাম। বাইপাস করে গ্রামের গলিতে ঢুকে পড়লাম। সম্ভবত নিম্নবর্গের হিন্দুপাড়া। উঠোন, গোয়াল, বারান্দা, আঙিনা যেখানে যে রকম সুযোগ তালমাতালে হাঁটছি। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ভেতর একতাল চাঁদও উঠেছে। পাড়ার খাঁজে খাঁজে কুয়াশা নয়; সান্ধ্যপূজার ধূপের ধোঁয়া। নীরবতার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দূরবর্তী লঞ্চের ভেপুর মতো উলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে। উলুধ্বনির মাঝে মাঝে কেউ একজন শঙ্খ বাজাচ্ছে। সহযাত্রী জামাল অনেকটা ভূত দেখার মতো আমাকে থামিয়ে দিল, ‘শুনতে পাচ্ছেন, কে যেন কাঁদছে।’ কান্নার সঙ্গে খুব ধীরলয়ে ঢোল-হারমনি বাজছে। কৌতূহল আর ভয় নিয়ে আমরা কান্নার দিকে এগিয়ে গেলাম। কাছাকাছি যেতেই ছবিটা পরিষ্কার হয়ে গেল- প্রায় শ’দুয়েক নারী-পুরুষ মনসামঙ্গল পালা শুনছে। জটলার মাঝখানে লালসালু কাপড়ের রাজপোশাক গায়ে মুকুট মাথায় চাঁদ সওদাগর দাঁড়িয়ে আছে আর তার সামনে দিলিপ কেঁদে কেঁদে পাট করছে।

দিলিপের পাট নেওয়া কালো ছেলেটা সত্যি সত্যিই কাঁদছে। চোখ থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে। কোনো মেডিসিন ছাড়া এ রকম অভিনয় দিয়ে চোখে পানি আনা এই প্রথম দেখলাম। খানিক আগে আমরা দিলিপের কান্নাই শুনেছিলাম। বটগাছের নিচে পালা চলছে। পাশের ভাঙা ঘরকে ড্রেসিংরুম বানানো হয়েছে। এক মহিলাকে দেখলাম সেজেগুজে বসে আছে মনসাদেবীর পাট করার জন্য। বেহুলার ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য একজন ছোকরাকে পাউডার মাখিয়ে মেয়ে সাজানো হয়েছে। তার পাট বোধহয় পরের সিকুইন্সে হবে। সে বসে বসে বিড়ি টানছে। ওদের ছবি তুলে আমরা যখন পিচের রাস্তায় উঠলাম তখন রাত আটটা। বৃষ্টি থেমে গেছে। পাথারের মধ্যে সুতোর মতো পিচপথ। চাঁদের আলোর ভেতর একটা বুনো হাওয়া এসে উড়ে যায় পাথার থেকে পাথারে। আমরা হরিণখোলার সরু পিচ ছেড়ে সদর রাস্তায় উঠে যাই।

ড. আজাদুর রহমান : গবেষক ও সাহিত্যিক